সাক্ষাৎকার

[প্রফেসর শাহ মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। একজন বিজ্ঞ ইসলামী অর্থনীতিবিদ হিসাবে তিনি দীর্ঘ ২৩ বছর ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড’-এর শরী‘আহ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। মাসিক আত-তাহরীক-এর সাথে তাঁর লেখনীর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বিশেষ সংখ্যা উপলক্ষে ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে তাঁর এ সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন আত-তাহরীক-এর সহকারী সম্পাদক ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম ও গবেষণা সহকারী নূরুল ইসলাম]।

১. আত-তাহরীক : মাসিক আত-তাহরীক সম্পর্কে আপনার মুল্যায়ন কী?

শাহ হাবীবুর রহমান : আমার ব্যক্তিগত মতামত হ’ল, এ পত্রিকাটি একটি গবেষণামূলক পত্রিকা। কুরআন ও হাদীছের আলোকে মুসলমানদের জীবনকে সুন্দর এবং সুচারুরূপে পরিচালনা করার জন্য দীর্ঘদিন যাবৎ পত্রিকাটি খেদমত করে যাচ্ছে। সেই সাথে গত কয়েক বছর ধরে সমাজনীতি, অর্থনীতি, রাজনীতি নিয়েও পত্রিকাটিতে বিস্তর আলোচনা আসছে। সাথে সাথে দেশ-বিদেশের বিদগ্ধ পন্ডিতদের অনূদিত লেখনী প্রকাশ করায় এর মানও বেড়েছে। আরো গুরুত্বপূর্ণ হ’ল এটি অনলাইনে যাওয়ার কারণে দেশ-বিদেশে এর পাঠক সংখ্যা প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমি মনে করি, এর প্রশ্নোত্তর পর্বটি অত্যন্ত মূল্যবান এবং এর সম্পাদকীয় কলামটির কতগুলি সম্পাদকীয় এত বেশী মূল্যবান বলে মনে হয়েছে যে, সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিকে অনুরোধ করেছি যে, আপনার এ সম্পাদকীয়গুলি বাছাই করে আলাদা বই হিসাবে প্রকাশ করলে এটি স্থায়ীভাবে পাঠকের হাতে একটি তথ্যসমৃদ্ধ সংকলন হিসাবে থেকে যাবে।

২. আত-তাহরীক : একজন বিশেষজ্ঞ ইসলামী অর্থনীতিবিদ হিসাবে জাতিকে সূদভিত্তিক অর্থনীতির অভিশাপ থেকে রক্ষা করতে আপনার পরামর্শ কী?

শাহ হাবীবুর রহমান : ধন্যবাদ। আমার পরামর্শকে আমি তিনভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথমতঃ মানুষকে সূদভিত্তিক অর্থনীতির অভিশাপ সম্পর্কে জানাতে হবে। এ সম্পর্কে মানুষ খুব অল্পই জ্ঞান রাখে। ওলামায়ে কেরাম শুধু জানেন যে, সূদ হারাম। কিন্তু এর অভিশাপ সম্পর্কে তাদের অনেকেরই কোন ধারণা নেই। তাই এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরাম এবং বুদ্ধিজীবীদের একত্রে জানা ও কাজ করা উচিৎ। বর্তমানে সূদের কুফল নিয়ে বাংলা, আরবী, ইংরেজী প্রভৃতি ভাষায় অনেক বই বের হয়েছে। এগুলো পঠন-পাঠনের সুযোগ তৈরী হওয়া উচিৎ। কারণ এ বিষয়ে যত বেশী জনগণকে জানানো যাবে, তত বেশী তারা সচেতন হবে। কিন্তু দুঃখজনক হ’ল এ বিষয়ে স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে তো দূরের কথা, সাধারণভাবেও অনেকের কাছেই বিষয়টি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পৌঁছেনি। সূদের অভিশাপ সম্পর্কে যতক্ষণ আমরা জানাতে না পারব যে, এটা শুধু হারাম নয় বরং সমাজের জন্য একটি অভিশাপ, উন্নতির পথে অন্তরায়, জাতির জন্য অকল্যাণকর ততক্ষণ এটা দূর করা যাবে না।

দ্বিতীয়তঃ এ ব্যাপারে জনমত সৃষ্টি করতে হবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জনমত সৃষ্টি করতে পারলে, এর অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব। যদিও তাতে সময়ের প্রয়োজন। আমরা জানি, একজন মা-ও সন্তান না কাঁদা পর্যন্ত দুধ খাওয়ায় না। সেখানে জনগণ চাইবে না আর সরকার আপনাআপনিই কোন পরিবর্তন করে দেবে এটা হ’তেই পারে না। তাই জনগণকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। জনগণ এটি চাইতে পারে সভা-সমিতির মাধ্যমে, প্রচারপত্র ও পত্রিকার মাধ্যমে, লেখালেখির মাধ্যমে, সংসদ সদস্যদের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে, যেন তারাই সংসদে এ ব্যাপারে দাবী জানাতে পারেন। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে এ ব্যাপারে উদ্যোগ না নেব, ততক্ষণ আমরা সফলকাম হ’তে পারব না।

