প্রবন্ধ


কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ভারতীয়

উপমহাদেশের আহলেহাদীছ আলেমগণের অগ্রণী ভূমিকা

মূল (উর্দূ) : মাওলানা মুহাম্মাদ ইসহাক ভাট্টি
অনুবাদ : নূরুল ইসলাম
পিএইচ.ডি গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনের সময় তাদের ফিতনা-ফাসাদ লালনকারী মেধা যেসব ফিতনা সৃষ্টি করেছে এবং সেগুলো প্রতিপালনে রসদ যুগিয়েছে, তন্মধ্যে এক বিশাল বড় ফিতনা কাদিয়ানী মতবাদ।[1] এই ফিতনাকে দমন করার জন্য যারা সর্বপ্রথম ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তারা ছিলেন আহলেহাদীছ ওলামায়ে কেরাম। সংক্ষেপে এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা নিম্নরূপ :

মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী নিজেকে মুবাল্লিগ (ধর্ম প্রচারক), মুজাদ্দিদ (সমাজ সংস্কারক), মাসীহ-এর সদৃশ, মাসীহ প্রভৃতি দাবী করার এক পর্যায়ে ১৮৯১ সালে (১৩০৮ হিঃ) নবী দাবী করে।[2] এটি ছিল সরাসরি কুফরী এবং নবী করীম (ছাঃ)-কে আল্লাহ তা‘আলা যে শরী‘আত দিয়ে প্রেরণ করেছেন, তা থেকে প্রকাশ্য বিচ্যুতি। নবীদের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী থেকে আমরা অবগত হই যে, প্রত্যেক নবী অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে নতুন বিধি-বিধান নিয়ে এসেছেন এবং তাঁদের অনুসারীদেরকে তাঁদের উম্মাত হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে। কিছু কিছু বিষয়ে নতুন উম্মাতের সাথে পূর্ববর্তী উম্মাতের মিল থাকলেও আক্বীদা ও আনুগত্যের স্বরূপ পাল্টে গিয়েছিল। হযরত মূসা (আঃ)-এর উম্মাতকে ইহুদী এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর অনুসারীদেরকে খ্রিস্টান বলে অভিহিত করা হয়েছিল। অতঃপর হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ) নবী হিসাবে প্রেরিত হলে তাঁর উপর ঈমান আনয়নকারীদেরকে মর্যাদাপূর্ণ ‘মুসলিম’ নামে ডাকা শুরু হয়। মুসলমানদের ইবাদতের ধরন ও আনুগত্যের পদ্ধতি পূর্ববর্তী জাতিসমূহ থেকে ভিন্ন। পূর্ববর্তী বিধি-বিধানের অনেক কিছুই ইসলামে ‘মানসূখ’ বা রহিত করা হয়েছে।

কাদিয়ানীরা মুসলমানদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক এক জীবনপ্রণালী বানিয়ে নিয়েছিল। তাদের নবী, অনুসারী, মসজিদ, সামাজিক জীবনাচার ও আত্মীয়তা পৃথক। ফলকথা তারা নবী করীম (ছাঃ)-এর অনুসারী মুসলমানদের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতাকে বেছে নিয়েছিল এবং নিজেদেরকে একটি পৃথক গোষ্ঠী হিসাবে অভিহিত করেছিল।[3] এজন্য তাদেরকে কাফের আখ্যাদান এবং ইসলামের গন্ডি থেকে বের করে দেয়া মুসলমানদের জন্য আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। এখন এ সম্পর্কে আহলেহাদীছদের অগ্রগণ্য কৃতিত্ব লক্ষ্য করা যাক।-

কুফরীর প্রথম ফৎওয়া :

সর্বপ্রথম মাওলানা মুহাম্মাদ হুসাইন বাটালভী মাঠে নামেন। তিনিই প্রথম আলেমে দ্বীন, যিনি মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর বিরুদ্ধে কুফরীর ফৎওয়া লিপিবদ্ধ করেন এবং স্বীয় উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষক মিয়াঁ সাইয়িদ নাযীর হুসাইন দেহলভীর নিকটে সেটি উপস্থাপন করে তাতে তাঁর স্বাক্ষর নেন। এরপর ভারতের দূর-দূরান্তে বসবাসকারী দু’শ প্রসিদ্ধ ও খ্যাতিমান আলেমের সাথে নিজে সাক্ষাৎ করে অথবা প্রতিনিধি প্রেরণ করে ঐ ফৎওয়া তাদেরকে শুনান। তাতে তারা তাঁদের সত্যায়নমূলক স্বাক্ষর করে সিল মেরে দেন। মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী ও তার সহচররা তাকফীরের এই ফৎওয়ার কারণে দিশেহারা হয়ে পড়ে। মির্যা কাদিয়ানী এই হতবুদ্ধিতার প্রকাশ এভাবে করেছে-

‘পাঞ্জাবের আলেমগণ এবং ভারতের পক্ষ থেকে ‘তাকফীর’ (কাফের আখ্যাদান) ও ‘তাকযীব’ (মিথ্যা প্রতিপন্নকরণ)-এর ফিতনা সীমা অতিক্রম করেছে। শুধু আলেমগণ নন; বরং পীর-ফকীর ও তাদের খলীফারা পর্যন্ত এই অক্ষমকে কাফের ও মিথ্যুক প্রমাণে মৌলভীদের সাথে এক সুরে কথা বলছে। তাদের প্ররোচনার কারণে এমন হাযার হাযার লোক পাওয়া যায় যারা আমাকে খ্রিস্টান ও হিন্দুদের থেকেও বড় কাফের বলে জানে। এই তাকফীরের বোঝা নাযীর হুসাইনের কাঁধে থাকলেও অন্য আলেমদের অপরাধ হল তারা স্পর্শকাতর এই তাকফীরের বিষয়ে নিজেদের বিচার-বুদ্ধি ও গবেষণার সহায়তা না নিয়ে নাযীর হুসাইনের দাজ্জালী ফৎওয়া দেখে বিনা বিচার-বিশ্লেষণে এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছেন। যেটি প্রস্ত্তত করেছিলেন মুহাম্মাদ হুসাইন বাটালভী।[4]

তাকফীরের উদ্যোক্তা :

এই ফৎওয়া সম্পর্কে অন্য জায়গায় মির্যা গোলাম আহমাদ লিখেছে, ‘মৌলভী মুহাম্মাদ হুসাইন এই ফৎওয়া লিখে মিয়াঁ নাযীর হুসাইন দেহলভীকে বলেন, আপনি সর্বপ্রথম এতে সিল মেরে মির্যা কাদিয়ানীর কুফরী সম্পর্কে ফৎওয়া দিয়ে দিন এবং মুসলমানদের মাঝে তার কাফের হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ করে দিন। যদিও এই ফৎওয়া ও উল্লিখিত মিয়াঁ ছাহেবের সিলমোহরের ১২ বছর পূর্বে এই গ্রন্থটি (বারাহীনে আহমাদিয়াহ) সমগ্র পাঞ্জাব ও ভারতে প্রকাশিত হয়েছিল। মৌলভী মুহাম্মাদ হুসাইন- যিনি ১২ বছর পর প্রথম কাফের আখ্যাদানকারী হন- তিনিই তাকফীরের উদ্যোক্তা ছিলেন এবং নিজ প্রসিদ্ধির কারণে সারাদেশে এই আগুনকে প্রজ্বলিতকারী ছিলেন মিয়াঁ নাযীর হুসাইন দেহলভী’।[5]

গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর এই স্বীকারোক্তি একথা সুস্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাকে কাফের সাব্যস্তকরণের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন মাওলানা মুহাম্মাদ হুসাইন বাটালভী। আর মিয়াঁ ছাহেব নিজ প্রসিদ্ধির কারণে সারা দেশে সেই আগুনকে প্রজ্বলিতকারী ছিলেন। অর্থাৎ মিয়াঁ ছাহেব সমগ্র ভারতের আলেম ও নেতৃবৃন্দের মাঝে নিজস্ব ইলমী মর্যাদা ও প্রসিদ্ধির অধিকারী ছিলেন। এই জ্ঞানগত মর্যাদা ও খ্যাতির কারণে সমগ্র দেশে এই ফৎওয়াটি ছড়িয়ে পড়ে এবং এই ফৎওয়ার ভিত্তিতে মির্যা গোলাম আহমাদকে লোকজন কাফের আখ্যায়িত করে।

এটি আজ থেকে কমবেশী সোয়াশ’ (১২৫) বছর আগের কথা। সেই সময় যাতায়াতের ঐ সকল মাধ্যমের কোন অস্তিত্বই ছিল না, যেগুলো বর্তমান যুগে আমরা দেখছি। ছিল না মোটরগাড়ি, সড়ক ও ট্রেন। কাঁচা রাস্তায় মানুষজন পায়ে হেঁটে, গরুর গাড়িতে বা উট-ঘোড়ায় চড়ে সফর করত। মাওলানা মুহাম্মাদ হুসাইন বাটালভীর সাহস, দ্বীনের খিদমতের আগ্রহ এবং নবীপ্রেমের দাবী লক্ষণীয়। তিনি দূরবর্তী স্থানসমূহে নিজে গিয়ে অথবা প্রতিনিধি প্রেরণ করে ঐ তাকফীরের ফৎওয়ায় স্বাক্ষর করান এবং তাদের সিলমোহর মেরে নেন। এই দৌড়ঝাঁপে মাওলানা বাটালভী অনেক অর্থ ব্যয় করে থাকবেন বলে অনুমিত হয়।

ফৎওয়ায়ে তাকফীর-এর প্রচার ও প্রসার :

মাওলানা বাটালভীর জীবদ্দশায় প্রথমবার এই ফৎওয়াটি প্রকাশিত হয়েছিল। এর প্রায় ১০০ বছর পর ‘পাক ও হিন্দ কে ওলামায়ে ইসলাম কা আওয়ালীঁ মুত্তাফাক্বাহ ফৎওয়া’ শিরোনামে এই ফৎওয়াটি সম্মানিত শিক্ষক মাওলানা মুহাম্মাদ আতাউল্লাহ হানীফ ভূজিয়ানী ১৯৮৬ সালের নভেম্বরে দারুদ দাওয়াহ আস-সালাফিয়্যাহ, লাহোরের পক্ষ থেকে প্রকাশ করেন। যেটি ছিল বড় সাইজের ১৮৮ পৃষ্ঠাব্যাপী। এতে উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানের দু’শ আলেমের স্বাক্ষর রয়েছে, যারা নিজ নিজ এলাকায় অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ছিলেন। এভাবে মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীকে কাফের সাব্যস্তকরণ সম্পর্কিত এই ফৎওয়াটি উপমহাদেশের সোয়াশ’ বছর পূর্বের আলেমদের একটি গ্রহণযোগ্য ঐতিহাসিক দলীল। এর মাধ্যমে এটাও জানা যায় যে, ঐ সময় কোন্ কোন্ বড় আলেম কোথায় অবস্থান করতেন।

গ্রন্থাকারে খুব সুন্দরভাবে এই ফৎওয়াটিকে পুনরায় প্রকাশ করা উচিত এবং এর সংক্ষিপ্ত নাম হওয়া উচিত ‘আওয়ালী ফৎওয়ায়ে তাকফীর’। এতে এমন ভূমিকা লেখা উচিত যেখানে কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে আহলেহাদীছদের অগ্রণী ভূমিকার কথা সবিস্তারে আলোচনা করা হবে। ফৎওয়ায় স্বাক্ষর ও সিলমোহর প্রদানকারী আলেমদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি প্রদান করার চেষ্টা করা উচিত।

তাকফীরের ফৎওয়া ছাড়াও মাওলানা বাটালভী সরাসরি মির্যার সাথে বাহাছ করেছেন, তাকে মুবাহালার আহবান জানিয়েছেন এবং লেখনীর মাধ্যমেই তার লেখনীর জবাব দিয়েছেন। মির্যার বিরুদ্ধে তিনি কঠিন প্রস্ত্ততি গ্রহণ করেন এবং প্রত্যেকটি ময়দানে তাকে পরাজিত করেন। এ বিষয়ের গ্রন্থাবলী এবং মাওলানা বাটালভীর পত্রিকা ‘ইশা‘আতুস সুন্নাহ’তে এর বিস্তারিত বিবরণ মওজুদ রয়েছে। মাওলানা বাটালভী ১৮৪১ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারী (১২৫৬ হিজরীর ১৮ই যিলহজ্জ) বাটালায় (যেলা গুরুদাসপুর) জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯২০ সালের ২৯শে জানুয়ারী (১৩৩৮ হিজরীর ৮ই জুমাদাল উলা) মৃত্যুবরণ করেন।

মাওলানা মুহিউদ্দীন আব্দুর রহমান লাক্ষাবীর এলহাম :

মাওলানা মুহিউদ্দীন আব্দুর রহমান লাক্ষাবী পাঞ্জাবের সংস্কারক ও মুফাস্সিরে কুরআন হাফেয মুহাম্মাদ লাক্ষাবীর স্বনামধন্য পুত্র ছিলেন। তিনি অত্যন্ত সৎ ও আল্লাহভীরু  আলেম ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে মির্যা গোলাম আহমাদের ব্যাপারে আমার নিকট এলহাম হয়েছে যে, إِنَّ فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَجُنُودَهُمَا كَانُوا خَاطِئِينَ ‘নিশ্চয়ই ফেরাঊন, হামান ও তাদের বাহিনী ছিল অপরাধী’ (ক্বাছাছ ২৮/৮)। মির্যা কাদিয়ানী মিথ্যুক, অপবাদদাতা এবং ফেরাঊন ও হামানের দলভুক্ত। এর প্রেক্ষিতে মির্যা লাক্ষাবীর জন্য কঠিন মৃত্যু কামনা করে এবং মাওলানাকে গালির লক্ষ্যবস্ত্ততে পরিণত করে ভবিষ্যদ্বাণী করে যে, মুহিউদ্দীন আব্দুর রহমান লাক্ষাবী পুত্রসন্তান থেকে বঞ্চিত থাকবেন। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে পুত্রসন্তান দান করেন। তিনি তার নাম রাখেন মুহাম্মাদ আলী। মাওলানা মুহাম্মাদ আলী লাক্ষাবী বর্ণনা করতেন, ‘আমি মির্যা গোলাম আহমাদের বদদো‘আর ফল। আমার জন্ম, আমার বেঁচে থাকা এবং লোকজনের সাথে আমার মেলামেশা মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর মিথ্যার ঘোষণা ও প্রমাণ’।

মাওলানা মুহিউদ্দীন আব্দুর রহমান লাক্ষাবী ১২৫৪ হিজরীতে (১৮৩৮ খ্রিঃ) ‘লাক্ষৌকে’তে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৩১৩ হিজরীর ১৫ই যিলক্বদ (২৭শে এপ্রিল ১৮৯৬ খ্রিঃ) মদীনা মুনাউওয়ারায় (মসজিদে নববী) মৃত্যুবরণ করেন। ‘বাক্বী’ কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

