প্রবন্ধ

শায়খ আলবানীর তাৎপর্যপূর্ণ কিছু মন্তব্য (২য় কিস্তি)

-আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব

২৩. আহলেহাদীছ প্রসঙ্গে :

(ক) একবার পাকিস্তানের আহলেহাদীছগণ একটি দাওয়াতী সম্মেলনে শায়খ আলবানীকে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু তিনি তাতে অংশগ্রহণে আগ্রহী হ’লেন না। তখন তারা তাঁর ছাত্র শায়খ হাশেমীকে অনুরোধ করলেন শায়খ আলবানীর সাথে কথা বলার জন্য। কিন্তু শায়খ আলবানী আবারও ওযর পেশ করে বললেন যে, তার না যাওয়ার কারণ হ’ল, পাকিস্তানের আহলেহাদীছ ভাইয়েরা তার প্রতি ভালোবাসায় বাড়াবাড়ি করছেন। অতঃপর শায়খ হাশেমী যখন তাঁকে সেখানকার কিছু আহলেহাদীছ ওলামায়ে কেরামের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন, তখন আলবানী শায়খ হাসান বিন মুহাম্মাদের চরণটি আবৃত্তি করলেন,  

أَهْلُ الْحَدِيْثِ هُمْ أَهْلُ النَّبِيْ + وَإِنْ لَمْ يَصْحَبُوْا نَفْسَهْ أَنْفَاسُهُ صَحِبُوْا

অর্থাৎ ‘আহলেহাদীছগণ তো নবী করীম (ছাঃ)-এর পরিবার।

যদি তারা স্বয়ং সাথী নাও হন, তবুও তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস তাদের সাথী’।

অতঃপর বললেন, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। তিনি যেন আমাকে কিয়ামতের দিন তাদের সাথেই পুনরুত্থিত করেন। একথা বলতে বলতে তিনি কেঁদে ফেললেন (মুহাম্মাদ বাইয়ূমী, ইমাম আলবানী হায়াতুহু দাওয়াতুহু ওয়া জুহূদুহু ফী খিদমাতিস সুন্নাহ, পৃঃ ১৩৮)

(খ) শায়খ আলবানী তাঁর বিখ্যাত ‘সিলসিলা ছহীহাহ’ গ্রন্থের ২৭০ নং হাদীছে ফেরক্বা নাজিয়ার পরিচয় দিতে গিয়ে আহলেহাদীছগণ সম্পর্কে ওলামায়ে কেরামের ও আইম্মায়ে এযামের মন্তব্য তুলে ধরার পর বলেন, ইমামগণ আহলেহাদীছদেরকে নাজী ফেরক্বা ও বিজয়ী দল হিসাবে চিহ্নিত করায় কিছু মানুষ বিব্রত বোধ করে থাকে। মূলতঃ এটা অস্বাভাবিক মনে করার কোন কারণ থাকবে না যদি নিম্নোক্ত বিষয়গুলি আমরা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেই।

প্রথমতঃ আহলেহাদীছগণ হাদীছ গবেষণা ও এতদসংক্রান্ত বিষয়াবলী যেমন রাবীদের জীবনী, হাদীছের দোষ-ত্রুটি ও তার বিভিন্ন সূত্র সম্পর্কে পান্ডিত্য হাছিলের দিক থেকে রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাত, তার পথনির্দেশ, তাঁর চরিত্র, যুদ্ধাভিযান ও ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞান রাখে।