তৃতীয়তঃ প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টা। বাংলাদেশে বর্তমানে সূদ উচ্ছেদের জন্য কিছু কাজ করে যাচ্ছে ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ইসলামী ফাইন্যান্সিং প্রতিষ্ঠানসমূহ। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটটেড সর্বপ্রথম এ ব্যাপারে কাজ শুরু করেছিল। এরপর অনেকগুলি ইসলামী ব্যাংক ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী এ ব্যাপারে এগিয়ে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠান কতখানি সূদ উচ্ছেদ করতে পারছে সে প্রশ্নে না গিয়ে বলা যায় যে, অন্তত কিছু লোক সূদ থেকে বাঁচতে চেষ্টা করছে এবং ইসলামিক ফাইন্যান্স এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির একটা বড় অংশ জুড়ে ব্যাপ্তি লাভ করেছে। যেসব ব্যক্তিবর্গ ও ব্যবসায়ীগণ এর সাথে যুক্ত হয়েছেন, তারা মূলতঃ সূদের অভিশাপ থেকে বাঁচতেই এর সাথে যুক্ত হয়েছেন। তাই এটা যত বেশী প্রসার লাভ করবে, ততবেশী আমরা সূদ থেকে বেঁচে থাকতে পারব। এ প্রসঙ্গে বলা ভাল, দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সকল পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ব্যতীত বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার মাধ্যমে সূদের অভিশাপ থেকে কখনোই মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। আরেকটি বিষয় হ’ল, আমাদের পাঠ্যসূচীতে ইসলামী অর্থনীতি নেই। দু’একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যা আছে, তা খুবই সামান্য এবং অতিরিক্ত পাঠ্য হিসাবে। সূদ বিষয়ক আলোচনা ইসলামিয়াতের সাথে অবশ্যপাঠ্য করা গেলে আরো সচেতনতা সৃষ্টি হ’ত। যে ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজে পড়াশুনা করছে, তারা সূদ কি তাই জানে না। আর এর অভিশাপ সম্পর্কে জানা তো অনেক দূরের ব্যাপার। আমার মনে হয়, সপ্তম শ্রেণী থেকে কলেজ পর্যন্ত হ’লেও ইসলামিয়াতের সাথে ইসলামী অর্থনীতি পাঠ্য হিসাবে থাকা আবশ্যক। কেবল সভা-সমাবেশ করে এ থেকে মুক্ত হওয়া যাবে না। কারণ ছোটবেলা থেকে এ ব্যাপারে মৌলিক ধারণা না পেলে বড় হয়ে কেউ এ থেকে বেরিয়ে আসার কোন নৈতিক তাকীদ অনুভব করবে না।

৩. আত-তাহরীক : জনমত সৃষ্টির জন্য আর কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে?

শাহ হাবীবুর রহমান : জনমত সৃষ্টির জন্য কতকগুলি ক্ষেত্র রয়েছে। যেমন (১) ওয়ায মাহফিলের বিশাল ক্ষেত্র। আমার জানা মতে, এগুলো মূলতঃ মসজিদ-মাদরাসার জন্য চাঁদা উঠানো, কুরআনের তাফসীর, রাসূল (ছাঃ)-এর জীবনী আলোচনা, মাসআলা-মাসায়েল ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু সূদের যে কঠিন গুনাহ এবং সমাজের উপর এর যে ক্ষতিকর প্রভাব, সে সম্পর্কে সেখানে বলা গেলে জনমত গঠনে তা ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারত। (২) সূদ সম্পর্কে গণসচেতনতামূলক পোস্টার তৈরী করা। প্রয়োজন কুরআন ও হাদীছের উদ্ধৃতি সমৃদ্ধ এ ধরনের পোষ্টার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে পারলে এ সম্পর্কে আরো সচেতনতা সৃষ্টি হ’ত। এছাড়া (৩) সূদের উপর ৮ পৃষ্ঠা বা ১৬ পৃষ্ঠার ছোট ছোট বই ছেপে যদি লক্ষ লক্ষ কপি মানুষের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করা যেত এবং সমাজের অর্থশালী সহৃদয় ব্যক্তিবর্গ যদি ছাদাক্বায়ে জারিয়া হিসাবে একাজে আত্মনিয়োগ করতেন, তাহ’লে এগুলো জনমত সৃষ্টিতে খুবই কার্যকর হ’ত। (৪) ইসলামী ভাবধারাপুষ্ট খবরের কাগজগুলিতে এ সম্পর্কে ব্যাপক লেখালেখি হওয়া দরকার। আমি বলছি না যে সেখানে লেখা হচ্ছে না। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই কম। আসলে সূদ উচ্ছেদ কার্যক্রমকে একটি আন্দোলন হিসাবে রূপ না দিতে পারলে আমাদের সামাজিক কাঠামো থেকে কখনোই এ অভিশাপ দূর করা সম্ভব নয়।

৪. আত-তাহরীক : এদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইসলামী অর্থনীতি কি কি ভূমিকা রাখতে পারে?

