প্রবন্ধ

আত-তাহরীকের সাহিত্যিক মান

প্রফেসর মুহাম্মাদ নযরুল ইসলাম
প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সাবেক ভাইস প্রিন্সিপ্যাল (অবঃ) সরকারী এম.এম. কলেজ, যশোর।

 

আত-তাহরীক অফিস থেকে ‘আত-তাহরীক-এর সাহিত্যিক মান’ এ বিষয়ের ওপর একটি নিবন্ধ লিখে দেবার পত্রটা যখন এল, তখন একেবারেই বিপন্ন বোধ করলাম। হাতের কাছে রাখা তাহরীকের একটি সংখ্যা চোখের সামনে তুলে ধরলাম। এর প্রথম প্রচ্ছদের ওপরেই লেখা আছে ‘ধর্ম সমাজ ও সাহিত্য বিষয়ক গবেষণা পত্রিকা’। পত্রিকাটির যতগুলো সংখ্যা আমি পড়েছি তার প্রত্যিকটিতেই এই একই কথা লেখা আছে। বার বার পড়েছি অথচ ‘সাহিত্যিক মান’ এ বিষয়টার গুরুত্ব কেন চিন্তায় এল না? কেন? এই কেন প্রশ্ন মাথায় যখন এল, তখনই বিদ্যুৎ চমকের ন্যায় এক বিশাল সত্যের জগৎ চোখের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। প্রথমত যাদের দিলের তামান্না থেকে এ পত্রিকার জন্ম হয়েছে, যাদের জ্ঞান, ইচ্ছা অভিপ্রায়, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যা আমি বিলক্ষণ জানি এবং তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যে যে দলটিকে তারা সংগঠিত করেছে এবং যার মুখপত্র করেছে এই পত্রিকাটিকে সে দলের ও সামগ্রিক গতি-প্রকৃতিও আমার দৃষ্টি সীমায় আছে। সেই সব জান্নাতী কাফেলার নকীব-রাহবার আর কর্মীদের চোখের আলো দিয়ে আত-তাহরীকের পাতায় চোখ ফেলতেই এ পত্রিকার সাহিত্যিক মান’ কোথায় এবং তার গুরুত্ব কতটুক, আর প্রয়োজনীয়তাও বা কতটুকু সব কিছুই দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট প্রতিভাত হয়ে গেল। কিন্তু ভয় পেয়ে গেলাম সাথে সাথে যে পটভূমিকার ওপর দাঁড় করালে এ পত্রিকার ‘সাহিত্যিক মান’ সহজে নির্ণয় করা যায়, তার বিশাল পরিধির কথা চিন্তা করে। সারা দুনিয়ার, বিশেষ করে এশিয়া ও ইউরোপের প্রাচীন ও আধুনিক প্রচলিত সাহিত্যের বিপুল ভান্ডার, যশ ও খ্যাতির শীর্ষস্পর্শী অগণিত কবি ও সাহিত্যিক এবং স্তাবকবৃন্দের অজস্র লেখার পর্বতসম স্তূপ এক দিকে। অন্যদিকে মধ্য যুগের রুমী, হাফিজ, খৈয়াম, আত্তার, গাযালী, এদের অজস্র রচনাবলী, আধুনিক কালের ইখওয়ান, জামাত এসব দলের মুসলিম এবং ইসলামী নামের চোখ ধাঁধানো রচনাবলী, হাসানুল বান্না, কুতুব ভ্রাতৃদ্বয়, আউদা শহীদ, ভারতীয় অসংখ্য সাহিত্যিক এবং তাদের দলের প্রচন্ড আন্দোলনের জোয়ার, এ বিশাল পটভূমির পাশে ক্ষীণকায় সাধু ফরমার আত-তাহরীক, যার নাক টিপলে এখনও দুধের গন্ধ পাওয়া যায় তাকে দাঁড় করিয়ে এর মান বিচার না করলে এ পত্রিকার মান যাচাই করা সম্ভব নয়। এই কঠিন চিন্তায় ভীত নয়, আতংকিত হয়ে পড়লাম। কীভাবে এ অসাধ্য সাধন করা যায়, পথ কোথায়, আলো কোথায়? ইসলামের জন্যে কারো বক্ষদেশ খুলে দিতে চাইলে আল্লাহ পাক তাকে ‘নূর’ দেন। পবিত্র কুরআনের অত্যন্ত পরিচিত আয়াত  সেই  ‘নূর’  হয়ে  চোখের  সামনে  ভেসে উঠল, সে

