সাময়িক প্রসঙ্গ

শাহবাগ থেকে শাপলা : একটি পর্যালোচনা

-ড. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হোসাইন

ভূমিকা :

৫ ফেব্রুয়ারী হ’তে ৫ মে ২০১৩। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এই তিন মাসের ঘটনাপ্রবাহ অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক, লোমহর্ষক, বেদনাবিধূর ও অবিশ্বাস্য। যা এদেশের স্বাধীনতার মূল ইসলামী চেতনাকেই ম্লান করে দিয়েছে। নাস্তিক্যবাদী শক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইন্ধন ও হিঃস্র আক্রমণে ইসলাম আজ বিপন্নপ্রায়। এই সময়ে সরকারীভাবে ইসলাম ও প্রিয়নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে কটূক্তিকারীদের উৎসাহিত করা এবং এর প্রতিবাদে ফুঁসে উঠা মুসলিম জনতাকে নৃশংস ও বর্বরভাবে আক্রমণ চালিয়ে দমন করার যে দৃশ্য বাংলার মানুষ দেখেছে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অন্ধকার অধ্যায়ে পরিগণিত হয়েছে। পরাধীনতার কালো মেঘ যেন উঁকি মারছে স্বাধীন এ ভূ-খন্ডের নীলাকাশে। পরিকল্পিতভাবে সৃষ্ট শাহবাগ চত্বরের কলঙ্কিত ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ তথা ‘নাস্তিক মঞ্চ’ এবং এর প্রতিবাদে তাওহীদী জনতার ঈমানী চেতনার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে মতিঝিলের ‘শাপলা চত্বর’-এর উত্থান যেন এ দেশে ঈমান ও কুফরের সুস্পষ্ট সংঘাত হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। আলোচ্য নিবন্ধে শাহবাগ থেকে শাপলা চত্বরের ঘটনা প্রবাহ নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা উপস্থাপন করা হ’ল।-

ঘটনার সূত্রপাত :

৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৩ রোজ মঙ্গলবার। যুদ্ধাপরাধ (?) মামলার রায়ে ‘জামায়াতে ইসলামী’-এর সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদন্ড হওয়ায় হঠাৎ করে দেশের দৃশ্যপট পাল্টে যায়। উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ঢাকা। আদালতের রায়কে অস্বীকার করে জামায়াত নেতার ফাঁসির দাবীতে রাজপথে নামে বাম ঘরানার কিছু বুদ্ধিজীবি ও তাদের অনুসারীরা। অন্যদিকে ব্লগার ও অনলাইন নেটওয়ার্ক একটিভিস্টদের উদ্যোগে রাজধানীর অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ স্থান তিন-তিনটি বৃহৎ হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের (পিজি, বারডেম ও ঢাকা মেডিকেল) সংযোগস্থল ‘শাহবাগ চত্বরে’ স্থাপন করা হয় তথাকথিত ‘গণজাগরণ মঞ্চ’। যা সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় ও মিডিয়ার প্রচারণায় কয়েকদিনের মধ্যেই সারাদেশের আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অতঃপর যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবীতে চলতে থাকে দিনের পর দিন শ্লোগান ও নানাবিধ গর্হিত কর্ম। চলে নারী-পুরুষ একাকার হয়ে দিবা-রাত্রী গান-বাজনা ও অশ্লীল নৃত্য। যিম্মী হয়ে পড়ে দেশের সর্ববৃহৎ হাসপাতাল বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতাল (সাবেক পিজি হাসপাতাল) সহ আরো দু’টি বৃহৎ হাসপাতালের শত শত ডাক্তার ও রোগী। জনমানুষের ভোগান্তি চরমে উঠে। চারদিক থেকে রাস্তা অবরুদ্ধ থাকায় ঐ পথে যান চলাচল থাকে একেবারে বন্ধ। আশ্চর্যের বিষয় যে, এরা ষোলআনাই সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পায়। পুলিশী পাহারা, খাবার সরবরাহ, মোবাইল টয়লেটের ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য সেবা সহ সব ধরনের সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হয় সরকারীভাবে। এই মঞ্চ ক্রমান্বয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে গজিয়ে উঠতে থাকে একই নিয়মে ও একই দাবী নিয়ে।

