প্রশ্নোত্তর

দারুল ইফতা

হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

প্রশ্ন (১/২০১) : ওমর (রাঃ)-এর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে কুরআন মাজীদের মোট কতটি আয়াত নাযিল হয়? প্রেক্ষাপট সহ জানিয়ে বাধিত করবেন।

-আব্দুস সুবহান

বিরল, দিনাজপুর।

উত্তর : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলতেন, আল্লাহ তা‘আলা ওমরের যবানে ও হৃদয়ে সত্য প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছেন (তিরমিযী হা/৩৬৮২, হাদীছ ছহীহ)। এক্ষণে ৬টি বিষয়ে ওমর (রাঃ)-এর প্রস্তাবের সমর্থনে কুরআনে আয়াত নাযিল হয়েছে, যা ছহীহ হাদীছহসমূহ দ্বারা প্রমাণিত। যেমন (১) বদর যুদ্ধের ৭০ জন বন্দীর ব্যাপারে ওমর (রাঃ)-এর পরামর্শ ছিল তাদেরকে হত্যা করা। পরে তাঁর মতের সমর্থনে আল্লাহ সূরা আনফালের ৬৭-৬৯ আয়াত নাযিল করেন (মুসলিম হা/১৭৬৩)। (২) মক্কা বিজয়ের দিন রাসূল (ছাঃ) যখন মাকামে ইবরাহীমের কাছে দাঁড়ালেন, তখন ওমর (রাঃ) তাঁকে বলেন, আমরা কি মাক্বামে ইবরাহীমকে ছালাতের স্থান বানিয়ে নিতে পারি না?... তখন সূরা বাক্বারার ১২৫ আয়াতটি নাযিল হয়।

(৩) একদা তিনি রাসূল (ছাঃ)-কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার স্ত্রীগণের নিকট ভালো-মন্দ সব ধরনের লোক প্রবেশ করে। অতএব আপনি যদি তাদেরকে পর্দা করার নির্দেশ দিতেন!... এরপর উম্মাহাতুল মুমিনীনদের পর্দা ফরয করে সূরা আহযাবের ৫৩ আয়াতটিনাযিল হয়। (৪) হাফছার নিকটে রাসূল (ছাঃ)-এর মধু খাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্ত্রীগণের মাঝে পরস্পরে হিংসার ঘটনা ঘটলে তিনি তাদেরকে তালাক দেয়ার ধমকি দেন। অতঃপর তাঁর সমর্থনে সূরা তাহরীমের ৫ আয়াতটি নাযিল হয় (বুখারী হা/৪০২, মুসলিম হা/২৩৯৯, মিশকাত হা/৬০৪২)। (৫) ওমর (রাঃ) মুনাফিক  নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের জানাযার ছালাতে বাধা দেওয়ার পরেও রাসূল (ছাঃ) তা আদায় করেন। তখন আল্লাহ ওমরের সমর্থনে সূরা তাওবার ৮৪ আয়াতটি নাযিল করেন এবং মুনাফিকদের জানাযায় অংশগ্রহণে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেন (বুখারী হা/১৩৬৬, তিরমিযী হা/৩০৯৭)। (৬) ওমর (রাঃ)-এর আকাংখা মাফিক আল্লাহ তা‘আলা মদ নিষিদ্ধের আয়াত নাযিল করেন (আবুদাউদ হা/৩৬৭০; তিরমিযী হা/৫৫৪০; নাসাঈ হা/৩০৪৯)। এছাড়া আরো কয়েকটি আয়াত নাযিলের ব্যাপারে তাফসীর গ্রন্থ সমূহে বর্ণিত হয়েছে, যা ছহীহ সনদে প্রমাণিত নয়।

প্রশ্ন (২/২০২) : জনৈক ব্যক্তি আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৬/৩৭০ পৃষ্ঠায় বর্ণিত ‘আলা ইবনুল হাযরামী কর্তৃক লোকদেরকে  নিয়ে  একত্রিত  মুনাজাত  করার  ঘটনাটিকেসম্মিলিত মুনাজাতের পক্ষে দলীল হিসাবে উল্লেখ করেছেন। এর সত্যতা জানতে চাই।

-রূহুল আমীন, দুবাই।

উত্তর : প্রথমতঃ এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা, যা সনদ বিহীনভাবে বর্ণিত হয়েছে। আর ঐতিহাসিক ও সনদ বিহীন কোন বক্তব্যকে শরী‘আতের দলীল হিসাবে গ্রহণ করা যায় না (সৈয়ূত্বী, আল-ইতক্বান ফী উলূমিল কুরআন ২/২২৭-২২৮ পৃঃ)। সনদ থাকার পরেও তা যঈফ হওয়ার কারণে যেখানে হাদীছ গ্রহণযোগ্য হয় না, সেখানে কোন ইবাদতের ক্ষেত্রে উক্ত ঘটনা দলীল হিসাবে গ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রশ্নই আসে না।

দ্বিতীয়তঃ এই দো‘আটি ছিল মূলতঃ ইস্তিস্কা বা পানি প্রার্থনার জন্য। আর পানি প্রার্থনার জন্য হাত তুলে সম্মিলিতভাবে দো‘আ করার বিষয়টি ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত (বুখারী হা/১০৯২, ‘ইস্তিস্কা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-২১)। ঘটনাটি হ’ল, বাহরাইন যুদ্ধের প্রাক্কালে মুসলিম সেনাবাহিনী এমন এক স্থানে অবতরণ করে যেখানে পানি সংকটের কারণে তাদের থাকা কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। এমনকি তাদের উটগুলো তাদের খাদ্য সামগ্রী-পানীয় ও বস্ত্র সমূহ পিঠে করে নিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল। ফলে তাদের সাথে তাদের পরনের কাপড় ছাড়া আর কিছুই বাকী ছিল না। তখন ছাহাবী ‘আলা ইবনুল হাযরামী (রাঃ) লোকদের নিয়ে ফজরের ছালাত আদায় করেন ও সূর্যোদয় পর্যন্ত দো‘আ করতে থাকেন। তিনি যখন দো‘আর তৃতীয় পর্যায়ে পৌঁছলেন, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য তাদের পাশে একটি শীতল পানির পুকুর সৃষ্টি  করে দিলেন। অতঃপর তিনি সহ সকলে সেখানে গেলেন এবং পানি পান করলেন ও গোসল করলেন। ওদিকে দিনের আলো প্রস্ফুটিত হ’তে না হ’তেই তাদের উটগুলো পিঠের বোঝা সহ বিভিন্ন দিক থেকে ফিরে আসল। অথচ তাদের আসবাবপত্রের একটিও হারায়নি। অতঃপর তারা তাদের উটগুলোকে উদর পূর্তি করে পানি পান করালেন (আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৬/৩২৮)

অতএব স্পষ্ট যে, উক্ত ঘটনাটি ছিল পানি প্রার্থনার সাথে সংশ্লিষ্ট। প্রচলিত মুনাজাতের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

প্রশ্ন (৩/২০৩) : মহিলাদের জন্য জুম‘আর ছালাত আদায় করা কি যরূরী? বিস্তারিত জানতে চাই।

-সোহেল রাণা, মালয়েশিয়া।

উত্তর : মহিলাদের জন্য জুম‘আর ছালাত ফরয নয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, জুম‘আর ছালাত প্রত্যেক মুসলমানের উপর জামা‘আতে আদায় করা ওয়াজিব। কিন্তু গোলাম, মহিলা, শিশু ও রোগী ব্যতীত (আবুদাঊদ হা/১০৬৭, মিশকাত হা/১৩৭৭; ইরওয়া হা/৫৯২)। এছাড়া সকল ছালাত বাড়িতে আদায় করাই মহিলাদের জন্য উত্তম (আবুদাঊদ হা/৫৬৭, মিশকাত হা/১০৬২)। তবে তারা জুম‘আর খুৎবা ও জামা‘আতে যোগদান করতে পারেন। যেমন বায়‘আতে রিযওয়ানে যোগদানকারিণী ছাহাবী উম্মে হিশাম বিনতে হারেছাহ (রাঃ) বলেন, আমি সূরা ক্বাফ (প্রথমাংশ) মুখস্থ করেছি রাসূল (ছাঃ)-এর যবানী থেকে, যা তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে প্রতি জুম‘আর খুৎবায় পাঠ করতেন’ (মুসলিম হা/৮৭৩; মিশকাত হা/১৪০৯)। অতএব মহিলাদের জন্য এটি এখতিয়ারী বিষয়। কারণ তাতে তারা অনেক উপদেশ  লাভ করতে পারেন (মির‘আত ৪/৪৯৮)

প্রশ্ন (৪/২০৪) : জনৈকা মহিলা তার বর্তমান স্বামীকে ছেড়ে দিয়ে পূর্বের প্রেমিককে বিবাহ করতে চায়। এক্ষণে বর্তমান স্বামীকে ত্যাগ করে নতুন বিবাহের ক্ষেত্রে শরী‘আতের নির্দেশনা কি?