দ্বিতীয়তঃ মুসলিম উম্মাহ বিভিন্ন ফেরক্বা ও মাযহাবে বিভক্ত হয়েছে যা ১ম শতাব্দীতে ছিল না।[1] আর প্রত্যেক মাযহাবেরই নিজস্ব মূলনীতি ও শাখা-প্রশাখা রয়েছে। রয়েছে এমন হাদীছসমূহ, যা থেকে তারা দলীল পেশ করেন ও যার উপর তারা নির্ভর করেন। এসব মাযহাবের মধ্যে কোন একটিকে অনুসরণকারী মুকাল্লিদ কেবল সেই মাযহাবেরই অন্ধ অনুসরণ করে এবং সে মাযহাবের সকল সিদ্ধান্তকে অাঁকড়ে থাকে। ঐ ব্যক্তি অন্য মাযহাবের দিকে ভ্রূক্ষেপও করে না। অথচ হয়তবা সেখানে সে এমন হাদীছ খুঁজে পেত, যা তার অনুসৃত মাযহাবে পায়নি। বিদ্বানদের এটা একটা স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার যে, প্রত্যেক মাযহাবেই এমন অনেক সুন্নাত ও হাদীছ রয়েছে যা অন্য মাযহাবে পাওয়া যায় না। ফলে সুনির্দিষ্ট একটি মাযহাবের অনুসারী ব্যক্তি অন্য মাযহাবসমূহে সংরক্ষিত বিপুলসংখ্যক হাদীছের প্রতি আমল করা থেকে বিস্মৃত থেকে যায়। কিন্তু আহলেহাদীছগণ এর ব্যতিক্রম। কেননা তারা বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত সকল হাদীছই গ্রহণ করে থাকেন, তা সে যে মাযহাবের হৌক না কেন। তার বর্ণনাকারী যে দলেরই হৌক না কেন, যতক্ষণ তিনি বিশ্বস্ত মুসলিম হন। এমনকি বর্ণনাকারী হানাফী, মালেকী বা অন্য মাযহাব দূরে থাক, যদি শী‘আ, ক্বাদারী, খারেজীও হন, তবুও সে হাদীছ তারা গ্রহণ করেন। ইমাম শাফেঈ (রহঃ) এটাই স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন তাঁর বক্তব্যে। তিনি ইমাম আহমাদ-কে লক্ষ্য করে বলেন, أنتم أعلم بالحديث مني، فإذا جاءكم الحديث صحيحا فأخبرني به حتى أذهب إليه سواء كان حجازيا أم كوفيا أم مصريا ‘আপনি হাদীছ সম্পর্কে আমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী। অতএব যখনই আপনার নিকটে কোন ছহীহ হাদীছ পৌঁছবে, তখনই আপনি আমাকে তা অবহিত করবেন। যাতে আমি সেদিকে যেতে পারি। হৌক বর্ণনাকারী হেজাযী, কূফী কিংবা মিসরী।’ কিন্তু আহলেহাদীছগণ- আল্লাহ আমাদেরকে হাশরের ময়দানে তাদের সাথে সমাবেত করুন- তারা মুহাম্মাদ (ছাঃ) ব্যতীত অন্য কারু বক্তব্যের অন্ধ অনুসরণ করে না, যতই শ্রেষ্ঠ বা মহান ব্যক্তি হৌক না কেন। অথচ অন্যেরা যারা হাদীছ ও তার উপর আমলের প্রতি সম্বন্ধ করে না, তারা ইমামগণের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও স্ব স্ব ইমামের বক্তব্যের অন্ধ অনুসরণ করে থাকে। যেমনভাবে আহলেহাদীছগণ নবী করীম (ছাঃ)-এর হাদীছের অনুসরণ করে থাকে। উপরোক্ত আলোচনার পর এতে কোন বিস্ময়ের অবকাশ থাকে না যে, আহলেহাদীছগণই বিজয়ী দল এবং নাজী ফেরক্বা। বরং তারাই হ’ল সেই মধ্যপন্থী উম্মত যারা (কিয়ামতের দিন) সমগ্র সৃষ্টির উপর সাক্ষী হবেন।

