মনীষী চরিত


ইমাম নাসাঈ (রহঃ)

কামারুযযামান বিন আব্দুল বারী

(শেষ কিস্তি)

মনীষীদের দৃষ্টিতে ইমাম নাসাঈ (রহঃ)

ইলমে হাদীছ সহ ইসলামের অন্যান্য শাখায় অবদান রাখার কারণে সমসাময়িক ও পরবর্তী মনীষীগণ ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর প্রশংসায় অনেক মূল্যবান উক্তি পেশ করেছেন। তন্মধ্যে কয়েকজনের উক্তি নিম্নে উল্লেখ করা হ’ল।- 

১. হাফেয আলী ইবনে ওমর বলেন,كَانَ النَّسَائِيُّ أَفْقَهَ مَشَايِخِ مِصْرَ فِيْ عَصْرِهِ وَأَعْرَفَهُمْ بِالصَّحِيْحِ وَالسَّقِيْمِ وَأَعْلَمَهُمْ بِالرِّجَالِ. ‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) সমকালীন মিসরীয় মনীষীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফকীহ, ছহীহ ও যঈফ হাদীছ সম্পর্কে সবচেয়ে বিজ্ঞ এবং রিজালশাস্ত্রে সবচেয়ে বেশী জ্ঞানী ছিলেন’।[1]

২. হাফেয যাহাবী বলেন,

وَلَمْ يَكُنْ أَحَدٌ فِيْ رَأْسِ الثَّلاَثِمِائَةِ أَحْفَظَ مِنَ النَّسَائِيِّ، وَهُوَ أَحْذَقُ بِالْحَدِيْثِ وَعِلَلِهِ وَرِجَالِهِ مِنْ مُسْلِمٍ، وَمِنْ أَبِيْ دَاوُدَ، وَمِنْ أَبِيْ عِيْسَى، وَهُوَ جَارٍ فِيْ مِضْمَارِ البُخَارِيِّ وَأَبِيْ زُرْعَةَ.

‘হিজরী তৃতীয় শতকের প্রারম্ভে ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর চেয়ে হাদীছের অধিক সংরক্ষক অন্য কেউ ছিল না। হাদীছ, ইলালুল হাদীছ (হাদীছের ত্রুটি-বিচ্যুতি) এবং রিজালশাস্ত্রে তিনি ইমাম মুসলিম, আবূ দাঊদ এবং আবূ ঈসা আত-তিরমিযী (রহঃ)-এর চেয়েও পারদর্শী ছিলেন। তিনি ইমাম বুখারী ও আবূ যুর‘আ (রহঃ)-এর সমপর্যায়ের মুহাদ্দিছ ছিলেন’।[2] তিনি আরো বলেন, وكان من بحور العلم، مع الفهم، والاتقان، والبصر، ونقد الرجال، وحسن التأليف. ‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) ইলমে হাদীছের সমুদ্রতল্য মহাজ্ঞানী, সূক্ষ্মজ্ঞানী, সূক্ষ্মদর্শী, ইলমুর রিজালের সমালোচক ও বরেণ্য গ্রন্থপ্রণেতা ছিলেন’।[3]

৩. মানছূর আল-ফকীহ ও আবূ জা‘ফর আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ আত-তাহাবী বলেন, أبو عبد الرحمن النسائي إمام من أئمة المسلمين، وكذلك أثنى عليه غير واحد من الأئمة وشهدوا له بالفضل والتقدم في هذا الشأن. ‘ইমাম আবূ আব্দুর রহমান আন-নাসাঈ (রহঃ) হাদীছ শাস্ত্রের ইমামগণের মধ্যে অন্যতম ইমাম ছিলেন। অনুরূপভাবে অনেক মনীষী তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং এ বিষয়ে তাঁর মর্যাদা ও অগ্রগামিতার স্বীকৃতি দিয়েছেন’।[4]

৪. হাফেয আবূ আলী আন-নীসাপুরী বলেন,

رأيت من أئمة الحديث أربعة في وطني وأسفاري: النسائي بمصر، وعبدان بالأهواز، ومحمد بن إسحاق، وإبراهيم بن أبي طالب بنيسابور.

