প্রশ্নোত্তর

দারুল ইফতা

হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

প্রশ্ন (১/২৮১) : অনেকে পেশাব করার পর ইস্তেঞ্জা বা পানি না নেওয়ার কারণে ছালাত আদায় করে না। এ ব্যাপারে শরী‘আতে নির্দেশনা কি?

-ইশতিয়াক আহমাদ

মহিষালবাড়ী, গোদাগাড়ী, রাজশাহী।

উত্তর : প্রথমতঃ পেশাব করার পরে ইস্তিঞ্জা না করা গুরুতর অপরাধ এবং কবরের শাস্তির অন্যতম কারণ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩৩৮)। দ্বিতীয়তঃ ছালাত কবূলের পূর্বশর্ত হল, পবিত্রতা অর্জন করা (বুখারী হা/১৩৫, মুসলিম হা/২২৪)। সুতরাং ওযূ বা পানি না পাওয়ার শর্তে তায়াম্মুম ব্যতীত ছালাত কবুলযোগ্য হবে না। তবে ওয়াক্তের মধ্যে অপবিত্রতা দূর করা সম্ভব হলে শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করা যাবে। তৃতীয়তঃ পোষাকের অপবিত্রতা দূর করার কোন উপায় না পেলে অথবা পোষাকটি খুলে ফেললে সতর ঢাকা সম্ভব না হ’লে উক্ত পোষাকেই ছালাত আদায় করতে হবে। কেননা আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সাধ্যমত আল্লাহকে ভয় কর’ (তাগাবুন ১৬, বাক্বারাহ ২৮৬, আবুদাঊদ হা/৬৫০)। অতএব কোন অবস্থায়ই ছালাত পরিত্যাগ করা যাবে না।

প্রশ্ন (২/২৮২) : ‘হিন্দুস্থানে একটি যুদ্ধ হবে এবং সেখানে শাহাদতবরণকারীগণ জান্নাতে যাবে’ মর্মের বর্ণনাটির কোন সত্যতা আছে কি?

-ওমর ফারূক

মুর্শিদাবাদ, ভারত।

উত্তর : ক্বিয়ামতের আলামত হিসাবে উক্ত মর্মে নিম্নোক্ত ভাষায় ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘আমার উম্মতের দু’টি দলকে আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। একটি দল হিন্দুস্থানে যুদ্ধ করবে আর দ্বিতীয় দল ঈসা ইবনু মারিয়ামের সাথে থাকবে (নাসাঈ হা/৩১৭৫, ছহীহাহ হা/১৯৩৪)। অর্থাৎ সেখানে তারা দাজ্জালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে (মানাবী, শরহে জামে‘ ছাগীর ২/১৩২)। তবে উপরোক্ত হাদীছ ব্যতীত এ মর্মে আরও কিছু বর্ণনা রয়েছে, যেগুলি যঈফ (নাসাঈ হা/৩১৭৩-৭৪, আহমাদ হা/৮৮০৯, সনদ যঈফ)। স্মর্তব্য যে, হিন্দুস্থান বলতে কেবল বর্তমান ভারত নয়, বরং সমগ্র ভারত উপমহাদেশকে বুঝায়।

প্রশ্ন (৩/২৮৩) : দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণকারীর লাশ না পাওয়া গেলে উক্ত মাইয়েতের জানাযা ও দাফন-কাফনের বিধান কি?

-শরীফুল ইসলাম

শরীফপুর, গাযীপুর।

উত্তর : লাশ না মিললেও মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হ’লে তার গায়েবানা জানাযা  আদায়  করতে  হবে। কেননা  জানাযার ছালাত মৃতের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার মাধ্যম। আর লাশ না পাওয়া গেলে দাফন-কাফনের বিষয়টি বিবেচ্য নয়।

প্রশ্ন (৪/২৮৪) : তাক্বদীর কি? এ সম্পর্কে সঠিক আক্বীদা কি? বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।

-ফরীদ আহমাদ

নেছারাবাদ, পিরোজপুর।

উত্তর : তাক্বদীর শব্দটির অর্থ নির্ধারণ করা বা অনুমান করা। শারঈ পরিভাষায় তাক্বদীর হ’ল, আল্লাহ কর্তৃক বান্দার ভবিষ্যত নির্ধারণ করা। আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক মানুষের তাক্বদীর লিপিবদ্ধ করেছেন আসমান-যমীন সৃষ্টির ৫০ হাযার বছর পূর্বে এবং তিনি যার ভাগ্যে যা লিপিবদ্ধ করেছেন তাই ঘটবে (ছহীহ মুসলিম, মিশকাত হা/৭৯)। তাক্বদীর সম্পূর্ণ গোপনীয় বিষয়। আল্লাহ তা‘আলা স্বয়ং তাক্বদীরের জ্ঞান তাঁর সৃষ্টিকুল থেকে গোপন রেখেছেন। এজন্য রাসূল (ছাঃ) এ প্রসঙ্গে অহেতুক বিতর্কে জড়িয়ে পড়তে নিষেধ করেছেন(তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, মিশকাত হা/৯৮)। একদিন ছাহাবায়ে কেরাম তাকে কেবল তাক্বদীরের উপর ভরসা করে সকল আমল ছেড়ে দেওয়ার আবেদন জানালে রাসূল (ছাঃ) বললেন, তোমরা সৎকর্ম করে যাও। কেননা যাকে যেজন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার পক্ষে সে কাজ সহজসাধ্য হবে। যারা সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত, তাদের জন্য সেরূপ আমল এবং যারা দুর্ভাগাদের অন্তর্ভুক্ত তাদের জন্য সেরূপ আমল সহজ করে দেওয়া হয়েছে (বুখারী হা/৪৯৪৯)

‘তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাস’ মুমিনের মৌলিক ও অপরিহার্য ছয়টি আক্বীদার অন্তর্ভুক্ত। তাক্বদীর একটি গায়েবী বিষয়, যার রহস্য মহান আল্লাহ ব্যতীত কেউ অবগত নন। এজন্য সাধারণভাবে বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় যে, যেমন একজন লোকের সামনে ফলের রস ভর্তি গ্লাস রাখা রয়েছে। সে ইচ্ছা করলে তা পান করতে পারে, নাও পারে। অর্থাৎ সে পান করতে বাধ্য নয়। অতঃপর যদি সে পান করে, তবে তা আল্লাহর জ্ঞানে পূর্ব থেকেই রক্ষিত রয়েছে। আবার যদি পান না করে, তবুও তা আল্লাহর জ্ঞানে আগে থেকেই রক্ষিত আছে। যদি বলা হয় এর ব্যাখ্যা কি? এর জবাব এতটুকুই দেওয়া যায় যে, অসীম জ্ঞানের অধিকারী মহান আল্লাহর সৃষ্টি রহস্য মানুষের স্বল্পজ্ঞান দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। মানুষের সৎ-অসৎ যাবতীয় কর্মের ক্ষেত্রেও অনুরূপ বক্তব্যই প্রযোজ্য। একজন পাপাচারী পাপকর্মের দিকে প্রবৃত্ত হয় এবং নিজ হাতে তা বাস্তবায়ন করে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, নিজ ইচ্ছা ও ক্ষমতা প্রয়োগ করে সে পাপাচারে লিপ্ত হচ্ছে। কিন্তু একই সাথে আল্লাহর জ্ঞান বা পূর্বনির্ধারণ থেকে বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা তার নেই। এটা আল্লাহ তা‘আলার অপরিসীম ক্ষমতা ও হিকমতের বহিঃপ্রকাশ। এক্ষণে বান্দা যেহেতু নিজের তাক্বদীর জানে না, সেহেতু তাকে মন্দ কর্ম হ’তে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতে হবে এবং সর্বদা আল্লাহর বিধান মেনে কাজ করে সুন্দর পরিণতি লাভের চেষ্টা করতে হবে। তার সাধ্যমত চেষ্টার পরেও যেটা ঘটবে, বুঝতে হবে সেটাই ছিল তার তাক্বদীরের লিখন।

মূলতঃ আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করে বিবেক-বুদ্ধি দান করে, ভালো আর মন্দ দু’টি পথ দেখিয়ে এক মহাপরীক্ষার মধ্যে ফেলেছেন। আর ভালো পথের জন্য জান্নাত আর মন্দ পথের জন্য জাহান্নাম নির্ধারণ করে রেখেছেন। ফলে বিবেক দিয়ে নিজ স্বাধীনতাকে ব্যবহার করে মানুষ এ পৃথিবীতে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত যা কিছু করবে, আল্লাহ তাঁর অগ্রিম জ্ঞানে সেগুলোর সব কিছু সম্পর্কে জানেন এবং সেগুলোই তিনি লিখে রেখেছেন।

স্মর্তব্য যে, আল্লাহ তাক্বদীরের মন্দকে পরিবর্তন করে দিতে পারেন। তিনি তাক্বদীরের ভাল-মন্দকে ইচ্ছা করলে মিটিয়ে দিতে পারেন এবং বহালও রাখতে পারেন (রা‘দ ৩৯)।  রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘মানুষ পাপকর্মের কারণে রূযী থেকে বঞ্চিত হয়। দো‘আর মাধ্যমে তাক্বদীর পরিবর্তন হয় এবং নেকীর মাধ্যমে বয়স বৃদ্ধি পায় (নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, হা/৪৯২৪; মিশকাত হা/৪৯২৫)। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি স্বীয় জীবিকায় প্রশস্ততা ও মৃত্যুতে বিলম্ব কামনা করে, সে যেন আত্মীয়-স্বজনের সাথে উত্তম ব্যবহার করে’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯১৮)।

