মহিলাদের পাতা

মিডিয়া আগ্রাসনের কবলে ইসলাম ও মুসলিম


নূরজাহান বিনতে আব্দুল মজীদ

 

মিডিয়া (Media) একটি ইংরেজী শব্দ। কোন কিছু প্রচারে যে মাধ্যম ব্যবহৃত হয় সেটাই মিডিয়া। মিডিয়ার প্রধানত দু’টি স্তর রয়েছে- (১) প্রিনট মিডিয়া অর্থাৎ পত্র-পত্রিকা বা সংবাদপত্র। (২) ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া অর্থাৎ স্যাটেলাইট, মোবাইল, কম্পিউটার, টিভি, রেডিও ইত্যাদিত। কারো পক্ষে বা বিপক্ষে কিছু বলার ক্ষেত্রে মিডিয়ার নিজস্ব কোন শক্তি নেই। মিডিয়ার ধারক-বাহক ও চালক যে কাজে তাকে চালাবে সে কাজেই মিডিয়া চলবে ও ব্যবহৃত হবে। এটা প্রত্যেক নির্জীব জিনিসের ক্ষেত্রে চিরাচরিত নিয়ম।
যোগাযোগ মাধ্যম প্রকৃতপক্ষে এমন কিছু কর্মের সমষ্টি, যার মাধ্যমে মানুষ পরস্পর আবেগ-অনুভূতি, মতামত-প্রতিক্রিয়া, চিন্তাধারা-ভাবধারা ও জ্ঞানের আদান-প্রদান করে। এই আদান-প্রদান ও মত বিনিময় এমন সব উপকরণের মাধ্যমে হয়ে থাকে, যেগুলোকে পৃথক পৃথক দু’টিভাগে বিভক্ত করা যায় :
(১) এমন সীমিত উপকরণ, যা সীমিত ব্যক্তিকে পরস্পর মিলিয়ে দেয়। সেসব উপকরণের মধ্যে টেলিফোন, ফ্যাক্স, মোবাইল ইত্যাদির সাথে সাথে সমাবেশ, সম্মেলন, কনফারেন্স, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কারণ এগুলো পরস্পরকে মিলিয়ে দেওয়ার মাধ্যম।
(২) এমন উপকরণ, যা অগণিত ব্যক্তি পর্যন্ত কথা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম। এর মধ্যে পত্র-পত্রিকা, টিভি-ভিসিআর, সিনেমা-ফিল্ম,  টিভি-র  বিজ্ঞাপন,  ইন্টারনেট  ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আজ বিশব মুসলিম উভয় প্রকার মিডিয়ার অপব্যবহারের বিভ্রান্তির ধূম্রজালে আবদ্ধ ও সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের শিকার। ইসলাম বিদ্বেষীরা বিশব মুসলিমের আমল-আক্বীদা সমূলে ধ্বংস করার জন্য মিডিয়াকে প্রধান মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেছে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে সুইজারল্যান্ডের বাজিল নগরীতে অস্ট্রেলিয়ার দুর্ধর্ষ ইহুদী সাংবাদিক ড. থিওডর হার্জেলের নেতৃত্বে বিশব ইহুদী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে তারা গোটা বিশবকে নিয়ন্ত্রণ করার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র ও সুপরিকল্পিত নীলনকশা প্রণয়ন করে। তারা সকলে একমত হয় যে, বিশবকে নিয়ন্ত্রণ করতে হ’লে প্রথমত দুনিয়ার সকল স্বর্ণভান্ডার আয়ত্ত করতে হবে এবং সূদী অর্থ ব্যবস্থার জাল বিস্তার করে পৃথিবীর সকল পুঁজি তাদের হস্তগত করতে হবে। এরপর তারা স্থির সিদ্ধান্ত নেয় যে, আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যম যেন তাদের একচ্ছত্র আধিপত্যে চলে আসে এবং মিডিয়ার সাহায্যে দুনিয়াবাসীর মগজধোলাই প্রক্রিয়া শুরু করে তারা তাদের কাংখিত লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারে। সংবাদমাধ্যম তথা সকল প্রচার মাধ্যমের অসাধারণ গুরুত্ব, প্রভাব ও ভূমিকার কথা উলেলখ করে ড. থিওডর বলে, ‘আমরা ইহুদীরা পুরো বিশবকে শোষণের পূর্বশর্ত হিসাবে পৃথিবীর সকল পুঁজি হস্তগত করাকে প্রধান কর্তব্য বলে মনে করি। তবে প্রচার মিডিয়া আমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে দ্বিতীয় প্রধান ভূমিকা পালন করবে। আমাদের শত্রুদের পক্ষ হ’তে এমন কোন শক্তিশালী সংবাদ প্রচার হ’তে দেব না, যার মাধ্যমে তাদের মতামত জনগণের কাছে পেঁŠছতে পারে।’
