সম্পাদকীয়

(১) মিসকীন ওবামা, ভিকটিম ওসামা, সাবধান বাংলাদেশ


জনগণের আশা-আকাংখার প্রতীক হয়ে আমেরিকার ক্ষমতায় এলেন বরাক হোসায়েন ওবামা। তাঁর কথায় ও আচরণে মুগ্ধ হয়ে আন্তর্জাতিক নোবেল কমিটি তাঁকে অল্প দিনের মধ্যেই শান্তিতে ‘নোবেল’ পুরস্কারে ভূষিত করলেন। কিন্তু ব্যক্তি হিসাবে তিনি যত ভাল মানুষই হন না কেন, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি ও তার শোষণবাদী পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক পলিসির কোন পরিবর্তন হয়নি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘সূদের চূড়ান্ত পরিণতি হ’ল নিঃস্বতা’ (ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/২৮২৭)। আমেরিকা এখন সেই পরিণতিতে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে তাদের ৩৩১টি ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেছে। হাযার হাযার কর্মচারী-কর্মকর্তা চাকুরী হারিয়েছেন। এমনকি এ মাসেই খোদ নিউইয়র্ক সিটিতে ছয় হাযার শিক্ষক চাকুরী হারাতে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই সেদেশে প্রতি ৭ জনের মধ্যে ১ জন হতদরিদ্র। আমেরিকার এখন নাভিশ্বাস উঠে গেছে। তাই চিরবৈরী গণচীনের কাছে তাকে হাত পাততে হয়েছে। তাদের কাছে সে এখন তিন হাযার বিলিয়ন ডলারের বিশাল অংকের ঋণের জালে আবদ্ধ। ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার, গুয়ান্তানামো বে কারাগার বন্ধ, দেশের অর্থনৈতিক মন্দা দূরীকরণ প্রভৃতি কোন নির্বাচনী ওয়াদাই ওবামা পূরণ করতে পারেননি। এদিকে চার বছরের মেয়াদও শেষের পথে। ঐতিহ্য অনুযায়ী আগামী ২০১২ সালের নির্বাচনে তাঁকে দ্বিতীয় মেয়াদে জিততে হবে। নইলে বড়ই লজ্জার কারণ হবে। কেননা এটাই সেদেশের ভাল প্রেসিডেন্টদের নিদর্শন। ওবামা তাই এখন বড়ই মিসকীন।
একদিকে অর্থনীতি উদ্ধার অন্যদিকে ক্ষমতা উদ্ধার। দু’দিকেই সামাল দেবার জন্য তিনি তাঁর পূর্বের প্রেসিডেন্ট বুশের পথ ধরেছেন। তিনি তাঁর সময়ে অর্থনীতি ও রাজনীতি উদ্ধারের জন্য দু’টি নোংরা পলিসি গ্রহণ করেছিলেন। এক- মুসলিম বিশ্বের তৈল সম্পদ লুট করা এবং দুই- মুসলিম সংস্কারবাদী আন্দোলনগুলিকে সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদী আন্দোলন হিসাবে বদনাম করা ও তাদেরকে উৎখাত করা।
ইংরেজরা ইতিপূর্বে বিশ্ব শোষণ করেছে। ইংল্যান্ড ও আমেরিকা তাদেরই দেশ। ভারতবর্ষ ছিল তাদের এককালের শোষণভূমি। তাই সে তার প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়াকে আফগানিস্তানে দেখে ঝাঁপিয়ে পড়ল এখানে। আফগানীদের ইসলামী জোশকে কাজে লাগালো অর্থ দিয়ে অস্ত্র দিয়ে। সঊদী আরবের বিখ্যাত নির্মাণ প্রতিষ্ঠান বিন লাদেন কোম্পানী-র অন্যতম উত্তরসুরী প্রকৌশলী উসামাকে একাজে লাগানো হ’ল। প্রায় দশ বছরের (১৯৭৯-৮৯) রক্তক্ষয়ী লড়াই শেষে রাশিয়া বিতাড়িত হ’ল। তালেবান নেতাদের হোয়াইট হাউজে ডেকে নিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা দেওয়া হ’ল। কিন্তু বাগে ফিরলো না তালেবানের ইসলামী সরকার। তারা আফগানিস্তানের সম্পদ অন্যকে দেবে না। নিজেদের সম্পদ নিজেদের বিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার কাজে ব্যয় করবে। স্বার্থে আঘাত লাগলো। অতএব এবার তালেবান সরকার উৎখাতের পালা। গণতন্ত্রের সুড়সুড়ি দিয়ে বিরোধী দলগুলির মাধ্যমে সে কাজ সারা হ’ল। পুতুল সরকার ক্ষমতায় এলো। এবার রাতারাতি তালেবান হ’ল সন্ত্রাসী দল। ওসামা ও মোল্লা ওমর হ’লেন বিশ্বের সেরা জঙ্গী। অতঃপর সরাসরি হামলার অজুহাত সৃষ্টি করা হ’ল। ৯/১১-এর নাটক মঞ্চস্থ হ’ল। তিন হাযার লোক মারা গেল। কিন্তু ১৩০০ ইহুদী কর্মকর্তা-কর্মচারীর কেউ ঐদিন কাজে গেল না। এমনকি ইসরাঈলী প্রধানমন্ত্রীর আগের দিনের সফর বাতিল করা হ’ল। ঘটনার সাথে সাথে ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করে প্রেসিডেন্ট বুশ বিবৃতি দিলেন। অথচ ওসামার ওয়েব সাইটে ১১-২৪ সেপ্টেম্বর ১৩ দিনের মধ্যে ৪ বার ঘোষণা এল যে, তিনি বা তার সংগঠন এতে জড়িত নয়। এই মর্মান্তিক ট্রাজেডীর তদন্ত রিপোর্ট আজও প্রকাশিত হয়নি। অথচ ঘটনার মাত্র ২৮ দিনের মাথায় ২০০১ সালের ৭ই অক্টোবর আফগানিস্তানে সরাসরি হামলা করল আমেরিকা ও ন্যাটো জোট। আফগানিস্তানকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হ’ল। কিন্তু ওসামাকে পাওয়া গেল না। শোষণ-শাসন দু’টিই চলতে থাকল। ৩ বছর ৯ মাস পর ২০০৫ সালের ১৯ জুন বুশ-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি বললেন, ওসামা বিন লাদেনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের কোন অকাট্ট প্রমাণ মার্কিন প্রশাসনের কাছে নেই। সে জন্যই তিনি কোন এলাকায় আছেন, সে সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা থাকা সত্ত্বেও তারা তাকে গ্রেফতার করতে পারছেন না। কারণ গ্রেফতার করলে তার বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে। সেই মামলায় সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে তাকে মুক্তি দিতে হবে’। প্রশ্ন হ’ল, সন্ত্রাসের সাথে যুক্ত থাকার কোন প্রমাণ না থাকলে কিসের ভিত্তিতে তারা আফগানিস্তানের মত একটা স্বাধীন দেশের উপর হামলা চালালো? জবাব রয়েছে তাদের কাছেই। ২০০৫ সালের ২৮শে অক্টোবর ভার্জিনিয়ার সেনা সদরে দেয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট বুশ বলেছিলেন, বিগত শতাব্দীর পতিত সমাজতন্ত্রের মতোই বর্তমান শতকে ইসলামী মৌলবাদ বিশ্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ... একে অবশ্যই নিশ্চিহ্ন করতে হবে’।
একই কথা প্রযোজ্য ইরাকের ক্ষেত্রেও। গণ-বিধ্বংসী অস্ত্র মওজুদ রাখার অভিযোগে তারা ২০০৩ সালের ২০শে মার্চ ইরাকে হামলা চালিয়ে তা দখল করে নিল। কিন্তু সেদিন বা আজও তারা সেখানে কিছুই পায়নি। তাহ’লে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে ও টন কে টন বোমা মেরে লাখ লাখ বনু আদমকে হত্যা ও পঙ্গু করার এবং সবশেষে একটি স্বাধীন দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসায়েনকে প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করার দায়-দায়িত্ব কে নেবে? হাঁ তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। ভূপৃষ্ঠের মানুষ তাদের লক্ষ্য ছিল না, ভূগর্ভের তৈল ছিল তাদের লক্ষ্য। সেটা তারা ষোলআনা পেয়েছে। এখন তারা ইরাকের পুতুল সরকারের কাছ থেকে তাদের ইরাক যুদ্ধের পুরো খরচ আদায় করছে। বর্তমানে উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলির দিকে তারা থাবা বিস্তার করেছে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার তাদের ফাঁকা বুলি মাত্র।
দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হবার জন্য বুশ তার দেশবাসীকে বিন লাদেন জুজুর ভয় দেখিয়ে ভোটে পাস করেছিলেন। এবারেও দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হবার জন্য ওবামা তুরুপের তাস হিসাবে ওসামাকেই ব্যবহার করেছেন। অথচ রোগাক্রান্ত ওসামা দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে গেছেন হয়তবা বহু বছর পূর্বে। দুনিয়াবাসীকে যা জানতে দেওয়া হয়নি। আমেরিকা তাই ওসামাকে মারেনি। বরং তাকে ভিকটিম বানিয়ে ‘ওসামা হত্যা’র আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে মাত্র। ঘুমন্ত নিরস্ত্র ওসামা হত্যাকারী বীর (?) হিসাবে ওবামা মার্কিন ভোটারদের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে ভোট চাইবেন। কিন্তু কে না জানে যে নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করার মধ্যে কোন গৌরব নেই। তাই বিশ্ব নিন্দার মুখে ওবামা এখন বড়ই বিব্রত।
গত ২রা মে গভীর রাতে রাডার ফাঁকি দেওয়া চোরা (স্টিল্থ) হেলিকপ্টারে করে এসে পাকিস্তানের এবোটাবাদের সামরিক কেন্দ্রের নাকের ডগায় ওসামা হত্যার মহড়া চালিয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। ইতিমধ্যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বিস্তারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী শক্তি হিসাবে নামানো হয়েছে ইউরোপকে। দৃশ্যপটের পাদ প্রদীপে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী থাকলেও পর্দার অন্তরালে কলকাঠি নাড়ছে ইহুদী-খৃষ্টান নিয়ন্ত্রিত বৃহৎ করপোরেট হাউজগুলি। আফ্রিকা ও আরব দেশগুলি সহ মুসলিম বিশ্বের অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ লুট ও বিশাল বাজার দখলের অভিন্ন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সর্বত্র গণতন্ত্রের নামে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে। একাজে তারা ধর্মকেও ব্যবহার করছে। পূর্ব তিমুরে ধর্ম প্রচারের নামে তাদের খৃষ্টান বানিয়ে তাদেরকে ইন্দোনেশিয়া থেকে পৃথক করে কথিত স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়ে পুতুল সরকারের মাধ্যমে সেখানকার সাগর তীরে বসে জাহাযের পর জাহায ভরে তেল লুটে নিয়ে যাচ্ছে তারা। মুখোশ খুলে যাওয়ায় পূর্ব তিমুরের বুভুক্ষ মানুষ এখন আবার ইন্দোনেশিয়ার দিকে ঝুঁকছে। অতি সম্প্রতি দক্ষিণ সূদানকে পৃথক করা হয়েছে, খৃষ্টান অধ্যুষিত দক্ষিণ এলাকার তেল লুট করার জন্য। লিবিয়ায় একদল গাদ্দাফী বিরোধীকে দিয়ে অস্থায়ী সরকার কায়েম করে তাদের কথিত অনুমতি নিয়ে তেল লুট করা শুরু হয়েছে। ইরাক ও আফগানিস্তানের পর ওরা এবার পাকিস্তানকে পুরোপুরি কব্জায় নেবে। তালেবান দমন ও পাকিস্তানের পারমাণবিক স্থাপনার নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সেদেশে মার্কিন সামরিক আগ্রাসন ও দখলদারিত্ব  কায়েমের  পথ  খোলাছা  করা হচ্ছে বলে আশংকা করা হচ্ছে। পাকিস্তানের তাই এখন বাঁচা-মরা সমস্যা।
ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, সূদান, মিসর, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়ামেন, বাহরায়েন-এর ন্যায় বাংলাদেশও মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। এদেশের শতকরা ৯০ জন নাগরিক মুসলমান। এদেশটির উদ্ভাবিত ও নিরুপিত প্রাকৃতিক সম্পদের চাইতে অনুদ্ভাবিত প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার বেশী সমৃদ্ধ। বলা হয়ে থাকে যে, পুরো বাংলাদেশ তেলের উপর ভাসছে। যা উত্তোলন করা গেলে এদেশের মাথাপিছু আয় আমেরিকার বর্তমান মাথাপিছু আয়ের চাইতে একশ’ গুণেরও বেশী দাঁড়িয়ে যাবে। এছাড়াও রয়েছে অন্যান্য সম্পদ। উপরন্তু দেশটির রয়েছে নিজস্ব দু’টি সামুদ্রিক বন্দর। রয়েছে ১৬ কোটি মানুষের বিশাল আভ্যন্তরীণ বাজার। এর ভৌগলিক অবস্থান সামরিক কৌশলগত দিক দিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবকিছু বিবেচনায় নিলে এদেশটি পার্শ্ববর্তী আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রের সন্ত্রাসী হামলার এবং বিদেশী করপোরেট শক্তির আগ্রাসী থাবায় আক্রান্ত হওয়ার শতভাগ আশংকা রয়েছে। ইতিমধ্যে উজানে সব নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশটিকে মরুভূমি বানানোর চক্রান্ত সফল হয়েছে। আমাদের প্রায় এক কোটি মানুষ এখন বিদেশে শ্রম বিক্রি করছে। অথচ নিজ দেশের সম্পদের ভান্ডার অন্যেরা শুষে নিচ্ছে। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবি প্রভৃতি আন্তর্জাতিক করপোরেট হাউজ তথা শোষক সংস্থাগুলি কখনোই চায় না বাংলাদেশ নিজস্ব সম্পদের সদ্ব্যবহার করে নিজের পায়ে দাঁড়াক। তারা চায় এদেশটি সর্বদা তাদের কাছ থেকে চক্রবৃদ্ধি হারের সূদে নেওয়া ঋণের জালে আবদ্ধ থাকুক। আর তাই তাদের ইঙ্গিতে ইঙ্গ-মার্কিন পরাশক্তি একদিকে যেমন এদেশের নেতৃত্বকে পরস্পরে বিভক্ত ও মারমুখী করে রেখেছে, অন্যদিকে তেমনি দেশটিকে জঙ্গীরাষ্ট্র বানানোর সকল চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছে। এক্ষণে তারা কথিত জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাস দমনের অজুহাতে এদেশে ঘাঁটি গাড়বে এবং আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মতই দুরবস্থার সৃষ্টি করবে।

পরিশেষে বলব, দেশ, জাতি ও মানবতার স্বার্থে ওসামারা চিরকাল জীবন দেয়। আর তাদের অমলিন ত্যাগ ও তেজোদ্দীপ্ত ঈমানকে ওবামারা চিরদিন ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থে। অতঃপর ছেঁড়া ন্যাকড়ার মত তাদের ফেলে দেয় ডাষ্টবিনে। ওসামারা তাই মযলূম মানবতার প্রেরণার উৎস। আর ওবামারা হ’লেন যুলুমের প্রেতাত্মা। ওসামারা মরেও অমর। কিন্তু ওবামারা বেঁচে থেকেও মৃত। বাংলাদেশী নেতারা তাই সাবধান হও। আধিপত্যবাদী, পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের তোষণনীতি ছাড়। এক বন্ধু গেলেও শত বন্ধু তোমার পাশে এসে দাঁড়াবে। অতএব আল্লাহর উপরে ভরসা করে দৃঢ় ঈমান নিয়ে দাঁড়িয়ে যাও। মনে রেখ আল্লাহর শক্তির সামনে মানুষের শক্তি কিছুই নয়।  আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন- আমীন!! (স.স.)

