ভ্রমণস্মৃতি

রিয়াদ সফরে অশ্রুসিক্ত সাংগঠনিক ভালবাসা

গোলাম কিবরিয়া আব্দুল গণী

২য় বর্ষ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।

হাদীছের পাতায় পড়েছিলাম সুমাইয়া ও বেলাল (রাঃ)-এর ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ফলে করুণ কষ্টের কথা। খোবায়েব (রাঃ)-এর ফাঁসির কাষ্ঠে শাহাদত বরণের ব্যথা। তাঁরা সকল কষ্ট-ব্যথা হাসিমুখে বরণ করে নিয়ে জান্নাতের সুধা পান করেছেন কেবল দ্বীনের প্রতি নিখাদ ভালবাসার কারণে। দ্বীনী মুহাববত ও সাংগঠনিক ভালবাসা যে কত গভীর, কত মধুর হয় রিয়াদ সফর না করলে হয়তবা তা অনুভব করতে পারতাম না। মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য দাওয়াতী কাজের ভালো সুযোগ হ’ল রামাযান মাসে সঊদী আরবের বিভিন্ন দাওয়া সেন্টারের পক্ষ থেকে দাওয়াতী কাজে অংশগ্রহণ করা। সেই সুযোগ লাভের জন্য দেশে ছুটি না কাটিয়ে রামাযান মাসে পাড়ি জমিয়েছিলাম সঊদী আরবের রাজধানী রিয়াদে। বিকাল ৫টায় পৌঁছলাম রিয়াদ বিমান বন্দরে। সেখানে আমাদের রিসিভ করেন ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’ সঊদী আরব শাখার সম্মানিত প্রচার সম্পাদক জনাব সোহরাব হুসাইন (পাবনা) ও আব্দুল্লাহ বিন আবুল কালাম আযাদ। সোহরাব ভাই নিজেই ড্রাইভ করে আমাদেরকে নিয়ে চললেন তার বাসায়। পথিমধ্যে আমাকে তার মোবাইল দিয়ে বললেন, বাড়ীতে সঊদী পৌঁছে যাওয়ার সংবাদ জানিয়ে দিতে। অথচ আমার নিকট মোবাইল বিদ্যমান। শুরু হ’ল সাংগঠনিক ভালবাসার প্রথম পরশ। গাড়ি চলছিল ১০০ কি. মি. গতিতে আর আমরা উপভোগ করছিলাম রিয়াদ শহরের শিল্প কারুকার্য খচিত দৃষ্টিনন্দন সুরম্য ভবনগুলো। রামাযান শুরুর কয়েকদিন বাকী থাকায় আপাতত আমরা সোহরাব ভাইয়ের বাসাতেই অবস্থান করতে লাগলাম।

রামাযানের আগের দিন অপর সাংগঠনিক ভাই ইমদাদুল হক মিঠু (পাবনা) আমাদেরকে রাবাওয়াহ দাওয়াহ সেন্টারে নিয়ে আসলেন। রিয়াদ শহরে যতগুলো দাওয়া সেন্টার রয়েছে তন্মধ্যে রাবাওয়াহ সেন্টারটিই বৃহৎ এবং এর কার্যক্রম অন্যগুলির তুলনায় ব্যাপক। প্রায় একশতটি ভাষায় তারা দাওয়াতী কাজ করে যাচ্ছেন। আমাদের দায়িত্ব পড়ল প্রতিদিন ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে বিভিন্ন মসজিদে গিয়ে উপস্থিত লোকদেরকে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে দাওয়াত দেওয়া। ফলে প্রতিদিন প্রবাসী বহু ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ হ’তে লাগল। অফিসের পক্ষ থেকে প্রদত্ত রামাযানের গুরুত্ব ও ফযীলত সহ মাসআলা-মাসায়েল আলোচনা করার পর প্রবাসী ভাইয়েরা বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করত। এভাবে তাদের সাথে হৃদ্যতা গড়ে উঠার মধ্য দিয়ে একসময় সাংগঠনিক দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছি। দলীলভিত্তিক মাসআলা-মাসায়েল জানার জন্য ‘আত-তাহরীক’ পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছি।  এভাবে  নিয়মিত দাওয়াতের ফলে আল্লাহর অশেষ রহমতে অনেক ভাইকে আমরা আত-তাহরীকের পাঠক বানাতে সক্ষম হয়েছি। ফালিল্লা-হিল হামদ। এভাবে পুরো মাসটিই আমাদের দাওয়াতী কাজের মধ্যেই কেটে যায়। এবার আসি মূল আলোচনায়। রিয়াদ শহরে এসে আমার মনে হ’ল এটা ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর জন্য দাওয়াত সম্প্রসারণের একটা উর্বর ক্ষেত্র। সেখানকার বিভিন্ন শাখার নিবেদিতপ্রাণ দায়িত্বশীলদের মাঝে সাংগঠনিক কার্যক্রমে বিপুল আগ্রহ আমাদেরকে সত্যিই অভিভূত করেছে। তাই সেখানে অনেকগুলি অনুষ্ঠানে আমাদের অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়েছিল। তার কয়েকটির অভিজ্ঞতা নিম্নে আলোচনা করা হ’ল-  

