সাক্ষাৎকার


মাওলানা ইসহাক ভাট্টি

 (পূর্ব প্রকাশিতের পর)

আত-তাহরীক : কোন মৌলিক বা অনুবাদ রচনায় কোন বিষয়গুলোর দিকে বিশেষ নযর দেয়া উচিৎ বলে মনে করেন?

মাওলানা ইসহাক ভাট্টি : কোন মৌলিক রচনার সময় চেষ্টা করতে হবে যেন পাঠককে সঠিক তথ্যটি দেয়া যায় এবং ভাষা শুদ্ধ হয়। এটা একটি ভাল লেখনীর মূল বৈশিষ্ট্য। আর যদি ভাষায় কিছুটা দুর্বলতা থাকে, তবে সঠিক তথ্য পরিবেশন করতে পারলে সেটা কাটিয়ে ওঠা যায়। অনেকের লেখায় তথ্য কম থাকলেও তা ভাষার সৌন্দর্যে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত থাকে। এ ধরনের লেখায় তথ্য বেশী না মিললেও ভাষার সৌকর্যে পাঠকের মনোরঞ্জন ঘটে। কিন্তু যে লেখায় তথ্যও নেই, ভাষারও ঠিক নেই, তাতে পাঠকের কোনই উপকার হয় না।

আর অনুবাদের ক্ষেত্রে বলব, যে ভাষা থেকে আপনি অনুবাদ করতে চান সেই ভাষায় আপনার দখল থাকতে হবে। আবার যে ভাষায় অনুবাদ করবেন, সেই ভাষাতেও দক্ষতা থাকতে হবে। যে বিষয়টি অনুবাদ করছেন, সেই বিষয়টি সম্পর্কেও সার্বিক জ্ঞান থাকতে হবে। যেমন অর্থনীতির উপর কোন বই আপনি আরবী থেকে উর্দূতে অনুবাদ করতে চান। সেক্ষেত্রে আপনাকে আরবীতে এবং উর্দূতে যেমন দক্ষতা থাকতে হবে, অর্থনীতির সাথেও তেমন পরিচয় থাকা আবশ্যক।

আত-তাহরীক : খাছভাবে আহলেহাদীছদের ইতিহাস লিখতে আগ্রহী হ’লেন কেন আপনি?

মাওলানা ভাট্টি : প্রথম কারণ তো খুব স্বাভাবিক যে আমি একজন আহলেহাদীছ। সুতরাং আহলেহাদীছদের ইতিহাস নিয়ে আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক। দ্বিতীয়তঃ ইতিহাস বিষয়ক গবেষণার সাথে আমার সম্পৃক্ততা। আহলেহাদীছদের ইতিহাস নিয়ে বেশ কিছু গ্রন্থ উর্দূতে রচিত হয়েছে। তবে সেটা বেশ অপ্রতুল আকারে। এজন্য অনেক আগে থেকেই এই কাজে নামার তাকীদ অনুভব করছিলাম। ১৯৯৭ সালে চাকুরী থেকে অবসর নেয়ার পর আমি খালেছভাবে আহলেহাদীছদের ইতিহাস রচনার কাজে হাত দেই। প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে সমকালীন যুগ পর্যন্ত উপমহাদেশীয় আহলেহাদীছদের দ্বীনী খেদমত সবিস্তারে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি যথাসাধ্যভাবে। সেগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে এবং আল-হামদুলিল্লাহ যথেষ্ট পাঠকপ্রিয়ও হয়েছে।

আত-তাহরীক : আপনি উপমহাদেশীয় প্রেক্ষাপটে ইতিহাস রচনা করলেও তাতে বাংলাদেশের আলেম-ওলামার নাম প্রায় অনুপস্থিতই। এর কারণ কী?