রাশেদুল ইসলাম, ঢাকা।

উত্তর : যথাযোগ্য শারঈ কারণ ব্যতীত স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাক চাওয়া হারাম। কোন স্ত্রী এরূপ করলে তার জন্য জান্নাতের সুগন্ধি হারাম হয়ে যাবে (আবুদাউদ হা/২২২৬; ইবনু মাজাহ হা/২০৫৫; তিরমিযী হা/১১৮৭; মিশকাত হা/৩২৭৯)। এক্ষণে কোন শরী‘আতসম্মত কারণ থাকলে উক্ত মহিলা সমাজের দায়িত্বশীল বা আদালতের মাধ্যমে বর্তমান স্বামীকে মোহর ফেরত দিয়ে ‘খোলা’ করতে পারে (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩২৭৪)। অতঃপর একমাসের ইদ্দত গণনা শেষে অন্যত্র বিবাহ করতে পারবে (বুখারী হা/৫২৭৩, মিশকাত হা/৩২৭৪, আবুদাঊদ হা/২২২৯-৩০)। স্মর্তব্য যে, বৈধ অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত কোন মহিলা এরূপ বিবাহ করলে, তা বাতিল বলে গণ্য হবে (আবুদাঊদ হা/২০৮৩, ইবনু মাজাহ হা/১৮৭৯, মিশকাত হা/৩১৩১)

প্রশ্ন (৫/২০৫) : খাদ্যগ্রহণের আদব কি কি?

-মুহাম্মাদ ছানাউল্লাহ, রাজশাহী।

উত্তর : খাদ্য গ্রহণের আদবসমূহ হ’ল : (১) হালাল ও পবিত্র রূযী খাবে (বাক্বারাহ ২/১৬৮)। (২) অতঃপর হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিবে (তুহফাতুল আহওয়াযী ৫/৪৮৫)।(৩) বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া শুরু করবে (আবুদাউদ হা/৩৭৬৭; ইরওয়া হা/১৯৬৫)। (৪) অতঃপর ডান হাত দিয়ে খাবে এবং পান করবে (মুসলিম হা/২০২০; মিশকাত হা/৪১৬২)। (৫) পাত্রের মধ্যস্থল থেকে খাবে না বরং নিকট থেকে খাবে (বুখারী হা/৫৩৭৬, তিরমিযী হা/১৮০৫; মিশকাত হা/৪১৫৯, ৪২১১)। (৬) প্রথমে বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে গেলে স্মরণ হলেই ‘বিসমিল্লাহি আউয়ালাহূ ওয়া আখেরাহূ’ বলবে (আবুদাউদ হা/৩৭৬৭; মিশকাত হা/৪২০২)। (৭) প্লেট এবং আঙ্গুল ভালভাবে চেটে খাবে (মুসলিম হা/২০৩৪; আবুদাউদ হা/৩৮৪৫)। (৮) যদি খাবার পড়ে যায় তাহলে তা উঠিয়ে ছাফ করে খেয়ে নিবে। কারণ সে জানে না কোন খাবারে বরকত আছে (মুসলিম হা/২০৩৪; তিরমিযী হা/১৮০৩) (৯) একাকী না খেয়ে একত্রে খাবে। এতে বরকত রয়েছে। (আবুদাউদ হা/৩৭৬৪; মিশকাত হা/৪২৫২)। (১০) পান করার সময় পাত্রের বাইরে ৩ বার নিঃশ্বাস ফেলবে (বুখারী হা/৫৬৩১;  ছহীহাহ হা/৩৮৭)। (১১) পানির পাত্রে বা খাবারে নিশ্বাস ছাড়বে না বা ফুঁক দিবে না। (বুখারী হা/১৫৩; মিশকাত হা/৪২৭৭)। (১২) দাঁড়িয়ে পানাহার করবে না (মুসলিম হা/২০২৬; মিশকাত হা/৪২৬৭)। (১৩) পেটের একভাগ খাদ্য দিয়ে ও একভাগ পানি দিয়ে ভরবে এবং একভাগ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য খালি রাখবে (তিরমিযী হা/২৩৮০)। (১৪) কাত হয়ে বা ঠেস দিয়ে খাবে না (বুখারী হা/৫৩৯৮; মিশকাত হা/৪১৬৮)। (১৫) খাওয়ার সময় পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে খাবে। অহেতুক গল্প-গুজব করবে না। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবে এবং শেষে বলবে আল-হামদুল্লিাহ এবং অন্যান্য দো‘আ পড়বে। (১৬) খাওয়া শেষে প্লেট বা দস্তরখান উঠানোর সময় বলবে, আলহামদুলিল্লা-হি হামদান কাছীরান ত্বাইয়েবাম মুবা-রাকান ফীহি’ (বুখারী, মিশকাত হা/৪১৯৯)। (১৭) দাওয়াত খেলে মেযবানে জন্য দো‘আ করে বলবে, আল্লা-হুম্মা আত্ব‘ইম মান আত্ব‘আমানী ওয়াসক্বি মান সাক্বা-নী’ (মুসলিম হা/২০৫৫; আহমাদ হা/২৩৮৬০ ‘সনদ ছহীহ’)

প্রশ্ন (৬/২০৬) : স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদের পর সন্তানের অধিকারী হবেন কে?

-আব্দুল ক্বাইয়ূম,

নবাবগঞ্জ, দিনাজপুর।

উত্তর : সন্তান মূলতঃ পিতার। তবে শৈশবে তার লালন-পালনের অধিকারী হ’লেন মা। কিন্তু মা অন্যত্র বিবাহ করলে তার এ অধিকার আর থাকে না। তখন সন্তান পিতার পূর্ণ দায়িত্বে থাকবে। আমর তাঁর পিতা শু‘আইব হ’তে, তিনি তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ এবং তিনি তার পিতা আমর ইবনুল আছ (রাঃ) হ’তে বর্ণনা করেন যে, জনৈক স্ত্রীলোক বলল, হে আল্লাহর রাসূল! এটি আমার ছেলে। আমার পেট ছিল তার পাত্র, আমার স্তন ছিল তার মশক এবং আমার কোল ছিল তার দোলনা। তার পিতা আমাকে তালাক দিয়েছে। সে এখন আমার ছেলে নিয়ে টানাটানি করছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘যতক্ষণ তুমি অন্যত্র বিবাহ না করবে, ততক্ষণ তুমিই তার অধিক হকদার’ (আহমাদ, আবুদাঊদ; মিশকাত হা/৩৩৭৮)।

তবে জ্ঞান-বুদ্ধি হওয়ার পর সন্তান যার নিকটে ইচ্ছা থাকতে পারে। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট জনৈকা স্ত্রীলোক এসে বলল, আমার স্বামী আমার ছেলে নিয়ে যেতে চায়। অথচ ছেলে আমার উপকার করে। সে আমাকে কূয়া থেকে পানি এনে দেয়। এসময় তার পিতা এলে নবী করীম (ছাঃ) ছেলেকে বললেন, ইনি তোমার পিতা আর ইনি তোমার মাতা- যাকে ইচ্ছা তুমি তার হাত ধর। ছেলে তার মায়ের হাত ধরল। অতঃপর মা তাকে নিয়ে চলে গেল’ (আবুদাঊদ, নাসাঈ; মিশকাত হা/৩৩৮০, সনদ ছহীহ)

ইমাম শাওকানী বলেন, ‘হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ছেলে হৌক বা মেয়ে হৌক, সন্তানের ভাল-মন্দ বুঝার জ্ঞান হওয়ার পর যদি পিতা-মাতা সন্তান গ্রহণের ক্ষেত্রে মতভেদ করেন, তাহ’লে সন্তানকে এখতিয়ার দেওয়াই শরী‘আত সম্মত’ (নায়লুল আওত্বার ৮/১৬০ পৃঃ, ‘সন্তান পালনের অধিক হকদার কে?’ অনুচ্ছেদ)

