প্রশ্নোত্তর

দারুল ইফতা

হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

প্রশ্ন (১/১৬১) : দরিদ্র ও বিধবা হওয়ার কারণে সহোদর বোনকে যাকাতের অর্থ প্রদান করা যাবে কি?

- শরীফুল ইসলাম

পাঁচ পয়লা, জামালপুর।

উত্তর : সহোদর ভাই-বোন যাকাতের হকদার হ’লে তাকে যাকাত প্রদান করা যাবে। বরং এতে দ্বিগুণ নেকী রয়েছে। যয়নব (রাঃ) স্বীয় স্বামীকে যাকাতের অর্থ দিতে চাইলে রাসূল (ছাঃ) তাকে অনুমতি দিয়ে বলেন, এতে দ্বিগুণ নেকী রয়েছে। (১) ছাদাক্বার নেকী (২) আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখার নেকী’ (বুখারী হা/১৪৬৬, মুসলিম হা/১০০০; মিশকাত হা/১৯৩৪-৩৫)

প্রশ্ন (২/১৬২) : জনৈক আলেম বলেন, খাদীজা (রাঃ)-এর দাফনের সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর অশ্রু ফোঁটায় তাঁর কবর সিক্ত হলে আল্লাহ মুনকার-নাকীর কে ক্বিয়ামত পর্যন্ত সওয়াল-জওয়াব করতে নিষেধ করে দেন। এ বিবরণ কি সত্য?

-শাফিয়ার রহমান

গ্রীণ ভ্যালী, ধানমন্ডি, ঢাকা।

উত্তর : উক্ত বক্তব্য ভিত্তিহীন ও বানোয়াট।

প্রশ্ন (৩/১৬৩) : নিরাময়যোগ্য নয় এরূপ রোগগ্রস্ত গরু-ছাগল কষ্ট পাওয়ার কারণে জবাই করা হলে তার গোশত খেতে কারো রুচিতে কুলাবে না। এরূপ অবস্থায় জবাই করে পুঁতে ফেলা জায়েয হবে কি?

-হাসানুযযামান

কলারোয়া, সাতক্ষীরা।

উত্তর : রোগগ্রস্ত মৃতপ্রায় হালাল প্রাণী যবেহ করে খাওয়া জায়েয (ফিক্বহুস সুন্নাহ ৩/৩০৩)। ইমাম আহমাদ এতে কোন দোষ নেই বলে মন্তব্য করেছেন (ইবনু কুদামা, মুগনী ৯/৪০৫) তবে রুচি না হলে বা উক্ত প্রাণীর রোগ মানুষের দেহে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে না খেয়ে যবেহ করে পুঁতে ফেলতে হবে।

প্রশ্ন (৪/১৬৪) : মসজিদে বা কোন স্থানে দলবদ্ধভাবে যিকর করায় শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

-আবু তালিব

পুঠিয়া, রাজশাহী।

উত্তর : উচ্চৈঃস্বরে দলবদ্ধভাবে যিকর করা বিদ‘আত। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা প্রতিপালককে স্মরণ কর আপন মনে ক্রন্দনরত ও ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় এবং স্বর উঁচু না করে (আ‘রাফ ২০৫)। রাসূল (ছাঃ)ও সশব্দে যিকর করতে নিষেধ করেছেন (মুসলিম হা/২৭০৪, মিশকাত হা/২৩০৩)। আব্দুল্লাহ ইবনে মাস‘ঊদ (রাঃ) একদল মুছল্লীকে মদীনার মসজিদে নববীতে গোলাকার হয়ে  তাসবীহ-তাহলীল  করতে  দেখে বলেন, ‘হে মুহাম্মাদের উম্মতগণ! কত দ্রুত তোমাদের ধ্বংস এসে গেল’? (দারেমী হা/২১০; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২০০৫)

দো‘আ করার জন্য একদল মুসলমানের নিয়মিতভাবে একত্রিত হওয়ার খবর পেয়ে ওমর (রাঃ) তাদের নেতাকে ডাকিয়ে এনে চাবুক মারেন’ (মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা হা/২৬৭১৫)। তবে যিকরের মজলিসের ফযীলত সংক্রান্ত কিছু হাদীছ বর্ণিত হয়েছে; যা ছিল তা‘লীম বা শিক্ষার মজলিস। যেমন রাসূল (ছাঃ) বলেন, যখন তোমরা জান্নাতের বাগিচা অতিক্রম করবে, তখন তার কিছু ফল তোমরা ভক্ষণ করবে। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! জান্নাতের বাগিচা কি? তিনি বললেন, যিকরের মজলিস’ (তিরমিযী হা/৩৫১০, মিশকাত হা/২২৭১, সনদ হাসান)। তিনি বলেন, যখন কোন কওম আল্লাহর যিকর করতে বসে তখন আল্লাহর ফেরেশতাগণ তাদেরকে ঘিরে নেন, তাঁর রহমত তাদেরকে ঢেকে ফেলে এবং তাদের উপর শান্তি বর্ষিত হয়। আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর নিকটবর্তী ফেরেশতাগণের নিকট তাদের সম্পর্কে প্রশংসামূলক আলোচনা করেন’ (মুসলিম, মিশকাত হা/২২৬১)। এই যিকরের অর্থ কুরআন-হাদীছের পর্যালোচনা। যেমন রাসূল (ছাঃ) বলেন, যখন কোন কওম কোন গৃহে বসে, অতঃপর কুরআন তেলাওয়াত করে এবং তা পর্যালোচনা করে (يَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ) , সেখানে তাদের উপর আল্লাহর পক্ষ হ’তে প্রশান্তি নাযিল হয় ও ফেরেশতারা তাদেরকে ঘিরে রাখে... (মুসলিম, মিশকাত হা/২০৪)। যেমন তা‘লীমী বৈঠক, ওয়ায মহফিল, প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে অন্য যেকোন দ্বীন শিক্ষার মজলিস ইত্যাদি।

আত্বা বিন আব রিবাহ (রহঃ) বলেন, যিকরের মজলিস অর্থ হালাল-হারাম জানার জন্য শিক্ষার মজলিস (তারীখু দিমাশক ৪০/৪৩২, ইবনু তায়মিয়াহ, জামে‘ঊল মাসায়েল ৩/৩৮৫)। ইমাম শাত্বেবী (রহঃ) বলেন, কুরআন-হাদীছে বর্ণিত দো‘আ-দরূদের বাইরে নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে নির্দিষ্ট তরীকায় বানোয়াট যিকর দলবদ্ধভাবে সমস্বরে করা নিকৃষ্ট বিদ‘আতসমূহের  অন্তর্ভুক্ত (শাত্বেবী, আল-ই‘তিছাম ১/৫৩)

স্মর্তব্য যে, প্রচলিত ‘আল্লাহু’ ‘আল্লাহু’, ‘হু হু’ বা ‘ইল্লাল্লাহ’ শব্দে কোন যিকর নেই। উক্ত মর্মে যে হাদীছটি রয়েছে তার অর্থ হ’ল ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ (মুসলিম হা/১৪৮, আহমাদ হা/১৩১৬০; মিশকাত হা/৫৫১৬)। শায়খ আলবানী বলেন, ‘শুধু আল্লাহ শব্দে যিকর করা বিদ‘আত। সুন্নাতে যার কোন ভিত্তি নেই’ (মিশকাত ১৫২৭ পৃঃ ১ নং টীকা)। সর্বোত্তম যিকর হচ্ছে ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ (ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/২৩০৬)। যা নিরিবিলি ও নিম্নস্বরে হবে।

প্রশ্ন (৫/১৬৫) : গায়েবানা জানাযা কখন কিভাবে আদায় করতে হয়। বিভিন্ন স্থানে গায়েবানা জানাযা জায়েয হবে কি?