আলোয় যখন দেখলাম তখন দেখলাম ওপরে বর্ণিত কবি-সাহিত্যিকের সংখ্যা যতই বেশী হোক না কেন এবং দেশ ও কালের যে স্থান ও সময়ে এরা জন্মাক না কেন, যত ভাষায় এবং ভঙ্গীতে এরা লিখুক না কেন, এরা সবাই এক শ্রেণীভুক্ত। এদের অন্য কোনই শ্রেণী নেই।

প্রিয় পাঠক! আপনি দয়া করে পবিত্র কুরআন খুলুন, দেখুন এই মহাগ্রন্থের ২৬নং সূরাটির নাম শু‘আরা। অর্থঃ কবিগণ। এই সূরাটির ২২১ থেকে ২২৬ পর্যন্ত আয়াতের বাংলা অর্থ আমি আপনাদের শোনাই, আপনারা মূলের সাথে মিলিয়ে নিন।-

(২২১) তোমাদেরকে কি জানাবো কার নিকট শয়তানেরা অবতীর্ণ হয়? (২২২) তারা তো অবতীর্ণ হয় ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীদের নিকট। (২২৩) তারা কান পেতে থাকে এবং তাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। (২২৪) আর কবিদের অনুসরণ করে যারা তারা বিভ্রান্ত (গা-ঊন)। (২২৫) তুমি কি দেখো না তারা বিভ্রান্ত হয়ে (কল্পনার জগতে) প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? (২২৬) এবং তারা যা বলে তা তারা করে না’।

এই তালিব আর তাদের মাতলূব, অনুসরণকারী আর কবিদের উভয়কে আল্লাহ কি আখ্যা দিলেন? এরা ‘গা-উন’ বিভ্রান্ত। এসব কবি-সাহিত্যিকগণের শ্রেণী একটাই, নাম একটাই এরা হ’ল আশ-শু‘আরাউল গাউন ‘বিভ্রান্ত কবিগণ’। মুশরিক সাহিত্যিকগণ সবাই এই শ্রেণীভুক্ত। ‘সাব‘আ মুয়াল্লাক্বা যুগের জাহিল আরব কবিদেরকেও আল্লাহ এই গা-উন শ্রেণীতে ফেলেছেন। দেখুন সূরা নাজমের ২নং আয়াত এবং সূরা আ‘রাফের ১৭৫, ১৭৬ আয়াত দু’টি দেখে নিন।

এবার আসুন, অতি প্রশংসায় সিক্ত অভিষিক্ত ‘মুসলিম’ কবি সাহিত্যিকদের অবস্থা কি দাঁড়ায় তা পরখ করে ফেলি। গাযালী এবং ইরানী কবি-সাহিত্যিকগণ প্রত্যেকেই ছিলেন বাতিল ছূফী তরীকার মুক্বাল্লিদ। এদের প্রত্যেকের গলায় তাদের গুরুদের পাকানো মোটা উট বাঁধার রশি প্যাঁচানো। গুরুর তরীকার গোলক ধাঁধায় দিকভ্রান্ত। হাসানুল বান্না, কুতুব ভ্রাতৃদ্বয় এবং আউদা শহীদের ইখওয়ানুল মুসলিমীনের বর্তমান অনুসারীদের দেখুন। দেখুন মিসরে মুরসি ছাহেবরা কি নাজেহাল অবস্থা করে ফেলেছে। কেন তাদের এই করুণ দশা! পাশ্চাত্যের পুঁুজিবাদী গণতন্ত্রের পূজা করতে গিয়েই ঐ দশায় পড়েছে তারা। ইখওয়ানের জন্যে মিসরীয় পন্ডিতগণ ইসলাম প্রতিষ্ঠার জান্নাতী তরীকার সন্ধান তাদের সমগ্র রচনায় দিয়ে যাননি। তাদের লেখায় বিপ্লবের আগুনঝরা প্রেরণা সুনিশ্চিতভাবেই ছিল। কিন্তু হাদীছে রাসূল (ছাঃ)-এর পথ দেখাতে তারা ব্যর্থতার গ্লানি রেখে গেছেন।

এবার নিজের দেশের বর্তমান গৃহযুদ্ধের আগ্নেয় পরিবেশটার দিকে দেখুন! এদেশের কোর্টগুলোতে আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন? শাহবাগ চত্বরে কি দেখছেন? গণতন্ত্রের পূজা করতে গিয়ে কারা আজ দেশকে জাহান্নাম বানিয়ে ছেড়েছে? এরা সবাই পাশ্চাত্যের প্রভু আর স্বীয় গুরুদের মুক্বাল্লিদ সাজতে গিয়ে একদল সম্পূর্ণভাবে ইসলাম ছেড়েছে, অন্য দল বিশুদ্ধ হাদীছের পথ পরিহার করে এই অবস্থার সৃষ্টি করেছে। এদের সম্পর্কে কথা আমার চেয়ে আপনারা কম জানেন না। বেশি বলার প্রয়োজন আছে কি?

