প্রবন্ধ


১৬ মাসের  মর্মান্তিক  কারা স্মৃতি

[২০০৫ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারী থেকে ২০০৬ সালের ৮ই জুলাই। ১ বছর ৪ মাস ১৪ দিন]

অধ্যাপক মাওলানা নূরুল ইসলাম
সাধারণ সম্পাদক, আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ।

(৬ষ্ঠ কিস্তি)

আমীরে জামা‘আত পরকালের পথ নির্দেশক : কালের আবর্তে দিন গুনতে গুনতে ইতিমধ্যেই কারাজীবনের বয়স ৭/৮ মাস হয়ে গেল। বহু আসামীর যামিন হচ্ছে দেখে আমাদের মনেও যামিনের আকাঙ্ক্ষা উদগ্র হয়ে উঠলো। ইতিমধ্যে হাইকোর্ট পর্যন্ত যামিন নামঞ্জুর করেছে। ফলে কারাজীবন দীর্ঘায়িত হচ্ছে ভেবে আমরা মুক্তির জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠছি। হঠাৎ করে সালাফী ছাহেবের ছেলে আব্দুল আহাদ দেখা করতে আসল। তিনি জেলগেটে দেখা করে এসে চিৎকার করে বলতে লাগলেন, আমাদের আর যামিন হবে না। অন্যান্য সংগঠন তাদের নেতা-কর্মীদের জন্য যেভাবে চেষ্টা করে, টাকা খরচ করে, আমাদের জন্য তা করা হচ্ছে না। বরং শুনতে পেলাম আমীরে জামা‘আতকে আগে বের করবে তারপর আমাদের জন্য চেষ্টা করবে। আব্দুল লতীফ বলেছে, এ ব্যাপারে আমাদের রেজুলেশন হয়েছে। আমি আমার ছেলেকে বললাম, ‘কারুর ভরসা কর না, আমার শহরের বাড়ী বিক্রি করে হ’লেও আমাকে বের কর’ ইত্যাদি আবোল-তাবোল বকতে লাগলেন। আমীরে জামা‘আত বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর কদমে আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, আপনারা কি আল্লাহ্কে ভুলে গেছেন? তাকদীর অস্বীকার করছেন? জেলখানার রুযীর একটি দানা বাকী থাকতেও আপনারা বের হ’তে পারবেন না। আপনারা ইবাদত-বন্দেগী বাদ দিয়ে গীবত-তোহমত নিয়ে ব্যস্ত আছেন। ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) জেলখানাতে কাগজ-কলম থেকে বঞ্চিত হয়ে অবশেষে মুখস্থ কুরআন ২৭ পারা পর্যন্ত পাঠ করে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। পূর্বের আলেমদের উপর যে নির্যাতন এসেছিল সে কথা স্মরণ করুন! আপনারা সুন্দর পরিবেশ পেয়েছেন। উত্তম খাবার পাচ্ছেন। আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করুন। ইবাদতে মন দিন। কুরআন-হাদীছ মুখস্থ করতে শুরু করুন। আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন। তিনিই একমাত্র সাহায্যকারী। حسبنا الله ونعم الوكيل নূরুল ইসলাম! কুরআন মাজীদ নিয়ে আসো, আযীযুল্লাহ যাও, কুরআন নিয়ে ছহীহ-শুদ্ধভাবে ক্বিরাআত শিখ ও মুখস্থ কর। তোমাদের কি শুক্রবারের ফজরের ছালাতের সুন্নাতী ক্বিরাআত মুখস্থ আছে? উত্তর আসলো না! দুই দিনের মধ্যে সূরা সাজদাহ ও দাহর মুখস্থ করে আমাকে শুনাও।

আমীরে জামা‘আতের ধমক খেয়ে আর হুকুম পেয়ে আরম্ভ হ’ল কুরআন মুখস্থের পালা। জেলখানা যেন হেফযখানায় পরিণত হ’ল। সকাল-বিকাল ব্যায়াম করা আর কুরআন পড়া আমাদের  দৈনন্দিন  রুটিন হয়ে গেল।  আযীযুল্লাহ  কুরআন মাজীদ পাঠের ফাঁকে ফাঁকে তার পি.এইচ.ডির কাজ এগিয়ে নিতে আমীরে জামা‘আতের সহযোগিতা পেল। ফলে আমাদের জন্য কারাগার হ’ল শিক্ষাগার।

