প্রবন্ধ


জামা‘আতবদ্ধ জীবন যাপনের আবশ্যকতা

অধ্যাপক, ড. হাফেয বিন মুহাম্মাদ আল-হাকামী
হাদীছ বিভাগ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।

অনুবাদ : মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
গবেষণা সহকারী, হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।

ভূমিকা :

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর নিকটে সাহায্য চাই এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। আমরা আমাদের হৃদয়ের অনিষ্টতা ও কাজ-কর্মের অপরাধ হ’তে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই। আল্লাহ যাকে হেদায়াত দান করেন, তাকে পথভ্রষ্টকারী কেউ নেই। আর তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তাকে হেদায়াতকারী কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত (প্রকৃত) কোন মা‘বূদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রতি রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন। আরো শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর পরিবার-পরিজন, ছাহাবায়ে কেরাম এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত যারা যথার্থভাবে তাঁদের অনুসরণ করবে তাদের উপর।

হামদ ও ছানার পর, রাসূল (ছাঃ)-এর চোখের সামনে প্রথম যে জামা‘আতটি গঠিত হয়েছিল, অতঃপর তাঁর খলীফাগণ যে জামা‘আতকে দিকনির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে সযত্নে লালন করেছিলেন, সেই জামা‘আতই ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ ফুটিয়ে তোলে। এ জামা‘আত ইসলামকে সানন্দে গ্রহণ করেছিল এবং সকল বিষয়ে সন্তুষ্টচিত্তে তাকে (ইসলাম) কর্তৃত্বের আসনে বসিয়েছিল। ফলে এ জামা‘আতটি ইসলামের ছায়াতলে সুখময় জীবন যাপন করেছিল। এভাবে এ জামা‘আতটি এমন পবিত্র জীবন কাটিয়েছে, যার অঙ্গীকার তার প্রতিপালক করেছেন এ বাণীতে, مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً-  ‘মুমিন অবস্থায় পুরুষ অথবা নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকর্ম করবে, অবশ্যই আমরা তাকে আনন্দময় জীবন দান করব’ (নাহল ১৬/৯৭)। আর এ জামা‘আতটি মর্যাদার সাথে জীবন অতিবাহিত করেছে, যা তার প্রতিপালক তার জন্য লিপিবদ্ধ করেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُوْلِهِ وَلِلْمُؤْمِنِيْنَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ  ‘শ্রেষ্ঠত্ব তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মুমিনদের জন্য। কিন্তু মুনাফিকরা জানে না’ (মুনাফিকূন ৬৩/৮)

ঐ মুমিন জামা‘আতের সম্মানে পৃথিবীর সকল জাতি মাথা নত করেছিল। যার শীর্ষে ছিল পারস্য ও রোম। তার (জামা‘আত) রাজত্ব প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং তার জন্য মু‘জিযা সংঘটিত হয়েছিল। যে ব্যাপারে রাসূল (ছাঃ) (আহযাবের যুদ্ধের দিন পরিখা খননের সময়) সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন।[1]

আল্লাহ যতদিন চাইলেন মুসলিম উম্মাহর পরবর্তী প্রজন্ম ততদিন প্রথম জামা‘আতের পথে চলে উক্ত সম্মান ও বিশাল রাজত্বের উত্তরাধিকারী হ’ল। এরপর পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ব্যাধিতে মুসলিম জাতি আক্রান্ত হ’ল। ফলে মুসলমানদের হৃদয়ে দুনিয়ার মোহ বাসা বাঁধল এবং তারা তাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ন্যায় দুনিয়া লাভের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হ’ল। এর ফলে তাদের মধ্যে মতভেদ, দলাদলি ও ভাঙ্গন সৃষ্টি হ’ল। এগুলো মুসলিম জাতির প্রভাব-প্রতিপত্তিকে দুর্বল করে দিল এবং তাদেরকে পদানত করতে শত্রুদেরকে উৎসাহ যোগাল। অতঃপর শত্রুরা মুসলমানদের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ল এবং মুসলমানদের কর্তৃত্ব হরাস পেয়েছিল, এমন কিছু অঞ্চল শত্রুরা পুনরুদ্ধার করতে লাগল। তারপর তারা তাদের বিরুদ্ধে তাদের প্রাণকেন্দ্রে যুদ্ধ শুরু করল। আর আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক শতাব্দীতে মুসলিম উম্মাহর জন্য এমন ব্যক্তিকে পাঠান, যিনি তার দ্বীনকে সংস্কার করেন এবং মুসলমানদেরকে অধঃপতন থেকে নবজাগৃতির পথে নিয়ে যান। ফলে মুসলিম উম্মাহ প্রতিশোধ গ্রহণ করে এবং তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধার করে।

বর্তমান যুগে দ্বীনী বিষয়ে মুসলিম উম্মাহর শিথিলতা প্রদর্শন এবং পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দেওয়া চরম পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। এজন্য আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর তাদের শত্রুদের কর্তৃত্ব চাপিয়ে দিয়েছেন এবং তারা তাদেরকে এমন লাঞ্ছনা ও অপমানের মুখোমুখি করেছে, তাদের সুদীর্ঘ ইতিহাসে যার কোন নযীর নেই। আর এটিই আল্লাহর বান্দাদের ব্যাপারে তাঁর সার্বজনীন নীতি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,إِنَّ اللهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوْا مَا بِأَنْفُسِهِمْ  ‘আল্লাহ নিজে কোন জাতির অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে’ (রা‘দ ১৩/১১)

