প্রশ্নোত্তর

দারুল ইফতা
হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

প্রশ্ন (১/৩২১) : ‘সকল বিধান বাতিল কর, অহি-র বিধান কায়েম কর’ কেবল এই শ্লোগান দিলেই কি দ্বীন কায়েম হয়ে যাবে? না দ্বীন কায়েমের জন্য আরো কিছু করণীয় আছে? বুলেট বা ব্যালট ব্যতীত কেবল দাওয়াতের মাধ্যমে দ্বীন প্রতিষ্ঠার কোন সম্ভাবনা আছে কি?

-মুনীর হায়দার

মধ্য বাসাবো, ঢাকা।

উত্তর : উপরোক্ত শ্লোগানটি যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ যে দাওয়াত নিয়ে আগমন করেছিলেন, তারই প্রতিধ্বনি। সকল নবী-রাসূলই দুনিয়াতে এসেছিলেন এই দাওয়াত নিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং ত্বাগূত থেকে বেঁচে থাকো (নাহল ১৬/৩৬)। নূহ (আঃ) ৯৫০ বছর যাবৎ দাওয়াত দিয়ে মাত্র ৪০ জন অনুসারী পেয়েছিলেন। ক্বিয়ামতের দিন কোন নবী উম্মতশূন্য, কেউ একজন, কেউ দু’জন উম্মত নিয়ে হাযির হবেন (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫২৯৬)। দ্বীনকে রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে কোন নবী দাওয়াত দেননি। বরং মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই তারা দাওয়াত দিয়ে গেছেন। বুলেট ও প্রচলিত ব্যালট পদ্ধতি দু’টিই নবীদের আদর্শের বিরোধী। আল্লাহ তা‘আলা জোরপূর্বক দাওয়াত গ্রহণ করানো থেকে বিরত থাকার আদেশ দিয়েছেন (বাক্বারাহ ২৫৬; গাশিয়া ৬৮/২২)। শরী‘আত প্রদর্শিত বৈধ পন্থায় প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া সকলের ঈমানী দায়িত্ব। ফলাফলের মালিক আল্লাহ। ‘খেলাফত’ ইসলামী জীবন-যাপনের সহায়ক মাধ্যম মাত্র, কখনোই অপরিহার্য অঙ্গ নয়। যে নে‘মত স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা মুমিন বান্দাদেরকে দান করার ওয়াদা করেছেন (নূর ২৪/৫৫)। তা অর্জনের জন্য কোন অবৈধ পন্থা অবলম্বনের সুযোগ নেই। দেশে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য অহি-র বিধান অনুসরণের গুরুত্ব এবং তা অনুসরণ না করলে পরকালীন জীবনের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা ওলামায়ে কেরামের প্রধান দায়িত্ব। সেই সাথে দল ও প্রার্থীবিহীন ইসলামী নেতৃত্ব নির্বাচন পদ্ধতির কল্যাণকারিতা বিষয়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। যাতে জাতি ক্ষমতার লড়াইয়ে আপোষে মারামারি ও হানাহানি থেকে বেঁচে যায়। ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’ একনিষ্ঠভাবে সে কাজটিই করে যাচ্ছে। আল্লাহ কবুল করলে কেবল বাংলাদেশেই নয় সমগ্র পৃথিবীতে একদিন অহি-র বিধান প্রতিষ্ঠা লাভ করবে ইনশাআল্লাহ (বিস্তারিত দ্রঃ ‘ইসলামী খেলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন’ বই)

প্রশ্ন (২/৩২২) :আমি মানুষকে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করছি। কিন্তু তার অধিকাংশই নিজে পালন করতে পারি না। অথচ আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যা কর না তা বল কেন?’। এক্ষণে আমি কি দাওয়াত থেকে বিরত থাকব?

-মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহ

নলত্রী, গোদাগাড়ী, রাজশাহী।

উত্তর : নিজে সৎকাজ করা এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকা যেমন ওয়াজিব, তেমনি অপরকে সৎকাজের উপদেশ দেওয়া এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করাও ওয়াজিব। প্রকৃত মুসলিমের জন্য উভয়টিই পরিপূর্ণ করার জন্য সচেষ্ট হতে হবে। একটি ওয়াজিব পালন করতে না পারলে আরেকটি ওয়াজিব ত্যাগ করা যাবে না। সাঈদ বিন জুবায়ের (রহঃ) বলেন, ‘মানুষ যদি নিজে করতে না পারার কারণে সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা থেকে বিরত থাকত, তাহ’লে সৎ-অসৎ কাজের আদেশ-নিষেধকারী খুঁজে পাওয়া যেত না’ (আলোচনা দ্রঃ ইবনু কাছীর, বাক্বারাহ ৪৪ আয়াতের ব্যাখ্যা)। আল্লাহর বাণী, ‘তোমরা যা কর না তা বল কেন?’-এর ব্যাখ্যা হ’ল, এখানে আল্লাহ তা‘আলা বনী ইসরাঈলদেরকে অন্যকে উপদেশ দানের পরও নিজেরা না করার কারণে তিরস্কার করেছেন, অন্যকে উপদেশ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলেননি। বরং ন্যায়ের আদেশ দেওয়া প্রত্যেক মানুষের জন্য ওয়াজিব। তবে অন্যকে উপদেশ দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে নিজে না করলে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে (বুখারী হা/৩২৬৭, মুসলিম, মিশকাত হা/৫১৩৯)।  

প্রশ্ন (৩/৩২৩) : জমি বিক্রয়ের বায়নাচুক্তির পর জমি না দিয়ে কয়েক বছর পর উক্ত বায়নামূল্য ফিরিয়ে দিতে চাইলে, ক্রেতা তা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। ক্রেতার জীবদ্দশায় তার সন্তানরা তা ফিরিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছে। এক্ষণে ক্রেতার অস্বীকৃতি সত্ত্বেও সন্তানরা তা নিলে বিক্রেতা কি তার পাপ থেকে মুক্তি লাভ করবে?

-আনোয়ারুল হক

নবাবগঞ্জ, দিনাজপুর।

উত্তর : অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে বিক্রেতা গুনাহগার হবে। চুক্তি ক্রেতার সাথে সম্পন্ন হওয়ার কারণে এক্ষেত্রে ক্রেতার অসম্মতিতে তার সন্তানদের কোন পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই বিক্রেতার জন্য কর্তব্য হবে, ক্রেতাকে অঙ্গীকার অনুযায়ী জমি প্রদান করা। তবে ক্রেতা যদি সন্তুষ্টচিত্তে বায়না ফেরত নিতে রাযী হয়, তাহলে তা ফেরত দিয়ে বিক্রেতা গুনাহ থেকে মুক্তি পাবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ বলেন, তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ কর। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার বিষয়ে তোমরা (ক্বিয়ামতের দিন) জিজ্ঞাসিত হবে’ (ইসরা ১৭/৩৪)।  

প্রশ্ন (৪/৩২৪) :সুন্নাত ছালাতের ক্বাযা আদায় করতে হবে কি? না করলে গুনাহগার হতে হবে কি?