শাহ হাবীবুর রহমান : সর্বপ্রথম আমাদেরকে জানতে হবে যে, আমরা যে রাষ্ট্রে বসবাস করছি, সেটা কি ইসলামী রাষ্ট্র না মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র? মুসলিম প্রধান দেশ হিসাবেই যদি স্বীকার করি, তাহ’লে বলতে হবে, মুসলিম হিসাবে আমাদের মধ্যে যে ইসলামী জ্ঞান থাকা প্রয়োজন ছিল তা আমাদের নেই। পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত, রামাযানে ছিয়াম পালন, হজ্জের মৌসুমে হজ্জ, জানাযা পড়তে যাওয়া প্রভৃতির মধ্যেই আমাদের ধর্মীয় চেতনা সীমাবদ্ধ। ইসলাম যে পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা; যার সমাজনীতি, অর্থনীতি, রাজনীতিসহ সকল ক্ষেত্রেই পরিপূর্ণ দিক-নির্দেশনা রয়েছে, তা অধিকাংশের নিকটেই স্পষ্ট নয়। আর যাদের স্পষ্ট ধারণা আছে, তারা এগুলি বাস্তবায়ন প্রচেষ্টার জন্য কোন প্লাটফরম পাচ্ছে না। তাছাড়া দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইসলামী অর্থনীতি কি কি ভূমিকা রাখতে পারে তার আলোচনা অনেক ক্ষেত্রেই টেক্সচুয়াল। যদিও তার বাস্তব প্রয়োগ খুবই কম।

যেমন ধরুন, বাংলাদেশে বৃটিশ আমল থেকে মীরাছ আইন চালু রয়েছে। কিন্তু আজকে কোর্টগুলিতে দেখুন, এসংক্রান্ত কত মামলা জমে রয়েছে। যদি এ বিষয়ে চালু থাকা আইনগুলিও বাস্তবায়ন করা যেত, তাহ’লেও অনেকখানি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কল্যাণ অর্জিত হ’ত। এর পিছনে অনেক কারণ বিদ্যমান। যেমন আমাদের অজ্ঞতা, লোভ, হিংসা, মামলার দীর্ঘসূত্রিতা ইত্যাদি। যেমন দেওয়ানী মামলা মানেই প্রায় ৫০ বছর। অথচ এতদিন কারো হায়াত থাকে না। ফলে এসব মামলা থেকে সুফল পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম দাবী হ’ল, ওযনে ফাঁকি না দেওয়া, কারচুপি না করা, সম্পদ মজুদ না করা ইত্যাদি। ইসলামী শরী‘আতে নিষিদ্ধ এসব বিষয়ে বিধিবদ্ধ আইন রয়েছে। তারপরও সবকিছুই চলছে সরকারের নাকের ডগায়। আরো মজার কথা হ’ল, চট্রগ্রামের এক ব্যবসায়ী সম্পর্কে আমি জানি, যিনি নিয়মিত সম্পদের যাকাত দেন, আবার জাহাযে পণ্য আসলে কয়েকদিন সেগুলি আটকে রেখে পণ্যের দাম ইচ্ছামত বাড়িয়ে বিপুল মুনাফা অর্জন করেন। অতঃপর সেই টাকা দিয়ে প্রতিবছর কয়েকজনকে হজ্জে পাঠান আর ভাবেন আমি তো হাজী পাঠিয়েছি। তাদের দো‘আর বরকতেই আমার সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। তিনি যদি ইসলামী অর্থনীতি সম্পর্কে জানতেন এবং মজুদদারীর শাস্তি সম্পর্কে অবগত থাকতেন, তাহ’লে তিনি হয়তো এরূপ পাপের কাজে পা বাড়াতেন না।

সার্বিকভাবে ইসলামী অর্থনীতির কার্যকর ভূমিকার জন্য প্রশাসনিক সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় যথাযথ আইনের শাসন দিন দিন যেন সুদূর পরাহত হয়ে যাচ্ছে। সকলেরই লক্ষ্য ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করা। আর একবার ক্ষমতায় আসতে পারলে তারা মনে করেন, সবকিছু উচ্ছন্নে যায় যাক, নিজেকে কিভাবে ক্ষমতায় স্থায়ী রাখা যায় সেটাই মুখ্য ব্যাপার। তাই এর জন্য যেমন জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে, তেমনি সরকারকেও আন্তরিকভাবে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। ইসলামী অর্থনীতির অনুকূলে বিদ্যমান যে আইন রয়েছে, সেটুকুও যদি বাস্তবায়নে আমরা এগিয়ে আসতে পারি, তাহ’লে বাকীগুলির প্রতি মানুষ আগ্রহী হয়ে উঠবে।

৫. আত-তাহরীক : ইসলামী ব্যাংকিং কি সমাজের বুকে ইসলামী অর্থনীতির সুফল ছড়িয়ে দিতে পারছে?

শাহ হাবীবুর রহমান : প্রশ্নটি খুবই প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপুর্ণ। আমার দৃষ্টিতে ইসলামী ব্যাংকগুলো এক্ষেত্রে ইতিবাচক কিছু কাজ করতে পেরেছে।

প্রথমতঃ ইসলামী ব্যাংকগুলির কারণে সমাজের কিছু মানুষ সূদ থেকে কিছুটা হ’লেও বেঁচে থাকতে পারছে। আমি অনেককেই জানি, যারা বিভিন্ন সূদী ব্যাংক থেকে ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙ্গিয়ে ইসলামী ব্যাংকগুলিতে আমানত রেখেছে। এক্ষেত্রে তারা কিন্তু কেবলমাত্র ঈমানের দাবীতেই সূদ থেকে বাঁচার প্রচেষ্টায় একাজ করেছেন। ফলে দেখা যাচ্ছে, ইসলামী ব্যাংকগুলির গ্রাহক হু হু করে বাড়ছে। এখান থেকে বুঝা যায়, তারা এতদিন ইসলামী অর্থনীতির কোন প্লাটফরম পাননি বিধায় সূদী ব্যাংকে টাকা রাখতে বাধ্য হয়েছেন। তবে এখনও পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের সংখ্যা খুবই অল্প। তাও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড ছাড়া অন্য ইসলামী ব্যাংকগুলি সবাই প্রায় নবীন।