প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, আমরা একটি শব্দের সাথে খুবই পরিচিত। তা হচ্ছে ‘আদালত অবমাননা’। সহজ অর্থে আদালতের বাইরে আদালতের কোন সিদ্ধান্তের সমালোচনা ও বিরোধিতাকেই বলা হয় ‘আদালত অবমাননা’। যার জন্য আবার সুনির্দিষ্ট ধারায় শাস্তির বিধানও রয়েছে আমাদের আইনী কিতাবে (?)। ঘটনা যদি তাই হয়, তাহ’লে শাহবাগীরা সর্বোচ্চ বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে যে প্রকাশ্য আন্দোলনে নামল এবং আদালতের রায়কে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করল, তা কি ‘আদালত অবমাননা’ নয়? স্বাধীন বিচার বিভাগের ‘সুচিন্তিত’ রায়ের বিরুদ্ধে মাসের পর মাস রাজপথ দখল করে ‘আন্দোলন’ করার অপরাধে এরা যেমন কঠোরভাবে ‘আদালত অবমাননা’র অপরাধে অপরাধী, তেমনি জাতীয় সংসদে প্রকাশ্যে এদের পৃষ্ঠপোষকতা দানের ঘোষণা দিয়ে সরকারও চরম অপরাধী হওয়ার কথা। কিন্তু কই, কোন মহল থেকে এ বিষয়ে উচ্চবাচ্য তো দেখা গেল না? এটাই এখন বাংলাদেশের তথাকথিত ‘আইনের শাসনে’র নমুনা! 

নাস্তিকদের ঔদ্ধত্য :

‘গণজাগরণ মঞ্চ’ মূলতঃ বাম ও রামপন্থীদের সমন্বয়ে গজিয়ে ওঠা একটি নাস্তিক্যবাদী মঞ্চ। এই মঞ্চকে ঘিরেই এ দেশে সাম্প্রতিক নাস্তিক্যবাদের উত্থান। নাস্তিক্যবাদের এই প্রকাশ্য মহড়া বাংলাদেশের ইতিহাসে বড়ই অবিশ্বাস্য, অনাকাংখিত ও অকল্পনীয়। দাউদ হায়দার, আহমাদ শরীফ, হুমায়ুন আযাদ ও তাসলীমা নাসরিনদের প্রেতাত্মা এইসব মুসলিম নামধারী নাস্তিক ব্লগাররা তাদের ব্লগে ইসলাম ও প্রিয়নবী (ছাঃ) সম্পর্কে যেরূপ নোংরা মানহানিকর মন্তব্য ছড়িয়ে দিয়েছে, তা নাস্তিক্যবাদের ইতিহাসেই বিরল। কোন অমুসলিমও এত নিকৃষ্ট মন্তব্য করার স্পর্ধা দেখায়নি। যে বিশ্বনবীর সুন্দরতম চরিত্রের অনুপম সনদ স্বয়ং বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ দিয়েছেন (ক্বলম ৪), যে নবী বিশ্ববাসীর জন্য রহমত স্বরূপ (আম্বিয়া ১০৭), যে নবীর সুফারিশ ব্যতীত আখেরাতে কারু কোন গত্যন্তর থাকবে না, সেই নবীর চরিত্র নিয়ে এরা যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ কটূক্তি করেছে, তা এককথায় তুলনাহীন। শারঈ বিচারে এদের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড। যা কার্যকর করা যেকোন মুসলিম সরকারের জন্য অপরিহার্য। অন্যথায় চূড়ান্ত বিচার দিবসে সরকারকে অবশ্যই লাঞ্ছিত হ’তে হবে এবং মর্মন্তুদ শাস্তি ভোগ করতে হবে।

হেফাজতে ইসলামের তের দফা দাবী :