-রূহুল আমীন, ফরিদপুর।

উত্তর : কোন ব্যক্তির জানাযা না হয়ে থাকলে তার গায়েবানা জানাযা পড়া জায়েয। অমুসলিম দেশে জানাযা ছাড়াই দাফন হওয়ার কারণে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বাদশাহ নাজাশীর গায়েবানা জানাযা পড়েছিলেন (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৬৫২)। কারণ তিনি মুসলমান হয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তাঁর জানাযা পড়ার মত কেউ ছিল না। কারু জানাযা হয়ে থাকলে পুনরায় গায়েবানা জানাযা আদায়ের ব্যাপারে হাদীছে কোন দলীল পাওয়া যায় না। ইবনু আব্দিল বার্র বলেন, যদি গায়েবানা জানাযা জায়েয হ’ত, তাহ’লে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিশ্চয়ই নিজের ছাহাবীদের গায়েবানা জানাযা আদায় করতেন (যাদের জানাযায় তিনি শরীক হ’তে পারেননি)। অনুরূপভাবে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মুসলমানেরা তাদের প্রিয় চার খলীফার গায়েবানা জানাযা পড়ত। কিন্তু এরূপ কথা কারু থেকে কখনো বর্ণিত হয়নি’ (আল-জাওহারুন নাক্বী শরহ সুনানুল বায়হাক্বী ৪/৫১)। সুতরাং জানাযা হয়েছে এরূপ ব্যক্তির গায়েবানা জানাযা পড়া জায়েয নয় (বিস্তারিত দ্র. ছালাতুর রাসূল, পৃঃ ১৫১-১৫২)। এছাড়া বর্তমান সময়ে যেভাবে লাশ নিয়ে বিভিন্ন স্থানে জানাযা পড়ানো হয়, তার পক্ষেও কোন দলীল পাওয়া যায় না। বরং প্রথম জানাযাই হ’ল মূল জানাযা। অনুরূপভাবে জানাযা পড়িয়ে লাশ কারু জন্য রেখে দিয়ে পরে পুনরায় জানাযা বা বিনা জানাযায় দাফন করা পরিস্কারভাবে সুন্নাতবিরোধী আমল। এমতাবস্থায় শুরুতেই দ্রত জানাযা করে লাশ দাফন করতে হবে। পরে কেউ এলে তিনি কবরে জানাযা করবেন। রাসূল (ছাঃ) একমাস পরে তার এক ছাহাবীর কবরে গিয়ে জানাযা পড়েছেন। ইবনু ওমর (রাঃ) তাঁর ভাই আছেম-এর জানাযা তিনদিন পরে এসে পড়েছেন’ (বায়হাক্বী ৪/৪৯ পৃঃ)

প্রশ্ন (৬/১৬৬) : কারো কাছে কর্যে হাসানা না পেয়ে একান্ত বাধ্যগত অবস্থায় সূদের উপর কর্য নেয়া যাবে কি?

-আব্দুল লতীফ

রাজপুর, সাতক্ষীরা।

উত্তর : কোন অবস্থায় সূদের উপর ঋণ নেওয়া যাবে না। কারণ সূদ হারাম। তবে ক্ষুধার কারণে মৃত্যুর মুখোমুখি হলে এরূপ নিরুপায় অবস্থায় কেবল হারাম খাওয়ার অনুমতি রয়েছে (মায়েদাহ ৩)

প্রশ্ন (৭/১৬৭) : আমাদের মসজিদে লেখা আছে জুম‘আর দিন আছর ছালাতের পর ‘আল্লাহুম্মা ছাল্লিআলা মুহাম্মাদীন নাবিয়িল উম্মী ওয়ালা আলীহী ওয়া ছাল্লাম তাসলীমা’- এ দরুদটি ৮০ বার পাঠ করলে মহান আল্লাহ ৮০ বছরের গুনাহ মাফ করে দেন এবং তার আমলনামায় ৮০ বছরের নফল ইবাদতের নেকী লেখা হবে। এর সত্যতা জানতে চাই।

-উম্মে হাবীবা, বগুড়া

উত্তর : সরাসরি উক্ত মর্মে কোন হাদীছ পাওয়া যায় না। তবে শাব্দিকভাবে এর কাছাকাছি মর্মে দু’একটি হাদীছ পাওয়া যায়। যার মধ্যে ৮০ বার দরূদ পাঠ করলে ৮০ বছরের গোনাহ মাফের কথা এসেছে। তবে হাদীছগুলি জাল (আলবানী, সিলসিলা যঈফাহ হা/২১৫)

প্রশ্ন (৮/১৬৮) : পেশাব-পায়খানার প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও জামা‘আত ছুটে যাবে বলে জামা‘আত ধরা ঠিক হবে কি?

-আবুবকর

পিরুজালী, গাযীপুর।

উত্তর : এরূপ অবস্থায় পেশাব-পায়খানা শেষ না করে ছালাত আদায় করা ঠিক হবে না। নবী করীম (ছাঃ) বলেন, ‘খাদ্য উপস্থিত হলে ছালাত নেই এবং পেশাব-পায়খানার চাপ থাকলে কোন ছালাত নেই’(বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১০৫৭)। তবে এমতাবস্থায় ছালাত আদায় করলে তা বাতিল হবে না।

প্রশ্ন (৯/১৬৯) : রাসূল (ছাঃ)-এর প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করার ক্ষেত্রে শরী‘আতের বিধান জানিয়ে বাধিত করবেন।

-আব্দুল আলীম

কাঞ্চন, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

উত্তর : রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না, যেমন বাড়াবাড়ি করেছে খ্রিষ্টানরা মারিয়ামপুত্র ঈসাকে নিয়ে। আমি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। অতএব তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল বল’ (বুখারী হা/৩৪৪৫; মিশকাত হা/৪৮৯৭)। রাসূল (ছাঃ)-এর প্রশংসায় তাঁকে ‘নূরের নবী’ বলা সরাসরি কুরআনী আয়াতের (কাহফ ১১০) -এর স্পষ্ট লংঘন। এতদ্ব্যতীত তাঁর কথিত জন্মদিবস উপলক্ষে মীলাদুন্নবীর অনুষ্ঠান করা, জশনে জুলূস-এর মিছিল করা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠান করা নিকৃষ্টতম বিদ‘আত মাত্র। রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরাম থেকে এসবের কোন প্রমাণ নেই এবং তাঁরা এসব করার নির্দেশ দেননি। এসবই বাড়াবাড়ি মাত্র। যেজন্য ইহূদী-নাছারারা অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্ট হয়েছে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, তোমরা ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি করো না। কারণ দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি তোমাদের পূর্ববর্তীদের ধ্বংস করেছে’ (ইবনু মাজাহ হা/৩০২৯; নাসাঈ হা/৩০৫৭; সিলসিলা ছহীহাহ হা/১২৮৩)

প্রশ্ন (১০/১৭০) : সূরা হূদের ১১৪ আয়াতের তাফসীর জানিয়ে বাধিত করবেন।

-মুহাম্মাদ ফরীদ

চোরকোল, ঝিনাইদহ।

উত্তর: আয়াতটির অর্থ হ’ল - ‘আর তুমি ছালাত কায়েম কর দিনের দুই প্রান্তে ও রাত্রির প্রথম অংশে। নিশ্চয়ই সৎকর্মসমূহ মন্দ কর্মসমূহকে বিদূরিত করে। আর এটি (অর্থাৎ কুরআন) হ’ল উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য (সর্বোত্তম) উপদেশ’। অত্র আয়াতে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের ফযীলতের কথা বর্ণিত হয়েছে, যা মুমিনের ছোট পাপসমূহ মোচন করে দেয়। কুরতুবী বলেন, এবিষয়ে কারু কোন মতভেদ নেই যে, অত্র আয়াতে ‘ছালাত’ বলতে ফরয ছালাতসমূহকে বুঝানো হয়েছে। ‘দুই প্রান্তে’ বলতে মুজাহিদ বলেন, প্রথম প্রান্তে ফজর ছালাত ও দ্বিতীয় প্রান্তে যোহর ও আছর ছালাত। ‘রাত্রির প্রথম অংশ’ বরতে হাসান বাছরী বলেন, মাগরিব ও এশা। ছাহাবা ও তাবেঈগণ বলেন, অত্র আয়াতে ‘সৎকর্মসমূহ’ বলতে পাঁচ ওয়াক্ত ফরয ছালাতকে বুঝানো হয়েছে (কুরতুবী, ইবনু কাছীর)। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি একজন নারীকে চুমু দিয়ে অনুতপ্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দরবারে এসে তার পাপের কথা জানালে উক্ত আয়াতটি নাযিল হয় (বুখারী হা/৪৬৮৭, মুসলিম হা/২৭৬৩, মিশকাত হা/৫৬৬)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, যদি তোমাদের কেউ দৈনিক পাঁচবার নদীতে গোসল করে, তাহলে তার দেহে কোন ময়লা থাকে কি? অনুরূপভাবে পাঁচ ওয়াক্ত ফরয ছালাত। যার মাধ্যমে আল্লাহ সমস্ত পাপ মোচন করে দেন (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৫)। ‘যদি কেউ কবীরা গোনাহসমূহ হ’তে বিরত থাকে’ (মুসলিম হা/২৩৩ প্রভৃতি)