-মুহাম্মাদ মিধু মন্ডল

মিঠাপুকুর, রংপুর।

উত্তর : সুন্নাত ছালাতের ক্বাযা আদায় করাও সুন্নাত। রাসূল (ছাঃ) সুন্নাত ছালাতের ক্বাযা আদায় করেছেন এবং অন্যকে সম্মতিও দিয়েছেন (আবূদাঊদ হা/১২৬৭, বুখারী, ‘ছালাতের ওয়াক্তসমূহ’ অধ্যায়, ৩৩ অনুচ্ছেদ)। তবে অবজ্ঞা না করে অলসতা বা কোন কারণ বশতঃ সুন্নাত ছেড়ে দিলে গুনাহগার হবে না। কারণ এটা অতিরিক্ত ছালাত (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৬)

প্রশ্ন (৫/৩২৫) : সীরাতে ইবনে ইসহাকে রয়েছে, ‘রাসূল (ছাঃ) মক্কাবিজয়ের সময় কা‘বাগৃহে প্রবেশ করে ৩৬০টি মূর্তি ধ্বংস করার নির্দেশ দেন। কিন্ত একটিতে মারিয়াম (আঃ)-এর ছবি অঙ্কিত ছিল। তাই তা মুছতে নিষেধ করেন। এ কাহিনীর সত্যতা জানিয়ে বাধিত করবেন।

-নযরুল ইসলাম খান

গেন্ডারিয়া, ঢাকা।

উত্তর : আযরূকী তার ‘আখবারু মাক্কাহ’ গ্রন্থে (১/১৩০) এ মর্মে চারটি ‘আছার’ বর্ণনা করেছেন, যার সবগুলিই মুনকার, যঈফ এবং ছহীহ হাদীছের বিরোধী। ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (ছাঃ) যখন বায়তুল্লাহর মধ্যে ছবি দেখলেন তখন তিনি সেগুলো মুছে ফেলার নির্দেশ দেন। তা না মোছা পর্যন্ত তিনি প্রবেশ করেননি (বুখারী হা/৩৩৫২)

প্রশ্ন (৬/৩২৬) :  জনৈক আলেম বলেছেন যে, রাসূল (ছাঃ)-এর নূর দ্বারাই চন্দ্র ও সূর্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এ বক্তব্যের কোন ভিত্তি আছে কি?

-তরীকুল ইসলাম

সুরিটোলা, ঢাকা।

উত্তর : এ বক্তব্য ভিত্তিহীন। এ মর্মে যেসব বক্তব্য সমাজে ছড়িয়ে রয়েছে, তা বিভ্রান্ত ছূফীদের কল্পিত বক্তব্য। কুরআন ও হাদীছে এর কোন ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না।

প্রশ্ন (৭/৩২৭) : প্রস্রাব করে পানি নেওয়ার পরে জামায় প্রসাব লেগে গেলে, বাসা থেকে জামা পরিবর্তন করে ছালাত আদায় করি। কিন্তু বাইরে এই সমস্যা হ’লে করণীয় কি? অনেকে এজন্য ছালাত ক্বাযা করে। এটা কি ঠিক?

-ইমরান হোসাইন

ধামরাই, ঢাকা।

উত্তর : যে অংশে প্রস্রাব লাগবে শুধুমাত্র সে অংশটুকু ধুয়ে ছালাত আদায় করতে হবে। জামা পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। আর যদি ধোয়া সম্ভব না হয়, তাহ’লে উক্ত ছালাতের ওয়াক্তের মধ্যেই পোষাক পরিবর্তন করতে হবে। সম্ভব না হ’লে উক্ত পোষাকেই ছালাত আদায় করতে হবে, কোনক্রমেই ক্বাযা করা যাবে না। আল্লাহ তা‘আলা অপবিত্র অবস্থায় পানি না পেলে পরবর্তীতে পানি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তায়াম্মুম করে ছালাত আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন (নিসা ৪/৪৩)।   

প্রশ্ন (৮/৩২৮) : মসজিদে ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ। কিন্তু সমাজের প্রয়োজনে মসজিদের বারান্দা বা বাইরে ইসলামী বই বিক্রয় করতে হচ্ছে। এর সাথে রূযীর বিষয়ও রয়েছে। এক্ষণে এটি শরী‘আত সম্মত হবে কি?

-আব্দুল্লাহ নাছের, রাজশাহী।

উত্তর : ব্যবসার উদ্দেশ্যে মসজিদে ক্রয়-বিক্রয় করা জায়েয নয়। আমর ইবনু শু‘আইব (রাঃ) তাঁর পিতার মাধ্যমে তাঁর দাদা হ’তে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মসজিদে ক্রয়-বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন’ (আবূদাঊদ, মিশকাত হা/৭৩২)। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, যখন তোমরা মসজিদে ক্রয়-বিক্রয় করতে দেখবে তখন বলবে, আল্লাহ যেন আপনার ব্যবসায় লাভ না দেন (তিরমিযী, ইরওয়া হা/১২৯৫)। তবে ইসলামী বই-পুস্তক জুম‘আর দিন মসজিদের বারান্দার বাইরে বিক্রয় করতে বাধা নেই। কেননা এটি দ্বীনের দাওয়াতের একটি অংশ।

প্রশ্ন (৯/৩২৯) : আল্লাহ তা‘আলা সাত আসমান ও সাত যমীন সৃষ্টি করেছেন। তাহ’লে কি আরো ছয়টি পৃথিবী বিদ্যমান রয়েছে। এ ব্যাপারে কুরআন-হাদীছ থেকে কিছু জানা যায় কি?

-আবু তাহের

মোহনপুর, রাজশাহী।

উত্তর : আল্লাহ তা‘আলা সাত আসমান ও সাত যমীন সৃষ্টি করেছেন (তালাক ১২), তা বিদ্যমান রয়েছে এবং ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা সাতটি যমীন চাপিয়ে দিয়ে জমি জবর দখলকারীদেরকে শাস্তি দিবেন (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৯৩৮)। ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন, এর দ্বারা যমীনের সাতটি স্তরকে বুঝানো হয়েছে। কুরআনে আসমানকে ‘দুখান’ বলা হয়েছে (হা-মীম সাজদাহ ১১, দুখান ১০)। যার অর্থ ধূম্রকুঞ্জ। অতএব আমাদের কেবল এটুকুতেই বিশ্বাস রাখতে হবে। অন্য আয়াতে ‘কঠিন সপ্তস্তর’ (নাবা ১২) বলা হয়েছে। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, ঐসব আসমানের গঠন-প্রকৃতি এমন, যা ভেদ করা কঠিন ও দুরূহ। আমরা কেবল আসমানের নীচের স্তরটিই দেখতে পাই, যাকে কুরআনে ‘সুরক্ষিত ছাদ’ (আম্বিয়া ৩২) বলা হয়েছে।

প্রশ্ন (১০/৩৩০) : আল্লাহ বলেছেন, তোমরা আল্লাহকে দেখতে পাবে না। তাহ’লে আদম (আঃ) কি আল্লাহকে দেখেছিলেন?

-শহীদুল্লাহ

ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

উত্তর : আদম (আঃ) আল্লাহকে দেখেছেন মর্মে কোন দলীল পাওয়া যায় না। আল্লাহর উপরোক্ত বাণী অনুযায়ী দুনিয়াতে কেউই আল্লাহকে দেখতে পাবে না। তিনি নবী হৌন বা অন্য কেউ হোক। কোন নবী-রাসূল থেকেই এটা প্রমাণিত হয়নি যে, তারা আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখেছেন। রাসূল (ছাঃ) স্বয়ং আল্লাহকে দেখেননি। বরং তাঁর ‘নূর’ দেখেছেন (মুসলিম, মিশকাত হা/৫৬৫৯) এবং একবার ফজরের পূর্বে তাঁকে স্বপ্নে দেখেছিলেন (তিরমিযী হা/৩২৩৪-৩৫, মিশকাত হা/৭২৫, ৭২৬, ৭৪৮)। আখেরাতে নবী-রাসূলগণ সহ প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তি আল্লাহকে দেখতে পাবেন (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫৬৫৫)

প্রশ্ন (১১/৩৩১) : হারাম বস্ত্ত বা যেসব বস্ত্ত মানুষ গোনাহের কাজে ব্যবহার করে তা নিজস্ব বা অন্যের দোকানে চাকুরী নিয়ে বিক্রি করা শরী‘আত সম্মত কি?