কাদিয়ানে মাওলানা ছানাউল্লাহ অমৃতসরীর ভাষণ :

কাদিয়ানীদের প্রসঙ্গে মাওলানা ছানাউল্লাহ অমৃতসরীর আলোচনা অত্যন্ত যরূরী। সেই যুগে মাওলানা অমৃতসরী যেভাবে কাদিয়ানীদের প্রতিরোধ করেছিলেন, তার দৃষ্টান্ত পেশ করা সম্ভব নয়। লিখিত আকারে এবং বক্তব্য ও বিতর্কের মাধ্যমে প্রত্যেকটি ময়দানে তিনি কাদিয়ানীদেরকে পরাস্ত করেছেন। নবুওয়াতের দাবীদার মির্যা গোলাম আহমাদ থেকে তার নিম্নস্তরের কাদিয়ানী মতবাদের প্রচারকদেরকে তিনি অত্যন্ত দুঃসাহসিকতার সাথে মুকাবেলা করেছেন। তিনি কখনো চিন্তা করেননি যে, স্বয়ং মির্যা গোলাম আহমাদের সাথে লড়াই করার পর নিম্নস্তরের ঐসকল প্রচারকদেরকে মিথ্যুক সাব্যস্ত করার কী দরকার আছে। তিনি সর্বদা ধর্মীয় গুরুত্বকে সামনে রেখেছেন এবং সর্বত্র ছোট-বড় সব কাদিয়ানীর পশ্চাদ্ধাবন করেছেন।

তিনিই প্রথম আলেম যিনি জনসম্মুখে বৃহৎ পরিসরে মুনাযারার ভিত্তি নির্মাণ করেছেন। ১৯০২ সালে (১৩২০ হিঃ) মির্যা গোলাম আহমাদ ‘ই‘জাযে আহমাদী’ নামে গ্রন্থ লিখে। এই গ্রন্থে সে মাওলানা অমৃতসরীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে যে, তিনি কাদিয়ানে আসুন এবং আমার এলহামগুলোকে মিথ্যা প্রমাণিত করুন। প্রত্যেক এলহামের বিনিময়ে তাকে একশত রূপী পুরস্কার প্রদান করা হবে। যদি তিনি আমার সকল এলহামকে মিথ্যা প্রমাণিত করতে সফল হন তাহলে ১ লাখ ১৫ হাযার রূপী পুরস্কার পাবার যোগ্য বিবেচিত হবেন।

মির্যার এই চ্যালেঞ্জের জবাবদানের জন্য তিনি ১৯০৩ সালের ১১ই জানুয়ারী (১১ই শাওয়াল ১৩২০ হিঃ) কাদিয়ানে পৌঁছেন এবং মির্যাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হবার আহবান জানান। কিন্তু সে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ না হয়ে মুহাম্মাদ হাসান আমরূহীর হাতে চিরকুট লিখে পাঠায় যে, কারো সাথে মুনাযারা না করার জন্য সে কসম করে আল্লাহর নিকট অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছে। এই চিরকুট পাঠ করে মাওলানা অমৃতসরী কাদিয়ানে বক্তব্য প্রদান করেন এবং মির্যাকে তাঁর নবুওয়াতের দাবীতে মিথ্যুক প্রমাণিত করেন। মাওলানা অমৃতসরীই প্রথম আলেম ছিলেন যিনি মির্যার নবুওয়াত দাবী করার পর কাদিয়ান গিয়েছিলেন এবং কাদিয়ানীদের দুর্গে গিয়ে তাদেরকে নাস্তানাবুদ করেছিলেন।

উল্লেখ্য, ‘ই‘জাযে আহমাদী’ গ্রন্থে মির্যা কাদিয়ানী মাওলানা অমৃতসরীর জ্ঞানগত মর্যাদার স্বীকৃতি প্রদান করে লিখে যে, মুসলমানদের মধ্যে ছানাউল্লাহর গ্রহণযোগ্যতা অপরিসীম।

ফাতিহে কাদিয়ান উপাধি লাভ :

মাওলানা অমৃতসরী বিভিন্ন স্থানে কাদিয়ানীদের সাথে মুনাযারা করেছেন, তাদের প্রত্যুত্তরে বইপত্র লিখেছেন এবং মির্যার সাথে বিতর্ক করার জন্য কাদিয়ানেও গিয়েছেন। যার ফলশ্রুতিতে মুসলমানেরা তাকে ‘ফাতিহে কাদিয়ান’ (فاتح قاديان) বা ‘কাদিয়ান বিজয়ী’ উপাধি প্রদান করেছেন। এই উপাধিটি এত সুন্দরভাবে লিখে তাঁকে প্রদান করা হয়েছিল যে, ডান ও বাম উভয় দিক থেকে তা সহজেই পড়া যেত।

সত্যবাদীর জীবদ্দশায় মিথ্যুকের মৃত্যু :

এখানে এটা উল্লেখ করা যরূরী যে, ১৯০৭ সালের এপ্রিল মাসে মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী মাওলানা ছানাউল্লাহ ছাহেবের জন্য মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করতঃ দো‘আ করেছিল যে, ‘আমাদের দু’জনের মধ্যে যে মিথ্যুক সে যেন সত্যবাদীর জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণ করে’। এটাকে মির্যা গোলাম আহমাদের ভবিষ্যদ্বাণী, দো‘আ বা বদদো‘আ হিসাবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। এটা ছিল তার একক ভবিষ্যদ্বাণী বা দো‘আ, যেটি অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ হয়েছিল। এর ১১ মাস পর[6] ১৯০৮ সালের ২৬শে মে লাহোরে মির্যার মৃত্যু হয়।

মাওলানা ছানাউল্লাহ অমৃতসরী ১৮৬৮ সালের জুন মাসে (ছফর ১২৮৫ হিঃ) অমৃতসরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৪৮ সালের ১৫ই মার্চ (৪ঠা জুমাদাল উলা ১৩৬৭ হিঃ) সারগোধাতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর ৪০ বছর পরে মৃত্যুবরণ করেন।

মাওলানা আব্দুল মজীদ সোহদারাভী (মৃঃ ৬ই নভেম্বর ১৯৫৯ খ্রিঃ) প্রথম আলেম যিনি ‘সীরাতে ছানাঈ’ নামে মাওলানা অমৃতসরীর জীবনী লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি মাওলানার মুনাযারার নিম্নোক্ত ১০টি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। অমৃতসরীর কতিপয় মুনাযারায় সোহদারাভীর নিজেরও অংশগ্রহণের সুযোগ ঘটেছিল। প্রত্যেক মুনাযিরের এ বৈশিষ্ট্যগুলো শুধু চিন্তা করাই যথেষ্ট নয়; বরং আমল করা উচিত।

১. মাওলানা অমৃতসরী প্রতিপক্ষকে কখনো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা লাঞ্ছিত করতেন না। বরং তাদেরকে সম্মান করতেন এবং সহাস্যবদনে তাদের মুখোমুখি হতেন।

২. সমালোচনা বা প্রত্যুত্তর প্রদানের ক্ষেত্রে শব্দগুলো সর্বদা সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থপূর্ণ ও সারগর্ভ হ’ত।