কেউ কেউ ‘ভাগ্যে যা আছে তাই হবে, আমার কিছু করার নেই’ বলে নিজেকে বিভ্রান্তির পথে টেনে নিয়ে যায়। অথচ দুনিয়ায় তারা না খেয়ে বসে থাকে না, পরীক্ষার জন্য প্রস্ত্ততি না নিয়ে পরীক্ষা দেয় না, পিপাসা লাগলে পানি না খেয়ে ভরসা করে না। অর্থাৎ ক্ষণস্থায়ী জীবনের জন্য তারা ভাগ্যের উপর ভরসা না করে চেষ্টা করে। কিন্তু যত ভরসা কেবল চিরস্থায়ী জীবনের ক্ষেত্রেই করে! এরূপ অপযুক্তির মাধ্যমে মানুষ কেবল নিজেকে ধ্বংসেই নিক্ষেপ করে। ভ্রান্ত ফের্কা অদৃষ্টবাদী জাবরিয়াগণ এরূপ ভেবে থাকেন। অথচ আল্লাহ বান্দার তাক্বদীর জানেন। কিন্তু বান্দা তা জানেনা। তাই তাকে সাধ্যমত আল্লাহর পথে কাজ করে যেতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘বান্দা কেবল সেটাই পায়, যেটার জন্য সে চেষ্টা করে’ (নাজম ৫৩/৩৯)।                             

প্রশ্ন (৫/২৮৫) :  ৩ মাস পূর্বে একটি ট্রাক ৪০ লক্ষ টাকা মূল্যে ক্রয় করেছি। যার মধ্যে ২৪ লক্ষ টাকা ঋণ রয়েছে। এক্ষণে আমার উপর যাকাত ফরয হয়েছে কি?

-ওমর বিন হোসাইন

আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা।

উত্তর : ট্রাকের ক্রয় মূল্যের উপর যাকাত লাগবে না। বরং ট্রাক থেকে উপার্জিত অর্থ যদি নিছাব পরিমাণ হয় এবং তা একবছর সঞ্চিত থাকে, তাহলে ২.৫% হিসেবে যাকাত দিতে হবে। তবে নিছাব পরিমাণ সম্পদ সঞ্চিত না রেখে যদি ঋণ পরিশোধ করে সেক্ষেত্রে যাকাত প্রদানের প্রয়োজন হবে না। হযরত ওছমান (রাঃ) বলতেন, এটি (রামাযান) যাকাতের মাস। অতএব যদি কারো উপর ঋণ থাকে তাহলে সে যেন প্রথমে ঋণ পরিশোধ করে। এরপর অবশিষ্ট সম্পদ নিছাব পরিমাণ হ’লে সে তার যাকাত আদায় করবে (মুওয়াত্ত্বা মালেক হা/৮৭৩, ইরওয়া ৩/৩৪১, সনদ ছহীহ)

প্রশ্ন (৬/২৮৬) :  জনৈক ব্যক্তি একটি কঠিন পাপকর্ম থেকে তওবা করার পর শয়তানের ধোঁকায় পড়ে পুনরায় উক্ত গোনাহে লিপ্ত হয়েছে। এক্ষণে উক্ত ব্যক্তির করণীয় কি?

-আব্দুল আউয়াল

কুমারখালী, কুষ্টিয়া।

উত্তর : ঐ ব্যক্তি পুনরায় তওবা করবে (যুমার ৫৩, মুসলিম, মিশকাত হা/২৩২৬)। পুনরায় লিপ্ত না হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করবে এবং এ ব্যাপারে আল্লাহর সাহায্য কামনা করবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘কোন বান্দা অপরাধ করল এবং বলল, হে আমার প্রতিপালক আমি অপরাধ করেছি, তুমি তা ক্ষমা কর। তখন আল্লাহ বলেন, (হে আমার ফিরিশতাগণ!) আমার বান্দা কি জানে যে তার একজন প্রতিপালক আছেন, যিনি অপরাধ ক্ষমা করেন অথবা অপরাধের কারণে শাস্তি দিবেন? (তোমরা সাক্ষী থাক) আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম। অতঃপর আল্লাহ যতদিন চাইলেন ততদিন সে অপরাধ থেকে বিরত থাকল। অতঃপর পুনরায় একই অপরাধ করল এবং ক্ষমা প্রার্থনা করল। তখন আল্লাহ একই কথা বলে তাকে ক্ষমা করে দিলেন। অতঃপর কিছুদিন পর পুনরায় একইভাবে সে অপরাধ করে ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ বললেন, ‘সে যা ইচ্ছা করুক। আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম’ (বুখারী হা/৭৫০৭, মুসলিম হা/২৭৫৮, মিশকাত হা/২৩৩৩)। এ হাদীছ প্রমাণ করে ক্ষমা প্রার্থনার প্রধান বিষয়টি হ’ল ‘আল্লাহভীতি’। কেবল আল্লাহর ভয়ে যদি বান্দা অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তাহ’লে করুণাময় আল্লাহ ক্ষমা তাকে করতে পারেন।

প্রশ্ন (৭/২৮৭) :  পৃথিবী গোলাকার হওয়ার ব্যাপারে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের কোন প্রমাণ আছে কি?

-আল-সামী

কুঠিবাড়ী, কমলাপুর, ফরিদপুর।

উত্তর : সূরা যুমার ৫, ক্বাফ ৯, লোকমান ২৯, নাযি‘আত ৩০ প্রভৃতি আয়াত সমূহ পৃথিবী গোলাকার হওয়ার প্রমাণ বহন করে। উক্ত আয়াত সমূহে আল্লাহ বলেন, يُكَوِّرُ اللَّيْلَ عَلَى النَّهَارِ وَيُكَوِّرُ النَّهَارَ عَلَى اللَّيْلِ ‘তিনিই দিবসের উপর রাত্রিকে এবং রাত্রির উপর দিবসকে আবেষ্টনকারী বানিয়েছেন’ (যুমার ৫)كَوْرٌ অর্থ গোল বানানো, মাথায় পাগড়ী পেচানো। এটাই পৃথিবী গোল হওয়ার অন্যতম প্রধান কুরআনী দলীল। কারণ এক দেশে যখন সূর্য অস্ত যায়, অন্য দেশে তখন সূর্যের উদয় হয়, এটাই পৃথিবীর গোলত্বের অকাট্য প্রমাণ। যা কুরআন বহু পূর্বে পেশ করেছে। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, وَالْأَرْضَ مَدَدْنَاهَا ‘আমরা পৃথিবীকে বিস্তৃত করে দিয়েছি’ (ক্বাফ ৭)। অর্থাৎ যা সর্বদা বিস্তৃত ও প্রশস্ত। মানুষ সারা জীবন চলতে থাকলেও পৃথিবীকে প্রশস্তই পাবে। আর এই অব্যাহত প্রশস্ততা কেবল তখনই সম্ভব, যখন পৃথিবী গোল হয়। অন্য কোন আকৃতির হলে তা সম্ভব হবে না। কেননা সে সময় তাকে একটা না একটা সীমান্তে পৌঁছতেই হবে। কিন্তু কোন প্রান্তসীমা পাওয়া বা সেখানে গিয়ে কোন গভীর গহবরে পড়ে যাওয়ার মত কখনো ঘটেনি’। বস্ত্ততঃ ‘পৃথিবী গোলাকার’ এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আবিষ্কৃত হওয়ার অন্ততঃ এগারশ’ বছর পূর্বে কুরআন মজীদই সর্বপ্রথম তা উপস্থাপিত করেছে’ (আব্দুর রহীম, স্রষ্টা ও সৃষ্টিতত্ত্ব পৃঃ ২৬৯-২৮০)

ইমাম ইবনু হাযম আন্দালুসী (৩৮৪-৪৫৬ হিঃ) সূরা যুমার ৫ আয়াত থেকে দলীল দিয়ে বলেন, ‘নেতৃস্থানীয় বিদ্বানগণের কেউই পৃথিবী গোলাকার হওয়ার ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেননি। কিংবা এর বিরুদ্ধে তাদের কারু থেকে কোন বক্তব্য জানা যায়নি। বরং কুরআন ও হাদীছে এর গোলাকার হওয়ার পক্ষেই দলীল এসেছে (ইবনু হাযম, আল-ফিছাল ফিল মিলাল ১/৩৫২ ‘পৃথিবী গোলাকার হওয়া’ অনুচ্ছেদ)।

শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (৬৬১-৭২৮ হিঃ) বিখ্যাত বিদ্বান আবুল হুসায়েন আহমাদ বিন জাফর (রহঃ)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে কোন মতভেদ নেই। তিনি বলেন, এর প্রমাণ হিসাবে বলা যায়, ‘পৃথিবীর কোন প্রান্তে সূর্য, চন্দ্র বা নক্ষত্ররাজি একই সময়ে উদিত হয় না বা অস্তও যায় না। বরং পশ্চিমের আগে তা পূর্বে উদিত হয়’ (ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ২৫/১৯৫)

