প্রশ্নোত্তর

দারুল ইফতা
হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

প্রশ্ন (১/৪১) : ছহীহ হাদীছের আলোকে ঈদের ছালাতের সময় জানিয়ে বাধিত করবেন।

-সোহরাব হোসাইন

রিয়াদ, সঊদী আরব।

উত্তর : ঈদুল আযহায় সূর্য এক ‘নেযা’ পরিমাণ ও ঈদুল ফিৎরে দুই ‘নেযা’ পরিমাণ উঠার পরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ঈদের ছালাত আদায় করতেন। এক ‘নেযা’ বা বর্শার দৈর্ঘ্য হ’ল তিন মিটার বা সাড়ে ছয় হাত (আওনুল মা‘বূদ শরহ সুনানে আবুদাঊদ ৩/৪৮৭; ফিক্বহুস  সুন্নাহ ১/২৩৮ পৃঃ)। আব্দুল্লাহ ইবনে বসর (রাঃ) একদা লোকদের সাথে ঈদুল ফিতর কিংবা ঈদুল আযহার ছালাতে গেলেন এবং ইমামের দেরী করে ছালাত আদায় করাকে অপসন্দ করলেন। অতঃপর বললেন, নিশ্চয়ই আমরা এ সময়ে ছালাত আদায় শেষ করতাম। আর ছালাত আদায়ের সময় হচ্ছে সূর্য উদিত হওয়ার অল্প কিছুক্ষণ পর (ইবনু মাজাহ হা/১৩১৭; আবুদাঊদ হা/১১৩৫, সনদ ছহীহ)। অতএব ঈদুল আযহার ছালাত সূর্যোদয়ের পরপরই যথাসম্ভব দ্রুত শুরু করা উচিত (দ্রঃ ‘মাসায়েলে কুরবানী ও আকীকা’ পৃঃ ২৭)

প্রশ্ন (২/৪২) :  কুরআনের বিভিন্ন স্থানে ‘আল্লাহ বান্দার সাথে আছেন’ মর্মে বহু আয়াত বর্ণিত হয়েছে। এর প্রকৃতি ও স্বরূপ কি?

-আব্দুল জাববার, নোয়াখালী।

উত্তর : এর অর্থ হ’ল আল্লাহ স্বীয় জ্ঞান ও ক্ষমতায় বান্দার সাথে আছেন। কেননা বান্দার প্রত্যেকটি বিষয় আল্লাহ তা‘আলার জ্ঞান ও ক্ষমতা দ্বারা পরিবেষ্টিত (তালাক্ব ৬৫/১২)। মূলতঃ এ মর্মে বর্ণিত আয়াতসমূহ দ্বারা কেউ কেউ ‘আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান’ প্রমাণ করতে চান। অথচ তাঁর আরশে সমুন্নত থাকার বিষয়টি স্পষ্ট দলীল দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ বলেন, আল্লাহ তা‘আলা আরশের উপর সমুন্নীত (ত্বোয়াহা ২০/৫, রা‘দ ২, ইউনুস ৩)। এরূপ সর্বেশ্বরবাদী আক্বীদা মূলতঃ কুফরী আক্বীদা। কারণ এরূপ বিশ্বাসের মাধ্যমে বহু আয়াত ও হাদীছকে অস্বীকার করা হয়।

প্রশ্ন (৩/৪৩) : ছালাতের মাঝে পায়ে পা মিলানোর সঠিক পদ্ধতি কি?

-ডা. শামসুল ইসলাম

চিনাডুলী, ইসলামপুর, জামালপুর।

উত্তর : জামা‘আতে ছালাত আদায়কালে মুছল্লীদের পরস্পরে পায়ে পা মিলানো একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। আনাস (রাঃ) বলেন, আমাদের মধ্য থেকে একজন একে অপরের কাঁধে কাঁধ ও পায়ে পা মিলিয়ে দিতেন। আজকের দিনে তোমরা এরূপ করতে গেলে, তোমাদের কেউ কেউ অবশ্যই খরতাপে উদভ্রান্ত খচ্চরের ন্যায় ছুটে পালাবে (বুখারী হা/৭২৫, মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ, ছহীহাহ হা/৩১)। ছাহাবী নু‘মান বিন বাশীর (রাঃ) থেকেও অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে (আবুদাঊদ হা/৬৬২)। অন্য হাদীছে পায়ে পা কিংবা টাখনুর সাথে টাখনু মিলিয়ে দাঁড়ানোর কথা এসেছে (বুখারী, ফাৎহুল বারী সহ ২/২৪৭, হা/৬৮৩)। এছাড়াও উক্ত মর্মে বহু হাদীছ রয়েছে। যার ভিত্তিতে ইমাম বুখারী (রহঃ) ‘ছালাতের কাতারে কাঁধে কাঁধ ও পায়ে পা মিলানো’ শিরোনামে অধ্যায় রচনা করেছেন। এখানে পা মিলানো অর্থ পায়ের সাথে পা এমনভাবে লাগিয়ে দেওয়া, যাতে মাঝে কোনরূপ ফাঁক না থাকে এবং কাতারও সোজা হয়।

ইবনু হাজার বলেন, নু‘মান বিন বাশীরের বর্ণনার শেষাংশে كَعْبَه بكَعْبِه ‘গোড়ালির সাথে গোড়ালী’ কথাটি এসেছে। এর দ্বারা পায়ের পার্শ্ব বুঝানো হয়েছে, পায়ের পিছন অংশ নয়, যেমন অনেকে ধারণা করেন’ (ফাৎহুল বারী ২/২৪৭ পৃঃ)। এখানে মুখ্য বিষয় হ’ল দু’টি: কাতার সোজা করা ও ফাঁক বন্ধ করা। অতএব পায়ের গোড়ালী সমান্তরাল রেখে পাশাপাশি মিলানোই উত্তম।

প্রশ্ন (৪/৪৪) : ইসমাঈল (আঃ)-এর জীবনের বিনিময়ে আল্লাহ তা‘আলা যে পশুটি প্রেরণ করেছিলেন, সেটি কি ছিল?

-কুতুবুদ্দীন, গাযীপুর।

উত্তর : সেটি ছিল একটি সুন্দর শিংওয়ালা ও চোখওয়ালা সাদা দুম্বা। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, এজন্য আমরা কুরবানীর সময় অনুরূপ ছাগল-দুম্বা খুঁজে থাকি। তিনি বলেন, ঐ দুম্বাটি ছিল হাবীলের কুরবানী, যা জান্নাতে ছিল, যাকে আল্লাহ ইসমাঈলের ফিদ্ইয়া হিসাবে পাঠিয়েছিলেন (তাফসীরে ইবনে কাছীর ৪/১৭ পৃঃ; ঐ, তাহকীক, সনদ ছহীহ ৭/২৮ পৃঃ, তাফসীরে কুরতুবী ১৫/১০৭ পৃঃ)

প্রশ্ন (৫/৪৫) : ছালাতে সিজদারত অবস্থায় দু’পা কিভাবে রাখতে হবে? দলীলভিত্তিক জবাব দানে বাধিত করবেন।