মাওলানা ভাট্টি : আসলে বাঙালী আলেমদের সাথে আমার চলা-ফেরা খুব কম হয়েছে। উর্দূ ভাষায় বাঙালী আহলেহাদীছ আলেমদের নিয়ে লেখালেখিও আমি তেমন পাইনি। ফলে বাঙালী আলেমদের ব্যাপারে আমি প্রায় অন্ধকারেই। অনুজপ্রতীম ড. মুজীবুর রহমানকে কত বার যে বলেছি, এ বিষয়ে উর্দূতে কিছু লেখার জন্য। কিন্তু তাঁর সেই সময় হয়নি। জানি না আমেরিকায় এখন সে কী করছে। বাংলাদেশে আমার যাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সুযোগ হয়নি। একবার কলিকাতা পর্যন্ত গিয়েছিলামও। কিন্তু সেবারও যেতে পারিনি। এটা নিয়ে আমার আফসোস রয়েছে। তবে আমার ‘বার্রে ছাগীর মেঁ আহলেহাদীছ খুদ্দামে কুরআন’ গ্রন্থে মাওলানা আব্দুল্লাহিল কাফীসহ কয়েকজন বাঙালী আলেমের কথা কিন্তু এসেছে। পাকিস্তান গঠনকালীন সময় বাঙালীদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯৫০-৫১ সালে ৩১ জন আলেমকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল, যখন লিয়াকত আলী খান চ্যালেঞ্জ করেছিলেন যে, আলেমরা একতাবদ্ধ হ’তে পারে না এবং ইসলামী শাসনতন্ত্র রচনা কিভাবে করা যেতে পারে সে ব্যাপারে তাদের কোন ধারণা নেই। তখন পাকিস্তানের কিছু হানাফী-আহলেহাদীছ আলেম মিলে এই কমিটি গঠন করেন। মাওলানা দাঊদ গযনভীও এই কমিটির সদস্য ছিলেন। এই কমিটিতে বেশ কয়েকজন ছিলেন বাঙালী আলেম। পরবর্তীতে আইয়ূব খান যখন পাকিস্তানের সংবিধান রচনা করলেন তখন পাকিস্তানের বিভিন্ন ওলামায়ে কেরাম এবং বিজ্ঞজনদের কাছে এর খসড়া পেশ করে তাদের মতামত জানতে চাইলেন। এ ব্যাপারে পরামর্শের জন্য বাংলাদেশে মাওলানা আব্দুল্লাহিল কাফী আল-কুরায়শী’র বাড়িতে আলেমদের সর্বশেষ মিটিংটি হয়েছিল। মাওলানা কাফী ছাহেব ইংরেজীতে সংবিধানটি সম্পর্কে তাঁর জওয়াব লিখতে লিখতেই মৃত্যুবরণ করেন।      

আত-তাহরীক : আপনি মারকাযী জমঈয়তে আহলেহাদীছের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। অফিস সেক্রেটারীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন। সেই সময়কার ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন।

মাওলানা ভাট্টি : ১৯৪৮ সালের ২৫শে জুলাই ‘মারকাযী জমঈয়তে আহলেহাদীছ পশ্চিম পাকিস্তান’-এর সর্বপ্রথম বৈঠক হয়। প্রায় ২০০/২৫০ মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। সেদিন ফয়ছালাবাদ থেকে আমরা ৬ জন উপস্থিত হয়েছিলাম। মাওলানা ছূফী আব্দুল্লাহ, মিয়াঁ মুহাম্মাদ বাকের, হাকিম নূরুদ্দীন, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ আহরার, মাওলানা আল্লাহ বখশ এবং আমি। আর জমঈয়তের প্রতিষ্ঠাতা যারা ছিলেন তাঁরা হলেন মাওলানা সাইয়েদ মুহাম্মাদ দাঊদ গযনভী, মাওলানা মুহাম্মাদ ইসমাঈল সালাফী, মাওলানা আতাউল্লাহ হানীফ ভূজিয়ানী, মিঞা আব্দুল মাজীদ, প্রফেসর আব্দুল কাইয়ুম এবং মাওলানা মুহাম্মাদ হানীফ নদভী। কাছূরী ভ্রাতৃদ্বয় মাওলানা মুহিউদ্দীন আহমাদ কাছূরী এবং মাওলানা মুহাম্মাদ আলী কাছূরীকেও এর মধ্যে শামিল করা যায়। সংগঠন প্রতিষ্ঠার পর আমাকে দফতর সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব দেয়া হয়।

তারপর দীর্ঘদিন আমি জমঈয়তের সাথে কাজ করেছি এবং করেছিলাম আল-হামদুলিল্লাহ। সে সময় এখনকার মত যাতায়াতের সুব্যবস্থা কল্পনাই করা যেত না। ক্রোশের পর ক্রোশ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করতে হ’ত দাওয়াতী সফরে। কিন্তু পরবর্তীতে যখন লেখালেখির জীবনে প্রবেশ করলাম, তখন সংগঠনের জন্য আগের মত সময় দেওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ল। তাছাড়া মাওলানা দাঊদ গযনভীর মৃত্যুর পর সংগঠনের অবস্থাও ভাল ছিল না। শুধু মিটিং ডাকা হ’লে যেতাম। তবে ময়দানের কাজে পিছিয়ে পড়লেও এটুকু গর্ব করেই বলতে পারি যে, লেখালেখির মাধ্যমে আমি সেই ঘাটতিটুকু পুষিয়ে দিয়েছি আল-হামদুলিল্লাহ।