দ্বিতীয়তঃ যে ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীরা এসব ইসলামী ব্যাংকে আমানত রাখছেন, আমি যতদূর জানি তারা অন্তত জেনে বুঝে অন্যায় কাজ করেন না। তারা অনেকখানি চেষ্টা করছেন ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার। এর সাথে আরো বলা যায়, ইসলামী ব্যাংক তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারিত করেছে এসএমই বা ছোট ছোট বিনিয়োগের মাধ্যমে। ফলে অনেক সাধারণ বা নিম্ন আয়ের মানুষ যারা অল্প বিনিয়োগে কাজ করতে চান, তারা কিন্তু সূদী ব্যাংকে না গিয়ে ইসলামী ব্যাংকের কাছে চলে এসেছেন। কারণ সূদের বাহ্যিক সমস্যাটি তারা বুঝেন যে, সূদী ব্যাংকে তারা নির্ধারিত সূদ দিতে বাধ্য। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদেরকে মুনাফার অংশ দিতে হবে মাত্র। আমরা অনেকে সূদ ও মুনাফার মধ্যে পার্থক্য বুঝি না। বরং আমরা দু’টিকে এক করে ফেলি। আমরা যদি পার্থক্যটা বুঝতাম, তাহ’লে এর কল্যাণকারিতাও বুঝতে সক্ষম হ’তাম।

তৃতীয়তঃ ইসলামী ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র্ঋণের বিকল্প হিসাবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ প্রকল্প চালু করেছে। এছাড়াও তাদের ‘পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প’ (Rural Development Scheme) রয়েছে। যার মাধ্যমে তারা লক্ষ লক্ষ গ্রাহকের কাছে পৌঁছে গেছে। তাদের মাধ্যমে আমি তিনটি পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। যেমন তাদের সাথে যুক্ত মহিলাদের অনেকে হয়ত জানতই না যে হিজাব কি। তারা আজ হিজাব পরিহিতা অবস্থায় বাইরে আসছে, ব্যবসা করছে। তারা এখন নিজেরা স্বাবলম্বী হয়ে সূদমুক্ত জীবন যাপনের চেষ্টা করছে। এটা একটা বিশাল ব্যাপার। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই যে, অন্যান্য এনজিওগুলি যেভাবে ক্ষুদ্রঋণ দিচ্ছে, তাতে তাদের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। যেমন পত্রিকার পাতায় দেখা যায়, তারা কিস্তি পরিশোধের জন্য কারো ঘরের চাল খুলে নিচ্ছে, কারো অলংকার ছিনিয়ে নিচ্ছে, এমনকি অনেক মহিলা আত্মহত্যা করছে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের ক্ষুদ্র বিনিয়োগের ব্যাপারে আজ পর্যন্ত এরূপ কোন রিপোর্ট আমরা দেখিনি। আমার জানা মতে, এরকম অবস্থায় ইসলামী ব্যাংক তাদের কিস্তির সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়, কারো প্রাপ্য মওকূফ করে অথবা তাকে দান করে দায়মুক্ত হ’তে সাহায্য করে। এর সাথে সাথে তারা বিনিয়োগ গ্রহণকারীদের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষা ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে ইসলামী ব্যাংক যে সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনে এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। হয়তো এর অনেক সমালোচনাও রয়েছে। তবে আমরা এর মধ্যে যতটুকু কল্যাণকর পাব তার প্রশংসা করব এবং এগুলি যদি বৃদ্ধি পায় তাহ’লে আমরা খুশী হব। উল্লেখ্য যে, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডই কেবল এক্ষেত্রে কাজ করছে। অন্য ব্যাংকগুলি এখনো শুরু করেনি। অথচ শত শত এনজিও এখন এই ক্ষুদ্র্ঋণ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এর মোকাবেলায় ইসলামী ব্যাংক কতটুকুই বা করবে। তারপরও যে তারা করছে সেজন্য তাদেরকে উৎসাহ দিতে চাই, ধন্যবাদ জানাতে চাই। এতে তাদের যা ভুল-ভ্রান্তি হচ্ছে, আমাদের উচিৎ হবে সেগুলো ধরিয়ে দেওয়া। আর তাদের উচিৎ হবে সেগুলো সংশোধন করে নেওয়া।

চতুর্থতঃ এখন যারা সূদী ব্যাংকে কাজ করছে, যারা অর্থনীতি নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের কার্যক্রম সাফল্যের সাথে চলার কারণে তারাও এখন ইসলামী অর্থনীতি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তারা এখন ইসলামী ব্যাংক কি, কেন, এর সুফল কি, তুলনামূলক কোন্ ব্যাংকে কাজ করলে আখেরাতে অধিক কল্যাণ আসবে, সেসব সম্পর্কে জানতে চাচ্ছে। এটাকেও কিন্তু খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।

৬. আত-তাহরীক : প্রচলিত ব্যাংকিং পদ্ধতি কি পুরোপুরি সূদমুক্ত করা সম্ভব? এক্ষেত্রে সরকার কি পদক্ষেপ নিতে পারে?

