প্রবন্ধ


নেতৃত্বের মোহ

মূল : শায়খ মুহাম্মাদ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ
অনুবাদ : মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক*

(৩য় কিস্তি)

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাপ্রীতির কারণ (أسباب حب الرئاسة) :

পৃথিবীর সকল কাজের পেছনেই কারণ রয়েছে। এটা মহান আল্লাহরই কৌশল ও ব্যবস্থাপনার অংশ। তাই এমন কোন কাজ নেই যার পেছনে কারণ নেই। এই কার্যকারণের কথা যে জানে সে জানে। আর যে জানে না সে জানে না। জানা-অজানা এ বিষয়ের একটি হ’ল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাপ্রীতির রোগ। নিম্নে এ রোগের প্রধান প্রধান কারণ উল্লেখ করা হ’ল।

১. অন্যের অধীনতা থেকে মুক্ত থাকার ইচ্ছা :

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে পেতে ইচ্ছুক ব্যক্তি কখনই চায় না যে তার উপরে কেউ থাকুক। বরং তার একান্ত আগ্রহ হয়ে দাঁড়ায় যে, সেই সকলের জন্য একমাত্র আদেশদাতা ও নিষেধকারী হবে। এজন্যই সে ছোট-বড়, ইতর-ভদ্র, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের দিকে লক্ষ্য রাখে এবং ছোট-বড় প্রতিটি কাজে সে হস্তক্ষেপ করে। যা তার অধিকারে পড়ে না।

২. ক্ষমতালিপ্সা মনের আবেগ ও কামনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া :

মানুষ আদেশদাতা ও নিষেধকর্তা হ’তে ভালবাসে। সে আদেশ-নিষেধের মুখোমুখি হ’তে চায় না। মানুষের উপর ক্ষমতা খাটাতে ও তাদের প্রশংসা পেতে সে ভালবাসে। এছাড়া আরো অনেক বিষয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভের সাথে সম্পৃক্ত।

সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) বলেছেন, তুমি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যাপারে যত কম ছাড় দেওয়া দেখতে পাবে, তত কম ছাড় প্রদান আর কোন ক্ষেত্রে দেখতে পাবে না। তুমি দেখতে পাবে কোন ব্যক্তি খাদ্য, পানীয়, বস্ত্র, অর্থ ইত্যাদি বিষয়ে ছাড় দিতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হ’লে তা লাভের জন্য সে হামলে পড়ে এবং শত্রুতা শুরু করে দেয়।[1]

ইউসুফ বিন আসবাত্ব বলেন,الزهد في الرياسة أشد من الزهد في الدنيا ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতি আসক্তি থেকে মুক্তি পৃথিবীর প্রতি আসক্তি থেকে মুক্তি অপেক্ষাও অনেক বেশী কঠিন’।[2]

ইমাম ইবনু তায়মিয়া (রহঃ) বলেন, উচ্চমর্যাদা ও ক্ষমতা লাভের মোহে মানুষের মন যথাসম্ভব পরিপূর্ণ থাকে।[3]

ইবনু হিববান বলেন যে, মুনতাছির বিন বেলাল আমাকে আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন,

بلاء الناس مذ كانوا * إلى أن ةأةي الساعة

بحب الأمر والنهي * وحب السمع والطاعة

‘আমি আদেশ করব এবং নিষেধ করব, আর অন্যেরা তা শুনবে ও মানবে- এমন মানসিকতা সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকে শুরু করে ক্বিয়ামত পর্যন্ত মানুষের উপর মুছীবত রূপে চেপে রয়েছে’।[4]

৩. ঈমানী দুর্বলতা:

মানব মন ঈমান বিবর্জিত হওয়া অথবা তাদের মাঝে ঈমানী দুর্বলতা দেখা দেওয়া পৃথিবীর প্রতি মোহ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মোহ তার মধ্যে সবচেয়ে বড়। তবে যাদের অন্তর ঈমানে পরিপূর্ণ, ঈমানী শক্তি যাদের মাঝে বেশী ক্রিয়াশীল তারা নশ্বর দুনিয়ার সম্পদের মোহ থেকে বিমুখ। তাদের চিন্তা-চেতনা ও কর্মব্যস্ততা কেবল আখেরাতকে ঘিরে। আল্লাহ বলেন, تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِيْنَ لاَ يُرِيْدُوْنَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلاَ فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ- ‘এটা হচ্ছে আখেরাতের ঘর। আমি এটা তাদের জন্য নির্ধারিত করে রেখেছি যারা দুনিয়ায় কোন রকম প্রাধান্য বিস্তার করতে চায় না এবং বিশৃংখলাও সৃষ্টি করতে চায় না। আর শুভ পরিণাম তো আল্লাহভীরুদের জন্য রয়েছে’ (ক্বাছাছ ২৮/৮৩)।

আল্লামা সা‘দী বলেছেন, তাদের তো (প্রাধান্য লাভের) ইচ্ছাই নেই। সুতরাং পৃথিবীতে আল্লাহর বান্দাদের উপর বড়ত্ব দেখানো, তাদের উপর অহংকার ও সত্যের প্রতি নাক সিটকানোর মত কাজ তারা কেন করবে?[5]