প্রশ্ন (৮/২৮৮) : ওমর (রাঃ)-এর চিঠির মাধ্যমে নীলনদের পানি প্রবাহিত হওয়ার ঘটনাটির সত্যতা জানিয়ে বাধিত করবেন।

-কর্ণেল আব্দুর রাকীব

কুলোনিয়া, পাবনা।

উত্তর : উক্ত চিঠির ঘটনাটি বহু বিশ্বস্ত ইতিহাস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। যেমন ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ৭/১০০; ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক্ব ৪৪/৩৩৭; সুবকী, তাবাক্বাতুশ শাফেঈয়াহ কুবরা ২/৩২৬; সৈয়ূতী, তারীখুল খুলাফা ১/১১৩ প্রভৃতি। তবে দু’টি কারণে বর্ণনাটির সনদ খুবই দুর্বল (১) বর্ণনাটি দুর্বল রাবী ইবনে লাহি‘আহ সূত্রে বর্ণিত। (২) ইবনে লাহি‘আহ ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন ক্বায়েস বিন হাজ্জাজ মিসরীর নিকট থেকে। যিনি ষষ্ঠ স্তরের রাবী হওয়ার কারণে কোন ছাহাবীর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটেনি (ইবনু হাজার, তাক্বরীবুত তাহযীব রাবী নং-৫৫৬৮)। ফলে তিনি তাদলীসের দোষে অভিযুক্ত। অতএব ঘটনাটি সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়।

প্রশ্ন (৯/২৮৯) :  বাংলাদেশের ন্যায় একটি দেশে সামরিক বাহিনী বা পুলিশ বাহিনীতে চাকুরী করা শরী‘আতসম্মত হবে কি? এরূপ চাকুরীতে থাকা অবস্থায় যদি কেউ মারা যায়, তাহ’লে তাকে ‘শহীদ’ বলা যাবে কি?

-মুহাম্মাদ মুর্তাযা

ধূরইল, মোহনপুর, রাজশাহী।

উত্তর : আল্লাহ বলেন, তোমরা নেকী ও তাক্বওয়ার কাজে পরস্পরকে সাহায্য কর এবং গুনাহ ও অন্যায়ের কাজে সাহায্য করো না’ (মায়েদাহ ৫/২) সুতরাং যে যে অবস্থানে থাকুক না কেন, আল্লাহর বিধান মেনে অকল্যাণকর কাজ থেকে বিরত থাকার সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রশাসনিক যে কোন বাহিনীতে উপরোক্ত নির্দেশনা মেনে দায়িত্ব পালন করা দুঃসাধ্য। সেকারণেই সম্ভবতঃ রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, অবশ্যই তোমাদের উপরে এমন শাসকদের আগমন ঘটবে, যারা নিকৃষ্ট লোকদের কাছে টানবে এবং উত্তম লোকদের পিছনে সরিয়ে দিবে। তারা ছালাতকে তার ওয়াক্ত থেকে পিছিয়ে দেবে। তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে পাবে, তারা যেন কখনোই তাদের গুপ্তচর, পুলিশ, কর আদায়কারী এবং রাজস্ব কর্মকর্তা হিসাবে নিযুক্ত না হয়’ (ছহীহ ইবনু হিববান হা/৪৫৮৬, মুসনাদে আবী ইয়া‘লা হা/১১১৫; ছহীহাহ হা/৩৬০)। অতএব বর্তমান দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনে এসব চাকুরী থেকে দূরে থাকাই উত্তম। 

‘শহীদ’ সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর  রাস্তায় নিহত হয়, সে শহীদ’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৩৮১১, ‘জিহাদ’ অধ্যায়)। তিনি বলেন, যে আল্লাহর কালেমাকে সমুন্নত করার জন্য লড়াই করে, সেই-ই মাত্র আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩৮১৪)। সুতরাং যদি কেউ এসব বাহিনীতে চাকুরী করা সত্ত্বেও অমুসলিমদের আক্রমণ থেকে মুসলিম রাষ্ট্রকে রক্ষা করা এবং কোন কোন ক্ষেত্রে কেবল আল্লাহর কালেমা বা তাঁর বিধানকে সমুন্নত করার লক্ষ্যে জীবন বিলিয়ে দেন, তিনি শহীদী মর্যাদা লাভ করবেন ইনশাআল্লাহ। তবে কাউকে ‘শহীদ’ লকবে ভূষিত করার কোন সুযোগ নেই। ওমর ফারূক (রাঃ) বলেন, কেউ যুদ্ধে নিহত হলে বা মারা গেলে তোমরা বলে থাক ‘অমুক লোক শহীদ হয়ে গেছে’। তোমরা এরূপ বলো না। বরং ঐরূপ বলো যেরূপ রাসূল (ছাঃ) বলতেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় নিহত হ’ল বা মৃত্যুবরণ করল, সে ব্যক্তি শহীদ’ (আহমাদ হা/২৮৫, ১০৭৭২)

প্রশ্ন (১০/২৯০) :  হায়েয, নিফাস ও ইস্তিহাযা অবস্থায় ই‘তিকাফ করা জায়েয হবে কি?

-সালমা আখতার, নবাবগঞ্জ, দিনাজপুর।

উত্তর : হায়েয এবং নিফাসের অবস্থায় ই‘তিকাফ করা যাবে না। যদি ই‘তিকাফ অবস্থায় হায়েয শুরু হয়ে যায় অথবা সন্তান প্রসব হয়ে যায়, তবে ই‘তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে। এছাড়া রাসূল (ছাঃ) ঈদের ময়দানে উপস্থিত হওয়ার জন্য ঋতুবতী নারীদেরকে নির্দেশ দিলেও তাদেরকে ছালাত আদায় থেকে নিষেধ করেছেন’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত  হা/১৪৩১)। তবে ইস্তিহাযা অবস্থায় ই‘তিকাফ করতে পারবে (বুখারী হা/৩১০-৩১১)

প্রশ্ন (১১/২৯১) :  প্রতি মাসে দিন নির্দিষ্ট করে ছিয়াম পালন করায় শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

-নাজমুল হাসান, সাঘাটা, গাইবান্ধা।

উত্তর : শরী‘আত নির্দেশিত দিনগুলি ব্যতীত মাসের কোন দিনকে ছিয়ামের জন্য নির্দিষ্ট করা বিদ‘আত হিসাবে গণ্য হবে। শরী‘আত নির্ধারিত ছিয়াম যেমন প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার (আহমাদ হা/৮৩৪৩, ছহীহুল জামে‘ হা/৪৮০৪), আরবী মাসের ১৩,১৪,১৫ (বুখারী হা/১৯৮১, নাসাঈ হা/২৪২০) অথবা একদিন পর পর ছিয়াম পালন করা (বুখারী হা/১৯৭৬) ইত্যাদি। আর শুক্রবারকে নির্দিষ্ট করে ছিয়াম পালন করতে নিষেধ করা হয়েছে (বুখারী হা/১৯৮৪)

প্রশ্ন (১২/২৯২) : পিতা-মাতার দিকে অনুগ্রহের দৃষ্টিতে তাকালে কবুল হজ্জের নেকী লাভ করা যায় মর্মের বক্তব্যটি কি সঠিক?

-আব্দুর রাকীব

জামালপুর।

উত্তর : বর্ণনাটি মওযূ বা জাল। কারণ এর একাধিক বর্ণনা সূত্রে অধিকাংশই যঈফ ও অপরিচিত রাবী রয়েছেন (বিস্তারিত দ্রঃ আলবানী, সিলসিলা যঈফাহ হা/৩২৯৮)। তবে পিতা-মাতার প্রতি অনুগ্রহ করার জন্য কুরআন ও হাদীছে অসংখ্য নির্দেশ রয়েছে। যেমন ইসরা ২৩-২৪; তিরমিযী হা/১৮৯৯; নাসাঈ হা/৩১০৪; বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯১২ প্রভৃতি।

প্রশ্ন (১৩/২৯৩) : শোনা যায় ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ)-কে আববাসীয় শাসনামলে ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।

-আলী খান

ডোগাইর, ডেমরা, ঢাকা।

উত্তর : ঘটনা সঠিক। আববাসীয় খলীফা মামূন (১৯৮-২১৮ হিঃ), মু‘তাছিম বিল্লাহ (২১৮-২২৭ হিঃ) এবং ওয়াছিক বিল্লাহ (২২৭-২৩২ হিঃ)-এর শাসনামলে ‘কুরআন সৃষ্ট কি-না?’ এ বিষয়ে বিতর্কের উপর ভিত্তি করে মু‘তাযেলী আলেমদের চক্রান্তে খলীফাত্রয় তাঁর উপর এ নির্মম নির্যাতন চালান। এসময় তাঁকে দীর্ঘ ২৮ মাস কারা জীবন, বহু বেত্রাঘাত ও গৃহবন্দীত্বসহ বিবিধ শাস্তির সম্মুখীন হ’তে হয় (ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ১০/৩৩০)। এছাড়া বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর উপর নির্মম অত্যাচারের বিস্তারিত কাহিনী বর্ণিত হয়েছে (সুবকী, তাবাক্বাতুল হানাবিলাহ ১/৩৩৫; ইবনুল জাওযী, মানাক্বিব পৃঃ ৪০৯-১০; হিলইয়াতুল আওলিয়া ৯/২০৯-১০)

প্রশ্ন (১৪/২৯৪) : হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, তাঁর নিকটে এমন গোপন ইলম রয়েছে, যা প্রকাশ করলে তার কণ্ঠনালী কর্তিত হবে। কেউ কেউ এই গোপন ইলম দ্বারা ছূফীদের বাতেনী ইলমকে বুঝাতে চান। এক্ষণে উক্ত গোপন ইলম বলতে কি বুঝানো হয়েছে?