-উযীর আলী

খড়িয়াল, শিবগঞ্জ, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।

উত্তর : হযরত আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘এক রাত্রিতে আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বিছানায় না পেয়ে আমার হাত দিয়ে খুঁজতে থাকলাম। অতঃপর আমার হাত তাঁর দু’পায়ের উপর পতিত হয়। তখন তিনি সিজদারত ছিলেন এবং তাঁর পা দু’টি খাঁড়া ছিল’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৮৯৩, ‘সিজদা ও সিজদার ফযীলত’ অনুচ্ছেদ)। অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘এ সময় তাঁর গোড়ালীদ্বয় মিলানো ছিল এবং পায়ের অঙ্গুলি সমূহ কিবলার দিকে ছিল’ (মুস্তাদরাক হাকেম ১/৩৪০ পৃঃ, হা/৮৩২; ছহীহ ইবনু খুযায়মাহ হা/৬৫৪, ইবনু হিববান হা/১৯৩৩)। ইবনু আববাস (রাঃ) বর্ণিত রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘আমি সাত অঙ্গের উপর সিজদা করতে আদিষ্ট হয়েছি। নাকসহ চেহারা, দু’হাত, দু’হাটু এবং দু’পায়ের আঙ্গুলসমূহের অগ্রভাগ’ (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৮৮৭)। এখানে ‘দু’পায়ের আঙ্গুলসমূহের অগ্রভাগ’-এর ব্যাখ্যায় ছাহেবে মির‘আত বলেন, দু’পায়ের আঙ্গুলগুলি ক্বিবলামুখী থাকবে এবং দু’গোড়ালি খাড়া থাকবে’ (মির‘আত ৩/২০৪)। ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেন, দু’গোড়ালীর মাঝে এক বিঘত ফাঁক থাকবে (নায়ল ৩/১২১)। মূলতঃ দাঁড়ানো অবস্থায় যেমন দু’পা ফাঁক থাকে, সিজদা অবস্থায়ও সেভাবে থাকবে এবং এটাই স্বাভাবিক অবস্থা। এক্ষণে ইবনু হিববান, ইবনু খুযায়মা ও হাকেম বর্ণিত আয়েশা (রাঃ)-এর দু’গোড়ালি মিলানো সম্পর্কে যে বর্ণনাটি এসেছে, সে সম্পর্কে ইমাম হাকেম বলেন, ‘এই হাদীছ ব্যতীত অন্য কোথাও কেউ গোড়ালী মিলানোর কথা বর্ণনা করেছেন বলে আমি জানি না (হাকেম ১/৩৫২)। তাই ছহীহ মুসলিম ও অন্যান্য হাদীছে আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত দু’গোড়ালি খাড়া রাখার হাদীছই অগ্রাধিকারযোগ্য। সর্বোপরি বিষয়টি মুস্তাহাব। অতএব খাড়া বা মিলানো যেভাবে সহজ হবে সেভাবেই রাখবে। এতে কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

প্রশ্ন (৬/৪৬) : জনৈক ব্যক্তি কাদিয়ানী মতবাদের অসারতা প্রমাণের জন্য রাসূল (ছাঃ)-এর পর কোন নবী আসবেন না বলে আল্লাহর নামে কসম খেয়ে ৫ম বার বলেন ‘আমি যদি মিথ্যা বলি তবে আমার উপর গযব নাযিল হৌক’। দাওয়াতী ক্ষেত্রে এভাবে কসম খাওয়ায় শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

-ডা. মুহাম্মাদ পারভেজ, কর্ণফুলী, চট্টগ্রাম।

উত্তর : বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য এভাবে গযব কামনা করা দাওয়াতী কাজের শরী‘আত সম্মত পদ্ধতি নয়। বরং দাওয়াতী ময়দানে সর্বদা সর্বোত্তম পন্থা অবলম্বন করা যরূরী। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি হিকমত (কুরআন ও সুন্নাহ) ও উত্তম নছীহতের সাথে আল্লাহর পথে দাওয়াত দাও এবং তাদের সাথে বিতর্ক করো উত্তম পন্থায়’ (নাহল ১২৫)। তবে এরূপ ক্ষেত্রে আল্লাহর নামে কসম খাওয়া যাবে। যেমন রাসূল (ছাঃ) বিভিন্ন ক্ষেত্রে বলতেন, ‘সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার জীবন নিহিত’ (বুখারী হা/২৬১৫, আবুদাঊদ হা/১৪৬১)

প্রশ্ন (৭/৪৭) : কোন্ দলীলের ভিত্তিতে তাওহীদকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়?

-আব্দুল্লাহ নোমান

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

উত্তর : কুরআন ও ছহীহ হাদীছে আল্লাহ তা‘আলার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের ক্ষেত্রে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে, সেগুলিকে সহজে বুঝানোর স্বার্থে তাওহীদকে তিনভাগে ভাগ করা হয়। যার কোন একটির প্রতি অবিশ্বাস করলে ঈমানশূন্য হ’তে হবে। যেমন (১) তাওহীদে রুবূবিয়াত বা আল্লাহকে স্রষ্টা হিসাবে বিশ্বাস করা। দলীল : আ‘রাফ ৫৪, ১৫৮, যারিয়াত ৫৬-৫৭, আনকাবূত ৬১, যুমার ৩৮, বাক্বারাহ ২৯, শু‘আরা ২১, হূদ ৬। স্বল্পসংখ্যক নাস্তিক ব্যতীত পৃথিবীর সকল ধর্মাবলম্বী মানুষ এ প্রকার তাওহীদে বিশ্বাস করে থাকে। (২) তাওহীদে ইবাদত বা উলূহিয়াত। অর্থাৎ ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্যকে শরীক না করা। দলীল :যারিয়াত ৫৬, বাক্বারাহ ২১, ফাতিহা ৪। (৩) তাওহীদে আসমা ওয়া ছিফাত বা আল্লাহর গুণাবলীর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা। অর্থাৎ আল্লাহকে রিযিকদাতা, জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা, ক্ষমাকারী ইত্যাদি হিসাবে বিশ্বাস করা। দলীল : আ‘রাফ ১৮০, শু‘আরা ১১ প্রভৃতি। নিম্নোক্ত দু’প্রকার তাওহীদে অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস রাখে না। মুসলিমগণ উপরোক্ত তিন প্রকার তাওহীদেই বিশ্বাস রাখেন। কেবল প্রথম প্রকার তাওহীদ বিশ্বাসে ‘মুসলিম’ হওয়া যায় না।

প্রশ্ন (৮/৪৮) : জনৈক ছাহাবী শরীরে তীরবিদ্ধ হলেও কুরআন পাঠ বন্ধ করলেন না এবং জনৈক ছাহাবীর পায়ে বর্শা ঢুকে গেলে তিনি ছালাতে দাঁড়ালেন, অতঃপর বর্শা টেনে বের করা হল। কিন্তু তিনি কিছুই বুঝতে পারলেন না। ঘটনা দু’টির সত্যতা আছে কি?

