প্রবন্ধ

মুসলিম উম্মাহর বর্তমান বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয়

-মূল : শায়খ নাছিরুদ্দীন আলবানী

অনুবাদ : আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব
এম.ফিল গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

[বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছ শায়খ নাছিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) ইলমে হাদীছে অপরিসীম অবদান রাখার পাশাপাশি বিশুদ্ধ ইসলামের আলোকে মুসলিম জাতিকে সঠিক পথের দিশা দানের লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে অবস্থার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্নোত্তর প্রদান করেছেন। এলাহী জ্ঞানের গভীরতার কারণে তাঁর বহু বক্তব্য কালোত্তীর্ণ মর্যাদায় আসীন হয়ে রয়েছে। একথা সর্বজন বিদিত যে, বর্তমানে সারা বিশ্বে মুসলিম জাতি বিভিন্ন দিক থেকে দুর্দশার শিকার। বিশেষ করে বেশ কিছু দেশে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর চালানো নির্মম নির্যাতন এবং সে ব্যাপারে তথাকথিত বিশ্ব বিবেকের নিশ্চুপ ও অনৈতিক ভূমিকায় প্রতিটি মুসলিমের হৃদয়ে দুঃখ ও ক্ষোভের আগুন ধূমায়িত হচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও শক্তি না থাকায় এর প্রতিরোধ বা প্রতিকারের উপায় তারা খুঁজে পাচ্ছে না। অন্যদিকে মুসলিম শাসকরাও প্রায় সকলেই স্ব স্ব ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হীন স্বার্থে এসকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে টু’শব্দটি পর্যন্ত করছেন না। এমতাবস্থায় সাধারণ মুসলমানদের করণীয় কি হ’তে পারে, এ নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এমনই একটি প্রশ্নের জওয়াবে শায়খ আলবানী (রহঃ) যে বক্তব্য প্রদান করেছিলেন, নিম্নে তা ঈষৎ সংক্ষেপায়িত আকারে উপস্থাপন করা হ’ল- অনুবাদক]

প্রশ্ন : হে শায়খ! আপনি জানেন বর্তমানে মুসলমানরা বিশ্বের সর্বত্র নির্যাতিত হচ্ছে। অথচ মুসলিম শাসকদের সে ব্যাপারে কোন মাথাব্যথা বা কোন পদক্ষেপ নেই। এক্ষণে আমাদের করণীয় কি? আমরা কি আমাদের দায়িত্ব পালন না করায় অপরাধী হচ্ছি না?

উত্তর : ইসলামী দাওয়াত সর্বযুগেই বিরোধিতার শিকার

বর্তমান যুগে মুসলমানদের অবস্থা আর প্রাথমিক যুগে তথা মাক্কী জীবনে মুসলমানদের অবস্থার মধ্যে খুব বেশী তারতম্য নেই। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি আজকের যুগে ইসলামী দাওয়াতের অবস্থা সেযুগের ইসলামী দাওয়াতের অবস্থা থেকে খুব একটা তফাৎ নেই, বরং একই। আমাদের সকলেরই জানা আছে যে, সেযুগে দাওয়াত দানকারী ছিলেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)। তিনি যাদের মাঝে প্রেরিত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ছিল তাঁর দাওয়াতের প্রতি চরম বিরোধিতা, যেমনটি পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত হয়েছে। এই প্রতিকূলতার মধ্যেই তাঁর দাওয়াত ছড়িয়ে যেতে লাগল এবং তার পরিধি আরবের বিভিন্ন গোত্রের মাঝে বিস্তৃতি লাভ করল। তারপর রাসূল (ছাঃ) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের জন্য নির্দেশপ্রাপ্ত হ’লেন। মদীনায় হিজরতের পর তিনি সেখানে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রথম ভিত্তি স্থাপন করলেন। কিন্তু মদীনাতেও এই নতুন দাওয়াতের বিরুদ্ধে নব নব শত্রুতা  দানা  বাঁধতে  শুরু করল । অতঃপর এ দাওয়াত রোমক সম্রাট হেরাক্লিয়াস তথা খ্রিষ্টানদের গৃহাভ্যন্তরেও পৌঁছে গেল। ফলে সেখানে সৃষ্টি হ’ল নতুন শত্রুতা। কেবল আরব উপদ্বীপেই নয়। বরং উত্তর আরব তথা সিরিয়ার খ্রিষ্টানরাও শত্রুতা পোষণ করতে লাগল। অতঃপর পারসিকরাও শত্রু হিসাবে আবির্ভূত হ’ল। এভাবে ইসলামী দাওয়াত প্রথমে মক্কার মুশরিকদের, পরে ইহূদী ও খ্রিষ্টানদের এবং সবশেষে পারসিকদের বিরোধিতার মুখোমুখি হ’ল। অথচ তখন পারসিকদের সাথে খ্রিষ্টানদের চলছিল বড় ধরনের সংঘাত!

উপরোক্ত ধারাবাহিক শত্রুতার ইতিহাস থেকে স্পষ্ট হয় যে, সকল দিক থেকে বিরোধিতার শিকার বর্তমান ইসলামী দাওয়াতের অবস্থা দেখে বিস্মিত হওয়ার কোন কারণ নেই। কারণ ইসলামী দাওয়াত প্রাথমিক যুগ থেকে এভাবেই বিরোধিতার শিকার হয়ে আসছে।

প্রশ্ন হ’ল, এক্ষেত্রে করণীয় কি? এ পরিস্থিতিতে রাসূল (ছাঃ) ও তাঁর ছাহাবীগণ কি করেছিলেন, যেহেতু তখন তারা বর্তমান যুগের মুসলমানদের চেয়ে সংখ্যায় ছিলেন অনেক অনেক কম?

উত্তর : আরবের মুসলমানরা কি প্রাথমিক অবস্থায় তাদের বিরোধী আরব মুশরিক, খ্রিষ্টান ও পারসিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন? না, তারা তা করেননি। তবে কি করেছিলেন? এমতাবস্থায় প্রথম যুগের মুসলমানেরা যা করেছিলেন, বর্তমানে আমাদের উপর ঠিক সেটা করাই ওয়াজিব। কেননা তারা যে অবস্থার মুখোমুখি হয়েছিলেন, বর্তমানে আমরাও একই অবস্থার মুখোমুখি হয়েছি। সুতরাং তারা যেভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছিলেন, আমাদেরকেও সেভাবে করতে হবে।

আশা করি উপরোক্ত জবাবের মধ্য দিয়ে শ্রোতামন্ডলীর নিকটে এতক্ষণে প্রশ্নটির ইঙ্গিতপূর্ণ জবাব পৌঁছে গেছে। আমি এবার সুস্পষ্টভাবে আমার বক্তব্য পেশ করছি-