একদিন কুরআন তেলাওয়াতের পর সকালের নাশতা খাচ্ছি এমন সময় খবর এলো আমীরে জামা‘আত নওগাঁ জেলখানা থেকে একেবারে বগুড়া যাচ্ছেন। কারণ নওগাঁর পোরশা থানার মামলায় শুনানী হয়ে গেছে। এখন আর নওগাঁ থাকার প্রয়োজন নেই। যাওয়ার সময় আমি স্যারের হাতে ২০ টাকার একটা নোট গুঁজে দিলাম। স্যার ওটা ফেরৎ দিয়ে বললেন, নূরুল ইসলাম ‘টাকা নয় আল্লাহ আমাদের সাথী’। আমরা অশ্রুসজল চোখে স্যারকে বিদায় দিলাম।

আমীরে জামা‘আতের অবর্তমানে আমরা : সরকার মুহতারাম আমীরে জামা‘আতকে বগুড়ায় পৃথকভাবে অতিরিক্ত তিনটা মামলা দিয়েছিল। ঐ মামলায় হাযিরা দেওয়ার জন্য শুধুমাত্র তাঁকে মাঝে-মধ্যে বগুড়ায় নিয়ে যাওয়া হ’ত। তাছাড়া গাইবান্ধার দু’টি মামলায় আমরাও আসামী। তারপরও আমাদের তিনজনকে সেখানে কোনদিন নিয়ে যাওয়া হয়নি। এ কারণে মাঝে মাঝে আমরা নওগাঁতে আমীরে জামা‘আত ছাড়াই থাকতাম। আবার তাওহীদ ট্রাস্টের অর্থ লোপাটের অভিযোগে সালাফী ছাহেবের নামে আগে থেকেই ঢাকায় মামলা ছিল। সেই মামলায় হাযিরা দিতে সালাফী ছাহেবও দু’বার নওগাঁ থেকে ঢাকায় গিয়েছিলেন। আরেকবার সালাফী ছাহেবকে চিকিৎসার জন্য রাজশাহীতে পাঠানো হয়। এ সময় আমি আর আযীযুল্লাহ নওগাঁয় থাকতাম। আমাদের দীর্ঘ কারাজীবনে আমরা দু’জন কোনদিন পৃথক হইনি, যেখানেই গেছি এক সঙ্গেই গেছি।

আমীরে জামা‘আতের অবর্তমানে আমরা অত্যন্ত অসহায় বোধ করতাম। তাঁকে নিয়েও আমাদের দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। আমরা তো তিনজন একত্রে এক রকম আছি। কিন্তু তিনি একা একা কোথায় আছেন, কিভাবে থাকছেন, কিভাবে সময় অতিবাহিত করছেন ইত্যাদি নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তা করতাম। কিন্তু যখন তিনি ফিরে আসতেন, তখন তাঁর জীবনযাপনের বিবরণ শুনে খুশিতে মন ভরে উঠতো। কারণ তিনি যেখানেই যেতেন, সেখানেই পুলিশ, কারারক্ষী, কয়েদী, কারাকর্তৃপক্ষ সকলেই তাঁকে অত্যন্ত সম্মান, শ্রদ্ধা ও সর্বাত্মক সহযোগিতা করত। মাঝে মাঝে ভাবতাম, তিনি আমাদের মাঝে থাকলে হয়তো আমরাও তাঁকে তাদের মত করে সেবা-যত্ন করতে পারতাম না। সবই আল্লাহর মেহেরবানী। স্যারের অবর্তমানে কোন কর্তাব্যক্তি কারা পরিদর্শনে আসলে তারাও আমাদের সেলে এসে আগে স্যারের খোঁজ-খবর নিতেন। তাঁর শরীর কেমন আছে, তিনি এখন কোথায় আছেন, মামলার অবস্থা কি ইত্যাদি। তারপর আমাদের অবস্থা জিজ্ঞেস করতেন।

প্রথম দিকে স্যার মামলার হাযিরার জন্য গাইবান্ধা বা বগুড়ায় যেতেন, আবার ফিরে আসতেন। এভাবে কয়েকবার আসা-যাওয়া করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে তাঁকে আর আনা হ’ল না। আমরা তিনজন নওগাঁয় থেকে গেলাম, আর স্যারকে বগুড়া কারাগারে রাখা হ’ল। কারাগারে আমাদের আর মিলিত হওয়ার সুযোগ আসলো না। যখন জানতে পারলাম, স্যারকে আর নওগাঁয় আনা হবে না, তখন আমাদের এত খারাপ লেগেছিল, যা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। স্যারকে নিয়ে নানা রকম দুশ্চিন্তা সারাক্ষণ আমাদের মাথায় এসে ভিড় করত।

আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ : দেখা-সাক্ষাতের ক্ষেত্রে কারাগারের একটা সাধারণ নিয়ম আছে। যেমন কোন বন্দীর সাথে কেউ একবার দেখা করলে ১৫ দিনের মধ্যে তার সাথে আর কেউ দেখা করতে পারবে না। সচরাচর বন্দীকে বাইরের রান্না করা খাবার দেওয়া যাবে না ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে সেসব নিয়ম প্রযোজ্য হ’ত না। এমনও হয়েছে যে, এক সপ্তাহে আমাদের ৩/৪ দিন দেখা এসেছে। নেতা-কর্মীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এক নযর আমাদেরকে দেখা এবং তাদের সাধ্যমত খাদ্য-পানীয় দিয়ে আমাদেরকে সহযোগিতা করা। আগেই বলেছি নওগাঁ কারাগারের পানিতে প্রচন্ড আয়রণ ছিল। সে পানি খেয়ে আমরা সহ্য করতে পারলেও আমীরে জামা‘আত এবং সালাফী ছাহেব মোটেও সহ্য করতে পারতেন না। আয়রণ যুক্ত পানি পান করে তাঁরা দু’জন রীতিমত ডিসেন্ট্রিতে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। তখন আমরা বাইরে থেকে বোতলের পানি আনতে শুরু করলাম। আমাদের সাথে যখন কেউ দেখা করতে আসত, তখন তাদেরকে খাদ্য দেওয়ার চেয়ে বোতলের পানি কিনে দিতে বলতাম। পরবর্তীতে আযীযুল্লাহর উদ্ভাবিত কৌশলে পানি সমস্যার একটা সমাধান হয়। তাই বাইরে থেকে আর বোতলের পানি নিয়ে আসার প্রয়োজন হ’ত না। কিন্তু খাবার-দাবার?

আলহামদুলিল্লাহ! আমরা অত্যন্ত খুশি এবং কৃতজ্ঞ ছিলাম এই ভেবে যে, আমাদের কর্মীরা আমাদেরকে এত বেশি ভাল বাসে! বিভিন্ন যেলা থেকে কর্মী-দায়িত্বশীলরা যখন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন, তখন তারা আপেল, কমলা, আঙ্গুর, কলা, বিস্কুটসহ নানা রকম খাদ্য এত পরিমাণ দিতেন যে, আমরা তা খেয়ে শেষ করতে না পেরে অন্যদের মাঝেও বিতরণ করতাম। আমের মৌসুমে আম তো ছিলই। আমার মনে হয় ঐ বছর কারাগারে বসে আমরা যে পরিমাণ আম খেয়েছি, ঐ পরিমাণ আম আমরা কোন মৌসুমেই খাইনি। বিশেষ করে আমি ও আযীযুল্লাহ। এই অবস্থা দেখে আমীরে জামা‘আত আমাদের বলতেন, দেখ আমাদের কর্মীরা যে আমাদেরকে এত ভালবাসে, তা এখানে না আসলে আমরা বুঝতেই পারতাম না। আজকের এই সুযোগে সকলকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের পাশাপাশি মহান আল্লাহর নিকটে এই প্রার্থনা করি, তিনি যেন ক্বিয়ামতের ময়দানে আহলেহাদীছ আন্দোলনের নেতাদের প্রতি সর্বস্তরের কর্মীদের এই আন্তরিক মহববতের উপযু্ক্ত প্রতিদান প্রদান করেন।