-মুশতাক আহমাদ

জোহান্সবার্গ, দক্ষিণ আফ্রিকা।

উত্তর :  নিজের দোকানে হোক বা অন্যের দোকানে হোক কোন হারাম বস্ত্ত বিক্রি করা শরী‘আত সম্মত নয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যখন আল্লাহ তা‘আলা কোন জিনিস হারাম করেন তখন তা বিক্রি করাও হারাম’ (ছহীহ ইবনু হিববান হা/৪৯৩৮)। এছাড়াও তা পাপের কাজে সহযোগিতা করার শামিল। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কল্যাণ ও তাক্বওয়ার কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা কর এবং পাপ ও সীমালংঘনের কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা কর না’ (মায়েদাহ ২)। আল্লাহকে ভয় করে এরূপ অন্যায় কাজ ছেড়ে দিলে তিনি হালাল রূযীর ব্যবস্থা করবেন ইনশাআল্লাহ। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার জন্য পথ খুলে দেন এবং এমন রূযী দান করেন, যা সে কল্পনাও করেনি (তালাক ৬৫/৩)

প্রশ্ন (১২/৩৩২) : স্ত্রী ঘটনাক্রমে হারিয়ে গেলে তার বোনকে বিবাহ করি। অনেক দিন পর উক্ত স্ত্রী ফিরে আসলে এক্ষণে করণীয় কি?

-মুছলেহুদ্দীন

তা‘মীরুল মিল্লাত মাদ্রাসা, ঢাকা।

উত্তর : হারিয়ে যাওয়া স্ত্রী ফিরে না আসার নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়ার পূর্বে তার আপন বোনকে বিবাহ করা শরী‘আত সম্মত হয়নি। বরং উচিত ছিল অন্য কোন মেয়েকে বিবাহ করা। যাতে পূর্বের স্ত্রী ফিরে আসলে উভয়কেই স্ত্রী হিসাবে রাখতে পারে।  যেহেতু দুই বোনকে এক সঙ্গে স্ত্রী হিসাবে রাখা যাবে না (নিসা ২৩), সেহেতু তার প্রথমা স্ত্রীকে রেখে দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দিতে হবে। সন্তান হয়ে থাকলে সে তার পিতার সাথে সম্পৃক্ত হবে। তবে মায়ের সাথেও থাকতে পারে।

প্রকাশ থাকে যে, নিখোঁজ স্বামীর ক্ষেত্রে ৪ বছর অপেক্ষা করার পর কোন সন্ধান পাওয়া না গেলে স্ত্রী অন্য স্বামী গ্রহণ করতে পারবে মর্মে যে বিধান রয়েছে, নিখোঁজ স্ত্রীর বোনের ক্ষেত্রে উক্ত বিধান প্রয়োগ করা জায়েয হবে না। কেননা বিষয়টি হারাম-এর সাথে সম্পৃক্ত।

প্রশ্ন (১৩/৩৩৩) : ছালাতে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে মহিলাদের দু’পা মিলিয়ে দাঁড়াতে হবে কি?

-শিহাব, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম।

উত্তর : ছালাতে নারী ও পুরুষ সকলকেই স্ব স্ব কাতারে পায়ে পা ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াতে হবে। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন আমাদেরকে কাতার সোজা করে নেওয়ার জন্য বলতেন, তখন আমরা পরস্পরে কাঁধের সাথে কাঁধ পায়ের সাথে পা মিলিয়ে দাঁড়াতাম’ (বুখারী ১/২১৯ পৃঃ; হা/৭২৫ ‘আযান’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৭৬)। রাসূল (ছাঃ)-এর বাণী- ‘তোমরা ছালাত আদায় কর সেভাবে, যেভাবে আমাকে ছালাত আদায় করতে দেখছ’ (বুখারী হা/৬৩১)। নারী-পুরুষ সকল মুছল্লী এ নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত।

প্রশ্ন (১৪/৩৩৪) : ব্যক্তির সম্মানে দাঁড়ানো সম্পর্কে বুখারীতে সা‘দ বিন মু‘আয সম্পর্কিত যে হাদীছটি বর্ণিত হয়েছে, তার প্রকৃত ব্যাখ্যা জানিয়ে বাধিত করবেন।

-মুনীরুল ইসলাম

ফুলবাড়িয়া, কাথুলী, মেহেরপুর।

উত্তর : যারা সম্মানার্থে দাঁড়ানোর পক্ষে মতামত পেশ করেন, তারা সা‘দ ইবনু মু‘আযের উক্ত হাদীছটি দলীল হিসাবে পেশ করে থাকেন। তারা উক্ত হাদীছের শেষ অংশ  قُوْمُوْا إِلَى سَيِّدِكُمْ -এর অর্থ করেন, ‘তোমরা তোমাদের নেতার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যাও’। উক্ত ব্যাখ্যা বেশ কয়েকটি কারণে গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রথমতঃ উক্ত হাদীছটি মুসনাদে আহমাদে ছহীহ সূত্রে বর্ধিত আকারে এসেছে। قُوْمُوْا إِلَى سَيِّدِكم فَأَنْزِلُوْه ‘তোমরা তোমাদের নেতার দিকে এগিয়ে যাও এবং তাঁকে (গাধা হ’তে) নামিয়ে নাও’ (আহমাদ হা/২৫১৪০; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৬৭)। এতে বুঝা যায় যে, অসুস্থ সা‘দ বিন মু‘আয (রাঃ)-কে গাধার পিঠ থেকে নামতে সাহায্য করার জন্যই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদেরকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এজন্যই হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বর্ধিত অংশটুকু উল্লেখ করে বলেন, هَذِهِ الزِّيَادَةُ تَخْدِشُ فِى الْاِسْتِدْلاَلِ بِقِصَّةِ سَعْدٍ عَلَى مَشْرُوْعِيَّةِ الْقِيَامِ الْمُتَنَازَعِ فِيْهِ অর্থাৎ ‘এই বর্ধিত বর্ণনাটুকু সা‘দ ইবনু মু‘আয (রাঃ) সংশ্লিষ্ট বিবরণ দ্বারা বিতর্কিত ক্বিয়াম বা সম্মানার্থে দন্ডায়মান হওয়াকে শরী‘আতের দলীল সাব্যস্ত করার দাবীকে নাকচ করে দিয়েছে’ (ফাৎহুল বারী ১১/৬০-৬১ পৃঃ, হা/৬২৬২-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)

দ্বিতীয়তঃ তিনি অসুস্থ ছিলেন। ইহুদী গোত্র বনু কুরায়যার সাথে যুদ্ধের সময় তিনি তীরের আঘাত পেয়েছিলেন। আর যখমী অবস্থায় তিনি গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে আসলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে নামতে সাহায্য করার নির্দেশ দেন।

তৃতীয়তঃ ব্যাকরণগত দিক থেকেও তাদের বক্তব্য সঠিক নয়। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যদি সম্মানার্থে দাঁড়াতে বলতেন তাহ’লে বলতেন,  قُوْمُوْا لِسَيِّدِكُمْ   ‘তোমরা তোমাদের নেতার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যাও’। কারণ আরবী ব্যাকরণ মতে, قيام   শব্দের   صله   বা সম্বন্ধ যখন إلى   আসে, তখন তা সহযোগিতা অর্থে আসে। আর যখন ل আসে, তখন তা সম্মান অর্থে আসে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর নির্দেশে  إلى সম্বন্ধপদ প্রয়োগ করেছেন। অতএব এর অর্থ হবে, ‘তোমরা তোমাদের নেতার সাহায্যার্থে দন্ডায়মান হও’ (মিরক্বাতুল মাফাতীহ ৯/৮৩ পৃঃ)(এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা দেখুন সিলসিলা ছাহীহাহ হা/৬৭-এর ব্যাখ্যা)