ইদানিং আমার বেশ কষ্ট হয়, যখন শুনি কোন কোন আহলেহাদীছ হাযরাত বলেন যে, ‘আমি জমঈয়তের সক্রিয় কর্মী নই’। আমার কথা হ’ল, শুধু বক্তব্য প্রদান কিংবা সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই কি খেদমত হয়? লেখালেখির মাধ্যমে খেদমত হয় না? উপমহাদেশের আহলেহাদীছদের ইতিহাসের উপর আমার মত এত বিস্তারিত আর কেউ লিখেছেন বলে আমার জানা নেই। আহলেহাদীছদের ইতিহাসের উপর আমি যেমন লিখেছি ‘বার্রে ছাগীর মে আহলেহাদীছ কী আমাদ’ (উপমহাদেশে আহলেহাদীছদের আগমন), ‘কারওয়ানে সালাফ’ (সালাফদের কাফেলা), ‘কাফেলায়ে হাদীছ’ (হাদীছের কাফেলা), ‘বার্রে ছাগীর কী আহলেহাদীছ খুদ্দামে কুরআন’ (উপমহাদেশের আহলেহাদীছ কুরআনের খাদেমগণ), যেই গ্রন্থে আরবী, উর্দূ, ফার্সী, পশতু, পাঞ্জাবী, বাংলা, বালুচী, হিন্দী, সিন্ধী এবং ইংরেজী ভাষায় রচিত আহলেহাদীছ আলেমদের কৃত সকল কুরআন তরজমা এবং তাফসীর সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে এবং ‘দাবিস্তানে হাদীছ’ (হাদীছের পাঠশালা), ‘গুলিস্তানে হাদীছ’ (হাদীছের বাগান), ‘চামানিস্তানে হাদীছ (হাদীছের পুষ্পোদ্যান), ‘মাহফিলে দানিশমান্দাঁ (জ্ঞানীদের মেলা)-এর মত বিস্তারিত ইতিহাসগ্রন্থ, তেমনি ‘বার্রে ছাগীর মে আহলেহাদীছ কী আউয়ালিয়াত’ (উপমহাদেশে আহলেহাদীছদের অগ্রণী ভূমিকা), ‘বার্রে ছাগীর মে জামা‘আতে আহলেহাদীছ কী তানযীমী আওর তাদরীসী সারগুযাস্ত’ (উপমহাদেশে আহলেহাদীছদের সাংগঠনিক ও শিক্ষকতার ইতিহাস)-এর মত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলীল রচনার কাজও এই অধমের হাতে সম্পাদিত হয়েছে। ১৯৪৯ সাল থেকে অদ্যাবধি জমঈয়তের বার্ষিক যত সম্মেলন হয়েছে তার স্বাগত ও উদ্বোধনী ভাষণের একটি সংকলনের কাজ আমি শেষ করেছি, যেটি প্রকাশিতব্য। পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির ‘এনসাইক্লোপেডিয়া অফ ইসলামে’ অনেক আহলেহাদীছ মনীষীর জীবনী লিখেছি। এছাড়াও তাযকিরায়ে কাযী মুহাম্মাদ সুলায়মান মানছূরপুরী, তাযকিরায়ে ছূফী মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ, তাযকিরায়ে মিঞা আব্দুল আযীয, মিঞা ফযলে হক এবং তাঁর খেদমত, কাছূরী খানদানের খেদমত প্রভৃতি লিখেছি। উপমহাদেশে আরবী সাহিত্যের তিন উজ্জ্বল নক্ষত্র মাওলানা আব্দুল আযীয মায়মান, মাওলানা মুহাম্মাদ সূরাটী, মাওলানা আব্দুল মাজীদ হারীরী বানারসী, যারা আহলেহাদীছ ছিলেন, তাঁদের উপরও একটি গ্রন্থ রচনা শুরু করেছি। এভাবে জীবনের বৃহত্তম অংশ আহলেহাদীছদের ইতিহাস রচনায় ব্যাপৃত রাখার পরও যখন কেউ আমাকে জমঈয়তের কোন সক্রিয় কর্মী নই বলে মনে করেন, তখন খুব কষ্ট পাই। লেখালেখির প্রয়োজনে আমি নিভৃতে থাকলেও রাজনীতির বাইরে জমঈয়ত এবং জামা‘আতের প্রায় সকল কর্মকান্ডেই আমি সম্পৃক্ত থাকার চেষ্টা করি। এরপরও কেউ ভুল বুঝলে আমার আর কিইবা করার আছে।         

আত-তাহরীক : প্রথমে মারকাযী জমঈয়তের সদস্য হিসাবে এবং সাপ্তাহিক আল-ই‘তিছামের সম্পাদক হিসাবে, পরবর্তীতে ছাক্বাফাতে ইসলামিয়ার রিসার্চ ফেলো হিসাবে এবং বর্তমানে জীবন সায়াহ্নে এসে স্বাধীনভাবে লেখালেখির চর্চায় নিয়োজিত রয়েছেন। এর মধ্যে কোন সময়টিকে আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?