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক প্রচার মিডিয়াগুলোর মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ ও ইসলামী মৌলবাদের বিরুদ্ধে বিশবময় এক ঝড় তোলা হয়েছে। এরা ইতিমধ্যেই দুনিয়ার মুসলমানদেরকে দু’টি ভাগে ভাগ করে ফেলেছে।
একটি Moderate Islamic group and Muslim activist নামে অভিহিত। বিশেবর অন্যতম প্রধান সংবাদ সংস্থা হ’ল রয়টার। পৃথিবীর এমন কোন সংবাদপত্র, রেডিও সেনটার, টিভি সেনটার ও স্যাটেলাইট নেই যারা রয়টার থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে না। বর্তমান বিশেবর প্রধান দু’টি প্রচার মাধ্যম ‘বিবিসি’ এবং ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ও প্রায় নববই ভাগ সংবাদ রয়টার থেকে সংগ্রহ করে থাকে। বিশবখ্যাত এ সংবাদ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়াস রয়টার ১৮১৬ সালে জার্মানির এক ইহুদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার এই রয়টার কার্যক্রম অতি সহজেই বিশবময় স্থান লাভ করেছিল। এখন তো রয়টার ছাড়া পৃথিবী যেন অচল। রয়টার হচেছ আকাশ সংবাদসংস্থার মহারাজাধিরাজ।
ইসলাম বিদ্বেষী তৎপরতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাঈল, ভারত ও মার্কিন ইহুদী লবি অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ইহুদীরা স্বীয় প্রটোকল প্রস্ত্তত করার পূর্বেই ১৮৪৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি সংবাদ এজেন্সি প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এই এজেন্সিকে আমেরিকার পাঁচটি বড় বড় দৈনিক মিলে ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ নামে প্রতিষ্ঠা করে। অর্ধ শতাব্দী অতিক্রান্ত হওয়ার পর ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দে এই সংস্থা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে কাজ শুরু করে এবং আমেরিকায় প্রকাশিত সকল পত্র-পত্রিকাসহ গোটা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মিডিয়া ও প্রচার মাধ্যমকে সংবাদ সরবরাহ করতে থাকে। ১৯৮৪ সনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী উক্ত এজেন্সীর সাথে আমেরিকার তেরশ’ দৈনিক, তিন হাযার সাত শত আটাশিটি রেডিও এবং ৮৮টি টিভি স্টেশন জড়িত আছে। আমেরিকার বাইরে এগার হাযার নয় শত সাতাশ (১১৯২৭)টি দৈনিক ও রেডিও, টিভি স্টেশন জড়িত আছে। স্যাটেলাইট ও অন্যান্য মাধ্যমে দৈনন্দিন এক কোটি সতের লাখ শব্দ সম্বলিত লেখা মিডিয়াকে সরবরাহ করা হয়। এছাড়া ১৯০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ইউনাইটেড প্রেস’, ১৯০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল নিউজ সার্ভিস’ যা ১৯৫৮ সালে একীভূত হয়ে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর মালিকানায় চলে আসে। এটি পরিচালিত হয় ইহুদী মালিকের অধীনে।
ইহুদী প্রচার মাধ্যমগুলো বিশবময় ইসলামী পুনর্জাগরণ আনেদালন সম্পর্কে অব্যাহতভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টির প্রয়াস চালিয়ে যাচেছ। এ উদ্দেশ্যে তারা আন্তর্জাতিক সূত্রগুলোকে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে মার্কিন-ইহুদী প্রভাবিত প্রচার মাধ্যমগুলো মুসলমানদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ও মৌলবাদের অপবাদ রটিয়ে যাচেছ, যাতে করে বিশ্বে ইসলামী আনেদালন স্তব্ধ করে দেয়া যায়। যেমন-