আমি বলতে চাই যে, এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা এবং যুক্তির দাবী থেকে এটা এমনিতেই বুঝা যায় যে, সে যুগে কাফের-মুশরিকদের চেয়ে সংখ্যার দিক দিয়ে বহুগুণ কম হওয়া সত্ত্বেও মুমিনরা আল্লাহ তা‘আলার সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে বিজয়ী হয়েছিল কেবলমাত্র তাদের ঈমানী শক্তির জোরে।

সুতরাং ইসলামের বিরুদ্ধে এই প্রবল শত্রুতাকে রুখে দেয়ার জন্য আজকের মুসলমানদের সেই ঔষধই ব্যবহার করতে হবে, যে ঔষধ সে যুগে ব্যবহৃত হয়েছিল। তাহ’লেই সে সফলতা অর্জিত হবে, যে সফলতা তারা অর্জন করেছিলেন।

সৃষ্টিজগৎ পরিচালনায় আল্লাহর নীতির কোন পরিবর্তন নেই

আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টিজগৎ এবং তাঁর বান্দাদেরকে এমন সুশৃংখল রীতি-নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যার কোন পরিবর্তন নেই। যেমন তিনি বলেন,فَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللهِ تَبْدِيْلاً وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللهِ تَحْوِيْلاً ‘কখনোই তুমি আল্লাহর রীতি-নীতিতে কোন ব্যতিক্রম এবং কোন ভিন্নতা খুঁজে পাবে না (ফাত্বির ৩৫/৪৩)

এই রীতি-নীতির প্রতি লক্ষ্য রাখা, সঠিকভাবে তা মূল্যায়ন করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আবশ্যক। বিশেষতঃ শারঈ বিধানগত নীতি। মূলতঃ নীতি দু’ধরনের। একটি ব্যবহারিক নীতি, অপরটি প্রাকৃতিক নীতি। প্রাকৃতিক নিয়ম-নীতি মুসলিম-কাফের, ভালো-মন্দ সকলেরই জানা। যেমন মানুষের শারীরিক গঠনের ৩টি মৌলিক উপাদান রয়েছে;  খাদ্য, পানীয় এবং বিশুদ্ধ বায়ু। এ তিনটি বস্ত্তর কোন একটির অনুপস্থিতি তাকে বস্ত্তজগতে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে। প্রকৃতির এই অমোঘ নীতি থেকে বের হয়ে মানুষের বাঁচার কোন সুযোগ আছে কি?

এর জওয়াব হ’ল, নেই। কেননা আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের পূর্বে যারা গত হয়েছে তাদের ব্যাপারে এটিই আল্লাহর রীতি ছিল; আর তুমি আল্লাহর রীতিতে কোন ব্যতিক্রম পাবে না’ (ফাতহ ৪৮/২৩)

তেমনিভাবে জানা আবশ্যক যে, আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছু ব্যবহারিক নীতি রয়েছে। যে ব্যক্তি সেগুলো অনুসরণ করবে, সে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে এবং তার ফলাফল ভোগ করতে পারবে। আর যে তা অনুসরণ করবে না, সে কখনই গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে না। যেমনটি প্রাকৃতিক নিয়ম-নীতির ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি।

আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করেন যারা তাঁকে সাহায্য করে

এবার আমরা মূল প্রশ্নে আসছি। আমরা সবাই একটি আয়াত পড়ে থাকি। অনেকে বৈঠকখানায় বা ঘরের দেয়ালে এ আয়াতটি কারুকার্যখচিত করে লিখে রাখেন। সেটা হ’ল- আল্লাহ বলেন, إِن تَنصُرُواْ اللهَ يَنصُرْكُمْ ‘যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, তবে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন’ (মুহাম্মাদ ৪৭/৭)। দুঃখের বিষয় হ’ল- আজকে আয়াতটি কেবল দেয়ালের সৌন্দর্যবর্ধক হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু এ আয়াতটির তাৎপর্য কি তা কি আমরা কখনো ভেবে দেখেছি? তাই তো বর্তমান মুসলিম বিশ্ব আজ এমন অস্থিরতা ও বিশৃংখলায় পরিপূর্ণ, যেখান থেকে মুক্তির কোন উপায় আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। অথচ মুক্তির পথ বহু আয়াতের মাঝেই উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা যদি কেবল এ আয়াতটিই স্মরণ করিয়ে দেই, তবে একটি আয়াতই মুমিনদের উপদেশ লাভের জন্য যথেষ্ট হবে।

আরবী ব্যাকরণ মোতাবেক উক্ত আয়াতে ‘যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর’ অংশটুকু শর্ত এবং ‘তবে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন’ অংশটুকু তার জওয়াব। অর্থাৎ বিষয়টি এমন যে, আমরা যদি খাদ্য গ্রহণ করি, তবে আমরা বেঁচে থাকব, আর যদি খাদ্য গ্রহণ না করি, তাহ’লে মারা যাব। একইভাবে উছূলবিদদের ‘মাফহূম মুখালাফাহ’-এর বিধান অনুযায়ী আয়াতটির অর্থ হ’ল, ‘যদি আমরা আল্লাহকে সাহায্য না করি, তাহ’লে আল্লাহ আমাদেরকে সাহায্য করবেন না’।

আয়াতের অর্থ থেকে এটাই বুঝতে হবে যে, এখানে ‘সাহায্য’ অর্থ ‘বস্ত্তগত সাহায্য’ নয়। অর্থাৎ ব্যাপারটা এমন নয় যে, আমরা আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে আমাদের দুনিয়াবী শক্তি দ্বারা লড়াই করার মাধ্যমে আল্লাহ্কে সাহায্য করব। কেননা আল্লাহ তো আমাদের বস্ত্তগত শক্তির মুখাপেক্ষী নন। বরং এর অর্থ হ’ল, যদি তোমরা আল্লাহ নির্দেশিত বিধি-বিধান অনুসরণ কর, তাহ’লে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন।

প্রশ্ন হ’ল- আজকে মুসলিম জাতি কি এই শর্ত পূরণ করছে? এর জবাব আমাদের কারোরই অজানা নয়। অর্থাৎ তারা আল্লাহকে সাহায্য করার শর্তটি পূরণ করছে না।

আমি আপনাদেরকে শিক্ষাদানের জন্য নয়, কেবল স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য বলছি যে, আজ অধিকাংশ মুসলমানই আক্বীদা-আমলসহ দ্বীনের বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞানার্জন থেকে বিমুখ হয়ে পড়েছে। তাদের অধিকাংশই ইসলাম কি তা বুঝে না। আর ইসলাম সম্পর্কে যারা স্বল্পবিস্তর জেনেছে, বস্ত্ততঃ তাও প্রকৃত ইসলাম নয়। বরং তা রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরামের অনুসৃত পথ থেকে বিচ্যুত এক বিকৃত ইসলাম।