-আবুল কাসেম

নাচোল, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।

উত্তর : উক্ত গোপন ইলম সম্পর্কে আবু হুরায়রা (রাঃ) স্বয়ং কিছু বলেননি। তবে মুহাদ্দিছগণ এ হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, তিনি যা গোপন করেছিলেন, সেগুলি খুলাফায়ে রাশেদীন পরবর্তী মন্দ আমীর-ওমারাদের নাম, পরিচয়, সময়কাল, অবস্থা ইত্যাদি সংক্রান্ত ছিল। আবু হুরায়রা (রাঃ) তাদের কারু প্রতি ইঙ্গিত করলেও স্পষ্টভাবে কিছু বলেননি (ফাৎহুল বারী হা/১২০-এর ব্যাখ্যা দ্রঃ)

কুরতুবী বলেন, এগুলি ছিল তৎকালীন ফিৎনা-ফাসাদ, হত্যা এবং মুনাফিক ও মুরতাদ নেতাদের পরিচয় সম্পর্কিত বিষয় (তাফসীর কুরতুবী ২/১৮৬, বাক্বারাহ ১৫৯ আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রঃ)। এর সাথে ভ্রান্ত ছূফীদের বাতেনী ইলমের কোন সম্পর্ক নেই। কেননা এগুলি অনেক পরের সৃষ্টি। তাছাড়া তার গোপনকৃত বিষয়টি কোন শরী‘আত সংশ্লিষ্ট বিষয় ছিল না (কুরতুবী ২/১৮৬; যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ২/৫৯৭; ইবনু হাজার, ফাৎহুল বারী ১/২১৬)

এছাড়া ‘আজকের দিনে আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম’ (মায়েদাহ ৫/৩) আয়াত দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ বলে ঘোষণা করেছেন। অতএব সেখানে বাতেনী বা গোপন কোন ইলম বাকী থাকার প্রশ্নই আসে না।

প্রশ্ন (১৫/২৯৫) : বিভিন্ন স্থানে লেখা দেখা যায়, ‘নবী করীম (ছাঃ) গাছ লাগিয়েছেন, তাই আমাদেরকে গাছ লাগাতে হবে’। এটা কি সঠিক?

-ইয়াসমীন, ভাটাপাড়া, রাজশাহী।

উত্তর : তিনি স্বহস্তে গাছ লাগিয়েছেন একথা ঠিক। রাসূল (ছাঃ) সালমান ফারেসী (রাঃ)-এর দাসত্বমুক্তির জন্য চুক্তিকৃত জমিতে বরকতের উদ্দেশ্যে নিজ হাতে খেজুর গাছের চারা রোপণ করেছিলেন (আহমাদ হা/২৩৭৮৮; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৮৯৪)। এটি কোন বাধ্যগত বিষয় নয়। বরং তিনি গাছ লাগানোর প্রতি উৎসাহিত করেছেন। যেমন তিনি বলেন, ‘কোন মুসলিম ব্যক্তি যদি গাছ লাগায় অথবা শস্য উৎপাদন করে, অতঃপর সে শস্য বা গাছ মানুষ, পশু-পক্ষী বা চতুষ্পদ জন্তু ভক্ষণ করে, তবে তা ঐ ব্যক্তির জন্য ছাদাক্বা হবে’ (বুখারী হা/৬০১২, মুসলিম হা/১৫৫২)। তিনি এটাকে ছাদাক্বায়ে জারিয়ার অন্যতম উৎস হিসাবে বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি বলেন, মৃত্যুর পর ক্বিয়ামত পর্যন্ত বান্দার সাতটি আমল প্রবহমাণ থাকে। (১) দ্বীনী ইলম শিক্ষাদান (২) নদী-নালা প্রবাহিত করণ (৩) কূপ খনন (৪) খেজুর বৃক্ষ রোপণ (৫) মসজিদ নির্মাণ (৬) কুরআন বিতরণ (৭) এমন সন্তান রেখে যাওয়া, যে পিতার মৃত্যুর পর তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে’ (মুসনাদে বাযযার হা/৭২৮৯, বায়হাক্বী শু‘আব, সিলসিলা ছহীহাহ হা/৫৯১৫)

প্রশ্ন (১৬/২৯৬) : রাসূল (ছাঃ)-এর ছাহাবীগণের সংখ্যা কত ছিল?

-রায়হানুল হক

উত্তর যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।

উত্তর : ছাহাবায়ে কেরামের সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে ছহীহ সূত্রে কিছু বর্ণিত হয়নি। তবে ইমাম মুসলিম (রহঃ)-এর উস্তাদ আবূ যুর‘আহ্ রাযী এর সংখ্যা এক লক্ষ চৌদ্দ হাযার বলে উল্লেখ করেছেন (খতীব বাগদাদী, আল-জামে‘ ২/২৯৩)। কারো মতে, এর সংখ্যা এক লক্ষ চবিবশ হাযার। সৈয়ূতী এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছেন (সাফারীনী, গিযাউল আলবাব ১/৩১)। ৯ম হিজরীতে তাবুক অভিযানে গমনকালে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সৈন্য সংখ্যা ছিল ত্রিশ হাযার (যাদুল মা‘আদ ৩/৫২৬)। এদের প্রত্যেকের পরিবারে গড়ে পাঁচজন করে সদস্য থাকলেও তাদের সংখ্যা দেড় লাখে পৌঁছে যাবে। তাছাড়া যুদ্ধে সবাই যাননি এবং যেতে পারেননি। অতঃপর বিদায় হজ্জে উপস্থিত তাঁর সাথী সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ১৪ হাযার (সাখাবী, ফাৎহুল মুগীছ ৪/৪৯-৫৪)। তাদের বাইরেও সারা আরবে বহু মুসলিম ছিলেন। যারা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে দর্শন করেছেন ও তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। অতএব ছাহাবীদের সংখ্যা সঠিক জানা না গেলেও তা যে অগণিত ছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। আল্লাহ সর্বাধিক অবগত।

প্রশ্ন (১৭/২৯৭) : আমাদের মসজিদটি যে জমির উপরে স্থাপিত, তা ওয়াকফকৃত নয় আবার ক্রয়কৃতও নয়। উক্ত মসজিদে ছালাত আদায় করা শরী‘আতসম্মত হবে কি?

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

ধুবড়ী, আসাম, ইন্ডিয়া।

উত্তর : কারো আপত্তি না থাকলে ছালাত শুদ্ধ হবে। তবে মসজিদের নামে স্থানটি ওয়াক্ফ করা যরূরী (বুখারী হা/২৭৭৪)

প্রশ্ন (১৮/২৯৮) : পালিত ছেলে-মেয়ে কি পালক পিতা-মাতার জন্য বা তাদের প্রকৃত সন্তানদের ক্ষেত্রে মাহরাম হিসাবে গণ্য হবে? এদের কোন বয়সসীমা আছে কি?

-সোহরাব হোসাইন

রিয়াদ, সঊদী আরব।

উত্তর :  মাহরাম হিসাবে গণ্য হবে না। পালকপুত্রকে রক্তসম্পর্কীয় পুত্র হিসাবে গণ্য করা শরী‘আতে নিষিদ্ধ (আহযাব ৩৭, ৪০, তাফসীর ইবনে কাছীর)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পালকপুত্র যায়েদ বিন হারেছার তালাক দেওয়া স্ত্রী যয়নাব বিনতে জাহশকে বিবাহ করেছিলেন (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩২১১-১২ ‘ওয়ালীমা’ অনুচ্ছেদ)। এর মাধ্যমে তিনি পালক ছেলে-মেয়ে যে মাহরাম নয়, সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। বালেগ হওয়ার সাথে সাথে তাদের ক্ষেত্রে হুরমতের বিধান প্রযোজ্য হবে তথা পর্দা ফরয হয়ে যাবে।

প্রশ্ন (১৯/২৯৯) : ছালাতে ভুলক্রমে রাক‘আত সংখ্যা কম হ’লে ‘আল্লাহু আকবার’ এবং রাক‘আত সংখ্যা বেশী হ’লে ‘সুবহানাল্লাহ’ বলতে হবে কি?