ইসলামী শরী‘আতে কারো সম্মানার্থে দাঁড়ানো বা দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা নাজায়েয। এটি একটি জাহেলী প্রথা, যা বর্জন করা আবশ্যক। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এতে আনন্দ পায় যে, লোকজন তার সম্মানে দাঁড়িয়ে যাক, সে যেন তার স্থান জাহান্নামে করে নিল’ (আবুদাঊদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/৪৬৯৯ সনদ ছহীহ, ‘ক্বিয়াম’ অনুচ্ছেদ)। অন্য হাদীছে এসেছে, হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, ছাহাবায়ে কেরামের নিকট রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) অপেক্ষা কোন ব্যক্তিই অধিক প্রিয় ছিলেন না। অথচ তারা কখনো রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে দেখে দাঁড়াতেন না (তিরমিযী হা/২৭৫৪; সনদ ছহীহ, মিশকাত হা/৪৬৯৮)

প্রশ্ন (১৫/৩৩৫) : সাপ বা যে কোন ক্ষতিকর প্রাণী থেকে বাঁচার জন্য কোন দো‘আ আছে কি?

-খুরশিদুল ইসলাম

সোনাতলা, বগুড়া।

উত্তর : যে কোন প্রাণীর ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য নিম্নোক্ত দো‘আটি পাঠ করতে হবে। আ‘ঊযু বি কালিমা-তিল্লাহিত তা-ম্মা-তি মিন শার্রি মা খালাক্বা’ ‘আমি আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ কালেমাসমূহের মাধ্যমে সেই সবের ক্ষতি থেকে তাঁর আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যেগুলি তিনি সৃষ্টি করেছেন’ (মুসলিম, মিশকাত হা/২৪২২ ‘বিভিন্ন সময়ের দো’আ সমুহ’ অনুচ্ছেদ)

প্রশ্ন (১৬/৩৩৬) : জনৈক আলেম বললেন, মানুষের মাথা, কান ও গালে আঘাত করতে রাসূল (ছাঃ) নিষেধ করেছেন। এক্ষণে স্কুল শিক্ষকগণ এরূপ করলে ছাত্রদের করণীয় কি?

-মুছলেহুদ্দীন

শিবগঞ্জ, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।

উত্তর: রাসূল (ছাঃ) চেহারায় আঘাত করতে নিষেধ করেছেন (বুখারী হা/২৫৫৯, মুসলিম, মিশকাত হা/৩৫২৫)। ইবনু হাজার বলেন, সব ধরনের শাস্তি বা হদ উক্ত নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত (ফাৎহুল বারী ৫/১৮৩)। এক্ষণে স্কুল শিক্ষকগণ এরূপ করলে ছাত্ররা ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষের নিকটে অভিযোগ করবে এবং কর্তৃপক্ষ সকল শিক্ষককে এ ব্যাপারে সতর্ক করবেন।

প্রশ্ন (১৭/৩৩৭) :মাই টিভির ইসলামী অনুষ্ঠানে জনৈক মাওলানা বললেন, একদা আয়েশা (রাঃ) রাসূল (ছাঃ)-এর গৃহে একগ্লাস পানি পেয়ে তা খেয়ে ফেললে রাসূল (ছাঃ) বললেন, এটি তো আমার প্রস্রাব। তখন আয়েশা (রাঃ) বললেন, আমি জীবনে যত শরবত খেয়েছি, এটি তার মধ্যে সবচেয়ে মিষ্টি ও সুগন্ধিযুক্ত।’ এ বক্তব্যের সত্যতা আছে কি?

-শফীকুর রহমান

কলারোয়া, সাতক্ষীরা।

উত্তর: উক্ত বক্তব্যটি বানোয়াট। তবে কাছাকাছি মর্মে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, যা যঈফ। এ বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূল (ছাঃ)-এর আযাদকৃত দাসী উম্মে আয়মন বলেন, রাসূল (ছাঃ) একদিন রাতে গৃহকোণে রাখা একটি মাটির পাত্রে পেশাব করেছিলেন। পিপাসার কারণে আমি অজান্তে পেশাবটি পান করে নেই। পরের দিন সকালে তিনি আমাকে উক্ত পেশাব ফেলে দিতে বললে আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি তো সেটা পান করে নিয়েছি। একথা শুনে তিনি হেসে ফেললেন এবং বললেন, যাও তুমি আর কখনো পিপাসিত হবে না (ত্বাবারাণী, হাকেম ৪/৭০, হা/৬৯১২)

উক্ত হাদীছটি দু’টি কারণে যঈফ : (১) উম্মে আয়মন ও তাঁর থেকে বর্ণনাকারী নুবায়েহ আল-উনাযীর মাঝে সাক্ষাত না হওয়া (২) সনদে আবু মালিক আন-নাখঈ নামক বর্ণনাকারী নিতান্ত যঈফ। ইমাম নাসাঈ, আবু হাতেম, ইবনু হাজার সহ সকলেই তাকে যঈফ বলেছেন (তালখীছুল হাবীর ১/১৭১)। এরূপ আরেকটি ঘটনা ত্বাবারাণী কাবীর ও বায়হাক্বী সুনানুল কুবরায় বর্ণিত হয়েছে, সেটিও যঈফ।

প্রশ্ন (১৮/৩৩৮) : জুম‘আর দিনে দুই আযান দেওয়া কি বিদ‘আত? এটা হযরত ওছমান (রাঃ) প্রবর্তিত সুন্নাত নয় কি? যদি বিদ‘আত হয়ে থাকে তবে দুই হারামে এটি অনুসৃত হওয়ার কারণ কি?

-আবুবকর

মাদ্রাসা মুহাম্মাদীয়া, হারাগাছ, রংপুর।

উত্তর: জুম‘আর দিনে মূল আযানের পূর্বে আরো একটি আযান দেয়ার নিয়ম ওছমান (রাঃ) চালু করেছিলেন। মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মসজিদে নববীর অদূরে ‘যাওরা’ নামক বাজারে তিনি এ আযান দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে উক্ত আযান শুনে লোকেরা যথাসময়ে মসজিদে উপস্থিত হ’তে পারে। সায়েব বিন ইয়াযীদ (রাঃ) বলেন, জুম‘আর দিন রাসূল (ছাঃ), আবুবকর ও ওমর-এর যুগে যখন ইমাম মিম্বরে বসতেন তখন প্রথম আযান দেয়া হ’ত। অতঃপর যখন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল তখন ওছমান (রাঃ) যাওরাতে দ্বিতীয় আযান বৃদ্ধি করেন (বুখারী হা/৯১২, ‘জুম‘আহ’ অধ্যায়; তিরমিযী হা/৫১৬)। খলীফার এই হুকুম ছিল স্থানিক প্রয়োজনের কারণে একটি সাময়িক রাষ্ট্রীয় ফরমান মাত্র। সেকারণ মক্কা, কূফা ও বছরা সহ ইসলামী খেলাফতের বহু গুরুত্বপূর্ণ শহরে এ আযান তখন চালু হয়নি। হযরত ওছমান (রাঃ) এটাকে সর্বত্র চালু করার প্রয়োজন মনে করেননি বা উম্মতকে বাধ্য করেননি। তাই সর্বদা সর্বত্র চালু করার পিছনে কোন যুক্তি নেই।

অতএব তিনি যে কারণে দ্বিতীয় আযান যাওরাতে চালু করেছিলেন, সে কারণ এখনও থাকলে তাকে নাজায়েয কিংবা বিদ‘আত বলা যাবে না। কিন্তু উক্ত কারণ যদি না থাকে, তাহ’লে বিদ‘আত হিসাবে গণ্য হবে (বিস্তারিত আলোচনা দ্রঃ ছালাতুর রাসূল (ছাঃ), ৪র্থ সংস্করণ পৃঃ ১৯৪-১৯৬)

মসজিদের ভিতরে দাঁড়িয়ে মাইকে ডাক আযান দিয়ে তাকে ওছমানী সুন্নাত দাবী করা নিতান্তই অনুচিত। হারামাইনে দুই আযান একই স্থানে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দেওয়া হয়। এটা রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাত এবং ওছমান (রাঃ)-এর নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। আর সুন্নাত পরিপন্থী সকল কাজই প্রত্যাখ্যাত (বুখারী হা/২৬৯৭)

প্রশ্ন (১৯/৩৩৯) : পোষাক পরিবর্তনের সময় সতর খুলে যাওয়ায় অথবা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ালে ওযূ ভেঙ্গে যায় কি?