মুসলিম উম্মাহকে দ্বীনের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য এ অবস্থা মুসলমানদের সুদৃঢ় ঐক্য এবং তরুণদের সীমাহীন প্রচেষ্টার দাবী করছে। কেননা  জাতির ঘাড়ে চেপে বসা এ লাঞ্ছনা দূর করা এগুলোর সাথে সম্পৃক্ত। যেমন এ বিষয়ে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সংবাদ দিয়েছেন, যিনি নিজ থেকে কোন কথা বলতেন না। ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,

إِذَا تَبَايَعْتُمْ بِالْعِينَةِ وَأَخَذْتُمْ أَذْنَابِ الْبَقَرِ وَرَضِيتُمْ بِالزَّرْعِ وَتَرَكْتُمُ الْجِهَادَ، سَلَّطَ اللهُ عَلَيْكُمْ ذُلاًّ لاَ يَنْزِعُهُ حَتَّى تَرْجِعُوا إِلَى دِينِكُمْ-

‘যখন তোমরা প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ধারে অধিক মূল্যে ক্রয়-বিক্রয় করবে, গরুর লেজ অাঁকড়ে ধরবে, কৃষি কাজে সন্তুষ্ট থাকবে এবং জিহাদ পরিত্যাগ করবে, তখন আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের উপর এমন লাঞ্ছনাদায়ক ও অপমানকর অবস্থা চাপিয়ে দিবেন, যা তোমরা তোমাদের দ্বীনে ফিরে না আসা পর্যন্ত তিনি তোমাদের থেকে দূর করবেন না’।[2]

প্রথম জামা‘আত যার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল সেদিকে ফিরে আসার মাধ্যমেই মুসলিম উম্মাহ তার দ্বীনের দিকে ফিরে আসতে সক্ষম হবে। কারণ প্রথম যুগের মুসলমানেরা যার মাধ্যমে সংশোধিত হয়েছিল, তা ব্যতীত এ উম্মতের পরবর্তীরা সংশোধিত হবে না। আর রাসূল (ছাঃ) এমন ফিতনা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, যা মুসলিম উম্মাহর উপর দিয়ে বয়ে যাবে। আর তিনি জামা‘আত অাঁকড়ে ধরাকে এ থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। জামা‘আত অাঁকড়ে ধরাকে উৎসাহিত করে এবং তা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে সতর্ক করে বহু হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। বিদ্বানগণ বর্ণনা করেছেন যে, হাদীছে বর্ণিত জামা‘আত দ্বারা সেই জামা‘আতই উদ্দেশ্য, যার উপর প্রথম জামা‘আত প্রতিষ্ঠিত ছিল।

জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরা সম্পর্কে বর্ণিত হাদীছ সমূহ :

1- عَنْ حُذَيْفَةَ بْنِ الْيَمَانِ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: كَانَ النَّاسُ يَسْأَلُوْنَ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم  عَنِ الْخَيْرِ، وَكُنْتُ أَسْأَلُهُ عَنِ الشَّرِّ مَخَافَةَ أَنْ يُدْرِكَنِىْ فَقُلْتُ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! إِنَّا كُنَّا فِىْ جَاهِلِيَّةٍ وَشَرٍّ فَجَاءَنَا اللهُ بِهَذَا الْخَيْرِ، فَهَلْ بَعْدَ هَذَا الْخَيْرِ مِنْ شَرٍّ؟ قَالَ: نَعَمْ. قُلْتُ: وَهَلْ بَعْدَ ذَلِكَ الشَّرِّ مِنْ خَيْرٍ؟ قَالَ: نَعَمْ، وَفِيْهِ دَخَنٌ؟  قُلْتُ: وَمَا دَخَنُهُ؟ قَالَ: قَوْمٌ يَهْدُوْنَ بِغَيْرِ هَدْيِيْ، تَعْرِفُ مِنْهُمْ وَتُنْكِرُ. قُلْتُ: فَهَلْ بَعْدَ ذَلِكَ الْخَيْرِ مِنْ شَرٍّ؟ قَالَ: نَعَمْ، دُعَاةٌ عَلَى أَبْوَابِ جَهَنَّمَ، مَنْ أَجَابَهُمْ إِلَيْهَا قَذَفُوْهُ فِيْهَا. قُلْتُ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! صِفْهُمْ لَنَا. قَالَ: هُمْ مِنْ جِلْدَتِنَا، وَيَتَكَلَّمُوْنَ بِأَلْسِنَتِنَا. قُلْتُ: فَمَا تَأْمُرُنِىْ إِنْ أَدْرَكَنِىْ ذَلِكَ؟ قَالَ: تَلْزَمُ جَمَاعَةَ الْمُسْلِمِيْنَ وَإِمَامَهُمْ. قُلْتُ : فَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُمْ جَمَاعَةٌ وَلاَ إِمَامٌ؟ قَالَ: فَاعْتَزِلْ تِلْكَ الْفِرَقَ كُلَّهَا، وَلَوْ أَنْ تَعَضَّ بِأَصْلِ شَجَرَةٍ، حَتَّى يُدْرِكَكَ الْمَوْتُ، وَأَنْتَ عَلَى ذَلِكَ-

১. হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকজন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে কল্যাণের বিষয়াবলী জিজ্ঞেস করত, আর আমি তাঁকে অকল্যাণের বিষয়াবলী জিজ্ঞেস করতাম এ ভয়ে যে, যেন অকল্যাণ আমাকে না পেয়ে বসে। একদা আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমরা তো অজ্ঞতা ও অকল্যাণের মাঝে ছিলাম। এরপর আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে এ কল্যাণের মাঝে নিয়ে আসলেন। এ কল্যাণের পর আবারও কী অকল্যাণ আসবে? তিনি উত্তরে বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, এ অকল্যাণের পর কী আবার কল্যাণ আসবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তবে এর মধ্যে কিছুটা ধূম্রজাল থাকবে। আমি বললাম, এর ধূম্রজাল কেমন? তিনি বললেন, তারা এমন এক সম্প্রদায় যারা আমার হেদায়াত ব্যতীত অন্য পথে পরিচালিত হবে। তাদের পক্ষ থেকে সম্পাদিত ভাল কাজও দেখবে এবং মন্দ কাজও দেখবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সে কল্যাণের পর কী আবার অকল্যাণ আসবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। এমন এক সম্প্রদায় আসবে যারা জাহান্নামের দিকে আহবান করবে। যে ব্যক্তি তাদের ডাকে সাড়া দিবে তারা তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আপনি আমাদের কাছে তাদের কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করুন। তিনি বললেন, তারা আমাদেরই সম্প্রদায়ভুক্ত এবং আমাদের ভাষাতেই কথা বলবে। আমি বললাম, যদি এমন অবস্থা আমাকে পেয়ে বসে তাহ’লে আমাকে কী করার নির্দেশ দেন? তিনি বললেন, তুমি মুসলমানদের জামা‘আত ও তাদের ইমামকে অাঁকড়ে ধরবে। আমি বললাম, তখন যদি মুসলমানদের কোন জামা‘আত ও ইমাম না থাকে? তিনি বললেন, ‘তখন সকল দলমত ত্যাগ করে সম্ভব হ’লে কোন গাছের শিকড় কামড়িয়ে পড়ে থাকবে, যতক্ষণ না সে অবস্থায় তোমার মৃত্যু উপস্থিত হয়’।[3]

ছহীহ মুসলিমে এসেছে,

قُلْتُ فَهَلْ مِنْ وَرَاءِ ذَلِكَ الْخَيْرِ شَرٌّ قَالَ: نَعَمْ. قُلْتُ: كَيْفَ؟ قَالَ: يَكُوْنُ بَعْدِىْ أَئِمَّةٌ لاَ يَهْتَدُوْنَ بِهُدَاىَ وَلاَ يَسْتَنُّوْنَ بِسُنَّتِىْ وَسَيَقُوْمُ فِيْهِمْ رِجَالٌ قُلُوْبُهُمْ قُلُوْبُ الشَّيَاطِيْنِ فِىْ جُثْمَانِ إِنْسٍ. قَالَ: قُلْتُ: كَيْفَ أَصْنَعُ يَا رَسُوْلَ اللهِ إِنْ أَدْرَكْتُ ذَلِكَ، قَالَ: تَسْمَعُ وَتُطِيْعُ لِلأَمِيْرِ وَإِنْ ضُرِبَ ظَهْرُكَ وَأُخِذَ مَالُكَ فَاسْمَعْ وَأَطِعْ-

‘আমি বললাম, এ কল্যাণের পর কী আর কোন অকল্যাণ থাকবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, অবস্থা কেমন হবে? তিনি বললেন, আমার পরে এমন একদল শাসক হবে, যারা আমার হেদায়াত ও সুন্নাত অনুযায়ী চলবে না। তাদের মধ্যে এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটবে, যাদের মানব দেহে শয়তানের হৃদয় বিরাজ করবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! যদি আমি সেই অবস্থার সম্মুখীন হই তাহ’লে কী করব? তিনি বললেন, ‘তুমি আমীরের কথা শুনবে এবং তার আনুগত্য করবে। যদিও তোমার পিঠে চাবুকের আঘাত পড়ে এবং তোমার সম্পদ কেড়ে নেয়া হয়। তবুও তার কথা শুনবে এবং তার আনুগত্য করবে’।[4]

২- عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ: نَضَّرَ اللهُ امْرَأً سَمِعَ مَقَالَتِى فَوَعَاهَا وَحَفِظَهَا وَبَلَّغَهَا، فَرُبَّ حَامِلِ فِقْهٍ إِلَى مَنْ هُوَ أَفْقَهُ مِنْهُ. ثَلاَثٌ لاَ يُغَلُّ عَلَيْهِنَّ قَلْبُ مُسْلِمٍ إِخْلاَصُ الْعَمَلِ لِلَّهِ وَمُنَاصَحَةُ أَئِمَّةِ الْمُسْلِمِيْنَ وَلُزُوْمِ جَمَاعَتِهِمْ فَإِنَّ الدَّعْوَةَ تُحِيْطُ مِنْ وَرَائِهِمْ-

২. আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি নবী (ছাঃ) হ’তে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ ঐ ব্যক্তির মুখমন্ডল উজ্জ্বল করুন, যে আমার কাছ থেকে একটি হাদীছ শুনে তা বুঝে মুখস্থ করে এবং অন্যের নিকটে পৌঁছিয়ে দেয়। অনেক ফিকহের বাহক আছে, যে তার থেকে বড় ফকীহ ব্যক্তির কাছে তা পৌঁছিয়ে দেয়। তিনটি আচরণ এমন আছে যা পালনে কোন মুসলমানের অন্তর বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হয় না। (১) আল্লাহর জন্য খাঁটি মনে আমল করা (২) মুসলিম শাসকগোষ্ঠীকে উপদেশ দেওয়া এবং (৩) তাদের জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরা। কেননা তাদের দো‘আ তাদেরকে চারদিক থেকে হেফাযত করবে’।[5]

3- عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبَانَ بْنِ عُثْمَانَ عَنْ أَبِيْهِ أَنَّ زَيْدَ بْنَ ثَابِتٍ خَرَجَ مِنْ عِنْدِ مَرْوَانَ نَحْواً مِنْ نِصْفِ النَّهَار،ِ فَقُلْنَا: مَا بَعَثَ إِلَيْهِ السَّاعَةَ إِلاَّ لِشَىْءٍ سَأَلَهُ عَنْهُ، فَقُمْتُ إِلَيْهِ فَسَأَلْتُهُ فَقَالَ: أَجلْ سَأَلَنَا عَنْ أَشْيَاءَ سَمِعْتُهَا مِنْ رَّسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم، سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُوْلُ: نَضَّرَ اللهُ امْرَءاً سَمِعَ مِنَّا حَدِيْثاً فَحَفِظَهُ حَتَّى يُبَلِّغَهُ غَيْرَهُ، فَإِنَّهُ رُبَّ حَامِلِ فِقْهٍ لَيْسَ بِفَقِيْهٍ، وَرُبَّ حَامِلِ فِقْهٍ إِلَى مَنْ هُوَ أَفْقَهُ مِنْهُ، ثَلاَثُ خِصَالٍ لاَ يَغِلُّ عَلَيْهِنَّ قَلْبُ مُسْلِمٍ أَبَداً إِخْلاَصُ الْعَمَلِ لِلَّهِ، وَمُنَاصَحَةُ وُلاَةِ الأَمْرِ، وَلُزُوْمُ الْجَمَاعَةِ، فَإِنَّ دَعَوَتَهُمْ تُحِيْطُ مِنْ وَرَائِهِمْ، وَقَالَ: مَنْ كَانَ هَمُّهُ الآخِرَةَ جَمَعَ اللهُ شَمْلَهُ وَجَعَلَ غِنَاهُ فِىْ قَلْبِهِ وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِىَ رَاغِمَةٌ، وَمَنْ كَانَتْ نِيَّتُهُ الدُّنْيَا فَرَّقَ اللهُ عَلَيْهِ ضَيْعَتَهُ وَجَعَلَ فَقْرَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ وَلَمْ يَأْتِهِ مِنَ الدُّنْيَا إِلاَّ مَا كُتِبَ لَهُ-

৩. আব্দুর রহমান ইবনু আবান ইবনে ওছমান (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি তার পিতা হ’তে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, দুপুরের দিকে যায়েদ ইবনু ছাবেত (রাঃ) মারওয়ানের নিকট থেকে বেরিয়ে এলেন। আমরা বললাম, নিশ্চয়ই তিনি তাঁকে কিছু জিজ্ঞেস করার জন্য এমন সময় ডেকে পাঠিয়েছিলেন। আমি তাঁর কাছে গিয়ে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, হ্যাঁ, তিনি আমাকে এমন কিছু বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন যা আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে শুনেছি। আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘আল্লাহ তা‘আলা ঐ ব্যক্তির মুখমন্ডল উজ্জ্বল করুন, যে আমাদের নিকট থেকে একটি হাদীছ শুনে তা বুঝে মুখস্থ করেছে। অতঃপর অন্যের নিকট তা পৌঁছিয়ে দিয়েছে। কেননা অনেক ফিকহের কথা বহনকারী আছে, যে নিজে ফকীহ নয়। আবার অনেক ফিকহের কথা বহনকারী আছে, যে তার থেকেও বড় ফকীহর কাছে তা পৌঁছিয়ে দেয়। তিনটি আচরণ এমন আছে যা পালনে কোন মুসলমানের অন্তর কস্মিনকালেও বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হয় না। (১) আল্লাহর জন্য খাঁটি মনে আমল করা (২) শাসকগোষ্ঠীকে উপদেশ দেওয়া এবং (৩) জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরা। কেননা তাদের দো‘আ তাদেরকে চারদিক থেকে বেষ্টন করে রাখে’। তিনি আরো বলেছেন, ‘যার লক্ষ্য হবে আখিরাত আল্লাহ তা‘আলা তার বিচ্ছিন্ন সকল কিছু একত্রিত করে দিবেন, তার অন্তরে ঐশ্বর্য সৃষ্টি করে দিবেন এবং সে অনাগ্রহী হওয়া সত্ত্বেও দুনিয়া (দুনিয়ার সম্পদ) তার আছে আসবে। আর যার নিয়ত হবে দুনিয়া লাভ, আল্লাহ তার সহায়-সম্পত্তি ছিন্নভিন্ন করে দিবেন, তার অভাব-অনটন তার দু’চোখের মাঝে স্থাপন করবেন এবং দুনিয়া থেকে সে ততটুকুই লাভ করবে যতটুকু তার জন্য বরাদ্দ আছে’।[6]

৪- عَنْ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ يَخْطُبُ النَّاسَ بِالْخَيْفِ نَضَّرَ اللهُ عَبْداً سَمِعَ مَقَالَتِى فَوَعَاهَا ...الحديث-

৪. জুবায়ের ইবনু মুত্বঈম (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি (মিনার) মসজিদে খায়ফে রাসূল (ছাঃ)-কে খুৎবারত অবস্থায় বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা ঐ বান্দার মুখ উজ্জ্বল করুন, যে আমাদের থেকে একটি হাদীছ শুনে অতঃপর বুঝে মুখস্থ করে...’ অতঃপর পূর্বের হাদীছের ন্যায় বর্ণনা করেন।[7]

5- عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ، اَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عليه وسلم قَالَ: عَلَيْكُمْ بِالْجَمَاعَةِ وَإِيَّاكُمْ وَالْفُرْقَةَ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ مَعَ الْوَاحِدِ وَهُوَ مِنَ الِاثْنَيْنِ أَبْعَدُ، وَمَنْ أَرَادَ بُحْبُوْحَةَ الْجَنَّةِ فَعَلَيْهِ بِالْجَمَاعَةِ-

৫. ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘অবশ্যই তোমরা জামা‘আতবদ্ধ হয়ে বসবাস করবে এবং বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে সতর্ক থাকবে। কারণ শয়তান একজনের সাথে থাকে এবং দু’জন থেকে সে অনেক দূরে থাকে। যে ব্যক্তি জান্নাতের মধ্যস্থলে থাকতে চায়, সে যেন অবশ্যই জামা‘আতবদ্ধ জীবন যাপন করে’।[8]

৬- عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيْرٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلماَلْجَمَاعَةُ رَحْمَةٌ وَالْفُرْقَةُ عَذَابٌ-

৬. নু‘মান ইবনু বাশীর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘জামা‘আতবদ্ধভাবে বসবাস রহমত স্বরূপ এবং বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস আযাব স্বরূপ’।[9]

7- عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا، أَنَّ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ: إِنَّ اللهَ لاَ يَجْمَعُ أُمَّةَ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم عَلَى ضَلاَلَةٍ، وَيَدُ اللهِ عَلَي الْجَمَاعَةِ، وَمَنْ شَذَّ شَذَّ فِي النَّارِ-

৭. আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা উম্মতে মুহাম্মাদীকে গোমরাহীর উপরে ঐক্যবদ্ধ করবেন না। আর জামা‘আতের উপর আল্লাহর হাত রয়েছে। যে ব্যক্তি (মুসলিম জামা‘আত হ’তে) বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল, সে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় জাহান্নামে গেল’।[10]

হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, হাকেম এবংতিরমিযীতে ইবনু ওমর থেকে মারফূ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘এই উম্মত কখনো গোমরাহীর উপর ঐক্যবদ্ধ হবে না’। হাকেম নিশাপুরী এ হাদীছের শাহেদ (সমর্থক হাদীছ) উপস্থাপন করেছেন। এ হাদীছের পক্ষে মু‘আবিয়া (রাঃ) বর্ণিত নিম্নের হাদীছ দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যেতে পারে-

عَنْ مُعَاوِيَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ، قَالَ: قَالَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم : لاَ يَزَالُ مِنْ أُمَّتِى أُمَّةٌ قَائِمَةٌ بِأَمْرِ اللهِ، لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ وَلاَ مَنْ خَالَفَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللهِ-

মু‘আবিয়া (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘ক্বিয়ামত পর্যন্ত আমার উম্মতের মধ্য থেকে একটি দল আল্লাহর সত্য দ্বীনের উপরে প্রতিষ্ঠিত থাকবে। আল্লাহর নির্দেশ (ক্বিয়ামত) আসা পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধবাদী ও অপদস্তকারীরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না’।[11] এ হাদীছ থেকে দলীল গ্রহণের দিক হ’ল- কিয়ামত পর্যন্ত এই হক্বপন্থী দলের টিকে থাকা ভ্রষ্টতার উপরে তাদের ঐক্যবদ্ধ না হওয়ার প্রমাণ বহন করে।

অতঃপর হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, ইয়াসীর ইবনু আমর হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আমরা আবু মাসঊদকে (আনছারী) বিদায় জানানোর জন্য তার সাথে বের হ’লাম। তিনি কংকরময় পথ ধরে চলা শুরু করলেন। এরপর তিনি এক বাগানে প্রবেশ করে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সম্পন্ন করলেন। অতঃপর তিনি ওযূ করে মোজার উপরে মাসাহ করলেন এবং বাগান থেকে এমন অবস্থায় বের হ’লেন যে, তার দাড়ি থেকে পানি ঝরছিল। আমরা তাকে বললাম, আমাদের কিছু উপদেশ দিন। কারণ লোকেরা ফিতনায় পতিত হয়েছে। আমরা জানি না আপনার সাথে আর সাক্ষাৎ হবে কি-না? তখন তিনি বললেন, اتَّقُوا اللهَ وَاصْبِرُوْا، حَتَّى يَسْتَرِيْحَ بِرٌّ، أَوْ يُسْتَرَاحَ مِنْ فَاجِرٍ، وَعَلَيْكُمْ بِالْجَمَاعَةِ، فَإِنَّ اللهَ لاَ يَجْمَعُ أُمَّةَ مُحَمَّدٍ عَلَى ضَلاَلَةٍ-  না সৎ ব্যক্তিগণ বিশ্রাম গ্রহণ করে অথবা তারা পাপাচারী ব্যক্তি থেকে রক্ষা পায়। আর তোমাদের জন্য আবশ্যক হ’ল জামা‘আতবদ্ধ  যাপন করা। কারণ আল্লাহ তা‘আলা উম্মতে মুহাম্মাদীকে গোমরাহীর উপরে ঐক্যবদ্ধ করবেন না’।[12]