৪. আমানত বা দায়িত্ব বহনের ঝুঁকি বুঝে উঠতে না পারা :

[রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও তার অধীন যে কোন দাপ্তরিক নির্বাহী দায়িত্ব একটি বড় আমানত। এ আমানত ঠিক মত রক্ষা করা যেমন অতীব সম্মানের, তেমনি এক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিণামও ভয়াবহ। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এ সম্পর্কে সচেতন নয়। বরং তারা উদাসীনতা দেখায়।-অনুবাদক] আল্লাহ তা‘আলা মানুষের এহেন আচরণ সম্পর্কে বলেছেন,

إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَنْ يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنْسَانُ إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولاً-

‘অবশ্যই আমরা (এক সময় কুরআনের দায়িত্ব বহনের) আমানত  আসমান সমূহ, পৃথিবী এবং পর্বতমালার সামনে তুলে ধরেছিলাম। কিন্তু তারা তা বহন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল এবং সবাই ভীত হয়ে পড়েছিল। অবশেষে মানুষ তা বহন করে নিল। নিঃসন্দেহে মানুষ খুবই যালিম এবং (আমানত বহন সম্পর্কে) একান্তই অজ্ঞ’ (আহযাব ৩৩/৭২)

عَنْ أَبِىْ أُمَامَةَ قَالَ قَالَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم مَا مِنْ رَجُلٍ يَلِى أَمْرَ عَشَرَةٍ فَمَا فَوْقَ ذَلِكَ إِلاَّ أَتَى اللهَ عَزَّ وَجَلَّ مَغْلُوْلاً يَوْمَ الْقِيَامَةِ، يَدُهُ إِلَى عُنُقِهِ فَكَّهُ بِرُّهُ أَوْ أَوْبَقَهُ إِثْمُهُ أَوَّلُهَا مَلاَمَةٌ وَأَوْسَطُهَا نَدَامَةٌ وَآخِرُهَا خِزْىٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ-

‘আবু উমামা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ‘এমন কোন ব্যক্তি নেই যে দশ কিংবা তার বেশী লোকের উপর কর্তৃত্ব করে। কিন্তু সে ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলার সামনে তার গলার সাথে স্বীয় হাত শৃঙ্খলিত অবস্থায় উপস্থিত হবে। তার নেকী তাকে মুক্ত করবে অথবা তার গোনাহ তাকে ধ্বংস করবে। ক্ষমতার প্রথম পর্ব ভৎর্সনাযুক্ত, মধ্যপর্ব অনুশোচনাযুক্ত এবং শেষ পর্ব ক্বিয়ামত দিবসে লাঞ্ছনাকর’।[6]

৫. কাল্পনিক তৃপ্তি লাভের অনুভূতি :

ইমাম ইবনু তায়মিয়া (রহঃ) বলেছেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাপ্রীতি, সম্পদের মোহ এবং ক্রোধের উসকানি নেশার অন্তর্ভুক্ত। মানুষের মাঝে যখন এসব চিন্তা শক্তিশালী রূপ নেয়, তখন তাকে নেশায় পেয়ে বসে। এ জিনিসগুলো এজন্য নেশাকর যে, নেশা এমন কঠিন তৃপ্তির সাথে তুলনীয় যা বিবেক-বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তৃপ্তির মূলে রয়েছে প্রিয় জিনিস প্রাপ্তির অনুভূতি। সুতরাং যখন ভাল লাগা প্রচন্ড রূপ নেয় এবং প্রেমিকের অনুভূতিও কাম্যবস্ত্ত পাওয়ার জন্য তীব্র হয়ে দাঁড়ায়, তখন বিবেক এবং ভাল-মন্দের পার্থক্য শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় ক্ষমতার মোহ মাদকের মতই নেশায় রূপ নেয়। এক্ষেত্রে বিবেক-বুদ্ধির দুর্বলতা কখনো ক্ষমতা প্রেমিকের মানসিক দুর্বলতার কারণে হ’তে পারে। আবার কখনো উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে হ’তে পারে। আসলে ক্ষমতা, অর্থ, প্রেম, মদ ইত্যাদি ক্ষেত্রে নবীনরা এমনই নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, যা পুরাতন ও অভ্যস্তদের বেলায় হয় না।[7]

৬. দুনিয়াপ্রীতি :

আব্দুল্লাহ ইবনু ছালেহ বলেন যে, ঈসা বলেছেন, ‘হে কুরআন পাঠক ও বিদ্বানমন্ডলী! জানা-বোঝার পরেও তোমরা কিভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে গেলে? চোখ থাকতেও তোমরা কিভাবে অন্ধ হয়ে গেলে? আসলে নিকৃষ্ট দুনিয়া ও কুৎসিত লালসা তোমাদের এরূপ গোমরাহ ও অন্ধ করে দিয়েছে। সুতরাং দুনিয়ার জন্য তোমাদের দুর্ভোগ আর তোমাদের জন্য দুনিয়ার পরিতাপ’।[8]