-রবীউল আউয়াল

চারঘাট, রাজশাহী।

উত্তর : এসব কারণে ওযূ নষ্ট হবে না। কারণ ওযূ ভঙ্গের যেসব কারণ হাদীছে রয়েছে এগুলি তার অন্তর্ভুক্ত নয়।

প্রশ্ন (২০/৩৪০) :পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের আগে-পিছের সুন্নাত অলসতাবশতঃ আদায় না করলে গোনাহগার হ’তে হবে কি?

-আব্দুল হামীদ

বাঘা, রাজশাহী।

উত্তর : সুন্নাত বলা হয় এমন কাজকে, যা করলে ছওয়াব হয়, না করলে গুনাহ হয় না (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৬)। পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের আগে-পিছে সুন্নাত ছেড়ে দিলে গুনাহ হবে না। কিন্তু প্রভূত নেকী থেকে বঞ্চিত হ’তে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি দিনে ও রাতে ১২ রাক‘আত নফল ছালাত আদায় করবে আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য জান্নাতে একটি গৃহ নির্মাণ করবেন (মুসলিম হা/৭২৮, মিশকাত হা/১১৬৯)। এছাড়া নফল ছালাতের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার ভালবাসা ও নৈকট্য লাভ হয় (বুখারী হা/৬৫০২)। ক্বিয়ামতের দিন বান্দার ফরয ইবাদতের ঘাটতিসমূহ নফল ইবাদত দ্বারা পূরণ করা হবে (আবুদাঊদ হা/৮৬৪, মিশকাত হা/১৩৩০)। অতএব নফল ছালাত সাধ্যপক্ষে আদায় করা কর্তব্য।

প্রশ্ন (২১/৩৪১) :জনৈক বক্তা বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, আবূবকর ও ওমর (রাঃ) আমার জন্য মূসা ও হারূন (আঃ)-এর ন্যায়। উক্ত বক্তব্য কি সঠিক?

-আব্দুল্লাহ আল-মামূন

রাজশাহী।

উত্তর : ‘হারূণ মূসা-এর জন্য যেরূপ ছিলেন, আবূবকর ও ওমর (রাঃ) আমার জন্য সেরূপ’ মর্মের রেওয়ায়াতটি মিথ্যা (সিলসিলা যঈফাহ হা/১৭৩৪)। কাছাকাছি মর্মে বর্ণিত হয়েছে, ‘তারা দু’জন ইসলামের জন্য মানুষের চোখ ও কানের ন্যায়’। এ বর্ণনাটিও জাল (সিলসিলা যঈফাহ হা/৩২৬৯)। অবশ্য আলী (রাঃ) সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেন, হারূণ মূসা-এর জন্য যেরূপ ছিলেন, তুমি আমার জন্য সেরূপ। তবে আমার পরে আর কোন নবী আসবেন না’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৬০৭৮)

প্রশ্ন (২২/৩৪২) : সফর অবস্থায় জামা‘আতে ছালাত আদায় করা ওয়াজিব কি? ছালাত জমা করার পরে পুনরায় উক্ত ছালাত জামা‘আতে আদায় করতে হবে কি?

-আহসান হাবীব, পটুয়াখালী।

উত্তর : সফর অবস্থায় জামা‘আতে ছালাত আদায় করা ওয়াজিব নয় (ছহীহুল জামে‘ হা/৫৪০৫, আলবানী, ইরওয়াউল গালীল হা/৫৯৪ আলোচনা দ্রষ্টব্য)। তবে সফরে কোথাও অবস্থানরত অবস্থায় সম্ভবমত জামা‘আতের সাথে ছালাত আদায় করা উচিত। আর ছালাত জমা করার পরও পুনরায় উক্ত ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করা যাবে। এক্ষেত্রে পরেরটি তার জন্য নফল হবে (মুসলিম, মিশকাত হা/৬০০)

প্রশ্ন (২৩/৩৪৩) :মানবসৃষ্টির মৌলিক উদ্দেশ্য কি? এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।

-আবরার মাহমূদ

বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর : মানুষ সৃষ্টির মৌলিক উদ্দেশ্য আল্লাহর দাসত্ব করা। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আমি জিন ও ইনসানকে কেবলমাত্র আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি’ (যারিয়াত ৫১/৫৬)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, আল্লাহ বলেছেন, ‘হে আদম সন্তান! আমার ইবাদতের জন্য অবসর হও। তাহ’লে আমি তোমার অন্তর প্রাচুর্য দিয়ে ভরে দিব এবং তোমার অভাব দূর করে দিব। আর যদি তা না কর তাহ’লে তোমার দু’হাত ব্যস্ততা দিয়ে ভরে দিব এবং তোমার অভাব দূর করব না’ (তিরমিযী হা/২৪৬৫)। আল্লাহর দাসত্ব অর্থ আল্লাহর বিধানের দাসত্ব করা। যা কেবল কতগুলি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার ক্ষেত্রে নয় বরং জীবনের সর্বক্ষেত্রে। কেননা ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীন (মায়েদাহ ৩)

প্রশ্ন (২৪/৩৪৪) :মৃত্যুর পূর্বে উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টন করা জায়েয কি? কোন পিতা বাধ্যগত অবস্থায় সন্তানদের মাঝে এরূপ করলে গোনাহগার হবেন কি?

-দীদার বখশ

মোহনপুর, রাজশাহী।

উত্তর : উত্তরাধিকার সম্পদ মৃত্যুর পরে বণ্টন হওয়াই ইসলামী শরী‘আতের বিধান, যা সকলের জন্য কল্যাণকর। মৃত্যুর পূর্বে পিতা-মাতা সন্তানদের মাঝে বণ্টন করতে পারেন। কিন্তু সেক্ষেত্রে সকলকে শরী‘আত অনুযায়ী সমানভাবে প্রদান করতে হবে (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩০১৯)। পিতার মৃত্যুর পরে শরী‘আতের বিধান অনুযায়ী যাতে বণ্টন করা হয়, সে মর্মে বণ্টননামা অছিয়ত আকারে লিখে রাখতে পারেন।

 

প্রশ্ন (২৫/৩৪৫) :হাদীছে জিবরীলে বলা হয়েছে ‘ইবাদত কর এমনভাবে যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ’। এর ব্যাখ্যা জানিয়ে বাধিত করবেন।