প্রশ্ন (১১/১৭১) : ‘মুসলমানগণ যে বিষয়কে উত্তম মনে করে আল্লাহর নিকটেও তা উত্তম’- উক্ত হাদীছটির সত্যতা ও ব্যাখ্যা জানিয়ে বাধিত করবেন।

-আনোয়ার হুসাইন

কানাইখালী, নাটোর।

উত্তর : মারফূ‘ সূত্রে হাদীছটির কোন ভিত্তি না থাকায় দলীল হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়াও তা রাসূল (ছাঃ)-এর অকাট্য বাণী-  فَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ ‘নিশ্চয়ই সকল প্রকার বিদ‘আত ভ্রষ্টতা’ (মুসলিম হা/৮৬৭; মিশকাত হা/১৪১)-এর স্পষ্ট বিরোধী।

ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, এটি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কথা নয়। হাদীছ সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তিরাই এটিকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে সম্পৃক্ত করেছে (ইবনুল ক্বাইয়িম, আল-ফুরূসিইয়াহ ৬১ পৃঃ)

শায়খ নাছিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) বলেন, মারফূ‘ সূত্রে এর কোন ভিত্তি নেই। বরং এটি ইবনু মাসউদ (রাঃ) হ’তে ‘মওকূফ’ সূত্রে বর্ণিত (সিলসিলা যঈফাহ হা/৫৩৩)

হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, উক্ত আছারটি দ্বারা খেলাফতের ক্ষেত্রে আবুবকর (রাঃ)-কে অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যাপারে ছাহাবায়ে কেরামের ইজমার কথা বুঝানো হয়েছে (আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১০/৩২৮ পৃঃ)

এছাড়াও উল্লিখিত আছারে বর্ণিত اَلْمُسْلِمُوْن এর اَلْ দ্বারা ‘ইজমায়ে ছাহাবা’ তথা যার উপর ছাহাবায়ে কেরাম ঐক্যমত পোষণ করেছেন, সেটা বুঝানো হয়েছে। এর অর্থ এটা নয় যে, অধিকাংশ মুসলমান কোন বিদ‘আতকে উত্তম বললে সেটা আল্লাহর নিকটেও উত্তম। এরূপ অর্থ করা মূর্খতা বৈ কিছুই নয়।

প্রশ্ন (১২/১৭২) : অনেক ছাত্রকে দেখা যায় তারা টিকিট না কেটে টিটিকে অল্প কিছু টাকা দিয়ে ট্রেনে ভ্রমণ করে। এটা কি শরী‘আতসম্মত?

-মাজেদুল ইসলাম

বদরগঞ্জ, রংপুর।

উত্তর : এর দ্বারা সরকারকে ফাঁকি দেওয়া হয় এবং এটা ঘুষের অন্তর্ভুক্ত; ইসলামী শরী‘আত যাকে হারাম করেছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ঘুষ দাতা ও ঘুষ গ্রহীতার উপর আল্লাহর অভিসম্পাত (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৩৭৫৩ সনদ ছহীহ ‘শাসন ও বিচার’ অধ্যায়)

প্রশ্ন (১৩/১৭৩) : দো‘আয়ে কুনূত ছাড়া বিতর ছালাত হবে কি?

-হারূনুর রশীদ, পলাশবাড়ী, গাইবান্ধা।

উত্তর : হয়ে যাবে। কেননা বিতরের জন্য দোআ কুনূত শর্ত নয়। রাসূল (ছাঃ) হাসান ইবনু আলী (রাঃ)-কে বিতরের দো‘আ কুনূত শিক্ষা দিয়েছিলেন (আবুদাউদ হা/১৪২৫; তিরমিযী হা/৪৬৪; মিশকাত হা/১২৭৩)। বিভিন্ন হাদীছ দ্বারা দো‘আয়ে কুনূত প্রমাণিত। কিন্তু এটি সর্বদা পড়া আবশ্যিক নয় (বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : মির‘আত হা/১৩০০-এর আলোচনা; মিশকাত হা/১২৯২ ‘কুনূত’ অনুচ্ছেদ)

প্রশ্ন (১৪/১৭৪) : সিজদায়ে সহো দিতে ভুলে গেলে উক্ত ছালাত বাতিল হবে কি?

-আব্দুল খালেক

উত্তর পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম।

উত্তর : ছালাত বাতিল হবেনা। তবে সালাম ফিরানোর পর যখন মনে পড়বে তখন সহো সিজদা দিতে হবে। কারণ এটাও একটা ভুল। আর ভুলের প্রতিকার হচ্ছে সহো সিজদা দেয়া। সালামের পরেও সহো সিজদা দেয়া যায় (বুখারী হা/৭১৫, মুসলিম হা/৫৭৪, মিশকাত হা/১০২১)। যদি তখনও সহো সিজদা দিতে ভুলে যায় তাহলে আর দিতে হবে না।

প্রশ্ন (১৫/১৭৫) : জনৈক আলেম বলেন, মুক্তাদীর ওযূ ভুল হওয়ার কারণে ইমামের ক্বিরাআত ভুল হয়। এ কথার সত্যতা জানিয়ে বাধিত করবেন।

-নূর মুহাম্মাদ

বিরামপুর, দিনাজপুর।

উত্তর : এমর্মে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ। (নাসাঈ হা/৯৪৭; মিশকাত হা/২৯৫; যঈফুল জামে‘ হা/৫০৩৬)

[নাম পরিবর্তন করে কেবল ‘মুহাম্মাদ’ বা ‘আব্দুন নূর’ রাখুন (স.স)]

প্রশ্ন (১৬/১৭৬) : ছালাতরত অবস্থায় পিতা-মাতা ডাক দিলে সেক্ষেত্রে করণীয় কি?  

-রেযওয়ানুল ইসলাম

মোহনপুর, রাজশাহী।

উত্তর : বিপজ্জনক কিছু মনে করলে ফরয ছালাত ত্যাগ করে হলেও সাড়া দিতে হবে। কেননা চোর ধরার জন্য ফরয ছালাত ছেড়ে দেয়ার অনুমতি রয়েছে (বুখারী হা/১২১১, ২১ অধ্যায়, ১১ অনুচ্ছেদ)। ছালাত যদি নফল হয়, তবে তা ছেড়ে দিয়ে পিতামাতার ডাকে সাড়া দিতে হবে (বুখারী হা/১২০৬, মুসলিম হা/৬৬৭২; ওছায়মীন, শরহ রিয়াযুছ ছালেহীন ৩/৭৩-৭৪)

প্রশ্ন (১৭/১৭৭) : স্ত্রী স্বামীকে নাম ধরে ডাকতে পারে কি?

-মুহাম্মাদ ছাদেকুযযামান

রাণীরবন্দর, দিনাজপুর।

উত্তর : স্ত্রীর নিকট স্বামী হ’লেন সবচেয়ে সম্মানের পাত্র। অতএব যেভাবে ডাকলে স্বামী খুশি হবেন সেভাবে ডাকা উচিৎ। তবে স্বামী অসন্তুষ্ট না হলে স্ত্রী স্বামীর নাম ধরে ডাকতে পারে। যেমন যয়নব রাসূল (ছাঃ)-এর সামনে তার স্বামী আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ)-এর নাম ধরে কথা বলেছিলেন (বুখারী হা/১৪৬২)

প্রশ্ন (১৮/১৭৮) : পাঁচ বছর পূর্বে দুই সন্তানসহ স্ত্রী খোলা তালাক নেওয়ার পর বর্তমানে ফিরে আসতে চাইলে করণীয় কি?