শাহ হাবীবুর রহমান : প্রচলিত ব্যাংকিং পদ্ধতি পুরোপুরি সূদমুক্ত করা সম্ভব নয়। এটা আমার বক্তব্য নয়, এটি ইসলামী ব্যাংকের পুরোধা ব্যক্তি শেখ ছালেহ কামেল-এর বক্তব্য। তিনি ‘ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক’ (IDB)-এর পুরস্কার পেয়েছিলেন। ‘ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকে’র পুরস্কার দেওয়া হয় এক বছর ‘ইসলামী অর্থনীতি’তে, আরেক বছর ‘ইসলামী ব্যাংকিং’-এ অবদান রাখার জন্য। পৃথিবীর সেরা ব্যক্তিদের মধ্যে বাছাই করে যাঁরা এইসব কাজে অগ্রণী ভূমিকা রেখে থাকেন, তাদেরকে সম্মানজনক স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার  দেওয়া হয়ে থাকে। শেখ ছালেহ কামেল এমন একজন ব্যক্তি, যিনি ইসলামী ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি তাঁর বক্তৃতায় বলেছেন, ‘আমি যদি জানতাম ইসলামী ব্যাংকিং করতে গিয়ে আমাদের অনেক আপোষ করতে হবে এবং সূদী ব্যাংকের মোকাবেলায় এই কাঠামোটি যথার্থ নয়, তাহ’লে ইসলামী ব্যাংকিং-এর জন্য বর্তমান কাঠামো বেছে নিতাম না, বরং অন্য কিছু করতাম’। এ বিষয়ে মাসিক আত-তাহরীক পত্রিকায় বিগত কয়েক সংখ্যায় (ডিসেম্বর’১২ ও জানুয়ারী’১৩ সংখ্যা দ্রঃ) শেখ ছালেহ কামেল-এর  বক্তৃতা প্রকাশিত হয়েছে। আগ্রহী পাঠক সেটি পড়ে নিতে পারেন। আমি সম্পাদককে অনুরোধ জানাবো, সেটি পুস্তিকা আকারে বের করে জনগণের নিকট ছড়িয়ে দিতে। ইসলামী ব্যাংকিং-এর যে ভবিষ্যৎ বিপুল সম্ভাবনা এবং বর্তমান বিদ্যমান সমস্যা জানার জন্য শেখ ছালেহ কামেলের মত লোকের বক্তব্য আমাদেরকে সমাধানের লক্ষ্যে পৌঁছাবে এবং সেটি আমাদের জন্য কল্যাণকর হবে। 

তবে মনে রাখতে হবে, পুরোপুরি সূদমুক্ত করার সম্ভাবনা আদৌ নেই বলে এ ব্যাপারে পিছিয়ে থাকব সেটাও ঠিক হবে না। প্রচলিত ব্যাংকিং ও ইসলামী ব্যাংকিং পুরোপুরি সূদমুক্ত করা যাবে না, এটি অনেক লম্বা সময়ের ব্যাপার। এজন্য আমাদের নিজেদেরকেও বদলাতে হবে। যেমন প্রত্যেক সিডিউল ব্যাংক তাদের আমানতের একটি অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখতে বাধ্য। এটি রাখতে হয় ব্যাংকগুলোর স্বার্থে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ম করে দিয়েছে। যেটা রাখা হয়, তার বিনিময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূদ দেয়। এই সূদ যদি ব্যাংক না গ্রহণ করে তাহ’লে কি হবে? এটা একটি সাধারণ প্রশ্ন। যদি কোন ইসলামী ব্যাংক বলে, আপনাদের এই সূদ নিব না, তাহ’লে পরের দিন তার লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। কারণ সে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ অমান্য করেছে। আমার জানা মতে, ইসলামী ব্যাংকগুলি সূদের টাকাটা নিয়ে নিজেদের আয়ে দেখায় না, বরং এটি অন্য তহবিলে স্থানান্তর করে দেয়। এক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংক যে সূদ গ্রহণ করল, এটা নিঃসন্দেহে একটি শরী‘আত ভায়োলেশন। কিন্তু এটা করা হয় এজন্য যে, এদেশের আইনে ব্যাংকিং ব্যবসার অনুমতির জন্য এটা বাধ্যতামূলক। নইলে সে অনুমতি পাবে না।

দ্বিতীয়তঃ রাষ্ট্রীয় আইনে সূদী ব্যাংকের যে সুবিধাগুলো আছে, ইসলামী ব্যাংকের সে সুবিধাগুলো নেই। যেমন কেউ ঋণখেলাফী হ’লে তার বিরুদ্ধে তারা সরাসরি মামলা করতে পারবে। এতে সূদী ব্যাংকগুলো সহজেই ডিক্রি পেতে পারবে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে শরী‘আহ কাউন্সিলের রায় কি তা জানার পরই মাত্র আদালত রায় দিয়ে থাকে। কারণ বিবাদীপক্ষই শরী‘আহ কাউন্সিলের রায়ের দাবী তোলে। এতে রায় বিলম্বিত হয়। অন্য ব্যাংক যেখানে ছয় মাসে রায় পায়, ইসলামী ব্যাংক সেখানে দু’বছরে রায় পাবে। ফলে তাদের বিনিয়োগকৃত টাকা আটকে থাকবে।