রিয়াদ, সৌদি আরব ২৩ শে জুলাই : অদ্য বাদ আছর রিয়াদে ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’ সঊদী আরব শাখার উদ্যোগে স্থানীয় এক মিলনায়তনে এক বিশাল আলোচনা সভা ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’ সঊদী আরব শাখার সভাপতি শায়খ মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সঊদী ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল শায়খ আবু সঊদ খালেদ আল-আযমী। তাঁর বক্তব্যের অনুবাদ করেন সঊদী আরব শাখা ‘আন্দোলন’-এর সাংগঠনিক সম্পাদক শায়খ আব্দুল বারী (রাজশাহী)। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য পেশ করেন সঊদী আরব শাখা ‘আন্দোলন’-এর সাধারণ সম্পাদক শায়খ আব্দুল হাই (রাজশাহী), ‘আত-তাহরীক’ পাঠক ফোরাম (রিয়াদ)-এর সেক্রেটারী মির্জা সিরাজ (ঢাকা) ও ‘বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ’-এর মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারী মুকাররম বিন মুহসিন প্রমুখ। ইফতার মাহফিলে মহিলাদের জন্যও পৃথক ব্যবস্থা ছিল। বিশাল মিলনায়তনে ছিল পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মী ও সুধীর উপচেপড়া ভীড়। বারংবার উচ্চারিত হচ্ছিল ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর বিভিন্ন শ্লোগান। সব মিলিয়ে এক আবেগঘন পরিবেশ। সঊদী আরবের মাটিতে এরূপ সমাবেশ সত্যিই অভাবনীয়।

নতুন সানায়া (রিয়াদ) ১লা আগষ্ট : অদ্য বাদ এশা ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’ নতুন সানায়া (রিয়াদ) এলাকার উদ্যোগে তিনটি শাখার দায়িত্বশীলদের নিয়ে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এলাকা ‘আন্দোলন’-এর সভাপতি জালালুদ্দীনের সভাপতিত্বে তার বাসায় অনুষ্ঠিত উক্ত সভায় আলোচনা পেশ করেন, ‘বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ’ মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারী মুকাররম বিন মুহসিন। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আব্দুল গাফফার ও ইমরান (ব্রাক্ষণবাড়িয়া)। সেদিনের আলোচনায় আমি মুহতারাম আমীরে জামা‘আত প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব হক্বের দাওয়াত দিতে গিয়ে কত বাধার সম্মুখীন হয়েছেন, কষ্ট ভোগ করেছেন, কত মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন সেসব বিষয়ে আলোকপাত করেছিলাম। বলেছিলাম, আমীরে জামা‘আতের গ্রেফতারের দিনগুলির কথা। আজ হক্বের উপর টিকে থাকার স্বার্থে সংগঠন থেকে কত ভাইকে হারানোর বেদনায় তিনি ভুগছেন। কত ভাই আদর্শচ্যুত হয়ে তাঁর সাথে সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করেছেন। এরপরেও তিনি থেকেছেন হকের পথে অবিচল। যখনই কোন কর্মীর সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটে একটাই উপদেশ দেন, পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের দাওয়াত দাও। হকের পথে দৃঢ়চিত্তে টিকে থাক। সর্বদা স্মরণ রাখ, হকের পথ চিরদিনই কন্টকাকীর্ণ। 

আমি ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠে স্মৃতিচারণ করছি। আর উপস্থিত ভাইয়েরা সবাই দু’নয়নে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছেন। যারা কখনো তাদের প্রাণপ্রিয় আমীরকে স্বচক্ষে দেখেননি। হয়ত তাঁর লেখনী পড়েছেন, বক্তব্য শুনেছেন, না দেখেই তাঁকে আমীর হিসাবে গ্রহণ করে কাজ করে যাচ্ছেন মাত্র। কেবল দ্বীনী সম্পর্ক পরস্পরের প্রতি কতটা ভালবাসা সৃষ্টি করতে পারে, সেদিন তাদের নীরবে অশ্রুবিসর্জনে আমি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি। তারা আমাদেরকে পেয়ে প্রশ্নের বানে ভাসিয়ে দিলেন। কারণ আমীরে জামা‘আতের পাশে থাকা কারো সাথে তাদের সেভাবে এখনও সাক্ষাৎ ঘটেনি। দেশে ফিরে তারা সবাই আমীরে জামা‘আতের সাথে সাক্ষাৎ করবেন এই তাদের প্রত্যেকের মনের একান্ত কামনা।