তবে মা কাফির হয়ে গেলে, মুসলিম সন্তানের উপরে তার কোন হক থাকবে না। আল্লাহ বলেন, আল্লাহ কাফিরদের জন্য মুমিনদের উপরে কোন অধিকার রাখেননি’ (নিসা ৪/১৪১)। ইবনুল ক্বাইয়িম বলেন, সন্তানকে এখতিয়ার দেওয়ার পূর্বে তার অধিকতর কল্যাণ বিবেচনা করা কর্তব্য। কেননা আল্লাহ বলেন, তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও (তাহরীম ৬)। তিনি তাঁর উস্তাদ ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, জনৈক সন্তান তার পিতার নিকটে যেতে চাইলে তার কারণ হিসাবে বলে যে, মা আমাকে মাদরাসায় পাঠায়, আর উস্তাদ আমাকে মারেন। কিন্তু আববা আমাকে খেলতে দেন। একথা শুনে বিচারক তাকে তার মায়ের কাছে পাঠাবার নির্দেশ দেন’ (নায়লুল আওত্বার ৮/১৬২)

প্রশ্ন (৭/২০৭) : অনেককেই দেখা যাচ্ছে পিস টিভি দেখা ও ওলামায়ে কেরামের বক্তব্য শোনার জন্য টেলিভিশন-ইন্টারনেট নিচ্ছেন। কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যরা এগুলির মাধ্যমে বিভিন্ন শরী‘আত বিরোধী কর্মকান্ডে জড়িয়ে যাচ্ছে। এক্ষণে পিতা হিসাবে আমাদের করণীয় কি?

-সুহাইল

শিবগঞ্জ, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।

উত্তর : পরিবার প্রধান হিসাবে পিতা পরিবারের সার্বিক ব্যাপারে দায়িত্বশীল (বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৩৬৮৫)। পরিবারকে প্রকৃত দ্বীন শিক্ষা দানের সাথে সাথে সকল প্রকার অশ্লীলতা থেকে দূরে রাখা তাঁর মৌলিক দায়িত্ব। এক্ষণে উপরোক্ত অবস্থায় টেলিভিশন-ইন্টারনেট কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এজন্য সম্ভব সকল প্রকার ব্যবস্থা তিনি গ্রহণ করবেন। অন্যথায় এগুলি সরিয়ে দিতে হবে। নইলে পরিবারের সদস্যদের গোনাহের কারণে দায়িত্বশীল হিসাবে পিতাও গোনাহগার হবেন।

প্রশ্ন (৮/২০৮) : গল্প-উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

-আব্দুর রহমান, উত্তরা, ঢাকা।

উত্তর : গল্প-উপন্যাস যদি ইসলামী আকবীদা বিরোধী না হয় এবং চরিত্র গঠন ও শিক্ষামূলক হয়, তবে তা লেখা যাবে। যেমন প্রয়োজনে শিক্ষামূলক কবিতা পড়া যায়। মা আয়েশা (রাঃ) বলেন, একদা কবিতা সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হ’লে তিনি বলেন, ‘এগুলি কিছু বাক্য মাত্র। অতএব এর ভালটি ভাল এবং মন্দটি মন্দ’ (দারাকুৎনী, মিশকাত হা/৪৮০৭ ‘শিষ্টাচারসমূহ’ অধ্যায় ‘বক্তৃতা ও কবিতা’ অনুচ্ছেদ)। তবে তা যদি নিছক খেল-তামাশা ও লোকদের হাসানোর উদ্দেশ্যে লেখা হয়, তবে জায়েয হবে না (উছায়মীন, ফাতাওয়া নূরুন আ‘লাদ-দারব ১/৩৩৫)। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘দুর্ভোগ ঐ ব্যক্তির জন্য যে কথা বলার সময় মিথ্যা বলে, যাতে লোকেরা হাসে’ (আবুদাউদ হা/৪৯৯০; মিশকাত হা/৪৮৩৪)

প্রশ্ন (৯/২০৯) : স্থাবর সম্পদ যেমন জমি, বাড়ি, গাছ-পালা এসবের যাকাত দিতে হবে কি?

-শাহাদত হোসাইন

ফুলবাড়িয়া, ময়মনসিংহ।

উত্তর : এসবের কোন যাকাত দিতে হবে না। তবে জমি থেকে উৎপাদিত ফসলের যাকাত দিতে হবে (বুখারী, মিশকাত হা/১৭৯৭)। শাক-সবজিতে কোন যাকাত নেই (তিরমিযী হা/৬৩৮; মিশকাত হা/১৮১৩)। বসবাসের জন্য নির্মিত বাড়িতে কোন যাকাত নেই। তবে বাড়ী বা দোকান থেকে প্রাপ্ত ভাড়া অথবা রিয়েল স্টেট ব্যবসার প্রাপ্ত লভ্যাংশ নিছাব পরিমাণ হ’লে এবং এক বছর অতিক্রান্ত হলে যাকাত দিতে হবে (আবুদাউদ হা/১৫৭৩; তিরমিযী হা/৬৩১)। গাছের কোন যাকাত নেই। তবে গাছ হতে উৎপন্ন শস্য নিছাব তথা পাঁচ ওয়াসাক্ব পরিমাণ হলে তাতে ২০ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে (বাক্বারাহ ২/২৬৭; মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৭৯৪)। উল্লেখ্য যে, ৫ ওয়াসাক্ব সমান ৬০ ছা‘ বা ৭৫০ কেজি।

প্রশ্ন (১০/২১০) : বিবাহের পর স্ত্রীর জন্য শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, না নিজ পিতা-মাতার সেবা করা অধিক যরূরী? এছাড়া স্বামী এবং নিজ পিতা-মাতার আদেশ-নিষেধের মাঝে বৈপরীত্য দেখা দিলে কার আদেশ-নিষেধ অগ্রাধিকার পাবে?

-মিলন সরকার

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

উত্তর : প্রত্যেক সন্তানের জন্য তার পিতা-মাতার সেবাযত্ন করাই সর্বাগ্রে যরূরী (ইসরা ১৭/২৩)। স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তার শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর খেদমতে বাধ্য করা উচিৎ নয়। তবে অবশ্যই তাদের সাথে সদাচরণ করা কর্তব্য। স্বামী এবং পিতা-মাতা উভয়ের আদেশ-নিষেধ মেনে চলা স্ত্রীর জন্য ওয়াজিব। তাই সাধ্যমত উভয়কে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করবে। এরপরেও যদি উভয়ের আদেশ-নিষেধের মাঝে বৈপরীত্য দেখা দেয়, সেক্ষেত্রে বৈষয়িক বিষয়ে স্বামীর আদেশকে অগ্রগণ্য করতে হবে। কেননা বিবাহের পূর্ব পর্যন্ত নারীরা পিতা-মাতার নিয়ন্ত্রণাধীনে থাকে। কিন্তু বিবাহের পর তারা স্বামীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সুতরাং সেসময় স্বামীর আদেশ-নিষেধ মান্য করাই তার জন্য অগ্রগণ্য হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, আমি যদি কাউকে কোন মানুষের সিজদা করার আদেশ দিতাম, তাহ’লে স্ত্রীকে তার স্বামীর সামনে সিজদা করতে বলতাম (আবুদাউদ হা/২১৪০; মিশকাত হা/৩২৫৫)। তিনি বলেন, ক্বিয়ামতের দিন সর্বাধিক শাস্তি প্রাপ্ত হবে দু’ধরনের মানুষ। তাদের একজন হ’ল, অবাধ্য স্ত্রী (তিরমিযী হা/৩৫৯, সনদ ছহীহ)। তবে উভয়ে উভয়ের অধিকারের প্রতি যত্নশীল থাকতে হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, তোমাদের উত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর নিকটে উত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীদের নিকটে উত্তম’ (তিরমিযী, দারেমী, মিশকাত হা/৩২৫২)

প্রশ্ন (১১/২১১) : শ্বশুরবাড়ির সকলেই বিড়ি তৈরীর ব্যবসা করে। এক্ষণে তাদের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া, উঠা-বসা জায়েয হবে কি?