ইবনু রজব বলেছেন, وأصل محبة المال والشرف حب الدنيا وأصل حب الدنيا اتباع الهوى- ‘ধন-সম্পদ ও মান-মর্যাদার লালসার মূলে রয়েছে দুনিয়াপ্রীতি। আর দুনিয়াপ্রীতির মূলে রয়েছে খেয়াল-খুশির পেছনে চলা।

ওহাব ইবনু মুনাবিবহ বলেছেন, দুনিয়ার মোহ খেয়াল-খুশির অনুসরণের অন্তর্গত। আর দুনিয়ার মোহের মধ্যে রয়েছে ধন-সম্পদ ও মান-মর্যাদা প্রাপ্তির আকর্ষণ ও ভালবাসা। আর ধন-সম্পদ ও মান-মর্যাদার ভালবাসায় হারামকে হালাল করা হয়। দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ জন্ম নেয় অর্থ-সম্পদ ও খেয়াল-খুশির পেছনে ছোটার কারণে। খেয়াল-খুশির অনুসরণই দুনিয়ার প্রতি অনুরাগ এবং অর্থ লালসা ও মর্যাদাপ্রীতির দিকে মানুষকে আহবান জানায়। কিন্তু তাক্বওয়া খেয়াল-খুশির অনুসরণে বাধা দেয় এবং দুনিয়ার ভালবাসার বিরোধিতা করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

فَأَمَّا مَنْ طَغَى، وَآثَرَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا، فَإِنَّ الْجَحِيْمَ هِيَ الْمَأْوَى، وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى، فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى-

‘অনন্তর যে ব্যক্তি সীমালংঘন করেছে এবং (পরকালের তুলনায়) দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিয়েছে অবশ্যই জাহান্নাম হবে তার ঠিকানা। আর যে ব্যক্তি তার মালিকের সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করেছে এবং নিজেকে নফসের কামনা-বাসনা থেকে বিরত রেখেছে, অবশ্যই জান্নাত হবে তার ঠিকানা’ (নাযি‘আত ৭৯/৩৭-৪১)

এছাড়াও আল্লাহ তা‘আলা তাঁর গ্রন্থের বিভিন্ন জায়গায় জাহান্নামবাসীদের ধন-দৌলত ও ক্ষমতা নিয়ে আক্ষেপের কথা বলেছেন। তিনি বলেন,

وَأَمَّا مَنْ أُوْتِيَ كِتَابَهُ بِشِمَالِهِ فَيَقُوْلُ يَا لَيْتَنِيْ لَمْ أُوْتَ كِتَابِيَهْ، وَلَمْ أَدْرِ مَا حِسَابِيَهْ، يَا لَيْتَهَا كَانَتِ الْقَاضِيَةَ، مَا أَغْنَى عَنِّيْ مَالِيَهْ، هَلَكَ عَنِّيْ سُلْطَانِيَهْ-

‘আর যার আমলনামা সেদিন তার বাম হাতে দেওয়া হবে (দুঃখ ও অপমানে) সে বলতে থাকবে, হায় আফসোস! (আজ যদি) আমাকে কোন আমলনামা না দেওয়া হ’ত। আমি যদি আমার হিসাবের খাতা না জানতাম। হায়! আমার প্রথম মৃত্যুই যদি আমার জন্য চূড়ান্ত নিষ্পত্তিকারী হয়ে যেত! হায়! আমার ধন-সম্পদ আজ কোনই কাজে লাগল না। আমার সব ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব আজ নিঃশেষ হয়ে গেল’ (হাক্কাহ ৬৯/২৫-২৯)[9]

ইসহাক ইবনু খালাফ বলেছেন, الورع في المنطق أشد منه في الذهب والفضة، والزهد في الرئاسة أشد منه في الذهب والفضة، لأنهما يبذلان في طلب الرئاسة- ‘কথা-বার্তায় সতর্কতা সোনা-রূপার ক্ষেত্রে সতর্কতা থেকেও বেশী কঠিন। আর রাষ্ট্র ক্ষমতার লালসা সোনা-রূপার প্রতি সাবধানতা থেকেও বেশী কঠিন। কেননা সোনা-রূপাতো রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনেই ব্যয় করা হয়’।[10]

৭. আত্মম্ভরিতা :

عن بن عمر قال قال النبى صلى الله عليه وسلم ثلاث مهلكات، وثلاث منجيات، وثلاث كفارات، وثلاث درجات، فأما المهلكات : فشح مطاع وهوى متبع وإعجاب المرء بنفسه. وأما المنجيات : فالعدل في الغضب والرضا والقصد في الفقر والغنى خشية الله في السر والعلانية.