‘আমি স্বদেশে ও প্রবাসে চারজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিছকে দেখেছি। তাঁরা হলেন, মিসরে ইমাম নাসাঈ (রহঃ), আহওয়াযে আবদান (রহঃ), নীসাপুরে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক এবং ইবরাহীম ইবনে আবূ তালিব (রহঃ)।[5] তিনি আরো বলেন, اَلنَّسَائِيُّ إِمَامٌ فِي الْحَدِيثِ بِلاَ مُدَافَعَةٍ، ‘নাসাঈ ইলমে হাদীছের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ইমাম ছিলেন’।[6]

৫. ইমাম দারাকুতনী (রহঃ) বলেন, أبو عبد الرحمن الإمام النسائي مقدم على كل من يذكر بعلم الحديث، وبجرح الرواة وتعديلهم في زمانه. ‘স্বীয় যুগে ইলমে হাদীছ, রাবীদের সমালোচনা এবং তাঁদের ন্যায়পরায়ণতা সাব্যস্তকরণে যাঁদেরকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়, ইমাম আবূ আব্দুর রহমান আন-নাসাঈ (রহঃ) তাঁদের সকলের উপরে অগ্রগামী ছিলেন’।[7]

৬. মুহাম্মাদ ইবনে সাঈদ আল-বারুদী বলেন,ذكرت النسائي لقاسم المطرز فقال هو إمام أو يستحق أن يكون إماما ‘আমি কাসেম আল-মুতরাযের নিকট ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর কথা উল্লেখ করলাম। তখন তিনি বললেন, ইলমে হাদীছের তিনি একজন ইমাম অথবা ইমাম হওয়ার যোগ্য’।[8]

৭. হাফেয আবূ আব্দুল্লাহ ইবনে মানদাহ বলেন,

اَلَّذين أخرجُوا الصَّحِيحَ وميزوا الثَّابِتَ من الْمَعْلُولِ وَالْخَطَأَ من الصَّوَابِ أرْبَعَةٌ : البُخَارِيّ، وَ مُسلم، أَبُو دَاوُد، وَأَبُو عبد الرَّحْمَن النَّسَائِيُّ

‘যাঁরা ছহীহ হাদীছ সংকলন করেছেন এবং ত্রুটিযুক্ত থেকে নির্ভরযোগ্য হাদীছগুলো পৃথক করেছেন এবং ভুল থেকে সঠিক বের করেছেন, তাঁরা হ’লেন চার জন। যথা- ১. ইমাম বুখারী (রহঃ), ২. ইমাম মুসলিম (রহঃ), ৩. ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ), ৪. ইমাম আবূ আব্দুর রহমান আন-নাসাঈ (রহঃ)।[9]

৮. আবু সাঈদ ইবনে ইউনুস বলেন, كَانَ إِمَامًا فِي الْحَدِيْثِ ثِقَةً ثَبْتًا حَافِظًا-  ‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) ইলমে হাদীছের ইমাম, নির্ভরযোগ্য, বিশ্বস্ত ও হাফেয ছিলেন’।[10]

৯. আল্লামা তাজুদ্দীন সুবকী (রহঃ) বলেন,

سمعت شيخنا أبا عَبد الله الذهبي الحافظ، وسألته: أيهما أحفظ: مسلم بن الحجاج صاحب الصحيح، أو النَّسَائي؟ فقال: النَّسَائي. ثم ذكرت ذلك للشيخ الإمام الوالد تغمده الله برحمته، فوافق عليه.