-তছেরুদ্দীন

নাজিরপুর, নাটোর।

উত্তর : এমতাবস্থায় স্ত্রীকে নতুন বিবাহের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনতে পারে।

প্রশ্ন (১৯/১৭৯) : পীরের মাযারে গিয়ে মানুষ বিভিন্নভাবে উপকৃত হয়। যেমন রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তি লাভ, সম্পদ অর্জন ইত্যাদি। এগুলি কিভাবে কার পক্ষ থেকে হয়?

-রূহুল আমীন, ফরিদপুর।

উত্তর : পীরের মাযারে গিয়ে মানুষ যে উপকার লাভের ধারণা করে, তা মূলতঃ শয়তানী ওয়াসওয়াসায় হয়ে থাকে। যেমনভাবে জাহেলী যুগে মানুষ যেসব প্রতিমার উপাসনা করত সেগুলির মধ্যে নারী জিন শয়তান থাকত (আহমাদ হা/২১২৬৯, সনদ হাসান)। যারা মানুষকে এরূপ শিরকের ওয়াসওয়াসা দিয়ে মূর্তিপূজায় প্ররোচনা দিত। প্রকৃতপক্ষে রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তি এবং রিযিক দানের মালিক একমাত্র আল্লাহ। তিনি বলেন, ‘যদি আল্লাহ তোমাকে কষ্টে নিপতিত করেন, তাহলে তিনি ব্যতীত তা দূর করার কেউ নেই। আর যদি তিনি তোমার কোন কল্যাণ করতে চান, তবে তাতে বাধা দানের কেউ নেই’ (ইউনুস ১০/১০৭)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, আল্লাহর আরোগ্য ব্যতীত কোন আরোগ্য নেই’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৫৩০)। অতএব পীরের মাযারে গেলে উপকার হয়, রোগ-ব্যাধি থেকে আরোগ্যলাভ করা যায়, এরূপ বিশ্বাস শিরকের অন্তর্ভুক্ত। যার পরিণাম জাহান্নাম।

প্রশ্ন (২০/১৮০) :  জনৈক আলেম বলেন, নাস্তিক সরকারের পতনের জন্য দেশের একমাত্র প্রতিবাদের মাধ্যম হিসাবে হরতাল করা শরী‘আত সম্মত। কারণ বড় ক্ষতি দূর করার জন্য ছোট ক্ষতি বরণ করায় শরী‘আতে কোন বাধা নেই। উক্ত বক্তব্যের সত্যতা জানিয়ে বাধিত করবেন।

-ফারূক হোসাইন

দোগাছী, পাবনা।

উত্তর : বাতিল প্রতিরোধের জন্য ছোট হৌক, বড় হৌক শরী‘আত বিরোধী কোন মাধ্যম গ্রহণ করা নিষিদ্ধ। ইসলামের দৃষ্টিতে পরকালীন বিজয়ই মুমিনের প্রকৃত বিজয়। দুনিয়াতে শত যুলুমের শিকার হলেও এর জন্য কারু আখেরাত বিনষ্ট হবে না। কিন্তু অন্যায় পথ বেছে নিলে আখেরাত বিনষ্ট হবে। আর আখেরাতে যালেম তার যথাযোগ্য শাস্তি পাবে এবং মাযলূম তার পূর্ণ পুরস্কার পেয়ে ধন্য হবে। আল্লাহ বলেন, তোমরা সেই দিনকে ভয় কর, যেদিন তোমরা আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে। অতঃপর প্রত্যেকে তার কৃতকর্মের ফল পুরোপুরি পাবে এবং কেউ অত্যাচারিত হবে না (বাক্বারাহ ২/২৮১)। 

প্রশ্ন (২১/১৮১) :  পবিত্র কুরআনে মুসলামানদেরকে মুসলিম, মুমিন, মুহসিন তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর ব্যাখ্যা জানিয়ে বাধিত করবেন।

-মামূন মিয়াঁ, ধনবাড়ী, টাঙ্গাইল।

উত্তর : দ্বীনের স্তর হচ্ছে তিনটি : (১) ইসলাম, যা পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। কালেমায়ে শাহাদাত, ছালাত, যাকাত, ছিয়াম ও হজ্জ। (২) ঈমান, যা ছয়টি রুকনের উপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ, ফেরেশতাগণ, আসমানী কিতাবসমূহ, নবী ও রাসূলগণ, ক্বিয়ামত দিবস এবং তাক্বদীরের ভালো-মন্দের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা। (৩) ইহসান, যা একনিষ্ঠচিত্তে ও পূর্ণ ইখলাছের সাথে আল্লাহর ইবাদত করাকে বুঝায়। অর্থাৎ এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করা যেন বান্দা আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছে অথবা আল্লাহ স্বীয় বান্দাকে দেখছেন। পূর্ণ ঈমানের সাথে সকল প্রকার সৎকর্ম ইসলাম ও ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। আর সেগুলি পূর্ণ ইখলাছের সাথে সম্পাদন করা ইহসানের অন্তর্ভুক্ত। উল্লিখিত তিনটি বিষয় হাদীছে জিব্রীলে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে (বুখারী হা/৫০, মুসলিম হা/৯; মিশকাত হা/২)

প্রশ্ন (২২/১৮২) : পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ইরাম দ্বারা কাদেরকে বুঝানো হয়েছে?

-সোহেল, পাট গুদাম, ময়মনসিংহ।

উত্তর : কুরআনে ‘ইরাম’ বলে سِبْط إرم অর্থাৎ ইরামের নিকটতম অধঃস্তন পুরুষদের বুঝানো হয়েছে। সূরা ফজর ৭-এর عاد إرم -কে অন্য সূরায় عاد الأولى অর্থাৎ প্রথম ‘আদ সম্প্রদায় বলা হয়েছে (নাজম ৫৩/৫০)। যারা পরবর্তী ‘আদ সম্প্রদায় থেকে আলাদা।

আল্লাহর গযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত বিশ্বের প্রধান ছয়টি জাতির মধ্যে কওমে নূহ-এর পরে কওমে ‘আদ ছিল দ্বিতীয় জাতি। হূদ (আঃ) ছিলেন এদেরই নবী ও বংশধর। ‘আদ ও ছামূদ ছিল নূহ (আঃ)-এর পুত্র সামের বংশধর এবং নূহের পঞ্চম অথবা অষ্টম অধঃস্তন পুরুষ। ইরামপুত্র ‘আদ-এর বংশধরগণ ‘আদ ঊলা’ বা প্রথম ‘আদ এবং অপর পুত্রের সন্তান ছামূদ-এর বংশধরগণ ‘আদ ছানী বা দ্বিতীয় ‘আদ বলে খ্যাত (ইবনু কাছীর, সূরা আ‘রাফ ৬৫, ৭৩)। ‘ছামূদ’ জাতির নবী ছিলেন ছালেহ (অঃ)। ‘আদ ও ছামূদ উভয় গোত্রই ইরাম-এর দু’টি শাখা। সেকারণ ‘ইরাম’ কথাটি ‘আদ ও ছামূদ উভয় গোত্রের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। এজন্য কুরআনে কোথাও ‘আদ ঊলা’ (নাজম ৫০) এবং কোথাও ‘ইরাম যাতিল ‘ইমাদ’ (ফজর ৭) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে (বিস্তারিত দেখুন : তাফসীরুল কুরআন ৩০ তম পারা, তাফসীর সূরা ফজর ৭ আয়াত)

প্রশ্ন (২৩/১৮৩) :  রাসূল (ছাঃ) যে হাযির-নাযির নন এবং প্রথম সৃষ্টি নন যে ব্যাপারে দলীলভিত্তিক জবাব দানে বাধিত করবেন।