রামাযান শেষ হ’ল। ঈদের আগের দিন আমাদের সাথী ভাইদের অনেকে মক্কা-মদীনায় চলে গেল ঈদ পালনের জন্য। রিয়াদে নতুন অভিজ্ঞতা। রামাযানে রাতে কেউ ঘুমায় না। বরং ফজরের ছালাত পড়ে ঘুমায়। আমরাও সেই অভ্যাসে ইতিমধ্যে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। বিদেশের মাটিতে পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন ছাড়া প্রথম ঈদ। ফজর ছালাত পড়েই ঈদের ছালাতের জন্য রওয়ানা দিলাম। মনোবেদনার ঝড় বইছে ভিতরে। ফোনে আত্মীয়-স্বজনের সান্ত্বনা কোন কাজে আসছে না। হঠাৎ ভাই ইমরানের ফোন। বাসায় দাওয়াত দিলেন। আমরা রাজি নই। কিন্তু তিনিও নাছোড়বান্দা। অবশেষে দাওয়াত গ্রহণ করলাম। গিয়ে দেখি সেমাই, বিরিয়ানি সহ দেশী খাবারের বিশাল আয়োজন। অকৃত্রিম ভালোবাসার পরশে খাওয়া-দাওয়া শেষ করলাম। এরপর দুপুরে দাওয়াত করলেন জনাব মীর্জা সিরাজ ভাই। সোহরাব ভাই সহ সেখানে গিয়েও দেখি দেশী খাবারের সমারোহ। ভাবলাম, কেন আমাদের জন্য এ আয়োজন? কেন আমাদের জন্য এত কষ্ট? তাদের সাথে নেই কোন রক্তের সম্পর্ক। কেবল স্বল্পদিনের পরিচয় মাত্র। সেদিনও একই উত্তর পেয়েছিলাম। আর তা হ’ল ‘সাংগঠনিক ভালবাসা, দ্বীনী মহববত’। দ্বীনী বন্ধন যে অনেক সময় আত্মীয়তার চেয়ে অধিক সুদৃঢ় বন্ধনে পরিণত হয়, প্রবাসে এসে তা ভালোভাবেই উপলব্ধি করলাম। তাদের আন্তরিকতা, আতিথেয়তা প্রত্যুষের মনোবেদনা নিমেষেই দূর করে দিল।

ঈদের দিন বিকেলটা সবাই নির্মল বিনোদনের মধ্য দিয়ে কাটাতে চায়। তাই তো ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’ সঊদী আরব শাখার নেতৃবৃন্দ সকল শাখার নেতা-কর্মী ও দায়িত্বশীলদের নিয়ে আয়োজন করেছে ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। ‘আন্দোলন’-এর সঊদী আরব শাখার সভাপতি শায়খ মুশফিক ছাহেবের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক শায়খ আব্দুল হাই-এর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হয় ষাটোর্ধ্ব বয়সী সাথীদের মাঝে বিস্কুট দৌড়, সবার জন্য উন্মুক্ত বিশুদ্ধ কুরআন তেলাওয়াত এবং দুই গ্রুপের মধ্যে প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতা। নৈশভোজের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে আমি আহলেহাদীছ আন্দোলন কি চায়, কেন চায় এবং কিভাবে চায়? বিষয়ে আলোচনা করেছিলাম, মুকাররম বিন মুহসিন ও হাফেয রূহুল আমীনও আলোচনা পেশ করে। বৈঠক শেষে বিদায় মুহূর্তে সকলের চেহারায় সেই মায়াবী ভালবাসার ছাপ। সেদিনের অনুষ্ঠান দেখে মনে হ’ল রিয়াদ সত্যিই ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন’-এর দাওয়াতী কাজের জন্য এক উর্বর ক্ষেত্র। শুধু প্রয়োজন একদল নিবেদিতপ্রাণ কর্মী বাহিনী। যাদের মাধ্যমে প্রবাসী ভাইদের মাঝে ছড়িয়ে পড়বে হকের দাওয়াত তথা আহলেহাদীছ আন্দোলন-এর দাওয়াত।