‘আমি আমাদের উস্তাদ হাফেয আয-যাহাবী থেকে শুনেছি, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ছহীহ মুসলিমের সংকলক ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (রহঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর মধ্যে ইলমে হাদীছের অধিক সংরক্ষক কে? উত্তরে তিনি বললেন, ইমাম নাসাঈ (রহঃ)। অতঃপর এ বিষয়টি আমার পিতা তাকীউদ্দীন সুবকী-এর নিকট আলোচনা করলে তিনি ইমাম যাহাবীর অভিমতকে সমর্থন করেন’।[11]

১০. আবূ আবদির রহমান মুহাম্মাদ ইবনুল হোসাইন আস-সুলামী বলেন,

سألت أَبَا الْحَسَن علي بْن عُمَر الدَّارَقُطْنِيَّ الْحَافِظَ، فقلت: إذا حدث مُحَمَّد بْن إسحاق بْن خزيمة وأَحْمَد بْن شعيب النَّسَائي حديثا من تقدم منهما؟ قال: النَّسَائي لأنه أسند، على أني لا أقدم على النَّسَائي أحدا وإن كَانَ ابْن خزيمة إماما ثبتا معدوم النظير.

‘হাফেয আবুল হাসান আলী ইবনে ওমর আদ-দারাকুতনী (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, যখন মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুযায়মা (রহঃ) ও ইমাম আহমাদ ইবনে শো‘আইব আন- নাসাঈ (রহঃ) কোন হাদীছ বর্ণনা করবেন, তখন এ দু’জনের মধ্যে কার বর্ণিত হাদীছকে আপনি অগ্রাধিকার দিবেন? উত্তরে তিনি বললেন, ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর হাদীছকে। কেননা তাঁর হাদীছের সনদ অত্যন্ত সুদৃঢ় ও মুত্তাছিল। আমি ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর ওপর অন্য কাউকে অগ্রাধিকার দিব না। যদিও ইবনে খুযায়মা নির্ভরযোগ্য ও অতুলনীয় ইমাম ছিলেন’।[12]

১১. হাকিম (রহঃ) বলেন,كلام النسائي على فقه الحديث كثير، ومن نظر في سننه تحير في حسن كلامه. ‘ফিকহুল হাদীছ সম্পর্কে ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর অনেক মূল্যবান বাণী রয়েছে। যে ব্যক্তি তাঁর সংকলিত সুনানের প্রতি দৃষ্টিপাত করবে, সে তাঁর মনোহরী কথামালা দেখে বিস্ময়াভিভূত হয়ে যাবে’।[13]

১২. নওয়াব ছিদ্দীক্ব হাসান খান (রহঃ) বলেন,

وكان أحد أعلام الدين وأركان الحديث، إمام أهل عصره ومقدمهم وعمدتهم وقدوتهم بين أصحاب الحديث وجرحه وتعديله، معتبر بين العلماء-

‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) দ্বীন ইসলামের একজন সুপন্ডিত, ইলমে হাদীছের স্তম্ভ, স্বীয় যুগের ইমাম, তাঁদের মধ্যে অগ্রগামী, মুহাদ্দিছগণের স্তম্ভ ও তাদের আদর্শ ছিলেন। তিনি জারাহ ওয়াত তা‘দীল বিশেষজ্ঞদের ইমাম এবং বিদ্বানগণের মাঝে গ্রহণযোগ্য ছিলেন’।[14]

১৩. আল্লামা ইবনুল জাওযী (রহঃ) বলেন,وكان إماما في الحديث ثبتا حافظا فقيها- ‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) হাদীছের ইমাম, নির্ভরযোগ্য, হাফেয ও ফক্বীহ ছিলেন’।[15]

শী‘আ অপবাদ আরোপ :