৩. সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়কেও বোধগম্য ভাষায় বর্ণনা করতে এবং কবিতামালার মাধ্যমে তাতে বৈচিত্র্য সৃষ্টিতে তিনি বিশেষভাবে পারঙ্গম ছিলেন।

৪. প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব যেন তাঁর নিকট এসে শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাঁর মতো প্রত্যুৎপন্নমতি কোথাও দৃষ্টিগোচর হয়নি।

৫. কোন বিতর্কে তিনি কখনো ভড়কে যাননি। বরং অত্যন্ত প্রশান্তির সাথে হেসে হেসে বিতর্ক করতেন।

৬. বিতর্কে সর্বদা তাঁর স্টাইল ছিল আলেমসুলভ বা বিজ্ঞজনোচিত। অবিজ্ঞজনোচিত বা সাধারণ স্টাইল তিনি কখনো বেছে নেননি।

৭. প্রতিপক্ষকে কখনো বিতর্কের বিষয়বস্ত্তর বাইরে যেতে দিতেন না। বাইরে চলে গেলেও আটঘাট বেঁধে মূল বিষয়ের দিকে ফিরিয়ে আনতেন। এটি বিতর্কশিল্পের সৌন্দর্য।

৮. বিতর্কে সর্বদা মুনাযারার মূলনীতিগুলোর প্রতি খেয়াল রাখতেন এবং অন্যান্য বিষয়ের মতো বিতর্কের মূলনীতির আলোকেই বিতর্ক করতেন।

৯. খোলা মনে বিতর্কের শর্তগুলো গ্রহণ করতেন। বারংবার প্রতিপক্ষের অন্যায্য শর্তগুলোও মেনে নিতেন। যাতে এই সুযোগে তারা পালানোর পথ খুঁজে নিতে না পারে।

১০. বিতর্কের ময়দানে তথ্যসূত্রবিহীন বা সূত্রের বিপরীতে কোন অভিযোগ আরোপ করেননি বা জবাব প্রদান করেননি। বরং সর্বদা দলীলের আলোকেই বক্তব্য পেশ করেছেন।

এ বৈশিষ্টগুলো মাওলানা অমৃতসরীর মুনাযারার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। বিতর্কের সময় প্রতিপক্ষ কোন ভুল শব্দ বললে অপরপক্ষের মুনাযির সাধারণত দ্রুত বলে ফেলে, সেতো সঠিক শব্দই বলতে পারে না। মূল শব্দ এরূপ নয়; বরং এরূপ। মাওলানা হানীফ নাদভী বলেছেন, মাওলানা ছানাউল্লাহর সামনে প্রতিপক্ষ ভুল শব্দ বললেও না তিনি সেটা শুদ্ধ করে দিতেন, আর না তাকে বাঁধা দিতেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, যদি সে ভুল শব্দ বলে তো বলতে থাকুক। তাকে সঠিক শব্দ বলে দেয়ার আমার কী ঠেকা পড়েছে।

মির্যা কাদিয়ানীকে মিথ্যুক প্রমাণে প্রথম বই :

মাওলানা মুহাম্মাদ ইসমাঈল আলীগড়ী ছিলেন স্বীয় যুগের একজন সুপরিচিত আহলেহাদীছ আলেম। তাঁর পিতার নাম ছিল মাওলানা আব্দুল জলীল। যিনি ১৮৫৭ সালের (১২৭৩ হিঃ) স্বাধীনতা যুদ্ধে ইংরেজদের সাথে জিহাদ করতে করতে আলীগড়ে শহীদ হয়ে গিয়েছিলেন। এজন্য তাঁকে ‘মাওলানা আব্দুল জলীল শহীদ’ বলা হয়। তাঁর স্বনামধন্য পুত্র মাওলানা মুহাম্মাদ ইসমাঈল আলীগড়ীর জন্মসন ১২৬৪ হিঃ (১৮৪৮ খ্রিঃ)। প্রচলিত জ্ঞান সমূহে তিনি পান্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। ১৮৯২ সালে (১৩০৯ হিঃ) তিনি ‘ই‘লাউল হক্ব আছ-ছরীহ ফী তাকযীবি মাছালিল মাসীহ’ (إعلاء الحق الصريح في تكذيب مثل المسيح) শিরোনামে মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর প্রত্যুত্তরে একটি বই রচনা করেন। ১৮৯১ সালে (১৩০৮ হিঃ) মির্যা নবুওয়াত দাবী করেছিল। এটিই প্রথম গ্রন্থ যেটি তাঁকে মিথ্যুক প্রতিপন্নকরণে প্রকাশিত হয়েছিল। এর পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ৪৪। মাওলানা মুহাম্মাদ ইসমাঈল আলীগড়ী ১৩১১ হিজরীর ২৭শে শাওয়াল (৩রা মে ১৮৯৪ খ্রিঃ) মৃত্যুবরণ করেন।

মির্যা কাদিয়ানীর প্রত্যুত্তরে কাযী ছাহেবের গ্রন্থাবলী :

কাযী মুহাম্মাদ সোলায়মান মানছূরপুরী ১৮৬৭ সালে (১২৮৪ হিঃ) পাটিয়ালা রাজ্যের (পূর্ব পাঞ্জাব) মানছূরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং জ্ঞানার্জনের পর উন্নতির পথ পাড়ি দিতে দিতে পাটিয়ালা রাজ্যের সেশন জজের পদে পৌঁছেন। তিনি মির্যা কাদিয়ানীর মাসীহ ও নবী দাবির প্রত্যুত্তরে এবং তার তিনটি গ্রন্থের (ফাতহে ইসলাম, তাওযীহুল মারাম ও ইযালায়ে আওহাম) জবাবে দু’টি গ্রন্থ লিখেন। প্রথম গ্রন্থটির নাম ‘গায়াতুল মারাম’। যেটি ১৮৯৩ সালে (১৩১০ হিঃ) প্রকাশিত হয়। সেই সময় তিনি ২৪/২৫ বছরের যুবক ছিলেন। এই গ্রন্থটি তাঁর ভাষা দক্ষতা ও ভাবগাম্ভীর্যের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘তায়ীদুল ইসলাম’। যেটি ঐ গ্রন্থের পাঁচ বছর পর ১৮৯৮ সালে (১৩১৬ হিঃ) প্রকাশিত হয়। মির্যা গোলাম আহমাদ সোলায়মান মানছূরপুরীর কোন গ্রন্থের উত্তর দিতে সক্ষম হয়নি। অবশ্য মির্যার ভাষ্য অনুযায়ী ১৮৯৩ সালের ৫ই এপ্রিল ফার্সী ভাষায় তার প্রতি একটি এলহাম হয়েছিল। সেই এলহামটি ছিল ‘পুশত বর কেবলা মী কুনান্দ নামায’। কাদিয়ানীদের ‘তাযকিরাহ’ গ্রন্থের সংকলক লিখছে, কাযী মুহাম্মাদ সোলায়মান মানছূরপুরীর ব্যাপারে এই এলহাম হয়েছিল যে, তিনি কেবলার দিকে পিঠ করে ছালাত আদায় করেন।[7] সুবহানাল্লাহ! কী এলহাম আর কী ঐ নবীর ভাষা! কাযী ছাহেব ১৯৩০ সালের ৩০শে মে (১লা মুহাররম ১৩৪৯ হিঃ) পরপারে পাড়ি জমান।

মির্যা কাদিয়ানীর সাথে দিল্লীতে প্রথম মুনাযারা :

ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি প্রসিদ্ধ গ্রামের নাম সাহসোয়ান। যেখানে অসংখ্য আলেম জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ইলমী খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। ঐ সকল উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন আলেমদের মধ্যে একজন আলেমে দ্বীন ছিলেন মাওলানা মুহাম্মাদ বাশীর সাহসোয়ানী। যিনি ১২৫২ হিজরীতে (১৮৩৬ খ্রিঃ) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মিয়াঁ সাইয়িদ নাযীর হুসাইন দেহলভীর নিকট দাওরায়ে হাদীছ সমাপ্ত করেন। বেশ কয়েকটি গ্রন্থের রচয়িতা এবং অনেক বড় বাগ্মী ও মুনাযির ছিলেন। তিনি কোন এক সময়ে ভূপালে নওয়াব ছিদ্দীক্ব হাসান খানের নিকট চলে গিয়েছিলেন। ১৩১২ হিজরীতে (১৮৯৪ খ্রিঃ) তিনি ভূপালে অবস্থানকালে মির্যা কাদিয়ানী দিল্লীতে এসে তার মাসীহ হওয়ার ঢেঁড়া পিটায় এবং মুনাযারার আহবান জানায়। ভূপালে মাওলানা বাশীরের নিকট এ খবর পৌঁছে। তিনি দিল্লীতে আসেন এবং এক সভায় মির্যার সাথে আলোচনা হয়। মুনাযারার বিষয় ছিল ঈসা মাসীহ (আঃ)-এর জন্ম ও মৃত্যু। মির্যা মৌখিক বিতর্কে অসম্মত হলে লিখিত বাহাছ শুরু হয়। মির্যা তার অভ্যাস অনুযায়ী প্রথমে তাবীল বা দূরতম ব্যাখ্যার আশ্রয় নেয়। কিন্তু যখন মাওলানা মুহাম্মাদ বাশীরের পাকড়াও কঠোর হয় এবং তিনি মাসীহ-এর বেঁচে থাকা সম্পর্কে দলীলাদি পেশ করতে শুরু করেন তখন মির্যা একথা বলে ময়দান ছেড়ে চলে যায় যে, তার ‘শ্বশুর’ (خُسر)[8] আসছেন। তাকে স্বাগত জানানোর জন্য দিল্লী রেলস্টেশনে তার যাওয়া যরূরী। মাওলানা ‘খুসর’ বা ‘শ্বশুর’  শব্দটি শোনামাত্র কুরআন মাজীদের এই আয়াতটি

তেলাওয়াত করেন,

خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةَ ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِيْنُ-

‘সে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুনিয়া ও আখিরাতে। এটাই তো সুস্পষ্ট ক্ষতি’(হজ্জ ২২/১১)

দিল্লী শহরে এটিই ছিল প্রথম মুনাযারা, যেটি একজন আহলেহাদীছ আলেম মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর সাথে করেছিলেন। সম্ভবত এই শহরে এটিই ছিল মির্যার সাথে শেষ মুনাযারা।

এই মুনাযারার বিস্তারিত বিবরণ, এর লিখিত পূর্ণাঙ্গ ডকুমেন্ট এবং দিল্লী থেকে মির্যার পলায়ন সবই গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল। ঐ গ্রন্থটির নাম ছিল ‘আল-হাক্কুছ ছরীহ ফী ইছবাতি হায়াতিল মাসীহ’ (الحق الصريح في إثبات حيات المسيح)। দিল্লীর আনছারী প্রেসে গ্রন্থটি মুদ্রিত হয়েছিল।

মাওলানা মুহাম্মাদ বাশীর সাহসোয়ানী ১৯০৮ সালের ২৯শে জুন (২৯শে জুমাদাল উলা ১৩২৬ হিঃ) দিল্লীতে মৃত্যুবরণ করেন। নিজ উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষক মিয়াঁ সাইয়িদ নাযীর হুসাইন দেহলভীর পাশে শীদীপুরা কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

মাওলানা শিয়ালকোটীর ১৭টি গ্রন্থ :

মাওলানা মুহাম্মাদ ইবরাহীম মীর শিয়ালকোটী আহলেহাদীছ জামা‘আতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ছিলেন। তিনি প্রায় ৮৪টি গ্রন্থের রচয়িতা, মুফাস্সিরে কুরআন, তেজস্বী বক্তা, অনেক বড় মুহাক্কিক, অত্যধিক অধ্যয়নকারী ও প্রত্যুৎপন্নমতি মুনাযির। কাদিয়ানী মতবাদের বিরুদ্ধে তিনি ১৭টি গ্রন্থ রচনা করেছেন।[9] তন্মধ্যে একটি গ্রন্থের নাম ‘শাহাদাতুল কুরআন’ (شهادة القرآن)। যেটি দুই খন্ডে সমাপ্ত। মাওলানা শিয়ালকোটী প্রথম আলেমে দ্বীন যিনি একটি বৃহৎ গ্রন্থ ‘শাহাদাতুল কুরআন’-এ কুরআন মাজীদের আলোকে কাদিয়ানী মতবাদ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এই গ্রন্থটি কয়েকবার প্রকাশিত ও বহুলপঠিত হয়েছে।

মাওলানা মুহাম্মাদ ইবরাহীম শিয়ালকোটী ১৮৭৪ সালের এপ্রিল মাসে (ছফর ১২৯১ হিঃ) শিয়ালকোটে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৫৬ সালের ১২ই জানুয়ারী (২৮শে জুমাদাল উলা ১৩৭৫ হিঃ) তাঁর মৃত্যু হয়।

মুবাহালা ও তার ফলাফল :

মাওলানা আব্দুল হক গযনভী একজন উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ছূফী আহলেহাদীছ আলেম ছিলেন। দুনিয়ার প্রতি তাঁর নিরাসক্ততা, তাক্বওয়া-পরহেযগারিতা, আত্মিক পরিশুদ্ধতা, ইবাদত ও অনাড়ম্বর জীবন যাপনের কারণে তিনি ছূফী আব্দুল হক উপাধিতে সুপরিচিত ছিলেন। মাওলানা আব্দুল্লাহ গযনভীর সাথে জন্মভূমি গযনী ত্যাগ করে অমৃতসর এসেছিলেন। তিনি ইসলামের প্রতিরক্ষা এবং নতুন নতুন ফিতনা থেকে এর হেফাযতে দারুণ আগ্রহী ছিলেন। ভিত্তিহীন দাবী এবং মিথ্যা ও ধোঁকার উপর প্রতিষ্ঠিত মির্যা কাদিয়ানীর চিন্তাধারা আত্মপ্রকাশ লাভের সাথে সাথেই তিনি বক্তব্য-বিবৃতির মাধ্যমে তার প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন শুরু করে দিয়েছিলেন। দু’পক্ষের মধ্যে মুকাবিলা চলতে থাকে। বাক-বিতন্ডা চলতে চলতে মুবাহালা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। মুহাবাহালার জন্য যে পদ্ধতি স্থির হয়েছিল মাওলানা আব্দুল হক গযনভীর ভাষায় তা ছিল এরূপ :