আহলেহাদীছগণের বিরোধীদের বক্তব্যের জবাবে খতীব বাগদাদী স্বীয় ‘শারফু আছহাবিল হাদীছ’ বইয়ের ভূমিকায় যে বক্তব্য পেশ করেছেন, তা আমাকে মুগ্ধ করেছে। তিনি বলেছেন,...আল্লাহ তা‘আলা আহলেহাদীছগণকে শরী‘আতের ভিত্তি স্বরূপ করেছেন, তাদের দ্বারাই জঘন্য সব বিদ‘আতকে ধ্বংস করেছেন, তারাই হ’ল সৃষ্টির মাঝে আল্লাহর দ্বীনের রক্ষক এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও তাঁর উম্মতের মাঝে যোগসূত্র স্থাপনকারী। তারাই হ’ল উম্মতের অস্তিত্ব রক্ষায় সংগ্রামকারী। প্রত্যেক দল স্ব স্ব খেয়াল-খুশীর আশ্রয় নেয় ও সেদিকে ফিরে যায়। তারা যে রায়টি পসন্দ করে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে, আহলেহাদীছগণ ব্যতীত। কেননা কুরআন তাদের হাতিয়ার, হাদীছ তাদের দলীল, স্বয়ং রাসূল (ছাঃ) তাদের নেতা, তাঁর দিকেই তাদের সম্বন্ধ। তারা নিজেদের খেয়াল-খুশীর উপরে চলে না, কারো রায়ের দিকে ভ্রূক্ষেপ করে না।.... তারা রাসূল (ছাঃ)-এর আনীত শরী‘আতকে কথায় ও কাজে সর্বান্তকরণে গ্রহণ করে। তার সুন্নাতের সংরক্ষণ ও তা মানুষের কাছে বিবৃত করার মাধ্যমে দ্বীনের পাহারাদারের ভূমিকা পালন করে এবং তারা তাকে মৌলিক ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। তারাই এর প্রকৃত হকদার ও প্রকৃত অনুসারী। কত দুষ্কৃতিকারী শরী‘আত বহির্ভূত বিষয়কে শরী‘আতের মধ্যে ঢুকানোর চেষ্টা করেছে! কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা আহলেহাদীছদের মাধ্যমে তাদের অপচেষ্টাকে প্রতিহত করেছেন। ফলে তারাই শরী‘আতের মৌলিক ভিত্তিসমূহের হেফাযতকারী এবং তার নির্দেশ ও মর্যাদার তত্ত্বাবধানকারী। যখন লোকেরা এর প্রতিরোধে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন এরাই তার পক্ষে ধনুকে তীর সংযোজন করে। এরাই হ’ল আল্লাহর দল। আর নিশ্চয় আল্লাহর দলই সফলকাম’।

অতঃপর আলোচনার শেষ প্রান্তে এসে তিনি বলেন, ‘পরিশেষে আমি আহলেহাদীছদের জন্য ভারতের একজন বিখ্যাত হানাফী পন্ডিত আবুল হাসানাত মুহাম্মাদ আব্দুল হাই লাক্ষ্ণৌভী (১২৬৪-১৩০৪ হিঃ) প্রদত্ত সাক্ষ্য তুলে ধরছি। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি ন্যায়ের দৃষ্টিতে দেখবে এবং খেয়ালখুশীর অনুসরণ না করে ফিক্হ ও উছূলের সমুদ্রে ডুব দিবে, তার মধ্যে এ দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাবে যে, অধিকাংশ মৌলিক ও শাখাগত মাসআলা, যেগুলি নিয়ে ওলামায়ে কেরামের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে, সেসব ব্যাপারে মুহাদ্দিছগণের মাযহাবই সকল মাযহাবের চেয়ে শক্তিশালী। যখনই আমি মতবিরোধের গিরিপথে ভ্রমণ করি, মুহাদ্দিছগণের বক্তব্যকে অধিকতর ন্যয়সঙ্গত দেখতে পাই। তাদের প্রতি আল্লাহর কতই না অনুগ্রহ! তাদের প্রতিই আমাদের কৃতজ্ঞতা! আর কেনইবা নয়! তারাই তো রাসূল (ছাঃ)-এর প্রকৃত উত্তরাধিকারী। তাঁর আনীত শরী‘আতের যথার্থ প্রতিনিধি। আল্লাহ যেন আমাদেরকে তাদের দলের সাথে পুনরুত্থান ঘটান এবং তাদের প্রতি ভালোবাসা ও তাদের অনুসৃত পথের উপরেই আমাদের মৃত্যু দান করেন’ (সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৭০-এর আলোচনা দ্রঃ)

২৪. সকল কাজে ইখলাছের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে :

মুসলমানদের সকল কাজ ইখলাছপূর্ণ হওয়া আবশ্যক। কারণ সকল কাজের মূল হলো ইখলাছ। إن كان بخاري زمانه في الحديث وأبو حنيفة في الفقه ولم يخلص في عمله فهذا لن ينفعه بشيئ অর্থাৎ যদি সে হাদীছ শাস্ত্রে ইমাম বুখারীর মত হয় এবং ফিকহ শাস্ত্রে ইমাম আবু হানীফার মত হয়, অথচ তার আমলে ইখলাছ না থাকে, তাহ’লে তার এই খেদমত (তার পরকালের জন্য) কোনই উপকারে আসবে না।

কোন আমলই কবুলযোগ্য হবে না, যতক্ষণ না তাতে দু’টি শর্ত বিদ্যমান থাকবে। (১) রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হ’তে হবে (২) ইখলাছপূর্ণ হ’তে হবে। এ দু’টি শর্তের যেকোন একটি না থাকলে সে আমল আল্লাহর নিকটে কবুল হবে না।