-জুনায়েদ রিফাত, চট্টগ্রাম।

উত্তর : রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, আল্লাহ সর্বপ্রথম সৃষ্টি করেছেন ‘কলম’। অতঃপর তাকে বলেন, লিখ। সে বলল, কি লিখব? আল্লাহ বললেন, তাক্বদীর লিখ। অতঃপর সে লিখল, যা কিছু ঘটেছে এবং যা কিছু ঘটবে ভবিষ্যতে ক্বিয়ামত পর্যন্ত (আবুদাউদ হা/৪৭০০; তিরমিযী হা/২১৫৫; ছহীহাহ হা/১৩৩)। আলবানী বলেন, أَولُ مَا خلقَ اللهُ نُوْرِ نَبِيِّكَ يَا جابرُ ‘আল্লাহ প্রথম তোমার নবীর নূর সৃষ্টি করেন হে জাবের!’ মর্মে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদীছটির কোন সনদ আমি জানতে পারিনি (তাহকীক মিশকাত হা/৯৪-এর টীকা ১; ১/৩৪ পৃঃ)। আর لَولاَكَ لماَ خَلقتُ الأَفْلاَك ‘তুমি না হলে আমি আসমান-যমীন কিছুই সৃষ্টি করতাম না’ মর্মে বর্ণিত হাদীছটি মওযূ বা জাল (সিলসিলা যঈফাহ হা/২৮০, ২৮২)

দ্বিতীয়তঃ রাসূল (ছাঃ) মানুষ ছিলেন (কাহফ ১৮/১১০) এবং তিনি সহ পূর্বেকার সকল নবী মৃত্যুবরণ করেছেন (যুমার ৩৯/৩০)। জীবিত বা মৃত কোন মানুষ কখনো হাযির-নাযির হতে পারে না। এটি সম্পূর্ণরূপে শিরকী আক্বীদা। আর আল্লাহ আরশে সমুন্নীত। অতএব তাঁর সত্তা সর্বত্র হাযির-নাযির নয়। বরং তাঁর জ্ঞান ও শক্তি সর্বত্র বিরাজমান। যেমন তিনি মূসা ও হারূণকে বলেন, ‘আমি তোমাদের সাথে আছি। শুনছি এবং দেখছি (ত্বোয়াহা ২০/৪৬)। অতএব প্রথম সৃষ্টি হ’ল কলম। যা দিয়ে তাক্বদীর লেখা হয়েছে এবং রাসূল (ছাঃ) সর্বত্র হাযির-নাযির নন।

প্রশ্ন (২৪/১৮৪) : রাসূল (ছাঃ) জনৈক ব্যক্তির ঘরে কৃষি যন্ত্রপাতি দেখে মন্তব্য করেন ‘যে ব্যক্তির ঘরে এসব প্রবেশ করে আল্লাহ সেখানে লাঞ্ছনাও প্রবেশ করান’। উক্ত হাদীছটির ব্যাখ্যা কি?

সাইফুল ইসলাম

কাজলা, রাজশাহী।

উত্তর : রাসূল (ছাঃ)-এর বাণী- ‘যে ব্যক্তির ঘরে এসব (চাষাবাদের যন্ত্রপাতি) প্রবেশ করে আল্লাহ সেখানে লাঞ্ছনাও প্রবেশ করান’ (বুখারী হা/২৩২১), এর দ্বারা সেই ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে ব্যক্তি জিহাদ ত্যাগ করে শুধুমাত্র কৃষিকর্মকেই বেছে নিয়েছে। যেমন- রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘যখন  তোমরা টাকা-পয়সা অাঁকড়ে ধরবে, ঈনা পদ্ধতিতে বেচাকেনা করবে, গরুর লেজ ধরবে (অর্থাৎ শরী‘আতের হুকুম-আহকাম অনুসরণ না করে, দুনিয়াবী বিষয়ে অধিক গুরুত্ব প্রদান করবে), চাষাবাদেই সন্তুষ্ট থাকবে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ ছেড়ে দিবে, তখন আল্লাহ তোমাদের উপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দিবেন। যতক্ষণ তোমরা দ্বীনের দিকে ফিরে আসবে, ততক্ষণ না তোমাদের উপর থেকে লাঞ্ছনা উঠিয়ে নেবেন না’ (আবুদাউদ হা/৩৪৬২; সিলসিলা ছহীহাহ হা/১১, ছহীহুল জামে‘ হা/৬৭৭)। পক্ষান্তরে গাছ লাগানো এবং চাষাবাদ করার মত ভালো কাজের প্রতি হাদীছে উৎসাহিত করা হয়েছে (বুখারী হা/২৩২০, মুসলিম হা/৩৮৯৫, মিশকাত হা/১৯০০)

প্রশ্ন (২৫/১৮৫) : রামাযান ব্যতীত অন্যান্য মাসে কোন কোন দিন নফল ছিয়াম পালন করা শরী‘আতসম্মত? ফযীলতসহ জানতে চাই।

-মুহাম্মাদ রানা

শিবগঞ্জ, চাপাই নবাবগঞ্জ।

উত্তর : (১) শাওয়াল মাসের ছয়টি ছিয়াম নফল পালন করা। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রামাযানের ছিয়াম পালন করতঃ শাওয়াল মাসের ৬টি ছিয়াম পালন করল, সে যেন সারা বছর ছিয়াম পালন করল’ (মুসলিম, মিশকাত হা/২০৪৭)। (২) প্রতি সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার ছিয়াম পালন করা। নবী করীম (ছাঃ) নিয়মিতভাবে সোমবার ও বৃহস্পতিবার ছিয়াম পালন করতেন (মুসলিম, মিশকাত হা/২০৪৫)। অন্য হাদীছে এসেছে, রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘সোমবার ও বৃহস্পতিবার আমল সমূহ পেশ করা হয়। তাই আমি পসন্দ করি ছিয়াম অবস্থায় আমার আমল পেশ করা হোক’ (তিরমিযী হা/৭৪৭, সনদ ছহীহ; মিশকাত হা/২০৫৬)। (৩) প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে ছিয়াম পালন করা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘প্রতি চান্দ্র মাসে তিনটি করে ছিয়াম, সারা বছর ধরে ছিয়াম পালনের শামিল’ (বুখারী ও মুসলিম, আলবানী-ছহীহ তারগীব হা/১০১৫)। (৪) আরাফার দিনে ছিয়াম পালন করা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আরাফার দিনের ছিয়াম পালন করবে আল্লাহ তা‘আলা তার এক বছর আগের এবং এক বছর পরের গোনাহ মাফ করে দিবেন’ (মুসলিম, মিশকাত হা/২০৪৪)। (৫) আশুরায়ে মুহাররমের ছিয়াম পালন করা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘আল্লাহ আশূরার ছিয়াম পালনকারীর পূর্বের এক বছরের পাপ মোচন করে দিবেন (ছহীহ আবূদাঊদ হা/২৪২৫)। এ ছাড়া যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে একটি ছিয়াম রাখবে, তাকে জাহান্নাম থেকে আল্লাহ সত্তর বছরের পথ দূরে রাখবেন’ (বুখারী হা/২৮৪০, মুসলিম হা/১১৫৩, মিশকাত হা/২০৫৩)

[‘রানা’ নামটি শিখ ধর্মগুরুদের লকব। এটি পরিত্যাগ করুন (স.স.)]

প্রশ্ন (২৬/১৮৬) : যেহেতু মানুষের জীবন-মৃত্যু নির্ধারিত সময়ে হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে হঠাৎ মৃত্যুবরণ কারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে ‘অকাল মৃত্যু’ বা ‘একারণেই সে মারা গেল’ ইত্যাদি বলা বা বিশ্বাস করা শরী‘আতসম্মত হবে কি?