ইবনু ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম  (ছাঃ) বলেছেন, ‘তিনটি জিনিস ধ্বংসাত্মক এবং তিনটি জিনিস মুক্তিদাতা, তিনটি জিনিস পাপ মোচক এবং তিনটি জিনিস মর্যাদা বৃদ্ধিকারী। ধ্বংসাত্মক তিনটি হ’ল অনুসরণীয় কৃপণতা, অনুসৃত খেয়ালখুশি এবং আত্মম্ভরিতা। আর মুক্তিদাতা তিনটি হ’ল) রাগ ও শান্ত অবস্থায় ইনছাফ বজায় রাখা, দরিদ্রতা ও ধনাঢ্যতায় মিতব্যয়িতা এবং গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহকে ভয় করা।[11]

ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেছেন, অন্তরের আরও অনেক ব্যাধি রয়েছে। যেমন লৌকিকতা, অহংকার, আত্মম্ভরিতা, হিংসা, গর্ব, নেতৃত্বের মোহ, যমীনে প্রাধান্য বিস্তার ইত্যাদি। এ সকল রোগ সন্দেহ ও লালসা যোগে সৃষ্ট। কেননা এতে অবশ্যই নষ্ট ভাবনা ও বাতিল ইচ্ছা বর্তমান রয়েছে। যেমন আত্মম্ভরিতা, গর্ব, অহংকার ও গৌরবের মত রোগ নিজেকে বড় ভাবা এবং মানুষের নিকট থেকে শ্রদ্ধা ও প্রশংসা পাওয়ার মানসিকতা থেকে সৃষ্ট। সুতরাং অন্তরের কোন রোগই লালসা অথবা সন্দেহ কিংবা উভয়ের সংমিশ্রণ থেকে মুক্ত নয়। আবার উল্লিখিত সকল রোগ অজ্ঞতা থেকে সৃষ্ট। আর অজ্ঞতার ঔষধ হ’ল বিদ্যা।[12]

রাষ্ট্র ক্ষমতাপ্রীতির প্রতিকার :

রোগের সাথে সাথে তার ঔষধ বা প্রতিকারের ব্যবস্থা বান্দাদের উপর মহান আল্লাহ তা‘আলার অসীম অনুগ্রহের অন্যতম। কাজেই রাষ্ট্র ক্ষমতাপ্রীতির ক্ষেত্রেও এমনটা প্রযোজ্য। নিম্নে তার কিছু প্রধান প্রধান চিকিৎসা উল্লেখ করা হ’ল।

১. আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি লাভের জন্য খাঁটি মনে কাজ করা:

ইবনু রজব বলেন, ওয়াহহাব ইবনু মুনাবিবহ মাকহূলের নিকট একটি পত্রে লিখেছিলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা ও নবী করীম (ছাঃ)-কে ছালাত ও সালাম জানানোর পর তোমাকে বলছি, তুমি তো তোমার প্রকাশ্য বিদ্যা দ্বারা মানব সমাজে বেশ নাম-কাম ও মর্যাদা লাভ করেছ, এখন তোমার অপ্রকাশ্য বিদ্যা দ্বারা আল্লাহর নিকট মর্যাদা ও নৈকট্য লাভের চেষ্টা করো। জেনে রাখ, উল্লিখিত দু’টি অবস্থানের একটি অন্যের জন্য বাধা স্বরূপ’।

প্রকাশ্য বিদ্যা বলতে এখানে শরী‘আতের বিধি-বিধান, ফাতাওয়া, কিচ্ছা-কাহিনী, ওয়ায-নছীহত ইত্যাদিকে বুঝানো হয়েছে। এগুলো দ্বারা ঐ বিদ্বান ব্যক্তি মানব সমাজে একটি বিশেষ স্থান ও মর্যাদা তৈরী করতে পারে। পক্ষান্তরে অপ্রকাশ্য বিদ্যা মানুষের অন্তরে গচ্ছিত থাকে। যেমন মহান আল্লাহর পরিচয়, তাঁর ভয়, তাঁকে ভালবাসা, তাঁকে মুরাকাবা বা ধ্যান করা, তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক গাঢ় করা, তাঁর সাথে সাক্ষাতে আগ্রহী হওয়া, তাঁর উপর ভরসা করা, তাঁর ফায়ছালার উপর সন্তুষ্ট থাকা, নশ্বর দুনিয়ার সম্পদকে উপেক্ষা করা, অবিনশ্বর আখিরাতের প্রতি মনোনিবেশ করা ইত্যাদি। এসবই এ ধরনের বিদ্যার মালিককে আল্লাহর নিকট বিশেষ স্থান ও মর্যাদার অধিকারী করে দেয়। কিন্তু দু’টি অবস্থানের একটি অন্যের জন্য বাধা। সুতরাং যে তার প্রকাশ্য বিদ্যা দ্বারা পৃথিবীতে মর্যাদা বা উচ্চাসন চাইবে, তার লক্ষ্য হবে কী করে মানব সমাজে তার সম্মানের মুকুট ধরে রাখা যায়। সে পৃথিবীতে তার সম্মান ধরে রাখতে যা যা করার করবে এবং এ সম্মান কোন সময় চলে যায় তার আশঙ্কায় সে শঙ্কিত থাকবে। কিন্তু এতে করে মহান আল্লাহর নিকট তার কোন মূল্য থাকবে না; বরং আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। এজন্যই জনৈক বিদ্বান বলেছেন, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের বদলে যে দুনিয়া গ্রহণ করে তার জন্য বড়ই দুর্ভোগ।[13]