এতক্ষণ তত্ত্বকথা শুনেছেন, এবারে আমি আপনাদের বাস্তব কিছু নিদর্শন দেখিয়ে এ প্রবন্ধের ইতি টানতে চেষ্টা করব। বিভ্রান্ত কবিদের শ্রেষ্ঠতম কয়েকজন কবি-সাহিত্যিক সম্পর্কে এবং তাদের রচনার নমুনা আপনাদেরকে দেখানো যাক। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকবি প্রাচীন গ্রীসের হোমার[1], তার সম্পর্কে অন্যতম দার্শনিক সক্রেটিসের[2] অতি শালীন মূল্যায়ন দেখুন-

(১) ‘হোমার যে বলিয়াছেন, মিউসের অর্থাৎ সর্বপ্রভুর (আল্লাহ্র) সামনে ভাল ও মন্দের দুইটি পাত্র রহিয়াছে এবং সব ভাল ও মন্দ সেই দুই পাত্র হইতেই আসে। তাই যেই মানুষের ভাগ্যে কল্যাণের পাত্র পড়িয়াছে তাহার সর্বত্রই কল্যাণ দেখা দেয় এবং যাহার ভাগ্যে অকল্যাণের পাত্র রহিয়াছে, তাহার সব কিছুতেই অকল্যাণ দেখা দেয়। আর যাহার ভাগ্য উভয় পাত্র হইতে আসিয়াছে তাহার কল্যাণ ও অকল্যাণ দুই-ই দেখা দিবে’।- এই ধারণার সহিত একমত হওয়া যায় না’।... প্লেটোর Republic গ্রন্থ থেকে অনুবাদ করেছেন মাওলানা আবুল কালাম আযাদ তাঁর বিখ্যাত উম্মুল কুরআন তাফসীরে। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

উল্লেখ্য যে, প্লেটো[3] যে আদর্শ রাষ্ট্রের পরিকল্পনা করেছিলেন সে রাষ্ট্রে তিনি কবিদের নাগরিকত্বের অধিকার দেননি।[4]

(২) সারা ইউরোপের শ্রেষ্ঠ কবি কে? শেক্সপিয়ার[5]। শোনা যায় ইংরেজরা তাদের স্বর্গরাজ্য লন্ডন শহরও শেক্সপিয়ারের বিনিময়ে বিক্রি করতে পারে। এই মহাকবির নিকট মানুষ আর বেচারা সৃষ্টিকর্তার অবস্থা জেনে নেওয়া যাক।-

Life is but a walking shadow

It is a tale told by an Idiot

Full of sounds and fury

Signifying nothing

A poor player that struts and frets his hour

Upon the stage, then is heard no more.

‘জীবন কিছুই নয় একটা চলমান ছায়া মাত্র। এটি একটি কাহিনী, যা বর্ণিত হয়েছে একজন বেওকুফের মাধ্যমে। যা স্রেফ হৈ-চৈ ও অসার কথামালা দ্বারা পূর্ণ। একজন হতভাগা অভিনেতা যে নাট্যমঞ্চে কিছু সময় সদম্ভে পদচারণা করে ও লম্ফ-ঝম্প করে। অতঃপর আর কিছুই শোনা যায় না’।

(৩) ইরানী কবি প্রিয়ার মুখের একটি লাল তিলের বিনিময়ে সমরকন্দ ও বোখারা বিক্রি করতে রাযী ছিলেন।[6]

(৪) বিশ্বকবি[7] কে? আপনার ঘরের যে শিশুর মুখের দুধেদাঁত সব গিরে যায়নি, তার কাছেই জিজ্ঞেস করে জেনে নিন। মৃত্যুর মাত্র এগারো দিন আগে কি জীবন দর্শন নিয়ে চির বিদায় নিয়ে গেলেন? কোথায় গেলেন?