-ছালাহুদ্দীন কাদের

ডিমলা, নীলফামারী।

উত্তর : প্রত্যেক প্রাণীর মৃত্যু নির্দিষ্ট সময়ে হবে (নূহ ৪) আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন, ‘তিনি একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত মানুষকে অবকাশ দিয়ে থাকেন। অতঃপর যখন সেই মেয়াদকাল এসে যায়, তখন তারা তা মুহূর্তকাল দেরী বা এগিয়ে আসতে পারে না (নাহল ১৬/৬১)। এর উপরেই ঈমান রাখতে হবে। ‘অকালমৃত্যু’ দ্বারা নির্ধারিত সময়ের পূর্বে মৃত্যুকে বুঝানো হয় না, বরং এর দ্বারা কম বয়সে মৃত্যু বুঝানো হয়। কিন্তু কেউ যদি এর দ্বারা নির্ধারিত সময়ের পূর্বে মৃত্যুবরণকে বুঝে থাকে তাহ’লে সেটা মারাত্মক ভুল হবে।

প্রশ্ন (২৭/১৮৭) : মুসলিম কোন দোকান না থাকায় অমুসলিম সুপার মার্কেট থেকে গরুর গোশত কিনে খাওয়া কি বৈধ হবে? জনৈক বন্ধু বলল, খাওয়ার সময় বিসমিল্লাহ বলে খেলেই যথেষ্ট হবে।

-যাকির আহমাদ

রিওনিগ্রো, আর্জেন্টিনা।

উত্তর : অমুসলিমদের মধ্যে ইহূদী-খৃষ্টানরা আল্লাহর নামেই পশু যবেহ করে থাকে। তাই প্রবল ধারণার ভিত্তিতে আল্লাহর নামে যবেহ করা হয়েছে বলে মনে হলে তা বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া জায়েয। একদা মদীনার গ্রাম অঞ্চলের নও মুসলিমরা মদীনা শহরে গোশত বিক্রি করতে আসলে এবং ছাহাবীগণ বিসমিল্লাহ বলা হয়েছে কিনা সন্দেহ করলে, রাসূল (ছাঃ) তাদের যবেহ করা পশুর গোশ্ত বিসমিল্লাহ্ বলে খাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন (বুখারী হা/৭৩৯৮; মিশকাত হা/৪০৬৯)।       তবে মূর্তিপূজক, নাস্তিক প্রভৃতি যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে যবেহ করে, তাদের যবেহকৃত পশু খাওয়া যাবে না (বাক্বারাহ ১৭৩; মায়েদাহ ৩)। কোনরূপ সন্দেহ হ’লে গোশত বাদ দিয়ে অন্য কিছু খেতে হবে।

প্রশ্ন (২৮/১৮৮) : ইমাম রুকূ বা সিজদায় থাকা অবস্থায় মাসবূক সরাসরি রুকূ বা সিজদায় চলে যাবে, না প্রথমে তাকবীরে তাহরীমা বলে তারপর রুকূ বা সিজদায় যাবে?

-মুহাম্মাদ আখতারুযযামান

বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর : মাসবূক ছালাতে শরীক হ’লে তাকে তাকবীরে তাহরীমা বলেই ইমামের অনুসরণ শুরু করতে হবে। কেননা তাকবীরে তাহরীমা হ’ল ছালাতের রুকন। আর রুকন ব্যতীত ছালাত সঠিক হবে না। হযরত আলী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ছালাতে সবকিছু হারাম হয় তাকবীরের মাধ্যমে এবং সবকিছু হালাল হয় সালাম ফিরানোর মাধ্যমে (আবুদাঊদ, তিরমিযী, সনদ হাসান, মিশকাত হা/৩১২)

প্রশ্ন (২৯/১৮৯) : মু‘আবিয়া (রাঃ) কিভাবে খলীফা নির্বাচিত হয়েছিলেন? বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।

-জাহিদুল ইসলাম

বসুন্ধরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া, ঢাকা।

উত্তর : ৪০ হিজরীর ১৭ই রামাযান হযরত আলী (রাঃ)-এর মৃত্যুর পর ইরাক, মক্কা, মদীনা ও ইয়ামনবাসী হাসান ইবনু আলী (রাঃ)-এর হাতে খেলাফতের বায়‘আত গ্রহণ করলে, তার নেতৃত্বেই পঞ্চম খলীফার অগ্রযাত্রা শুরু হয় এবং তিনি ছয় মাস খেলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। এর দ্বারা রাসূল (ছাঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী ‘আমার পরে খেলাফত ত্রিশ বছর থাকবে’ (আবুদাঊদ হা/৪৬৪৬, তিরমিযী হা/২২২৬; মিশকাত হা/৫৩৯৫) কার্যকর হয়। কিন্তু শামবাসী মু‘আবিয়া বিন আবু সুফিয়ান (রাঃ)-এর হাতে খেলাফতের বায়‘আত গ্রহণ করে এবং মিসরবাসী বিভক্ত হয়ে দু’পক্ষ দু’দলকে সমর্থন দেয়। হাসান (রাঃ) মু‘আবিয়া (রাঃ)-কে আনুগত্যের শপথ নেওয়ার জন্য আহবান জানালে তিনি অস্বীকার করেন। এমতাবস্থায় হাসান (রাঃ) মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে এক বিশাল সৈন্য দল প্রস্ত্তত করে শাম-এর উদ্দেশ্যে বের হয়ে ‘মাসকিন’ নামক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেন। বিপক্ষে মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর বিশাল সৈন্যদলও মুখোমুখি অবস্থান নেয়। এমতাবস্থায় মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর পক্ষ থেকে আলোচনার প্রস্তাব সম্বলিত চিঠি আসলে হাসান (রাঃ) নিজ পক্ষের ছাহাবীগণের সাথে পরামর্শ করে মুসলিম ঐক্য অটুট রাখার এবং রক্তপাত এড়িয়ে যাওয়ার বৃহত্তর স্বার্থে মু‘আবিয়া (রাঃ)-কে মুসলমানদের খলীফা হিসেবে মেনে নেন (হাকেম হা/৪৮০৮)। যার ইঙ্গিত রাসূল (ছাঃ) তাঁর বাণীতে দিয়ে যান (বুখারী হা/২৭০৪, মিশকাত হা/৬১৩৫)। মু‘আবিয়া (রাঃ) ৪১ হিজরীর রবীউল আউয়াল মাসে মুসলিম জাহানের খলীফা নির্বাচিত হন এবং প্রায় বিশ বছর তাঁর নেতৃত্বে ইসলামী শাসন পরিচালিত হয় (বিস্তারিত দ্রঃ আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৮/১৬-১৮, ইবনুল আছীর, কামেল ফিত তারীখ ৩/৫-৮)

প্রশ্ন (৩০/১৯০) : গীবত শ্রবণকারী গীবতকারীর সমপরিমাণ গোনাহগার হয়। সভা-সমিতিতে এরূপ গীবত হ’লে সেক্ষেত্রে শ্রবণকারীর করণীয় কি?

-হারূনুর রশীদ

পলাশবাড়ী, গাইবান্ধা।

উত্তর : গীবত শ্রবণকারীর গীবতকারীর সমপরিমাণ গুনাহ হবে কথাটি সঠিক নয়। তবে গীবত করা যেমন নিষেধ তেমনি তা শ্রবণ করাও নিষেধ (হুজুরাত ৪৯/১২)। আর গীবতকারীর প্রতিবাদ করে কোন ভাইয়ের সম্মান রক্ষা করলে আল্লাহ্ প্রতিবাদকারীর চেহারাকে কিয়ামত দিবসে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন (তিরমিযী হা/১৯৩১; ছহীহুল জামে‘ হা/৬২৬২)। কিন্তু কারো ভুল ধরিয়ে দেয়া গীবতের অন্তর্ভুক্ত নয়। ওলামায়ে কেরাম জনগণের মাঝে ধর্মীয় দিক-নির্দেশনা দানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। তাই তাঁদের পক্ষ থেকে কোন শিরক ও বিদ‘আতী আমল জনগণের মাঝে ছড়িয়ে পড়লে তা চরম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এরূপ আলেমদের সংশোধন করা এবং তাদের থেকে জনগণকে সতর্ক করা হকপন্থী ওলামায়ে কেরামের অন্যতম কর্তব্য। এতে তিনি বরং নেকীর হকদার হবেন। এছাড়া ছয়টি ক্ষেত্রে গীবত হয় না। যার একটি হ’ল, কেউ কোন পাপ ও বিদ‘আতে লিপ্ত হলে তা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে(মুসলিম হা/২৫৮৯ ‘গীবত হারাম হওয়া’ অনুচ্ছেদ, নববীর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)। তবে এক্ষেত্রে ভুল সংশোধনকারীর জন্য কিছু বিষয়ের প্রতি অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে, (১) সমালোচনা স্রেফ ইছলাহের উদ্দেশ্যে হবে। (২) পরস্পরের সম্মানের প্রতি খেয়াল রেখে বিনীতভাবে সুন্দর ভাষায় বলতে হবে এবং (৩) আল্লাহর নিকট ছওয়াবের আশায় খালেছ নিয়তে করতে হবে।

প্রশ্ন (৩১/১৯১) : কোন মহিলা তার দেবর বা ভাসুরের সাথে হজ্জে যেতে পারবে কি?