সরকারের প্রকাশ্য পৃষ্ঠপোষকতায় নাস্তিকদের এই বাগাড়ম্বরে     স্তম্ভিত হয়ে পড়ে জাতি। স্বাধীন বাংলাদেশের ৪২ বছরের ইতিহাসে নাস্তিকতার নামে এমন আস্ফালন দেখানোর দুঃসাহস কারো হয়নি। রাসূল (ছাঃ)-কে নিয়ে ব্লগার রাজীব ‘থাবা বাবা’র কটূক্তি দৈনিক আমার দেশ ও দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় প্রকাশের ফলে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে সর্বত্র। বিভিন্ন সংগঠন বিবৃতি দিয়ে এর তীব্র নিন্দা জানায়। শুরু হয় সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং। ২২ ফেব্রুয়ারী’১৩ রোজ শুক্রবার ঢাকার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেইটে সমমনা ১২টি ইসলামী দলের পক্ষে প্রথম বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেওয়া হয়। কিন্তু পুলিশী বাধায় তা পন্ড হয়ে যায়।  সেদিন নবীপ্রেমী মুছল্লীদের রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ। চলে পাইকারী গ্রেফতার। যার শিকার হয় নিরীহ মুছল্লীরা। দায়ের করা হয় একেক জনের বিরুদ্ধে ৩/৪টি করে মিথ্যা মামলা। ফলে চারিদিকে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। অতঃপর চট্টগ্রামের হাটহাজারী মঈনুল ইসলাম দারুল উলূম মাদরাসায় ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত কওমী মাদরাসা ভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন ‘হেফাজতে ইসলাম’ -এর পক্ষ থেকে ৯ই মার্চ’১৩ তারিখে সাংবাদিক সম্মেলন করা হয়। যেখানে সরকারের প্রতি ১৩ দফা দাবী জানানো হয় । যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং কুরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিল; আল্লাহ, রাসূল (ছাঃ) ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস; কথিত শাহবাগ আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী স্বঘোষিত নাস্তিক-মুরতাদ এবং প্রিয়নবী (ছাঃ)-এর শানে জঘন্য কুৎসা রটনাকারী ব্লগার ও ইসলাম বিদ্বেষীদের সকল অপপ্রচার বন্ধসহ কঠোর শাস্তিদানের ব্যবস্থা করা প্রভৃতি (দাবীসমূহ দ্র : আত-তাহরীক মে’১৩ সংখ্যা, পৃ. ৪৫)। এই দাবীসমূহ আদায়ের লক্ষ্যে দলটি দেশব্যাপী কর্মসূচী ঘোষণা করে এবং দেশবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া লাভ করে। ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ড. হাছান মাহমূদ হাটহাজারী মাদরাসায় গিয়ে হেফাজতের আমীর আল্লামা আহমাদ শফীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু আলোচনায় কোন ফল হয়নি।

হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচী ও সরকারী বাধা :

লংমার্চ : ১৩ দফা দাবী আদায়ের লক্ষ্যে সর্বাত্মক আন্দোলনের ডাক দেয় হেফাজতে ইসলাম। ৬ এপ্রিল ডাকা হয় ঢাকা অভিমুখে ঐতিহাসিক লংমার্চের। এতে অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে। ফলে লংমার্চ প্রতিহত করতে সরকার গ্রহণ করে নানামুখী পদক্ষেপ। সকল রুটের সকল বাস-ট্রেন-লঞ্চ-স্টীমার বন্ধ করা হয়। এমনকি সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় নামসর্বস্ব একটি দলকে দিয়ে ৫ এপ্রিল শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে ৬ এপ্রিল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশব্যাপী ডাকানো হয় হরতাল। উদ্দেশ্য, যেন দেশের অন্যান্য যেলা থেকে কেউ ঢাকায় আসতে না পারে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই ধরনের সরকারী হরতাল নযীরবিহীন। সরকারীভাবে ‘হরতাল’ পালনের এ এক নতুন রেকর্ড। কিন্তু মুসলমানদের ঈমানী চেতনার সামনে কোন বাধাই টিকেনি। শত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে পায়ে হেঁটে বা রিক্সা-ভ্যানে করে লংমার্চে অংশগ্রহণ করে লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মুসলমান। মতিঝিলের শাপলা চত্বর পরিণত হয় জনসমুদ্রে। পশ্চিমে দৈনিক বাংলা, উত্তরে ফকিরাপুল ও দক্ষিণে দৈনিক ইনকিলাব পর্যন্ত শুধুই মানুষের ঢল। জিয়াউর রহমানের জানাযার পর ঢাকায় এতবড় জনসমুদ্রের দৃষ্টান্ত আর পাওয়া যায় না। সকলের একটিই দাবী যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সম্পর্কে কটূক্তিকারী নাস্তিক ব্লগারদের ফাঁসি দেয়া হোক। অতঃপর পরবর্তী কর্মসূচী হিসাবে ৫ই মে ঢাকা অবরোধ ও মধ্যবর্তী সময়ে বিভিন্ন যেলা ও বিভাগীয় সম্মেলনের আহবানের মধ্য দিয়ে লংমার্চ ও সমাবেশ শেষ করা হয়। উল্লেখ্য যে, হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের মুখে শাহবাগীদের আস্ফালন ক্রমশঃ স্তিমিত হয়ে যায়।