-আবুল হাসানাত

ভাটাপাড়া, রাজশাহী।

উত্তর : না। বরং ছালাতরত অবস্থায় ইমামের ভুল হ’লে পুরুষ মুক্তাদী ‘সুবহা-নাল্লাহ’ বলবে, আর মহিলা মুক্তাদী হাত দ্বারা হাতের পিঠে হাত মেরে শব্দের মাধ্যমে লোকমা দিবে (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৯৮৮, ‘ছালাত অবস্থায় অসিদ্ধ ও সিদ্ধ আমলসমূহ’ অনুচ্ছেদ)

প্রশ্ন (২০/৩০০) : মৃত্যু যন্ত্রণা ও কবরের আযাব থেকে বাঁচার উপায় জানিয়ে বাধিত করবেন।

-আব্দুর রাযযাক, কাহারোল, দিনাজপুর।

উত্তর : মুসলিম ব্যক্তি শরী‘আতের যথাযথ অনুসারী হয়ে সার্বিক জীবন পরিচালনা করলে কবরের আযাব থেকে মুক্তি পাবে ইনশাআল্লাহ। সেই সাথে নিয়মিতভাবে ‘সূরা মুলক’ প্রতিদিন তেলাওয়াত করলেও কবরের আযাব থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার আশা করা যায় (হাকেম, সিলসিলা ছহীহাহ হা/১১৪০)। অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, দান কবরের শাস্তিকে মিটিয়ে দেয় এবং ক্বিয়ামতের দিন মুমিন তার দানের ছায়াতলে আশ্রয় পাবে’ (ত্বাবারাণী, সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩৪৮৪)। এছাড়া মৃত্যু যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রত্যেক ছালাতে জাহান্নাম ও কবরের আযাব থেকে পরিত্রাণ চাইতেন (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৯৩৯)

প্রশ্ন (২১/৩০১) : প্রচলিত ঈছালে ছওয়াব অনুষ্ঠানের কোন ভিত্তি শরী‘আতে আছে কি? এসব অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়া বা উপস্থিত হওয়া শরী‘আতসম্মত হবে কি?

-একরামুল কবীর, আগরদাঁড়ী, সাতক্ষীরা।

উত্তর : শরী‘আতে এরূপ অনুষ্ঠানের কোন ভিত্তি নেই। বরং এরূপ অনুষ্ঠানের নামে যা কিছু হয়ে থাকে সবই স্পষ্ট বিদ‘আত। অতএব এখানে অংশগ্রহণ করা, সহযোগিতা করা বা বক্তব্য প্রদান করা হ’তে বিরত থাকা আবশ্যক। ‘ঈছালে ছওয়াব’ অর্থ ছওয়াব পৌঁছানো। অথচ প্রত্যেক নেক আমলের ছওয়াব আল্লাহই তাকে দিবেন। তাঁর নিকটে কারু ছওয়াব পৌঁছাতে হবে না যে সেটা নিয়ে তিনি তাকে দিবেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে, তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়। কেবল তিনটি আমল ব্যতীত। (১) ছাদাক্বায়ে জারিয়াহ (২) এমন ইলম, যার দ্বারা জনগণের কল্যাণ সাধিত হয় এবং (৩) সুসন্তান, যে তার জন্য দো‘আ করে’ (মুসলিম, মিশকাত হা/২০৩ ‘ইল্ম’ অধ্যায়)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরও বলেন, যদি কোন মুমিন পুরুষ বা নারী অন্য কোন মুমিনের জন্য দো‘আ করে, তাহলে আল্লাহ তাদের প্রত্যেকের জন্য একটি করে নেকী লিখেন’ (ত্বাবারাণী, ছহীহুল জামে‘ হা/৬০২৬)। তিনি বলেন, কোন মুসলিম তার ভাইয়ের জন্য তার পিছনে দো‘আ করলে তা অবশ্যই কবুল (مسةجابة) হয়। তার মাথার নিকটে একজন ফিরিশতা নিযুক্ত থাকে। যখনই সে তার ভাইয়ের জন্য কল্যাণের দো‘আ করে, তখনই ঐ ফিরিশতা বলে, ‘আমীন’! তোমার জন্যও অনুরূপ’ (মুসলিম, মিশকাত হা/২২২৮)। অতএব ঈছালে ছওয়াবের নামে ও আখেরী মোনাজাতের নামে প্রচলিত লোক দেখানোর অনুষ্ঠানসমূহ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

প্রশ্ন (২২/৩০২) : কাপড় ধৌত করার পরে পুরোপুরি পবিত্র করার লক্ষ্যে বিসমিল্লাহ বলে পৃথকভাবে তিনবার পানিতে ডুবানোর প্রথাটি শরী‘আতসম্মত হবে কি?

-হাফীযুর রহমান

ফুলবাড়ী গেট, খুলনা।

উত্তর : যেকোন কাজ শুরু করার পূর্বে বিসমিল্লাহ বলা সুন্নাত। কিন্তু কাপড় ধৌত করার পরে পুরোপুরি পবিত্র করার লক্ষ্যে বিসমিল্লাহ বলে পুনরায় তিনবার পৃথকভাবে পানিতে ডুবানোর প্রথাটি বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। বরং পানি দ্বারা কাপড়ের নাপাক অংশটুকু একবার ধুয়ে নিলেই কাপড় পবিত্র হয়ে যাবে (তিরমিযী হা/১৩৮)।   

প্রশ্ন (২৩/৩০৩) : পিতা-মাতা কর্তৃক ছেলে বা মেয়েকে জোরপূর্বক বিবাহ দেওয়া শরী‘আতসম্মত হবে কি? এরূপ বিবাহের পর বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটালে উক্ত ছেলে বা মেয়ে গুনাহগার হবে কি?

-হারূনুর রশীদ

পলাশবাড়ী, গাইবান্ধা।

উত্তর : এভাবে বিবাহ প্রদান শরী‘আতসম্মত নয়। বিবাহ দেওয়ার জন্য সাবালক ছেলে-মেয়ের অনুমতি গ্রহণ করা আবশ্যক। জনৈক সাবালিকা মেয়েকে তার পিতা তার অসম্মতিতে বিবাহ দিলে রাসূল (ছাঃ) মেয়ের আপত্তির কারণে উক্ত বিবাহ বাতিল করে দেন (বুখারী, মিশকাত হা/৩১২৮, ইবনু মাজাহ হা/১৮৭৩)। একইভাবে কোন সাবালিকা মেয়ে তার পিতা বা বৈধ অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত বিয়ে করলে উক্ত বিবাহ বাতিল হবে’ (আবুদাঊদ হা/২০৮৩; মিশকাত হা/৩১৩১)। অতএব পিতা ও মেয়ে উভয়ের পারস্পরিক সম্মতি ও অনুমতির মাধ্যমে বিয়ে হ’তে হবে। তবে সাবালক ছেলে স্বাধীনভাবে বিয়ে করতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রেও তাকে পিতা-মাতাকে সন্তুষ্ট রেখে বিয়ে করা কর্তব্য। কেননা রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি’ (বায়হাক্বী শু‘আব হা/৭৮২৯, তিরমিযী হা/১৮৯৯, মিশকাত হা/৪৯২৭)

জোরপূর্বক বিবাহ দিলে ছেলে বা মেয়ের তা ভেঙ্গে দেওয়ার অধিকার রয়েছে এবং এতে তারা গুনাহগার হবে না। ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, ছেলের অসম্মতিতে তাকে কারো সাথে বিবাহ দেওয়ার অধিকার পিতা-মাতার নেই। আর অসম্মতি জানানোর কারণে সে অবাধ্য (عَاقٌّ) হিসাবেও গণ্য হবে না’ (ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ৩২/৩০)

প্রশ্ন (২৪/৩০৪) : জনৈক ইমাম সঠিক পথে ফিরে আসায় চাকুরী হারানোর ফলে পুনরায় হক ছেড়ে দিয়ে মাযহাবী আমল শুরু করে চাকুরী ফিরে পেয়েছেন এবং বলছেন, ধীরে ধীরে মানুষকে হকের পথে আনতে হবে। এক সময় সবাই ছহীহ হাদীছের অনুসারী হয়ে গেলে আমিও ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী আমল শুরু করব। দাওয়াতের এ পদ্ধতি কি শরী‘আতসম্মত?

