স্মৃতিকথা

এক পিতার ঘরে ফেরা...

সহকারী শিক্ষিকা, মহিলা সালাফিইয়াহ মাদরাসা, নওদাপাড়া, রাজশাহী।
শরীফা বিনতে আব্দুল মতীন

১০ই মে রবিবার। সারাদিন অস্থিরতায় ভুগছি। অসংখ্যবার ফোন দিয়েছি, একই খবর পাচ্ছি। সন্ধ্যার পর দু’বার কথা হয়েছে। হঠাৎ রাত ৯-টা ৪৭ মিনিটে ছোট বোনের কণ্ঠে শুনলাম- ‘আপু মনে হয় আমরা একটি কঠিন বিপদের খুবই নিকটে চলে এসেছি। দো‘আ কর’। আমি এশার ছালাতের প্রস্ত্ততি নিচ্ছিলাম। বড় আপুকে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করতে বলে ছালাতে দাঁড়িয়ে গেলাম। নিশ্চিত বিপদকে সামনে নিয়ে ছালাতে ভীষণ কেঁদে দো‘আ করলাম। মনে হচ্ছিল ছালাত শেষ করব না। না জানি সালাম ফিরালে কি সংবাদ পাই। ছালাত শেষ না হ’লেও কি চিরন্তন সত্য থেমে থাকবে? সালাম ফিরানোর সাথে সাথে বড় আপুর ফোন- শরীফা! আববু নেই!! ইন্নালিল্লা-হে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেঊন

পাঠক! এই সংবাদ একজন সন্তানের জন্য কত কঠিন, কত বিদীর্ণকারী, কতটা নিঃশেষকারী, তা যাদের পিতা নেই তারা ব্যতীত কেউ বুঝবে না। আমরাও পিতৃশোকে কাতরদের সান্ত্বনা দিয়েছি। তাদের ব্যথাকে নিজের করে বুঝার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এ ব্যথা হৃদয়ের কত গহীন কোণে পৌঁছে যায়, তা বুঝার সাধ্য ছিল না। জীবনে বুকভাঙ্গা বেদনা আমাদেরকেও হাতছানি দিয়ে ডেকেছে। কিন্তু এ ব্যথায় বুকের ভিতরটা ছিন্ন হয়ে যাওয়া স্পষ্ট টের পাচ্ছি। কেমন কথা! আমার আববু নেই মানে? তিনি আর আমাদের সাথে হাসবেন না, গল্প করবেন না, এক সাথে খাবেন না, কেমন আছি জানতে চাইবেন না, বাড়ি যেতে ডাকবেন না? এটা কি করে সম্ভব? হ্যাঁ, এটাই আল্লাহর চিরন্তন বিধান। যা রদ করার ক্ষমতা কারো নেই।

২৬ ও ২৭ শে মার্চ’১৫ ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর ২৫ তম বার্ষিক তাবলীগী ইজতেমা। আববুর স্বাস্থ্যের গতি দেখে ইজতেমার পরে বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে রেখেছি। ২২ শে মার্চ ২০১৫ তাকে ঢাকার কাকরাইলস্থ ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একটু অসুস্থ বোধ করলেই তাকে হাসপাতালে নেয়া হ’ত। এবারও আরো ভাল চিকিৎসা দিতে ঢাকা আনা হয়।

২৬ শে মার্চ বৃহস্পতিবার ইজতেমার প্রথম দিন রাজশাহীর বাসায় বহু মেহমানের আয়োজন। রান্না শেষ দিকে, সময় তখন বেলা ১১.৩৫। হঠাৎ আম্মুর ফোন। ‘তোমার আববুকে I.C.U তে নিয়ে গেছে’। ইন্নালিল্লাহ, কেন? ‘নাশতার পর থেকে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে অক্সিজেন, নেবুলাইজার দিয়ে ফল পাওয়া যাচ্ছে না। ঊর্ধ্বশ্বাস বেড়েই চলেছে। দেখতে চাইলে আসতে পার’। সব আয়োজন ফেলে, সব দাওয়াত ফিরিয়ে দিয়ে চললাম আববুর পানে। একটাই দো‘আ ছিল- ‘ইয়া সামী‘আদ দো‘আ! শেষবারের মত একবার আববুর সাথে কথা বলতে সুযোগ দাও’।