মাওলানা ইসহাক ভাট্টি :  আমার কাছে জীবনের সবগুলো পর্যায়ই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি পর্যায়ে বহু অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছে এবং নতুন নতুন বিষয় শেখার সুযোগ হয়েছে। অনেক গুণীজনের সাথে অন্তরঙ্গভাবে মেশার সুযোগ হয়েছে। ফেলে আসা সেই অতীতের কথা ভাবলে অন্তরটা প্রশান্তিতে ভরে যায়। রিসার্চ ফেলো থাকার সময় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছিলাম। যেমন-‘বার্রে ছাগীর মে ইলমে ফিক্বহ’ (উপমহাদেশে ইলম ফিক্বহ), ‘আল-ফিহরিস্ত’-এর উর্দূ অনুবাদ, ‘বার্রে ছাগীর মেঁ ইসলাম কে আউয়ালীন নুকূশ’ (উপমহাদেশে ইসলামের প্রথম দিকের নিদর্শন সমূহ), ১০ খন্ডে রচিত ‘ফুক্বাহায়ে হিন্দ’ (হিন্দুস্তানের ফক্বীহগণ) প্রভৃতি। সবগুলো  গ্রন্থই  ব্যাপকভাবে  গ্রহণযোগ্য  হয়েছে  এবং পাকিস্তান ও ভারতে বেশ কয়েকবার ছাপানো হয়েছে। পাটনার বিখ্যাত খোদাবক্স লাইব্রেরী থেকেও একটি বই ছাপানো হয়েছে। তারপর সর্বশেষ প্রায় আঠারো বছর ধরে ঘরে বসে আমি স্বাধীনভাবে লেখালেখি করছি। আল্লাহর অশেষ রহমতে এটিও আমার জন্য খুব প্রশান্তিময় ভাবে কেটে যাচ্ছে। কোন বিষয়বস্ত্ত নিয়ে লিখব, কিভাবে লিখব-তা নিয়ে কোন বাঁধাধরা নিয়মের বাঁধনে পড়তে হয় না। অন্তর যা চায়, যেভাবে চায় সেভাবেই লিখতে পারি। সব মিলিয়ে আজ অবধি আল্লাহ আমার অন্তরটা পরিতৃপ্তির দৌলতে ভরিয়ে রেখেছেন। আল-হামদুলিল্লাহ।        

আত-তাহরীক :  জীবনের একটা বড় অংশ কাটিয়েছেন মাওলানা হানীফ নদভীর সাহচর্যে। তাঁর সম্পর্কে কিছু বলুন।

মাওলানা ইসহাক ভাট্টি :  হ্যা, জীবনের প্রায় ৪০ বছর সময় কেটেছে আমার মাওলানা হানীফ নদভী (রহঃ)-এর সাথে। কুরআন, হাদীছ, ফিক্বহ এবং আরবী সাহিত্যের একজন বড় পন্ডিত তো ছিলেনই। সেই সাথে মানত্বিক এবং নব্য ও প্রাচীন দর্শন সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা রাখতেন। উর্দূ সাহিত্যেও ছিল তাঁর ভাল দখল। শব্দের এক বড় ভান্ডার যেমন সুরক্ষিত ছিল তাঁর মস্তিষ্কে; তেমনি কোথায়, কিভাবে তা ব্যবহার করতে হয় সে ব্যাপারেও ছিলেন সচেতন। স্বচ্ছ চিন্তা এবং সুমিষ্ট ভাষার অধিকারী একজন আলেম ছিলেন তিনি। ইসলামী দর্শন বিষয়ক তাঁর প্রবন্ধসমূহ পড়লে মনে হয় তিনি যেন দর্শনকে সাহিত্য বানিয়ে ফেলেছেন। নতুন আঙ্গিকে নতুন নতুন কথা বলতেন তিনি। সমালোচক ও লেখক হিসাবে তিনি অনেক উঁচুমাপের মানুষ ছিলেন। তাঁর লেখা একটি বইয়ের নাম ‘মির্যাইয়াত : নায়ে যাভিউঁ সে’ (কাদিয়ানী মতবাদ : নব দৃষ্টিকোণ থেকে)। এই বইয়ে তিনি সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে কাদিয়ানী মতবাদ সম্পর্কে আলোচনা করেন। তাদেরকে কাফির ঘোষণা করার দাবী তো সকলেই করে থাকে। তাই তিনি ১৯৫০ সালে আল-ই‘তিছাম’ পত্রিকায় একটি কলাম লিখে তাদেরকে ‘সংখ্যালঘু’ হিসাবে ঘোষণা করার দাবী করেন। পাকিস্তানে তিনিই প্রথম এই দাবী তোলেন।