-মুহাম্মাদ নো‘মান, মুসলিমপাড়া, ফরিদপুর।

উত্তর : হক পাওয়ার পর দাওয়াত সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এভাবে জাহান্নামের পথ অবলম্বন করা নিতান্তই গোমরাহী। আল্লাহ বলেন, হে নবী! তুমি বলে দাও যে, হক আসে তোমার প্রভুর পক্ষ থেকে। অতঃপর যে চায় তাতে বিশ্বাস স্থাপন করুক, আর যে চায় তা প্রত্যাখ্যান করুক। আমরা যালেমদের জন্য জাহান্নাম প্রস্ত্তত করে রেখেছি’ (কাহফ ১৮/২৯)। সুতরাং হক ছেড়ে কোন সুবিধাবাদী পথ অবলম্বন করা কখনো দাওয়াতের সঠিক কৌশল নয়। রাসূল (ছাঃ)-কে পরকালীন সফলতা অর্জনকারী ‘গোরাবা’দের সম্পর্কে প্রশ্ন করা হ’লে তিনি বলেন, তারা হ’ল অধিক সংখ্যক বদকার লোকদের মধ্যে অবস্থানকারী অল্পসংখ্যক সৎ মানুষ। যাদের অবাধ্যতাকারীদের সংখ্যা তাদের আনুগত্যকারীদের চাইতে বেশী হবে’ (আহমাদ হা/৬৬৫০, সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৬১৯)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, দুনিয়াতে সবচেয়ে বিপদগ্রস্ত হ’ল নবীগণ, অতঃপর নেকী অনুপাতে অধিক নেককার ব্যক্তিগণ’ (তিরমিযী হা/২৩৯৮, ইবনু মাজাহ হা/৪০২৩)। অতএব যতটুকু হক পাওয়া গেছে, আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রেখে আপোষহীন ভাবে তার অনুসরণ করতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার জন্য পথ খুলে দেন’ ‘এবং এমন পথে রূযী দান করেন, যা সে কল্পনাও করেনি। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তিনিই তাঁর জন্য যথেষ্ট হন’ (তালাক ৬৫/২-৩)। তবে দাওয়াতী কর্মে ও আচরণে সর্বদা মধ্যপন্থা অবলম্বন করবেন এবং মন্দকে ভাল দ্বারা প্রতিরোধ করবেন (হামীম সাজদাহ ৩৪; বুখারী, মিশকাত হা/১২৪৬)

প্রশ্ন (২৫/৩০৫) : হক-বাতিল প্রকাশের ক্ষেত্রে বড়দের মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রাখার প্রয়োজনীয়তা আছে কি? এছাড়া বড়দের নাম ধরে ডাকায় শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

-আশিক

রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

উত্তর : হক প্রকাশের ক্ষেত্রে কোন কিছুতেই বাধা নেই। তবে সর্বাবস্থায় বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আবশ্যক। হক কথা বলার সময়ও সর্বোচ্চ সম্মান বজায় রাখতে হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের মর্যাদা বুঝে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় (আবুদাঊদ হা/৪৯৩৯, তিরমিযী হা/১৯২০, ছহীহাহ হা/২১৯৬)। অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘নিশ্চয়ই প্রবীণ মুসলমানদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অন্তর্ভুক্ত’ (আবুদাঊদ হা/৪৮৪৩, মিশকাত হা/৪৯৭২)। এছাড়া গুরুজন সর্বদা সম্মানের পাত্র এবং সবদেশেই পরস্পরে সম্মানসূচক অথবা স্নেহব্যঞ্জক লকবে ডাকার প্রচলন রয়েছে। তাই সম্মানসূচক সম্বোধনেই তাদের ডাকতে হবে।

প্রশ্ন (২৬/৩০৬) : জনৈক আলেম বলেন, নফল ছালাতে ছানা পাঠ করার কোন বিধান নেই। এর কোন ভিত্তি আছে কি?

-আব্দুল্লাহ মোস্তফা

গুরুদাসপুর, নাটোর।

উত্তর : কথাটি ভিত্তিহীন। ছালাত ফরয হোক বা নফল হোক, সকল ছালাতেই ছানা পাঠ করা সুন্নাত। কেবল জানাযা ছালাতে নয়। কারণ জানাযা ছালাতে ছানা পড়ার কোন দলীল নেই (শারহুল মুনতাহা ৩/৬০)

প্রশ্ন (২৭/৩০৭) : বিবাহের রাত্রে বর ও কনেকে জামা‘আতবদ্ধভাবে ছালাত আদায় করতে হবে কি?

-সোহাইল

মহাখালী, ঢাকা।

উত্তর : এ ব্যাপারে রাসূল (ছাঃ) থেকে কোন আমল বা নির্দেশনা পাওয়া যায়না। তবে আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ, আবু যর, হুযাইফা (রাঃ) সহ একদল ছাহাবা হতে মওকূফ সূত্রে এরূপ নির্দেশনা পাওয়া যায় (মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ হা/১৭৪৩৮, ১৭৪৪১; আলবানী, আদাবুয যিফাফ পৃঃ ৯৪, সনদ ছহীহ)। অতএব উক্ত ছালাত আদায় করা মুস্তাহাব। এটি স্ত্রী যখন বাসর ঘরে স্বামীর নিকটে যাবে, তখন পড়বে। স্বামী সম্মুখে এবং স্ত্রী তার পিছনে দাঁড়িয়ে জামা‘আত করবে। এসময় তারা ভবিষ্যৎ দাম্পত্য জীবনের অকল্যাণ থেকে আল্লাহর নিকটে পানাহ চাইবে।

প্রশ্ন (২৮/৩০৮) : মৃত মুরগীর পেট থেকে ডিম বের করে খাওয়া যাবে কি?

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।

উত্তর : ডিম যদি পূর্ণরূপ ধারণ করে এবং তাযা থাকে, তবে তা খেতে বাধা নেই। আল্লাহ বলেন, তোমাদের উপর পবিত্র বস্ত্ত হালাল করা হয়েছে এবং সকল খবীছ বস্ত্ত হারাম করা হয়েছে (আ‘রাফ ১৫৭)। এখানে মৃত্যুর কারণে মুরগী হারাম হলেও তার তাযা ডিম হারাম নয়।

প্রশ্ন (২৯/৩০৯) : কত বছর বয়সে মেয়েদের জন্য পর্দা করা ফরয হয়?

-আব্দুল ক্বাইয়ূম, বনানী, ঢাকা।

উত্তর : এর জন্য নির্দিষ্ট কোন বয়স নেই। শারীরিক গঠনে পরিবর্তন দেখা দিলে এবং সাবালিকা হ’লে তার উপর পর্দা ফরয হয়ে যায়। তবে সাবালিকা হওয়ার পূর্ব থেকেই পর্দার অভ্যাস গড়ে তোলা যরূরী (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা ১৭/২১৯)। ছাহাবায়ে কেরাম তাদের শিশুদের ছালাত ও ছিয়ামের প্রশিক্ষণ দিতেন। এমনকি ছিয়ামরত শিশুদের খেলনা দিয়ে খাবারের কথা ভুলিয়ে রাখতেন (বুখারী হা/১৯৬০, মুসলিম হা/১১৩৬)। সাধারণতঃ নয় বছর বয়সে মেয়েরা সাবালিকা হয়। যেমন আয়েশা (রা) বলেন, যখন কোন শিশু নয় বছর বয়সে পদার্পণ করে তখন সাবালিকা হয়ে যায় (তিরমিযী হা/১১০৯)

প্রশ্ন (৩০/৩১০) : পবিত্র কুরআন কোন অমুসলিম ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের জন্য স্পর্শ করতে চাইলে তার জন্য ওযূ করার আবশ্যকতা আছে কি?

-ফজর আলী, কাঞ্চন, নারায়ণগঞ্জ।

উত্তর : অমুসলিমের জন্য আরবী মূল কুরআন স্পর্শ করা জায়েয নয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, পবিত্র ব্যতীত কেউ কুরআন স্পর্শ করবে না (ত্বাবারাণী, ছহীহুল জামে‘ হা/৭৭৮০)। এটা ছোট ও বড় উভয় পবিত্রতাকে শামিল করে। আর অমুসলিমরা উভয় দিক দিয়েই অপবিত্র। তবে অমুসলিমদের জন্য কুরআন শ্রবণ, কুরআনের তাফসীর বা অনুবাদ সহ কুরআন স্পর্শ করে পড়ায় বাধা নেই (মাজমূ‘ ফাতাওয়া বিন বায ২৪/৩৪০)। নিঃসন্দেহে তাকে পূর্ণ সম্মান বজায় রেখে স্পর্শ করতে হবে।

প্রশ্ন (৩১/৩১১) : পুরুষদের জন্য হাতে বা নখে মেহেদী মাখা শরী‘আতসম্মত হবে কি?

-শামীম হাসান, গোলাপবাগ, জামালপুর।

উত্তর : সৌন্দর্যের জন্য পুরুষদের হাতে-পায়ে মেহেদী ব্যবহার করা জায়েয নয় (ইবনু হাজার, ফৎহুল বারী হা/৫৮৯৯-এর ব্যাখ্যা দ্রঃ)। কারণ মেহেদী এক ধরনের রঙ। আর পুরুষদের জন্য রঙ ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, জেনে রাখো যে, পুরুষদের খোশবূ এমন, যাতে সুগন্ধি আছে রং নেই। পক্ষান্তরে নারীদের খোশবূ এমন, যাতে রং আছে সুগন্ধি নেই (তিরমিযী হা/২৭৮৭, মিশকাত হা/৪৪৪৩)। এছাড়া তিনি পুরুষদের জন্য রঙ থাকার কারণে জাফরানের সুগন্ধি ব্যবহার করতেও নিষেধ করেছেন (বুখারী হা/৫৮৪৬, মুসলিম হা/২১০১, মিশকাত হা/৪৪৩৪)। তবে চিকিৎসার প্রয়োজনে যে কোন স্থানে মেহেদী ব্যবহার করা জায়েয আছে (তিরমিযী হা/২০৫৪, ছহীহুল জামে‘ হা/৪৬৭১, ছহীহাহ হা/২০৫৯)। এছাড়া মাথার চুল ও দাড়িতে মেহেদী ব্যবহার করা উত্তম (আবুদাঊদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/৪৪৫১

প্রশ্ন (৩২/৩১২) : কেউ হজ্জ-এর নিয়ত করার পর মৃত্যুবরণ করলে হজ্জের নেকী পাবে কি এবং তার পক্ষ থেকে হজ্জ করতে হবে কি?