ঢাকা অবরোধ : মাসব্যাপী দেশের বিভিন্ন যেলায় অত্যন্ত সফল কর্মসূচী পালনের পর গত ৫মে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচীতে যোগদানের জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কওমী মাদরাসার ছাত্রসহ সাধারণ ধর্মপ্রাণ লক্ষ লক্ষ জনতা ঢাকায় এসে উপস্থিত হন। ঢাকার ছয়টি পয়েন্টে শান্তিপূর্ণভাবে অবরোধ শুরু হয় সকাল থেকেই। সড়কপথে রাজধানী ঢাকাকে সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। দুপুরের দিকে সরকার হেফাজতকে শাপলা চত্বরে সমাবেশ করার অনুমতি দিলে হেফাজত কর্মীরা অবরোধ ছেড়ে দলে দলে মতিঝিল অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু বিপত্তি বাধে পল্টন এবং গুলিস্তান এলাকায়। এখানে সরকারী দলের কর্মীরা মতিঝিলমুখী মিছিলসমূহকে বাঁধা দিলে উভয়পক্ষে সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশ গুলী চালালে ঘটনাস্থলেই নিহত হয় ৪/৫ জন হেফাজত কর্মী। আহত হয় আরো বহু সংখ্যক। রাত ৮টার দিকে হেফাজতের আমীর আল্লামা আহমাদ শফী সমাবেশ মঞ্চের দিকে অগ্রসর হওয়ার কিছুক্ষণ পর নিরাপত্তাজনিত কারণে আবার লালবাগ মাদরাসাস্থ কার্যালয়ে ফিরে যান। এরপরই হেফাজত নেতারা শাপলা চত্বরে সকাল পর্যন্ত অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। ওদিকে বিরোধী দলীয় নেত্রী আগের দিন একই স্থানে সমাবেশ করে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন ও হেফাজতের পক্ষে প্রকাশ্য সমর্থন ঘোষণা করেন এবং অদ্য ৫ মে সন্ধ্যায় প্রেসবিজ্ঞপ্তি মারফত দলীয় কর্মীদেরকে হেফাজতের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানান। এতে প্রমাদ গনে সরকার। ফলে রাত ১০টার দিকে হেফাজতকে শাপলা চত্বর ত্যাগের নির্দেশ দেয়। কিন্তু হেফাজত নেতারা তাতে সাড়া না দিলে সরকার পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের সাড়ে সাত হাযার সদস্যকে মাঠে নামায় যুদ্ধংদেহী মূর্তিতে। বিদ্যুৎ বন্ধ করে, সকল মিডিয়াকে সরিয়ে দিয়ে রাত আড়াইটার দিকে চালানো হয় পৈশাচিক আক্রমণ ‘অপারেশন ফ্লাশআউট’। শাপলা চত্বরকে ৩ দিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং ১টি দিক খোলা রেখে সরকার ঘুমন্ত, ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত জনতার উপর বর্বরোচিতভাবে হামলা চালায়। মুহুর্মুহু গুলী, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার সেল ও গরম পানির তোপের মুখে ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে শাপলা চত্বর থেকে বিক্ষোভকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। পড়ে থাকে যত্রতত্র শত শত আহত-নিহত মানুষের সারি, আর বিক্ষোভকারীদের ফেলে যাওয়া স্যান্ডেল আর ব্যাগপত্র।