সুতরাং আল্লাহর প্রতিশ্রুত সাহায্য লাভের জন্য যেটা আবশ্যক তা হ’ল- প্রথমে বিশুদ্ধ ইসলামী জ্ঞান অর্জন করা অতঃপর সেই মোতাবেক আমল করা। নতুবা উক্ত জ্ঞান মন্দ পরিণতিই বয়ে আনবে। যেমন আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا لِمَ تَقُوْلُوْنَ مَا لاَ تَفْعَلُوْنَ، كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللهِ أَنْ تَقُوْلُوْا مَا لاَ تَفْعَلُوْنَ- ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা এমন কথা কেন বল, যা তোমরা কর না? আল্লাহর নিকটে বড় ক্রোধের বিষয় এই যে, তোমরা এমন কথা বল, যা তোমরা কর না?’ (ছফ ৬১/৩)

আমি আরেকটি বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, আজকে অধিকাংশ মুসলমানের অভ্যাস হ’ল, তাদের উপর আপতিত লাঞ্ছনা, অপমানের কারণ হিসাবে শাসকদের উপর সকল দোষ চাপানো। কেননা শাসকরা তাদের দ্বীনকে সাহায্য করছে না। তারা ইহূদী-নাছারাদের ন্যায় বৃহৎ কাফের শক্তির হাতে লাঞ্ছিত মুসলমানদের সহায়তায় এগিয়ে আসছে না। এভাবে শাসকদের উপর দোষ চাপানোই মুসলমানদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বাস্তবতা হ’ল, এ দোষ মুসলিম উম্মাহর শাসক ও শাসিত সকলের জন্যই প্রযোজ্য। শুধু তাই নয়, বরং মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধাচরণকারী এই মুসলমানদেরও একটা অংশ দ্বীনের বিধি-বিধান সঠিক অনুসরণ না করায় ঠিক একই দোষে দুষ্ট। কারণ তারাও উপরে বর্ণিত আয়াতে (ان تنصروا الله) -এর বিরোধিতা করছে।

অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি, ঐসব নিন্দুক মুসলমানরা, যারা সর্বদা শাসকদের নিন্দায় মুখর, তারা নিজেরাও ইসলামী বিধি-বিধান লংঘনে লিপ্ত। তারা মুসলমানদের এই দুঃখজনক অবস্থার নিরসন করতে গিয়ে এমন পন্থা অবলম্বন করেছে, যা রাসূল (ছাঃ)-এর নীতি বিরোধী। যেহেতু তারা প্রথমতঃ মুসলিম শাসকদেরকে কাফের হিসাবে ঘোষণা করছে। দ্বিতীয়তঃ তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাকে ওয়াজিব বলে ঘোষণা দিচ্ছে। তখন এই মুসলমানদের হাতেই সৃষ্টি হচ্ছে সীমাহীন ফেতনা-ফাসাদ। কেননা এর ফলে মুসলমানরা একে অপরের বিরুদ্ধে সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে। ফলে তারা দলে দলে বিভক্ত হয়ে একপর্যায়ে শাসককে বাদ দিয়ে নিজেরাই আত্মকলহে লিপ্ত হয়ে পড়ছে।

তারা সংগ্রাম শুরু করছে তাদের বিরুদ্ধে যারা মনে করে যে, মুসলমানদের এ দুর্ভাগ্যজনক অবস্থার পরিবর্তনের জন্য শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা কোন কার্যকর পন্থা নয়, যদিও  আল্লাহর বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা না করার কারণে তাদের অনেকেই বিদ্রোহের হকদার হয়ে পড়েছে।

বস্ত্ততঃ তাদের মতানুসারে মুসলিম রাষ্ট্রের শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মাধ্যমে কাফেরদের পক্ষ থেকে আপতিত লাঞ্ছনা থেকে মুক্তি পাওয়া কি কখনোই সম্ভব? যখন সেদেশগুলিকে আমরা ভৌগলিক দিক থেকে মুসলিম দেশ হিসাবেই গণ্য করে থাকি? এক্ষেত্রে বলা যায়,

أوردها سعدٌ وسعدٌ مشتملْ + ما هكذا يا سعدُ تُورَد ُالإبلْ

‘সা‘দ উটটাকে পানি খাওয়াচ্ছে, সাথে নিজেও খাচ্ছে; কি হে সা‘দ এভাবে উটকে পানি খাওয়াতে হয়’? অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোন কাজ করতে চায় কিন্তু ভালভাবে করতে পারে না।

নিঃসন্দেহে মুসলমানদের মূল শত্রু হ’ল ইহূদী-নাছারা ও নাস্তিক গোষ্ঠী। সন্দেহাতীতভাবে তারাই মুসলমানদের জন্য অধিক ক্ষতিকর ঐসব মুসলিম শাসকদের চেয়ে, যারা ইলাহী বিধি-বিধান বাস্তবায়নের ব্যাপারে মুসলিম জনগণের আগ্রহে সাড়া দেয় না।

এছাড়া যারা রাসূল (ছাঃ)-এর নীতি অনুযায়ী নিজেদের আত্মিক পরিশুদ্ধির মাধ্যমে কাজ শুরু না করে প্রথমে বিদ্রোহ করাকে ওয়াজিব বলছে, তারা কি বাস্তবে কোন ফলাফল অর্জন করতে পারছে? কখনোই তারা কিছু করতে পারবে না। বর্তমান পরিস্থিতিই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বিদ্রোহের এই পথ কখনোই কাংখিত ফলাফল বয়ে আনতে পারে না। কেননা সমস্যা তো কেবল শাসকের মাঝে নয়, বরং শাসিতরাও একই দোষে দুষ্ট। সুতরাং উভয় পক্ষেরই আত্মিক পরিশুদ্ধি আবশ্যক।

মুসলমানদের করণীয় :

সকল মুসলমানই একমত যে, তারা বর্তমানে অপমান ও লাঞ্ছনার মাঝে নিমজ্জিত। এথেকে নিস্কৃতি লাভের জন্য তারা কিভাবে কাজ শুরু করবে? তারা কি মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মাধ্যমে শুরু করবে? না সমগ্র বিশ্বের কাফেরদের বিরুদ্ধে? না নফসের কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু করবে?

আমি শুরুতেই বলেছি যে, রাসূল (ছাঃ) মানুষকে আত্মশুদ্ধির দিকে আহবানের মাধ্যমে তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। দাওয়াত শুরু হয়েছিল মক্কায়, অতঃপর তা মদীনায় বিস্তৃতি লাভ করল। অতঃপর মুসলমানদের সংঘাত শুরু হ’ল প্রথমে কাফেরদের সাথে, তারপর রোমকদের, তারপর পারসিকদের সাথে।

বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিবিধানে মুসলমানদের প্রথম কর্তব্য হবে আল্লাহ্কে সাহায্য করা। এর বাইরে যে কোন উপায়ই অবলম্বন করা হৌক না কেন, কাংখিত ফল লাভ করা যাবে না। এর বাইরে যে পথটি আছে সেটা হ’ল বিদ্রোহ করা। যা বর্তমানে অসম্ভব। কেননা মুসলিম শাসকদেরকে যদি ইহুদী-খৃষ্টানদের মত কাফেরও গণ্য করা হয়, তথাপি মুসলমানরা কি বর্তমান যুগে ইহুদী-খৃষ্টানদের সাথে যুদ্ধ করার ক্ষমতা রাখে?