-রোকেয়া বেগম, ঢাকা।

উত্তর : কোন মহিলা তার দেবর বা ভাসুরের সাথে হজ্জে যেতে পারবে না। কেননা তারা মাহরামের অন্তর্ভুক্ত নয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, একটি দিন ও রাতের সফর মাহরাম পুরুষ ব্যতীত কোন নারী সফরে বের হবে না’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৫১৩, ২৫১৫ ‘মানাসিক’ অধ্যায়)। জনৈক ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-কে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (ছাঃ)! অমুক যুদ্ধে আমার নাম লেখানো হয়েছে। অথচ আমার স্ত্রী একাকিনী হজ্জে রওয়ানা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘যাও তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে হজ্জ কর’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৫১৩, ‘মানাসিক’ অধ্যায়)।

প্রশ্ন (৩২/১৯২) : সিজদা থেকে উঠে দাঁড়ানোর সময় স্বল্প সময়ের জন্য বসতে হবে না সরাসরি দাঁড়িয়ে যেতে হবে?

-মাহবূব হাসান, ঢাকা।

উত্তর : সিজদা থেকে উঠে সামান্য সময়ের জন্য স্থির হয়ে বসা সুন্নাত। একে জালসায়ে ইস্তেরাহাত বা স্বস্তির বৈঠক বলা হয়। ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন বেজোড় রাক‘আত গুলিতে পৌঁছতেন, তখন দাঁড়াতেন না যতক্ষণ না সুস্থির হয়ে বসতেন (বুখারী, মিশকাত হা/৭৯৬)। অন্য বর্ণনায় এসেছে حَتَّى تَطْمَئِنَّ جَالِسًا ‘যতক্ষণ না শান্ত হয়ে বসতেন’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৭৯০)

উল্লেখ্য যে, ‘হাতের উপরে ভর না দিয়ে তীরের মত সোজা দাঁড়িয়ে যেতেন’ বলে ‘ত্বাবারাণী কাবীরে’ বর্ণিত হাদীছটি ‘মওযূ’ বা জাল এবং উক্ত মর্মে বর্ণিত সকল হাদীছই ‘যঈফ’। (আলবানী, ছিফাতু ছালাতিন্নবী, ১৩৭ পৃঃ ; সিলসিলা যঈফাহ হা/৫৬২, ৯২৯, ৯৬৭; নায়লুল আওত্বার ৩/১৩৮-১৩৯; বিস্তারিত দ্রঃ ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) পৃঃ ১১৪-১৫)

প্রশ্ন (৩৩/১৯৩) : ছহীহ মুসলিমে এসেছে, চিরদিন আমার উম্মতের একটি দল হক-এর উপর কিতাল করবে...। এর অর্থ কি তারা সর্বদা যুদ্ধ করতে থাকবে? অথচ রাসূল (ছাঃ) জীবনের বহু সময় কিতাল বিহীন অবস্থায় অতিবাহিত করেছেন!

-আব্দুর রাযযাক

বিরল, দিনাজপুর।

উত্তর : উক্ত হাদীছের উদ্দেশ্য এটা নয় যে, বিজয়ী দলটি সর্বদা কেবল সশস্ত্র যুদ্ধেই লিপ্ত থাকবে। বরং এর উদ্দেশ্য হ’ল বিজয়ী দল কখনোই জিহাদকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করবে না। বরং তারা তাদের স্বীয় বিজয়ী বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী হকের উপর আপোষহীন থাকবে এবং প্রয়োজনে কাফেরদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ করবে। যে প্রয়োজন কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে (আলবানী)

ইমাম নববী এই দলটির পরিচয় সম্পর্কে বলেছেন- তাদের মাঝে রয়েছেন মুজাহিদ, ফকীহ, মুহাদ্দিছ, দুনিয়াবিমুখ, ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধকারীসহ অন্যান্য উত্তম কাজে নিযুক্ত ব্যক্তিগণ (নববী, শরহ মুসলিম হা/১২৪-এর ব্যাখ্যা দ্রঃ)

উক্ত দলটির বৈশিষ্ট্য হবে এই যে, তারা আল্লাহর কালেমাকে সমুন্নত রাখার জন্য পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে এবং ছাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে ছালেহীনের তরীকা মতে সকল প্রকার বাতিলের বিরুদ্ধে সকল যুগে সর্বাত্মকভাবে আপোষহীন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। ইমাম আহমাদ (রহঃ)-কে এই দলটি কারা সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, তারা যদি আহলুল হাদীছ না হয়, তাহ’লে আমি জানি না তারা কারা (তিরমিযী, মিশকাত হা/৬২৮৩ -এর ব্যাখ্যা)। ইমাম বুখারী ও অন্যান্য বিদ্বানগণ একই মন্তব্য করেছেন (ফৎহুল বারী হা/৭৩১৭-এর ব্যাখ্যা)

প্রশ্ন (৩৪/১৯৪) : জনৈক আলেম বলেন, কেবল চামড়ার মোটা মোজা পরিধান করলেই মাসাহ করা যাবে, সাধারণ মোজায় নয়। এক্ষণে সূতী মোজা পরিধান করলে মাসাহ করা যাবে কি? এছাড়া বুট জুতার উপর দিয়ে মাসাহ করা যাবে কি?

-আব্দুল করীম

পাংশা, রাজবাড়ী।

উত্তর : মোজার উপর মাসাহ করা বৈধ হওয়ার জন্য হাদীছে কোন প্রকার বিশেষ মোজাকে শর্ত করা হয়নি। আরবী ভাষায় চামড়ার তৈরী মোজাকে ‘খুফ’ এবং সূতা বা কাপড়ের তৈরী মোজাকে ‘জাওরাব’ বলা হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) চামড়ার তৈরী মোজার উপরে মাসাহ করেছেন (বুখারী হা/২০২; মুসলিম হা/২৭৪; মিশকাত হা/৩৯৯)। তিনি কাপড়ের তৈরী মোজার উপরেও মাসাহ করেছেন (আবুদাউদ হা/১৫৯; তিরমিযী হা/৯৯; ইবনু মাজাহ হা/৫৫৯; মিশকাত হা/৫২৩)। এছাড়া কেউ যদি জুতার উপর মাসাহ করে ছালাত আদায় করতে চায় তাকে সেই জুতা পরেই ছালাত আদায় করতে হবে। জুতা খুলে ফেললে ওযূ বিনষ্ট হবে (মাজমূ‘ ফাতাওয়া বিন বায ২৯/৬৯)

প্রশ্ন (৩৫/১৯৫) : কোন ভাল কাজ করার পূর্বে তাতে সফল হওয়ার জন্য দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করা হয়। এই ছালাতের কোন ভিত্তি আছে কি?

-ইস্রাফীল, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।

উত্তর : যে কোন বৈধ প্রয়োজন পূরণের জন্য দু’রাক‘আত নফল ছালাত আদায় করা মুস্তাহাব। একে ‘ছালাতুল হাজত’ বলা হয়। এক্ষেত্রে শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর সালাম ফিরানোর পূর্বে প্রয়োজনীয় বিষয়টির কথা নিয়তের মধ্যে এনে নিম্নোক্ত সারগর্ভ দো‘আটি পাঠ করবেন-اَللَّهُمَّ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ- ‘হে আল্লাহ! হে আমাদের পালনকর্তা! আপনি আমাদেরকে দুনিয়াতে মঙ্গল দিন ও আখেরাতে মঙ্গল দিন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব হ’তে রক্ষা করুন’ (দ্রঃ ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ২৬১ পৃঃ)

প্রশ্ন (৩৬/১৯৬) : রাসূল (ছাঃ) বলেন, কোন ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক না করলে সে জান্নাতে যাবে, যদিও সে যেনা করে ও চুরি করে। উক্ত হাদীছের ব্যাখ্যা কি?