ইমাম নাসাঈ (রহঃ) মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রসমূহে ব্যাপকভাবে পরিভ্রমণ শেষে মিসরে বসতি স্থাপন করেন। দীর্ঘদিন মিসরে বসবাস করার পর প্রতিকূল অবস্থার কারণে ৩০২ হিজরীতে দামেশকে চলে আসেন। দামেশকে পৌঁছে তিনি দেখতে পেলেন যে, জনসাধারণের অধিকাংশই বনী উমাইয়ার পক্ষে এবং আলী (রাঃ)-এর বিপক্ষে। তখন তিনি জনগণের মনোভাব ও আক্বীদা সংশোধনের লক্ষ্যে আলী (রাঃ) ও তাঁর পরিবারের প্রশংসায় ‘কিতাবুল খাছায়িছ ফী ফাযলে আলী ইবনি আবী তালিব ওয়া আহলিল বায়ত’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি এ গ্রন্থটি দামেশকের জামে মসজিদে সকলকে পড়ে শুনানোর ইচ্ছা করেন। যাতে বনী উমাইয়ার শাসনের ফলে সাধারণ লোকদের মাঝে যে ঈমানী দুর্বলতা সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর হয়ে যায়। কিন্তু এর সামান্য অংশ পড়ার পর এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করে, আপনি কি আমীরুল মুমিনীন মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর প্রশংসায় কিছু লিখেছেন? জবাবে ইমাম নাসাঈ (রহঃ) বললেন, মু‘আবিয়ার জন্য তো এটাই যথেষ্ট যে, সে এ থেকে সবসময় বাদ পড়ুক। তাঁর প্রশংসায় লেখার তো কিছু নেই। এ কথা শোনার সাথে সাথেই লোকেরা তাঁর ওপর হামলা চালায় এবং শী‘আ শী‘আ বলে তাঁকে মারধর করতে থাকে। ফলে তিনি মরণাপন্ন হয়ে পড়েন।[16]

মূলতঃ তিনি শী‘আ ছিলেন না। এটি ছিল তাঁর প্রতি চরম মিথ্যা অপবাদ। তিনি যে শী‘আ ছিলেন না তার জাজ্বল্য প্রমাণ হ’ল, তিনি স্বীয় فضائل الصحابة গ্রন্থে ছাহাবীদের তালিকায় আলী (রাঃ)-কে অন্যান্য বিশিষ্ট ছাহাবী তথা খলীফা চতুষ্টয়ের অন্যান্যদের উপর প্রাধান্য দেননি। তিনি যদি শী‘আ হ’তেন তাহ’লে আলী (রাঃ)-এর আলোচনা সর্বাগ্রে করতেন। যেমনটি অন্যান্য শী‘আরা করে থাকে।

উসামা রাশাদ ওয়াছফী আগা বলেন,

ثم إنه قد صنف كتاب فضائل الصحابة وبدأ بأبي بكر ثم عمر ثم عثمان ثم جعل عليا رضي الله عنه رابعهم وهذا يدل على أنه لا يقدم عليا حتى على عثمان-

‘অতঃপর তিনি ফাযাইলুছ ছাহাবা গ্রন্থ প্রণয়ন করেন এবং এতে আবূ বকর (রাঃ)-এর (জীবনী ও মর্যাদা শীর্ষক আলোচনার) মাধ্যমে শুরু করেন। অতঃপর ওমর (রাঃ), তারপর ওছমান (রাঃ), তারপর চতুর্থ পর্যায়ে আলী (রাঃ)-এর আলোচনা করেছেন। এটা প্রমাণ বহন করে যে, তিনি আলী (রাঃ)-কে অন্যদের চেয়ে এমনকি ওছমান (রাঃ)-এর চেয়েও প্রাধান্য দেননি’।[17]

অনুরূপভাবে ড. তাকীউদ্দীন নাদভী বলেন,أنه صنف كةاب فضائل الصحابة فاةضح بذلك أن شبهة الةشيع لا أساس لها في الحقيقة-  ‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) ‘ফাযাইলুছ ছাহাবা’ গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। এতে সুস্পষ্ট হয়েছে যে, তাঁর প্রতি শী‘আবাদের সন্দেহ করার কোন প্রকৃত ভিত্তি নেই’।[18]