-আব্দুর রঊফ, আসাম, ভারত।

উত্তর : হজ্জ বা যেকোন নেক আমলের নিয়ত করে কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে সে উক্ত আমলের নেকী পাবে বলে আশা করা যায়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা নেকী ও পাপ লিখেন। অতএব যে ব্যক্তি কোন নেকী করার সংকল্প করে তা বাস্তবায়ন করতে পারে না, আল্লাহ তার জন্য পূর্ণ নেকী লিখে থাকেন। আর যে ব্যক্তি তা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়, তার আমল নামায় ১০ থেকে ৭শ’র অধিক নেকী লেখা হয়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পাপের সংকল্প করে অথচ করেনা, আল্লাহ তার জন্য একটি পূর্ণ নেকী লিখেন। আর যদি সে সংকল্প করে এবং ঐ পাপ করে, তাহ’লে তার জন্য মাত্র একটি পাপ লেখা হয়’ (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/২৩৭৪ ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায় ‘আল্লাহর রহমতের প্রশস্ততা’ অনুচ্ছেদ)। তবে উক্ত ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ্জ করা উচিৎ। এজন্য প্রথমে নিজের হজ্জ করবে। অতঃপর ঐ মৃত ব্যক্তির পক্ষে হজ্জ করবে (আবুদাউদ হা/১৮১১; মিশকাত হা/২৫২৯)

প্রশ্ন (৩৩/৩১৩) : ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) রামাযানে ৬১ বার কুরআন খতম করতেন। উক্ত ঘটনার সত্যতা আছে কি?

-শামসুল ইসলাম, তানোর, রাজশাহী।

উত্তর : ঘটনাটির কোন সত্যতা নেই। আর এটি নিঃসন্দেহে রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাত বিরোধী। কারণ তিনি বলেন, তিনদিনের কমে কুরআন খতমকারী তা অনুধাবন করতে সক্ষম হয় না (তিরমিযী হা/২৯৪৯, মিশকাত হা/২২০১)। তাছাড়া এটি অসম্ভব বিষয়। এ ধরনের ঘটনা বরং ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করেছে (আল-আক্বাইদ আল-ইসলামিয়াহ, পৃঃ ৪৫)। অনুরূপ আরো অনেক অলৌকিক ঘটনা তাঁর নামে সমাজে প্রচলিত রয়েছে, যেগুলির কোন ভিত্তি নেই।

প্রশ্ন (৩৪/৩১৪) : জনৈক আলেম বলেন, পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের পর আয়াতুল কুরসী পাঠ করে বুকে ফুঁক দিলে সেই বুক জাহান্নামে যাবে না। এর কোন সত্যতা আছে কি?

-কাওছার আলম,

নবাবগঞ্জ, দিনাজপুর।

উত্তর : একথা ভিত্তিহীন। এ ব্যাপারে ছহীহ হাদীছে এসেছে, রাসূল (স) বলেন, ‘যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরয ছালাতের পর ‘আয়াতুল কুরসী’ পাঠ করবে মৃত্যু ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করতে তার কোনই বাধা থাকে না (নাসাঈ কুবরা হা/৯৯২৮, মিশকাত হা/৯৭৪; ছহীহাহ হা/৯৭২)। এছাড়া শয়নকালে পাঠ করলে সকাল পর্যন্ত তার হেফাযতের জন্য একজন ফেরেশতা পাহারায় নিযুক্ত থাকে। যাতে শয়তান তার নিকটবর্তী হতে না পারে’ (বুখারী, মিশকাত হা/২১২৩)

প্রশ্ন (৩৫/৩১৫) : সূরা বাক্বারাহ ১১৫ নং আয়াতের ব্যাখ্যা জানিয়ে বাধিত করবেন।

রাকীবুল ইসলাম

দমকল, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত।

উত্তর : অত্র আয়াতে আল্লাহ বলেন, আর আল্লাহর জন্যই পূর্ব ও পশ্চিম। অতএব যেদিকেই তোমরা মুখ ফিরাও না কেন সেদিকেই রয়েছে আল্লাহর চেহারা। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বব্যাপী ও সর্বজ্ঞ।

কোন কোন বিদ্বান বলেছেন যে, ১৬/১৭ মাস বায়তুল মুক্বাদ্দাসের দিকে ফিরে ছালাত আদায়ের পর বাক্বারাহ ১৪৪ ও ১৫০ আয়াতের মাধ্যমে রাসূলকে পুনরায় কা‘বা গৃহের দিকে কিবলা করে ছালাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে ইহুদীরা বাহানা খুঁজে পায় এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও মুসলমানদের উদ্দেশ্যে তারা নানাবিধ উপহাসমূলক কথাবার্তা বলতে থাকে। এর প্রতিবাদে অত্র আয়াত নাযিল হয়। যাতে বলা হয় যে, সকল দিকই আল্লাহর। তিনি স্বীয় বান্দাদের যেদিকে খুশী সেদিকে  ফিরে ছালাত আদায়ের নির্দেশ দিতে পারেন। এতে ইহুদী বা অন্য কারু খুশী বা নাখোশ হওয়ার কিছু নেই।

অন্যান্য বিদ্বানগণ বলেন, ঘনঘটাময় অন্ধকার রাত্রিতে দিকহারা মুছল্লী কিবলায় ভুল করলেও তার ছালাত জায়েয হবে মর্মে অত্র আয়াতটি নাযিল হয়েছে। যেমন আব্দুল্লাহ বিন আমের (রাঃ) স্বীয় পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, একদা আমরা এক অন্ধকার রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে এক সফরে ছিলাম। তখন আমরা কেউ কিবলা চিনতে পারলাম না। ফলে আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ধারণা মতে কিবলা নির্ধারণ করে ছালাত আদায় করি। সকালে আমরা বিষয়টি আল্লাহর রাসূলের কাছে পেশ করি। তখন অত্র আয়াতটি নাযিল হয়’ (তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, বায়হাক্বী, দারাকুৎনী সনদ হাসান; আলবানী, ইরওয়া হা/২৯১)। ইবনু ওমর (রাঃ) বর্ণিত অন্য একটি হাদীছে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মক্কা থেকে মদীনায় যাওয়ার পথে নিজ সওয়ারীতে ছালাত আদায় করেছিলেন কিবলা নির্ধারণ ছাড়াই। তখন অত্র আয়াতটি নাযিল হয়’ (বুখারী হা/১০৯৬; মুসলিম হা/৭০০; নাসাঈ, আবুদাঊদ হা/১২২৪ ইত্যাদি)

এর দ্বারা ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, মুসাফিরের জন্য সফর অবস্থায় পরিবহনের নির্দেশনা অনুযায়ী যেকোন দিকে ফিরে নফল ছালাত আদায় করা জায়েয। এ ব্যাপারে বিদ্বানগণের মধ্যে কোন মতভেদ নেই (কুরতুবী)

অত্র আয়াতে وَجْهُ اللهِ অর্থ ‘আল্লাহর চেহারা’-এর অর্থ তাঁর কুদরত বা অন্য কিছু বলা যাবে না। তাতে প্রকাশ্য অর্থের বিরোধিতা হবে এবং ছাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে ছালেহীনের বুঝের বিপরীত হবে। যারা আল্লাহকে ‘নিরাকার’ বলেন এবং কোন শূন্য সত্তার উপাসনা করেন, তারা আল্লাহর এই সকল ছিফাতের এবং অপব্যাখ্যা করেন এবং আল্লাহর হাত, চোখ, চেহারা, পায়ের নলা ইত্যাদি বিষয়ে বর্ণিত আয়াত সমূহের নানাবিধ রূপক অর্থ করেন, যার কোনটাতেই  তারা একমত হতে পারেননি।

অত্র আয়াতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, কেবল পূর্ব ও পশ্চিমে আল্লাহর ইলম সীমিত নয় কিংবা কিবলামুখী হওয়ার উদ্দেশ্য কা‘বা গৃহ বা বায়তুল মুক্বাদ্দাস পূজা করা নয়। বরং ইবাদতে শৃংখলা স্থাপন ও আল্লাহর প্রতি মনোযোগ একনিষ্ঠ করার উদ্দেশ্যে ছালাতে কিবলা নির্ধারণ করা হয়েছে। আয়াতের শেষে একথা বলে দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহর জ্ঞান সর্বব্যাপী। ‘তাঁর কুরসী আসমান ও যমীন সবকিছুকে বেষ্টন করে আছে। আর সেগুলিকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে মোটেই কঠিন নয়। তিনি সর্বোচ্চ ও মহান’ (বাক্বারাহ ২/২৫৫)

প্রশ্ন (৩৬/৩১৬) : ইস্তেখারাহ কি? এর ফযীলত ও কার্যকারিতা সম্পর্কে জানতে চাই। কোন কোন ক্ষেত্রে ইস্তেখারাহ করা যায়?