(১) পশ্চিমা গণমাধ্যম চরমপন্থা, মৌলবাদ, ধর্মীয় অনুশাসন পালনকে শব্দের ব্যবহারগত চাণক্যে সমার্থবোধক করে ফেলেছে। নিউইয়র্ক ভিত্তিক Daily Times ৪ঠা অক্টোবর ২০০২ এক সংবাদে লিখেছে, "Muslims Soliders were shown performing prayers with gun."  এ সংবাদের সাথে একটি ছবি ছাপা হয় এবং ছবির পরিচিতিতে লেখা হয়, "Guns and Prayer go together in the fundamentalist battle". আফগানিস্তানের মুসলমানরা যুদ্ধক্ষেত্রে ছালাতের সময় ছালাত আদায় করছে এ সত্য কথাটি পশ্চিমা মিডিয়া কৌশলে এড়িয়ে গেছে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর হাতে অস্ত্র থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সংবাদ প্রকাশের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে একটি যুদ্ধের চিত্র সংবাদকে সারাবিশ্বে ইসলামী মৌলবাদীদের (Islamic Fundamentalism) সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বলে প্রচার করা হ’ল। এমনিভাবে পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানরা প্রতিনিয়ত বিমাতাসুলভ আচরণের স্বীকার হচ্ছেন।
(২) পশ্চিমা সংবাদ ও গণমাধ্যমের আরেকটি ভ্রান্তি হ’ল মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক অবকাঠামো, অস্থিরতা ও ঘটনা প্রবাহকে ইসলামের সাথে একাকার করে ফেলা। ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের উদাহরণ এখানে উল্লেখ করা যায়। নববই-এর দশকে গালফ যুদ্ধ এবং এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ কেবল সাদ্দামের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তাঁর অমানবিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নির্বিচারে হাযারো নর-নারী সর্বস্বান্ত হওয়ার যে অভিযোগ রয়েছে, তা কোন সুস্থ ও বিবেকবান মুসলমান সমর্থন করেনি। অথচ পশ্চিমা সংবাদ ও গণমাধ্যম সাদ্দামের এ কর্মকান্ডকে ইসলামের সাথে জড়িয়ে উল্লেখ করেছে ‘ইসলাম কি করে এতো হত্যাকে উৎসাহিত করেছে?’ সাদ্দামের পরিচালিত গণহত্যাকে তারা ইসলামের সাথে তুলনা করেছে। ২০০৩ সালের মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক আইন-কানুনকে তোয়াক্কা না করে বুশ-ব্লেয়ার যখন ইরাক আক্রমণ করে তখন পশ্চিমা সংবাদ ও গণমাধ্যম এ আগ্রাসনকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে খৃষ্টান আক্রমণ না বলে সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নৈতিক (?) ও বৈধ (?) আক্রমণ বলে চালানোর চেষ্টা করেছে। আর এ ঘটনাগুলো প্রকাশ্যই পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যম সারা বিশ্বে প্রচার করেছে। হিটলার খৃষ্ট ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। এজন্য আমরা মনে করি না তাঁর সকল কর্মকান্ড খৃষ্টধর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট। ঠিক এমনিভাবে আমরা মনে করি সাদ্দাম ও ইসলামকে পশ্চিমা সংবাদ ও গণমাধ্যম যেমন এক করে ফেলে তেমনি ইসলাম, আরব ও মধ্যপ্রাচ্যকেও বিশ্ববাসীর সামনে এক করে তুলে ধরছে। তাদের পরিবেশিত মিথ্যা ও স্থূল তথ্যের কারণে বিশ্ববাসী ইসলাম এবং মুসলিম বিশ্ব সম্পর্কে ভ্রান্তির বেড়াজালে হাবুডুবু খাচ্ছে। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের সকল মুসলিম দেশে সমগ্র মুসলমানের মাত্র ১৮% বাস করে। সুতরাং তাদের সকল কর্মকান্ডকে ইসলামের সাথে জড়িয়ে ফেলার কোন কারণ থাকার কথা নয়।