খাদ্যের ব্যাপারে আরেকটি কথা না বললে চরম অকৃতজ্ঞতা হয়ে যাবে। আগেই বলেছি, গ্রেফতারের প্রায় দেড় মাস পর প্রথম বাসার রান্না করা খাবার খাওয়ার সৌভাগ্য হয় আমাদের নওগাঁ থানায় রিমান্ডে থাকা অবস্থায়। সেদিন আমীরে জামা‘আতের বাসা থেকে রান্না খাবার আসে। সেটা ছিল শুরু মাত্র। এরপর যতদিন চারজন নওগাঁ কারাগারে একত্রে ছিলাম, ততদিন কোন দিন আমীরে জামা‘আতের বাসা থেকে, কোন দিন সালাফী ছাহেবের বাসা থেকে নিয়মিত রান্না করা খাবার আমাদের জন্য পাঠানো হ’ত। আমরা পরম তৃপ্তি সহকারে তা খেতাম। যখন আমীরে জামা‘আত বগুড়ায় স্থায়ী হ’লেন, তখনও বাইরের খাদ্য আসা বন্ধ বা কমতি হয়নি। কোন দিন সালাফী ছাহেবের নিজের বাড়ি থেকে; কোন দিন তাঁর বড় মেয়ের বাড়ি থেকে; আবার কোন দিন তাঁর মেঝ মেয়ের বাড়ি থেকে রান্না করা খাবার আসত। এক্ষেত্রে আমি ও আযীযুল্লাহ পিছিয়ে ছিলাম। কারণ আমাদের দু’জনেরই বাড়ি ছিল অনেক দূরে। আমরা মুক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত একদিকে নেতা-কর্মীদের নিকট থেকে, অপরদিকে আমীরে জামা‘আত, সালাফী ছাহেব ও তাঁর নিকটাত্মীয়দের বাসা থেকে আমাদের প্রতি এ ভালবাসা অব্যাহত ছিল। এজন্য আমরা সকলের নিকট আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।

মামলা থেকে একের পর এক অব্যাহতি : আগেই বলেছি গ্রেফতারের পর আমাদের তিন জনের নামে মোট ৭টি এবং আমীরে জামা‘আতের নামে অতিরিক্ত ৩টিসহ মোট ১০টি মামলা দায়ের করা হয়। প্রথমে সকল মামলায় বিভিন্নভাবে আমাদেরকে সর্বমোট ৩০দিন রিমান্ডে নেওয়া হয়। তাতে প্রায় চারমাস অতিবাহিত হয়ে যায়। প্রথমে আমাদের নামে নির্দিষ্ট মামলা দেওয়ার কারণে রাজশাহীর ৫৪ ধারার মামলা থেকে আমরা অব্যাহতি পাই। অতঃপর সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানার মামলা থেকে আমাদের সকলকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়। এরপর জানতে পারলাম গাইবান্ধা যেলার গোবিন্দগঞ্জ ও পলাশবাড়ি থানার দু’টি মামলা থেকে আমাদের তিনজনকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়। কিন্তু আমীরে জামা‘আতকে একটি মামলায় অব্যাহতি এবং অপর একটি মামলায় চার্জ গঠন করা হয়। খবরটি শুনে আনন্দের চেয়ে দুঃখই বেশি পেলাম। কিন্তু কিছুই করার নেই। পরবর্তী তারিখে আমরা চারজনই নওগাঁ কোর্টে পোরশা থানার মামলায় হাযিরা দিলাম। ঐ তারিখে উক্ত মামলা থেকে আমাদের চারজনকেই অব্যাহতি প্রদান করা হয়। এর মধ্যে জানতে পারলাম, গাইবান্ধার পাশাপাশি বগুড়া যেলার তিনটি মামলাতেও আমীরে জামা‘আতের নামে চার্জ গঠন করা হয়েছে। তখন অনেকে বলছেন, সরকারের পরিকল্পনা হ’ল আপনাদের তিনজনকে তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেওয়া এবং আমীরে জামা‘আতকে না ছাড়া।

অবস্থাদৃষ্টে আমাদেরও তাই মনে হয়েছিল। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে আমাদেরকে চারটি মামলা থেকে এক প্রকার বিনা তদবীরে অব্যাহতি প্রদান করা হ’ল। ধারণা করছিলাম, অন্য দু’টি মামলা থেকেও আমরা দ্রুত অব্যাহতি পাব। একদিন সকালে বিবিসির সংবাদে শুনলাম, ‘আগামী ধার্য তারিখে রাণীনগর থানার খেজুর আলী হত্যা মামলা থেকে ড. গালিব ও তাঁর সহযোগীরা অব্যাহতি পেতে যাচ্ছেন’। কিন্তু না, সেই অব্যাহতি পেতে আরো দীর্ঘ এক বছর পার হয়ে গেল।