নাঈম ইবনু আবী হিন্দ সূত্রে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, একদা আবু মাসঊদ কূফা নগরী হ’তে বের হয়ে বললেন, عَلَيْكُمْ بِالْجَمَاعَةِ فَإِنَّ اللهَ لَمْ يَكُنْ لِيَجْمَعَ أُمَّةَ مُحَمَّدٍ عَلَى ضَلاَلَةٍ   ‘তোমাদের জন্য আবশ্যক হ’ল জামা‘আতবদ্ধভাবে জীবন যাপন করা। কেননা আল্লাহ তা‘আলা উম্মতে মুহাম্মাদীকে কখনো গোমরাহীর উপরে ঐক্যবদ্ধ করবেন না’।[13]

৮- عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُماَ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم: يَدُ اللهِ مَعَ الْجَمَاعَةِ-

৮. ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘জামা‘আতের উপরে আল্লাহর হাত রয়েছে’।[14] হাকেম আব্দুর রাযযাক এর সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, لَا يَجْمَعُ اللهُ أُمَّتِي عَلَى ضَلَالَةٍ أَبَدًا، وَيَدُ اللهِ عَلَى الْجَمَاعَةِ  ‘আল্লাহ তা‘আলা আমার উম্মতকে কখনো গোমরাহীর উপরে ঐক্যবদ্ধ করবেন না। আর জামা‘আতের উপরে আল্লাহর হাত রয়েছে’।[15]

৯- عَنْ أَبِى مَالِكٍ الأَشْعَرِىِّ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ، قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم: إِنَّ اللهَ أَجَارَكُمْ مِنْ ثَلاَثِ خِلاَلٍ، أَنْ لاَ يَدْعُوَ عَلَيْكُمْ نَبِيُّكُمْ فَتَهْلِكُوْا جَمِيْعًا، وَأَنْ لاَ يَظْهَرَ أَهْلُ الْبَاطِلِ عَلَى أَهْلِ الْحَقِّ، وَأَنْ لاَ تَجْتَمِعُوْا عَلَى ضَلاَلَةٍ-

৯. আবু মালেক আশ‘আরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে তিনটি বিষয় থেকে রক্ষা করেছেন। ১. তোমাদের নবী তোমাদের বিরুদ্ধে বদদো‘আ করবেন না, যার ফলে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে ২. বাতিলপন্থীরা হক্বপন্থীদের উপরে বিজয় লাভ করতে পারবে না এবং ৩. তোমরা গোমরাহীর উপরে ঐক্যবদ্ধ হবে না’।[16]

কা‘ব ইবনু আছেম হ’তে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, إِنَّ اللهَ تَعَالَى قَدْ أَجَارَ لِيْ عَلَى أُمَّتِي مِنْ ثَلَاثٍ: لَا يَجُوْعُوْا، وَلَا يَجْتَمِعُوْا عَلَى ضَلَالَةٍ، وَلَا يُسْتَبَاحُ بَيْضَةُ الْمُسْلِمِيْنَ-    মনে করা হবে না’।[17]

অন্য একটি সূত্রে কা‘ব ইবনু আছেম আশ‘আরী হ’তে বর্ণিত, তিনি নবী করীম (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছেন, إِنَّ اللهَ تَعَالَى قَدْ أَجَارَ أُمَّتِيْ أَنْ تَجْتَمِعَ عَلَى ضَلَالَةٍ  ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা আমার উম্মতকে গোমরাহীর উপরে ঐক্যবদ্ধ না করার মাধ্যমে তাদেরকে রক্ষা করেছেন’।[18]

১০- عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ: إِنَّ أُمَّتِيْ لَا تَجْتَمِعُ عَلَى ضَلَالَةٍ فَإِذَا رَأَيْتُمْ اخْتِلَافًا فَعَلَيْكُمْ بِالسَّوَادِ الْأَعْظَمِ-

১০. আনাস ইবনু মালেক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘নিশ্চয়ই আমার উম্মত গোমরাহীর উপরে ঐক্যবদ্ধ হবে না। যখন তোমরা লোকদের মাঝে মতপার্থক্য লক্ষ্য করবে, তখন তোমরা বড় দলকে আঁকড়ে ধরবে’।[19] মুসতাদরাকে হাকেমে আনাস ইবনু মালেক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন,

أَنَّهُ سَأَلَ رَبَّهُ أَرْبَعًا: سَأَلَ رَبَّهُ أَنْ لَا يَمُوْتَ جُوْعًا فَأُعْطِيَ ذَلِكَ، وَسَأَلَ رَبَّهُ أَنْ لَا يَجْتَمِعَ عَلَى ضَلَالَةٍ فَأُعْطِيَ ذَلِكَ، وَسَأَلَ رَبَّهُ أَنْ لَا يَرْتَدُّوْا كُفَّارًا فَأُعْطِيَ ذَلِكَ، وَسَأَلَ رَبَّهُ أَنْ لَا يَغْلِبَهُمْ عَدُوٌّ لَهُمْ فَيَسْتَبِيْحَ بَأْسَهُمْ فَأُعْطِيَ ذَلِكَ، وَسَأَلَ رَبَّهُ أَنْ لَا يَكُوْنَ بَأْسَهُمْ بَيْنَهُمْ فَلَمْ يُعْطَ ذَلِكَ-