আমরা রাত দশটায় হাসপাতালে পৌঁছলাম। সবার সাথে কথা ও সাক্ষাৎ হয়েছে আববুর। শেষ দিকটায় আমি গেলে আমার সাথে সাক্ষাৎ হ’লেও কথা হয়নি। ওদিকে মাইক্রো অপেক্ষা করছে আমাদেরকে কুমিল্লা নিয়ে যেতে। আববুর সাথে কথা হয়নি বিধায় আমি ঢাকাতে থেকে যাই। অজানা আশংকায় রাত কাটে। পরদিন জুম‘আর আগে আববুর সাথে কথা হয় আল-হামদুলিল্লাহ। আমি গিয়ে সালাম দিতেই আববু আমাকে চিনে অস্ফুট স্বরে ‘ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লা-হি ওয়া বারাকা-তুহু’ পুরোটা বললেন। কিছু কথা হ’ল। আববুর  স্মৃতিশক্তি দেখে অবাক হয়ে গেলাম। আমি বললাম, আববু আমাকে একবার ‘শরীফা’ বলে ডাক না। আববু ডাকলেন। চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।  গত ঈদুল ফিৎরে সুস্থ দেখে আসি। দীর্ঘদিনের তৃষ্ণায় ডাক্তারি যন্ত্রপাতির ভীড়ে আববুকে দেখে অনুভূতিটা যেন শূন্য হয়ে গেছে। পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হ’তে যাচ্ছি- এটা প্রায় নিশ্চিত জেনে অঝোরে কাঁদলাম। তখনই শেষ ডেকেছিলেন। আর ডাকেননি। কোনদিন ডাকবেন না। এ সত্য মনে হ’লে ডুকরে কেঁদে ওঠে মন। মানুষের জীবনে এর চেয়ে নির্মম সত্য আর কি-ই বা হ’তে পারে।

৬ই এপ্রিল’১৫ তারিখে হাসপাতাল থেকে আববুকে বাসায় আনা হয়। আমরা ৯ ভাইবোন দিনে রাতে সুযোগ মত সবাই কাছে থেকেছি। একদিন আববু যন্ত্রণায় অস্থির। আমি বললাম- আববু! তোমার কি অনেক কষ্ট হয়? আববু মাথায় ইশারা করলেন। আমি যন্ত্রণা লাঘবের আশায় বললাম- আববু! তোমার নয়টা সন্তান। সবাই বিশুদ্ধ তিলাওয়াতকারী। যথাসাধ্য সুন্নাহর অনুসারী। এমন সন্তান যার আছে তার আবার কিসের ভয়? তোমার কোন ভয় নেই, কোন চিন্তা নেই। শুধু একটু ধৈর্য ধর, ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তোমাকে ভাল রাখবেন। চোখ ভেঙ্গে অশ্রু বইছে আমার। আববুর বেদনাকাতর মুখখানি উজ্জ্বল হয়ে ওঠল। হাসিমাখা মুখে তিনিও কাঁদলেন। এরপরে তিনি আর এভাবে অনুভূতি ভাগাভাগি করতে পারেননি।

২২ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত ১ মাস ১৮ দিন আমরা ভাইয়েরা বোনেরা মহান মনিবের দরবারে ভিক্ষুকের মত হাত পেতে কেঁদেছি। আববুর খাট, তার রুম ছিল পরিবারের সদস্যদের সমন্বয়ে যিকর-আযকার ও তিলাওয়াতের মজলিস। আববুর শয্যাশায়ী জীবন আমরা চোখের সামনে মেনে নিতে কষ্ট পেতাম। হায়! এমন বিপদে সন্তান, সম্পদ কোন উপকার করতে পারে না। আমরা তাঁর সেবা-যত্ন, ডাক্তার-ঔষধে ন্যূনতম ত্রুটি রাখিনি। কিন্তু তাঁর কষ্টের ভাগ কানাকড়িও নিতে পারছি না। চূড়ান্ত ফায়ছালায় ব্যক্তির সুখ-দুঃখের ভাগীদার যে সে নিজেই, তা বেদনার সাথে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি।