আরেকটি ব্যাপার মনে রাখতে হবে, দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা ইসলামী না হ’লে, ব্যাংক ব্যবস্থা পুরোপরি ইসলামীকরণ করা যাবে না। রাষ্ট্রীয় কাঠামো, আইন ও শাসন, বিচার ব্যবস্থা ও  সমাজ ব্যবস্থাসহ সকল ক্ষেত্রে ইসলামী বিধান চালু থাকতে হবে। তবেই পুরোপুরি ইসলামী ব্যাংকিং আশা করা যায়। জ্যামিতিতে আছে, ক্ষুদ্র কখনো বৃহত্তরের সমান হ’তে পারে না। ক্ষুদ্র একটি অংশ কিভাবে বৃহৎ একটি ব্যাংক ব্যবস্থার মোকাবেলা করবে? তাই এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য আবশ্যক। যেমন উদাহরণস্বরূপ বলি, মালয়েশিয়াতে ইসলামী ব্যাংকিং এবং ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের জন্য সরকার আলাদা আইন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত কোন আইন তৈরী হয়নি। যা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রেয়াতি বা ছাড় দেওয়া ব্যবস্থা। আর বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়া কোন প্রতিষ্ঠান এটা পারবেও না। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীগুলোও তাই। এগুলো একটা রেয়াতি ব্যবস্থার উপর চলছে। কিন্তু একটা আইন হওয়া দরকার ছিল। তারপরও বলব, ঐ আইনটি শুধু ব্যাংকের জন্য, গোটা দেশের জন্য নয়। সামগ্রিক কাঠামোয় ইসলাম না থাকলে, কেবল ব্যাংকিং সিস্টেম ইসলামীকরণ করা কঠিন। সুতরাং বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থা পুরোপুরি সূদমুক্ত করা সম্ভব নয়, কিছুটা করা সম্ভব।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট যিয়াউল হক-এর সময় আইন করা হ’ল যে, ব্যাংক ব্যবস্থা ইসলামীকরণ করতে হবে। একে একে দেশের কমার্শিয়াল ব্যাংক, ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন, হাউজ বিল্ডিং কর্পোরেশন ও বিদেশী ব্যাংকগুলিকে ইসলামীকরণ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হ’ল এবং এর জন্য একটা সময়ও বেঁধে দেওয়া হ’ল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যিয়াউল হককে জানিয়ে দেওয়া হ’ল যে, দেশীয় ব্যাংক, ইনভেস্টমেন্ট হাউজ এবং ফাইন্যান্সিয়াল হাউজগুলি ইসলামীকরণ হয়েছে। কিন্তু বিদেশী ব্যাংকগুলো কথা শুনছে না। এটা শোনার পর প্রেসিডেন্ট যিয়াউল হক ইসলামাবাদ ও লাহোরে যে সমস্ত ব্যাংকের হেড অফিস ছিল তাদের পরিচালকদের তাঁর অফিসে চা-এর দাওয়াত দিলেন। চা-এর আসরে তিনি তাদেরকে একটি ছোট্ট প্রশ্ন করলেন, দেখুন! আমি যদি আপনাদের দেশে ব্যবসা করি বা ব্যাংক করি আমার করণীয় কি হবে? তারা বলল, আপনি সরকারের অনুমতি নিবেন, লাইসেন্স নিবেন এবং সরকারী আইনগুলি মেনে চলবেন। তনি বললেন, আপনারা কি সেই কাজটি করেছেন? তারা বলল, আমরা বুঝতে পারছি, ইয়োর এক্সেলেন্সি। তিনি বললেন, আমরা যে আইন করেছি, তাতে ব্যাংক কাঠামো ইসলামীকরণ করতে হবে, এটা আপনারা মানেননি। বরং পুরোনো সিস্টেম (অর্থাৎ সূদী ব্যবস্থা) চালু রেখেছেন। আমি আশা করছি আপনারা এটা করবেন। অন্যথায় আপনারা ব্যবসা বন্ধ করে দিন। এতে তারা বুঝল প্রেসিডেন্ট কি বলতে চাচ্ছেন। তখন তারা অচিরেই কাজটি করবে বলে ওয়াদা করেছিল। পরে যিয়াউল হক মারা গেলে তারা পূর্বের অবস্থায় ফিরে গেল।

রাষ্ট্র চাইলে যে পরিবর্তন আনতে পারে এটা তার একটা উদাহরণ। কাজেই আমাদেরকে চাইতে হবে। রাষ্ট্রের আইন কাঠামো বদলাতে হ’লে সংসদে আইন পাস হ’তে হবে, জনগণকে জানাতে হবে এবং সে আইনগুলো আদালতের মাধ্যমে প্রয়োগ করতে হবে, তাহ’লেই কাংখিত পরিবর্তন সম্ভব। নতুবা শুধু বক্তৃতা করে কিংবা মোটিভেট করে কাজ হবে না, সম্ভবপর নয়। কারণ মানুষের মধ্যে প্রবণতা আছে অন্যায় করার, প্রবণতা আছে ফাঁকি দেওয়ার। তা না হ’লে শয়তান আছে কেন? তার কাজই তো হ’ল ওয়াসওয়াসা দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা। কাজেই সরকার যদি চান অনুমতি দিতে পারেন। যেমন ইসলামী ব্যাংকগুলো বিশেষ ব্যবস্থার অনুমতি নিয়েছে। কিন্তু পুরোপুরি ইসলামীকরণ করতে গেলে ব্যাংক ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। সেইসঙ্গে আইন ঢেলে সাজাতে হবে। তাছাড়া এটা কখনোই সম্ভব নয়।

৭. আত-তাহরীক : বর্তমান বিশ্বে সম্পূর্ণরূপে সূদমুক্ত ইসলামী নিয়মানুসারে পরিচালিত কোন ইসলামী ব্যাংক আছে কি?