এর উত্তর- না। কারণ মুসলমানদের বর্তমান অবস্থা অনুরূপই, যেমনটি ছিল প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের অবস্থা। অর্থাৎ তারা দুর্বল, লাঞ্ছিত, নির্যাতিত এবং সংখ্যায় অল্প। সেদিন রাসূল (ছাঃ)-এর দাওয়াত গ্রহণের মাধ্যমে অর্জিত ঈমানটুকু ছাড়া তাদের আর কোন সহায়-সম্বল ছিল না। অতঃপর রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্যে অটল থেকে নানাবিধ কষ্টের উপর ধৈর্যধারণ তাদেরকে কাংখিত ফলাফল এনে দিয়েছিল, যা আমরা আজ কামনা করছি।

এক্ষণে কাংখিত ফলাফল লাভের উপায় কি?

উপায় একটাই অর্থাৎ ঐ পথ অবলম্বন করা, যে পথ রাসূল (ছাঃ) ও তাঁর ছাহাবীগণ অবলম্বন করেছিলেন। কেননা মুসলমানরা নানা পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত থেকে আজ কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয় লাভ করবে, এটা সম্ভব নয়। আর সেজন্য মুসলমানদের অবশ্য করণীয় হ’ল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর উপর সঠিকভাবে ঈমান আনা।

কিন্তু আজকের মুসলমান তো কেবল নামেই মুসলমান। তাদের তো ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান নেই। যেমনটি আল্লাহ বলেন, وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لاَ يَعْلَمُوْنَ ‘কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না’ (আন‘আম ৬/৩৭)। পরিস্থিতি বিশ্লেষণে আমি আপনাদেরকে আল্লাহর একটি বাণী স্মরণ করাতে চাই। যেখানে তিনি বলেছেন,

قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُوْنَ، الَّذِيْنَ هُمْ فِيْ صَلاَتِهِمْ خَاشِعُوْنَ، وَالَّذِيْنَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُّعْرِضُوْنَ، وَالَّذِيْنَ هُمْ لِلزَّكَاةِ فَاعِلُوْنَ، وَالَّذِيْنَ هُمْ لِفُرُوْجِهِمْ حَافِظُوْنَ، إِلاَّ عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُوْمِيْنَ ، فَمَنِ ابْتَغَى وَرَآءَ ذلِكَ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْعَادُوْن-

‘সফলকাম হ’ল ঐসব মুমিন, যারা তাদের ছালাতে গভীরভাবে মনোযোগী, যারা অনর্থক ক্রিয়া-কর্ম এড়িয়ে চলে, যারা সঠিকভাবে যাকাত আদায় করে, নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে, নিজেদের স্ত্রী ও অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত, কেননা এসবে তারা নিন্দিত হবে না। অতঃপর এদের ব্যতীত যারা অন্যকে কামনা করে, তারা হ’ল সীমালংঘনকারী’ (মুমিনূন ২৩/১-৭)

আমরা যদি কেবল উপরোক্ত গুণাবলীর দিকেই লক্ষ্য করি, তাহ’লে দেখব, এর প্রত্যেকটিই ইসলামের আমলকেন্দ্রিক বিষয়। এসব গুণাবলীর অধিকারী ব্যক্তিদেরকেই আল্লাহ তা‘আলা প্রকৃত মুমিন বলে আখ্যায়িত করেছেন (আনফাল ৮/৪)

অতএব সেই অর্থে কি আমরা সত্যিকার মুমিন হ’তে পেরেছি? কেবল প্রথম গুণ অনুযায়ীই আমরা কি আমাদের ছালাতে বিনয়ী বা একনিষ্ঠ হ’তে পেরেছি? আমি সাধারণ মানুষের কথা বলছি না, আমি আখেরাত যাদের কাছে গুরুত্বহীন, পেট ও প্রবৃত্তির অনুসরণই যাদের নিকটে মুখ্য, দ্বীনের ব্যাপারে অবহেলাকারী ঐসব ফাসেকদের কাছে প্রশ্ন রাখছি না। বরং যারা আজকে ছালাত আদায়কারী মুসলমান হিসাবে পরিচিত, আমি কেবল তাদেরকেই প্রশ্ন করছি যে, আমরা কি সূরা মুমিনূনের প্রথম আয়াত ক’টিতে উল্লিখিত গুণাবলীতে গুণান্বিত হ’তে পেরেছি? সমষ্টিগতভাবে বা উম্মাহগতভাবে উত্তর আসবে, না। তাহ’লে....। তাইতো কবি বলছেন,

تَرْجُوْ النَّجَاةَ وَلَمْ تَسْلُكْ مَسْالِكَهَا + إِنَّ السَّفِيْنَةَ لاَ تَجْرِيْ عَلَى الْيَبَسِ

‘তুমি মুক্তি কামনা করছ, অথচ মুক্তির পথ অনুসরণ করছ না। (জেনে রেখো) শুষ্ক ভূমিতে তো কখনো নৌকা চলতে পারে না’।

এক্ষেত্রে একটি হাদীছ আমি উল্লেখ করতে চাই, যেটা আজকের মুসলমানদের অবস্থা মনে করিয়ে দেয়। সেটা হ’ল, ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছেন, إِذَا تَبَايَعْتُمْ بِالْعِيْنَةِ وَأَخَذْتُمْ أَذْنَابَ الْبَقَرِ وَرَضِيْتُمْ بِالزَّرْعِ وَتَرَكْتُمُ الْجِهَادَ سَلَّطَ اللهُ عَلَيْكُمْ ذُلاًّ لاَ يَنْزِعُهُ حَتَّى تَرْجِعُوْا إِلَى دِيْنِكُمْ ‘যখন তোমরা ঈনা (সূদের একটি কৌশলী পন্থা) পদ্ধতিতে বেচাকেনা করবে, গরুর লেজ ধরবে (অর্থাৎ শরী‘আতের হুকুম-আহকাম অনুসরণ না করে, দুনিয়াবী বিষয়ে অধিক গুরুত্ব প্রদান করবে), চাষাবাদেই সন্তুষ্ট থাকবে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ ছেড়ে দিবে, তখন আল্লাহ তোমাদের উপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দিবেন। যতক্ষণ তোমরা দ্বীনের দিকে ফিরে না আসবে, ততক্ষণ তোমাদের উপর থেকে লাঞ্ছনা উঠিয়ে নেবেন না’।[1]

আমি এখানে পুরো হাদীছটি নিয়ে আলোচনা না করে কেবল إِذَا تَبَايَعْتُمْ بِالْعِينَةِ অংশটুকু নিয়ে আলোচনা করতে চাচ্ছি। ঈনা একটি সূদী লেনদেনের মাধ্যম। আমি বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না। তবে আজকে মুসলমানরা যে বিভিন্ন প্রকারের সূদী লেনদেনের সাথে জড়িত, তা কি কারো অজানা রয়েছে? আজকে সকল মুসলিম দেশেই এরূপ সূদী ব্যাংকের ছড়াছড়ি এবং সকল দেশেই তা অনুমোদিত!

