সমাজ বিপ্লবের পদধ্বনি

(১) ‘আন্দোলন’-এর একজন যেলা সেক্রেটারীকে সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের জনৈক বিভাগীয় কর্মকর্তা মোবাইল ফোনে ডাক দিলেন। সেক্রেটারী নিজেও সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য। তিনি গিয়ে সাক্ষাৎ করলেন। অতঃপর ‘সংগঠন’ সম্পর্কে বহু কথা জিজ্ঞেস করলেন। নিঃশঙ্কচিত্তে তিনি সবকিছুর উত্তর দিলেন। এক পর্যায়ে তাকে প্রশ্ন করা হ’ল, আপনারা কোন দলকে ভোট দেন? উত্তরে তিনি বললেন, আমরা দলীয় নির্বাচনে বিশ্বাসী নই। আমরা দল ও প্রার্থীবিহীন নেতৃত্ব নির্বাচনে বিশ্বাসী। প্রশ্ন : সেটা কিভাবে সম্ভব? উত্তর : বর্তমান প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রের কয়েকজন বিজ্ঞ ইসলামী ব্যক্তিত্বের নাম প্রস্তাব করবেন। সেই সাথে আরও কয়েকটি নামের স্থান ফাঁকা রাখবেন। নির্বাচন কমিশন তাদের প্রস্তাবের অনুকূলে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সীমিতভাবে পরিচিতি মূলক প্রচার চালাবেন। অতঃপর সর্বাধিক নিরাপদ ও সহজ পদ্ধতিতে দেশের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের নিকটে রায় চাইবেন। অতঃপর সর্বাধিক সমর্থনপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করবেন। অতঃপর তিনি বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ ও উপযুক্ত ব্যক্তিকে নিয়ে একটি ছোট মন্ত্রীসভা গঠন করবেন। যাদের সাথে পরামর্শক্রমে তিনি দেশ পরিচালনা করবেন। এই পদ্ধতিতে কারু প্রতি কারো দলীয় বিদ্বেষ পোষণের অবকাশ থাকবে না। বরং সকলের প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে। এরপর সর্বস্তরে সিলেকশন চলবে, ইলেকশন নয়।

প্রশ্ন : প্রচলিত ইলেকশনে সমস্যা কোথায়? উত্তর : প্রচলিত ইলেকশন প্রথা একটা ধোঁকা মাত্র। এতে ইলিশ মাছ ও পুটি মাছে কোন প্রভেদ নেই। এই নির্বাচন ব্যবস্থায় একজন বিজ্ঞ ও অজ্ঞ ব্যক্তির ভোটের মূল্য সমান। দ্বিতীয়তঃ এখানে নেতৃত্ব চেয়ে নিতে হয়। তাতে প্রার্থীর মধ্যে একটা আগ্রাসী মনোভাব সৃষ্টি হয়। ফলে সশস্ত্র ক্যাডারদের কদর বাড়ে ও কালো টাকার ছড়াছড়ি হয়। তৃতীয়তঃ এর ফলে বিজয়ী প্রার্থী সর্বদা পরাজিত প্রার্থীকে ও তার সমর্থকদের শত্রুর দৃষ্টিতে দেখে থাকে এবং তাদেরকে ধ্বংসের চেষ্টায় সর্বশক্তি নিয়োগ করে। বস্ত্ততঃ সকল গণতান্ত্রিক দেশে ব্যাপক অশান্তির মূল কারণই হ’ল প্রচলিত দল ও প্রার্থী ভিত্তিক নেতৃত্ব নির্বাচন ব্যবস্থা। আমরা এর অবসান চাই।

প্রশ্ন : আপনারা তাহ’লে ক্ষমতায় যাবেন কিভাবে? উত্তর : কোন নবীই রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের জন্য দুনিয়ায় আসেননি। তাঁরা এসেছিলেন মানুষের আক্বীদা ও আমল সংশোধনের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহমুখী করতে এবং মানুষকে শয়তানের দাসত্ব ছেড়ে আল্লাহর দাসত্বে ফিরিয়ে নিতে। আমরা সে কাজটিই করে থাকি। ক্ষমতা দেওয়া না দেওয়ার মালিক আল্লাহ।