-ইসরাফীল

হুজুরীপাড়া, দারুশা, রাজশাহী।

উত্তর : এই বাক্য দ্বারা ইবাদতের সর্বোচ্চ খুশূ-খুযূ‘ অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। আয়নী বলেন, ‘ইহসান’ বলতে তোমার ঐ ইবাদতকে বুঝায়, যে ইবাদতরত অবস্থায় তুমি যেন তোমার প্রভুকে দেখতে পাচ্ছ’। যদি এতটা উঁচু স্তরে না উঠতে পার, তবে এ বিশ্বাস রাখ যে, আল্লাহ তোমার সবকিছু দেখছেন এবং তুমি সর্বদা তোমার প্রভুর চোখের সম্মুখে রয়েছ। ঠিক যেমন মনিবের সম্মুখে গোলাম সদা সন্ত্রস্ত ও সতর্কভাবে এবং গভীর মনোযোগ সহকারে কাজ করে থাকে’। এর অর্থ এটা নয় যে, মা‘রেফাতের নামে ছূফীদের আবিষ্কৃত ১০ লতীফায় যিকর করে ‘ফানা ফিল্লাহ’ হয়ে যেতে হবে। অতঃপর আল্লাহর ভালবাসার নামে আব্দ ও মা‘বূদের পার্থক্য ঘুচিয়ে ‘আল্লাহ তা‘আলার আকৃতিমুক্ত সঙ্গ লাভ করে’ তাঁর অস্তিত্বে বিলীন হয়ে যেতে হবে। হুলূল ও ইত্তেহাদের এই অদ্বৈতবাদী ও সর্বেশ্বরবাদী দর্শন সম্পূর্ণরূপে কুফরী আক্বীদা। এ থেকে অবশ্যই তওবা করতে হবে।

প্রশ্ন (২৬/৩৪৬) : ট্যাটু বা উল্কি অাঁকা মহিলাদের জন্য নিষেধ মর্মে ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। এক্ষণে পুরুষের জন্য এর অনুমোদন আছে কি?

-মুহাম্মাদ ছিদ্দীক

মতিঝিল, ঢাকা।

উত্তর : আল্লাহ তা‘আলা ট্যাটু বা উল্কি অংকনকারীর উপর লা‘নত করেছেন (বুখারী হা/৫৯৩৭, মিশকাত হা/৪৪৩১) আল্লাহর এই লা‘নত শুধুমাত্র মহিলাদের উপরে নয়, বরং তা পুরুষদের উপরেও বর্তাবে। হাদীছে মহিলাদের প্রতি ইঙ্গিত করার কারণ হ’ল কাজটি মহিলারাই অধিকহারে করে থাকে।

প্রশ্ন (২৭/৩৪৭) :কোন ব্যক্তির আগমন বা কোন অনুষ্ঠান উপলক্ষে তাকবীর দেওয়া বা তার নামে শ্লোগান দেওয়া যাবে কি?

-শামীম, কাউনিয়া, রংপুর।

উত্তর : কোন সম্মানী ব্যক্তির আগমনে তাকবীর, শ্লোগান বা অন্য কোন ধ্বনি দেওয়া শরী‘আত পরিপন্থী নয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হিজরতকালে মদীনায় পৌঁছলে এবং বদর যুদ্ধ ও তাবুক সফর থেকে বিজয়ী বেশে মদীনায় ফিরলে মুসলিমগণ উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান (দ্রঃ যাদুল মা‘আদ ৩/৫২; মুস্তাদরাকে হাকেম হা/৪২৮২ ও অন্যান্য)। তবে ব্যক্তির নাম ধরে নয় বরং সাধারণভাবে আল্লাহর নামে তাকবীর সহ বিভিন্ন শ্লোগান দেওয়া যাবে। যেমন ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন’-এর মূল শ্লোগান ‘সকল বিধান বাতিল কর, অহি-র বিধান কায়েম কর’। এরূপ শ্লোগানে দাওয়াত ও সত্যপ্রকাশের নেকীও পাওয়া যাবে। সাথে সাথে জনগণের মাঝে অহি-র বিধানের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি পাবে ইনশাআল্লাহ।

প্রশ্ন (২৮/৩৪৮) :মহিলারা পর্দার মধ্যে থেকে মটর সাইকেল, সাইকেল, প্রাইভেট কার ইত্যাদি চালাতে পারে কি?

-আব্দুল লতীফ

বিরল, দিনাজপুর।

উত্তর : পর্দা করে হ’লেও মেয়েদের যেকোন ধরনের ড্রাইভ করা ঠিক নয়। কারণ এগুলি পুরুষালী কাজ এবং এতে  তার বেহায়াপনা প্রকাশ পায়। আল্লাহ প্রকাশ্য ও গোপন যাবতীয় বেহায়াপনাকে নিষিদ্ধ করেছেন (আ‘রাফ ৩৩)। এমনকি এরূপ কাজের নিকটবর্তী হ’তেও নিষেধ করেছেন (আন‘আম ১৫৩)। তার দিকে পুরুষের কুদৃষ্টি পড়ে। এতদ্ব্যতীত তার স্বাস্থ্যগত এবং অন্যান্য ক্ষতির সমূহ আশংকা থাকে। যেহেতু ইসলাম নারীকে গৃহে অবস্থান করার নির্দেশ দিয়েছে এবং জাহেলী যুগের ন্যায় নিজেদের সৌন্দর্য্যকে বাইরে প্রদর্শন করে বেড়াতে নিষেধ করেছে (আহযাব ৩৩), সেহেতু গৃহের দায়িত্ব পালন ও প্রয়োজনে সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাই তাদের জন্য নিরাপদ। যদিও প্রয়োজনে পর্দার সাথে তাদের বাইরে যাওয়া নিঃসন্দেহে জায়েয রয়েছে, যা বিভিন্ন হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৩২৫১ প্রভৃতি)। তবে বাইরে যাওয়া এবং ড্রাইভ করা কখনো এক নয়।

প্রশ্ন (২৯/৩৪৯) : বিভিন্ন সূরা পাঠের ফযীলত জানিয়ে বাধিত করবেন।

-ফয়ছাল, বহদ্দারহাট, চট্টগ্রাম।

উত্তর : ছহীহ হাদীছসমূহে বিভিন্ন সূরা পাঠের ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। যেমন (১) রাতে সূরা বাক্বারাহ পড়লে তার ঘর থেকে শয়তান পালিয়ে যায় (মুসলিম, মিশকাত হা/২১১৯)। অন্য হাদীছে এসেছে, যে ব্যক্তি রাত্রিতে সূরা বাক্বারাহর শেষ দুই আয়াত পাঠ করে, এটাই তার (রাত্রি জাগরণের) জন্য যথেষ্ট হয় (মুত্তাফাক্ব আলাইহ; মিশকাত হা/২১২৫)। (২) সূরা কাহফের প্রথম ১০ আয়াত পাঠ করলে দাজ্জালের ফেৎনা থেকে নিরাপদ থাকা যায় (মুসলিম; মিশকাত হা/২১২৬)। (৩) সূরা ইখলাছ কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান। অর্থাৎ গুরুত্ব ও নেকীতে কুরআনের তিনভাগের একভাগের সমান (মুসলিম হা/৮১২)। (৪) সূরা মুলক তার পাঠকের জন্য ক্বিয়ামতের দিন শাফা‘আত করবে (ইবনু মাজাহ; মিশকাত হা/২১৫৩)। (৫) সূরা ফালাক্ব ও নাস পাঠে ঝড়-তুফান ও অন্যান্য বিপদাপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায় (আবুদাঊদ; মিশকাত হা/২১৬৩)

প্রশ্ন (৩০/৩৫০) :  সন্তান পিতা-মাতার জন্য যা করণীয় তা পালন করার পরও তারা এটাকে অস্বীকার করছেন। এমতাবস্থায় দায়িত্বপালন থেকে বিরত থাকলে সন্তান গোনাহগার হবে কি?