অতঃপর শায়খ আলবানী ইখলাছবিহীন আমল থেকে বাঁচার জন্য দু’টি পথ দেখিয়েছেন।

(১) খ্যাতির মোহ থেকে মুক্ত থাকা : যে ব্যক্তি আমলকে ইখলাছপূর্ণ করতে চায়, তাকে খ্যাতির প্রতি ভালোবাসা এবং মানুষের প্রশংসা থেকে দূরে থাকতে হবে। এথেকে দূরে থাকতে পারলে অল্প আমলের বিনিময়ে পাহাড়সম নেকী অর্জিত হবে। খ্যাতির প্রতি আকর্ষণ সম্পদের প্রতি আকর্ষণের চেয়ে অধিক ক্ষতিকর। কেননা এর মাধ্যমে ব্যক্তির মধ্যে দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা ও মৃত্যুকে অপসন্দ করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। তাই প্রত্যেকের জন্য উচিৎ হবে দৃঢ়পদ থাকা এবং মানুষের প্রশংসা এবং তাদের মধ্যে স্বীয় প্রসিদ্ধির কারণে প্রভাবিত না হওয়া।

(২) আমল দ্বারা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা : প্রত্যেক মুজাহিদ এবং আলেমের জন্য আবশ্যক হ’ল তারা তাদের কার্যক্রমের জন্য কোন প্রতিদান বা শুকরিয়া কামনা করবেন না। এখানে উভয়েই আল্লাহর পথে জিহাদ করছেন। একজন স্বীয় ইলম দ্বারা। অপরজন স্বীয় বীরত্ব, শক্তি এবং সাহসিকতার দ্বারা। তাই এখানে প্রকৃত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাহ’লে তার পরিণাম হবে অজ্ঞ ব্যক্তির পরিণামের চেয়েও ভয়াবহ। আবুদ্দারদা (রাঃ) হ’তে একটি আছার বর্ণিত হয়েছে, ويل للجاهل مرت وويل للعالم سبع مرات ‘জাহেলের জন্য একগুণ ধ্বংস কিন্তু আলেমের জন্য সাতগুণ ধ্বংস নির্ধারিত’। এখানে সাতগুণ দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, আলেম ইলম থাকার কারণে অধিক শাস্তির সম্মুখীন হবেন। (সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর ১/১৪৯, ২৬০, ২৯১; ইয়াদ মুহাম্মাদ ছালেহ, মানহাজুল আলবানী ১৪১-১৪৩ পৃঃ)

২৫. ফৎওয়া প্রসঙ্গে :

أن الإستعجال في الفتيا من مصائب زماننا ‘তড়িঘড়ি কোন বিষয়ে ফৎওয়া দেওয়া এযুগের একটি বড় মুছীবত’ (সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর ১/৩০৬)

২৬. কুরআন শিক্ষা প্রসঙ্গে :

‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি যে কুরআন শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয়’ হাদীছটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কুরআনের শিক্ষক হ’লেন সর্বোত্তম শিক্ষক এবং মানুষ যা কিছু শিক্ষা করে তার মধ্যে সর্বোত্তম হ’ল কুরআন শিক্ষা করা। হায়! শিক্ষার্থীরা যদি এ সম্পর্কে জানতো, তাহ’লে তাদের জন্য বিরাট উপকার নিহিত ছিল। বর্তমান যুগে যে সমস্যা ব্যাপকতা লাভ করেছে সেটা হ’ল, তুমি বহু দাঈ এবং জ্ঞানান্বেষীকে দেখতে পাবে যারা দাওয়াত, ফৎওয়া ও মানুষের প্রশ্নের জবাবদানে তৎপর ভূমিকা রাখছে, অথচ তারা সুন্দরভাবে মাখরাজ সহকারে সূরা ফাতিহা তেলাওয়াত করতে পারে না। কখনো তারা س কে ص , ط কে ت , ذ কে ز কিংবা ث কে س -এর মত উচ্চারণ করছে। কখনো সংগোপন উচ্চারণের স্থলে স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করছে। অথচ তাদের জন্য কুরআন হেফয করার চেয়ে কুরআন সুন্দরভাবে পড়তে শেখা একান্ত যরূরী। যাতে দ্বীনের দাওয়াত দান, পাঠদান ও ওয়ায-নছীহতের সময় সুন্দরভাবে আয়াত চয়ন এবং তা দ্বারা দলীল পেশ করতে পারে। তুমি তাদেরকে হাদীছ ছহীহ-যঈফ, ওলামায়ে কেরামের মতামত রদ এবং বিভিন্ন মতের মধ্যে তারজীহ দিতে দেখবে। দেখবে সর্বদা তাদের জ্ঞানের স্তরের চেয়ে উচ্চ স্তরের কোন বিষয়ে কথা বলতে। কখনো দেখবে তারা বলছে, ‘আমি এটা মনে করি’, ‘আমি বলি’, ‘এ বিষয়ে এটা আমার বক্তব্য’ অথবা ‘এ মতটিই আমার নিকটে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত!’