২. দায়িত্ব লাভের আবেদন মঞ্জুর না করা :

عَنْ أَبِى مُوسَى رضى الله عنه قَالَ دَخَلْتُ عَلَى النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم أَنَا وَرَجُلاَنِ مِنْ بَنِىْ عَهِّيْ فَقَالَ أَحَدُ الرَّجُلَيْنِ يَا رَسُولَ اللهِ أَمِّرْنَا عَلَى بَعْضِ مَا وَلاَّكَ اللهُ عَزَّوَجَلَّ وَقَالَ الآخَرُ مِثْلَ ذَلِكَ. فَقَالَ إِنَّا وَللهِ لاَ نُوَلِّى عَلَى هَذَا الْعَمَلِ أَحَدًا سَأَلَهُ، وَلاَ أَحَدًا حَرَصَ عَلَيْهِ-

আবু মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি ও আমার চাচার সন্তানদের দু’জন লোক নবী করীম (ছাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করি। ঐ দু’জনের একজন বলে বসে, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আল্লাহ আপনাকে যে ক্ষমতা প্রদান করেছেন, তার কোন একটা দায়িত্ব আমাদের দিন। অন্যজনও তার মত বলে ওঠে। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! আমরা তো এই কাজের দায়িত্ব তাকে দেই না যে তার আবেদন করে এবং তাকে দেই না যে তা পাওয়ার লোভ করে’।[14]

তাঁর থেকে আরও বর্ণিত আছে, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, اتقوا الله فإن أخْوَنَكُمْ عندنا من طلب العمل সাবধান! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। কেননা আমাদের হিসাবে তোমাদের মধ্যকার ঐ লোকই সবচেয়ে বড় খিয়ানতকারী, যে (সরকারী) পদ লাভের আবেদন করে।[15]

৩. পরামর্শ গ্রহণ করা :

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ করবে কি করবে না এ প্রসঙ্গে পরামর্শ করার দু’টি জায়গা রয়েছে।

প্রথম জায়গা : যখন রাষ্ট্রীয় পদ গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হয় কিংবা তা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন হিতাকাঙ্খী সত্যপন্থী লোকদের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে যে, সে এ কাজের যোগ্য কি-না?

عَنْ أَبِى ذَرٍّ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ أَلاَ تَسْتَعْمِلُنِى؟ قَالَ فَضَرَبَ بِيَدِهِ عَلَى مَنْكِبِىْ ثُمَّ قَالَ يَا أَبَا ذَرٍّ إِنَّكَ ضَعِيْفٌ وَإِنَّهَا أَمَانَةٌ وَإِنَّهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ خِزْىٌ وَنَدَامَةٌ إِلاَّ مَنْ أَخَذَهَا بِحَقِّهَا وَأَدَّى الَّذِىْ عَلَيْهِ فِيْهَا-

আবু যার (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আপনি কি আমাকে আমেল বা কর্মকর্তা নিয়োগ করবেন না? তখন তিনি আমার কাঁধে আঘাত করে বললেন, ‘আবু যার তুমি দুর্বল মানুষ। আর (রাষ্ট্রীয়) পদ একটি আমানত। ক্বিয়ামতের দিন এ আমানত অপমান ও অনুশোচনার কারণ হবে। কেবল তারাই রক্ষা পাবে, যারা যথাযথভাবে আমানত রক্ষা করবে এবং স্বীয় কর্তব্য পালন করবে’।[16]

অন্য বর্ণনায় এসেছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে বললেন, يَا أَبَا ذَرٍّ إِنِّى أَرَاكَ ضَعِيفًا وَإِنِّى أُحِبُّ لَكَ مَا أُحِبُّ لِنَفْسِى لاَ تَأَمَّرَنَّ عَلَى اثْنَيْنِ وَلاَ تَوَلَّيَنَّ مَالَ يَتِيمٍ ‘আবু যার! আমার নযরে তুমি একজন দুর্বল মানুষ। আর আমি নিজের জন্য যা ভালবাসি তা তোমার জন্যও ভালবাসি। তুমি কখনই দু’জন লোকেরও শাসক হ’তে যেও না এবং কখনই ইয়াতীমের মালের অভিভাবকত্ব করো না’।[17]

ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আবু যার (রাঃ)-কে শাসন কর্তৃত্ব গ্রহণ করতে নিষেধ করেছিলেন। কেননা তিনি তাকে দুর্বল মনে করেছিলেন। অথচ তিনি নিজে তাঁর সম্বন্ধে বলেছেন,مَا أَظَلَّتِ الْخَضْرَاءُ وَلاَ أَقَلَّتِ الْغَبْرَاءُ أَصْدَقَ مِنْ أَبِىْ ذَرٍّ- ‘আকাশের নীচে মাটির উপরে আবু যার থেকে অধিক সত্যভাষী আর কেউ নেই’।[18]