‘রাসূল (ছাঃ) তাঁর রবের কাছে চারটি জিনিস প্রার্থনা করলেন। ১. তিনি তাঁর রবের কাছে প্রার্থনা করলেন, কেউ যেন ক্ষুধার কারণে মারা না যায়। তাঁকে সেটা দান করা হ’ল। ২. তিনি তাঁর রবের কাছে প্রার্থনা করলেন তাঁর উম্মত যেন গোমরাহীর উপরে ঐক্যবদ্ধ না হয়। সেটাও তাঁকে দান করা হ’ল। ৩. তিনি তাঁর রবের কাছে প্রার্থনা করলেন যেন তারা (মুসলমানগণ) ধর্মত্যাগ করে কাফের না হয়ে যায়। তাঁকে সেটাও দান করা হ’ল। ৪. তিনি তাঁর রবের কাছে প্রার্থনা করলেন যেন তাদের উপর তাদের শত্রুরা বিজয় লাভ না করে। ফলে তারা তাদেরকে হত্যা করা বৈধ মনে করবে। তাঁকে সেটাও দান করা হ’ল। তিনি তাঁর রবের কাছে প্রার্থনা করলেন যেন মুসলমানদের পরস্পরের মাঝে যুদ্ধ বেঁধে না যায়। কিন্তু এটা তাঁকে দান করা হ’ল না’।[20]

১১- عَنْ أَبِىْ ذَرٍّ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ قَالَ: اثْنَانِ خَيْرٌ مِنْ وَاحِدٍ وَثُلاَثٌ خَيْرٌ مِنِ اثْنَيْنِ وَأَرْبَعَةٌ خَيْرٌ مِنْ ثَلاَثَةٍ، فَعَلَيْكُمْ بِالْجَمَاعَةِ، فَإِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ لَنْ يَجْمَعَ أُمَّتِى إِلاَّ عَلَى هُدًى-

১১. আবু যার (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি নবী করীম (ছাঃ) হ’তে বর্ণনা করেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘একজন অপেক্ষা দু’জন উত্তম। দু’জন অপেক্ষা তিনজন উত্তম। তিনজন অপেক্ষা চারজন উত্তম। সুতরাং তোমাদের জন্য আবশ্যক হ’ল জামা‘আতবদ্ধভাবে জীবন যাপন করা। কেননা আল্লাহ তা‘আলা আমার উম্মতকে কখনো হেদায়াত ব্যতীত গোমরাহীর উপরে ঐক্যবদ্ধ করবেন না’।[21]

12- عَنْ أُسَامَةَ بْنِ شَرِيكٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ: يَدُ اللهِ عَلَى الْجَمَاعَةِ-

১২. উসামা ইবনু শারীক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি নবী করীম (ছাঃ) হ’তে বর্ণনা করেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘জামা‘আতের উপরে আল্লাহর হাত রয়েছে’।[22] উসামা ইবনু শারীক হ’তে আরো অতিরিক্ত বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,

فَإِذَا شَذَّ الشَّاذُّ مِنْهُمُ اخْتَطَفَهُ الشَّيْطَانُ كَمَا يَخْتَطِفُ الذِّئْبُ الشَّاةَ مِنَ الْغَنَمِ-

‘যখন তাদের মধ্য হ’তে কেউ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন শয়তান তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। যেমন বাঘ দলছুট ছাগলকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়’।[23]

১৩- عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِنَّ اللهَ يَرْضَى لَكُمْ ثَلاَثًا وَيَكْرَهُ لَكُمْ ثَلاَثًا فَيَرْضَى لَكُمْ أَنْ تَعْبُدُوْهُ وَلاَ تُشْرِكُوْا بِهِ شَيْئًا وَأَنْ تَعْتَصِمُوْا بِحَبْلِ اللهِ جَمِيْعًا وَلاَ تَفَرَّقُوْا، وَيَكْرَهُ لَكُمْ قِيْلَ وَقَالَ وَكَثْرَةَ السُّؤَالِ وَإِضَاعَةَ الْمَالِ-

১৩- আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের জন্য তিনটি জিনিস পসন্দ করেন এবং তিনটি জিনিস অপসন্দ করেন। তিনি তোমাদের জন্য পসন্দ করেন যে, ১. তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। ২. তোমরা ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে ধারণ করবে ও ৩. পরস্পর বিভক্ত হবে না। আর তিনি তোমাদের জন্য অপসন্দ করেন ১. কারো সমালোচনা করা, ২. অধিক প্রশ্ন করা এবং ৩. অর্থ-সম্পদ নষ্ট করা’ (সম্পদের অপব্যবহার ও অপচয় করা)।[24] [চলবে]



[1]. মুসলিম হা/২৮৮৯ ‘ফিতান’ অধ্যায়

[2]আবুদাউদ হা/৩৪৬২; ছহীহাহ হা/১১; ছহীহুল জামে‘ হা/৪২৩; ছহীহ তারগীব হা/১৩৮৯

[3]বুখারী হা/৩৬০৬,৭০৮৪; মুসলিম হা/১৮৪৭; মিশকাত হা/৫৩৮২

[4]মুসলিম হা/১৮৪৭; ছহীহাহ হা/২৭৩৯; মিশকাত হা/৫৩৮২

[5]আহমাদ হা/২১৬৩০; তিরমিযী হা/২৬৫৮; ইবনু মাজাহ হা/৪১০৫; ছহীহাহ হা/৪০৪; মিশকাত হা/২২৮

[6]আহমাদ হা/২১৬৩০; ইবনু মাজাহ হা/৪১০৫; ছহীহুল জামে‘ হা/৬৭৬৩; ছহীহ তারগীব হা/৯০; ছহীহাহ হা/৪০৪; মিশকাত হা/২২৮