শাহ হাবীবুর রহমান : আমার জানা মতে, পরিপূর্ণ সূদমুক্ত এবং ইসলামী নিয়মানুসারে পরিচালিত কোন ব্যাংক বর্তমান বিশ্বে নেই। যদিও একটা ব্যাংকের কথা অনেকেই বলবেন, সেটা হ’ল ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (IDB)। তবে তাদের কাঠামো সম্পূর্ণ ভিন্ন। সকল মুসলিম দেশের অর্থমন্ত্রী এর সদস্য এবং সকল মুসলিম দেশ এর তহবিলে অংশগ্রহণ করে। এই টাকা দিয়ে ব্যাংকগুলো তার আমানত তৈরী করেছে এবং তা  থেকে বিনিয়োগ করে। IDB সর্বদাই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে লেনদেন করে। কোন ব্যক্তি বা শ্রেণীর সাথে লেনদেন করে না। এমনকি যদি বৃত্তি প্রদান করে তবুও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বৃত্তি প্রদান করে। যেমন ঢাকাতে একটি IDB ভবন আছে, এটা বাংলাদেশ সরকারের সাথে চুক্তি করেই হয়েছে। এই ভবনের টাকা প্রদান করেছে IDB এবং জমি প্রদান করেছে বাংলাদেশ সরকার। ঐ ভবনের ভাড়া থেকে যে আয় হয়, তা দিয়ে IDB বৃত্তি প্রদান করে IT সেকশন-এর ট্রেনিং দেওয়ার কাজ করছে। এটা একটা উদাহরণ। তারা প্রত্যেকটি সদস্য মুসলিম দেশে অর্থনীতির উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেটুকু অংশ নিয়েছে তার সবই সরকারের সক্রিয় সহযোগিতায়। কাজেই IDB-এর কথা বিবেচনায় আনা যাবে না।

আসলে সমাজের সদস্যদের নিয়ে দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি। এই বিচারে ইসলামী ব্যাংক না বাংলাদেশে, না মালয়েশিয়ায়, না ইউরোপে কোথাও পুরোপুরি সূদমুক্তভাবে চালু নেই। খোদ সঊদী আরবেও সূদী ব্যাংক চালু আছে। কাজেই আমরা যদি কোন ব্যাংককে সূদমুক্ত করতে চাই, তাহ’লে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পুরোপুরি সূদমুক্ত হ’তে হবে। অন্যথায় সম্ভব নয়। বাহরায়েন এবং কুয়েত সম্পর্কে আমার সুস্পষ্ট ধারণা নেই। কারণ গত কয়েক বছর এ সম্পর্কে পড়াশুনা করার সুযোগ আমার হয়নি। কাজেই মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর ব্যাংকিং অবস্থা কি সে সম্পর্কে স্পষ্টভাবে বলা কঠিন। তবে সেখানে যেহেতু সূদী ব্যাংক আছে, সুতরাং একটি কমন ফরমেটে ব্যাংকগুলো চলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংকের জন্য বিভিন্ন আইন করলে সে নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সেকারণে আমার ধারণা, ঐসব দেশে যে ইসলামী ব্যাংকগুলো আছে, তারাও এদেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোর মত সর্বতোভাবে সূদমুক্ত নয়। যেমন ব্যাংকিং-এর ক্ষেত্রে তারা কতকগুলো নির্দিষ্ট পদ্ধতিতেই বিনিয়োগ করে। ইসলামী ব্যাংকিং-এর মূল যে রূহ মুযারাবা ও মুশারাকা তারা সেদিকে যেতে পারছে না। মুরাবাহা দিয়েই তারা কাজ করছে। দেশে-বিদেশে ইসলামী ব্যাংকগুলির বার্ষিক রিপোর্ট পর্যবেক্ষণ করে দেখুন, তাদের মোট আমানতের ৭০ ভাগ বিনিয়োগ করছে মুরাবাহার মাধ্যমে। আর মুরাবাহা তো ব্যবসা মাত্র। সেখানে কোন ঝুঁকি নেই বললেই চলে। আর বাকী মৌলিক পদ্ধতি অর্থাৎ মুশারাকা, মুযারাবা, শিরকাতুল মিলক সেগুলো কোথায় গেল?