অতঃপর নিহতের সংখ্যা নিয়ে শুরু হয় আরেক নাটক। সরকার পক্ষ থেকে বলা হয়, ঐ রাতে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হয় হাযার হাযার মানুষ নিহত হয়েছে এবং সিটি কর্পোরেশনের ময়লাবাহী ট্রাকে করে লাশ গুম করে ফেলা হয়েছে। হেফাজতে ইসলাম বলেছে, তাদের প্রায় আড়াই থেকে তিন হাযার কর্মী শাহাদাত বরণ করেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এমন রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে আল-জাযীরার অনুসন্ধানী রিপোর্টেও লাশ গুমের প্রামাণ্য চিত্র দেখানো হয়। তবে স্বতন্ত্র সংস্থাসমূহের মতে, এ ঘটনায় অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছে এবং অনেকের লাশ গুম করা হয়েছে। এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকেও নিহতের সংখ্যা শতাধিক উল্লেখ করা হয়েছে। পরদিন ৬ মে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সাথে জনগণের সংঘর্ষ হয় এবং হতাহত হয় প্রায় ৩০ জন বিক্ষোভকারী। ঐ দিন বিকালে আল্লামা শফীকে জোরপূর্বক ঢাকা ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় এবং গ্রেফতার করা হয় হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীকে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো রাত হিসাবে চিহ্নিত হ’ল ৬ মে।

পর্যালোচনা :

দেশের রাজনৈতিক আকাশে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহ নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে বেরিয়ে আসে ৩টি মৌলিক বিষয়। ১. হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচীর ত্রুটি ২. বিরোধী দলের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা ও ৩. সরকারের ন্যাক্কারজনক পদক্ষেপ।

১. হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচীর ত্রুটি : শাসক শ্রেণী যালেম হবে এটিই যুগ-যুগান্তর ধরে ঐতিহাসিক সত্য। নবী-রাসূলগণের যামানাও এই সত্যের বাইরে নয়। সেকারণ হিমাদ্রীসম নির্যাতন বরণ করতে হয়েছে তাঁদেরকেও। এমনকি কখনো কখনো দেশ ত্যাগেও তাঁরা বাধ্য হয়েছেন, করাতে দ্বিখন্ডিত হয়েছেন ইত্যাদি। সালাফে ছালেহীনের ইতিহাস থেকে শুরু করে আমাদের উপমহাদেশের মুসলিম জাগরণের ইতিহাসও রক্তে রঞ্জিত ইতিহাস। কিন্তু তাদের আন্দোলন ও সংগ্রাম থেকে যেটা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, তা হ’ল জনসাধারণের জান-মালের ক্ষতি সাধিত হবে কিংবা সমাজে নৈরাজ্য-বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে এমন কোন আত্মঘাতি পদক্ষেপ তারা গ্রহণ করেননি। যতটুকু করেছিলেন তা শরী‘আতের পূর্ণাঙ্গ অনুসরনের মধ্যে থেকেই করেছিলেন। অতএব যে কোন পদক্ষেপ গ্রহণে দ্বীনের মূলনীতির দিকে লক্ষ্য রাখা অত্যাবশ্যক। কোন অবস্থাতেই বৈধ কিছু অর্জনের জন্য অবৈধ পন্থার আশ্রয় নেয়া যাবে না। অতএব সরকারের শরী‘আত বিরোধী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে ইসলাম যে মূলনীতি বেঁধে দিয়েছে, তার বাইরে যাওয়াটা কল্যাণকর নয়। সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের যতটুকু করণীয় তা হ’ল- প্রথমত: বিভিন্ন উপায়ে সরকারকে নছীহত করা (আহমাদ হা/৮৭৮৫; আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৪৪২) দ্বিতীয়ত: সকল প্রকার বৈধ পন্থায় প্রতিবাদ জানানো। রাসূল (ছাঃ) বলেন, তোমাদের উপরে ভালো ও মন্দ দু’ধরনের শাসক আসবে। যে ব্যক্তি তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে সে দায়িত্বমুক্ত হবে। যে ব্যক্তি তাকে অপসন্দ করবে, সে নিরাপত্তা লাভ করবে। কিন্তু যে ব্যক্তি তার উপর রাযী থাকবে ও তার অনুসারী হবে (সে গোনাহগার হবে)’ (মুসলিম হা/১৮৫৪; মিশকাত হা/৩৬৭১)। 