-গোলাম মুক্তাদির

লক্ষ্মীনগর, ধুলিয়ান, মুর্শিদাবাদ, ভারত।

উত্তর : এর জন্য পাপের বোঝা শ্বশুরবাড়ীর লোকদের উপর বর্তাবে। আল্লাহ বলেন, একজনের পাপের বোঝা অন্যে বহন করবে না (নাজম ৫৩/৩৮)। ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, তার নিকটে জনৈক ব্যক্তি এসে বলল, আমার একজন প্রতিবেশী আছে যে সূদ খায় এবং সর্বদা আমাকে তার বাড়িতে খাওয়ার জন্য দাওয়াত দেয়। এক্ষণে আমি তার দাওয়াত কবুল করব কি? জওয়াবে তিনি বললেন, مَهْنَأَهُ لَكَ وَإِثْمُهُ عَلَيْهِ ‘তোমার জন্য এটি বিনা কষ্টের অর্জন এবং এর গোনাহ তার উপরে’ (মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক হা/১৪৬৭৫, ইমাম আহমাদ আছারটি ‘ছহীহ’ বলেছেন, জামেঊল উলূম ওয়াল হিকাম ২০১ পৃঃ)। এক্ষণে আত্মীয় হিসাবে আপনার দায়িত্ব হবে শ্বশুরবাড়ীর লোকদের হালাল রূযীর দিকে ফিরিয়ে আনার জন্য সাধ্যপক্ষে চেষ্টা করা। আপনার চেষ্টা সফল হ’লে তাদের নেকীর সমপরিমান নেকী আপনি পাবেন। আর সফল না হলেও আপনি দাওয়াতের পূর্ণ নেকী পেয়ে যাবেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি কাউকে কল্যাণের পথ দেখায়, সে ঐ কর্মীর ন্যায় ছওয়াব পায় (মুসলিম, মিশকাত হা/২০৯)

প্রশ্ন (১২/২১২) : ছালাতরত অবস্থায় অজান্তে বের হওয়া মযী ছালাত শেষ হওয়ার পর বুঝতে পারলে উক্ত ছালাত পুনরায় আদায় করতে হবে কি?

-তাওছীফ আহমাদ, মুর্শিদাবাদ, ভারত।

উত্তর : এমতাবস্থায় যদি দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে, ছালাতরত অবস্থাতেই মযী বের হয়েছে, তাহ’লে তাকে কাপড় ও শরীর উভয় স্থান থেকে মযী ধৌত করার পর ওযূ করে পুনরায় ছালাত আদায় করতে হবে। আর যদি কেবল সন্দেহ হয়, তবে পুনরায় ছালাত আদায় করতে হবে না। কারণ সন্দেহের দ্বারা পবিত্রতা নষ্ট হয় না (বুখারী হা/১৩৭, মুসলিম হা/৩৬২, মিশকাত হা/৩০৬)

আর এটা রোগে পরিণত হ’লে মযী বের হলেও ছালাত পরিত্যাগ করার প্রয়োজন নেই। সেক্ষেত্রে প্রত্যেক ছালাতের জন্য পৃথকভাবে ওযূ করতে হবে (বুখারী হা/২২৮, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৫৫৮; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৬৮ পৃঃ)। কারণ আল্লাহপাক মানুষের উপর সাধ্যের অতিরিক্ত কিছু চাপিয়ে দেননি (বাক্বারাহ ২৮৬)

প্রশ্ন (১৩/২১৩) : আযান দেওয়ার নির্দিষ্ট কোন স্থান কি শরী‘আত কর্তৃক নির্ধারিত রয়েছে? মসজিদ বা মসজিদের বাইরে যেকোন স্থান থেকে আযান দিলে চলবে কি?

-মাহতাব, গোপালনগর, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।

উত্তর : রাসূল (ছাঃ) আব্দুল্লাহ বিন যায়েদের স্বপ্নে পাওয়া আযানের বাক্যগুলো শুনে বললেন, তোমার স্বপ্ন সত্য, তুমি বেলালকে আযানের বাক্যগুলি শিখিয়ে দাও এবং তাকে আযান দিতে বল। কেননা বেলালের কণ্ঠস্বর তোমাদের সবার চেয়ে উঁচু (আবুদাউদ হা/৪৯৯; ইবনু মাজাহ হা/৭০৬; মিশকাত হা/৬৫০)। উরওয়া বিন যুবায়ের বনু নাজ্জারের জনৈকা মহিলা থেকে বর্ণনা করেন যে, মসজিদের পার্শ্ববর্তী আমার বাড়ী উঁচু ছিল। বেলাল তার উপরে উঠে ফজরের আযান দিতেন (আবুদাঊদ হা/৫১৯)। উল্লিখিত হাদীছ দুটি থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাসূল (ছাঃ)-এর যামানায় মসজিদের বাইরে আযান দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল দূরবর্তী মুছল্লীর কাছে আযানের আওয়ায পৌঁছানো। অতএব মাইকে আযান দিলে মসজিদের ভিতর সহ যেকোন স্থানে দাঁড়িয়ে আযান দেওয়া যাবে। আর মাইক না থাকলে মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে আযান দিবে। যাতে করে মানুষের কাছে আযানের আওয়ায পৌঁছে (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা ফৎওয়া নং ৩৬৩০, ৪৩৩৫)

প্রশ্ন (১৪/২১৪) : ছেলেদের রাগ কমানোর জন্য অনেকে কানফুল দিয়ে থাকে। এটা শরী‘আতসম্মত হবে কি?

-রায়হান,

খয়রাবাদ, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।

উত্তর : ইসলামী শরী‘আতে এরূপ চিকিৎসার কোন ভিত্তি নেই। বরং রাগ কমানোর চিকিৎসা হিসাবে রাসূল (ছাঃ) বলেন, তোমরা যখন রেগে যাবে তখন  আ‘ঊযুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বানির রাজীম পাঠ করবে (বুখারী হা/৬০৪৮; মুসলিম হা/২৬১০;, মিশকাত হা/২৪১৮)। অন্যত্র তিনি বলেন, এ সময় দাঁড়িয়ে থাকলে বসে যাবে এবং বসে থাকলে শুয়ে যাবে (আবুদাঊদ হা/৪৭৮২, মিশকাত হা/৫১১৪)উল্লেখ্য যে, ক্রোধ নিবারণে ওযূ করা সম্পর্কিত হাদীছটি যঈফ (আবুদাঊদ হা/৪৭৮৪, যঈফাহ হা/৫৮২)

প্রশ্ন (১৫/২১৫) : দাড়ির সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য অনেকে দাড়ি ছেটে সুন্দর করার চেষ্টা করেন এবং দলীল পেশ করে বলেন, আল্লাহ সৌন্দর্যকে পসন্দ করেন। সঊদী আরবের ওলামায়ে কেরামও নাকি এ ব্যাপারে একমত। এক্ষণে এটা জায়েয হবে কি?

-মীযানুর রহমান

তাহেরপুর, বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, তোমরা মুশরিকদের বিরোধিতা কর এবং দাড়িকে নিজের অবস্থায় ছেড়ে দাও। আর গোঁফ ছোট কর (বুখারী হা/৫৮৯২; মুসলিম হা২৫৯; মিশকাত হা/৪৪২১)দাড়ি ছাড়ার ব্যাপারে হাদীছে পাঁচ ধরনের শব্দ এসেছে। যেমন- (أَوْفِرُوا وَأَوْفُوا وَأَرْخُوا ,وَوَفِّرُوا) আওফিরূ, আওফূ, আরখূ, ওয়াফ্ফিরূ। এই শব্দগুলো একই মর্ম বহন করে। আর তা হ’ল, দাড়ি তার নিজ গতিতে ছেড়ে দেওয়া। দাড়ি কাটা বা ছাঁটার পক্ষে ছহীহ কোন দলীল নেই; বরং এটি রাসূল (ছাঃ)-এর আদর্শের পরিপন্থী। উল্লেখ্য যে, দাড়ি ছাঁটার পক্ষে তিরমিযীতে যে হাদীছ বর্ণিত হয়েছে তা জাল (তিরমিযী হা/২৭৬২; মিশকাত হা/৪৪৩৯; সিলসিলা যঈফাহ হা/২৮৮)

সউদী আরবের সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদ এ ব্যাপারে বলেন যে, দাড়ি মুন্ডন বা দাড়ির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ হ’তে কিছু কেটে নেওয়া বৈধ নয়। এটা রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাত বিরোধী কাজ (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমাহ ৫/১৩৭)শায়খ উছায়মীন (রহঃ) বলেন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর অনুসরণ করতে চায়, তারা যেন অবশ্যই দাড়ির কোন অংশ না কাটে। কেননা শেষনবী (ছাঃ) এবং তার পূর্বের কোন নবী দাড়ি কাট- ছাঁট করতেন না (উছায়মীন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১১/৮২)শায়খ বিন বায (রহঃ) বলেন, দাড়িকে তার নিজ অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া ওয়াজিব (বিন বায, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১০/৯৬-৯৭)অতএব সৌন্দর্যের দোহাই দিয়ে দাড়ি কাট-ছাঁট করার কোন সুযোগ নেই।

প্রশ্ন (১৬/২১৬) : তাবীয দিয়ে সাপের বিষ নামানো যাবে কি?