বৎসর বৎসর চলে গেল

দিবসের শেষ সূর্য

শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল

পশ্চিম সাগর তীরে

নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়

কে তুমি?

পেল না উত্তর \

প্রথম দিনের সূর্য/ ১১ই শ্রাবণ, ২৭ জুলাই ১৯৪১

= মৃত্যু ২২ শ্রাবণ।

মানুষের (সত্তার) আবির্ভাব কেন হ’ল এবং সে-ই বা কে, কবি তার কিছুই জানলেন না। শেষ গন্তব্য তার কোথায় তাও থেকে গেল অন্ধকারে। আশ্রয়হীন।

(৫) বাইবেল ঈসা (আঃ)-এর যবানী তৈরী করেছে ‘খেকশিয়ালেরও একটা থাকবার গর্ত অন্তত থাকে। কিন্তু ঈশ্বরপুত্রের তা-ও নেই’। কি সাংঘাতিক দুর্দশা!

(৬) বাংলা সাহিত্যে শাহেনশাহ[8] (সাহিত্য সম্রাট) কে?  তাও আপনার অপগন্ড শিশুর কাছে জিজ্ঞেস করুন। ঝটপট বলে ফেলবে। তার কাছ থেকে বাঙালী মুসলমানের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় জেনে নেয়া যাক-

‘ইংরেজ এক জাতি, বাঙ্গালী বহুজাতি.... তাদের মধ্যে চারি প্রকারের বাঙ্গালী পাই। প্রথম আর্য, দ্বিতীয় অনার্য হিন্দু, তৃতীয় অর্যানার্য হিন্দু, আর তিনের বার এক চতুর্থ জাতি, বাঙ্গালী মুসলমান। সমাজের নিম্নস্তরেই বাঙ্গালী অনার্য বা মিশ্রিত আর্য ও বাঙ্গালী মুসলমান’ (বঙ্গদর্শন পত্রিকা ১২৮৭ অব্দ)। কি ভাই, কোন ক্লাসে পড়লেন? থার্ড ক্লাসে না তারও একধাপ নিচে? জাতি পাগল ভাই মাথায় হাত চেপে ধরেননি তো! দুনিয়ার প্রতীক দৃশ্য দেখলেন? এরাই তো গাঊন শো‘আরা। এটাই সাহিত্যিক দুনিয়া। এই হ’ল তাদের সাহিত্যের মান। কি দুর্দশা! কি দুর্দশা!

এবারে আসুন গাঊনদের ‘জান্নাত’ (না, জাহান্নাম) ঘরে আপনাদের ঘুরিয়ে নিয়ে আসি। আসুন ভাই আমার পেছনেই আসুন। মতিহারের বিশাল বিশাল ভবনের একটি হ’ল ‘বইয়ের ঘর’ (লাইব্রেরী) ঢুকে পড়ুন। দেখুন সারি সারি অগণিত আলমিরা। তাকের পর তাকে বই সাজানো। ধূলোর আর মাকড়সার জালের পুরু আস্তরে ঢাকা। উদাস কিছু তালিব। বেশীক্ষণ দাঁড়ানো ঠিক নয়। আসুন এসব বইয়ের পাঠকক্ষে একবার ‘ঢু’ মেরে আসি। ছায়াবাজি ভোজবাজির তামাশা দেখছেন কি? উঁচু ডায়াস পাতা, একজন কৃষ্ণচর্মের সাহেবী পোষাকের দেশী বঙ্গসন্তানকে দেখতে পাচ্ছেন? উনি বক্তব্য দিচ্ছেন। অপূর্ব বাচন ভঙ্গী, অনর্গল কথন, ঐসব বই-পত্তর সবই স্মৃতির ডিস্কে গাঁথা। লাইনের পর লাইন সমানে আওড়ানো। সামনে কাদেরকে দেখছেন? উভয় লিঙ্গের সমসংখ্যক তালিব। ওদের চোখের ভাষা দেখতে পাচ্ছেন, মাতলুবের দিকে? না কাদের সাথে ওদের চোখের বিনিময়? এখানে বেশী দাঁড়ানো নিরাপদ নয়। ধমক খাওয়ার বিপদ আছে।