হারা (রিয়াদ) ১৬ই আগষ্ট ২০১৩ : অদ্য বাদ এশা হারায় ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর হারা (রিয়াদ) উত্তর ও দক্ষিণ শাখার উদ্যোগে হারা উত্তর ‘আন্দোলন’-এর সভাপতি জনাব রিয়াযুল ইসলাম মধু (রাজবাড়ী)-এর সভাপতিত্বে এবং হারা দক্ষিণ ‘আন্দোলন’-এর সভাপতি জনাব লিয়াকত (চট্রগ্রাম)-এর পরিচালনায় হারা উত্তর ‘আন্দোলন’-এর সেক্রেটারী জনাব ফরহাদ (রাজবাড়ী)-এর বাসায় উভয় শাখার দায়িত্বশীলদের নিয়ে এক দায়িত্বশীল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় আমরা আলোচনার সাথে সাথে দায়িত্বশীলদের সাংগঠনিক বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর প্রদান করি। আলোচনার মাঝে ফরহাদ ভাই তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, আমি মূলতঃ অন্য সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলাম। আন্দোলনে যোগদানের পর আমীরে জামা‘আতের লিখিত সাংগঠনিক বইগুলোর প্রায় সবই আমি পড়েছি। কিন্তু আন্দোলনের ইতিহাস সংক্রান্ত কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর আমি পাইনি। অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পরে সেগুলি জানতে পারিনি। অবশেষে ‘বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ’ থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত স্মারক গ্রন্থ পড়ে সে প্রশ্নের উত্তরগুলো পেয়েছি। সেজন্য ‘যুবসংঘে’র নেতৃবৃন্দকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই। ফালিল্লা-হিল হামদ! নৈশভোজের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

সানায়া দাঈরী (রিয়াদ) ২২শে আগষ্ট ২০১৩ : অদ্য ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’ সানায়া দাঈরী (রিয়াদ) শাখা পুনর্গঠন উপলক্ষ্যে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সানায়া দাঈরী শাখার সভাপতি শহীদুল ইসলাম (ফরিদপুর)-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত সভায় প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সঊদী আরব ‘আন্দোলন’-এর সাধারণ সম্পাদক শায়খ আব্দুল হাই। উক্ত অনুষ্ঠানে ভাই শহীদুল ইসলাম (ফরিদপুর)-কে সভাপতি ও কামাল আব্দুল হাই (মাদারীপুর)-কে সেক্রেটারী করে ৯ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়।

নতুন সানায়া (রিয়াদ) ২৩শে আগষ্ট ২০১৩ : অদ্য বাদ মাগরিব জালালুদ্দীন (কুমিল্লা)-এর সভাপতিত্বে ‘নতুন সানায়া’ (রিয়াদ) এলাকার তিন শাখার দায়িত্বশীলদের নিয়ে এক মতবিনিময় ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আমরা সেখানে কিভাবে সংগঠনকে গতিশীল করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা করি। বৈঠক শেষে আমরা চলে আসি সানায়া দাঈরী শাখার সভাপতি শহীদুল ইসলাম ভাইয়ের বাসায়। কারণ তিনি আমাদের রাতের খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন। সাথে ছিলেন ইমরান ও রনু ভাই। খেতে বসে দেখলাম দেশী খাবারের সমারোহ। ব্যাচেলর হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমাদের জন্য রান্না করেছেন বহু রকমের খাবার। জনাব আব্দুল হাই ভাই শত ব্যস্ততার মধ্যেও আমাদের সাথে শরীক হন।

সানায়া দাঈরী (রিয়াদ) ২৯শে আগষ্ট ২০১৩ : অদ্য বাদ এশা অত্র শাখা ‘আন্দোলন’-এর সভাপতি শহীদুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারী কামাল আব্দুল হাইয়ের পরিচালনায় শাখার দায়িত্বশীল ও শুভাকাংখীদের নিয়ে এক সাংগঠনিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আমরা বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোচনা পেশ করি।

বিদায়ের পালা : মাসব্যাপী দাওয়াতী সফর শেষে বেজে উটলো বিদায়ের ঘণ্টা। দিনটি ছিল ৩১শে আগষ্ট’১৩। ‘আন্দোলন’এর হারা (উত্তর) শাখার সেক্রেটারী জনাব ফরহাদ (রাজবাড়ী)-এর বাসায় দুপুরের খাবার শেষে রওনা দিলাম রিয়াদ বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে। আমাদের বিমানবন্দরে পৌঁছে দিলেন জনাব সোহরাব ভাই। একটি কথা অবশ্যই স্মরণ করা উচিৎ, তিনি ও ইমদাদুল হক মিঠু ভাই (পাবনা) আমাদের যাতায়াতের সবরকম ব্যবস্থা করেছেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও তারা আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পৌঁছে দিয়েছেন। আবার অনুষ্ঠান শেষে বাসায় রেখে গেছেন। মহান আল্লাহ তাঁদের উত্তম প্রতিদান দান করুন-আমীন! প্রত্যেক বিদায়ই কষ্টকর স্মৃতির জন্ম দেয়। সবাইকে বিদায় জানিয়ে বিচ্ছেদ বেদনায় কাতর হয়ে অবশেষে বিমানে চেপে বসলাম মদীনার উদ্দেশ্যে। এভাবেই আমাদের এক মাসের দাওয়াতী সফরের পরিসমাপ্তি ঘটল। ফালিল্লা-হিল হামদ