-যুলফিক্বার আলী

কাকরান, ধামরাই, ঢাকা।

উত্তর : অবশ্যই গুনাহগার হবে। কেননা পিতা-মাতার হক সন্তানের উপর অপরিসীম, যা কখনো পূরণীয় নয়। তাঁরা খেদমত স্বীকার করুন বা না করুন, তাদের সেবা করা সন্তানের জন্য অবশ্য কর্তব্য। এমনকি তারা শিরক করতে চাপ দিলেও তা থেকে বিরত থেকে তাদের সাথে সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (লোকমান ১৫)। এছাড়া তারা অমুসলিম হ’লেও তাদের সাথে নম্র ব্যবহার এবং তাদের ভরণ-পোষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৪৯১৩)

প্রশ্ন (৩১/৩৫১) : কুরআনে সিজদার আয়াত কয়টি। এ আয়াতগুলি যেকোন স্থানে শ্রবণ করলে কি সেখানেই সিজদা দিতে হবে না পরে দিলেও চলবে। এর জন্য ওযূ শর্ত কি?

-নূরে আলম ছিদ্দীকী

মতিঝিল, ঢাকা।

উত্তর : পবিত্র কুরআনে সিজদার আয়াত সমূহ ১৫টি। যথা : আ‘রাফ ২০৬, রা‘দ ১৫, নাহ্ল ৫০, ইস্রা/বনু ইস্রাঈল ১০৯, মারিয়াম ৫৮, হজ্জ ১৮, ৭৭, ফুরক্বান ৬০, নমল ২৬, সাজদাহ ১৫, ছোয়াদ ২৪, ফুছছিলাত/হামীম সাজদাহ ৩৮, নাজম ৬২, ইনশিক্বাক্ব ২১, ‘আলাক্ব ১৯ (দারাকুৎনী হা/১৫০৭; হাকেম ২/৩৯০-৯১; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১৬৫)। এ আয়াতগুলি পড়লে বা শ্রবণ করলে সিজদা দেয়া সুন্নাত। ইবনে ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) সিজদার আয়াত পড়তেন এবং সিজদা করতেন। আমরাও সিজদার জন্য ভিড় জমাতাম। এমনকি অনেকে ভিড়ের কারণে সিজদা দেয়ার জায়গা পেত না (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১০২৫)। তবে সিজদা না করলে গুনাহগার হবে না (বুখারী হা/১০৭৭)এই সিজদার জন্য ওযূ ও ক্বিবলা শর্ত নয় (বুখারী হা/১০৭১, ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ২১/২৭৮, ২৯৩ পৃঃ)

প্রশ্ন (৩২/৩৫২) : বিবাহ শুদ্ধ হওয়ার জন্য কি কি শর্ত প্রযোজ্য? কোন একটি পূরণ না হ’লে বিবাহ সাব্যস্ত হবে কি?

-ফাতেমা, তালাইমারী, রাজশাহী।

উত্তর : বিবাহের শর্ত হ’ল চারটি। (১) পরস্পর বিবাহ বৈধ এমন পাত্র-পাত্রী নির্বাচন (২) উভয়ের সম্মতি (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩১২৬)। (৩) মেয়ের ওলী থাকা (আহমাদ, তিরমিযী; মিশকাত হা/৩১৩০), (৪) দু’জন ন্যায়নিষ্ঠ সাক্ষী থাকা (ত্বাবারাণী, ছহীহুল জামে‘ হা/৭৫৫৮)। বিবাহের দু’টি রুকন হ’ল ঈজাব ও কবুল (নিসা ১৯)। উক্ত শর্তাবলীর কোন একটি পূরণ না হ’লে বিবাহ শুদ্ধ হবে না। উল্লেখ্য যে, যে মেয়ের ওলী নেই, তার ওলী হবেন সরকার (আহমাদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/৩১৩১)

প্রশ্ন (৩৩/৩৫৩) : হযরত আদম (আঃ)-কে মোহর ব্যতীত বিবি হাওয়াকে স্পর্শ করতে দেওয়া হয়নি। নবী (ছাঃ)-এর উপর দরূদ পাঠই ছিল তাঁর জন্য মোহরস্বরূপ। এ বক্তব্যের কোন ভিত্তি আছে কি?

-আতাউর রহমান

সন্যাসবাড়ী, নওগাঁ।

উত্তর : বক্তব্যটি ভিত্তিহীন এবং বানাওয়াট। এ মর্মে সূত্র বিহীন একটি গল্প বর্ণিত হয়েছে জামালুদ্দীন বাগদাদী লিখিত ‘বুসতানুল ওয়ায়েযীন’ বইয়ের ২৯৭ পৃষ্ঠায়। এছাড়া আরো আছে তাবলীগী নেছাবের ‘ফাযায়েলে দরূদ শরীফ’ গল্প নং ১৪ পৃঃ ৮৫-তে (দ্রঃ হাদীছের প্রামাণিকতা ২য় সংস্করণ পৃঃ ৫৯)

প্রশ্ন (৩৪/৩৫৪) :গরমের কারণে মসজিদের বাইরে মাঠে ছালাত আদায় করলে ছালাত আদায় হবে কি?

-আনোয়ার হোসাইন

আড়ানী, বাঘা, রাজশাহী।

উত্তর : শুধুমাত্র গরমের কারণে মসজিদ বাদ দিয়ে মাঠে ছালাত আদায় করলে মসজিদে ছালাত আদায়ের নেকী অর্জিত হবে না। রাসূল (ছাঃ) বলেন, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তর স্থান হ’ল মসজিদ (মুসলিম, মিশকাত হা/৬৯৬)। তিনি বলেন, যখন মুছল্লী মসজিদে প্রবেশ করে ছালাতে রত হয় এবং ছালাতই তাকে আটকে রাখে। ফেরেশতারা তার জন্য দো‘আ করে বলে, ‘হে আল্লাহ! তুমি তাকে ক্ষমা কর ও তার তওবা কবুল কর’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৭০২)। তবে মসজিদের নেকী থেকে বঞ্চিত হলেও ছালাত শুদ্ধ হবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘সমগ্র যমীনকে আমার জন্য পবিত্র এবং সিজদার স্থান বানিয়ে দেয়া হয়েছে’। অন্য বর্ণনায় এসেছে, গোসলখানা ও কবরস্থান ব্যতীত’ (আবুদাঊদ হা/৪৮৯, ৪৯২; মিশকাত হা/৭৩৭, ৫৭৪৭)। 

প্রশ্ন (৩৫/৩৫৫) : জান্নাতে কৃষি খামার বা পশুপালন ইত্যাদি করা যাবে কি? দলীলসহ জানিয়ে বাধিত করবেন।

-মুহীউদ্দীন, যশোর।

উত্তর : জান্নাতবাসীদের সকল ইচ্ছা পূরণ করা হবে। আল্লাহ বলেন, সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে যা কিছু তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে যা কিছু তোমরা দাবী করবে’ (হা-মীম সাজদাহ ৪১/৩১; যুখরুফ ৪৩/৭১, শূরা ২২)। এছাড়াও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, একজন জান্নাতী ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার কাছে ফরিয়াদ করবে জান্নাতে ক্ষেত-খামার করার জন্য। তখন তিনি একটি বীজ রোপন করবেন সেটা তখনই বড় হয়ে ফসল প্রস্ত্তত হয়ে যাবে (বুখারী হা/৭৫১৯, মিশকাত হা/৫৬৫৩)

প্রশ্ন (৩৬/৩৫৬) : বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রাণীর ছবি অংকন করতে হয়। এরূপ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে প্রাণীর ছবি অংকনে শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