আমি আবারও আগের কথায় ফিরে আসতে চাই, কেবল শাসকরাই নয়, শাসিতরাও একই রোগে আক্রান্ত। যেসব মুসলিম আজ এসব ব্যাংকের সাথে সূদী লেনদেন করছে, তাদেরকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে, তুমি কি অবগত নও যে সূদ হারাম? তুমি কি জানো না বিষয়টা এতই নিকৃষ্ট যে, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘কোন ব্যক্তির এক দিরহাম পরিমাণ সূদ খাওয়া আল্লাহর নিকটে ছত্রিশবার যেনায় লিপ্ত হওয়ার চেয়েও কঠিন’?[2] তারপরও কেন তুমি সূদী লেনদেন করছ? সে বলবে, আমাদের আর কি করার আছে...আমাদের তো খেয়ে-পরে বাঁচতে হবে!!

অতএব অপরাধটা কেবল শাসকের সাথে জড়িত নয়, শাসক-শাসিত উভয়ের সাথে জড়িত। বরং প্রকৃত বিচারে শাসিতরাই অধিকতর দায়ী। যেমন সিরীয় প্রবাদে বলা হয়,دود الخل منه وفيه অর্থাৎ ‘আচারের পোকা আচারেই জন্ম নেয় এবং আচারেই অবস্থান করে’। অর্থাৎ ঐসব শাসকবৃন্দ মঙ্গলগ্রহ থেকে আমাদের উপর নাযিল হয়নি। বরং তারা আমাদের মাঝেই বেড়ে উঠেছে, আমাদের সাথেই অবস্থান করছে। সুতরাং যদি আমরা আমাদের অবস্থার সংশোধন কামনা করি, তবে নিজেদের দায়-দায়িত্ব এবং অপরাধ ভুলে গিয়ে কেবল শাসকদের বিরুদ্ধে ভীষণ যুদ্ধের ঘোষণা দিলে চলবে না। কারণ সমস্যার উৎপত্তিস্থল আমাদের মাঝেই। মুসলিম বিশ্বের সর্বত্রই এই সমস্যা বিদ্যমান।

অতএব আমি মুসলমানদেরকে তাদের দ্বীনের দিকে ফিরে আসার জন্য আহবান করছি এবং নছীহত করছি যতটুকু ইলম হাছিল হয়েছে তদনুযায়ী আমল করার জন্য।

বর্তমান বিশ্বের বহু সমস্যা নিয়ে কতিপয় যুবক উত্তেজিত হয়ে উঠে বলে, আমাদের করণীয়টা কি? একইভাবে আমরা আরও বলছি, আজকে ফিলিস্তীনে ইহূদীদের জবরদখল, ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া, বসনিয়া হার্জেগোভিনিয়ায় ক্রুসেডারদের আক্রমণসহ সারাবিশ্বে মুসলমানদের উপর যে অত্যাচার-নির্যাতন নেমে এসেছে সেক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কি?

উপরোক্ত বিপর্যয়গুলো সবই সত্য এবং বাস্তব। কিন্তু এটাই সত্য যে, আবেগের বশে কোন পদক্ষেপ নিতে পারলেই এর প্রতিবিধান হবে না। বরং সেটা কেবলমাত্র ইলম ও আমল দ্বারাই সম্ভব হবে। আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! তুমি বলে দাও! তোমরা কাজ করে যাও। কারণ আল্লাহ্ তোমাদের কাজ দেখবেন এবং তাঁর রাসূল ও মুমিনগণও। আর অচিরে তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে সেই সত্তার নিকটে, যিনি গোপন ও প্রকাশ্য বিষয়ে অবগত। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে জানাবেন, যা তোমরা করতে’ (তওবা ৯/১০৫)

‘তোমরা আমল করতে থাক’- এ বিষয়ে আমি বলতে চাই, ইসলামের ছায়াতলে ইসলামের জন্য বর্তমানে যে কাজ হচ্ছে, তা বিভিন্ন দলে ও বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে অসংখ্য রূপ লাভ করেছে। বাস্তবে বহু পথ ও মতে বিভক্ত এসব দল ও গোষ্ঠীগুলিই মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বড় সমস্যা।

অথচ আল্লাহ বলেন,وَلاَ تَكُوْنُوْا مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ- مِنَ الَّذِيْنَ فَرَّقُوْا دِيْنَهُمْ وَكَانُوْا شِيَعًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُوْنَ ‘তোমরা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না’। ‘যারা দ্বীনকে বিভক্ত করেছে ও নিজেরা বিভিন্ন দল হয়ে গিয়েছে। আর প্রত্যেক দলই নিজেদের যা আছে তা নিয়ে আনন্দিত’ (রূম ৩০/৩১-৩২)। এ থেকে মুক্তির উপায় কি? কয়েকটি পথ আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই-

প্রথম পথ : এটা সর্বোৎকৃষ্ট ও অদ্বিতীয় পথ। যে পথের দিকে আমরা সর্বদাই আহবান করে চলেছি। সেটা হ’ল ইসলামের সঠিক রূপকে বিশুদ্ধভাবে হৃদয়ঙ্গম করা ও তা অনুসরণ করা এবং মুসলমানদের মধ্যে এর অনুশীলন নিশ্চিত করা। আর এটাই ছিল রাসূল (ছাঃ)-এর অনুসৃত পদ্ধতি। রাসূল (ছাঃ) তাঁর ছাহাবীগণকে প্রথমে আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান আনার দিকে আহবান করেছিলেন এবং তাদেরকে ইসলামের বিধি-বিধান সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন।   সেসময় ছাহাবীগণ ইসলাম গ্রহণের কারণে মুশরিকদের পক্ষ থেকে আপতিত অত্যাচার ও নির্যাতনের বিষয়ে রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে অভিযোগ পেশ করতেন। কিন্তু তিনি তাদেরকে কেবলই ছবরের উপদেশ দিতেন। সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর বিধান এরূপই যে, হক বাতিলের সাথে লড়াই করবে, মুমিন মুশরিকের সাথে লড়াই করবে। অতএব সমস্যা প্রতিবিধানের প্রথম পদ্ধতি হ’ল বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করা এবং সৎকর্মের অনুশীলন করা।

কিছু দল ও গোষ্ঠী রয়েছে যারা উপরোক্ত পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিরোধী। তারা ইসলামের সঠিক বুঝ ও তদনুযায়ী আমল করার বিষয়টি একপার্শ্বে রেখে বলছে, এখন এসব রাখ, আমাদের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হ’ল কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ হ’তে হবে।