আত-তাহরীক : আপনার ঘরের দেয়ালে ‘মুআররিখে আহলেহাদীছ’ লেখা একটি বড় শিল্ড ঝুলানো দেখতে পাচ্ছি।

মাওলানা ইসহাক ভাট্টি :  হাহা...এটা কিছু মানুষ বলা শুরু করেছে। আমি এমন কী আর করেছি! যা হোক ২০০৮ সালে কুয়েতে ‘জমঈয়তে এহইয়াউত তুরাছ আল-ইসলামী’-এর কনফারেন্স হলে সেখানকার পাকিস্তানী আহলেহাদীছ সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। আমি সেখানে আমন্ত্রিত ছিলাম। অনুষ্ঠানে মারকায দাওয়াতুল জালিয়াতের পক্ষ থেকে আমাকে ‘মুআররিখে আহলেহাদীছ’ খেতাব সম্বলিত এই শিল্ডটি প্রদান করেন ‘এহইয়াউত তুরাছ’-এর প্রধান জনাব তারেক সামী সুলতান আল-ঈসা।        

আত-তাহরীক :  আহলেহাদীছদের মধ্যে এ দেশে যথেষ্ট সাংগঠনিক বিভক্তি বিদ্যমান। এ সম্পর্কে কিছু বলবেন কি? এ সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কি?

মাওলানা ইসহাক ভাট্টি :  ১৯৪৮  সালে  যখন  স্বাধীন পাকিস্তানে মারকাযী জমঈয়তে আহলেহাদীছ প্রতিষ্ঠা লাভ করে তখন লাহোরে আহলেহাদীছ মসজিদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩টি। মসজিদে চিনাওয়ালী, মসজিদে মুবারক এবং মসজিদে লিচুরেওয়ালী। এখন তো লাহোরে রয়েছে ৩০০-এর বেশী আহলেহাদীছ মসজিদ। এ দৃষ্টিকোণ থেকে আহলেহাদীছ আন্দোলনের কার্যক্রম যে অনেক বেশী সম্প্রসারিত হয়েছে প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের চেয়ে তা বলাই বাহুল্য। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হল, তুচ্ছ মাসআলাগত কারণে, কখনওবা ব্যক্তিত্বের সংঘাতের কারণে কিংবা অনেক সময় নীতিগত মতপার্থক্যের কারণে আহলেহাদীছ জামা‘আত এখন অনেক দলে বিভক্ত হয়ে গেছে, যেটা পূর্বে ছিল না। এর সমাধান আমার জানা নেই। আরও দুঃখজনক ব্যাপার হ’ল যে আহলেহাদীছ আলেমগণ ঐক্যের উপর সবচেয়ে বেশী আলোচনা করে থাকেন, বাস্তবে তারাই এ ব্যাপারে অটুট থাকতে পারেন না। সুতরাং এ ব্যাপারে একজন সাধারণ মানুষ হিসাবে আমার বিশেষ কিছু বলার নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে সকলের সাথেই সম্পর্ক রাখি, সকলেই আমার সাথে সম্পর্ক রাখেন। আমি মনে-প্রাণে কেবল আল্লাহর কাছে দোআ করি আর কামনা করি যে, এই বিভক্তি যেন দাওয়াতী কর্মকান্ডে কোনরূপ বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।           

আত-তাহরীক : বাংলাদেশের আহলেহাদীছদের প্রতি আপনার বার্তা কি?

মাওলানা ইসহাক ভাট্টি :   নছীহত করার যোগ্যতা আমার নেই। এই আন্দোলন অব্যাহত থাকুক এটাই কেবল কামনা করি। আহলেহাদীছদের জ্ঞানী-গুণী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাক, সমাজ পরিবর্তনের জন্য যোগ্য মানুষ তৈরী হোক এই দো‘আই করছি।          

আত-তাহরীক :  এতক্ষণ সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। জাযাকাল্লাহ খায়রান।

মাওলানা ইসহাক ভাট্টি :  আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

 

 

 

HTML Comment Box is loading comments...