সাময়িক প্রসঙ্গ

ইসরাঈলকে শত কোটি ডলারের অস্ত্র এবং আইএস’র পরাশক্তি হয়ে ওঠা

জামাল উদ্দীন বারী

‘ইসলামিক স্টেট’ (আইএস) যখন ইরাক এবং সিরিয়ায় একের পর এক শহর ও গুরুত্বপূর্ণ জনপদ দখল করে নিচ্ছে, তখন সঊদী নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনী ইয়েমেনের হাওছী বিদ্রোহীদের দমনের নামে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। দেড় মাসের বেশি সময় ধরে পরিচালিত বিমান হামলায় হাওছীদের তেমন বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে, এমন কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে ইরাক সীমান্তের রামাদি শহরটি আইএস যোদ্ধারা দখল করে নিয়েছে। ইতিপূর্বে সিরিয়ার ঐতিহাসিক নগরী পালমিরাও আইএসের দখলে চলে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে তার বশংবদ শক্তি গুলো আইএসবিরোধী তৎপরতা চালিয়ে গেলেও, আইএসের অগ্রযাত্রা অব্যাহত আছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে আইএস-এর খিলাফত রাষ্ট্রের ঘোষণার পর থেকেই এর সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোপন এজেন্ডা জড়িত থাকার যে অভিযোগ উঠছিল, এখন তা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে পড়ছে।

ফিলিস্তীনের গাজা উপত্যকা গত ৮ বছর ধরে ইসরাঈলের দ্বারা অবরুদ্ধ এর মধ্যেই অন্তত ৩ বার ইসরাঈলী বিমান হামলায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যার শিকার হয়েছে গাজানরা। হাযার হাযার টন বোমা ফেলে গাজা শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার পরও হামাস মিলিশিয়াদের নেটওয়ার্ক ও শক্তি-সামর্থ্য ধ্বংস করতে পারেনি ইসরাঈল। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ইসরাঈলী গণহত্যায় হাযার হাযার ফিলিস্তীনি নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছিল। তবে হামাসের জানবাজ প্রতিরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য অর্জন না করেই আইডিএফ সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল ইসরাঈল। এরই মধ্যে বছর পেরিয়ে গেলেও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে গাজা নগরীর পুনর্গঠনের কোন উদ্যোগই দেখা যাচ্ছে না। বিভিন্ন দাতা সংস্থা এবং পশ্চিমা দেশগুলো গাজার পুনর্গঠনে যে সব সাহায্য-সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার ভগ্নাংশও ছাড় করা হয়নি। স্বদেশে পরবাসী, স্বজন হারানো ফিলিস্তীনিদের ভাগ্য নিয়ে পুরো বিশ্বসম্প্রদায় যেন এক নির্মম তামাশায় লিপ্ত রয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, অর্থনৈতিকভাবে স্থবির এবং বেকার জনগোষ্ঠীর উচ্চ হারের ক্ষেত্রে সারাবিশ্বে গাজার অধিবাসীরা শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। গাজার পুরো কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক বর্তমানে কর্মহীন এবং অতি দরিদ্র ও নিরাপত্তাহীনতায় দিনাতিপাত করছে। ইসরাঈলের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা না থাকলে গাজার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখনকার চেয়ে অন্তত চারগুণ বেশি হ’তে পারত বলে সংস্থাটির জরিপ প্রতিবেদনে উলে­খ করা হয়েছে। ইসরাঈলের গাজা আগ্রাসনে ব্যাপকসংখ্যক নিরস্ত্র বেসমারিক নারী, শিশু হতাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিক্ষোভ-প্রতিবাদের মুখেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেকটা মুখে কুলুপ এঁটে থাকলেও বেসামরিক নাগরিক হত্যা কমিয়ে আনতে ইসরাঈলের আন্তরিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল একটি মার্কিন প্রতিবেদনে। তবে সারাবিশ্বে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ফেরিওয়ালা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানায় শ্রমিকদের অধিকার ও কর্মপরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলে জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে দিলেও গাজায় হাযার হাযার ফিলিস্তীনি শিশু ও নারী হত্যার জন্য ইসরাঈলকে কোন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়নি। ইসরাঈলী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা এবং প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গত মাসে মার্কিন সিনেটের স্পিকারের আমন্ত্রণে বক্তৃতা দিয়ে আসলেন। বক্তৃতায় ওবামার মধ্যপ্রাচ্যনীতি বিশেষতঃ ইরানের সাথে শান্তি আলোচনা ও পরমাণু চুক্তিক্ত সম্পর্কে মার্কিন নীতির বিরোধিতা করাই ছিল নেতানিয়াহুর সিনেট ভাষণের মূল উপজীব্য। সে সময় কোন কোন পশ্চিমা মিডিয়া ইসরাঈল ও মার্কিনীদের শর্তহীন পুরনো পিরিতে ফাটল বা দূরত্ব সৃষ্টির আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল।

ইসরাঈলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও নেতানিয়াহুর কট্টর মনোভাবের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইসরাঈলের সম্পর্ককে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। এসব ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ‘লিকুদ পার্টির’ ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন অনেকটা কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছিল। এরই মধ্যে ইসরাঈলের সাধারণ নির্বাচনের বৈতরণী পার হয়ে ‘লিকুদ পার্টি’ ও নেতানিয়াহু আবারো সরকার গঠন করেছে। তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠনের পর ১৭মে নেতানিয়াহু তার পারিষদবর্গকে নিয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জেরুযালেম দিবস পালন করেছেন। ১৯৬৭ সালে ৬ দিনের যুদ্ধে ইসরাঈলী বাহিনী আরব দেশগুলোর বিপুল আয়তনের ভূমি দখল করে নেয়। তবে ৬ দিনের যুদ্ধের  সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের জন্য পবিত্র নগরী বায়তুল মুক্বাদ্দাসের পাদপীঠ পূর্ব জেরুযালেম দখল করে নেয় জায়নিস্ট বাহিনী। রোমানদের হাতে পরাস্ত ও বিতাড়িত হওয়ার পর ২ হাযার বছরের মধ্যে ইহুদীরা আর কখনো জেরুযালেমে প্রবেশ করতে পারেনি। ১৯৪৮ সালে আরবদের জমি দখল করে ইসরাঈল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেও জেরুযালেম নগরী দুইভাগে বিভক্ত ছিল। এর পশ্চিমাংশ নিয়ন্ত্রণ করছিল ইহুদিরা আর বায়তুল মুকাদ্দাসসহ পূর্বাংশ ফিলিস্তীনিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অন্যদিকে ১৯৪৮ সালের পর থেকেই ফিলিস্তীনিরা জেরুযালেম নগরীকে রাজধানী করে ভবিষ্যতের স্বাধীন ফিলিস্তীন রাষ্ট্রের পরিকল্পনা, রূপরেখা ও দাবি প্রকাশ করে আসছে। ৬৭ সালের ৬ দিনের যুদ্ধে পূর্বজেরুযালেম দখল করে নেয়ার পর এ প্রত্যাশা আরো জটিল ও দুরূহ হয়ে ওঠে। মিসরের সিনাই উপত্যকা, অথবা গোলান মালভূমি দখল করে নেয়ার পর মিশর, জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে এসব ভূমি ফেরত দেয়ার শর্তে ইসরাঈলের সাথে এক ধরনের অধীনতামূলক মিত্রতা স্থাপনের দূতিয়ালি করে সফল হয় পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদিরা। কিন্তু মসজিদুল আকসা ও জেরুযালেম নগরীর অধিকৃত অংশ ফিলিস্তীনিদের ফেরত দিয়ে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং টু-নেশন থিউরির আওতায় ইসরাঈল ও ফিলিস্তীনের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পশ্চিমারা কখনো কোন পদক্ষেপই নেয়নি। পারস্য ও রোমান সম্রাটদের নির্যাতন ও বিতাড়নের শিকার হওয়ার আগে থেকেই ইহুদিরা ফিলিস্তিন ত্যাগ করতে শুরু করেছিল। প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে তাদের কোনো রাষ্ট্র ছিল না। তবে শতকরা ১৫ ভাগেরও কম ইহুদি জনসংখ্যার ফিলিস্তীনে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার সাথে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তির ভবিষ্যৎ সাম্রাজ্যবাদি স্বার্থের বীজ বপিত হয়েছিল।