বাংলাদেশের মিডিয়া জগৎ ও চলচ্চিত্র হ’ল অশলীলতার একমাত্র হাতিয়ার। আমাদের দেশে পশ্চিমাদের মতো কিছু উচ্চ শিক্ষিত লোক আছে যারা ভাই-বোন, পিতা-মাতা, স্ত্রী-পুত্র সহকারে একত্রে স্যাটেলাইট দেখে। কোন চলচ্চিত্রে একটি মেয়ে বস্ত্রহীন হয়ে নাচে অথবা কোন মেয়েকে ধর্ষণ করার দৃশ্য রয়েছে, এ রকম ছবি দেখাকে তারা ‘ফ্রি মাইন্ড’ মনে করে। অথচ যে দেশের মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় সন্তান বিক্রি করে, হালের বলদের অভাবে মানুষ কাঁধে জোয়াল টানে, সে দেশে চার্লস ডায়নার বিয়ের ছবি এবং পার্শ্ববর্তী দেশের নায়ক-নায়িকার বিয়ের খবর এক সপ্তাহ ধরে ছাপা হয়। আরেকশ্রেণীর বিলাসপ্রিয় মানুষ ডিসএনিটনার সাহায্যে বিছানায় শুয়ে শুয়ে আলো-ঝলমল পৃথিবীর সভ্যতা বিবর্জিত রঙ্গমঞ্চ প্রত্যক্ষ করে চলছে বিবেকহীনভাবে।
পশ্চিমের মানুষেরা নিজের বোধ-বুদ্ধিকে জলাঞ্জলি দিয়ে প্রচারযন্ত্রের নাচের পুতুলে পরিণত হয়েছে। প্রচারযন্ত্রের প্রচারণার নিরিখেই তারা জীবনের সবকিছু মাপতে চায়। তারা বুঝতে চায় কে কতখানি উন্নত বা অনুন্নত। প্রচারযন্ত্রই সাম্রাজ্যিক স্বার্থে তাদের মাথায় ঢুকিয়ে রেখেছে, অপশ্চিমা বিশেবর মানুষেরা নিজেদের ভালমনদ বুঝতে পারে না। সুতরাং এদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে পশ্চিমের উন্নত মানুষদের সহায়তা যরূরী।
স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমের প্রযুক্তিশাসিত শক্তিশালী মিডিয়া পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের একান্ত অনুগত খেদমতগার হিসাবে ইসলামকেই এই মুহূর্তে তার বড় শত্রু হিসাবে নিশানা করেছে। কমিউনিজমের পতনের পর ইসলামকে এই নিশানা করার কারণ হচ্ছে- এটি একটি সুগঠিত আদর্শ। এটি কর্পোরেট পুঁজিকে সমর্থন করে না। সমর্থন করে না বাজার অর্থনীতি, বিশবায়নের নামে নতুন কালের অর্থনৈতিক শোষণের দাপাদাপি। পশ্চিমের অবাধ কনজুমারিজম, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও স্বার্থপরতা ইসলামের কাম্য নয়। ইসলাম চায় না একজনের শোষণে আর একজনের অগ্রগতি; ইসলাম চায় আদল, ইহসান ও ইনছাফভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা, যেখানে শোষণ ও বঞ্চনা থাকবে না। সাম্রাজ্যবাদীদের পথের কাঁটা এই মতাদর্শকে Preemative war-এর বিজয়নিশান উড়িয়ে মার্কিন বিদ্বেষ খতম করার চেষ্টা করবে, এতে আর অবাক হওয়ার কী আছে। এক্ষেত্রে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো তথ্যপ্রযুক্তিকে তাদের স্বার্থে Catalytic converter-এর মতো ব্যবহার করে। এজন্য পুঁজিবাদী মিডিয়া ইসলামকে বর্বর, সন্ত্রাসী ও জঙ্গী ধর্ম হিসাবে অনবরত প্রচার করে। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগে তাকে অবিরত নিনিদত হ’তে হয়। উদ্দেশ্য, কোন কিছুকে নিনিদত না বানাতে পারলে তাকে ধরাশায়ী করা যাবে কেমন করে! কেবল শক্তিশালী মিডিয়ার সাহায্যে সাম্রাজ্যবাদীরা ইসলামের সঙ্গে শত্রুতাকে আজ বৈধ করে নিচেছ।