-মীযান, কলারোয়া, সাতক্ষীরা।

উত্তর : তাবীয দিয়ে কোন চিকিৎসা গ্রহণ করা যাবেনা। কারণ রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি তাবীয লটকালো, সে শিরক করল (আহমাদ হা/১৭৪৫৮; ছহীহাহ হা/৪৯২)আর শিরকের গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করেন না (নিসা ৪/৪৮)তবে সূরা ফাতিহা পাঠ করে ফুঁক দিয়ে সাপের বিষ নামানো শরী‘আতসম্মত (বুখারী হা/৫০০৭)। এছাড়া শরী‘আতবিরোধী নয়, এরূপ চিকিৎসা গ্রহণে কোন বাধা নেই।

প্রশ্ন (১৭/২১৭) : মহিলারা সর্বোচ্চ কত বছর বয়সের বালকের সাথে বিনা পর্দায় দেখা করতে পারবে?

-মুবাশশিরাহ

বিবিহাটরা, মোহনপুর, রাজশাহী।

উত্তর : নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ নাবালকদের সাথে মহিলারা বিনা পর্দায় সাক্ষাৎ করতে পারে (নূর ২৪/৩১)। আবহাওয়াগত ভিন্নতার কারণে সাবালক হওয়ার বয়সে ভিন্নতা দেখা দেয়। অতএব শিশুর মধ্যে সাবালক হওয়ার আলামত পাওয়া গেলে তার থেকে পর্দা করতে হবে।

প্রশ্ন (১৮/২১৮) : জনৈক ব্যক্তি বলেন, ‘মহিলাদের পবিত্রতা অর্জনের জন্য প্রথমে ঢিলা-কুলুখ ব্যবহারের পর পানি ব্যবহার করতে হবে। এ বক্তব্যের কোন সত্যতা আছে কি?

-মাজেদা বেগম, চুনাঘাট, লালমণিরহাট।

উত্তর : উক্ত বক্তব্য ভিত্তিহীন। পুরুষ-মহিলা সকলের জন্য পবিত্রতা অর্জনের প্রধান মাধ্যম হ’ল পানি। পানি না থাকলে ঢেলা বা ক্ষতিকর নয় এরূপ টিস্যু ব্যবহার করতে হবে। সূরা তওবার ১০৯ আয়াতে পবিত্রতা অর্জনের কারণে আল্লাহ যাদের প্রশংসা করেছেন, তারা পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করতেন (আবুদাঊদ হা/৪৪, সনদ ছহীহ)। উল্লেখ্য যে, আগে ঢেলা বা টিস্যু দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করতে হবে এবং পরে পানি ব্যবহার করতে হবে মর্মে মুসনাদে বাযযারে যে বর্ণনা এসেছে, তা মওযূ‘ বা জাল (ইরওয়াউল গালীল হা/৪২-এর আলোচনা দ্রঃ)

প্রশ্ন (১৯/২১৯) : রাতে ঘুমানোর সময় ওযূ করার বিশেষ কোন ফযীলত আছে কি?

-নার্গিস সুলতানা, মধ্য বাড্ডা, ঢাকা।

উত্তর : রাতে ঘুমানোর সময় ওযূ করা অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ কাজ। বারা ইবনে আযেব (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জনৈক ব্যক্তিকে বলেন, যখন তুমি শুতে যাবে, তখন ছালাতের মত ওযূ কর এবং ডান কাতে শয়ন করো। অতঃপর তাকে একটি দো‘আ শিখিয়ে বললেন, ‘যদি তুমি এ অবস্থায় মারা যাও, তবে তুমি ইসলামী স্বভাবের উপর মারা যাবে। আর যদি সকাল কর তাহলে কল্যাণের উপর সকাল করবে (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৩৮৫)। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি ওযূ অবস্থায় ঘুমায়, তার পাশে একজন ফেরেশতা অবস্থান করে। যখন সে জাগ্রত হয়, তখন ফেরেশতা বলে, হে আল্লাহ! তুমি তোমার এই বান্দাকে ক্ষমা করে দাও। কারণ সে পবিত্র অবস্থায় ঘুমিয়েছিল (ছহীহ ইবনু হিববান হা/১০৫১; ছহীহাহ হা/২৫৩৯)

প্রশ্ন (২০/২২০) : স্ত্রীর চাকুরী অথবা ব্যবসার আয়ের অর্থের উপর স্বামীর হক আছে কি? স্বামী স্ত্রীর অর্থের হিসাব রাখতে পারবে কি? এছাড়া স্ত্রী স্বামীকে না জানিয়ে তার পিতার বাড়িতে কোন খরচ করতে পারবে কি?

আরীফুল ইসলাম, ছোট বনগ্রাম, রাজশাহী।

উত্তর : স্ত্রীর সম্পদের উপর স্বামীর কোন হক নেই। তবে স্ত্রীর মৃত্যুর পর স্বামী তার সম্পদের উত্তরাধিকারী হবেন। স্বামী স্ত্রীর অর্থের হিসাব রাখতে পারেন, কেবল দ্বীনী দায়িত্ব হিসাবে। স্ত্রী তার স্বামীকে না বলে তার পিতার বাড়ীতে খরচ করতে পারে। তবে স্বামীর পরামর্শ ও অনুমতি নিয়ে ব্যয় করা উচিৎ। কেননা আল্লাহ তা‘আলা পরস্পরে পরামর্শ সাপেক্ষে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন (আলে ইমরান ৩/১৫৯)

প্রশ্ন (২১/২২১) : একই রাক‘আতে কয়েকটি সূরা পাঠ করায় শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

-মুবাশশির, মীরপুর, ঢাকা।

উত্তর : একই রাক‘আতে একাধিক সূরা পাঠ করায় কোন বাধা নেই। রাসূল (ছাঃ) একই রাক‘আতে পরপর দু’টি বা ততোধিক সূরা পাঠ করেছেন (মুসলিম হা/৭৭২, নাসাঈ হা/১৬৬৪)। এছাড়া একই রাক‘আতে একাধিক সূরা পাঠের বিষয়টি বিভিন্ন ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত (বুখারী হা/৭৪২, আবুদাঊদ হা/১৩৯৬; দ্রঃ ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ১০১ পৃঃ)

প্রশ্ন (২২/২২২) : আমি ২০১৩ সালে স্ত্রীকে মৌখিকভাবে এক তালাক  দেই। অতঃপর ৩দিন পর তাকে ফিরিয়ে নিয়ে সংসার করতে থাকি। কিন্তু ২০১৪ সালে কোর্টের মাধ্যমে পুনরায় তালাক প্রদান করি এবং তালাকনামার কপি ডাকের মাধ্যমে স্ত্রীর পিতার বরাবরে প্রেরণ করি। সে গ্রহণ না করলেও জানতে পেরেছে। অতঃপর ৩ মাস পর ঐ তালাকের জাবেদা কপি পুনরায় স্ত্রীর পিতার বাড়ীতে প্রেরণ করি। উল্লেখ্য, ২য় তালাক দেওয়ার পর থেকেই স্ত্রীর সাথে আমার সম্পর্ক নেই। এক্ষণে এটা কি তিন তালাক হিসাবে গণ্য হবে?