শুধু তাই নয়, মু‘আবিয়া (রাঃ) সম্পর্কেও তাঁর খারাপ ধারণা ছিল না। আবূ আলী আল-হাসান ইবনু আবূ হেলাল বলেন, ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছাহাবী মু‘আবিয়া ইবনু আবূ সুফিয়ান (রাঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হ’লে  তিনি বলেন, ইসলাম একটি গৃহের ন্যায় যার একটি দরজা রয়েছে, আর ইসলামের সে দরজা হ’ল ছাহাবায়ে কেরাম। অতঃপর যে ব্যক্তি ছাহাবায়ে কেরামকে দিয়ে ইসলাম পেতে চায় সে ঐ ব্যক্তির মত যে দরজায় করাঘাত করে গৃহে প্রবেশ করতে চায়। তিনি আরও বলেন, যে ব্যক্তি মু‘আবিয়া (রাঃ)-কে কষ্ট দিয়ে ইসলাম পেতে চায়, সে যেন ছাহাবায়ে কেরামকে কষ্ট দিয়ে ইসলাম পেতে চায়।

উপরোক্ত কথাগুলো তার চূড়ান্ত বদান্যতার পরিচয়। কেননা তিনি এটা সন্দেহাতীতভাবে বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর উপর শী‘আ মতাবলম্বী হওয়ার যে মিথ্যারোপ করা হয়েছে তা থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে মুক্ত’।[19]

ইমাম নাসাঈ (রহঃ) মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর প্রতি বিরাগ ছিলেন না, তার আরো একটি সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হ’ল, তিনি সুনানে কুবরাতে মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর সূত্রে ৬৩টি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। যদি মু‘আবিয়া (রাঃ) সম্পর্কে তাঁর বিরূপ মনোভাব থাকত, তাহ’লে তিনি কিছুতেই তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করতেন না।[20]

মৃত্যু ও দাফন :

শী‘আ অপবাদের অভিযোগে তাঁকে বেদম প্রহার করা হ’লে তিনি মরণাপন্ন হয়ে পড়েন। খাদেম তাঁকে সেখান থেকে উঠিয়ে বাড়িতে নিয়ে যায়। বাড়িতে পৌঁছে তিনি বলেন, আমাকে মক্কায় পৌঁছে দাও, যাতে আমার মৃত্যু মক্কায় বা মক্কার রাস্তায় হয়। কথিত আছে যে, মক্কায় পৌঁছার পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন’।[21]

হাফেয যাহাবী ‘তাযকিরাতুল হুফ্ফায’ গ্রন্থে লিখেছেন, وَتُوُفِّيَ بِفِلِسْطِينَ يَوْمَ الْاثْنَيْنِ لِثَلاَثِ عَشْرَةَ خَلَتْ مِنْ صَفَرٍ سَنَةَ ثَلاَثٍ وَثَلاَثِمِائَةٍ. ‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) ৩০৩ হিজরীর ছফর মাসের ১৩ তারিখ সোমবার ফিলিস্তীনে মৃত্যুবরণ করেন’।[22]

ঐতিহাসিক ইবনে খাল্লিকান বলেন, إِنَّهُ تُوُفِّيَ فِيْ شَعْبَانَ مِنْ هذِهِ السَّنَةِ ‘একই বছরের শা‘বান মাসে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।[23] মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর[24] মতান্তরে ৮৯ বছর’।[25]

ছাফা ও মারওয়া পাহাড়ের পাদদেশে তাঁকে দাফন করা হয়।[26] অন্য বর্ণনায় এসেছে, হাফেয আবূ আমির মুহাম্মাদ ইবনে সাদুন আল-আবদারী বলেন,

مَاتَ أَبُو عَبْدِ الرَّحْمَنِ النَّسَائِيُّ بِالرَّمْلَةِ مَدِينَةِ فِلِسْطِيْنَ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ لِثَلاَثِ عَشْرَةَ لَيْلَةً خَلَتْ مِنْ صَفَرٍ سَنَةَ ثَلاَثٍ وَثَلاَثِمِائَةٍ، وَدُفِنَ بِبَيْتِ المقدسِ.