হেফাজতে ইসলাম অতি অল্প সময়ে জনসমর্থনের বিপুল ঢেউ দেখে অতি আশাবাদী হয়ে কিছুটা অধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে এবং ত্বরিৎ ফল লাভের আশা করেছে। ফলে রাজনৈতিক লুটেরারা তাদেরকে দাবার গুঁটি বানিয়ে ফায়দা হাছিলের অপচেষ্টা চালিয়েছে। হেফাজত নেতৃবৃন্দের প্রথম দিকের বক্তব্য অরাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ হ’লেও পরবর্তী সভা-সমাবেশে তাদের সরকার বিরোধী উত্তপ্ত বক্তব্য সরকারকে অসহিষ্ণু করে তুলে এবং সরকার তাদেরকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসাবে চিত্রিত করে। হেফাজত নেতৃবৃন্দের উচিত ছিল দাবীগুলোর পক্ষে জনমত সংগঠিত করার কাজটি অব্যাহত রাখা, হরতাল-অবরোধ জাতীয় সহিংস কর্মসূচী না দেওয়া এবং কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে তাদের কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়া। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে মাত্র এক মাসের মধ্যে তারা আপামর জনতার মনে যে শ্রদ্ধার আসনটি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল, তা ছিল এ আন্দোলনের জন্য একটি বিরাট অর্জন। কিন্তু ঢাকা অবরোধে এসে এ অর্জনটি তারা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় কিংবা ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাদেরকে সহিংসতায় জড়িয়ে দেয়া হয়। ফলে  যে পরিমাণ দ্রুততার সাথে বিশাল সম্ভাবনাময় জনসমর্থন নিয়ে এ সংগঠনের উত্থান ঘটেছিল, ঠিক ততোধিক দ্রুততার সাথে এ আন্দোলনে ভাটা পড়ার পথ তৈরী হ’ল। মোটকথা চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা এবং শরী‘আত অননুমোদিত আচরণ থেকে আত্মরক্ষা করতে না পারাটাই তাদের জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

২. বিরোধী দলের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা : বিরোধী দল প্রথম থেকেই হেফাজতের আন্দোলন থেকে ফায়দা হাছিলের চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। যেহেতু সরকারের বিরুদ্ধে এত বড় সমাবেশ ইতিপূর্বে কেউ করতে পারেনি, সেকারণ বিরোধী দল হেফাজতের দাবী ও কর্মসূচীতে লোক দেখানো সংহতি প্রকাশ করে এই বিশাল জনসমর্থনকে তাদের পকেটস্থ করার হীন চিন্তা করেছিল। ৬ এপ্রিলের লংমার্চের মঞ্চে বিএনপি নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি এবং ৫ মে সন্ধ্যায় প্রদত্ত বিরোধী দলীয় নেত্রীর বিবৃতি ছিল কেবল জাতিকে ধোঁকা দেয়ার জন্য। যদিও কার্যত বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কোন সহযোগিতা হেফাজত পায়নি। এমনকি নিজেরা ক্ষমতায় গেলে হেফাজতের তের দফা দাবী মানা হবে এমন কোন আশ্বাসও বিরোধী দল দেয়নি। এমনকি অবরোধের দিনও বিরোধী নেত্রীর আহবানে সাড়া দিয়ে কেউ নিরস্ত্র ক্লান্ত-শ্রান্ত অবসন্ন হেফাজত কর্মীদের পাশে দাঁড়ায়নি। ফলে বিরোধী দলের এই হঠকারী ভূমিকা হেফাজতকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তেমনি সরকারকে বল্গাহারা ও হিংস্র করে তুলেছে।