আজকে বৃটেন, আমেরিকাসহ তাদের অন্যান্য দোসররা ইসলামী সন্ত্রাসবাদ ও মুসলিম চরমপন্থী নামে অপপ্রচার চালাচেছ এবং বিশবকে তা বিশবাসও করাতে চাচেছ। প্রচারণার এই ধরনটা চিরকাল একই রকম। হয় আমাদের সঙ্গে থাক, না হ’লে ভাগাড়ে গিয়ে মরো। পেনটাগন, হোয়াইট হাউস এবং স্টেট ডিপার্টমেনেটর পসনদসই হ’লে টিকবে, নইলে ধ্বংস হয়ে যাবে। স্বাধীনতা সংগ্রামী, মতাদর্শিক যোদ্ধা এতে কিছু আসে যায় না। আমেরিকার জিঘাংসার বিরুদ্ধে, ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে, বিশবায়ন-বাজার অর্থনীতির বিরুদ্ধে যে-ই দাঁড়াবে, মোকাবিলা করার কথা বলবে, সে-ই রাতারাতি সভ্যতার শত্রু, জঙ্গী, বর্বর, সন্ত্রাসী বনে যাবে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, মুসলিম রাষ্ট্র ও জনগণ আজও পাশ্চাত্যের পুঁজিপতিদের নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার উপর ভয়ানকভাবে নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে মুসলিম জনগণের অবস্থানকে প্রতিনিয়ত দুর্বল করে দিচেছ। পুঁজিপতি মিডিয়াগুলোর অবিরত প্রচারণা মুসলিম জনগণের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। তাদের মধ্যে নৈরাজ্য উৎপাদন করে। এসবের ফলে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক ধারণাগুলোর বিলুপ্তি ঘটে। এগুলো ধীরে ধীরে ভিনদেশী ধারণা দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ হচেছ মিডিয়াকে ব্যবহার করা। মিডিয়ার প্রচারণাকে মিডিয়া দিয়েই প্রতিহত করতে হবে। এই কৌশল আজ মুসলমানদের আয়ত্ত করতে হবে। পাশ্চাত্যের সুপ্রসিদ্ধ ধর্মবিষয়ক পন্ডিত ‘Muhammad : The biography of a Prophet’-এর ননিদত রচয়িতা কারেন আর্মস্টং-এর একটি উদ্ধৃতি দিতে চাই, যা মিডিয়া জগতে এ কালের মুসলমানদের দায়িত্ব ও করণীয় সম্পর্কে একটা ধারণা দিবে। তিনি বলেন, ‘একুশ শতকে মুসলমানরা এ রকম একটা স্ট্র্যাটেজি ছাড়া পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার যুদ্ধকে মোকাবিলা করতে পারবে না। মুসলমানদের মিডিয়াকে ব্যবহার করা উচিত ইহুদীদের মতো। মুসলমানদের লবিং করতে জানতে হবে এবং তাদের একটি মুসলিম লবির সৃষ্টি করতে হবে। এটাকে আপনি সমন্বিত প্রচেষ্টা গ্রহণ বলতে পারেন। এটা এমন একটা প্রচেষ্টা, এমন সংগ্রাম; যেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনি মিডিয়াকে পরিবর্তন করতে চান, তাহ’লে মানুষকে আপনার বুঝাতে হবে ইসলাম রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে একটি শক্তি। কিভাবে মিডিয়াকে ব্যবহার করতে হবে এবং মিডিয়াতে নিজেদের কিভাবে উপস্থাপন করতে হবে তা মুসলমানদের জানতে হবে। মুসলিম উম্মাহকে এই নবতর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার বিকল্প কোন পথ নেই।


[চলবে]


. ইয়াসির নাদীম, বিশ্বায়ন : সাম্রাজ্যবাদের নতুন স্ট্র্যাটেজি (ঢাকা : প্রফেসর’স পাবলিকেশন্স, ২০০৮), পৃঃ ১৯৬-১৯৭
. ঐ, পৃঃ ১৯৭-১৯৮
. ড. মুহাম্মাদ ইকবাল হোসাইন, পাশ্চাত্য সংবাদ ও গণমাধ্যমের ইসলাম বিরোধিতা : উত্তরণ প্রক্রিয়ার কতিপয় দিক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, ৪৬ বর্ষ, ২য় সংখ্যা, অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০০৬, পৃঃ ১১৩। গৃহীত :Martinez, Pricilia. http:/ chuma. cas. usf. edu/rfayiz/media. html. Muslim Culture, Religion Misrepresented by Media..
. ঐ, পৃঃ ১১৪-১১৫। গৃহীত : Ba-Yunus, Ilyas. http://www.geocities.com/CollegePark/6453/myth.htm1. The Myth of Islamic Fundamentalism.).