-মুহাম্মাদ নযরুল ইসলাম
মহিলা কলেজপাড়া, ঝিনাইদহ।

উত্তর : ৪র্থ হিজরীতে সংঘটিত যাতুর রিক্বা‘ যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে এক স্থানে রাতে বিশ্রামকালে রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশে পাহারারত আনছার ছাহাবী ‘আববাদ বিন বিশ্র (রাঃ) গভীর মনোযোগে ছালাত আদায়কালে শত্রু কর্তৃক পরপর তিনটি তীর দ্বারা আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বে্ও ছালাত পরিত্যাগ না করার কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমি এমন একটি সূরা তেলাওয়াত করছিলাম, যা পরিত্যাগ করতে আমার মন চাচ্ছিল না (‘আওনুল মা‘বূদ হা/১৯৫-এর ব্যাখ্যা; আবুদাঊদ হা/১৯৮, সনদ হাসান)। ছালাতের মাঝে হযরত আলী (রাঃ)-এর পা থেকে তীর টেনে বের করা হয়েছিল বলে একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা সমাজে প্রচলিত আছে। কিন্তু এর কোন ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। এছাড়া উরওয়া ইবনু যুবায়ের (রাঃ) সম্পর্কে এরূপ একটি ঘটনা প্রসিদ্ধ রয়েছে যে, তাঁর পা কেটে ফেলার প্রয়োজন হলে তিনি ছালাতে দন্ডায়মান হন। অতঃপর তা কাটা হয়। কিন্তু তিনি কিছুই অনুভব করতে পারেননি (আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৯/১০২)

প্রশ্ন (৯/৪৯) : শুভলক্ষণ বা কুলক্ষণ বলতে কি বুঝায়? শরী‘আতে এসবের কোন ভিত্তি আছে কি?

-আশরাফ, রাজাবাজার, ঢাকা।

উত্তর : আরবরা কোথাও যাত্রার প্রাক্কালে বা কোন কাজের পূর্বে পাখি উড়িয়ে তার শুভাশুভ লক্ষণ নির্ণয় করত। পাখি ডান দিকে গেলে শুভ মনে করে সে কাজে নেমে পড়ত। আর বামে গেলে অশুভ মনে করে তা হ’তে বিরত থাকত। একেই ‘শুভলক্ষণ’ বা ‘কুলক্ষণ’ বলা হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন, ‘যখন ফেরাঊন ও তার প্রজাদের কোন কল্যাণ দেখা দিত, তখন তারা বলত, এটা আমাদের জন্য হয়েছে। আর যদি কোন অকল্যাণ হ’ত, তারা তখন মূসা ও তাঁর সাথীদের ‘কুলক্ষণে’ বলে গণ্য করত’ (আ‘রাফ ১৩১)

বর্তমানে মাস, দিন, সংখ্যা, নাম ইত্যাদিকে দুর্ভাগ্য বা অশুভ প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। যেমন অনেক দেশে হিজরী সনের ছফর মাসে বিবাহ করা থেকে বিরত থাকা হয়। প্রতি মাসের শেষ বুধবারকে কুলক্ষণে মনে করা হয়। বিশ্বজুড়ে আজকাল ১৩ সংখ্যাকে ‘অলক্ষুণে তের’ বা Unluckey thirteen বলা হয়। অনেক বিক্রেতা প্রথম ক্রেতার ক্রয় না করাকে অশুভ গণ্য করে। অনেকে কানা, খোঁড়া, পাগল ইত্যাকার প্রতিবন্ধীদের কাজের শুরুতে দেখলে মাথায় হাত দিয়ে বসে। অথচ এ জাতীয় আক্বীদা পোষণ করা হারাম ও শিরক। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, الطَّيَرَةُ شِرْكٌ ‘কুলক্ষণে বিশ্বাস করা শিরক’ (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৪৫৮৪)

তবে সুলক্ষণ-কুলক্ষণের ধারণা মনে জন্ম নেয়া স্বভাবগত ব্যাপার, যা সময়ে হরাস-বৃদ্ধি হয়। এর একমাত্র চিকিৎসা হ’ল আল্লাহর উপর পূর্ণভাবে তাওয়াক্কুল বা ভরসা করা। যেমন রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যার মনে কুলক্ষণ সংক্রান্ত কিছুই উঁকি দেয় না। কিন্তু আল্লাহর উপর ভরসা তা দূর করে দেয়’ (আবুদাঊদ হা/৩৯১০; মিশকাত হা/৪৫৮৪)

প্রশ্ন (১০/৫০) : উম্মে হারাম বিনতে মিলহান এবং উম্মে সুলাইম-এর সাথে রাসূল (ছাঃ) কিরূপ সম্পর্ক ছিল?

-আফীফা তাসনীম, মিরপুর, ঢাকা।

উত্তর : উপরোক্ত দু’জন আনছার মহিলা পরস্পরে দু’বোন ছিলেন। তারা রাসূল (ছাঃ)-এর ‘মাহরাম’ ছিলেন (বুখারী হা/২৭৮৯; মুসলিম হা/২৩৩১)। ইমাম নববী বলেন, রাসূল (ছাঃ) যে তাদের উভয়ের মাহরাম ছিলেন, সে ব্যাপারে সকল বিদ্বান একমত। কিন্তু কি সম্পর্কের কারণে মাহরাম ছিলেন তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন তারা দু’বোন রাসূল (ছাঃ)-এর দুগ্ধসম্পর্কীয় (রেযা‘ঈ) খালা ছিলেন। কেউ বলেছেন, তাঁর পিতা অথবা দাদার খালা ছিলেন। কেননা রাসূল (ছাঃ)-এর দাদা আব্দুল মুত্ত্বালিবের মা ছিলেন মদীনার বনু নাজ্জার গোত্র’ (নববী, শরহ মুসলিম ১৩/৫৭, ৫৮, ১৯১২ নং হাদীছের ব্যাখ্যা দ্রঃ)। সে হিসাবে তারা ছিলেন রাসূল (ছাঃ)-এর মাতুল গোষ্ঠী। সেকারণ হিজরতের পরে তিনি তাদের কাছেই আশ্রয় নিয়েছিলেন।

প্রশ্ন (১১/৫১) : দোকানের কর্মচারী ছালাত আদায় না করলে মালিক দায়ী হবে কি?

-সফীউদ্দীন আহমাদ, নরসিংদী।

উত্তর : কর্মচারীকে ছালাত আদায় করার নির্দেশ প্রদান করা মালিকের উপর একান্ত যরূরী। তবে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার পরও যদি সে ছালাত আদায় না করে তবে মালিক এর জন্য দায়ী হবে না’ (বনী ইসরাঈল ১৫)। এরূপ কর্মচারীকে অব্যাহতি দেওয়াই কর্তব্য। তবে মালিক কর্মচারীকে ছালাত আদায়ের সুযোগ না দিলে, এমনকি এ ব্যাপারে তাকে নির্দেশ দেওয়া থেকে বিরত থাকলে অবশ্যই তাকে এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, ‘যার হাতে আমার জীবন তার কসম করে বলছি, অবশ্যই তোমরা সৎকাজের আদেশ দিবে ও অসৎকাজে নিষেধ করবে। নইলে সত্বর আল্লাহ তার পক্ষ হতে তোমাদের উপর শাস্তি প্রেরণ করবেন। অতঃপর তোমরা দো‘আ করবে, কিন্তু তা আর কবুল করা হবে না’ (তিরমিযী হা/২১৬৯; মিশকাত হা/৫১৪০)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘কোন জাতির মধ্যে পাপ হ’তে থাকলে এবং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা প্রতিরোধ না করলে সত্বর আল্লাহ তাদের উপরে ব্যাপক প্রতিশোধ নামিয়ে দিবেন’ (আবুদাঊদ হা/৪৩৩৮; মিশকাত হা/৫১৪২)

প্রশ্ন (১২/৫২) : আল্লাহ তা‘আলা বলেন, অধিকাংশ মানুষ ঈমান আনা সত্ত্বেও মুশরিক (ইউসুফ ১২/১০৬)। অত্র আয়াতে কাদেরকে বুঝানো হয়েছে?