[7]আহমাদ হা/১৬৮০০; ছহীহ তারগীব হা/৯২; ইবনু মাজাহ হা/৩০৫৬; দারেমী হা/২২৮

[8]তিরমিযী হা/২১৬৫; হাকেম হা/৩৮৭; আহমাদ হা/১১৪;  ইবনু হিববান হা/৪৫৭৬; ছহীহাহ হা/৪৩০; হাদীছ ছহীহ

[9]ছহীহাহ হা/৬৬৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৩১০৯; আলবানী, যিলালুল জান্নাহ হা/৯৩; শু‘আবুল ঈমান হা/৯১১৯; হাদীছটি হাসান পর্যায়ের

[10]তিরমিযী হা/২১৬৭; হাকেম হা/৩৯৪; ইবনু মাজাহ হা/৩৯৫০; মিশকাত হা/১৭৩; ছহীহুল জামে‘ হা/১৮৪৮; যিলালুল জান্নাহ হা/৮৫; শু‘আবুল ঈমান হা/৭৫১৭, হাদীছটি হাসান পর্যায়ের। দ্রঃ তারাজু‘আতে আলবানী হা/৮৫

[11]বুখারী হা/৩৬৪১; মুসলিম হা/১৯২০; ছহীহাহ হা/১৯৫; হাকেম হা/৮৩৯০; ইবনু মাজাহ হা/০৬; তিরমিযী হা/২১৯২; আহমাদ হা/১৮১৬০; মিশকাত হা/৬২৭৬

[12]. ইবনু আবী শায়বাহ হা/৩৭১৯২; শু‘আবুল ঈমান হা/৭১১১; হাকেম হা/৬৬৬৪, সনদ ছহীহ। দ্র. সিলসিলাতুল আছারিছ ছহীহাহ হা/৮৫।

[13]আলবানী, যিলালুল জান্নাহ হা/৮৫; শু‘আবুল ঈমান হা/৭৫১৭; ইবনু আবী শায়বা হা/৩৮৭৭০; ইবনু আবী আছেম হা/৭৩; আত-তালখীছুল হাবীর ৩/১৪১

[14]তিরমিযী হা/২১৬৫; হাকেম হা/৩৯৪; ইবনু মাজাহ হা/৩৯৫০; ছহীহুল জামে‘ হা/১৮৪৮; শু‘আবুল ঈমান হা/৭৫১৭; মিশকাত হা/১৭৩; হাদীছ ছহীহ

[15]হাকেম হা/৩৯৩মাজমা‘উয যাওয়ায়েদ হা/৯১০০; আলবানী (রহঃ) শাহেদ থাকায় হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন। দ্রঃ যিলালুল জান্নাহ হা/৮১

[16]আবুদাউদ হা/৪২৫৩; মু‘জামুল কাবীর হা/৩৪৪০;  হাদীছটির সনদ যঈফ। যঈফা হা/১৫১০; যঈফুল জামে‘ হা/১৫৩২

[17]হাদীছটির সনদ হাসান। দ্রঃ ইবনু আবী আছেম, আস-সুন্নাহ হা/৯২; যিলালুল জান্নাহ হা/৯২; দারাকুৎনী হা/৪৬৬৬

[18]ইবনু আবী আছেম, আস-সুন্নাহ হা/৮৩; সর্বশেষ ফলাফল হ’ল হাদীছটির সনদ হাসান; ছহীহাহ হা/১৩৩১; ছহীহুল জামে‘ হা/১৭৮৬; যিলালুল জান্নাহ হা/৯৩

[19]আহমাদ হা/১৯৩৭০; ইবনু মাজাহ হা/৩৯৫০; যঈফুল জামে‘ হা/১৮১৫; তারাজু‘আতে আলবানী হা/৮৫; ইবনু আবী আছেম আস-সুন্নাহ হা/৮৪। হাদীছ হাসান। ছহীহাহ হা/১৩৩১-এর আলোচনা দ্রঃ

[20]হাকেম হা/৪০০। এর সনদে মুবারক ইবনু সুহাইম নামক একজন মাতরূক রাবী থাকায় হাদীছটি যঈফ (তাহযীবুল কামাল ২৭/১৭৬; তাকরীব ২/১৫৬; মীযান ৩/৪৩০)।

[21]আহমাদ হা/২১৩৩১; যঈফা হা/১৭৯৭; যঈফুল জামে‘ হা/১৩৬; ইবনু আসাকির ৩৮/২০৬। আলবানী হাদীছটিকে জাল ও শু‘আইব আরনাউত অত্যন্ত যঈফ বলেছেন

[22]হাকেম হা/৩৯৮; নাসাঈ হা/৪০২০; ছহীহুল জামে‘ হা/৮০৬৫; যিলালুল জান্নাহ হা/৮১; ইবনু আবী আছেম হা/৬৯, আলবানী (রহঃ) শাহেদ থাকায় হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন

[23]মু‘জামুল কাবীর হা/৪৮৯; মাজমা‘উয যাওয়ায়েদ হা/৯১০১; আবু নু‘আইম, মা‘রিফাতুছ ছাহাবা হা/৭৩২। আল্লামা আলবানী বলেন, হাদীছটির সনদ অত্যন্ত যঈফ। দ্রঃ তাখরীজুস সুন্নাহ ১/৪০

[24]আহমাদ হা/৮৭৮৫; মুসলিম হা/১৭১৫; ইবনু হিববান হা/৩৩৮৮; মুওয়াত্ত্বা মালেক হা/৩৬৩২; আবু আ‘ওয়ানা হা/৬৩৬৫; আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৪৪২; ছহীহাহ হা/৬৮৫

 

 

HTML Comment Box is loading comments...