জনগণের আকাংখা ছিল যে, ইসলামী ব্যাংকগুলো শরী‘আতের পুরোপুরি পাবন্দ হবে। সেক্ষেত্রে বলা যেতে পারে ইসলামী স্বর্ণযুগে যে পদ্ধতিগুলো ছিল সেগুলো পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছে না। বিশেষ করে ‘মুযারাবা’, যেটা ইসলামী ব্যাংক করতে পারতো বা পারা উচিত বলে আমরা মনে করি, সেখানে ইসলামী ব্যাংকগুলো শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের প্রায় সকল দেশে খুবই দুর্বল অবস্থায় আছে। এর কারণ সরকারী আইন তো আছেই। তার চেয়ে বড় কথা মানুষ। মানুষ তৈরী করতে না পারলে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা কখনোই সম্ভব নয়। বাস্তবে দেখা গেছে, একই ব্যক্তি ইসলামী ব্যাংক থেকে বিনিয়োগ নিয়েছে এবং অন্য ব্যাংক থেকে টাকা ঋণ নিয়েছে। সে ঋণ শোধ করেছে, কিন্তু বিনিয়োগের টাকা শোধ করেনি। কারণ তার যুক্তি, আমাদের তো পার্টনারশীপ ব্যবসা। লোকসান হ’তেই পারে। এই জাতীয় আচরণে ব্যাংকেরও ক্ষতি, জনগণের ইমেজের ক্ষতি। কাজেই ইসলামী ব্যাংকিং সিস্টেম যদি পুরোপুরি ইসলামীকরণ করতে হয়, তাহ’লে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও আইন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে এবং সবার আগে জনগণের মনমানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে।

দেখুন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছেন। মদীনার লোকজন সঙ্গে ছিলেন বলেই তিনি সেখানে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করতে পেরেছিলেন। সেখানে বিরোধিতা ছিল, কিন্তু তিনি তা দূর করেছিলেন মদীনার আনছার এবং মুহাজির ছাহাবীদের সহযোগিতায়। আমরা কি তা করতে পেরেছি? শুধু ওয়ায করে বা পরামর্শ দিয়ে কাজ হবে না। ইসলামী ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্স সিস্টেম প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু ত্যাগ স্বীকার করা প্রয়োজন। আর এ ত্যাগ স্বীকার করবেন দেশের বিত্তশালী ব্যক্তিরা। তারা ত্যাগ স্বীকার না করা পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকিং পুরো সফল হ’তে পারবে না। যদি মনে করি, ব্যাংকে টাকা রাখলাম। লাভটা চাই, লোকসান নিতে হ’লে আমি তাতে নেই, তাহ’লে তো ব্যাংক চলবে না। অথচ মুযারাবা ও মুশারাকা পদ্ধতিতে কখনো কখনো লোকসান থাকবেই। এই লোকসানটা যদি আমরা মেনে নিতে না চাই, তাহ’লে ইসলামী ব্যাংকিং-এর মূল রূহ অর্থাৎ শরী‘আতের পূর্ণ অনুসরণ, সেটা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।

৮. আত-তাহরীক : আত-তাহরীকের সার্বিক মান বৃদ্ধির জন্য আপনার পরামর্শ কি?

শাহ হাবীবুর রহমান : আত-তাহরীক-এর মান বৃদ্ধির জন্য আমার প্রথম পরামর্শ হ’ল (১) ভাল কাগজে এটি ছাপাতে হবে। আমি তাহরীক-এর অনেক পাঠককে দেখেছি, তারা পত্রিকার পুরাতন সংখ্যাগুলি বাইন্ডিং করে সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখেন। কিন্তু নিউজপ্রিন্ট কাগজ সংরক্ষণের উপযোগী নয়। ভাল কাগজে ছাপলে হয়ত পত্রিকার মূল্য বৃদ্ধি পাবে। তবে আমার মনে হয়, ভর্তুকি দিয়ে হ’লেও এ কাজটি করা দরকার। কাগজ খারাপ হওয়ার কারণে পত্রিকাটি ফটোকপি কালচে হয়। অতএব মান বৃদ্ধির জন্য আমার প্রথম পরামর্শ হ’ল কাগজের মান বৃদ্ধি করতে হবে। (২) সম্পাদকীয় লেখার অক্ষর খুবই ছোট হওয়ায় পড়তে কষ্ট হয়। তাই এ ব্যাপারে অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে সম্পাদকীয়দু’তিন পৃষ্ঠাব্যাপী হৌক। তাতে পড়তে সুবিধা হবে। (৩) অর্থনীতি ও রাজনীতির পাতা প্রত্যেক সংখ্যায় অবশ্যই থাকতে হবে। এই পাতায় লেখা হবে তিন ধরনের। (ক) নবী-রাসূলের যুগের কিছু ইতিহাসমূলক লেখনী (খ) ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈ, তাবে-তাবেঈন, উমাইয়া, আববাসীয় যুগের কিছু ভালো-মন্দ ইতিহাস, যেগুলি হবে শিক্ষণীয় ও অনুসরণীয় (গ) এবং আধুনিক যুগের প্রেক্ষাপটে তুলনামূলক আলোচনা। এক্ষেত্রে আধুনিক বিষয় নিয়ে বিভিন্ন ভাষায় যারা লিখছেন, সেগুলো অনুবাদ করে হ’লেও ছাপানো উচিত। এছাড়া আরো বলব, (৪) বাইরের দুনিয়ায় কি ঘটছে, তা আত-তাহরীক-এর মাধ্যমে পাঠকরা জানতে চায়। আমরা মধ্যপ্রাচ্যের খবর, সেখানের রাজনীতি, অর্থনীতি কেমন চলছে, তা খুব কম জানতে পারি।  অথচ জানার মাধ্যমেই আগ্রহ সৃষ্টি হয়, মানসিকতা তৈরী হয়। তাই পাঠকদের অধিক জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য বাইরের গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলি নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে।

৯. আত-তাহরীক : আত-তাহরীকের জন্য আপনার মূল্যবান সময় ব্যয় করায় আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

শাহ হাবীবুর রহমান : আপনাদেরকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।