আমার আববু হাফেয আব্দুল মতীন সালাফী নশ্বর এই পৃথিবীর মায়াজাল ছিন্ন করে আমাদের সকলকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে গত ১০ই মে ২০১৫ দিবাগত রাত  ১০-টায় ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লা-হে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেঊন (মৃত্যু সংবাদ আত-তাহরীক জুন’১৫ সংখ্যা, ৪৮ পৃঃ দ্রঃ)। তিনি ৩ বার ব্রেইন স্ট্রোক করেছিলেন। তন্মধ্যে ২ বার বক্তব্যের মঞ্চে, আরেকবার ঘুমের মধ্যে। এছাড়াও তিনি ডায়াবেটিক, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও ফুসফুসের সমস্যায় আক্রান্ত ছিলেন।

জন্ম ও শিক্ষা জীবন : ১৯৪৫ সালে কুমিল্লা যেলার দেবীদ্বার থানাধীন তুলাগাঁও (নোয়াপাড়া) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সাত ভাই-বোনের মধ্যে ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তার পিতা মৌলভী সাঈদুর রহমান মিয়াঁজী ছিলেন এলাকার প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় মৌলভী। মাত্র ২ বছর বয়সে পিতা ও ২৩ বছর বয়সে তিনি মাতাকে হারান। মায়ের স্নেহমাখা তত্ত্বাবধানে শৈশব-কৈশোর এবং বড় ভাই অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুছ ছামাদের তত্ত্বাবধানে তিনি শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করেন। পরবর্তীতে বসতি পরিবর্তন করে তারা পার্শ্ববতী বুড়িচং থানাধীন কাকিয়ারচর গ্রামে স্থানান্তরিত হন।

শিক্ষাজীবনের শুরুতে তিনি পড়াশুনায় বেশ অমনোযোগী ছিলেন। পুণ্যবতী মায়ের বিশেষ দো‘আর বরকতে পরবর্তীতে শিক্ষার সর্বোচ্চ সিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হন। আববুর মুখে শুনা, পড়াশুনায় অমনোযোগিতার কারণে একবার বড় ভাই পেঁয়াজ-রসুন কিনে দিয়েছিলেন ব্যবসা করার জন্য। তখন মায়ের অঝোর নয়নের কান্না আর দো‘আয় আমার জীবনের আমূল পরিবর্তন হয়। ১৯৫৭ সালে বৃহত্তর ঢাকা যেলার রসূলপুর মাদরাসায় দাখিল ১ম বর্ষে ভর্তি হন। পড়াশুনায় মন না বসায় এক বছর পর প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করেন। ১৯৫৮ সালে কুমিল্লা যেলাধীন জগতপুর এ.ডি.এইচ. ফাযিল মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে বন্যায় সব ভাসিয়ে নিয়ে গেলে তার পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যায়। পরের বছর ১৯৫৯ সালে তিনি নরসিংদী যেলার ‘মাধবদী হাফেযিয়া মাদরাসায়’ ভর্তি হন। এখানে ২১ পারা হিফয সম্পন্নের পর প্রাতিষ্ঠানটির আভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে এখান থেকেও বিদায় নেন। অবশেষে ১৯৬১ সালে নারায়ণগঞ্জের ‘ফরাযীকান্দা হাফেযিয়া মাদ্রাসায়’ ভর্তি হন এবং ১৯৬২ সালে এখান থেকেই বেশ পাকা শুনানীসহ হিফয সম্পন্ন করেন। ফলে শেষ বয়সেও তার কুরআনের হিফয ভাল ছিল। ১৯৬৩ সালে তিনি পুনরায় ‘রসূলপুর ওছমান মোল্লা সিনিয়র মাদরাসায়’ আলিয়া লাইনে ভর্তি হন। দুর্ভাগ্যক্রমে সেবারও বিরাট বন্যা হয়। ফলে লেখাপড়া এখানেও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তিনি জামালপুরের সরিষাবাড়ী আলিয়া মাদরাসায় এক বৎসর এবং  ময়মনসিংহ যেলার ত্রিশালের চকপাঁাচপাড়া মাদরাসায়ও কিছুদিন লেখাপড়া করেন। অতঃপর ১৯৬৫ সালের ২৭শে মার্চ তিনি পাকিস্তান গমন করেন এবং ‘জামি‘আ সালাফিইয়াহ লায়ালপুর’ মাদরাসায় ভর্তি হন। দীর্ঘ আট বছর অধ্যয়নের পর সেখানের সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করে ১৯৭৩ সালের ১৫ই নভেম্বর দেশে ফিরে আসেন। পাকিস্তান থাকাবস্থায় তিনি ১৯৭০ সালে সেদেশের ‘বোর্ড অব ইন্টারমিডিয়েট এন্ড সেকেন্ডারী এডুকেশন’ থেকে মেট্রিক ও একই বোর্ড থেকে ১৯৭৩ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। এরপর ১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসে মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদন করেন। আবেদন মঞ্জুর হ’লে একই বছরের ১৮ই ডিসেম্বরে তিনি মদীনা অভিমুখে যাত্রা করেন। অতঃপর ‘হাদীছ বিভাগ’ থেকে ১৯৮৪ সালে তিনি সফলতার সাথে ‘লিসান্স’ ডিগ্রী অর্জন করেন।