-সাইফুল ইসলাম, ধনবাড়ী, টাঙ্গাইল।

উত্তর : ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, যারা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা, জীবন এবং মৃত্যুদাতা বলে বিশ্বাস করে, কিন্তু ইবাদতের ক্ষেত্রে অন্যকে শরীক করে, উক্ত আয়াতে তাদেরকে মুশরিক বলা হয়েছে (ইবনু কাছীর উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রঃ; বুখারী, ‘তাওহীদ’ অধ্যায় ৪০ অনুচ্ছেদ)। আবু জাহল ও আবু লাহাবের ন্যায় আজকের যুগেও অধিকাংশ মানুষ আল্লাহকে একক সৃষ্টিকর্তা হিসাবে বিশ্বাস করলেও ইবাদতের ক্ষেত্রে তারা শিরক করে থাকে। উক্ত আয়াতে তাদেরকেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে।  

প্রশ্ন (১৩/৫৩) : অন্যের ভ্রুণ নষ্ট করার পাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় জানতে চাইলে জনৈক আলেম এর কাফফারা হিসাবে দু’মাস ছিয়াম পালন এবং তওবা করতে বলেন। উক্ত বক্তব্য কি শরী‘আত সম্মত?

-ডা. আরীফ, পৈলানপুর, পাবনা।

উত্তর : কাফফারা সংক্রান্ত উক্ত বক্তব্য সঠিক নয়। বরং এর জন্য অনুতপ্ত হয়ে উক্ত কাজ থেকে বিরত থাকার প্রতিজ্ঞা করে আল্লাহর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করাই যথেষ্ট হবে।

প্রশ্ন (১৪/৫৪) : জনৈক মহিলার সন্তান-সন্ততি না থাকায় বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী ভাইবোনদের অনুমতি নিয়ে পালক পুত্রের নামে সমুদয় সম্পত্তি লিখে দিয়েছে। এভাবে লিখে দেওয়া বা পালকপুত্রের জন্য তা গ্রহণ করা শরী‘আত সম্মত হয়েছে কি?

-ওবায়দুল্লাহ, পঃ বঙ্গ, ভারত

উত্তর : পালকপুত্রকে রক্তসম্পর্কীয় পুত্র হিসাবে গণ্য করা শরী‘আতে নিষিদ্ধ (আহযাব ৩৭, ৪০, তাফসীর ইবনে কাছীর)। অতএব পালকপুত্রের নামে সমুদয় সম্পত্তি লিখে দেওয়া নিষিদ্ধ। বরং মৃত্যুর পরে শরী‘আতের বিধান অনুযায়ী প্রত্যেক ওয়ারিছ শরী‘আত নির্ধারিত অংশের উত্তরাধিকারী হবেন। তবে কাউকে পুত্রস্নেহে লালন-পালন করলে তার জন্য অছিয়ত করা যাবে। তবে তা এক-তৃতীয়াংশের নয় (বুখারী হা/৬২৭৩)


প্রশ্ন (১৫/৫৫) : বিয়ের পরে সকল নফল ইবাদত স্বামীর অনুমতি নিয়ে করতে হয়। কিন্তু বিয়ের আগে নফল ইবাদত করতে হলে পিতা-মাতার অনুমতি নিয়ে করতে হয় কি ?

-সুরাইয়া খাতুন

লক্ষ্মীপুর, চারঘাট, রাজশাহী

উত্তর : বিয়ের পরে নফল ইবাদতের জন্য স্বামীর অনুমতি নেওয়ার বিষয়টি কেবল তখন প্রযোজ্য, যখন স্বামী গৃহে অবস্থান করেন (বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/২০৩১)। বিয়ের পূর্বে পিতা-মাতার নিকট হতে সম্মতি নেয়ার কোন প্রয়োজন নেই।

প্রশ্ন (১৬/৫৬) : হিন্দুদের বানানো মিষ্টি মুসলমানদের খেতে কোন বাধা আছে কি?

-আব্দুল আযীয

সুলাই, রিয়াদ, সঊদী আরব।

উত্তর : যথাসম্ভব মুসলিম কারিগরদের নিকট থেকে মিষ্টি ক্রয় করাই উত্তম। তবে প্রয়োজনে অমুসলিমদের বানানো মিষ্টি খেতে কোন বাধা নেই। রাসূল (ছাঃ) অমুসলিমদের রান্না করা খাবার খেয়েছেন (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৫৯৩১)। শরী‘আতে কেবল অমুসলিমদের যবহকৃত পশুর গোশত খেতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে যবহ করে থাকে (বাক্বারাহ ২/১৭৩)

প্রশ্ন (১৭/৫৭) : যাকাত আদায়ের জন্য অধিক নেকীর আশায় রামাযান মাসকে নির্দিষ্ট করা যাবে কি? এছাড়া ব্যবসার সম্পদ একবছর পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তার যাকাত আদায় রামাযান মাস পর্যন্ত বিলম্বিত করা যাবে কি?

-যিয়াউর রহমান

দাম্মাম, সঊদী আরব।

উত্তর : এরূপ করার কোন দলীল নেই। বরং নেকীর কাজ যত দ্রুত সম্ভব সম্পন্ন করতে হবে। কেননা বিপদাপদ ও প্রতিবন্ধকতা যে কোন সময় আপতিত হতে পারে। তাছাড়া মৃত্যু থেকে কেউ নিরাপদ নয় এবং বিলম্ব কখনোই প্রশংসিত নয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ফিৎনাসমূহ উপস্থিত হওয়ার পূর্বেই তোমরা দ্রুত নেক আমল সম্পাদন কর’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৫৩৮৩ ‘ফিৎনাসমূহ’ অধ্যায়)। বরং আববাস (রাঃ) রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই যাকাত আদায়ের অনুমতি চাইলে তিনি তাকে অনুমতি দেন (তিরমিযী হা/৬৭৮)

তবে যদি যাকাতের যথাযথ হকদার পাওয়া না যায় বা যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়, তবে তা বছর পূর্তির পর আদায় করে সম্পদ থেকে পৃথক রাখতে হবে এবং সুযোগমত তা বণ্টন করা যাবে।

প্রশ্ন (১৮/৫৮) : জনৈক আলেম বলেন, ওযূ শেষে সূরা ক্বদর একবার পড়লে ছিদ্দীকের অন্তর্ভুক্ত হওয়া যাবে, দু’বার পড়লে শহীদের তালিকায় নাম লেখা হবে, আর তিনবার পড়লে নবীদের সাথে হাশর হবে। শরী‘আতে উক্ত বক্তব্যের কোন ভিত্তি আছে কি?

- হাবীবুর রহমান, বোয়ালকান্দি, সিরাজগঞ্জ।

উত্তর : বর্ণনাটি দায়লামী তার মুসনাদে ফেরদাঊসে উল্লেখ করেছেন। বর্ণনাটি মওযূ বা জাল (বিস্তারিত দ্রঃ সিলসিলা যঈফাহ হা/১৪৪৯, ১৫২৭)

প্রশ্ন (১৯/৫৯) : মাযহাবী ইমামের পিছনে ইচ্ছাকৃতভাবে জামা‘আতে ছালাত আদায় না করলে গোনাহগার হতে হবে কি?