(২) হকিং-এর পরকাল তত্ত্ব
আপেক্ষিকতা সূত্রের (Law of Relativity) উদ্গাতা জন আইনস্টাইনের পর অনেকের নিকট বর্তমান বিশ্বের সেরা পদার্থ বিজ্ঞানী ড. স্টিফেন হকিং (জন্ম : লন্ডন, ১৯৪২), যিনি মধ্যাকর্ষণ শক্তির উদ্ভাবক স্যার আইজাক নিউটনের ন্যায় কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘লুকাসিয়ান অধ্যাপক’-এর বিরল সম্মাননায় ভূষিত, তিনি স্বীয় গবেষণা বিষয়বস্ত্ত তথা ফিজিক্স-এর বাইরে গিয়ে মেটাফিজিক্স বা থিওলজি সম্পৃক্ত বিষয় নিয়ে সম্প্রতি এমন কিছু মন্তব্য করেছেন, যা তাঁর সুউচ্চ সম্মানকে কালিমালিপ্ত করেছে। বৃটেনের প্রভাবশালী দৈনিক গার্ডিয়ানের সাথে এক সাক্ষাৎকারে ‘পরকাল’ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘মৃত্যুর পরে আর কোন জীবন নেই। স্বর্গ ও নরক মানুষের  অলীক কল্পনা মাত্র’। এর আগেও গত বছর তিনি ‘স্রষ্টার অস্তিত্ব ও মহাবিশ্বের শৃংখলা’ নিয়ে তার বই ‘দি গ্রান্ড ডিজাইনে’ অনেক ঔদ্ধত্যপূর্ণ কটাক্ষ করেন। সেখানে তিনি দাবী করেন যে, মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ব্যাখ্যার জন্য ঈশ্বর ধারণার কোন প্রয়োজন নেই। তিনি সৃষ্টিকর্তাকে ‘মানব কল্পিত রূপক’ হিসাবে বর্ণনা করেন। হকিং-এর এসব মন্তব্য স্রেফ কল্পনা নির্ভর হ’লেও যেহেতু তারা বিজ্ঞানী, অতএব তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন বহু মানুষ। বিশেষ করে দুর্বল বিশ্বাসী, কপট বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী ব্যক্তিগণ এইসব মন্তব্যগুলিকে তাদের পক্ষে বড় দলীল হিসাবে সোৎসাহে পেশ করে থাকেন।
খৃষ্টীয় অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে যথাক্রমে শিল্পবিপ্লব ও বিজ্ঞানের নানামুখী আবিষ্কারে হতচকিত হয়ে সাময়িকভাবে অনেক বিজ্ঞানী বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন এবং তারা বিশ্ব চরাচরের সবকিছুকে ‘প্রকৃতির লীলাখেলা’ মনে করতেন। কিন্তু এখন তাদের অধিকাংশের হুঁশ ফিরেছে এবং হোয়াইট হেড, আর্থার এডিংটন, জেম্স জীন্স (১৮৭৭-১৯৪৬) সহ বিরাট সংখ্যক বিজ্ঞানী স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, Nature is alive ‘প্রকৃতি এক জীবন্ত সত্তা’। কেবল জীবন্ত নয়, বরং ডব্লিউ,এন, সুলিভানের ভাষায় বিজ্ঞানীদের বক্তব্যের সার নির্যাস হ’ল, The ultimate nature of the universe is mental. ‘বিশ্বলোকের চূড়ান্ত প্রকৃতি হ’ল মানসিক’। অর্থাৎ সৌরজগত আপনা-আপনি সৃষ্টি হয়নি বা এটা কোন বিগব্যাং বা মহা বিস্ফোরণের ফসল নয় বা অন্ধ-বোবা-বধির কোন ন্যাচার বা প্রকৃতি নয়, বরং একজন প্রজ্ঞাময় সৃষ্টিকর্তার মহা পরিকল্পনার ফসল। আর তিনিই হচ্ছেন ‘আল্লাহ’। যিনি বিশ্ব প্রকৃতির সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা। যাঁর পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনায় সবকিছু চলছে (ইউনুস ১০/৩১)। হাঁ, বিগব্যাং যদি হয়ে থাকে, তবে সেটা দুনিয়ার মানুষ বিজ্ঞানীদের বহু পূর্বে নিরক্ষর নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর মুখ দিয়ে শুনেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা অবিশ্বাস করে তারা কি দেখে না যে, আকাশ সমূহ ও পৃথিবী পূর্বে মিলিত ছিল। অতঃপর আমরা উভয়কে পৃথক করে দিলাম। অতঃপর প্রাণবান সবকিছুকে আমরা সৃষ্টি করলাম পানি হ’তে। তবুও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না’? (আম্বিয়া ২১/৩০)অতঃপর পরকাল কেন? কেন মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে? আল্লাহ বলেন, ...নিশ্চয় তিনিই প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি পুনর্বার সৃষ্টি করবেন। যাতে তিনি বিশ্বাসী ও সৎকর্মশীলদের যথাযথ পুরস্কার দিতে পারেন। আর যারা অবিশ্বাস করে তারা প্রাপ্ত হবে উত্তপ্ত পানীয় ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদের অবিশ্বাসের প্রতিফল স্বরূপ’ (ইউনুস ১০/৪)। আল্লাহ বলেন, তিনিই সেই সত্তা যিনি সৃষ্টির সূচনা করেছেন। অতঃপর পুনরায় সৃষ্টি করবেন। আর এটি তার জন্য অধিকতর সহজ। নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে সর্বোচ্চ মর্যাদা তাঁরই এবং তিনিই মহাপরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়’ (রূম ৩০/২৭)। অদৃশ্য জগতের জ্ঞান বিজ্ঞানীদের নেই। তাই তাদের জ্ঞান অপূর্ণ। সেকারণেই বিজ্ঞানী আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫) বলেছেন, Religion without science is blind and Science without religion is lame. ‘বিজ্ঞান ব্যতীত ধর্ম অন্ধ এবং ধর্ম ব্যতীত বিজ্ঞান পঙ্গু।’

আজকের হকিংদের ন্যায় সেকালে মক্কার মুশরিক নেতাদের অনেকের ধারণা ছিল যে, মানুষ আপনা-আপনি সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রাকৃতিক নিয়মেই তারা ধ্বংস হবে। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘তারা বলে যে, পার্থিব জীবনই আমাদের জীবন। এখানেই আমরা মরি ও বাঁচি। আর আমাদের কেউ ধ্বংস করে না কাল ব্যতীত। বস্ত্ততঃ এব্যাপারে তাদের কোন জ্ঞান নেই। তারা কেবল ধারণা করে মাত্র’ (জাছিয়াহ ৪৫/২৪)। আরব নেতারা বলেছিল, ‘যখন আমরা মরব ও মাটি হয়ে যাব (অতঃপর পুনরুজ্জীবিত হব), সেই প্রত্যাবর্তন তো সুদূর পরাহত’ (ক্বাফ ৫০/৩)। এ নিয়ে তারা ঝগড়ায় লিপ্ত ছিল। আল্লাহ বলেন, ‘ওরা কি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে? মহা সংবাদ নিয়ে? ‘যে বিষয়ে তারা মতভেদে লিপ্ত’। ‘কখনোই না (তাদের