সুবহানাল্লাহ! অস্ত্র ছাড়া কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা কি কখনো সম্ভব? সামান্য জ্ঞান যার আছে, সেও জানে যে অস্ত্রবিহীন কোন ব্যক্তি কখনো অস্ত্রধারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে না। এটাই স্বাভাবিক যে, অস্ত্র বলে বলীয়ান হওয়ার পরে যুদ্ধ। এটা বস্ত্তগত দিক। আরেকটা দিক হ’ল আদর্শিক দিক, যেটা বস্ত্তগত দিকের চেয়ে অধিক গুরুত্বের দাবীদার। এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটা পার্শ্বে ফেলে রেখে যদি আমরা কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নামি, তবে আমরা কখনোই সফলকাম হব না। কেননা এটা মুমিনদের প্রতি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশনার সম্পূর্ণ বিরোধী। যেমন আল্লাহ বলেন, وَالْعَصْرِ- إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ- إِلاَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ ‘কালের শপথ!  নিশ্চয়ই সকল মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তারা ব্যতীত যারা (জেনে-বুঝে) ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম সম্পাদন করেছে এবং পরস্পরকে হক-এর উপদেশ দিয়েছে ও পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে’ (আছর ১০৩/১-৩)। উক্ত বাণী অনুযায়ী নিঃসন্দেহে আমরা ক্ষতির মাঝে নিপতিত। কেননা আমরা এখানে উল্লিখিত নির্দেশনা অনুসরণ করিনি।  

বন্ধুগণ!

আমরা বলছি, আমরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি। কিন্তু অন্ধ দলবাজিতে লিপ্ত, বাতিলের পথে ধাবমান মুসলিম গোষ্ঠীসমূহকে যখন আমরা কিতাব ও সুন্নাতের দিকে ফিরে আসার আহবান জানাচ্ছি, তখন তারা বলছে, এগুলি এখন একপার্শ্বে রাখ। এখন গুরুত্বপূর্ণ হ’ল কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ। আমরা বলি, ঠিক আছে, কিন্তু এই যুদ্ধ কিভাবে হবে, অস্ত্রসহ না অস্ত্রবিহীন?

এখানে দু’প্রকার অস্ত্র থাকা আবশ্যক। প্রথম অস্ত্র হ’ল, আদর্শিক অস্ত্র। তারা বলে এসব পার্শ্বে রেখে আগে বাস্তব অস্ত্র ধর। কিন্তু এই বস্ত্তগত অস্ত্র কোথায়? তার তো কোন দিশা নেই। কারণ বর্তমানে আমরা যে ব্যবস্থায় শাসিত হচ্ছি, সেখানে এমন ধরনের প্রস্ত্ততি গ্রহণ করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। একদিকে আমরা সর্বদিক থেকে কাফের পরিবেষ্টিত, অন্যদিকে যেসব মুসলিম শাসকের শাসনাধীনে আমরা রয়েছি, সেখানে এরূপ প্রস্ত্ততি গ্রহণের কোন সুযোগ নেই।

অতএব বস্ত্তগত শক্তির অধিকারী না হওয়া সত্ত্বেও আমরা যুদ্ধে নামতে চাচ্ছি। অথচ আদর্শিক অস্ত্র আমাদের নাগালের মধ্যেই বর্তমান। আল্লাহর বাণী- فَاعْلَمْ أَنَّهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ  ‘তুমি আল্লাহ সম্পর্কে জানো যে, তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই (মুহাম্মাদ ৪৭/১৯)। এই ইলম অর্জন, অতঃপর ইলম মোতাবেক সম্ভবপর আমল করা, এটা আমাদের সাধ্যের মধ্যেই আছে। অথচ তা অস্বীকার করে এবং এক পার্শ্বে ঠেলে দিয়ে আমরা অপরিণামদর্শীর মত সাধ্যাতীত ও অসম্ভব বিষয়ের দিকে আহবান করছি!!

প্রিয় ভাতৃমন্ডলী!

আমরা যুদ্ধ করতে চাই, যুদ্ধ করার কোন বিকল্প আমাদের নেই। কিন্তু আমাদের অস্ত্র কোথায়? কি দিয়ে যুদ্ধ করব? আমরা যে উভয় অস্ত্রই হারিয়ে ফেলেছি। ফলে আমাদের অবস্থান আজ ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে। আদর্শিক অস্ত্র পরে ব্যবহার করব, আবার জাগতিক অস্ত্র হাতে নেয়ারও ক্ষমতা নেই, তাহ’লে আর কি বাকি থাকছে আমাদের? উভয় অস্ত্র হারিয়ে তো আমরা সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে পড়েছি।

আমরা যদি ইসলামের সোনালী যুগ, অর্থাৎ রাসূল (ছাঃ)-এর যামানায় ফিরে যাই তাহ’লে দেখতে পাবো, সেখানে অস্ত্রের শক্তি মুসলমানদের ছিল না। তাহ’লে তাদের বিজয়ের চাবিকাঠি কি ছিল? আদর্শিক শক্তি, না বস্ত্তগত শক্তি? নিঃসন্দেহে আদর্শিক শক্তি, যার দাওয়াত শুরু হয়েছিল, ‘তুমি আল্লাহ সম্পর্কে জানো যে, তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই’ (মুহাম্মাদ ৪৭/১৯) এই আয়াত দিয়ে। সুতরাং সবকিছুর পূর্বে সঠিক জ্ঞান, সবকিছুর পূর্বে ইসলাম। অতঃপর আমাদের সাধ্যের মধ্যে ইসলামের যতদূর সম্ভব বাস্তবায়ন করা। আমাদের সাধ্যের মধ্যে থেকে আমরা পারি সঠিক ইসলামী আক্বীদা সম্পর্কে জানতে, জানতে পারি ইসলামের যাবতীয় বিধি-বিধান, চারিত্রিক দিক সহ সবকিছু সম্পর্কেই এবং সে মোতাবেক আমলও করতে পারি। অথচ অধিকাংশ মুসলমান এগুলি থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। অতঃপর তারাই উঁচু গলায় দাবী করছে- জিহাদ চাই! জিহাদ চাই! কোথায় জিহাদ? অথচ আমাদের প্রথম অস্ত্রটি হারিয়ে গেছে, আর দ্বিতীয় অস্ত্রটিও নাগালের বাইরে।