আশ্চর্যের বিষয় হ’ল, তুমি তাদের অধিকাংশকে কখনো ওলামায়ে কেরামের মতৈক্যপূর্ণ মাসআলা নিয়ে আলোচনা করতে দেখবে না; বরং সর্বদাই দেখবে তারা বিরোধপূর্ণ মাসআলা নিয়ে আলোচনা করছে। এমনকি বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে তুলনামূলক আলোচনায় লিপ্ত হচ্ছে, আর কঠিন হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন মতামত থেকে একটিকে প্রাধান্য দিচ্ছে। আমি আল্লাহর নিকটে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এ ধরনের লোকপ্রদর্শনী ও লোক শুনানোর লালসা এবং আত্মপ্রচারমুখী মনোভাব থেকে। আমি প্রথমে নিজেকে তারপর ঐসব ব্যক্তিদেরকে উপদেশ দিচ্ছি এ মর্মে যে, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য পবিত্র কুরআন হেফয করার মাধ্যমে জ্ঞানার্জন শুরু করা উত্তম। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে কুরআনের সাহায্যে উপদেশ দাও’ (ক্বাফ ৫)(আদ-দুরার আল-গাওয়ালী মিন কালামিল আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানী, পৃঃ ২৪৫)

মুসলিম যুবক ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে

শায়খ আলবানীর নছীহত

প্রথমতঃ তোমরা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যেই ইলম অর্জন করবে। এর বিনিময়ে কোন প্রতিদান, কোন শুকরিয়া বা কোন মজলিস আলোকিত করার অভিলাষ পোষণ করবে না। বরং তোমাদের লক্ষ্য থাকবে কেবল সেই মর্যাদা অর্জন, যা আল্লাহ তা‘আলা কেবল ওলামায়ে কেরামের জন্যই নির্ধারণ করেছেন।

দ্বিতীয়তঃ বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষার্থী যে বিপদে আছে, তা থেকে তোমরা দূরে থাকবে। সেগুলি হ’ল, তাদের উপর জ্ঞানের অহংকার ও আত্মম্ভরিতা প্রাধান্য বিস্তার করেছে। ফলে তাদের কেউ কেউ অহংকারের এত ঊচ্চ সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে যে, সালাফে ছালেহীনের মতামতের কোন তোয়াক্কা না করে তারা কোন বিষয়ে নিজের মত করে ফৎওয়া দিচ্ছে। অথচ সালাফে ছালেহীন আমাদের জন্য রেখে গেছেন এক আলোকোজ্জ্বল জ্ঞানভান্ডার। যা থেকে আমরা যুগ-যুগান্তরে আপতিত বিভিন্ন সমস্যার ক্ষেত্রে সাহায্য গ্রহণ করতে পারি এবং বিভিন্ন মতবাদের ধোঁয়াশা ভেদ করে কিতাব ও ছহীহ সুন্নাহর আলোকোজ্জ্বল মৌল উৎসের দিকে ফিরে যেতে পারি।

তোমরা নিশ্চয়ই জান যে, আমি নিজে এমন এক যুগে বসবাস করেছিলাম যেখানে বিরাজ করছিল দু’টি পরস্পরবিরোধী অবস্থা। সে যুগের মুসলমানরা সকলেই ছিল শিক্ষক কিংবা সাধারণ ছাত্র এবং তারা সকলেই কেবল বিভিন্ন মাযহাবেরই মুকাল্লিদ নয়, বরং বাপ-দাদাদের আচরিত বিভিন্ন রীতি-নীতিরও অনুসারী ছিল। এরূপ মতবাদ বিক্ষুব্ধ সাগরের মাঝেও আমরা ও আমাদের মত অন্যান্য দেশের অনেক ভাইয়েরা কুরআন ও ছহীহ হাদীছের দিকে মানুষকে দাওয়াত দিয়ে গিয়েছি।