-মুহাম্মাদ সাফিউল ইসলাম

গোদাগাড়ী, রাজশাহী।

উত্তর : প্রশ্নে উল্লেখিত বিবরণ অনুযায়ী ২য় তালাক দেওয়ার পর ইদ্দতকাল তথা তিন মাসের মধ্যে স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নেওয়ায় বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেছে (বাক্বারাহ ২/২২৯)। এমতাবস্থায় স্বামী-স্ত্রী পরস্পরে সম্মত হ’লে নতুন বিবাহের মাধ্যমে পুনরায় ঘর-সংসার করতে পারে (বাক্বারাহ ২/২৩২; তালাক ৩৫/১; বুখারী হা/৫১৩০)

তবে তিন তুহরে তিন তালাক প্রদান করলে এ সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়, যতক্ষণ না সে অন্যত্র বিবাহ করে ও সেখান থেকে স্বাভাবিকভাবে তালাকপ্রাপ্তা হয় (বাক্বারাহ ২/২৩০)। উল্লেখ্য, প্রশ্নকারী দ্বিতীয় তালাকের ইদ্দতকাল অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পর ৩য় তালাক প্রদান করায় তা গণ্য হবে না। কারণ তালাক দিতে হয় ইদ্দতকালের মধ্যে। আল্লাহ বলেন, ‘আর তাদেরকে তালাক দাও ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে এবং ইদ্দত গণনা কর’ (তালাক ৬৫/১)। আবদুল্লাহ্ ইবনু ওমর (রাঃ) স্বীয় স্ত্রীকে ঋতু অবস্থায় তালাক দিলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে ফিরিয়ে নিয়ে ইদ্দতের মধ্যে তালাক দেওয়ার নির্দেশ দেন (বুখারী হা/৫২৫১, মুসলিম হা/১৪৭১)। কেননা ঋতু অবস্থায় তালাক দেওয়া জায়েয নয় (বিস্তারিত দ্রঃ ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা ২০/১৪৭, ফৎওয়া নং ৮২৫)

প্রশ্ন (২৩/২২৩) : অজান্তে কবরযুক্ত মসজিদে ছালাত আদায় করে পরবর্তীতে জানতে পারলে উক্ত ছালাত পুনরায় আদায় করতে হবে কি?

-যুবায়ের, ময়মনসিংহ।

উত্তর : অজান্তে কবরযুক্ত মসজিদে ছালাত আদায় করে ফেললে তা পুনরায় আদায় করতে হবে না। আল্লাহ বলেন, ‘যা তোমাদের ভুলবশতঃ ঘটে সে বিষয়ে আল্লাহ তোমাদের পাকড়াও করবেন না (আহযাব ৩৩/৫)

তবে এর জন্য তওবা ও ইস্তেগফার করবে। যেন পুনরায় এরূপ ভুল না হয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, গোনাহ থেকে তওবাকারী ঐ ব্যক্তির মত, যার কোন গোনাহ নেই (ত্বাবারাণী, ছহীহুল জামে‘ হা/৬৮০৩)। স্মর্তব্য যে, ছালাত পুনরায় আদায় করতে হয় কেবল ছালাতের রুকনসমূহের কোন একটি তরক হলে।

প্রশ্ন (২৪/২২৪) : নাপিতের পেশা শরী‘আতসম্মত কি?

-আশরাফুল ইসলাম

তাহেরপুর, বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর : নাপিতের পেশা বৈধ। নববী যুগে এর প্রচলন ছিল (বুখারী হা/৪১৯০, মিশকাত হা/৪৪৬২)। তবে এ পেশায় থেকে দাড়ি কেটে বা ছেটে দেওয়ার ন্যায় গর্হিত কাজ থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। কেননা এতে অন্যায় কাজে সহায়তা করার পাপ হবে। যা থেকে আল্লাহ নিষেধ করেছেন (মায়েদাহ ৫/২)

প্রশ্ন (২৫/২২৫) : প্রতি শুক্রবার ফজরের ছালাতে সূরা সাজদাহ ও দাহর তিলাওয়াতের কোন গুরুত্ব আছে কি?

-মাসঊদ, মেহেরপুর।

উত্তর : শুক্রবার ফজরের ফরয ছালাতে সূরা দু’টি পাঠ করা সুন্নাত। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) এ দু’টি সূরা জুম‘আর দিন ফজরে নিয়মিত তেলাওয়াত করতেন (বুখারী হা/৮৯১, মুসলিম হা/৮৮০, মিশকাত হা/৮৩৮)। তবে অন্য সূরা পড়াও জায়েয আছে (মির‘আত ৩/১৪৫)। এছাড়া রাসূল (ছাঃ) সুরা সাজদা ও মুলক না পড়ে রাতে ঘুমাতেন না (তিরমিযী হা/৩৪০৪, মিশকাত হা/২১৫৫, ছহীহুল জামে‘ হা/৪৮৭৩)

প্রশ্ন (২৬/২২৬) : বিদেশে অমুসলিমদের যবেহকৃত পশুর গোশত খাওয়া জায়েয হবে কি?

-আহসান হাবীব, দক্ষিণ কোরিয়া।

উত্তর : দেশে হৌক আর বিদেশে হৌক অমুসলিমদের যবেহকৃত পশুর গোশত খাওয়া হালাল নয়। কেননা তা হালাল হওয়ার শর্ত হল, ‘বিসমিল্লাহ’ বলে যবেহ করা (আন‘আম ৬/১২১)। তবে আহলে কিতাবদের (ইহূদী এবং খৃষ্টানদের) যবেহ করা পশু খাওয়া জায়েয (মায়েদাহ ৫/৫)। শর্ত হ’ল যদি তারা আল্লাহর নামে যবেহ করে (বাক্বারাহ ২/১৭৩, আন‘আম ৬/১২১)। আর যদি এমন দেশে বসবাস করা হয়, যে দেশে মুসলিম ও আহলে কিতাব একত্রে বসবাস করে এবং যবহের সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলেছে কি-না সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া না যায়, সেক্ষেত্রে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে খাওয়া যেতে পারে (বুখারী হা/৭৩৯৮; আবুদাউদ হা/২৮২৯; মিশকাত হা/৪০৬৯)। তবে সন্দেহ থেকে দূরে থাকার জন্য তা বর্জন করাই উত্তম। রাসূল (ছাঃ) বলেন, হালাল স্পষ্ট, হারামও স্পষ্ট। এর মধ্যবর্তী বিষয়সমূহ অস্পষ্ট, যা অনেক মানুষ জানে না। অতএব যে ব্যক্তি সন্দিগ্ধ বস্ত্তসমূহ থেকে বেঁচে থাকবে, সে ব্যক্তি তার দ্বীন ও সম্মানকে পবিত্র রাখলো। আর যে ব্যক্তি সন্দিগ্ধ কাজে লিপ্ত হ’ল, সে হারামে পতিত হ’ল (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৭৬২)। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ‘তুমি সন্দেহযুক্ত বিষয় থেকে নিঃসন্দেহের দিকে ধাবিত হও’ (তিরমিযী হা/২৫১৮; নাসাঈ হা/৫৭১১; মিশকাত হা/২৭৭৩)

প্রশ্ন (২৭/২২৭) : মাসিক অবস্থায় ভুল বা অজ্ঞতাবশতঃ স্ত্রী সহবাস করে ফেললে করণীয় কি?

-সারোয়ার

মুন্সির হাট, ধোবাউড়া, ময়মনসিংহ।

উত্তর : এরূপ অবস্থায় কোন গুনাহ হবে না বা কোন কাফফারাও ওয়াজিব হবে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা আমার উম্মতের ভুলবশতঃ ও বাধ্যগত অবস্থায় কৃত অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছেন’ (ইবনু মাজাহ হা/২০৪৫, মিশকাত হা/৬২৮৪)। তবে নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে এরূপ করলে তওবা করতে হবে এবং এক দীনার বা অর্ধ দীনার ছাদাক্বা করতে হবে (আবুদাঊদ হা/২৬৪; মিশকাত হা/৫৫৩)

প্রশ্ন (২৮/২২৮) : মেমোরী কার্ডে গান, ভিডিও, ইসলামী বক্তব্য ইত্যাদি লোড দেওয়ার ব্যবসা করা জায়েয হবে কি?

-জসীমুদ্দীন

কাঠিগ্রাম, কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ।

উত্তর : যে সব ব্যবসা মানুষকে মন্দের দিকে নিয়ে যায় তা থেকে বেঁচে থাকাই উত্তম। এ ব্যবসার নেতিবাচক দিক হ’ল এর মাধ্যমে অন্যায়-অশ্লীলতা দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে।  যদিও এটি দ্বীন প্রচারেও সহায়ক ভুমিকা পালন করে থাকে। তবে মন্দটি পরিত্যাগ করে এ ব্যবসা করায় কোন বাধা নেই। আল্লাহ বলেন, তোমরা সৎ ও তাক্বওয়ার কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা কর আর গুনাহ ও পাপ কাজে সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাক (মায়েদাহ ৫/২)

প্রশ্ন (২৯/২২৯) : আমাদের দেশে বিবাহ পড়ানোর সময় একই গ্লাসে একই শরবত বর ও কনেকে খাওয়ানো হয়। এগুলি জায়েয হবে কি?