বর্তমান সময়ে যদিও কিছু আদর্শিক অস্ত্র সমৃদ্ধ বিশুদ্ধ ইসলামী জামা‘আতের সন্ধান পাওয়া যায়, কিন্তু তাদের কাছে কোন জাগতিক শক্তি নেই। এক্ষেত্রে তাদের জন্য আল্লাহর নিম্নোক্ত নির্দেশ প্রযোজ্য হবে। যেমন তিনি বলেন, وَأَعِدُّوْا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُوْنَ بِهِ عَدُوَّ اللهِ ‘কাফিরদের মুকাবিলার জন্য তোমরা সাধ্যমত শক্তি ও সদা সজ্জিত অশ্ববাহিনী প্রস্ত্তত রাখো, যা দিয়ে তোমরা আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুদের ভীত করবে’ (আনফাল ৭/৬০)। অর্থাৎ যদি আমরা আভ্যন্তরীণ শক্তি হাছিল করে থাকি তাহ’লে আয়াতটির হুকুম তথা জাগতিক শক্তি অর্জনের বিষয়টি আমাদের উপর বর্তাবে। এখন আমরা কি অস্ত্র ছাড়াই ঝাঁপিয়ে পড়ব? না। কারণ এই আয়াত বাস্তবায়নের যোগ্য আমরা নই। কিসের প্রস্ত্ততি আমরা নেব? কোন শক্তির বলে জিহাদে নামব? আমরা তো আদর্শিক ও জাগতিক উভয় অস্ত্রই হারিয়েছি।

সুতরাং এটাই বাস্তব যে, জাগতিক শক্তি অর্জনের সামর্থ্য আমাদের এখন নেই। তবে যে সামর্থ্য আছে তা হ’ল, আদর্শবলে বলীয়ান হওয়া। এই সামর্থ্যটুকু নিয়েই আমরা বিশুদ্ধ জ্ঞান এবং আমলে ছালেহের পথে অগ্রসর হ’তে পারি। আল্লাহ আমাদের উপর সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেননি। যেমন তিনি বলেন, لاَ يُكَلِّفُ اللهُ نَفْسًا إِلاَّ وُسْعَهَا ‘আল্লাহ কোন ব্যক্তিকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না’ (বাক্বারাহ ২/২৮৬)। তিনি আরো বলেন,فَاتَّقُواْ اللهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ  তোমরা সাধ্যমত আল্লাহকে ভয় কর (তাগাবুন ৬৪/১৬)

উপসংহার :

পরিশেষে সংক্ষিপ্তভাবে বিষয়টি আবারও বলতে চাই, আজকে মুসলমানদের সমস্যা কেবল ফিলিস্তীনে সীমাবদ্ধ নয়। বরং দুঃখের সাথে বলতে হয়, মুসলিম সমাজের পদে পদে। সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়াটাই তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। তারা বিশ্বাসের সাথে কাজের মিল না থাকার দোষে প্রবলভাবে দুষ্ট। যেমন যখন আমরা ইসলাম এবং ইসলামী রাষ্ট্রের কথা বলি, তখন বলি যে, সকল মুসলিম রাষ্ট্রই প্রত্যেক মুসলিমের মাতৃভূমি। এখানে আরব-আজমের কোন তফাৎ নেই; হেজাযী, জর্দানী, মিসরীদের মাঝে কোন পার্থক্য নেই। অথচ কর্মজগতে নেমে মুসলিম বিশ্বে এই জাত-পাতের পার্থক্য প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হয়! বিস্ময়কর ব্যাপার হ’ল, এটা কেবল রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয় বরং ইসলামপন্থীদের মাঝেও বিরাজমান। বহু ইসলামী নেতাকে পাওয়া যায় যারা কেবল ফিলিস্তীনের প্রতি গুরুত্বারোপ করে চলেছেন, অন্যান্য দেশে মুসলমানদের দুরবস্থা নিয়ে তাদের কোন গুরুত্ব নেই।

উদাহরণ স্বরূপ- যখন আফগান মুসলমানদের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তাদের সমাজতান্ত্রিক মিত্রদের মাঝে লড়াই চলছিল, তখন অনেক মুসলিম নেতা নীরব ভূমিকা পালন করেছিলেন। তারা ভাবছিলেন, তারাতো সিরিয়ান নয়, মিসরী নয় বা আরব নয় ইত্যাদি ইত্যাদি!

সুতরাং সকল ক্ষেত্রেই আমাদের সমান দৃষ্টি দিতে হবে এবং কথায়-কাজে মিল রাখতে হবে। এ সমস্যাগুলো মুকাবিলা করতে আমাদের এখন আদর্শিক ও জাগতিক উভয় শক্তিতে বলীয়ান হ’তে হবে। কিন্তু শুরু করব কোনটা দিয়ে? আভ্যন্তরীণ, না জাগতিক শক্তি দিয়ে? আমাদের শুরু করতে হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথা আভ্যন্তরীণ শক্তি অর্জনের মাধ্যমে। অতঃপর জাগতিক শক্তি, যদি সেটা অর্জন করা সম্ভব হয়।  

অত্যন্ত দুঃখজনক হ’লেও সত্য যে, আফগানিস্তানে মুসলমানরা যে জাগতিক শক্তি দ্বারা সমাজতন্ত্রীদের বিরুদ্ধে জিহাদে লিপ্ত ছিল, তা কি ইসলামী অস্ত্র ছিল? না, বরং তা ছিল পাশ্চাত্যের চালানকৃত অস্ত্র! অর্থাৎ আমরা জাগতিক অস্ত্রের দিক থেকে অন্যের মুখাপেক্ষী। তাই আভ্যন্তরীণ শক্তিতে বলীয়ান হয়ে যদি আমরা যুদ্ধ করতে চাই, তবুও আমরা জাগতিক অস্ত্র বহির্দেশ থেকে আমদানীর উপর নির্ভরশীল। হয়ত তা ক্রয় করতে হবে, নতুবা দান পেতে হবে অথবা কোন কিছুর বিনিময়ে নিতে হবে। আপনারা সকলেই পাশ্চাত্যের বর্তমান রাজনীতি সম্পর্কে সমধিক অবগত, যা এই বক্তব্যের উপর ভিত্তিশীল- حكلي لحكلك অর্থাৎ দাও এবং নাও। অর্থাৎ কোন রাষ্ট্রই মূল্য পরিশোধ করা সত্ত্বেও অস্ত্র বিক্রি করবে না, যতক্ষণ না তাদের কাছে নতি স্বীকার করা হয়। হে মুসলিম জাতি! তোমরা অস্ত্রের বিনিময়ে মূল্যও পরিশোধ করবে, আবার নতি স্বীকারও করবে?