-ফয়ছাল আহমাদ

কবিরপুর, আশুলিয়া, ঢাকা।

উত্তর : মাযহাবী ইমাম যদি প্রকাশ্যে কোন শিরকী কাজে লিপ্ত না থাকে, তাহ’লে তার পিছনে ছালাত আদায়ে কোন বাধা নেই। কারণ ইমাম কোন ত্রুটি করলে তার গোনাহ তার উপরই বর্তাবে (বুখারী হা/৬৯৪, মিশকাত হা/১১৩৩)।  জামা‘আতের সাথে ছালাত আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ বলেন, তোমরা রুকুকারীদের সাথে রুকু কর (বাক্বারাহ ৪৩)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকটে জনৈক অন্ধ ছাহাবী ওযরের কারণে বাড়ীতে ছালাত আদায়ের অনুমতি চাইলে তিনি বললেন, ‘তুমি কি আযান শুনতে পাও? শুনতে পেলে মসজিদে আস’ (মুসলিম, মিশকাত হা/১০৫৪)। অন্য এক বর্ণনায় জামা‘আতে উপস্থিত না হলে তিনি তাদের বাড়ী-ঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১০৫৩)। বিভিন্ন মাযার ও কবরের লাগোয়া মসজিদে সাধারণতঃ কবরপূজারী শিরকপন্থী ইমামগণ ইমামতি করে থাকেন। এগুলি থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

প্রশ্ন (২০/৬০) : আমার স্বামী প্রচন্ড রাগী হওয়ায় কয়েক বছরের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে রাগাম্বিত অবস্থায় আমাকে কয়েকবার ১টি করে তালাক দিয়েছে। তালাকের বিধান সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকায় এরপরেও আমরা স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছি। এক্ষণে উক্ত তালাকগুলির কারণে কি বিবাহ বাতিল হয়ে গেছে?

-আরিফা, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

উত্তর : প্রথমতঃ রাগান্বিত অবস্থায় প্রদত্ত তালাকের ক্ষেত্রে দু’টি বিষয় লক্ষণীয়। (১) রাগান্বিত অবস্থায় বুঝশক্তি লোপ না পাওয়া, জ্ঞানহারা না হওয়া এবং নিজেকে কিছু বলা ও করা হতে বাধা প্রদান করতে সক্ষম থাকা। অর্থাৎ যদি সে সবকিছু জেনে-বুঝে বলে, এমতাবস্থায় তালাক হয়ে যাবে। (২)  ক্রোধের প্রচন্ডতার কারণে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য অবস্থায় তালাক দিলে তা তালাক হিসাবে গণ্য হবে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তালাক ও দাসমুক্তি নেই ‘ইগলাক্ব’ অবস্থায়’ (আবুদাউদ হা/১৯১৯, মিশকাত হা/৩২৮৫)। আবু দাঊদ বলেন, ‘ইগলাক্ব’ গালাক্ব ধাতু হ’তে ব্যুৎপণ্ণ। যার অর্থ বন্ধ হওয়া। ক্রোধান্ধ, পাগল ও যবরদস্তির অবস্থায় মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞান ও ইচ্ছাশক্তি লোপ পায়। তাই এ অবস্থাকে ‘ইগলাক্ব’ বলা হয় (ঐ, হাশিয়া ২/৪১৩ পৃঃ)।  

দ্বিতীয়তঃ তালাকের বিধি-বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতা হেতু সে এরূপ করে থাকলে উক্ত স্ত্রী হারাম হবে না। বরং অনুতপ্ত হয়ে তওবা করতে হবে এবং পুনরায় এরূপ কাজ থেকে বিরত থাকার প্রতিজ্ঞা করতে হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং অনিচ্ছাকৃত পাপসমূহ ক্ষমা করে দিবেন (ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/৬২৮৪)

সুতরাং উক্ত বিবাহ বাতিল হবে না। বরং তওবা করতে হবে এবং আর কখনো এরূপ না করার প্রতিজ্ঞা করতে হবে।

প্রশ্ন (২১/৬১) : ছহীহ হাদীছ মোতাবেক ছালাত আদায় না করে মাযহাবী নিয়ম অনুসরণ করলে উক্ত ছালাত কি বাতিল বলে গণ্য হবে?

-মুহাম্মাদ নো‘মান

গুহলক্ষ্মীপুর, ফরিদপুর।

উত্তর : ছালাতের রুকন, ফরয, ওয়াজিবসমূহ সঠিকভাবে পালন করার পর সুন্নাতসমূহের ব্যাপারে ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে গেলে উক্ত ছালাত বাতিল হবে না বরং ত্রুটিপূর্ণ হবে। অর্থাৎ পূর্ণ নেকী অর্জিত হবে না। তবে ছহীহ হাদীছ জানার পরেও মাযহাবের দোহাই দিয়ে এবং বারবার বুঝানো সত্ত্বেও গোঁড়ামী ও অবজ্ঞাবশে তা পালন না করলে, উক্ত ছালাত বাতিল বলে গণ্য হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, তোমরা ছালাত আদায় কর সেভাবে, যেভাবে আমাকে ছালাত আদায় করতে দেখছ (বুখারী হা/৬০০৮; মিশকাত হা/৬৮৩)। তিনি আরো বলেন, যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং  যে আমার অবাধ্যতা করল, সেই-ই জান্নাতে যেতে অসম্মত’ (বুখারী, মিশকাত হা/১৪৩)

প্রশ্ন (২২/৬২) :  রাসূল (ছাঃ)-এর বাণী, ‘কালেমা পাঠকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে’ এবং কালেমা পাঠ করা সত্ত্বেও মুশরিক ও মুনাফিকরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না’ উভয় বক্তব্যের বৈপরিত্যের সমাধান কি?

-আবুল কালাম

উত্তর বাড্ডা, ঢাকা।

উত্তর : প্রথম হাদীছের অর্থ ‘খালেছ অন্তরে কালেমা পাঠকারী’ এবং দ্বিতীয় হাদীছের অর্থ ‘মুখে পাঠকারী অন্তরে নয়’। কপটতার কারণে এরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুনাফিক ও কাফেরদের জাহান্নামে একত্রিত করবেন’ (নিসা ৪/১৪০)। অতএব উভয় হাদীছের মাঝে কোন বৈপরিত্য নেই।

প্রশ্ন (২৩/৬৩) :  ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির কুরবানী করার বিধান কি? ঋণ পরিশোধ না করে কুরবানী করা জায়েয হবে কি?