ধারণা অবাস্তব)। ‘শীঘ্র তারা জানতে পারবে’। ‘আবার বলছি, শীঘ্রই তারা জানতে পারবে’ (নাবা ৭৮/১-৫)। কি সে মহা সংবাদ? সেটি হ’ল পুনর্জন্মের সংবাদ। কেননা মানবজীবনে সবচেয়ে বড় সুসংবাদ হ’ল জন্মগ্রহণ করা। আর সবচেয়ে দুঃসংবাদ হ’ল মৃত্যুবরণ করা বা বিলীন হয়ে যাওয়া। এ দুনিয়াতে কেউ মরতে চায় না। কিন্তু যে মানুষের জন্য আসমান-যমীন সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে, সেই মানুষ গড়ে একশ’ বছরের মধ্যেই মরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। অথচ ইহজীবনে তার আশা-আকাংখার অনেক কিছুই পূরণ হচ্ছে না। তাই এই অস্থায়ী ও অসম্পূর্ণ জগত থেকে চিরস্থায়ী ও পরিপূর্ণ আরেকটি জগতে হিজরত করতে হয়। যেখানে যালেম তার সমুচিত শাস্তি পাবে এবং মযলূম তার যথাযথ পুরস্কার পেয়ে তৃপ্ত হবে। আর সে জগতটাই হ’ল পরজগত। মৃত্যুর পরেই হবে যার শুরু এবং ক্বিয়ামতের দিন হবে যার পূর্ণতা। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ভয় কর সেই দিনের, যেদিন তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে আল্লাহর দিকে। অতঃপর প্রত্যেকে প্রতিফল পাবে, যা কিছু সে অর্জন করেছিল (দুনিয়াতে)। আর তারা মোটেই অত্যাচারিত হবে না’ (বাক্বারাহ ২/২৮১)। আর এটাই হ’ল জগদ্বাসীর প্রতি আল্লাহর সর্বশেষ নাযিলকৃত আয়াত। অতএব যদি পরকাল বিশ্বাস না থাকত, তাহ’লে সবল ও দুর্বলের হানাহানিতে পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ত। অবিশ্বাসীদের সন্দেহ দূর করার জন্যই আল্লাহ স্বীয় নবীকে মে‘রাজে নিয়ে জান্নাত-জাহান্নাম স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়েছেন। এরপরেও কি হকিংদের চোখ খুলবে না। হে বিজ্ঞানী স্টিফেন! কোন সে শক্তি যিনি আপনাকে ১৯৬৩ সাল থেকে বিগত ৪৮ বছর যাবত মাথা ব্যতীত পুরা দেহ প্যারালাইসিসে পঙ্গু করে রেখেছেন? দুনিয়ার সকল চিকিৎসা সুবিধা নাগালের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও কেন আপনি সুস্থ হ’তে পারছেন না? আপনার বুকের মধ্যের রূহটা কি কখনো দেখতে পেয়েছেন? ওটা কার হুকুমে এসেছে, আর কার হুকুমে চলে যাবে? আপনি কি ১৯৮৬ সালে শিকাগো শহরে আগের বছরের দেয়া তত্ত্বের ভুল স্বীকার করেননি? বিজ্ঞান স্রেফ অনুমিতি নির্ভর বস্ত্ত নয় কি? অথচ ‘আল্লাহর কালাম সত্য ও ন্যায় দ্বারা পরিপূর্ণ..’ (আন‘আম ৬/১১৫)। ঐ শুনুন আপনার সৃষ্টিকর্তার বাণী, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের প্রভু আল্লাহ, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশে সমাসীন হয়েছেন। তিনিই সকল কিছু পরিচালনা করেন... (ইউনুস ১০/৩)। অতএব তওবা করুন! মুসলিম হয়ে মৃত্যুবরণ করুন!! পরকালে ভাল থাকবেন ইনশাআল্লাহ। (স.স.)