-রাশেদুল ইসলাম, নরসিংদী।

উত্তর : এভাবে খাওয়ানোর মাধ্যমে আল্লাহ বর-কনের মধ্যে অধিক ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিবেন বলে যদি কোন আক্বীদা থাকে, তবে তা জায়েয নয়। বরং কুসংস্কার মাত্র। তবে সাধারণভাবে এরূপ খাওয়ায় কোন বাধা নেই। রাসূল (ছাঃ) ও আয়েশা (রাঃ) একই পাত্রের একই স্থানে মুখ রেখে পানি পান করেছেন (মুসলিম, মিশকাত হা/৫৪৭)

প্রশ্ন (৩০/২৩০) : দো‘আর অর্থ না জানা থাকলে তা দ্বারা আল্লাহর নিকটে কিছু কামনা করলে কবুলযোগ্য হবে কি?

-শিহাবুদ্দীন,

পাংশা, রাজবাড়ী।

উত্তর : অবশ্যই হবে। কেননা আল্লাহ মানুষের হৃদয়ের খবর রাখেন। অতএব হৃদয় ঢেলে দিয়ে দো‘আ করলে আল্লাহ অবশ্যই তার ডাকে সাড়া দিবেন। তিনি বলেন, তোমরা আমাকে ডাক। আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব’ (মুমিন ৬০)। তবে অর্থ জেনে ও মর্ম বুঝে দো‘আ করলে তাতে একাগ্রতা ও বিনয় বেশী থাকে। ফলে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনাও বেশী থাকে। তাই অর্থ না জানলে কবুলযোগ্য হলেও অর্থ জেনে দো‘আ করার চেষ্টা করতে হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘মুছল্লী ছালাতের মধ্যে স্বীয় প্রভুর সাথে গোপনে কথা বলে। অতএব সে তার প্রভুর সাথে কি বলছে তার প্রতি যেন একাগ্র থাকে .. (আহমাদ, মিশকাত হা/৮৫৬)

প্রশ্ন (৩১/২৩১) : সময়ের মূল্য সম্পর্কে শরী‘আতে কোন গুরুত্বারোপ করা হয়েছে কি?

- সিরাজুল ইসলাম

মোল্লাহাট, বাগেরহাট।

উত্তর : শরী‘আতে সময়ের মূল্য সম্পর্কে অপরিসীম গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ক্বিয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমরা কেউ এক পাও নড়াতে পারব না। তন্মধ্যে অন্যতম দু’টি হচ্ছে- ‘আমাদের জীবনের সময়কাল আমরা কিভাবে ব্যয় করেছি এবং আমাদের যৌবনকে আমরা কিভাবে ক্ষয় করেছি (তিরমিযী, মিশকাত হা/৫১৯৭)। অন্য হাদীছে আছে, রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘দু’টি নে‘মতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত। আর তা হচ্ছে স্বাস্থ্য ও অবসর সময়’ (বুখারী, মিশকাত হা/৫১৫৫; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৯২৮)

প্রশ্ন (৩২/২৩২) : ফরয গোসল পুকুরে নেমে করা যাবে কি? এতে কি পানি অপবিত্র হয়ে যাবে?

-আব্দুর রাকীব

জলপাইগুড়ি, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

উত্তর : পুকুরে ফরয গোসল করায় কোন বাধা নেই। রাসূল (ছাঃ) বলেন, নিশ্চয়ই পানি হ’ল পবিত্র। তাকে কোন বস্ত্ত অপবিত্র করতে পারে না (আবুদাঊদ হা/৬৭; মিশকাত হা/৪৭৮)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, যতক্ষণ না তা নাপাকী বহন করে (আবুদাঊদ হা/৬৩; মিশকাত হা/৪৭৭)। উক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় ইবনুল মুনযির বলেন, বিদ্বানগণ এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, পানি কম হৌক বেশী হৌক, সেখানে নাপাকী পড়ায় যদি তার স্বাদ, রং বা গন্ধে কোন পরিবর্তন আসে, তাহ’লে সেটা অপবিত্র হবে। ছাহেবে মির‘আত বলেন, উক্ত মর্মে সকল বিদ্বানগণ একমত হয়েছেন, যদিও এবিষয়ে হাদীছ দুর্বল (মির‘আত হা/৪৮১০এর আলোচনা দ্রঃ, ২/১৭৩)। অতএব পুকুরে ফরয গোসল করায় কোন দোষ নেই।

প্রশ্ন (৩৩/২৩৩) : জনৈক আলেম হাদীছ বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি পরহেযগার আলেমের পিছনে ছালাত আদায় করল সে যেন নবীর পিছনে ছালাত আদায় করল। উক্ত হাদীছটি ছহীহ কি?

-ইউসুফ আকরাম

হালিশহর, চট্টগ্রাম।

উত্তর : উক্ত মর্মের বর্ণনাটি ভিত্তিহীন (সিলসিলা যঈফাহ হা/৫৭৩, ২/৪৪ পৃঃ)

প্রশ্ন (৩৪/২৩৪) : অমুসলিম দেশে অবস্থান কালে সেদেশের আইন মেনে চলা কি যরূরী?

-সুমন, পীরগঞ্জ. ঠাকুরগাঁও।

উত্তর : মুসলিম হৌক অমুসলিম হৌক প্রতিষ্ঠিত কোন সরকারের বিধি-বিধান শরী‘আত বিরোধী না হলে তা মেনে চলা সেদেশের নাগরিকদের জন্য আবশ্যক। রাসূল (ছাঃ) বলেন, তোমরা তাদের (শাসকদের) হক আদায় কর এবং তোমাদের হক আল্লাহর কাছে চাও (বুখারী হা/৭০৫২; মিশকাত হা/৩৬৭২)। তবে ইসলাম বিরোধী হুকুম মানতে কোন মুসলিম নাগরিক বাধ্য নয় (বুখারী হা/৭২৫৭; মিশকাত হা/৩৬৯৬, ৩৬৬৪)। বরং  তা থেকে বিরত থাকতে হবে, তার প্রতিবাদ করতে হবে অথবা তাকে ঘৃণা করতে হবে (মুসলিম, মিশকাত হা/৫১৩৭)। সেক্ষেত্রে বাধ্য করা হলে সেদেশ থেকে হিজরত করতে হবে। বাধ্যগত অবস্থায় সেখানে অবস্থান করতে হলে এবং তাকে শরী‘আতবিরোধী কাজ করতে বাধ্য করা হ’লে সেক্ষেত্রে সে গুনাহগার হবে না (বাক্বারাহ ২/১৭৩)(বিস্তারিত দ্রঃ ‘জিহাদ ও ক্বিতাল’ বই ৪২-৪৪ পৃঃ)

প্রশ্ন (৩৫/২৩৫) : জনৈক বক্তা বলেন, ছালাত কমিয়ে ৫ ওয়াক্ত করার ব্যাপারে আল্লাহর নিকটে মূসা (আঃ)-এর বারবার যাওয়ার বিষয়টি সত্য নয় বরং রাসূল (ছাঃ) স্বয়ং কয়েকবার গিয়ে তা কমিয়ে নিয়ে আসেন। এ বক্তব্যের সত্যতা জানতে চাই।

-জসীমুদ্দীন, নিয়ামতপুর, নওগাঁ।

উত্তর: মূসা (আঃ)-এর পরামর্শক্রমে রাসূল (ছাঃ) বারবার গিয়েছিলেন (বুখারী হা/৩৮৮৭, মুসলিম হা/৪২৯)। তবে নিঃসন্দেহে এটা ছিল পূর্বনির্ধারিত তাক্বদীর।

প্রশ্ন (৩৬/২৩৬) : ওযূ অবস্থায় মোযা পরে কতক্ষণ যাবৎ পা মাসাহ করা যাবে? বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।

-আমীনুল ইসলাম, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।

উত্তর: ওযু অবস্থায় মোযা পরে মুক্বীমের জন্য একদিন একরাত এবং মুসাফিরের জন্য তিন দিন তিন রাত পর্যন্ত মাসাহ করা জায়েয (মুসলিম হা/২৭৬; মিশকাত হা/৫১৭)। ছাফওয়ান (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) আমাদের আদেশ দিতেন, মুসাফির অবস্থায় আমরা যেন তিন দিন তিন রাত নাপাকীর গোসল ব্যতীত, এমনকি পায়খানা-পেশাব ও নিদ্রার পর ওযূ করার সময়ও আমাদের মোযাসমূহ না খুলি (তিরমিযী, নাসাঈ, মিশকাত হা/৫২০)

প্রশ্ন (৩৭/২৩৭) : জনৈক আলেম বলেন, ছাহাবী ও তাবেঈগণ জায়নামাযের চেয়ে মাটির উপর সিজদাকে অধিক উত্তম বলে অভিহিত করেছেন’। এ বক্তব্য কতটুকু গ্রহণযোগ্য?