আপনার কি জানা আছে এদেশের একজন স্বঘোষিত নাস্তিকের লাশটা কোথায় রক্ষিত আছে? ডাক্তার ছাত্রদের অস্থিবিদ্যার ল্যাবরেটরিতে। ফিরাঊনের লাশ যে কারণে আল্লাহ রক্ষা করেছেন, নাস্তিক আহমদ শরীফের লাশটাও সেই উদ্দেশ্য পূরণ করার জন্যে আল্লাহ স্বয়ং ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ডাক্তার ছাত্ররা দেখুক আর ভাবুক এই সেই অমুকের পুত্র অমুক।[9]

ছায়াছবির বিপরীত দিক

আশ- শু‘আরাউল মুমিনূন

আত-তাহরীক

বন্ধুগণ! এবারে আপনার হাতের আত-তাহরীকের প্রচ্ছদ পৃষ্ঠাটা উল্টান। প্রথমে দেখুন এক পাতার একটি সম্পাদকীয়। বিগত ১৫ বছরে বহু সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে এতে। এগুলির বিষয়বস্ত্ত কী? আপনি দুনিয়ার খবর যতটুকু রাখেন দেখুন, এ দুনিয়া এখন কঠিন ব্যাধিগ্রস্ত, সর্বাঙ্গ জুড়ে ব্যাধি। জীবনের এমন কোন দিক ও বিভাগ আপনি পাবেন না যেখানে এ ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হয়নি। আত-তাহরীকের সম্পাদক তাঁর সুপারসোনিক দৃষ্টি দিয়ে প্রতিটি সম্পাদকীয়তে একেকটি ব্যাধি চিহ্নিত করেছেন। ব্যাধির মূল নির্ণয় করেছেন। নিরাময়ের নির্ভুল ব্যবস্থাপত্রও দিয়েছেন। শুধু এতেই ক্ষ্যান্ত হননি, স্বস্তি পাননি। দুনিয়া থেকে ব্যাধির জড় উপড়ে ফেলার জন্যে একদল নিবেদিতপ্রাণ কর্মী সৃষ্টি করেছেন এবং নিজে সে কাফেলার সিপাহসালার হিসাবে অগ্রে অগ্রে দৃপ্ত পদে এগিয়ে চলেছেন। একে শুধু অলস পন্ডিতের অসার কথা বলবেন? আমি তো দেখি ঊর্ধ্বাকাশ বিহারী এক স্বর্গ ঈগল দুনিয়ার আকাশে বিচরণশীল। তীক্ষ্ণ চক্ষু, যা সুপার রাডারকে হার মানায়। দুনিয়ার সকল অন্ধি-সন্ধি কোনটাই তার চোখের বাইরে যেতে পারছে না। সব ধরনের সমস্যার প্রতি সজাগ দৃষ্টি। আপনি কি কখনও ভেবেছেন একটাই ব্রেণ, কত তার কোষ-কলা? প্রতিটি কলায় সাজানো রয়েছে জ্ঞানের ভিন্ন ভিন্ন শাখার বিপুল সম্পদ। বহুমুখী পান্ডিত্য কি শুধু? না বহুদর্শীতা, না ত্রিকাল দর্শীতা? বিশাল সুপার কমপিউটার। তার তথ্যের ভান্ডার পরিপূর্ণ। এ সম্পাদকীয় কেবল তারাই বুঝতে পারে যারা সম্পাদকের দেখানো পথে তার সাথে সাথে সৈনিক বেশে মার্চ করে। প্রতিটি বাক্য ঋজু, প্রাঞ্জল, বাহুল্য অলংকার একটুও নেই। যে নিজেই সোনা, তার আবার বাড়তি অলংকারের প্রয়োজন কি? সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ শাখাকে সমুন্নত বা Sublime সাহিত্য বলে। সাবলাইম সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গুণ তার বিষয়বস্ত্তর গৌরব। তার সততা, কল্যাণময়তা, সার্বজনীনতা, সর্বমুখিনতা। কালকে জয় করার হার্দিক শক্তি। সম্পাদকীয়গুলোয় কি তার কিছুটা ঝলক দেখা যায় না?

দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মানুষের বিচারের তিনটি মানদন্ড নির্ধারণ করেছিলেন আমেরিকার ইহুদী অধ্যাপক জুয়েল ম্যাসারম্যান, আর একজন ফরাসি অধ্যাপক লা মার্টিন। সেই মানদন্ড তিনটি হ’ল, এক. উদ্দেশ্যের সততা। দুই. সাধ্যের স্বল্পতা। তিন. উল্লেখযোগ্য সাফল্য। বাড়তি একটা প্রাসঙ্গিক তত্ত্বও তারা বলেছিলেন, সেটি ঐ মূল তিনটির অন্তর্ভুক্ত, অনুসারীদের জন্যে শান্তিময় নিরাপত্তা। বিজ্ঞ পাঠক! আপনি এই তিন মানদন্ডে ফেলে আত-তাহরীকের সম্পাদকীয়গুলোর সাহিত্যিক মান যাচাই করে নিন।

আত-তাহরীকের অন্যান্য প্রবন্ধগুলোতে আমি দেখি ঐ সম্পাদকীয়ের অঙ্গে গাঁথা এক একটি সোনার অলংকার। এরপর আপনি দেখুন এ যাবৎ যতগুলো যুগ-জিজ্ঞাসা বা প্রশ্নোত্তর আত-তাহরীকে এসেছে, সবগুলোর জবাব এসেছে মূল উৎস পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ তথা অহি-র উৎস থেকে। নির্ভেজাল তাওহীদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে উত্থান ঘটেছে আত-তাহরীকের। পত্রিকার সমস্ত দিক ও বিভাগে সেই তাওহীদের সুর-ঝংকার ছাড়া আর কিছু আছে কি? কি বলবেন আপনি? আপনার জানা দুনিয়ার এমন একটি দলের নাম বলুন, যারা এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে পথে নেমেছে। এমন একটি পত্রিকার নাম বলুন, যাতে শিরক নেই, বিদ‘আত নেই, গোমরাহী নেই? প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ড. গালিব আত-তাহরীকের ১ম সম্পাদকীয়তে ‘আত-তাহরীক’ শব্দের অর্থ করেছেন ‘বিশেষ আন্দোলন’ The Movement বা That very Movement. আমি বলি, এর অর্থ একমাত্র আন্দোলন, লা শরীক আন্দোলন।

আমার জানা মতে, আত-তাহরীকে লিখিত সকল প্রবন্ধ-নিবন্ধগুলোর মধ্যে এই লেখাটিই ভিন্ন ধরনের প্রথম লেখাই বলতে হবে। বিষয়বস্ত্ত ছিল দুনিয়ার এপার-ওপার জোড়া। অথচ আত-তাহরীকের কায়া ক্ষীণ। সংক্ষেপ করা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। তাই অনেক কথাই বলা সম্ভব ছিল না।

আমার না বলা কথাগুলির সার পাবেন ২০১২ সালের মার্চে প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যায় বর্তমান সম্পাদক ড. সাখাওয়াতের লেখা ‘মাসিক আত-তাহরীক : ফেলে আসা দিনগুলি’ প্রবন্ধে। পড়ে নেবেন। আল্লাহ আত-তাহরীকের নেক মাকছূদ পূর্ণ করুন- আমীন!


[1]. হোমার (খৃঃ পূঃ ৮ম শতাব্দী) গ্রীসে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মহাকাব্যের নাম The Iliad and The Odyssey.

[2]. সক্রেটিস (খৃঃ পূঃ ৪৭০-৩৯৯) গ্রীসে জন্মগ্রহণ করেন।

[3]. প্লেটো (খৃঃ পূঃ ৪২৭-৩৪৭) গ্রীসে জন্মগ্রহণ করেন।

[4]. Republic 7th Vol.

[5]. শেক্সপিয়ার (১৫৬৪-১৬১৬ খৃঃ) ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। উদ্ধৃত অংশটি তাঁর বিখ্যাত Macbeth নাটক থেকে নেয়া।

[6]. ইনি হ’লেন ওমর খৈয়াম (১০৪৮-১১৩১ খৃঃ), যিনি ইরানের নিশাপুরে জন্মগ্রহণ করেন। কাব্যগ্রন্থের নাম ‘রুবাইয়াতে ওমর খৈয়াম’।

[7]. ইনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১ খৃঃ) কলিকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯১৩ সালে বাংলা সাহিত্যে ‘নোবেল’ পুরস্কার পান।

[8]. ইনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪ খৃঃ) কলিকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৭২ সালে তিনি ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন।

[9]. ডঃ আহমদ শরীফ (১৯২১-১৯৯৯) পিতা : আবদুল আযীয। চাচা ছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক আবদুল করীম সাহিত্যবিশারদ। আহমদ শরীফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের পঠিয়াতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯৫ সালে ১৯শে মে তারিখে লিখিতভাবে তার মরদেহ ধানমন্ডীর বেসরকারী মেডিকেল কলেজকে দান করে যান।

 

**