প্রশ্ন : আপনাদের উপর যুলুম হ’লে তার প্রতিকার কিভাবে করবেন? উত্তর : ইসলামী পন্থায় আমরা তার প্রতিবাদ করব। তার বিরুদ্ধে জনমত গঠন করব। বিভিন্ন উপায়ে সরকারকে নছীহত করব। সরকারের হেদায়াতের জন্য দো‘আ করব। অবশেষে প্রয়োজনে সরকারের বিরুদ্ধে আল্লাহর নিকটে কুনূতে নাযেলাহ পাঠ করব।

প্রশ্ন : আপনারা হরতাল-ধর্মঘটে বিশ্বাসী নন?  উত্তর : না। এগুলি গণতন্ত্রে বৈধ হ’লেও ইসলামে অবৈধ। এতে একজনের বা একটি দলের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য আপামর জনগণকে কষ্ট দেওয়া হয়। আমাদের আমীরে জামা‘আত বিগত চারদলীয় জোট সরকারের চাপানো মিথ্যা মামলায় ৩ বছর ৬ মাস ৬ দিন কারা নির্যাতন ভোগ করেছেন। কিন্তু আমরা কোনদিন হরতাল-ধর্মঘট বা গাড়ী ভাংচুর করিনি। আল্লাহর রহমতে তিনি ও আমাদের অন্যান্য নেতা-কর্মীগণ বেকসুর খালাস পেয়ে বেরিয়ে এসেছেন। আলহামদুলিল্লাহ

কর্মকর্তা : ধন্যবাদ আপনাকে। আপনাদের আমীরের সব বই ও বক্তৃতার সিডি আমাদের কাছে আছে। আমরা তাঁর খুৎবা নিয়মিত শুনে থাকি। খুশী হ’লাম নেতা ও কর্মীদের চিন্তার ঐক্য দেখে। আমরা আপনাদেরকে সম্মান করি।

(২) একটি পত্র, তাং ১০/০৪/১৫ইং কলারোয়া, সাতক্ষীরা। [আসুন! পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে জীবন গড়ি]

হাম্দ ও ছালাতের পর সকল রাগ প্রকাশ করছি হে আমীরে জামা‘আত! আপনার বিরুদ্ধে। কারণ আপনার কারণেই আজ আমি নানা সমস্যায় পড়েছি। আগে আমার কোন অভাব ছিল না। ছাত্রজীবনে দলের বড় পদ ছিল আমার। তখন মানুষ আমাকে দাম দিত। তারপর ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীতে চাকরী হ’ল। বেতন-ভাতা বাড়তে শুরু হ’ল। আপনার মেজ ছেলের কথায় বাদ দিলাম। তারপর ব্যবসা শুরু করলাম। কিন্তু সূদের মাধ্যমে ছাড়া কেউ ঋণ দিতে চায়না। সেটা হ’ল না। এখন হালালভাবে কোন মতে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি। আজ অভাব থাকলেও মানসিক দিক দিয়ে অনেক সুখে আছি আলহামদুলিল্লাহ। স্যার! হালাল-হারাম বাছতে গিয়ে প্রতি পদে পদে কত ক্ষতি হয়েছে আমার। আর এসব কিছু ক্ষতির জন্য আপনিই দায়ী। যে ক্ষতি করেছিলেন আমাদের প্রিয় রাসূল (ছাঃ) তাঁর ছাহাবীদের।

স্যার! বিদেশ যেতে চেয়েছিলাম অনেক টাকা আয় করার জন্য। কিন্তু পারিনি তিনটি কারণে। ১- সেখানে আমার প্রিয় সংগঠনটি পাব না। ২- সেখানে পাব না আমার হৃদয় জুড়ে যিনি আছেন, আমাদের প্রিয় আমীরে জামা‘আতকে এবং ৩- তাঁর প্রিয় সহকর্মীদেরকে।