সুতরাং হে ভাইসকল! বিষয়টি এমন নয় যে আমরা যৌবনের সাময়িক তেজ, উদ্দীপনা, উত্তেজনা নিয়ে তা চিন্তা করব, যেটা সাবানের ফেনার মত উত্থিত হয়ে পরক্ষণেই নিস্তেজ হয়ে পড়ে।

পরিশেষে বলতে চাই, আল্লাহর সেই ভাষাটি যেখানে আল্লাহ বলেন, ‘(হে নবী!) তুমি বলে দাও যে, তোমরা কাজ করে যাও। অতঃপর অচিরেই তোমাদের কাজ দেখবেন আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও ঈমানদারগণ। আর নিশ্চয়ই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে সেই সত্তার নিকটে, যিনি গোপন ও প্রকাশ্য বিষয়ে অবগত। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে তোমাদের সকল কৃতকর্ম সম্পর্কে জানিয়ে দিবেন’ (তওবা ৯/১০৫)

আমি আবারও বলছি, আমাদের আমল আমাদের কোন কাজে আসবে না, যদি তা বিশুদ্ধ জ্ঞানের উপর ভিত্তিশীল না হয়। আর বিশুদ্ধ জ্ঞান হ’ল, কেবলমাত্র আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর বাণী তথা সুন্নাহ।

ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন,

الْعِلْمُ قَالَ اللهُ قَالَ رَسُولُهُ + قَالَ الصَّحَابَةُ لَيْسَ خُلْفٌ فِيهِ

مَا الْعِلْمُ نَصْبُكَ لِلْخِلاَفِ سَفَاهَةً + بَيْنَ النُّصُوصِ وَبَيْنَ رَأْيِ سَفِيهِ

كَلاَّ وَلاَ جحد الصِّفَات ونفيها +حَذَرًا مِنْ التَّجْسِيمِ وَالتَّشْبِيهِ

(ধর্মীয়) জ্ঞান হ’ল যা কিছু আল্লাহ ও তাঁর রাসূল বলেছেন এবং ছাহাবায়ে কেরাম বলেছেন, যাতে দ্বিমত নেই।

তুমি আল্লাহর নাযিলকৃত অহী আর মূর্খদের রায়-এর বিভক্তির মাঝে  সমন্বয়ের লক্ষ্যে যা-ই দাঁড় করাও না কেন, তা জ্ঞান হিসাবে গণ্য হবে না।

কখনোই নয়, আল্লাহ গুণাবলীকে অস্বীকার করা বা প্রত্যাখ্যান করার কোন সুযোগ নেই। আর আল্লাহর দেহ বা তাঁর সাদৃশ্য কল্পনা করা থেকে সতর্ক থাক।

মুসলিম বিশ্বের জন্য আজ বিশুদ্ধ জ্ঞান তথা হক পথ থেকে দূরে সরে যাওয়ার এ মুছীবত অত্যন্ত বিপজ্জনক। আপনাদের কেউ কেউ হয়ত আমার এ কথাকে অপসন্দ করবেন যে, মুসলিম বিশ্বের এ মুছীবত ইহূদী কর্তৃক ফিলিস্তীনে জবরদখলের চেয়েও বিপজ্জনক। তারা আজ সেই ইসলাম সম্পর্কে জানে না, যে ইসলাম তাদের দুনিয়া-আখেরাত উভয় স্থানের সফলতা নিশ্চিত করতে পারে। মুসলমানরা যদি আজকের দুনিয়ায় কাফের-মুশরিকদের দ্বারা লাঞ্ছিত ও অত্যাচারিত হয়ে নিহতও হয়, তবুও তারা নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যবান অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করবে। অন্যদিকে অহীভিত্তিক বিশুদ্ধ ইসলাম থেকে বিচ্যুত মুসলমানরা যদি দুনিয়াবী জীবন প্রতাপের সাথেও কাটিয়ে দেয়, তবু তারা অচিরেই হতভাগা হিসাবেই মৃত্যুবরণ করবে, যদিও দুনিয়ায় তারা সৌভাগ্যবান হিসাবে জীবন যাপন করেছে।

অতএব একমাত্র চিকিৎসা- আপনারা আল্লাহর পথে ফিরে আসুন, আল্লাহর পথে ফিরে আসুন এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসুন। অর্থাৎ কুরআন ও হাদীছকে যথাযর্থভাবে জানুন, বুঝুন এবং তদনুযায়ী আমল করুন।

আমার জবাব এখানেই শেষ করছি। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য এবং দরূদ ও সালাম বর্ষিত হৌক শেষ নবী, তার পরিবারবর্গ ও তাঁর ছাহাবীগণের উপর।[3]

সারকথা

অবনতির কারণ :

১. মুসলমানরা তাদের আদর্শিক শক্তি হারিয়েছে এবং জাগতিক শক্তির দিক থেকে অমুসলিমদের মুখাপেক্ষী।

২. আজকের মুসলমানরা আক্বীদা-আমল সহ ধর্মীয় বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞানার্জন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। যতটুকু অর্জন করছে, তাও রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরামের পথ থেকে বিচ্যুত বিকৃত ইসলাম।

৩. ইসলামী বিধান না মানার ক্ষেত্রে সাধারণ মুসলমানরা কেবল শাসকদেরকে দায়ী করছে, অথচ তারা নিজেরাও এ ব্যাপারে সমান দায়ী বরং আরও বেশী।

৪. তারা রাসূল (ছাঃ)-এর দ্বীন ক্বায়েমের নীতি অনুযায়ী প্রাথমিক ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তথা আত্মিক পরিশুদ্ধি অর্জন না করেই, জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়ার উন্মত্ত আবেগে   পড়ে নিজেদের ইহকাল-পরকাল ধ্বংস করছে।

৫. তারা ঈমানের মৌলিক গুণাবলী অর্জন থেকে বহু পিছিয়ে রয়েছে।

৬. তারা পরস্পর শত-সহস্র বাতিল মতাদর্শভিত্তিক দল ও উপদলে বিভক্ত।

সমস্যা প্রতিবিধানে করণীয় :

১. মুসলমানদের সার্বিক দুর্দশা প্রতিবিধানে নববী যুগে রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরাম কর্তৃক গৃহীত নীতিই অনুসরণীয়।

২. স্রষ্টা নির্ধারিত বিশ্বপরিচালনা নীতি যেমন মানুষের জন্য অনুসরণীয়, তেমনি স্রষ্টার বিধানগত নীতিও সমানভাবে অনুসরণীয়। তাই মুক্তির জন্য মুসলমানদের করণীয় হ’ল, আল্লাহকে সাহায্য করা তথা তাঁর বিধানের আনুগত্য করা।

৩. বিশুদ্ধ ইসলামী জ্ঞান অর্জন ও তদনুযায়ী সৎকর্ম করতে হবে। কারণ বিশুদ্ধ ইসলামের অনুসারী ব্যক্তি যতই নির্যাতিত হৌক না কেন, পরকালে সে সফলকাম। কিন্তু বিকৃত ইসলামের অনুসারী ব্যক্তি দুনিয়াবী শান্তি ও সমৃদ্ধির শিখরে আরোহণ করলেও পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।


[1]. আবুদাঊদ হা/৩৪৬২, সিলসিলা ছহীহাহ হা/১১

[2]. আহমাদ, মিশকাত হা/২৮২৫

[3]. আলবানী, সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, অডিও ক্লিপ নং ৭৬০; ডাউনলোড লিংক http://www.alalbany.net/2530, http://ar.islamway.net/article/1467.

 

 

 

 

HTML Comment Box is loading comments...