বিভিন্নজনের অনুভূতি : দীর্ঘ এই সফরে বিভিন্ন দ্বীনী ভাইয়ের আবেগভরা অনুভূতি আমাদেরকে দারুণভাবে অভিভূত করেছে। সিলেটের এক ভাই বললেন, আমি আহলেহাদীছ হয়েছি। কিন্তু আমি দেশে গিয়ে একা একা কিভাবে দাওয়াতী কাজ করব? আমার যেলায় কি আর কোন আহলেহাদীছ ভাই নেই? যাদের সহযোগিতা আমার শক্তি যোগাবে। নারায়ণগঞ্জের এক ভাই বললেন, দীর্ঘ ৮ বছর আমি পিতার সাথে রিয়াদে ছিলাম। কিন্তু শত চেষ্টা করেও আমার পিতা আমাকে নিয়মিত ছালাত আদায় করাতে পারেননি। তবে আল্লাহর অশেষ রহমত। যেদিন থেকে সংগঠনের সাথে জড়িত হয়েছি তার পর আর কোন দিন আমার ছালাত কাযা হয়নি। ফালিল্লাহিল হামদ। মাদারীপুরের একজন বললেন, আমার দুই ভাতিজাকে আমি নিজ খরচে নওদাপাড়া, রাজশাহীর কেন্দ্রীয় মারকাযে পড়াশুনার ব্যবস্থা করব। অপর একজন বললেন, আমার পিতা আমাকে সঊদী আরব আসার পূর্বে এক পীরের বায়াত নিয়ে মুরীদ করে পাঠিয়েছেন। আমি দেশে যেতে চাচ্ছি। কিন্তু সেখানে গিয়ে কিভাবে দাওয়াত দিব? অনেক ভাই আগ্রহভরে বললেন, আমার ছেলে ছোট। একটু বড় হ’লেই নওদাপাড়ায় ভর্তি করব ইনশাআল্লাহ। অনেকের অনুভূতি, ‘আমি আমার ছেলেকে নওদাপাড়ায় পড়াতে চাই কিন্তু আমার বাড়ী থেকে তা অনেক দূরে। ঢাকায় কি আমাদের কোন প্রতিষ্ঠান নেই?’ ‘আমার বাড়ী পীর-মাযারের আড্ডাখানা চট্রগ্রামে। তাই আমি রাজশাহীতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চাই।’ ‘আমাদের এলাকায় সবাই হানাফী। আমাকে আহলেহাদীছ মেয়ের সাথে বিবাহের ব্যবস্থা করুন’। ‘আমাদের যেলায় এখনও কেন ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর দাওয়াত পৌঁছেনি, আপনারা দয়া করে দেশের দায়িত্বশীলদের বলুন, তারা যেন আমাদের যেলাগুলোতে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেন। সকলের একটাই দাবী, ভাই! আমাদের জন্য দো‘আ করবেন, যাতে আমরা ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর সাথে থেকে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী জীবন গড়তে পারি। আর মুহতারাম আমীরে জামা‘আতকে এখনও দেখিনি। দেশে গেলে অবশ্যই তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করব। তবে আমাদের পক্ষ থেকে তাঁকে সালাম দিবেন ও দো‘আ করতে বলবেন। এরকম হাযারো অনুভূতির ডালি নিয়ে অবশেষে ফিরে এলাম মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল চত্বরে।

পরিশেষে মুহতারাম আমীরে জামা‘আতের একটি উপদেশ উল্লেখ করে শেষ করছি। তিনি বলেছিলেন ‘যেখানেই থাকো সংগঠনের সাথে থাকবে, সংগঠনের দাওয়াত দিবে। কখনও সংগঠন থেকে বিচ্ছিন্ন হবেনা, আল্লাহ তোমাদের সম্মান বৃদ্ধি করবেন ইনশাআল্লাহ’।

 

 

 

HTML Comment Box is loading comments...