স্যার! গত ২৮.০৩.১৫ইং তারিখে কেন্দ্রীয় তাবলীগী ইজতেমা থেকে ফিরে কিছু ভাল লাগছিল না। মনটা নওদাপাড়ায় রেখে এসেছি। একবার ইজতেমা প্যান্ডেল আর একবার মাদরাসা ময়দান। অতঃপর বক্তব্য শোনা। ঠিকমত খাওয়া না, গোসল না, তারপর ঘুম তো নেই। অনেক কষ্ট হয়ে যায় তবুও খুব ভাল লাগে। কিন্তু যেদিন শেষ হয়ে যায় অর্থাৎ শেষ রাত্রি থেকে মনটা খারাপ হ’তে থাকে। তারপর আপনার হৃদয় বিদারক বিদায়ী ভাষণ। যা শুনে চোখের পানি আটকে রাখতে পারিনা। এবার রেকর্ড করেছি। স্যার! বাচ্চাদের মত অনেক কিছু ভাবি। ইজতেমা বছরে একবার না হয়ে যদি দু’বার হ’ত! আজ এক সপ্তাহ হয়ে গেল, তবু যেন সেই সব ভাষণ কানে বাজে। ভুলতে পারিনা।

স্যার! আজ যদি এই সংগঠন না থাকত, তাহ’লে আমার মত কত মানুষ অন্ধকারে হারিয়ে যেত। আমার অনেক আত্মীয়-স্বজন মারা গেছে। সে সময় একটু কষ্ট লাগলেও চোখে পানি আসেনি। কিন্তু কোন ধার্মিক লোকের কষ্টের কথা শুনলে চোখে পানি এসে যায়।.. এবার ইজতেমায় আমাদের এলাকার একজন ধনী হানাফী মুরববী গিয়েছিলেন। তিনি সম্পূর্ণ ‘আহলেহাদীছ’ হয়ে গিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমি অনেক মানুষের সাথে উঠাবসা করি। কিন্তু এত ভাল মানুষ আমি কোথাও দেখিনি।...

স্যার! আমাদের এলাকায় কিছু দুষ্টু লোক সন্দেহ করে বলত, এরা ইজতেমায় ফ্রি গাড়ীতে যায়। এমনকি টাকা পায়’। এবার ঐ ধরনের লোকদের কয়েকজন আমাদের গাড়ীতে গিয়েছিল। আমাদের গাড়ী ভাড়ায় ২৫০০ টাকা ঘাটতি পড়ে। এগুলি স্বচক্ষে দেখে ঐসব লোকেরা এখন বলছে, যেমন গালিব ছাহেব তেমনি তাঁর কর্মীরা। স্যার! আমরা ভাল কিছু করলে আপনার প্রশংসা হয়। আর আমরা এটাই চাই।

 স্যার! আমাদের এলাকার দায়িত্বশীলদের মধ্যে একজন মাওলানাও ছিলেন না (তারা আমাদের বিরোধিতা করতেন)। অথচ ১৫-১৬ বছর আগে ঐ সকল মাওলানা ও খতীবদের সাথে আমরা যা বলেছিলাম, আস্তে আস্তে তারা তা এখন কার্যকর করছেন। আমাদের ঘৃণা করলেও আমরা যা বলি, তারা পরে তা মানতে শুরু করেন।

পরিশেষে দো‘আ করি, আল্লাহ যেন আপনাকে দীর্ঘায়ু দান করেন এবং আপনার কলমটা যেন শেষ সময় পর্যন্ত চালু রাখেন- আমীন! -ইতি।... একজন নগণ্য কর্মী, ... বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ, সাতক্ষীরা যেলা।

[‘আহলেহাদীছ আন্দোলন’-এর মাধ্যমে সমাজে তৃণমূল পর্যায়ে যে নীরব বিপ্লব সূচিত হচ্ছে, তার কিছু কিছু নমুনা এখন থেকে এই কলামে প্রকাশিত হবে ইনশাআল্লাহ। সংশ্লিষ্টদেরকে পাঠাতে অনুরোধ রইল- সম্পাদক]

 

HTML Comment Box is loading comments...