অবস্থা ভাল নয় দেখে আমাদের নেতৃবৃন্দ আমীরে জামা‘আতের মামলাসহ আমাদেরকে যামিন করানোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে হাইকোর্টে বার বার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোন ফল হয়নি। হঠাৎ একদিন দুপুর বেলা আমাদের তিনজনের কোর্টে ডাক পড়ল। আব্দুল জাববার বিহারী একটা স্লিপ হাতে নিয়ে এসে আমাদেরকে বলল, স্যার তৈরী হন, এখুনি আপনাদেরকে কোর্টে যেতে হবে। আমরা বললাম, আজ আই.এ. পরীক্ষা আছে, কোর্ট তো হবে না। তাছাড়া এই দুপুর বেলা কেন? বিহারী বলল, আমি তো আদার ব্যাপারী, জাহাযের খবর কি করে রাখব স্যার? জামা-কাপড় পরে গেটে গিয়ে দেখি আমাদের নেওয়ার জন্য কারাগারের গেটে বড় একটি প্রিজন ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। ঐ গাড়িতে সেদিন অন্য মামলার আরেক জনকে নিল। এই চারজনকে নিয়ে প্রিজন ভ্যানটি আদালতে পেঁŠছল। আদালত চত্বর একেবারে জনশূন্য বললেও ভুল হয় না। প্রায় আড়াইটার দিকে আমাদেরকে আদালতে তোলা হ’ল। সেদিন এজলাস কক্ষে ম্যাজিষ্ট্রেট ও আমরাসহ সর্বসাকুল্যে ১০ জনের মত লোক হবে। ম্যাজিষ্ট্রেট চেয়ারে বসে কাগজ-কলম হাতে নিয়ে আমাদের উকিল জনাব আবু বেলাল জুয়েলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনার আসামীদের যামিনের স্বপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করুন। অন্যান্য দিন যে লোক উকিলের কথা শোনা তো দূরের কথা তাঁর দিকে তাকায়ও না, সেই লোক আজ উপযাচক হয়ে উকিলকে বলছেন, যামিনের স্বপক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের জন্য। তখন আমাদের উকিল কয়েকটি যুক্তি উপস্থাপন করলেন। যেমন- ১. এই মামলার এজাহারে আমার কোন আসামীর নাম নেই। ২. তাঁরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক এবং একজন মাদ্রাসার প্রিন্সিপ্যাল, অর্থাৎ সম্মানিত ব্যক্তি। তাঁদের দ্বারা এরূপ জঘন্য কাজ হ’তে পারে না। ৩. ঘটনার স্থান নওগাঁর রাণীনগর আর আমার আসামীদের কারো বাড়ি সাতক্ষীরায়, কারো বাড়ি মেহেরপুর, কারো বাড়ি রাজশাহীতে। এই পয়েন্টে এসে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আযীযুল্লাহ একটু সংশোধন করে দিল। ম্যাজিষ্ট্রেট তাই লিখলেন। আযীযুল্লাহ বলল, এক কথায় আসামীদের কারো বাড়ি নওগাঁ যেলায় নয়। ৪. তাছাড়া পুলিশ প্রতিবেদনে আমার চার আসামীর নামে অত্র মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রদান করা হয়েছে। তাই আমার আরয, আমার চারজন আসামীকে যেকোন শর্তে যামিন মঞ্জুর করা হোক।

এরপর ম্যাজিষ্ট্রেট সরকারের দায়িত্বে নিয়োজিত কোর্ট জিআরওকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনার কিছু বলার আছে? তিনি তখন বললেন, যেহেতু আসামীদের নামে তদন্তকারী কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রদান করেছেন, সেহেতু তাঁদের জামিনের ক্ষেত্রে আমার কোন আপত্তি নেই। তখন ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের কার্যক্রম ২০ মিনিটের জন্য মুলতবী করে নিজের রুমে চলে গেলেন। কিন্তু রুম থেকে প্রায় ১ ঘন্টা পরে এসে তিনি আমাদের যামিন মঞ্জুরের আদেশ শুনালেন। আদেশ শুনে একদিকে আনন্দে ও অপরদিকে দুঃখে আমরা চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর ধরে বিভিন্ন রকম চেষ্টা তদবীর করে বার বার যামিন ধরেও যারা আমাদেরকে যামিন দেননি, সেই তারাই আজ আমাদের মধ্যে এমন কি পেলেন যে, কারাগার থেকে এক প্রকার ডেকে এনে যামিন দিচ্ছেন? আল্লাহ যা করেন বান্দার মঙ্গলের জন্যই করেন।                           

(চলবে)

 

HTML Comment Box is loading comments...