-সাদিয়া, কাদিরগঞ্জ, রাজশাহী।

উত্তর : আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, যারা এসব ছবি তৈরী করে, তারা ক্বিয়ামতের দিন কঠিন আযাবপ্রাপ্ত হবে। তাদেরকে বলা হবে তোমরা যা সৃষ্টি করেছিলে তা জীবিত কর’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৪৯২ ‘পোষাক’ অধ্যায়, ‘ছবি সমূহ’ অনুচ্ছেদ)। তবে প্রাণীর গঠন বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানা ও চিকিৎসা কর্মে ব্যবহার করার জন্য, বিশেষতঃ জীব বিজ্ঞানের ব্যবহারিক পরীক্ষার সময় প্রাণীর ছবি অংকন করা জায়েয। কেননা এতে ছবিকে সম্মান করার উদ্দেশ্য থাকে না। বরং হীনকর কাজে ব্যবহৃত হয়। অতএব এর জন্য কোন শাস্তি হবে না ইনশাআল্লাহ (মুসলিম হা/২১০৭; মিশকাত হা/৪৪৯৩; দ্রঃ ‘ছবি ও মূর্তি’ বই)

প্রশ্ন (৩৭/৩৫৭) :  রাস্তার ডান দিক দিয়ে চলতে হবে। বাম দিক দিয়ে চললে পাপ হবে।শরী‘আতে এরূপ কোন নির্দেশনা আছে কি?

-মুহাম্মাদ রানা

 রাণীনগর, শিবগঞ্জ, চাঁপাই নবাবগঞ্জ

উত্তর : রাসূল (ছাঃ) সকল শুভ কাজ ডান দিক দিয়ে করা পসন্দ করতেন (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৪০০) অতএব রাস্তায় চলার সময় যথাসম্ভব ডান দিক দিয়ে চলাই উত্তম। তবে পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে ডান দিক দিয়ে চলায় ক্ষতির আশংকা থাকলে বাম দিক দিয়ে চলতে বাধা নেই। আল্লাহ বলেন, তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না’ (বাক্বারাহ ২/১৯৫)

প্রশ্ন (৩৮/৩৫৮) :  রাসূল (ছাঃ)-কে সৃষ্টি করা না হ’লে, এ পৃথিবী সৃষ্টি করা হ’ত না। এ হাদীছটির কোন ভিত্তি আছে কি? ছহীহ না হ’লে তার কারণ বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।

-সাজেদুর রহমান

সারিয়াকান্দি, বগুড়া।

উত্তর: হাদীছটি মওযূ বা জাল। হাদীছটি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ)-এর নামে মুহাদ্দিছ হাসান বিন মুহাম্মাদ ছাগানী (মৃঃ ৬৫০ হিঃ) স্বীয় ‘মওযূ‘আত’ গ্রন্থে (হা/৭৮) উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ফেরদৌস দায়লামী (হা/৮০৯৫) ও ইবনুল জাওযী স্বীয় মওযূ‘আত গ্রন্থে এবং সৈয়ূতী স্বীয় ‘লাআলী আল-মাছনূ‘ গ্রন্থে এনেছেন। সবাই এটিকে মওযূ বা জাল বলেছেন এবং তার কারণ সমূহ নির্দেশ করেছেন (সিলসিলা যঈফাহ হা/২৮২)। শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, এরূপ কোন হাদীছ ছহীহ বা যঈফ কোন সূত্রেই রাসূল (ছাঃ) থেকে বর্ণিত হয়নি। কোন ছাহাবীও এরূপ কোন হাদীছ সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। এর বর্ণনাকারী সম্পর্কেও জানা যায় না (মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১১/৮৬-৯৬)। সকল যুগের বিদ্বানগণ এ বর্ণনাকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলেছেন (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা ১/৩১২)

প্রশ্ন (৩৯/৩৫৯) :ওয়াক্তিয়া মসজিদের পাশে অনুষ্ঠিত ইসলামী সম্মেলন আযান হ’লে মসজিদে আযান দিতে হবে কি?

-রূহুল আমীন

আড়ানী, বাঘা, রাজশাহী।

উত্তর : ছালাত ছহীহ হওয়ার জন্য আযান শর্ত নয়। বরং ছালাতের সময় হলে আযান না দিয়ে ছালাত আদায় করলেও তা আদায় হয়ে যাবে। অতএব ইসলামী সম্মেলনের আযান শোনা গেলে পার্শ্ববর্তী মসজিদে আযান দেওয়ার বিষয়টি ইচ্ছাধীন (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা ফৎওয়া নং ৯৮৯৫)। তবে আযান দিলেও তা মাইকে দেওয়া উচিৎ হবে না।

প্রশ্ন (৪০/৩৬০) :ইয়াহইয়া ও ঈসা (আঃ)-এর মাঝে এবং ইয়াহইয়াও মারিয়াম (আঃ)-এর মাঝে কোন আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল কি?

-আরীফুল ইসলাম

বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর : ঐতিহাসিক ও জীবনীকারগণ বলেন, মারিয়ামের মা ছিলেন ‘হান্নাহ’ (حنة) এবং ইয়াহইয়ার মা ছিলেন ঈশা‘ (إيشاع)। এক্ষণে ঈশা‘ কে ছিলেন, সেবিষয়ে দু’টি মত পরিলক্ষিত হয়। (১) তিনি মারিয়ামের বোন ছিলেন। ইবনু কাছীর বলেন, এটাই জমহূর বিদ্বানগণের মত (আল-বিদায়াহ ২/৫২)। এ হিসাবে ইয়াহইয়া ও ঈসা দু’জন পরস্পরে খালাতো ভাই। যেমনটি মি‘রাজের প্রসিদ্ধ হাদীছে (إبنا خالة) বলা হয়েছে (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫৮৬২)। (২) ইয়াহইয়ার মা ঈশা‘ ছিলেন মারিয়ামের মা হান্নার বোন। সে হিসাবে ঈশা‘ হলেন মারিয়ামের খালা। আর তার পুত্র ঈসা (আঃ) হ’লেন ইয়াহইয়া (আঃ)-এর ভাগিনা। কিন্তু হাদীছে তাদেরকে ‘খালাতো ভাই’ বলা হয়েছে। এর উত্তরে বিদ্বানগণ বলেন, মায়ের খালা প্রকৃত খালার ন্যায়। অতএব ইয়াহইয়ার মা যিনি মারিয়ামের খালা, তিনি তার ছেলে ঈসারও খালা। যেমন মারিয়াম ইয়াহইয়ার খালার মেয়ে। একইভাবে তার ছেলে ঈসা তার খালারও ছেলে।’ আবুস সাঊদ স্বীয় তাফসীরে বলেন, হাদীছে দু’জনকে ‘খালাতো ভাই’ বলা হয়েছে একারণে যে, বহু ক্ষেত্রে বোন দ্বারা বোনের মেয়েকে বুঝানো হয়’। অতএব জীবনীকারগণের বক্তব্য অনুযায়ী ইয়াহইয়া ও ঈসা পরস্পরে খালাতো ভাইও হতে পারেন। আবার মামু-ভাগিনাও হতে পারেন।

নবীদের কাহিনী ২/১৭৮ পৃষ্ঠায় ঈসাকে ইয়াহইয়ার খালাতো ভাই এবং ২/১৮৩ পৃষ্ঠায় মারিয়াম (আঃ)-কে ইয়াহইয়ার খালাতো বোন বলা হয়েছে। ১ম মত অনুযায়ী মারিয়াম ইয়াহইয়ার খালা এবং ঈসা ইয়াহইয়ার খালাতো ভাই হবেন। ২য় মত অনুযায়ী মারিয়াম ইয়াহইয়ার খালাতো বোন এবং ঈসা (আঃ) ইয়াহইয়া (আঃ)-এর ভাগিনা হবেন। আল্লাহ সর্বাধিক অবগত।