‘ঈদগাহ ময়দানে (অমৃতসর) এই পদ্ধতিতে নিম্নোক্ত শব্দে মুবাহালা হবে। ‘আমি অর্থাৎ আব্দুল হক তিনবার উচ্চৈঃস্বরে বলব, হে আল্লাহ! আমি মির্যাকে পথভ্রষ্ট, বিভ্রান্তকারী, কাফের, মিথ্যুক, প্রতারক, কুরআন মাজীদ ও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হাদীছসমূহকে পরিবর্তনকারী মনে করি। যদি আমি এ কথায় মিথ্যাবাদী হই, তাহলে তুমি আমার উপরে সেরূপ লা‘নত করো, যেরূপ তুমি আজ পর্যন্ত কোন কাফেরের উপরেও করনি’। মির্যা তিনবার উচ্চৈঃস্বরে বলবে, ‘হে আল্লাহ! যদি আমি পথভ্রষ্ট, বিভ্রান্তকারী, কাফের, মিথ্যুক, প্রতারক, কুরআন মাজীদ ও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হাদীছসমূহকে পরিবর্তনকারী হই, তাহলে তুমি আমার উপরে সেরূপ লা‘নত করো, যেরূপ তুমি আজ পর্যন্ত কোন কাফেরের উপরেও করনি’। এরপর কিবলামুখী হয়ে অনেকক্ষণ যাবৎ অনুনয়-বিনয় করে দো‘আ করবে যে, হে আল্লাহ! মিথ্যাবাদীকে লজ্জিত ও লাঞ্ছিত করো। আর উপস্থিত সকলে আমীন বলবে’।[10]

উল্লিখিত ইশতেহার মোতাবেক ১৩১০ হিজরীর ১০ই যিলক্বদ (২৫শে মে ১৮৯৩ খ্রিঃ) অমৃতসরের ঈদগাহে মুবাহালা হয় এবং উভয় পক্ষ নিরাপদে প্রত্যাবর্তন করে। এই মুবাহালার ফলশ্রুতিতে ১৯০৮ সালের ২৬শে মে (২৫শে রবীউছ ছানী ১৩২৬ হিঃ) মির্যা গোলাম আহমাদ তার প্রতিপক্ষ (মাওলানা আব্দুল হক গযনভী)-এর জীবদ্দশায় কলেরায় আক্রান্ত হয়ে লাহোরে পায়খানায় পড়ে মারা যায়। উপরন্তু তার মৃত্যুর পর লাহোরের আহমাদিয়া বিল্ডিং থেকে যখন তার লাশ কাদিয়ান নিয়ে যাওয়ার জন্য লাহোর রেলস্টেশনের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন তার উপর ইট-পাথর, ময়লা-আবর্জনা, মলমূত্র এমনভাবে বর্ষিত হয় যে, ইতিহাসে কোন নিকৃষ্ট কাফেরেরও এরূপ লাঞ্ছনা ও অবমাননার খবর পাওয়া যায় না। অন্যদিকে মাওলানা আব্দুল হক গযনভী মির্যার মৃত্যুর পরে পুরা ৯ বছর জীবিত ছিলেন। ১৩৩৫ হিজরীর ২৩শে রজব (১৬ই মে ১৯১৭ খ্রিঃ) তাঁর মৃত্যু হয় এবং অত্যন্ত সম্মানের সাথে দাফন করা হয়।

এখানে একথা উল্লেখযোগ্য যে, পুরা উম্মাতের মধ্যে মাওলানা আব্দুল হক গযনভীই একমাত্র ব্যক্তি যার সাথে মির্যার মুবাহালা হয়। তিনি ব্যতীত অনেক আলেমের সাথে মুবাহালার আলোচনা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে কারো সাথে মুবাহালা হয়নি। মূলতঃ মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর সাথে মুবাহালা এবং এতে সফলতা লাভের সৌভাগ্য পুরা উম্মাতের মধ্যে শুধুমাত্র একজন আহলেহাদীছ আলেম মাওলানা আব্দুল হক গযনভীর ভাগ্যেই জুটেছিল।

কাদিয়ানীদেরকে সংখ্যালঘু ঘোষণার প্রথম দাবী :

মাওলানা মুহাম্মাদ হানীফ নাদভী প্রথম আলেম এবং লেখক যিনি সাপ্তাহিক ‘আল-ই‘তিছাম’ (লাহোর) পত্রিকায় পাকিস্তান সরকারের নিকট কাদিয়ানীদেরকে সংখ্যালঘু ঘোষণার দাবী জানান। এমনকি তিনি কাদিয়ানীদেরকে আহবান জানান যে, এখন ইংরেজ শাসনের যুগ শেষ হয়ে গেছে। তারা এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করুক যে, পাকিস্তানে যে আইন রচিত হবে সেখানে তাদের স্থান কোথায় হবে এবং নতুন নবীর নতুন উম্মাতের ভবিষ্যৎ কী হবে? এজন্য সরকারের নিকট তাদের নিজেদেরই দাবী করা উচিত যে, সরকার তাদেরকে সংখ্যালঘু আখ্যায়িত করে অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ন্যায় তাদের হেফাযতের দায়িত্ব নিক। মাওলানা নাদভীর এ সম্পর্কিত প্রবন্ধগুলো ‘আল-ই‘তিছাম’-এর প্রারম্ভিক কাল অর্থাৎ ১৯৪৯-১৯৫১ পর্যন্ত বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯৫২ সালে ‘মির্যাইয়াত নয়ে ঝাবিউঁ সে’ (আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কাদিয়ানী মতবাদ) নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশনার মুখ দেখে। অতঃপর ২০০১ সালের এপ্রিলে এই গ্রন্থটি নবআঙ্গিকে তারেক একাডেমী, ফায়ছালাবাদ থেকে প্রকাশিত হয়। আমি এ গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছি।

ওলামায়ে কেরাম কাদিয়ানীদেরকে কাফের আখ্যাদান তো করতেনই, কিন্তু মাওলানা মুহাম্মাদ হানীফ নাদভী ‘আল-ই‘তিছাম’ পত্রিকার পৃষ্ঠাসমূহে তাদেরকে সংখ্যালঘু ঘোষণার প্রথম দাবী করেন।

মাওলানা লিখেছেন, ‘আমাদের মতে খোদ কাদিয়ানীদেরকে একথার উপর জোরাজুরি করা উচিত নয় যে, তারা মুসলমানদের একটি শাখা বা গোষ্ঠী। তাদের জন্য এটাই যথার্থ যে, তারা একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসাবে পাকিস্তানে থাকবে। সংখ্যালঘুর এই স্বীকৃতিও তাদের জন্য শুধু একটা কর্তব্যবিধায়ক স্বীকৃতি, অবস্থার বাধ্যবাধকতায় যেটি প্রদান করা হয়েছে। নতুবা নির্ভেজাল ইসলামী কর্মপন্থা হল সেটিই যেটি মুরতাদ বা ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে আবুবকর (রাঃ) গ্রহণ করেছিলেন। এখানকার রাষ্ট্রব্যবস্থা মূলতঃ সম্মিলিত প্রচেষ্টার ভিত্তিতে অস্তিত্ব লাভ করেছে। এজন্য আইন তাদেরকে সকল নাগরিক অধিকার প্রদান করতে এবং তাদেরকে হেফাযত করতে বাধ্য’।[11]

আল্লামা ইহসান ইলাহী যহীরের আরবী রচনা ‘আল-কাদিয়ানিয়্যাহ’:

আল্লামা ইহসান ইলাহী যহীর[12] আহলেহাদীছ জামা‘আতের একজন খ্যাতিমান বক্তা ও সেরা লেখক ছিলেন। তিনি ‘আল-কাদিয়ানিয়্যাহ’ নামে আরবীতে একটি বই লিখেন, যেটি আরব দেশগুলোতে ব্যাপক প্রচার পায় এবং বড় বড় আরব আলেম তা অধ্যয়ন করেন। উহার ফার্সী, উর্দূ ও ইংরেজী অনুবাদ প্রকাশিত হয়ে সবার নাগালে এসেছে। কাদিয়ানী মতবাদের প্রত্যুত্তরে আল্লামার এটি অনেক বড় খিদমত এবং কাদিয়ানী মতবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের এক আহলেহাদীছ আলেমের এটিই প্রথম আরবী গ্রন্থ। তিনি ১৯৮৭ সালের ২৩শে মার্চ (২২শে রজব ১৪০৭ হিঃ) ৯ জন সঙ্গীসহ এক বোমা বিস্ফোরণে লাহোরে শহীদ হন। চিকিৎসার জন্য তাঁকে রিয়াদে (সঊদী আরব) নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাঁচেননি। সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন এবং ‘বাক্বী’ কবরস্থানে (মদীনা মুনাউওয়ারাহ) তাঁকে দাফন করা হয়।

আমাদের বন্ধু ড. বাহাউদ্দীন (মুহাম্মাদ সোলায়মান আযহার) ১২/১৩টি বৃহৎ খন্ডে ‘তাহরীকে খতমে নবুওয়াত’ নামে বই লিখেছেন।[13] যেগুলোতে কাদিয়ানী মতবাদ সম্পর্কে বহু প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংকলন করা হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদান দান করুন!

কাদিয়ানী মতবাদের বিরুদ্ধে আহলেহাদীছদের লিখিত অবদানের ইতিহাস কলম থামিয়ে থামিয়ে (সন্তর্পণে) অত্যন্ত সংক্ষিপ্তাকারে লেখা হয়েছে এবং আহলেহাদীছদের অগ্রগণ্য কৃতিত্ব পর্যন্তই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ এ বিষয়ের ঐ সকল প্রাথমিক রচনাসমূহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলো উর্দূ বা আরবীতে গ্রন্থাকারে মুদ্রিত হয়েছে।

১৯৫৩-এর তাহরীকে তাহাফ্ফুযে খতমে নবুওয়াত :

১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের সকল ধর্মীয় ও মাযহাবী দলগুলোর পক্ষ থেকে সম্মিলিতভাবে ‘তাহরীকে তাহাফ্ফুযে খতমে নবুওয়াত’ বা ‘খতমে নবুওয়াত সংরক্ষণ আন্দোলন’ শুরু করা হয়েছিল এবং এ ব্যাপারে একটি ওয়ার্কিং কমিটি বা কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। মাওলানা সাইয়িদ মুহাম্মাদ দাঊদ গযনভীকে যার সেক্রেটারী জেনারেল করা হয়েছিল। এই আন্দোলনে অনেক আহলেহাদীছ আলেম গ্রেফতার হন এবং কয়েক মাস যাবৎ দেশের বিভিন্ন জেলে বন্দী থাকেন। তন্মধ্যে মাওলানা মুহাম্মাদ ইসমাঈল সালাফী, মাওলানা মুহাম্মাদ ইউসুফ কলকাতাবী, মাওলানা মুঈনুদ্দীন লাক্ষাবী, মাওলানা আব্দুল্লাহ গুরুদাসপুরী, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ আহরার, মাওলানা হাকীম আব্দুর রহীম আশরাফ, মাওলানা মুহাম্মাদ হুসাইন শেখুপুরী, মাওলানা আব্দুল গাফফার হাসান, হাফেয আব্দুল কাদের রোপড়ী, হাফেয মুহাম্মাদ ইবরাহীম কমরপুরী, মাওলানা আহমাদুদ্দীন গোখড়াবী এবং আরো অসংখ্য আলেম শামিল ছিলেন। শুধু চক নং ৩৬, জেবি (যেলা ফায়ছালাবাদ)-এর প্রায় একশত লোক একসাথে গ্রেফতার হন। তাদের মধ্যে শায়খুল হাদীছ হাফেয আহমাদুল্লাহ বাড়হীমালাবীও শামিল ছিলেন। শুধু একটি ছোট্ট গ্রাম থেকে একসাথে এত লোক গ্রেফতারের ঘটনা একটি রেকর্ড। কোথাও এর দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায় না। এ সমস্ত লোকজন কয়েক মাস যাবৎ ফায়ছালাবাদ জেলে বন্দী থাকেন। আমাদের গ্রাম চক নম্বর ৫৩, জেবি মানছূরপুরেরও (যেলা ফায়ছালাবাদ) অনেক লোককে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

এই আন্দোলনের পর সরকার বিচারপতি মুহাম্মাদ মুনীর ও বিচারপতি মুহাম্মাদ রুস্তম কিয়ানীর সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেন। এই কমিশনে আলোচনার জন্য কার্যনির্বাহী পরিষদের পক্ষ থেকে মাওলানা সাইয়িদ মুহাম্মাদ দাঊদ গযনভীকে প্রতিনিধি নিযুক্ত করা হয়েছিল। মাওলানা গযনভী অত্যন্ত সুন্দর ও সুচারুরূপে এই গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন। মাওলানা গযনভীর আলোচনায় প্রভাবিত হয়ে একদা বিচারপতি কিয়ানী তাঁকে বলেছিলেন, ‘যদি আমার ক্ষমতা থাকত তাহলে আপনাকে ওকালতি করার লাইসেন্স দিয়ে দিতাম’।

১৯৭৪-এর তাহরীকে তাহাফ্ফুযে খতমে নবুওয়াত :

১৯৭৪ সালের ‘তাহরীকে তাহাফ্ফুযে খতমে নবুওয়াত’ বা ‘খতমে নবুওয়াত সংরক্ষণ আন্দোলনে’ও অসংখ্য আহলেহাদীছ আলেমকে গ্রেফতার করে দেশের বিভিন্ন জেলে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। গ্রেফতারকৃতদের তালিকায় মাওলানা মুঈনুদ্দীন লাক্ষাবী, মাওলানা আব্দুল্লাহ আমজাদ ছাত্তাবী ছাড়াও অনেক আহলেহাদীছ আলেমের নাম রয়েছে। কাদিয়ানীদেরকে সংখ্যালঘু ঘোষণা দেয়ার জন্য ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে যে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেগুলো সংগ্রহ ও বিন্যস্তকরণেও আহলেহাদীছ আলেমগণ অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন। তন্মধ্যে মাওলানা আব্দুর রহীম আশরাফ, হাফেয মুহাম্মাদ ইবরাহীম কমরপুরী ও তাদের সাথীগণ অত্যন্ত কষ্ট স্বীকার করেছেন।

এটি একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থের বিষয়বস্ত্ত। যেখানে আহলেহাদীছদের অবদান বিশদভাবে আলোচনা করা উচিত। এখানে তো শুধু সামান্য ইঙ্গিত দেয়া যায় মাত্র। সেটাও অত্যন্ত সংক্ষিপ্তাকারে। আর তা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে আমরা কারো সমালোচনা করতে চাচ্ছি না এবং এটা আমাদের কাজও নয়। আমাদের উদ্দেশ্য হল ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে শুধু আহলেহাদীছ জামা‘আতের প্রচেষ্টাগুলো তুলে ধরা। কারো সাথে মুকাবিলা বা ঝগড়া করা কখনোই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি নয়। আমাদের এই অভ্যাসও নেই।