-তাওয়াবুল ইসলাম

ছোটবনগ্রাম, রাজশাহী।

উত্তর : জায়নামাযের চেয়ে মাটির উপর সিজদা করা অধিক উত্তম মর্মে কোন দলীল পাওয়া যায়না। সম্ভবতঃ এটা ভ্রান্ত ফিরক্বা শী‘আদের অনুকরণ। কেননা তাদের নিকট মাটির উপর সিজদা করা ফরয। বিশেষতঃ কারবালার মাটিতে সিজদা করা অধিক ফযীলতপূর্ণ। রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক জায়নামাযে ছালাত আদায় করার বিষয়টি ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। মায়মূনা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) মাদুরের উপর ছালাত আদায় করতেন (বুখারী হা/৩৮১)। আনাস (রাঃ) বলেন, আমরা রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে খেজুরের পাতার চাটাইয়ের উপর ছালাত আদায় করেছি (বুখারী হা/৩৮০; মুসলিম হা/৬৫৮)। আনাস (রাঃ) বলেন, আমরা রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে ছালাত আদায় করেছি। আমাদের মধ্যে অনেকেই প্রচন্ড গরমের কারণে কাপড়ের টুকরা মাটিতে রেখে তার উপর সিজদা করতেন (বুখারী হা/৩৮৫; ইরওয়া হা/৩১১)। এছাড়া এ মর্মে বহু ছাহাবীর আমল পাওয়া যায়।

প্রশ্ন (৩৮/২৩৮) : সোনা বা চাঁদির পাত্রে পানাহার করায় শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

-ওমর ফারূক

মালঞ্চি, মুর্শিদাবাদ, ভারত।

উত্তর : সোনার বা চাঁদির পাত্রে পানাহার করা হারাম। রাসূল (ছাঃ) বলেন, তোমরা সোনা বা রূপার পাত্রে পানাহার করো না। কেননা দুনিয়াতে এগুলি কাফেরদের জন্য এবং আখেরাতে এগুলি তোমাদের জন্য (বুখারী হা/৫৬৩২, মুসলিম হা/২০৬৭, মিশকাত হা/৪২৭২)। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি সোনা বা রূপার পাত্রে খাবে বা পান করবে, জাহান্নামের আগুন তার পেট ছিন্নভিন্ন করবে’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪২৭১)

প্রশ্ন (৩৯/২৩৯) : পুরুষের জন্য পর্দার বিধান রয়েছে কি? তাদের পর্দা কিভাবে হবে?

-হাবীবুল বাশার

গোদাগাড়ী, রাজশাহী।

উত্তর : মহিলাদের যেরূপ পর পুরুষ হ’তে পর্দা করা ফরয,  তেমনি পুরুষদেরও বেগানা মহিলা হ’তে পর্দা করা অপরিহার্য। আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! তুমি মুমিন পুরুষদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে। আর এটাই তাদের জন্য উত্তম। বস্ত্ততপক্ষে তারা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবহিত’ (নূর ৩০)। তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা যখন তাদের (মহিলাদের) নিকট কোন বস্ত্ত চাইবে তখন পর্দার বাইরে থেকে চাইবে। কেননা এটি তোমাদের ও তাদের অন্তর সমূহের জন্য পবিত্রতর’ (আহযাব ৩৩/৫৩)

বুরায়দা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হযরত আলী (রাঃ) কে বলেন, ‘হে আলী! তুমি দৃষ্টির উপর দৃষ্টি ফেলো না। হঠাৎ যে দৃষ্টি পড়ে ওটা তোমার জন্য ক্ষমা। কিন্তু পরবর্তী দৃষ্টি তোমার জন্য বৈধ নয়’ (আহমাদ, তিরমিযী, আবুদাঊদ, দারেমী, মিশকাত হা/৩১১০)। পুরুষের জন্য দৃষ্টিকে সংযত করতে হবে। তবে মহিলাদের ন্যায় সর্বাঙ্গ ঢেকে পর্দা করতে হবে না।

প্রশ্ন (৪০/২৪০) : সন্তান জন্মের ৭ দিন পর আকীকা করা না হলে সেক্ষেত্রে করণীয় কি? পিতা-মাতা আকীকা না করে থাকলে নিজেই নিজের আকীকা করা যাবে কি?

-সোহেল, গোমস্তাপুর, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।

উত্তর: আকীকা দেয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘প্রত্যেক শিশু তার আকীকার সাথে বন্ধক থাকে। অতএব জন্মের সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে পশু যবহ করতে হয়, নাম রাখতে হয় ও তার মাথা মুন্ডন করতে হয়’ (আবুদাউদ হা/২৮৩৯; ইবনু মাজাহ হা/৩১৬৫; মিশকাত হা/৪১৫৩)। তিনি বলেন, ‘সন্তানের সাথে আক্বীক্বা জড়িত। অতএব তোমরা তার পক্ষ থেকে রক্ত প্রবাহিত কর (বুখারী, মিশকাত হা/৪১৪৯)। উক্ত হাদীছগুলিতে আকীকার গুরুত্ব ও সময় সম্পর্কে বলা হয়েছে এবং রাসূল (ছাঃ) তাঁর নাতি হাসান ও হুসাইনের আক্বীকাও সপ্তম দিনে করেছিলেন (ছহীহ ইবনু হিববান হা/৫৩১১, সনদ হাসান)। অতএব সক্ষম ব্যক্তি সপ্তম দিনেই আকীকা করবে। উল্লেখ্য, ৭ম দিনের পরে ১৪ ও ২১ দিনে দেওয়ার ব্যাপারে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ (আলবানী, ইরওয়াউল গালীল হা/১১৭০)

সঙ্গত কোন কারণে যদি সময়মত করা সম্ভব না হয়, পরবর্তীতে সুযোগ মত যেকোন সময় তা আদায় করবে (ইবনুল ক্বাইয়িম, তুহফাতুল মাওদূদ ৬৩ পৃঃ; আলবানী, সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, অডিও ক্লিপ নং- ১৯৯; ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা, ফৎওয়া নং ১৭৭৬; মাজমূ‘ ফাতাওয়া উছায়মীন ২৫/২১৫)

শাফেঈ বিদ্বানগণের মতে সাত দিনে আক্বীক্বার বিষয়টি সীমা নির্দেশ মূলক নয় বরং এখতিয়ার মূলক। ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেন, সাত দিনে আকীকার অর্থ হ’ল, ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ সাত দিনের পরে আকীকা করবে না (নায়লুল আওত্বার ৬/২৬১ পৃঃ)

অভিভাবক আকীকা না দিলে সেক্ষেত্রে পরবর্তীতে নিজেই নিজের আকীকা করতে পারে (ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, মাসআলা নং ৭৮৯৮; মাজমূ‘ ফাতাওয়া বিন বায ২৬/২৬৬)। খ্যাতনামা তাবেঈ মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন (রহঃ) বলেন, যদি আমি জানতাম যে, আমার পক্ষে আকীকা দেওয়া হয়নি, তবে অবশ্যই আমি নিজেই নিজের আকীকা করতাম (মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা হা/২৪৭১৮, ছহীহাহ হা/২৭২৬-এর আলোচনা দ্রঃ)। হাসান বছরী (রহঃ) বলতেন যে, যদি তোমার পক্ষ থেকে আকীকা দেওয়া না হয়, তবে তুমি নিজেই নিজের আকীকা দাও, যদিও তুমি বয়ঃপ্রাপ্ত ব্যক্তি হও (ইবনু হাযম, মুহাল্লা ৬/২৪০, সনদ হাসান, আলবানী, ছহীহাহ হা/২৭২৬-এর আলোচনা দ্রঃ)

 

HTML Comment Box is loading comments...