দরিদ্র ফিলিস্তীনিদের জমি দখল করে সৃষ্ট ইসরাঈল কখনো একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিবেশী ও বিশ্বসম্প্রদায় থেকে স্বীকৃতি পায়নি। পাশাপাশি গাজা ও পশ্চিম তীর নিয়ে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দাবির প্রতি বিশ্বসম্প্রদায়ের ব্যাপক সমর্থন থাকলেও গত সাড়ে ৬ দশক ধরে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিটি উদ্যোগ নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দিয়ে ব্যর্থ করে দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা। গণহত্যা, সামাজিক-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক বিপর্যয় সৃষ্টির মধ্য দিয়ে ইসরাঈল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে কয়েক বছর পর পর তারা ফিলিস্তিনি ও আরব প্রতিবেশীদের ওপর বর্বর সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে আসছে। প্রতিটি সামরিক আগ্রাসনেই নতুন নতুন আরব ভূমি দখল নিয়ে নতুন ইহুদি বসতি গড়ে তুলেছে ইসরাঈল। ইসরাঈলের এই দখলবাজি সব সময়ই ইঙ্গ-মার্কিনিদের দ্বারা সমর্থিত ও পুরস্কৃত হয়েছে। ২০০৯ সালে গাজায় ইসরাঈলি হামলার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে পুরস্কার স্বরূপ ইসরাঈল আয়রনডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ শত কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা পেয়েছিল। গত বছর গাজা ধ্বংসের পুরস্কার হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাঈলকে ১.৯ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে। ফিলিস্তিনি ও আরবদের শায়েস্তা করার জন্য ইসরাঈলের নতুন সরকারের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার এটি শুভেচ্ছা পুরস্কার। পুরস্কারের এই বহরে আছে অত্যাধুনিক জঙ্গি বিমান, ১২ হাজার উচ্চক্ষমতার বোমা, ৩ হাজার হেলফায়ার মিসাইল, ৭৫০টি বাঙ্কার ব­াস্টার বোমা এবং জঙ্গি হেলিকপ্টার। সামনের যুদ্ধে হামাসের সুড়ঙ্গপথগুলো ধ্বংস করতে এবং আরব দেশগুলোর মাটির নিচে থাকা ল্যাবরেটরি ও নিরাপদ স্থানগুলো ধ্বংস করতে ২০ ফুট পুরো কংক্রিটের আস্তর ভেদ করে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম এসব বাঙ্কার ব­াস্টার বোমা ইসরাঈলকে দেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রশাসন ইসরাঈলের পক্ষে আরেকটি বড় কাজ করেছে। গত এপ্রিলের শেষ দিকে জাতিসংঘের পারমাণবিক নিরস্ত্রিকরণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারের সম্মেলনের সবচে বড় এজেন্ডা ছিল, মধ্যপ্রাচ্যকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্তক্ত রাখার লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা। পাঁচ বছর পর পর অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে গত ২০ বছর ধরে ইসরাঈল অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু এবারের সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্যের পারমাণবিক ইস্যু ছিল মূল প্রতিপাদ্য, সে হিসাবে এখন পর্যন্ত ইসরাঈলই হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। ইরানসহ বিশ্বের অনেক দেশ ইসরাঈল ও মধ্যপ্রাচ্যকে পরমাণু অস্ত্রমুক্তক্ত করার যে দাবি তুলেছে তাতে ইসরাঈল বেশ অস্বস্তি ও বেকায়দায় পড়েছিল। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার কূটনৈতিক সামর্থ্য, নেটওয়ার্ক ও লবিং ব্যবহার করে ইসরাঈলকে আবারো দায়মুক্তক্ত করল। পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিক্ততে বিশ্বের ১৯১টি দেশ সই করলেও ইসরাঈল এখনো সই করেনি। উপরন্তু দশকের পর দশক ধরে দেশটি আন্তর্জাতিক তদারকি ও জবাবদিহিতার আওতামুক্ত থাকছে। এজন্য ইসরাঈলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সাম্প্রতিক এনপিটি সম্মেলনে মার্কিন প্রশাসন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন। মার্কিনিদের সাথে ইসরাঈলিদের রাজনৈতিক সম্পর্ক কোন আনুষ্ঠানিক ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা বা অর্থনৈতিক লেনদেনের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। মার্কিনি শাসকরা একে শর্তহীন ও অন্তহীন বন্ধুত্ব বলে বর্ণনা করেছেন। একটি যুদ্ধবাজ, দখলবাজ ও সম্প্রসারণবাদি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের সাথে বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তির এই শর্তহীন গাঁটছড়া বর্তমান সভ্যতার সব সমস্যা, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সঙ্কট ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মূল কারণ। দশকের পর দশক ধরে ইসরাঈলকে সমর্থন, পৃষ্ঠপোষকতা, অর্থ, অস্ত্র ও প্রযুক্তিক্ত দিয়ে শক্তিশালী করে তোলার মধ্য দিয়ে মূলত মধ্যপ্রাচ্যকে সব সময় নিরাপত্তাহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করে রাখা হয়েছে। ন্যূনতম চক্ষুলজ্জা, মানবতা ও বিবেকবোধকে বিসর্জন দিয়ে যুদ্ধাপরাধী রাষ্ট্র ইসরাঈলকে আবারো ২ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন অস্ত্র সহায়তার দেয়ার মধ্য দিয়ে এই অনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা পরিমাপ করা যায়। যেখানে ইসরাঈলি ধ্বংসযজ্ঞে গাজা নগরী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ অপসারণ করে ফিলিস্তীনি শিশুদের স্কুলগুলো, হাসপাতালগুলো, উদ্বাস্ত্ত মানুষের বাড়িগুলো বাসযোগ্য করে তোলার জন্য বিশ্বমোড়ল মার্কিনিদের কোন আগ্রহ নেই। ভূঁইফোড় দানবীয় শক্তি ইসরাঈলকে আরো বেশি শক্তিশালী, উন্মত্ত ও ধ্বংসাত্মক শক্তিতে পরিণত করতে শত শত কোটি ডলারের অতিরিক্ত সামরিক সহায়তার প্রতি তাদের বেশি আগ্রহ। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর ভূমিকাও ক্রমে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে। মূলতঃ মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাব্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ঐক্যপ্রক্রিয়াকে ঠেকিয়ে তদস্থলে পারস্পরিক অবিশ্বাস, জাতিগত ও ধর্মীয় দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও জঙ্গিবাদ উস্কে দিয়ে ইসরাঈলকে স্থায়ীভাবে একটি অপরাজেয় শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত রাখতেই এসব দেশকে ব্যবহার করছে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদিরা। আল-কায়েদার মতো শেষ পর্যন্ত আইএসও ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে পরিণত হয় কি-না, তা দেখার জন্য আমাদের হয়তো আরো কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে। আল-কায়েদার একটি উপদল আল-নুসরা ফ্রন্টের লোকেরা সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পতনের জন্য অস্ত্র ধারণ করলে আরব দেশগুলো তাদের হাতে শত শত কোটি ডলার ফান্ড, কোটি কোটি ডলারের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র এবং প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম তুলে দেয়। ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে মধ্যপ্রাচ্যসহ ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে মুসলমান-অমুসলমান তরুণ-তরুণীরা আইএস যোদ্ধা হিসাবে যোগদান করায় তা এখন একটি অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে। সিরিয়ার পালমিরা এবং ইরাকের রামাদি দখলে নেয়ার পর এখন তারা বাগদাদ দখলের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বলে জানা যায়। তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনীর সামরিক অভিযানকে লোক দেখানো বলে মনে করছেন অনেকে। আইএস যোদ্ধারা ভিন্ন মতাবলম্বী মুসলমানদের নির্বিচার ও নির্মমভাবে হত্যা করে সারাবিশ্বে ইসলামী শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে ভীতিকর ইমেজ সৃষ্টি করছে এদিকে। অন্যদিকে ইসরাঈলের হাতে ফিলিস্তীনের ধ্বংস, মুসলমান শিশু, নারী ও নিরস্ত্র মানুষ হত্যার ব্যাপারে বিস্ময়কর নিরবতা নালিশ করে যাচ্ছে। ওদিকে আইএস জুজর ভয় দেখিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সঊদী আরবসহ আরব দেশগুলোর কাছে হাযার হাযার কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি করছে। তবে সবচেয়ে স্পেশাল ও বেশি ধ্বংসক্ষমতা সম্পন্ন অস্ত্রগুলো ইসরাঈলকে দেয়া হচ্ছে বিনামূল্যে। আইএস সৃষ্টির পেছনে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদি শক্তির লক্ষ্য যাই হোক, এ শক্তির পেছনে আরব জনগণের সমর্থন এবং এর নেতৃত্বে উপযুক্ত ব্যক্তিবর্গ এলে সত্যিকার তা এক সময় আরব ভূ-খ-রে রাজনৈতিক মানচিত্র পাল্টে ফেলার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। সে সময় সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ এর বর্তমান পৃষ্ঠপোষকদের হাতে নাও থাকতে পারে। রামাদি দখলের সময় ইরাকের সরকারি বাহিনী এবং মার্কিন বাহিনী শুধু আত্মরক্ষার ভূমিকায় ছিল। মার্কিন বাহিনীর এই পলায়নকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় কৌশলগত পরাজয় হিসাবে গণ্য করছেন কেউ কেউ।

[সংকলিত- দৈনিক ইনকিলাব ২৭ই মে ২০১৫]

 

HTML Comment Box is loading comments...