দ্বিতীয় জায়গা : রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর পরামর্শ গ্রহণ করা। যাতে করে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি স্বৈরাচারী না হয়ে যায় এবং তার চিন্তা-চেতনাকে সে তীক্ষ্ণ করতে পারে। আল্লাহ বলেন, وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ ‘আর কাজে-কর্মে তাদের পরামর্শ গ্রহণ কর’ (আলে ইমরান ৩/১৫৯)

৪. রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার খারাপ ফল স্মরণ করা :

ইবনু হিববান বলেছেন, ‘দেশ ও জাতির নেতার দুশ্চিন্তা সবার চেয়ে বেশী। তার দুঃখের মাত্রা সর্বাধিক। তাকেই সবচেয়ে বেশী ব্যস্তমনা থাকতে হয়। তার বদনামও দেশজোড়া। শত্রুর সংখ্যা তার সবার উপরে পেরেশানীও তাকে বেশী পেয়ে বসে। বিব্রতকর পরিস্থিতিও তাকে বেশী সামলাতে হয়। ক্বিয়ামতে তাকেই সবচেয়ে বেশী হিসাব দিতে হবে এবং আল্লাহ তা‘আলা মাফ না করলে সেই ক্বিয়ামতে কঠিন আযাব ভোগ করবে’।[19]

ইবনু রজব বলেছেন, ‘মানুষের কোন ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়। কাজেই অস্থায়ী ও বিচ্ছিন্ন ক্ষমতা যা আগামী দিনে তার মালিকের জন্য আফসোস, অনুশোচনা, অপমান, লাঞ্ছনা ও অপদস্থতা বয়ে আনবে তার ভাবনাই ক্ষমতা লাভের চিন্তা থেকে মানুষকে দূরে রাখতে পারে।

এভাবে ক্ষমতা থেকে দূরে থাকার অনেক উপায় ভেবে বের করা যায়। যেমন, যে মানুষ পৃথিবীতে শাসন ক্ষমতা লাভের পর শাসনকেন্দ্রিক ইসলাম নির্দেশিত দায়িত্ব পালন করে না, ক্বিয়ামতে তার ভয়াবহ পরিণতি কী হবে তা ভাবা যেতে পারে। আবার পৃথিবীতেও অত্যাচারী, স্বৈরাচারী, অহঙ্কারী শাসকদের পরিণতি লক্ষ্য করা যেতে পারে।

عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ عَنِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ قَالَ يُحْشَرُ الْمُتَكَبِّرُوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَمْثَالَ الذَّرِّ فِىْ صُوَرِ الرِّجَالِ يَغْشَاهُمُ الذُّلُّ مِنْ كُلِّ مَكَانٍ فَيُسَاقُوْنَ إِلَى سِجْنٍ فِىْ جَهَنَّمَ يُسَمَّى بُوْلَسَ تَعْلُوْهُمْ نَارُ الأَنْيَارِ يُسْقَوْنَ مِنْ عُصَارَةِ أَهْلِ النَّارِ طِيْنَةِ الْخَبَالِ-

আমর ইবনু শু‘আইব কর্তৃক তার পিতা হ’তে তিনি তার দাদা হ’তে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন যে, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ‘ক্বিয়ামত দিবসে অহঙ্কারীদেরকে পিঁপড়ার মত ক্ষুদ্র করে মানুষের আকৃতিতে তোলা হবে। চারদিক থেকে অপমান তাদের ঘিরে ধরবে। তারপর তদেরকে জাহান্নামের একটি জেলখানার দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। যার নাম বুলাস। আগুন তাদের ঘিরে ধরবে। জাহান্নামীদের রক্ত, পুঁজ তাদের পান করতে দেওয়া হবে’।[20]

এক ব্যক্তি ওমর (রাঃ)-এর নিকট জনগণের মাঝে কিচ্ছা-কাহিনী বলে বেড়ানোর অনুমতি চাইল। তিনি তাকে বললেন, আমার ভয় হয় যে, তুমি তাদের মাঝে কিচ্ছা বা ইতিহাস বলতে গিয়ে নিজেকে তাদের থেকে বড় মনে করবে। তারপর ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে তাদের পায়ের তলা দিয়ে পিষবেন।[21]

ইমাম ইবনু তায়মিয়া (রহঃ) বলেছেন, পৃথিবীতে ক্ষমতাধর শাসকরা তাদের ক্ষমতা লাভে সাহায্যকারীদের প্রতি অনুগত দাস হয়ে থাকে। তাদের নেতা ও গণ্যমান্য মনে হয়। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে তারা তাদের অধীনস্ত সহযোগীদের সহযোগিতা আশা করে এবং অসহযোগিতার ভয়ে ভীত থাকে। এ কারণে তাদের জন্য তারা অর্থকড়ি, রাষ্ট্রীয় পদ ও সুযোগ-সুবিধা ব্যয় করে। তাদের সকল দোষ ও অপরাধ তারা মাফ করে দেয়। যাতে তাদের নিরঙ্কুশ আনুগত্য ও সহযোগিতা বজায় থাকে। সুতরাং খোলা চোখে তাদের রাষ্ট্র প্রধান ও মহামান্য মনে হ’লেও প্রকৃতপক্ষে তারা তাদের অনুগত দাস ছাড়া কিছু নয়।