-আফসার আলী

হুগলী, পঃ বঙ্গ, ভারত।

উত্তর : কুরবানী করা সুন্নাতে মুওয়াক্কাদাহ। এটি ওয়াজিব নয় যে, যেকোন মূল্যে প্রত্যেককে কুরবানী করতেই হবে। লোকেরা যাতে এটাকে ওয়াজিব মনে না করে, সেজন্য সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হযরত আবুবকর ছিদ্দীক্ব, ওমর ফারূক্ব, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর, আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) প্রমুখ ছাহাবী কখনো কখনো কুরবানী করতেন না (বায়হাক্বী, ইরওয়াউল গালীল হা/১১৩৯; মির‘আত ৫/৭২-৭৩) এক্ষণে ঋণ যত দ্রুত সম্ভব পরিশোধ করা যরূরী। তবে দাতার সম্মতিতে ঋণ দেরীতে পরিশোধ করে কুরবানী দেওয়ায় কোন বাধা নেই।

প্রশ্ন (২৪/৬৪) : ফজর ও যোহরের ছালাতের পূর্বে যে সুন্নাত ছালাত রয়েছে তা আযানের পূর্বে পড়া যাবে কি?

-হাফীযুল ইসলাম

দূর্গাপুর, ফরিদপুর।

উত্তর : প্রত্যেক ছালাতের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত রয়েছে (নিসা ৪/১০৩)। অতএব ওয়াক্তের মধ্যে হ’লে পড়তে পারবে। কারণ ফরয ছালাতের জন্য ওয়াক্ত হওয়া শর্ত, আযান হওয়া শর্ত নয়। অতএব ছালাতের ওয়াক্ত শুরু হয়ে গেলে সুন্নাত ছালাত পড়তে পারবে। আযান হৌক বা না হৌক।

প্রশ্ন (২৫/৬৫) : যমীনের উপরিভাগের মাটি অপবিত্র হওয়ায় ২০ ফুট নীচ থেকে মাটি উত্তোলন করে তা দিয়ে তায়াম্মুম করতে হবে, একথার কোন ভিত্তি আছে কি?

-শাহরিয়ার, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, ঢাকা।

উত্তর : এটি ভিত্তিহীন ও মনগড়া দাবী মাত্র। আল্লাহ তা‘আলা উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য সমস্ত যমীনকে ছালাতের স্থান ও পবিত্র বানিয়েছেন (বুখারী হা/৪৩৮; মুসলিম, মিশকাত হা/৫৭৪৭)। অতএব ভূ-পৃষ্ঠের যেকোন পবিত্র মাটি দ্বারাই তায়াম্মুম করা জায়েয। লক্ষ্য রাখতে হবে সেখানে যেন কোন অপবিত্র বস্ত্ত না থাকে।

প্রশ্ন (২৬/৬৬) : সমাজে খাৎনাকে কেন্দ্র করে যে সব আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয় সেগুলো কতটুকু শরী‘আতসম্মত?

-মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহ

নলত্রী, গোদাগাড়ী, রাজশাহী।

উত্তর : খাৎনা ইসলামের নিদর্শনমূলক সুন্নাতসমুহের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৪২০)। অতএব অন্যান্য শারঈ বিধানের মতই এ বিধানটিকে শরী‘আত মোতাবেক পালন করা আবশ্যক। নচেৎ সুন্নাত আমলটিও গোনাহে পরিণত হয়ে যাবে। নবী করীম (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরামের যুগে খাৎনার জন্য বিশেষ কোন অনুষ্ঠানের প্রমাণ পাওয়া যায় না। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে যে এমন রীতি সৃষ্টি করল যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৪০)

প্রশ্ন (২৭/৬৭) : উপরে উঠতে ‘আল্লাহু আকবার’ এবং নীচে নামতে ‘সুবহানাল্লাহ’ বলতে হবে’ বিষয়টি কি ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত?

-হাফিযার রহমান, জজকোট, বগুড়া।

উত্তর : বিষয়টি ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত (বুখারী হা/২৯৯৩; মিশকাত হা/২৪৫৩)

প্রশ্ন (২৮/৬৮) :  রাসূল (ছাঃ) স্বীয় জীবদ্দশায় কতবার হজ্জ এবং ওমরাহ পালন করেছিলেন?

-আব্দুল মাজেদ, বিরল, দিনাজপুর।

উত্তর : রাসূল (ছাঃ) স্বীয় জীবদ্দশায় ১ বার হজ্জ এবং ৪ বার ওমরাহ পালন করেন (তিরমিযী হা/৮১৫; মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/২৫১৮; দ্রঃ ‘হজ্জ ও ওমরাহ’ বই ৪র্থ সংস্করণ পৃঃ ১০)

প্রশ্ন (২৯/৬৯) :  মসজিদে ছালাতরত অবস্থায় কেউ প্রবেশ করলে তার জন্য সালাম প্রদান করা কি শরী‘আতসম্মত?

-আখতারুযযামান

উত্তর তলুইগাছা, সাতক্ষীরা।

উত্তর : ছালাতরত অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করলে সালাম প্রদান করা জায়েয। এক্ষেত্রে মুছল্লীগণ ইশারার মাধ্যমে উক্ত সালামের জবাব দিবেন (তিরমিযী, নাসাঈ, মিশকাত হা/৯৯১, ইবনু মাজাহ হা/১০১৮; আলোচনা দ্রঃ মির‘আত ৩/৩৬০-৬১)। মুখে উত্তর প্রদান করলে ছালাত বিনষ্ট হয়ে যাবে (মুসলিম, মিশকাত হা/৯৭৮)

প্রশ্ন (৩০/৭০) : মহিলাদের জন্য পৃথক মসজিদ নির্মাণ করতে শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

-মাসূদ রানা

হারাগাছ, রংপুর।

উত্তর : নববী যুগে মহিলাদের জন্য পৃথক কোন মসজিদ ছিল না। তারা পুরুষের পিছনে পৃথক কাতারে ছালাত আদায় করতেন। সুতরাং মহিলাদের জন্য পুরুষদের সাথে একই মসজিদে পর্দার মধ্যে ছালাত আদায় করাই শরী‘আতসম্মত। তবে যেখানে কেবল মহিলারাই অবস্থান করেন যেমন মহিলা মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয় হোস্টেল প্রভৃতি স্থানে মহিলাদের জন্য পৃথক মসজিদ নির্মাণ করা জায়েয। যেখানে মহিলারাই তাদের ইমামতি করবে। যেমন হযরত আয়েশা, উম্মে সালামাহ, উম্মে আত্বিয়াহ প্রমুখ মহিলাগণ মহিলাদের ইমামতি করতেন (বায়হাক্বী, ১/৪০৮; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৯১, ১৭৭; দারাকুৎনী হা/১০৭১)

প্রশ্ন (৩১/৭১) : রাতের বেলা সূরা আলে-ইমরানের শেষ দশ আয়াত পাঠ করার কোন ফযীলত আছে কি?

-আব্দুল্লাহ আল-মামূন, রাজশাহী।

উত্তর : সাধারণভাবে শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠে এটা পাঠ করার বিষয়টি ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত (বুখারী হা/১৮৩, মিশকাত হা/১১৯৫, ১২০৯)। তবে ‘শেষ রাতে সূরা আলে ইমরানের শেষাংশ পাঠ করলে তাহাজ্জুদ ছালাতের নেকী অর্জিত হবে’ মর্মে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ (দারেমী, মিশকাত হা/২১৭১)। অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি রাতে একশত আয়াত তেলাওয়াত করবে, তার জন্য সারারাত ইবাদতের নেকী লেখা হবে (দারেমী, সিলসিলা ছহীহাহ হা/৬৪৪)

প্রশ্ন (৩২/৭২) : শাওয়ালের ছয়টি ছিয়াম পালনের পর আইয়ামে বীযের তিনটি ছিয়াম পালন করতে হবে কি?