কর্মজীবন : মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পূর্বেই তার কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৭৪ সালে বিবাহের অব্যবহিত পরে নিজ থানার ‘জগতপুর এ.ডি.এইচ. ফাযিল মাদ্রাসায়’ শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। এখানে তিনি প্রায় এক বছর শিক্ষকতা করেন। অত্র প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কুমিল্লা যেলা ‘আন্দোলন’-এর দীর্ঘদিনের সভাপতি মাওলানা ছফিউল্লাহ তার প্রিয় ছাত্রদের অন্যতম ছিলেন। অতঃপর ১৯৭৫ সালে রাজশাহীর চারঘাট থানাধীন ভায়ালক্ষ্মীপুর দারুস সালাম হাফেযিয়া মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ডা. হাসরাতুল্লাহ ছাহেবের অনুরোধে সাড়া দিয়ে  তিনি উক্ত প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একাধারে চার বছর তিনি এখানে শিক্ষকতা করেন। উল্লেখ্য যে, সেসময় সুদূর কুমিল্লা থেকে রাজশাহী যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দুরূহ। দুই দিন লেগে যেত রাজশাহী পৌঁছতে। কখনো রিক্সা, কখনো ট্রেন, কখনো লঞ্চ, কখনো মহিষের গাড়ি এমনকি পায়ে হেঁটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার বর্ণনাতীত কষ্ট স্বীকার করে তাকে সপরিবারে রাজশাহী আসতে হ’ত। অতঃপর ১৯৭৮ সালে মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ লাভ করলে তিনি রাজশাহী ছেড়ে যান। মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘লিসান্স’ শেষ করে ১৯৮৪ সালে সৌদী দূতাবাসের অধীনে বাংলাদেশে সঊদী সরকারের ‘মাবঊছ’ হিসাবে চাকুরী নিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং কর্মস্থল হিসাবে তাঁর নিজ এলাকা কুমিল্লা যেলার বুড়িচং থানাধীন ‘কোরপাই কাকিয়ারচর ইসলামিয়া ফাযিল মাদরাসাকে’ বেছে নেন। জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি এই প্রতিষ্ঠানেই ‘ইলমে দ্বীন’ বিতরণে নিয়োজিত ছিলেন।