দৃষ্টি আকর্ষণ

অক্টোবর ২০১৪ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘বাহাছ-মুনাযারায় ভারতীয় উপমহাদেশের আহলেহাদীছ আলেমগণের অগ্রণী ভূমিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধের ৮ নং পৃষ্ঠার ২ নং প্যারায় ‘কিন্তু এ সময় আমার পুত্র ঈসার কথা মনে পড়ছে। যাকে তার অনুসারীরা শূলে বিদ্ধ করেছিল’ রয়েছে। মূলতঃ শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিছ দেহলভী (রহঃ) জনৈক খ্রিষ্টান পাদ্রীর প্রশ্নের জবাবে তার বিশ্বাস অনুযায়ী উক্ত জবাব প্রদান করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে ঈসা (আঃ) আল্লাহর পুত্র নন; বরং তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল ছিলেন (মারিয়াম ১৯/৩০)। আর নাছারারা তাকে শূলেও বিদ্ধ করেনি; বরং আল্লাহ তাকে আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন (নিসা ৪/১৫৭-১৫৮)।-সম্পাদক

 



[1]. মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর একটি উক্তি থেকে এটা একেবারে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। যেমন সে বলেছে, ‘ইংরেজরা আমাদের দ্বীনকে যেরূপ সাহায্য দিয়েছে সেরূপ হিন্দুস্তানের কোন মুসলিম শাসক দিতে পারেনি’। দ্রঃ  মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, দরসে হাদীছ : ‘খতমে নবুওয়াত’, আত-তাহরীক, অক্টোবর ’৯৯, পৃঃ ১১।-অনুবাদক

[2]. ১৮৮২-১৮৯০ সাল পর্যন্ত মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী নিজেকে মুবাল্লিগ, মুজাদ্দিদ ও ঈসা মাসীহ (আঃ)-এর সদৃশ, ১৮৯১ সালের ২২শে জানুয়ারী ‘প্রতিশ্রুত মাসীহ’ (مسيح موعود) , ১৮৯৪ সালের ১৭ই মার্চ ‘ইমাম মাহদী’ এবং সর্বশেষ ১৯০৮ সালের ৫ই মার্চ নবী ও রাসূল দাবী করে। দ্রঃ মাওলানা ছফিউর রহমান মুবারকপুরী, কাদিয়ানিয়াত আপনে আয়না মেঁ (বেনারস : জামে‘আ সালাফিয়্যাহ, ১৯৮১), পৃঃ ৩৯-৫২; আত-তাহরীক, অক্টোবর ’৯৯, পৃঃ ১১।-অনুবাদক

[3]. মির্যা কাদিয়ানী বলেছে, ‘অন্যান্যদের সাথে আমাদের মতভেদ কেবল ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যু ও অন্যান্য কতিপয় বিষয়ে নয়। বরং আল্লাহর সত্তা, রাসূল (ছাঃ), কুরআন, ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ, যাকাত মোটকথা প্রত্যেক বিষয়ে রয়েছে’। তার প্রথম খলীফা নূরুদ্দীন বলেছে, ‘ওদের (অর্থাৎ মুসলমানদের) ইসলাম এক এবং আমাদের অন্য’। উদ্ধৃত : মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, দরসে হাদীছ : ‘খতমে নবুওয়াত’, আত-তাহরীক, অক্টোবর’৯৯, পৃঃ ১১।-অনুবাদক

[4]. মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী, আঞ্জামে আথাম (ছাপা : ১৮৯৭), পৃঃ ৪৫

[5]. মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী, তোহফায়ে গোলড়াবিয়াহ (কাদিয়ান ছাপা : ১৯১৪), পৃঃ ১২১

[6]. ১৯০৭ সালের ১৫ই এপ্রিল থেকে ১৯০৮ সালের ২৬শে মে পর্যন্ত ১৩ মাস ১২ দিন পর।  দ্রঃ মাওলানা ছফিউর রহমান মুবারকপুরী, ফিৎনায়ে কাদিয়ানিয়াত আওর মাওলানা ছানাউল্লাহ অমৃতসরী (লাহোর : মাকতাবায়ে মুহাম্মাদিয়াহ, ২০১১), পৃঃ ১১১-১১৪।-অনুবাদক

[7]. তাযকিরাহ, পৃঃ ২৬৮

[8]. ফার্সীতে ‘খুসর’ মানে শ্বশুর।-অনুবাদক

[9]. তাঁর সর্বমোট গ্রন্থের সংখ্যা ৯০টি। এর মধ্যে কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে লিখিত হয়েছে ২১টি। এগুলো হ’ল- ১. শাহাদাতুল কুরআন (২ খন্ড) ২. আনজারুছ ছায়হ আন ক্বাবরিল মাসীহ ৩. খতমে নবুওয়াত আওর মির্যায়ে কাদিয়ান ৪. রাসাইলে ছালাছাহ ৫. নুযূলুল মালাইকাহ ওয়ার রূহ আলাল আরয ৬. মির্যা গোলাম আহমাদ কী বদ কালামিয়াঁ ৭. ফাছ্ছু খাতামিন নবুওয়াহ বিউমূমিদ দাওয়াহ ওয়া জামিইয়্যাতিশ শরী‘আহ ৮. মুসাল্লামুল ওয়াছল ইলা আসরারি ইসরাইর রাসূল ৯. ছদায়ে হক ১০-১১. খিল্লী ছুট্টী নম্বর ১, ২ ১২. খতমে নবুওয়াত ১৩. আয়না কাদিয়ানিয়াত ১৪. মুরাক্কা কাদিয়ানী ১৫. ফায়ছালা রববানী বর মরগে কাদিয়ানী ১৬. রিহলাতে কাদিয়ানী বামরগে নাগাহানী ১৭. তারদীদে মাফাদাতে মির্যাইয়াহ ১৮. কাদিয়ানী হলফ কী হাকীকাত ১৯. মির্যা কাদিয়ানী কা আখেরী ফায়ছালা ২০. কাশফুল হাকায়িক ইয়া‘নী রূদাদে মুনাযারাতে কাদিয়ানিয়াহ ২১. কাদিয়ানী মাযহাব মা‘আ যামীমা খুলাছা মাসায়েলে কাদিয়ানিয়াহ। দ্রঃ আব্দুর রশীদ ইরাকী, ‘ফিতনায়ে কাদিয়ানিয়াত কী তারদীদ মেঁ মাওলানা মুহাম্মাদ ইবরাহীম মীর শিয়ালকোটী (রহঃ) কী খিদমাত’, মাসিক ‘উসওয়ায়ে হাসানাহ’, করাচী, পাকিস্তান, বর্ষ ৬, সংখ্যা ২, ফেব্রুয়ারী ২০১৪, পৃঃ ১৪-১৫।-অনুবাদক

[10]. মাওলানা আব্দুল হক গযনভীর  ৮ই যিলক্বদ ১৩১০ হিজরীর ইশতেহার-এর বরাতে তারীখে মির্যা (লাহোর : আল-মাকাতাবাতুস সালাফিয়্যাহ), পৃঃ ৪৭

[11]. মির্যাইয়াত নয়ে ঝাবিউঁ সে, পৃঃ ১২৭

[12]. আল্লামা ইহসান ইলাহী যহীরের সংগ্রামী জীবন ও কর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন : অনুবাদক প্রণীত মনীষী চরিত, মাসিক আত-তাহরীক, মে, জুলাই-অক্টোবর ২০১১।-অনুবাদক

[13]. এ যাবৎ এটির ৪৫ খন্ড প্রকাশিত হয়েছে। গড়ে প্রত্যেকটি খন্ড পাঁচশত পৃষ্ঠার বেশী। কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে আহলেহাদীছ আলেমদের আপোষহীন ভূমিকা ও সংগ্রামের এটি এক প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলীল।-অনুবাদক

HTML Comment Box is loading comments...