-আব্দুল্লাহ আল-মামূন

 ছোটবনগ্রাম, রাজশাহী।

উত্তর : ইস্তিখারাহ ঐ ছালাতকে বলা হয়, যার মাধ্যমে দোদুল্যমান বিষয়ে আল্লাহর নিকটে ফয়ছালা কামনা করা হয়।  যে বিষয়ের পরিণতি সম্পর্কে বান্দা অজ্ঞাত, এর মাধ্যমে সে বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) আমাদেরকে সকল বিষয়ে ইস্তিখারাহ করার শিক্ষা দিতেন, যেভাবে তিনি কুরআনের সূরাসমূহ শিক্ষা দিতেন (বুখারী হা/৬৩৮২)

ইস্তিখারাহ সকল কর্মকান্ডে সফলতা অর্জনের সর্বোত্তম উপায়। এর মাধ্যমে মানুষ নিজেকে কেবল আল্লাহর উপর সঁপে দেয়। অতঃপর তাঁর সিদ্ধান্তের উপর সন্তুষ্ট হয়। বস্ত্ততঃ এ দু’টি বিষয়ের উপরেই মানুষের হৃদয়ের প্রশান্তি নির্ভর করে এবং এদু’টিই হ’ল তার সৌভাগ্যের সোপান। বান্দা যখন পূর্ণ ঈমানের সাথে কোন বিষয়ে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করে, তাতে তিনি সাড়া দেন। তাই ইস্তিখারাকে কেবল গুরুত্বপূর্ণ ও স্বল্প পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সকল দোদুল্যমান বিষয়ে পূর্ণ আস্থার সাথে ইস্তিখারাহ করা বান্দার জন্য কর্তব্য।

প্রশ্ন (৩৭/৩১৭) : জানাযার ছালাতের কোন তাকবীর ছুটে গেলে ইমামের সালামের শেষে বাকী অংশ আদায় করতে হবে কি?

-সাইফুল ইসলাম, কাজলা, রাজশাহী।

উত্তর : জানাযার যে কয়টি তাকবীর ছুটে যাবে মুছল্লী তা ইমামের সালাম ফিরানোর পর আদায় করে নিবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘ছালাতের যে অংশটুকু তোমরা পাও সেটুকু আদায় কর এবং যেটুকু বাদ পড়ে, সেটুকু পূর্ণ কর’ (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৬৮৬)। তবে তা আদায় না করলেও দোষ নেই (ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২৭৭)

প্রশ্ন (৩৮/৩১৮) : চৈত্র মাস আসলে বাজারে ১লা বৈশাখ উদযাপন উপলক্ষে বৈশাখ সম্পর্কিত বিভিন্ন উক্তি সম্বলিত কাপড় পাওয়া যায়। এগুলি বেচা-কেনা করা জায়েয হবে কি?

-হাসনা হেনা

পাঁচদোনা, নরসিংদী।

উত্তর : ‘বৈশাখ’ উদযাপন একটি অনৈসলামী প্রথা। যা থেকে মুসলিমকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। হযরত আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) যখন মদীনায় আগমন করেন, তখন মদীনাবাসীদের দু’টি উৎসব পালন করতে দেখে তিনি তাদের বলেন, তোমাদের এ দু’টি দিন কেমন? তারা বলল, জাহেলী যুগে আমরা এ দু’দিন উৎসব পালন করতাম। তিনি বললেন, ‘আল্লাহ এ দু’দিনের পরিবর্তে দু’টি উত্তম উৎসব দান করেছেন। আর তা হ’ল ঈদুল ফিৎর ও ঈদুল আযহা’ (আবুদাঊদ হা/১১৩৪, মিশকাত হা/১৪৩৯, ‘ছালাতুল ঈদায়েন’ অধ্যায়)। ঐ দু’টি দিন ছিল ‘নওরোজ’ বা নববর্ষ। অর্থাৎ সৌরবর্ষের প্রথম দিন এবং ‘মেহেরজান’ বছরে এইদিন রাত্রি-দিন সমান হয়।

মুবারকপুরী বলেন, ‘উক্ত হাদীছ দ্বারা নবী করীম (ছাঃ) উক্ত দুই দিন ব্যতীত অন্যান্য যাবতীয় উৎসব রহিত করেছেন এবং তার মুকাবিলায় উক্ত দু’টি দিনকে সাব্যস্ত করেছেন। মাযহার বলেন, ‘নওরোজ (নববর্ষ) ও মেহেরজান সহ কাফিরদের যাবতীয় উৎসবকে সম্মান প্রদর্শন করা যে নিষিদ্ধ উক্ত হাদীছে তার দলীল রয়েছে’। ইবনু হাজার বলেন, ‘মুশরিকদের উৎসব সমূহে খুশী করা কিংবা তাদের মত উৎসব করা উক্ত হাদীছ দ্বারা অপসন্দনীয় প্রমাণিত হয়েছে’। শায়খ আবু হাফছ আল-কাবীর হানাফী বলেন, ‘এসব দিনের সম্মানার্থে মুশরিকদের যে একটি ডিমও উপঢৌকন দিল, সে আল্লাহর সাথে কুফরী করল’। কাযী আবুল মাহাসেন হাসান মানছূর হানাফী বলেন, ‘এ দিনের সম্মানার্থে কেউ যদি ঐ সব মেলা থেকে কোন জিনিষ ক্রয় করে কিংবা কাউকে কোন উপঢৌকন দেয়, সে কুফরী করল। এমনকি সম্মানার্থে নয় বরং সাধারণভাবেও যদি এই মেলা থেকে কিছু ক্রয় করে কিংবা কাউকে এই দিনে কিছু উপঢৌকন দেয়, তবে সেটিও মাকরূহ’ (মির‘আত শরহ মিশকাত, ‘ছালাতুল ঈদায়েন’ অধ্যায় ৫/৪৪-৪৫ পৃঃ)

অতএব উক্ত হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয় যে, অমুসলিমদের উৎসবের সাথে মুসলমানদের কোনরূপ সম্পর্ক রাখা কিংবা সহযোগিতা করা জায়েয নয়। বৈশাখ সংক্রান্ত যাবতীয় অনুষ্ঠানাদি মূলতঃ হিন্দুয়ানী প্রথা সঞ্জাত। সুতরাং এ সংক্রান্ত যাবতীয় সহযোগিতা, অংশগ্রহণ, আয়-উপার্জন সহ সকল কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নেকী ও তাক্বওয়ার কাজে পরস্পরকে সাহায্য কর এবং গুনাহ ও অন্যায়ের কাজে সাহায্য কর না (মায়েদাহ ৫/২)’।

প্রশ্ন (৩৯/৩১৯) : তাহাজ্জুদের ছালাত ফজরের আযানের পর পড়া যাবে কি?

-আব্দুল আউয়াল, মান্দা, নওগাঁ।

উত্তর : পড়া যাবে। তাহাজ্জুদ বা বিতর ক্বাযা হয়ে গেলে ‘উবাদাহ বিন ছামিত, আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ, আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) প্রমুখ ছাহাবীগণ ফজর ছালাতের আগে তা আদায় করে নিতেন (ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৮৩)। এছাড়া বিতর পড়ে শুয়ে গেলে এবং ঘুম অথবা ব্যথার আধিক্যের কারণে তাহাজ্জুদ পড়তে না পারলে রাসূল (ছাঃ) দিনের বেলায় (সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে) ১২ রাক‘আত পড়েছেন (মির‘আত ৪/২৬৬; মুসলিম, মিশকাত হা/১২৫৭, ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ-৩৫)

প্রশ্ন (৪০/৩২০) : ইমাম জুম‘আর ছালাতের প্রথম রাক‘আতে সূরা ফাতিহার পর সূরা মুনাফিকুন-এর ৯ম আয়াত পাঠ করেছেন। কিন্তু ১০ম আয়াতের অর্ধেক পাঠের পর বাকীটা মনে না আসায় রুকূতে চলে যান। ২য় রাক‘আতে সূরা ফাতিহা ও সূরা কাওছার পাঠ করেছেন। এতে ‘ছালাত হয়নি’ বলে আরেকজন হাফেয জোর করে ইমাম ছাহেবকে ছালাত পুনরায় পড়াতে বাধ্য করেন। এবিষয়ে সঠিক সমাধান জানিয়ে বাধিত করবেন।

-কাজী শফিউর রহমান

কাজীপাড়া, বিরল, দিনাজপুর।

উত্তর :ইমাম সূরা ফাতিহা পাঠ করেছেন এবং তার সাথে কুরআনের কিছু অংশ পড়েছেন। অতএব তাঁর ছালাত শুদ্ধ হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ثُمَّ اقْرَأْ بِأُمِّ الْقُرْآنِ وَبِمَا شَآءَ اللهُ أَنْ تَقْرَأَ ‘অতঃপর তুমি ‘উম্মুল কুরআন’ অর্থাৎ সূরায়ে ফাতিহা পড়বে এবং যেটুকু আল্লাহ ইচ্ছা করেন কুরআন থেকে পাঠ করবে’... (আবুদাঊদ হা/৮৫৯, মিশকাত হা/৮০৪, ‘ছালাতের বিবরণ’ অনুচ্ছেদ)। তাকে পুনরায় ছালাত আদায়ে বাধ্য করে অন্যায় হয়েছে। অতএব ইমামের নিকট ক্ষমা চেয়ে নিয়ে পরস্পরে মহববত সৃষ্টি করা আবশ্যক।

 

 

HTML Comment Box is loading comments...