মোটকথা, শাসকগোষ্ঠী ও তাদের সহযোগীরা একে অপরের দাস। তারা উভয়েই আল্লাহর প্রকৃত ইবাদত বর্জনকারী। তারা যেহেতু যমীনের বুকে নাহকভাবে ক্ষমতা লাভে একে অপরের সহযোগী তাই উভয় পক্ষই অশ্লীল কাজে কিংবা চুরি-ডাকাতিতে পরস্পর সাহায্যকারীর মত। ফলে উভয় শ্রেণীই খেয়াল-খুশির দাসত্ব করতে গিয়ে পরস্পরের দাস হয়ে যায়।[22]

৫. সর্বদা ক্ষমা প্রার্থনা, তওবা ও আত্মসমালোচনা করতে থাকা :

ইবনু হিববান বলেছেন, যে মুসলমানদের শাসনকাজের দায়িত্ব বহন করে প্রতি মুহূর্তে তার আল্লাহর নিকট ধর্ণা দেওয়া অবশ্য কর্তব্য। যাতে ক্ষমতার ব্যাপারে তার কোন বাড়াবাড়ি হয়ে না যায়। সে আল্লাহর বড়ত্ব, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির কথা স্মরণ করবে। আল্লাহ্ই তো যালিমের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণকারী এবং নেককারদের প্রতিদান প্রদানকারী। সুতরাং শাসক তার কাজে অবশ্যই এমন আচরণ করবে, যাতে তার ইহলোক-পরলোক সবলোকেই কল্যাণ হয়। সে যেন তার পূর্ববর্তী শাসকদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। কেননা সে যে দায়িত্ব পেয়েছে সেজন্য অবশ্যই তাকে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে। একইভাবে এজন্য তাকে ক্বিয়ামতে অবশ্যই আল্লাহর দরবারে হিসাব দিতে হবে।[23]

৬. বিদ্যা চর্চায় ব্যস্ত থাকা, কোন সময় তা বন্ধ করে না দেওয়া :

ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন,تَفَقَّهُوْا قَبْلَ أَنْ تُسَوَّدُوْا ‘নেতা হওয়ার আগে তোমরা বিদ্যা অর্জন কর’। ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন, নেতা হওয়ার পরেও তোমরা বিদ্যা অর্জন করতে থাক। নবী করীম (ছাঃ)-এর ছাহাবীগণ তো  বৃদ্ধ বয়সে বিদ্যা শিখেছেন।[24]

হাসান বিন মানছূর আল-জাচ্ছাছ বলেন, আমি ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, কত বছর পর্যন্ত একজন মানুষ লেখা পড়া শিখবে? তিনি বললেন, মৃত্যু পর্যন্ত।[25]

৭. দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত হয়ে আখেরাতের প্রতি আসক্ত হওয়া এবং আখেরাতের কাজে প্রতিযোগিতা করা :

ইবনু রজব বলেছেন, জেনে রাখ মানুষের মন সমকালীন সকল মানুষের উপর উঠতে ও তাদের উপর কর্তৃত্ব করতে ভালবাসে। এখান থেকেই উৎপত্তি ঘটে অহঙ্কার ও হিংসার। কিন্তু বুদ্ধিমান মানুষ স্থায়ী উচ্চতা লাভের চেষ্টা চালিয়ে যায়। যাতে রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি, নৈকট্য ও সাহচর্য। নশ্বর ও অস্থায়ী উচ্চতায় তার কোনই আগ্রহ থাকে না। যার পেছনে থাকে আল্লাহর অসন্তোষ, ক্রোধ তার থেকে দূরে সরে যাওয়া এবং মানুষের অবনতি। এই দ্বিতীয় প্রকার উচ্চতারই নিন্দা করা হয়েছে। এ উচ্চতা অবাধ্যতামূলক এবং ভূপৃষ্ঠে নাহকভাবে অহংকার প্রদর্শন মাত্র।

পক্ষান্তরে প্রথম প্রকার উচ্চতা লাভের জন্য লোভ করা প্রশংসার যোগ্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, وَفِيْ ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُوْنَ ‘এতে বিজয়ী হওয়ার জন্য সকল প্রতিযোগী যেন প্রতিযোগিতা করে’ (মুতাফফিফীন ৮৩/২৬)[26]