‘ইমাম আবূ আব্দুর রহমান আন-নাসাঈ (রহঃ) ফিলিস্তীনের রামলা নগরীতে ৩০৩ হিজরীর ১৩ই ছফর সোমবার রাত্রে মৃত্যুবরণ করেন এবং বায়তুল মুক্বাদ্দাসের সন্নিকটে তাঁকে দাফন করা হয়’।[27]

ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর জীবনী থেকে শিক্ষণীয় বিষয়

ইলমে হাদীছের প্রচার-প্রসার, হাদীছ সংকলন ও সংরক্ষণ এবং জারহ ও তা‘দীল নির্ণয়ে ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর অবদান অতুলনীয়। এ ক্ষণজন্মা মহামনীষীর জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে রয়েছে আমাদের জন্য বহু শিক্ষণীয় বিষয়। নিম্নে কিছু শিক্ষণীয় বিষয় উল্লেখ করা হ’ল।-

১. সত্য আপোষহীন : সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব চিরন্তন। বাতিলের ধ্বজাধারী তাগূতী শক্তি সত্যের আলোকে নির্বাপিত করার লক্ষ্যে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে সচেষ্ট, এটাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে মিথ্যার সাথে আপোষ না করে সত্যের পথে হিমাদ্রির ন্যায় অটল ও অবিচল থাকতে হবে। যেমনিভাবে ইমাম নাসাঈ (রহঃ) মিথ্যার সাথে আপোষ না করে সত্যের উপর অটল ও অবিচল ছিলেন।

২. পার্থিব জীবন কুসুমাস্তীর্ণ নয় : এ পৃথিবীতে কারো জীবনই কুসুমাস্তীর্ণ নয়। কণ্টকাকীর্ণ পিচ্ছিল পথ মাড়িয়েই অভীষ্ট লক্ষ্যে পেঁঁŠছতে হয়। এক্ষেত্রে ইমাম নাসাঈ (রহঃ) ছিলেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

৩. মিথ্যা অপবাদ আরোপ : এ পৃথিবীতে নবী-রাসূল থেকে শুরু করে যাঁরাই সত্য প্রচারে ব্রতী হয়েছেন, তাঁরাই মিথ্যা অপবাদে অভিযুক্ত হয়েছেন। সত্য প্রচারকের বিরুদ্ধে মিথ্যা

অপবাদ আরোপ করা তাগূতী শক্তির চূড়ান্ত হাতিয়ার। যা থেকে ইমাম নাসাঈ (রহঃ)ও রক্ষা পাননি। সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে তাঁকে ‘শী‘আ’ অপবাদে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। এ যুগেও যারা সত্য প্রচার-প্রসারে ব্রতী হবেন তাদের বিরুদ্ধে লা-মাযহাবী, জঙ্গী, কাদিয়ানী, রাষ্ট্রদ্রোহী স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ইত্যাকার মিথ্যা অভিযোগ আরোপিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করতে হবে।

৪. আত্মোৎসর্গ : হক প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় সর্বদা জীবনের শেষ রক্তবিন্দু বিসর্জন দিতে প্রস্ত্তত থাকতে হবে। যেমনিভাবে ইমাম নাসাঈ (রহঃ) জীবনের শেষ রক্তবিন্দু সত্য প্রতিষ্ঠায় ব্যয় করেছিলেন।

৫. দ্বীন ও দুনিয়ার মাঝে সমন্বয় সাধন : দ্বীন-দুনিয়ার মাঝে সমন্বয় সাধনে ইমাম নাসাঈ (রহঃ) এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দুনিয়াবী ক্ষেত্রে তাঁর যেমন চারজন স্ত্রী ছিল। তেমনি দ্বীন পালনের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন তাহাজ্জুদগুযার এবং নফল ছিয়ামে অভ্যস্ত।

৬. অধ্যবসায় : শিক্ষার্জন ও গ্রন্থ প্রণয়নে ইমাম নাসাঈ (রহঃ) কঠোর অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়েছেন। শিক্ষার্জনে শুধু নিজ দেশের গন্ডিতে আবদ্ধ না থেকে পিপাসিত চাতকের ন্যায় দেশ-বিদেশের সমকালীন মহামনীষীদের দ্বারস্থ হয়েছেন। তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছেন শিক্ষার্জন ও গ্রন্থ প্রণয়নে। যার জ্ঞান সাগরে এখনও আমরা অবগাহন করে চলছি।

পরিশেষে দরবারে ইলাহীতে প্রার্থনা জানাই আল্লাহ রাববুল আলামীন ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর এ অনবদ্য অবদান কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন-আমীন!