৩. সরকারের ন্যাক্কারজনক পদক্ষেপ : সরকারের সেদিনের পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক, নিষ্ঠুর ও লোমহর্ষক। যা বাংলাদেশের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছে। কোন স্বাধীনতাকামী-বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধেও এমন আচরণ কল্পনাতীত। কোন অনির্বাচিত সরকারের পক্ষেও রাষ্ট্রের নাগরিকদের উপর এই অমানবিক হত্যাযজ্ঞ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তার উপর দেশের সম্মানিত নাগরিক আলেম-ওলামার ক্ষেত্রে এটি আরো প্রশ্নবিদ্ধ। যেখানে রাজপথ দখল করে জনগণের দূর্ভোগ সৃষ্টি করে নাস্তিকদের তথাকথিত ‘গণজাগরণ মঞ্চ' সরকারের সার্বিক সহযোগিতা নিয়ে মাসের পর মাস অবস্থান করে যেতে পারল, সেখানে নিরীহ আলেম-ওলামার ঈমানী দাবীর সমাবেশকে সরকার একটি দিনও বরদাশত করতে পারল না! এমনকি যুদ্ধংদেহীভাবে এরূপ রক্তাক্ত নারকীয় আক্রমণ চালাতে দ্বিধাবোধ করল না! এই দ্বিমুখী আচরণই সরকারের প্রবল ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাবের সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। এ ক্ষেত্রে সরকারের মন্ত্রী ও আমলাদের লাগামহীন মিথ্যাচার জাতিকে আরো হতবাক করেছে। ভাবখানা এমন যে, শাপলা চত্বরে সেদিন কিছুই ঘটেনি। সরকার যদি তার দাবীতে সত্যবাদী হয় তাহ’লে নিম্নের প্রশ্নগুলো জবাব কি হবে?

১. দিনের বেলায় অভিযান না চালিয়ে রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত মানুষের ওপর অভিযান চালানো হ’ল কেন? ২. অভিযানের প্রাক্কালে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিয়ে গোটা এলাকায় ভুতুড়ে পরিবেশ বানিয়ে ফেলা হ’ল কেন? ৩. ঘটনার রাতে অভিযানের পূর্বে সরকার বিরোধী দু’টি টিভি চ্যানেলকে বন্ধ করে দেওয়া হ’ল কেন? ৪. সকাল হওয়ার পূর্বেই দমকল বাহিনীর গাড়ী দিয়ে গোটা এলাকা ধুয়ে ফেলা হ’ল কেন? ৫. গুরুত্বপূর্ণ এই অভিযানটি টিভি চ্যানেলগুলিতে সরাসরি সম্প্রচার করতে দেয়া হ’ল না কেন?

এতগুলো ‘কেন’-এর সঠিক জবাব কে দিবে? অতএব ইনিয়ে-বিনিয়ে যাই বলা হৌক না কেন, জনগণ সত্য উপলব্ধি করতে জানে। শাক দিয়ে যেমন মাছ ঢাকা যায় না তেমনি মিথ্যাচারের শৃংখল ভেঙ্গে শাপলা ট্রাজেডির ইতিহাসও একদিন বেরিয়ে আসবে। যালিমরা এই যুলুমের পরিণাম থেকে কখনই রক্ষা পাবে না। আজ হোক, কাল হোক এর ফল তাদের ভোগ করতেই হবে। আল্লাহ আমাদেরকে যালিমদের হাত থেকে রক্ষা করুন। তাদেরকে যুলুমের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিন। সাথে সাথে এই ঘটনায় যারা নির্মমভাবে যুলুমের শিকার হয়েছেন তাদেরকে ইহকালে ও পরকালে উপযুক্ত প্রতিদান দিন-আমীন।