সাংগঠনিক জীবন : সাংগঠনিক জীবনে ১৯৭৮ সালে ‘বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ’ গঠিত হ’লে তিনি মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রচার সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। দেশে ফিরে এই সংগঠনেরই একজন সক্রিয় সমর্থক হিসাবে কাজ করেন। নববই দশকের শেষ দিকে ‘যুবসংঘে’র উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়-ঝঞ্ঝার সময়ও তিনি এই সংগঠনের নীতি-আদর্শের সাথে একমত থেকে ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে মাঠে-ময়দানে বিশেষ করে কুমিল্লা যেলায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’ গঠিত হ’লে তিনি ‘আন্দোলন’-এর সাথে কাজ করেন। ২০০৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী মুহতারাম আমীরে জামা‘আত প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিবের মিথ্যা মামলায় গ্রেফতারের সময় তিনি রাজশাহীতে ছিলেন। তাবলীগী ইজতেমায় যোগদানের জন্য এসেছিলেন। তার মেজ জামাতা ‘আত-তাহরীক’ সম্পাদক ড. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হোসাইনের বাসায় ছিলেন। মারকায মসজিদে শুক্রবারে জুম‘আর ছালাত আদায় করেন। পুলিশ, গোয়েন্দা ও সাংবাদিকে তখন মারকায ভর্তি। ইজতেমা বাতিল হওয়ায় শনিবার সকালে তিনি কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। অথচ হলুদ সাংবাদিকতার বশংবদরা সেদিনের পত্রিকায় রিপোর্ট করে যে, ‘তাহরীক সম্পাদকের শ্বশুর গ্রেফতার ও তাহরীক সম্পাদক পলাতক’ এই শিরোনামে। অথচ ততক্ষণে তিনি সুস্থ হালে কুমিল্লা গিয়ে পৌঁছেছেন। তবে বাস্তবে তিনি গ্রেফতার না হ’লেও ১৭ই আগষ্ট’০৫ দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার পর একাধিক দিন কুমিল্লা ডিবি অফিসে মুখোমুখি হ’তে হয়েছে তাঁকে। দিন-রাত অযথা এই বৃদ্ধ মানুষটিকে আটকে রেখে যারপর নেই মানসিক কষ্ট দেওয়া হয়েছে। তাঁর মেজ ছেলে ‘যুবসংঘে’র বর্তমান কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি জামীলুর রহমানকে তো টানা তিন দিন তিন রাত ডিবি কার্যালয়ে আটকে রেখেছিল।

তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কুমিল্লা যেলা ‘আন্দোলন’-এর প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। শারিরীক অক্ষমতার পূর্ব পর্যন্ত কুমিল্লা যেলা ‘আন্দোলন’ ও ‘যুবসংঘে’র বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতেন এবং সাধ্যমত আর্থিক সহযোগিতা করতেন। তিনি বেশ অতিথিপরায়ণ ছিলেন। বিশেষ করে আলেম-ওলামাদের আপ্যায়নে তিনি খুব আনন্দ বোধ করতেন।

সমাজ সংস্কার : আববুর সংস্কারধর্মী মনোভাব ছিল দৃঢ়। তিনি নিজ হাতে বহু উঁচু কবর সমান করেছেন। ঈদগাহের পাকা মিম্বর ভেঙ্গেছেন। শিরক-বিদ‘আতের ব্যাপারে ছিলেন আপোষহীন। একবার বেশ কিছু মেহমানের জন্য মা হালুয়া-রুটি তৈরী করেন। দুর্ভাগ্যক্রমে সেদিন ছিল শবেবরাত। আববু ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে আয়োজন দেখে ভীষণ রাগান্বিত হন। পরে শ্রদ্ধেয় নানার হস্তক্ষেপে ভুলের অবসান হ’লেও বড়দের খেতে দেননি। তিনি ভুলক্রমেও বিদ‘আতী খাবার খেতেন না। কোথাও খেতে বসলে আগে জেনে নিতেন এটা কিসের খাবার। বিদ‘আতের নাম-গন্ধ থাকলেও খাবারের প্লেট ফেলে উঠে আসতেন। তাঁর এই আপোষহীন মনোভাবের কারণে আমাদেরও বহু কটূক্তি শুনতে হ’ত। 

বিনা পয়সার খাদেম : জালসা-মাহফিল করে, খুৎবা দিয়ে, বিয়ে পড়িয়ে, ফৎওয়া- তাযকিয়া ইত্যাদি দিয়ে কোনদিন তিনি পয়সা নেননি। না অভাবে, না স্বাচ্ছন্দ্যে। এমনকি আশির দশকে ঢাকার কয়েক জায়গা থেকে স্থায়ী খতীব হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন এই বলে যে, আমার সমাজ কে সংস্কার করবে? টাকার জন্য ঢাকা যাব, সমাজকে কি দিব? তিনি অত্যন্ত রাগতঃস্বরে বক্তব্য দিতেন। সে সময়ে কাকিয়ারচর গ্রামে সংস্কারের যে ঢেউ লেগেছিল তা অকল্পনীয়। গোটা পাড়ার পুরুষেরা ছালাতের জামা‘আতে হাযির হ’ত। রাস্তায় দোকানপাটে কোন মহিলা বের হ’ত না। সে সময় তিনি এশা ও ফজরের পর মোমবাতি জ্বালিয়ে তাফসীর ও হাদীছের দরস দিতেন। গোটা এলাকায় সুন্নাতের একটা আবহ তৈরি হয়েছিল। গ্রামের প্রবীণ মানুষগুলো এখনো  এসব কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।