* প্রধান মুহাদ্দিছ, বেলটিয়া কামিল মাদরাসা, জামালপুর।

[1]. মুকাদ্দামাতু তুহফাতিল আহওয়াযী, ১/১০৭ পৃঃ; তাযকিরাতুল হুফফায, ২/৭০১ পৃঃ; তাহযীবুল কামাল, ১/৩৩৮ পৃঃ।

[2]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১৪/১৩৩ পৃঃ।

[3]. ঐ, ১৪/১২৭ পৃঃ।

[4]. তাহযীবুত তাহযীব, ১/২৭ পৃঃ; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ১১/১৪০ পৃঃ।

[5]. শাযারাতুয যাহাব, ২/২৪০ পৃঃ; তাহযীবুত তাহযীব, ১/২৭ পৃঃ।

[6]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ১১/১৪০ পৃঃ; তাযকিরাতুল হুফফায, ২/৬৯৯ পৃঃ।

[7]. আল-হিত্তাহ ফী যিকরিছ ছিহাহ সিত্তাহ, ২৫৩ পৃঃ; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১৪/১৩১ পৃঃ।

[8]. মুকাদ্দামাতু তুহফাতিল আহওয়াযী, ১/১০৬ পৃঃ; তাহযীবুত তাহযীব, ১/২৭ পৃঃ।

[9]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১৪/১৩৫ পৃঃ; তাহযীবুত তাহযীব, ২/৩৯১ পৃঃ; মুকাদ্দামাতু সুনানি আবূ দাঊদ লিল-আইনী, ১/১০৬ পৃঃ।

[10]. তাহযীবুল কামাল, ১/৩৪০ পৃঃ; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ১১/১৪০ পৃঃ; আল-হিত্তাহ, পৃঃ ২৫৪।

[11]. তাহযীবুল কামাল, ১/২৪০ পৃঃ (টীকা দ্রষ্টব্য)।

[12]. প্রাগুক্ত, ১/৩৩৪-৩৫ পৃঃ।

[13]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১৪/১৩০ পৃঃ।

[14]. আ‘লামুল মুহাদ্দিছীন, পৃঃ ২৫৪।

[15]. রুবাঈয়্যাতুল ইমাম আন-নাসাঈ, পৃঃ ২৬।

[16]. বুস্তানুল মুহাদ্দিছীন, পৃঃ ২৪৫; তাহযীবুত তাহযীব, ১/২৮ পৃঃ; রুবাঈয়্যাতুল ইমাম আন-নাসাঈ, পৃঃ ১৬-১৭।

[17]. ঐ, পৃঃ ১৮।

[18]. আ‘লামুল মুহাদ্দিছীন, পৃঃ ২৫৬।

[19]. রুবাঈয়্যাতুল ইমাম আন-নাসাঈ, পৃঃ ১৮-১৯।

[20]. প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৯।

[21]. বুস্তানুল মুহাদ্দিছীন, পৃঃ ২৪৫; তাহযীবুত তাহযীব, ১/২৮ পৃঃ।

[22]. তাযকিরাতুল হুফফায, ২/৭০১ পৃঃ; তাকরীবুত তাহযীব, পৃঃ ৯। কাশফুয যুনূন, ১/১০০৬ পৃঃ।

[23]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ১১/১৪১ পৃঃ।

[24]. তাহযীবুত তাহযীব, ১/২৮ পৃঃ; তাকরীবুত তাহযীব, পৃঃ ৯।

[25]. আল-হাদীছ ওয়াল মুহাদ্দিছূন, পৃঃ ৩৫৯।

[26]. শাযারাতুয যাহাব, ২/২৪০।

[27]. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ, ১১/১৪১ পৃঃ; আল-হিত্তাহ, পৃঃ ২৫৫।

 

HTML Comment Box is loading comments...