 -হোসনে আরা আফরোজ

 শেরপুর, বগুড়া।

উত্তর : সক্ষম হলে দু’টিই করা যাবে।

প্রশ্ন (৩৩/৭৩) : ঈদের তাকবীর হিসাবে যে দো‘আগুলি পাঠ করা হয় তার কোন ভিত্তি আছে কি?

-আব্দুল আলীম, মান্দা, নঁওগা।

উত্তর : ঈদের তাকবীরের জন্য একাধিক দো‘আ সালাফে ছালেহীন থেকে প্রচলিত রয়েছে। ইমাম মালেক ও আহমাদ (রহঃ) বলেন, তাকবীরের শব্দ ও সংখ্যার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। হযরত ওমর, আলী, আব্দুল্লাহ ইবনে মাস‘ঊদ, ইবনে আববাস (রাঃ) প্রমুখ ছাহাবীগণ তাকবীর দিতেন ‘আল্লা-হু আকবার, আল্লা-হু আকবার, লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু, ওয়াল্লা-হু আকবার, আল্লা-হু আকবার, ওয়া লিল্লা-হিল হাম্দ’ (মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, বায়হাক্বী, সনদ ছহীহ, ইরওয়া ৩/১২৫ পৃঃ; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২৪৩ পৃঃ)। অনেক বিদ্বান পড়েছেন, ‘আল্লা-হু আকবার কাবীরা, ওয়াল হামদু লিল্লা-হি কাছীরা, ওয়া সুবহানাল্লা-হি বুকরাতাঁও ওয়া আছীলা’ (কুরতুবী ২/৩০৬-৭ পৃঃ)। ইমাম শাফেঈ (রহঃ) এটাকে ‘সুন্দর’ বলেছেন (যাদুল মা‘আদ ২/৩৬১ পৃঃ; নায়ল ৪/২৫৭ পৃঃ)। এছাড়া তাকবীর হিসাবে আরো দো‘আ বিভিন্ন আছারে বর্ণিত হয়েছে (বায়হাক্বী, ইরওয়া ৩/১২৬, ফৎহুলবারী ২/৪৬২; দ্রঃ ‘মাসায়েলে কুরবানী ও আকীকা’ পৃঃ ২৯)

প্রশ্ন (৩৪/৭৪) : সূরা ক্বাছাছ ৮৮ আয়াত এবং রহমান ২৭ আয়াতে ‘ওয়াজহু’ শব্দ দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে? অনেকে বলেন, ইমাম বুখারী (রহঃ) এর অর্থ ‘আল্লাহর রাজত্ব’ করেছেন। এ ব্যাপারে সঠিক সমাধান জানিয়ে বাধিত করবেন।

-আব্দুল মুকীত

কুয়েট, খুলনা।

উত্তর : অত্র আয়াতে ‘ওয়াজহু’ দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার ‘চেহারা’ বুঝানো হয়েছে (ইবনু কাছীর, আয়াতদ্বয়ের তাফসীর দ্রঃ)। উল্লেখ্য যে, অত্র আয়াতের তাফসীরে ইমাম বুখারী (রহঃ) দু’টি কওল উদ্ধৃত করেছেন। একটি হ’ল ملكه ‘তাঁর রাজত্ব’ যা মা‘মার থেকে বর্ণিত হয়েছে। এটা তিনি কেবল একাই উদ্ধৃত করেন নি, বরং অন্যান্য বিদ্বানগণও উদ্ধৃত করেছেন। যেমন ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ, ইবনুল ক্বাইয়িম, বাগাভী, ইবনু কাছীর, ইবনু আবিল ‘ইয ও অন্যান্যগণ। তাঁরা এখানে ‘রাজত্ব’ বলতে আল্লাহ ‘সৃষ্ট রাজত্ব’ (الملك المخلوق) বুঝাননি। বরং আল্লাহর ‘মালিকানা’ গুণ (صفة الملك) -কে বুঝিয়েছেন। কেননা কিয়ামতের দিন আল্লাহর ‘সৃষ্ট রাজত্ব’ তথা সকল মাখলূক ধ্বংস হবে। কিন্তু তাঁর ‘মালিকানা’ অক্ষুণ্ণ থাকবে। উক্ত আয়াতের তাফসীরে তিনি দ্বিতীয় কওলটি উল্লেখ করেছেন إِلاَّ وَجْهَهُ অর্থ إِلاَّ هُوَ বা جَلاَلُهُ ‘তাঁর সত্তা’ বা ‘তাঁর পরাক্রম’। যা অব্যহত থাকবে। কেননা আরবরা শ্রেষ্ঠ অংশ দ্বারা সমস্তকে বুঝায়। তেমনি এখানে আল্লাহর ‘চেহারা’ দ্বারা আল্লাহর সত্তা’-কে বুঝানো হয়েছে। বিষয়টি আরো স্পষ্টভাবে বুঝা যায় ‘তাওহীদ’ অধ্যায়ে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আনা জাবের (রাঃ) বর্ণিত হাদীছটি দ্বারা (বুখারী হা/৭৪০৬ ‘তাওহীদ’ অধ্যায়, ১৬ অনুচ্ছেদ ১৩/৪০০ পৃঃ)। যেখানে বলা হয়েছে যে, সূরা আন‘আম ৬৫ আয়াত নাযিল হ’লে রাসূল (ছাঃ) বলে ওঠেন, أَعُوْذُ بِوَجْهِكَ ‘আমি তোমার সত্তার আশ্রয় প্রার্থনা করি’ (২ বার)। এখানে وَجْهٌ বা ‘চেহারা’ দ্বারা ‘আল্লাহর সত্তা’ অর্থ নেওয়া হয়েছে। যেমন বলা হয়, كَرَّمَ اللهُ وَجْهَهُ ‘আল্লাহ তাঁর চেহারাকে সম্মানিত করুন!’। যেমন আল্লাহ বলেছেন, وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلاَلِ وَالْإِكْرَامِ ‘আর সেদিন কেবল তোমার প্রভুর চেহারা বাকী থাকবে, যিনি মহিয়ান ও গরিয়ান’ (রহমান ৫৫/২৭)। সূরা ক্বাছাছ ৮৮ আয়াতেও একই অর্থ বুঝানো হয়েছে। অতএব এখানে ‘ওয়াজহু’ দ্বারা আল্লাহর চেহারা বা সত্তা বুঝানো হয়েছে, তাঁর সৃষ্ট রাজত্ব নয়। কেননা এরূপ অর্থ করলে ক্বিয়ামতের দিন ধ্বংস হওয়ার মত কোন বস্ত্তই আর অবশিষ্ট থাকবে না। অথচ সেদিন সবকিছুই ধ্বংস হবে, আল্লাহর সত্তা ব্যতীত।

প্রশ্ন (৩৫/৭৫) : ছালাতরত অবস্থায় ফোটায় ফোটায় পেশাব নির্গত হলে ছালাত বিনষ্ট হবে কি? এর জন্য করণীয় কি?