লেখনী : ‘সহীহ হাদীসের মানদন্ডে আট রাকআত তারাবীহ’ ও ‘সহীহ হাদীসের মানদন্ডে সালাতুল ঈদাইন’ নামে তার পৃথক দু’টি বই প্রকাশিত হয়েছে (১৯৯৯ইং)। এছাড়া আরও ৪টি পান্ডুলিপি, যেগুলো এক সংস্থায় ছাপাতে দিলে তাঁর নামে না ছাপিয়ে সংস্থার জনৈক ব্যক্তি নিজের নামে ছাপিয়ে  ফেলেন। এই বইগুলো এবং ঐ ব্যক্তির নাম প্রকাশ করতে আববুর নিষেধ রয়েছে। হক্ব-এর দাওয়াতের স্বার্থে তিনি এবিষয়ে চুপ থেকেছেন। তিনি পূর্ণ কুরআনের বঙ্গানুবাদও করেছেন (অপ্রকাশিত)। এছাড়া আক্বীক্বা, আল্লাহ আরশেই বিরাজমান, ছূফী মতবাদ, রাফঊল ইদায়েন, ইমামের পিছনে সূরা ফাতেহা পাঠ ইত্যাদি বিষয়ে কিছু অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি রয়েছে।

শেষ কথা : আববার মৃত্যুর পরদিন ১১ই মে সোমবার সকাল ৯-টায় বাসায় পৌঁছে পিতার হাসিমাখা সুন্দর নিথর মুখখানি দেখে শোকে বিহবল হয়ে পড়ি। আর অঝোর নয়নে কান্নার সাথে মহান আল্লাহর বারগাহে হৃদয়ের গভীর থেকে আকুতি মিশ্রিত দো‘আ করতে থাকি। আববুর প্রাণহীন দেহে হাত বুলাই, আর মর্মে মর্মে অনুভব করি, তিনি চিরদিনের জন্য আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। তার বিদায়ে প্রাণ স্পন্দন যেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। তিনি এখন কোথায় যাবেন? যিনি সব কিছু দেখভাল করতেন, তিনি এখন প্রাণহীন খাঁচা। আমাদের বেদনায় তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। এখন চিন্তা নিজেকে নিয়েই। তিনি এখন আসল ঘরের যাত্রী। মানুষ সব কিছু ছেড়ে কি নিয়ে চলে যায়? কি নিয়ে আসল ঘরে ফিরবে, তা কি কখনো ভেবে দেখে? যদি ভাবত, তবে প্রাণহীন নিথর দেহ থেকে মানুষ শিক্ষা নিত। যে শিক্ষা মানুষকে গর্ব-অহংকারহীন, লোভ-ক্ষোভহীন, হিংসা-বিদ্বেষহীন কোমল, পরিচ্ছন্ন ও উদার মানুষে পরিণত করত ।

পরিশেষে বলব, ‘হে আল্লাহ! তুমি তাকে ক্ষমা কর এবং সুপথপ্রাপ্তদের মধ্যে তাকে উচ্চমর্যাদা দান কর। পিছনে তিনি যাদেরকে ছেড়ে গেলেন, তাদের মধ্যে তুমিই তার প্রতিনিধি হও। হে বিশ্বচরাচরের পালনকর্তা! তুমি আমাদেরকে ও তাকে ক্ষমা কর। তুমি তার জন্য তার কবরকে প্রশস্ত করে দাও এবং সেটিকে তার জন্য আলোকিত করে দাও’ (মুসলিম)। -আমীন! ছুম্মা আমীন!!

 

HTML Comment Box is loading comments...