-শামীম হোসেন

কাটাখালী, সাতক্ষীরা।

উত্তর : এর ব্যাখ্যা হ’ল, কবীরা গোনাহগার মুমিন কাফির-মুশরিকদের ন্যায় চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না। বরং খালেছ তওবার কারণে আল্লাহ তাকে প্রথমেই ক্ষমা করবেন অথবা গুনাহের শাস্তি স্বরূপ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করার পর সে জান্নাত লাভে ধন্য হবে। কারণ শিরকের গোনাহ ব্যতীত সকল গোনাহ আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন (নিসা ৪/৪৮)। আবার বিদ‘আতমুক্ত কবীরা গুনাহগার ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-এর শাফা‘আত প্রাপ্ত হয়েও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে। কেননা তাঁর শাফা‘আত হবে কবীরা গুনাহগারদের জন্য (আবুদাঊদ হা/৪৭৩৯, তিরমিযী হা/২৪৩৫, ইবনু মাজাহ হা/৪৩১০)। অত্র হাদীছে খারেজী ও মু‘তাযিলাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ রয়েছে। যারা বলেন, কবীরা গোনাহগার ব্যক্তি চিরস্থায়ী জাহান্নামী, যদি সে তওবা না করে মারা যায় (মির‘আত হা/২৬-এর ব্যাখ্যা দ্রঃ)

প্রশ্ন (৩৭/১৯৭) : সরকারী উপবৃত্তি পাওয়ার জন্য বয়স কম দেখানো হচ্ছে। এভাবে টাকা উঠানো জায়েয হবে কি?

-ফাউয়ায

ডিমলা, নীলফামারী।

উত্তর : এটি প্রতারণা, যা নিঃসন্দেহে হারাম ও কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয় (মুসলিম হা/১০১, মিশকাত হা/৩৫২০)

প্রশ্ন (৩৮/১৯৮) : বাড়িতে কয়েকজন একত্রে জামা‘আতে ছালাত আদায় করলে মসজিদে জামা‘আতে ছালাত আদায়ের নেকী পাওয়া যাবে কি?

-রোকনুযযামান, বিরল, দিনাজপুর।

উত্তর : বাড়িতে জামা‘আতে ছালাত আদায় করলে জামা‘আতের নেকী পাওয়া যাবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, একাকী ছালাত আদায়কারীর চেয়ে জামা‘আতে ছালাত আদায়কারী ২৭ গুণ বেশী নেকী পাবে’ (বুখারী, মুসরিম, মিশকাত হা/১০৫২)। তবে মসজিদে আদায়ের নেকী পাওয়া যাবে না। মসজিদে ছালাত আদায়ের ফযীলত সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সকালে ও সন্ধ্যায় (পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতে) মসজিদে যাতায়াত করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে মেহমানদারী প্রস্ত্তত রাখেন’ (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৬৯৮)। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি উত্তম রূপে ওযূ করে একমাত্র ছালাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে আসবে, তার প্রতি পদক্ষেপে মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয় এবং একটি করে পাপ মোচন করা হয় ও একটি করে নেকী লেখা হয় (বুখারী হা/৪৭৭; মুসলিম হা/৬৪৯, ৬৫৪; মিশকাত হা/৭০২, ১০৭২)

প্রশ্ন (৩৯/১৯৯) : জিহাদ কি এবং কেন? কোন কোন অবস্থার প্রেক্ষিতে জিহাদ ‘ফরযে আইন’ এবং ‘ফরযে কিফায়া’ সাব্যস্ত হয়? বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।

-আবুবকর ছিদ্দীক

ধানমন্ডি, ঢাকা।

উত্তর : ‘জিহাদ’ অর্থ, সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো’। পারিভাষিক অর্থে, আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো। এর দ্বারা নিজেকে এবং অপরকে প্রবৃত্তির চাহিদা থেকে দূরে রাখা এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত রাখার সর্বাত্মক প্রচেষ্টাকে বুঝানো হয়। ইবনু হাজার বলেন, নফস, শয়তান ও ফাসিকদের বিরুদ্ধে জিহাদও এর অন্তুর্ভুক্ত’ (ইবনু হাজার, ফাৎহুল বারী ৬/৫ পৃঃ)। কাফিরের বিরুদ্ধে জিহাদ প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয। চাই সেটা হাত দিয়ে হৌক বা যবান দিয়ে হৌক বা মাল দিয়ে হৌক কিংবা অন্তর দিয়ে হৌক’ (ফাৎহুল বারী হা/ ২৮২৫-এর ব্যাখ্যা, ৬/৪৫ পৃঃ)। তবে ঈমান, ছালাত ও ছিয়ামের ন্যায় সশস্ত্র ‘জিহাদ’ প্রত্যেক মুমিনের উপরে সর্বাবস্থায় ‘ফরয আয়েন’ নয়। বরং আযান, জামা‘আত, জানাযা ইত্যাদির ন্যায় ‘ফরযে কিফায়াহ’। যা উম্মতের কেউ আদায় করলে অন্যদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। না করলে সবাই গোনাহগার হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে জিহাদ ফরযে আয়েন হয়ে যায়। যেমন, (১) মুসলমানদের বাড়ীতে বা শহরে শত্রুবাহিনী উপস্থিত হ’লে (তওবাহ ৯/১২৩) (২) শাসক যখন কাউকে যুদ্ধে বের হবার নির্দেশ দেন (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/২৭১৫, ৩৮১৮) (৩) যুদ্ধের সারিতে উপস্থিত হ’লে (আনফাল ৮/১৫, ৪৫)। (৪) যখন কেউ বাধ্য হয় (তিরমিযী হা/১৪২১, মিশকাত হা/৩৫২৯)। বর্তমান যুগে মুসলিম দেশের সেনাবাহিনী সশস্ত্র যুদ্ধের দায়িত্ব পালন করবে।

স্মর্তব্য যে, শত্রুশক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণার অধিকার হ’ল মুসলমানদের সর্বসম্মত আমীরের (নিসা ৪/৫৯)। রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ব্যতীত কোন দল বা ব্যক্তি এককভাবে কারু বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ ঘোঘণা করতে পারে না (এবিষয়ে বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : ‘জিহাদ ও ক্বিতাল’ বই)

প্রশ্ন (৪০/২০০) : সূরা কাহফের বিশেষ কোন ফযীলত আছে কি?

-মুহাম্মাদ অনিক

 কোর্ট চাঁদপুর, দিনাজপুর।

উত্তর : এ ব্যাপারে কয়েকটি বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন, রাসূল (ছাঃ) বলেন, সূরা কাহফের প্রথম ১০ আয়াত পাঠ করলে বা মুখস্থ করলে দাজ্জালের ফেৎনা থেকে নিরাপদ থাকা যায় (মুসলিম, ইবনু হিববান হা/৭৮৬; মিশকাত হা/২১২৬)। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি সূরা কাহফ পাঠ করবে, তার জন্য কিয়ামতের দিন একটি বিশেষ নূর বা আলো থাকবে (ত্বাবারাণী, ছহীহাহ হা/২৬৫১)। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি জুম‘আর দিন সূরা কাহফ পাঠ করবে, পরবর্তী জুম‘আর দিন পর্যন্ত তার জন্য একটি নূর বা আলো জ্বালানো হবে (দারেমী হা/৩৪০৭, ছহীহ তারগীব হা/৭৩৬)। বারা ইবনু আযেব (রাঃ) বলেন, ‘এক ব্যক্তি সূরা কাহ্ফ পাঠ করছিল। পাশেই তার দু’টি ঘোড়া বাঁধা ছিল। তৎক্ষণাৎ এক খন্ড মেঘের আকৃতিতে ফেরেশতাগণ তাকে আচ্ছাদিত করে নিল। এমনকি তারা আরো নিকটবর্তী হ’তে লাগল। তখন তার ঘোড়া দু’টি লাফাতে থাকে। পরদিন সকালে তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এর নিকটে উক্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, এটা রহমত, যা কুরআনের কারণে নেমে এসেছিল (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২১১৭)

 

 

HTML Comment Box is loading comments...