-আমানুল্লাহ

বিরামপুর, দিনাজপুর।

উত্তর : এটা এক প্রকার রোগ। এর চিকিৎসা করতে হবে। তবে এতে ছালাতের কোন ক্ষতি হবে না। আল্লাহপাক মানুষের উপর সাধ্যের অতিরিক্ত কিছু চাপিয়ে দেননি (বাক্বারাহ ২৮৬)। একদা এক ব্যক্তি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করল, আমি মযী (বীর্য বের হওয়ার পূর্বে তরল পদার্থ)-এর সিক্ততা অনুভব করি। এমতাবস্থায় আমি কি ছালাত ছেড়ে দিব? তিনি বললেন, আমার উরুর উপর দিয়ে তরল পদার্থ প্রবাহিত হয়। তথাপিও আমি ছালাত পরিত্যাগ করি না’ (মুওয়াত্ত্বা হা/৫৬)। তবে এক্ষেত্রে প্রত্যেক ছালাতের জন্য পৃথকভাবে ওযূ করতে হবে (আবুদাঊদ, নাসাঈ, মিশকাত হা/৫৫৮; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৬৮ পৃঃ)

প্রশ্ন (৩৬/৭৬) : ঈদের দিনকে কবর যিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট করা জায়েয হবে কি?

-আব্দুল আউয়াল

রিয়াদ, সঊদী আরব।

উত্তর : যেকোন দিন কবর যিয়ারত করা জায়েয (মুসলিম, মিশকাত হা/১৭৬৩)। কোন নির্দিষ্ট দিনে কবর যিয়ারতের কোন বিশেষ ফযীলত ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়। অতএব ঈদের দিন বা অন্য কোন একটি বিশেষ দিনকে কবর যিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট করা বা এর বিশেষ নেকী রয়েছে বলে মনে করা বিদ‘আত মাত্র (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা, ফৎওয়া নং ৬১৬৭)। এছাড়া জুম‘আর দিন কবর যিয়ারতের ফযীলত সম্পর্কে যে হাদীছ বর্ণিত হয়েছে তা মওযূ‘ বা জাল (সিলসিলা যঈফাহ হা/৪৯-৫০; বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান মিশকাত হা/১৭৬৮ ‘কবর যিয়ারত’ অনুচ্ছেদ)

প্রশ্ন (৩৭/৭৭) : মক্কা থেকে ওমরা করার ক্ষেত্রে কি মসজিদে আয়েশায় যেতে হবে, না নিজ গৃহ থেকে বের হলেই যথেষ্ট হবে?

-ইউসুফ

মক্কা, সঊদী আরব।

উত্তর : মক্কায় অবস্থানকারীগণ হজ্জের ইহরাম স্ব স্ব অবস্থান থেকে বাঁধবেন। কিন্তু ওমরাহর ইহরাম বাঁধার জন্য তাঁরা হারাম এলাকার বাইরে যাবেন ও সেখান থেকে ওমরাহর ইহরাম বেঁধে আসবেন। এজন্য সবচেয়ে নিকটবর্তী হ’ল ৬ কিঃমিঃ উত্তরে ‘তান‘ঈম’ এলাকা। বিদায় হজ্জের সময় ওমরাহর ইহরাম বাঁধার জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্ত্রী আয়েশা (রাঃ)-কে তার ভাই আব্দুর রহমানের সাথে এখানে পাঠিয়েছিলেন (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/২৫৫৬, ২৬৬৭)। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে এখানে ‘মসজিদে আয়েশা’ অবস্থিত। এছাড়া যদি অন্য উদ্দেশ্যে কেউ মক্কায় এসে থাকেন, অতঃপর হজ্জ বা ওমরাহ করতে চান, তাহ’লে হারামের বাইরে তান‘ঈম বা জি‘ইর্রানাহ প্রভৃতি এলাকায় গিয়ে তিনি ইহরাম বেঁধে আসবেন (দ্রঃ হজ্জ ও ওমরাহ, ৪র্থ সংস্করণ ৪২, ৪৫ পৃঃ)

প্রশ্ন (৩৮/৭৮) : চোরাইপথে পণ্য আমদানী-রপ্তানীর ব্যবসা করা জায়েয হবে কি?

-সফীউদ্দীন আহমাদ, নরসিংদী।

উত্তর : চোরাইপথে ব্যবসা-বাণিজ্য করা নিষিদ্ধ। কেননা শরী‘আতবিরোধী না হলে যে কোন রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা অনুসরণ করা জনগণের উপর অবশ্য কর্তব্য (নিসা ৫৯)। অতএব রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা ভঙ্গ করে ব্যবসা-বানিজ্য করা জায়েয হবে না।

প্রশ্ন (৩৯/৭৯) : দাইয়ূছ কাদেরকে বলা হয়? এদের পরিণতি কি?

-সাইফুল ইসলাম, ধনবাড়ী, টাঙ্গাইল।

উত্তর : যার স্ত্রীর নিকট পরপুরুষ প্রবেশ করে, অথচ সে কিছুই মনে করে না বরং চুপ থাকে, সে ব্যক্তিকে দাইয়ূছ বলা হয়। ইমাম যাহাবী (রহঃ) বলেন, ‘দাইয়ূছ’ সেই ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর ফাহেশা কাজ সম্পর্কে অবগত। কিন্তু তার প্রতি ভালোবাসার কারণে উক্ত ব্যাপারে সে উদাসীন থাকে। অথবা তার উপর তার স্ত্রীর বৃহৎ ঋণ বা মোহরানার ভয়ে কিংবা ছোট ছেলেমেয়েদের কারণে সে স্ত্রীকে কিছুই বলে না এবং যার আত্মসম্মানবোধ বলতে কিছুই নেই’ (যাহাবী, কিতাবুল কাবায়ের ১/৫০ পৃঃ)। ঐ ব্যক্তির পরিণতি সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘দাইয়ূছ কখনোই জান্নাতে প্রবেশ করবে না’ (নাসাঈ হা/২৫৬২, আহমাদ, মিশকাত হা/৩৬৫৫; ছহীহুল জামে‘ হা/৩০৫২)

প্রশ্ন (৪০/৮০) : বিবাহের পর স্ত্রীকে নিজ বাড়ীতে না নিয়ে জোরপূর্বক শ্বশুরবাড়ীতে দীর্ঘদিন রাখা শরী‘আতসম্মত কি?

-মুরসালিনা খানম

নড়াইল-বাশিয়ানী, গোপালগঞ্জ।

উত্তর : এটা শরী‘আতসম্মত নয়। স্ত্রী তার স্বামীর বাড়ীতেই থাকবে এবং স্বামী স্ত্রী-সন্তানের ভরণ-পোষণ করার ব্যাপারে দায়িত্বশীল। এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে স্বামীকে কিয়ামতের দিন জবাবদিহি করতে হবে। রাসূল (ছাঃ) স্বামীদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমরা যা খাও এবং পরিধান কর, তাদেরকে তা খাওয়াও এবং পরিধান করাও। তাদেরকে প্রহার করো না এবং তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করো না’ (আবুদাঊদ হা/২১৪৪)। অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) পরিবারের জন্য কৃত ব্যয়কে সর্বোত্তম ব্যয় হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন (মুসলিম হা/৯৯৪, মিশকাত হা/১৯৩২)। অতএব স্ত্রীকে জোরপূর্বক শ্বশুরবাড়ীতে বা অন্যত্র ফেলে রাখা কঠিন গোনাহের কাজ। এ থেকে এখুনি তওবা করা কর্তব্য।

HTML Comment Box is loading comments...