ইমাম ইবনু তায়মিয়া (রহঃ) বলেছেন, দুনিয়া বিষয়টাই তুচ্ছ। তার বড়ও ছোট। তার চূড়ান্ত লক্ষ্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং ধন-সম্পদ লাভ। আর রাষ্ট্রের কর্ণধারের চূড়ান্ত লক্ষ্য ফেরাঊনের মত (খোদায়ী দাবী) যাকে কিনা প্রতিশোধ স্বরূপ আল্লাহ তা‘আলা সাগরে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন এবং সম্পদশালীর লক্ষ্য কারূনের মত হওয়া। তাকে আল্লাহ মাটির নীচে পুঁতে দেবেছিলেন এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত সে মাটির নীচে যেতে থাকবে।[27]

৮. রাষ্ট্রক্ষমতা ত্যাগের বদলে আল্লাহ যে নে‘মত দেবেন তা নিয়ে চিন্তা করা :

ইবনু রজব বলেছেন, মহান আল্লাহ তাঁর আধ্যাত্মিক সাধক বান্দাদেরকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সম্পদ ও মর্যাদার বদলে দুনিয়াতেই তাক্বওয়া ও আধ্যাত্মিক শক্তি দান করেন। যার ফলে অন্য সব মানুষ তাদের সমীহ করে চলে। এতো গেল তাদের বাইরের দিক, আর ভিতর দিক থেকে আল্লাহর মা‘রেফাত, ঈমান ও আনুগত্যের মজা উপভোগ করেন। এটাই সেই পবিত্র জীবন যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক নর-নারীকে দিয়েছেন। এ জীবনের স্বাদ দুনিয়াতে কোন রাজা-বাদশাহ ও রাষ্ট্রীয় পদাধিকারীরা কখনো পায়নি। এজন্যই ইবরাহীম ইবনু আদহাম (রহঃ) বলেছেন, لو يعلم الملوك وأبناء الملوك ما نحن فيه لجالدونا عليه بالسيوف- ‘রাজা-বাদশাহ ও তাদের সন্তানেরা যদি আমরা কী মজা ও সুখে-শান্তিতে আছি তা জানত, তাহ’লে তারা তা লাভের জন্য তলোয়ার নিয়ে আমাদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হ’ত।[28]

[চলবে]


[1]. আবু নু‘আইম, হিলয়াতুল আওলিয়া ৭/৩৯।

[2]. ঐ, ৮/২৩৮।

[3]. ইবনু তায়মিয়া, মাজমূঊ ফাতাওয়া ৮/২১৮।

[4]. রাওযাতুল উকালা ওয়া নুযাহাতুল ফুযালা, পৃঃ ২৭৩।

[5]. তাফসীরে সা‘দী, পৃঃ ৬২৪।

[6]. আহমাদ হা/২২৩৫৪। আলবানী বলেছেন এর সনদ জাইয়িদ। দ্রঃ সিলসিলা ছহীহা হা/৩৪৯।

[7]. আল-ইস্তিক্বামাত ২/১৪৬।

[8]. জামেউ বায়ানিল ইলম ১/২৩৩।

[9]. শারহু হাদীছ মাযেবানে জায়ে‘আনে, পৃঃ ৭১।

[10]. ইবনুল ত্বাইয়িম, মাদারিজুস সালেকীন ২/২২।

[11]. ত্বাবারানী হা/৫৭৫৪। আলবানী হাদীছটিকে হাসান বলেছেন, ছহীহাহ হা/১৮০২।

[12]. ইবনুল কাইয়িম, মিফতাহু দারিস সা‘আদাহ ১/১১১।

[13]. শারহু হাদীছ মাযেবানে জায়ে‘আনে, ৮০ পৃঃ।

[14]. বুখারী হা/৭১৪৯।

[15]. ত্বাবারাণী। আলবানী একে হাসান বলেছেন। দ্রঃ ছহীহুল জামে হা/১০৩।

[16]. মুসলিম হা/১৮২৫।

[17]. ঐ হা/১৮২৬।

[18]. তিরমিযী হা/৩৮০১। আলবানী হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন। ইবনু তায়মিয়া, আস-সিয়াসাতুশ শারঈয়াহ পৃঃ ১৬।

[19]. রাওযাতুল উকালা ওয়া নুযহাতুল ফুযালা, পৃঃ ২৭৫।

[20]. তিরমিযী হা/২৪৯২। তিনি হাদীছটিকে হাসান ছহীহ বলেছেন।

[21]. শারহু হাদীছ মাযেবালে জায়ে‘আনে, পৃঃ ৭৩-৭৫।

[22]. আল-ফাতাওয়া ১০/১৮৯।

[23]. রাওযাতুল উকালা ওয়া নুযহাতুল ফুযালা, পৃঃ ২৭৭।

[24]. বুখারী তালীকান ১/৩৯।

[25]. ত্বাবাকাতুল হানাবিলাহ ১/১৪০।

[26]. শারহু হাদীছ মাযেবানে জায়ে‘আনে, পৃঃ ৭২।

[27]. মাজমূউ ফাতাওয়া ২৮/৬১৫ পৃঃ।

[28]. শারহু হাদীছ মাযেবালে জায়ে‘আনে, পৃঃ ৭৬।

 

HTML Comment Box is loading comments...