আজ সে অবস্থার উত্তরণ ঘটেছে এবং সমাজে সেই স্বল্পসংখ্যক সংস্কারকদের দাওয়াতের ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষতঃ বিভিন্ন দেশে যুবক শ্রেণী অধিকহারে এ দাওয়াত গ্রহণ করছে। দ্বীনের বিশুদ্ধ জ্ঞানার্জনে তাদের মাঝে এক নবজাগরণের সৃষ্টি হয়েছে।

কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হ’ল এ ইতিবাচক জাগরণের পাশাপাশি এই যুবকদের অনেকেই আবার আত্মগর্ব ও আত্ম অহংকারের কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কেবল যুবক শ্রেণীই নয়, বরং এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বহু আলেম। যারা দ্বীনের ছহীহ ইলমের অধিকারী হওয়ার পর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় না করে বরং নিজেদেরকে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থানকারী ওলামায়ে কেরামের চেয়ে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করা শুরু করেছে এবং ভাবছে যে তারা বুঝি কিছু একটা হয়ে গেছে। ফলে কিতাব ও সুন্নাতের গভীর পান্ডিত্য ছাড়াই বিভিন্ন বিষয়ে তারা অপরিপক্ক ফৎওয়া প্রদান করছে। অথচ তাদের ধারণা তাদের ফৎওয়া নিশ্চয়ই কুরআন ও হাদীছ মোতাবেক হচ্ছে। ফলে এর দ্বারা তারা নিজেরা পথভ্রষ্ট হচ্ছে এবং পথভ্রষ্ট করছে বহু মানুষকে। উদাহরণস্বরূপ একটি দলের কথা বলা যায়, যাদেরকে আপনারা অনেক মুসলিম দেশেই দেখছেন। এই দলটি অন্যান্য সকল মুসলিম দলকে কাফের ঘোষণা করছে।

সুতরাং মুসলিম বিশ্বের সকল শিক্ষার্থী এবং দাঈ ভাইদের প্রতি আমার নছীহত হ’ল, তারা যেন ধৈর্য সহকারে জ্ঞানার্জন করে এবং নিজের অর্জিত জ্ঞান নিয়ে আত্মপ্রতারণার শিকার না হয়। তারা যেন এককভাবে নিজেদের বুঝ মোতাবেক না চলে। অর্থাৎ তাদের একক ‘ইজতিহাদে’র উপর নির্ভর করে ফৎওয়া না দেয়। কেননা আমি অনেক ভাইয়ের নিকটে শুনেছি, তারা নিজেদের ভুল হ’তে পারে এরূপ চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই এবং কোন পরিণাম বিবেচনা না করেই খুব সহজে কোন বিষয়ে ফৎওয়া দিচ্ছে আর বলছে, أنا اجتهدت ‘আমি এ বিষয়ে ইজতিহাদ করেছি’। বলছে, ‘এটা আমার মত’, ‘এটা আমার মত নয়’ ইত্যাদি। যখন তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হয়, তুমি কিসের ভিত্তিতে এরূপ ইজতিহাদ করলে? তুমি কি এক্ষেত্রে কিতাব ও সুন্নাত, ছাহাবা ও তাবেঈন এবং ওলামায়ে কেরামের ঐক্যমতের উপর নির্ভর করেছ? না নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা ও ক্রুটিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির উপরে ইজতিহাদ করেছ? বাস্তবে দেখা যায়, সে এটাই করেছে। আমি মনে করি এর মূল কারণই হ’ল তাদের আত্মঅহমিকা ও নিজের ব্যাপারে অতি সুধারণা।

এজন্যই আমি মুসলিম বিশ্বের লেখকদের মাঝে একশ্রেণীর লেখকের বিস্ময়কর উত্থান লক্ষ্য করছি, যারা নিজেরা হাদীছের শত্রু; অথচ ইলমে হাদীছ বিষয়ে কিছু লিখছে। স্রেফ এটা যাহির করার জন্য যে, ইলমে হাদীছে তার অবদান রয়েছে। উক্ত লেখনীগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, এখান থেকে সেখান থেকে নকল করে তারা বইগুলি সংকলন করেছে। এর কারণ কি? এর কারণ হ’ল তারা নিজেদেরকে সমাজে যাহির করতে চায় এবং মানুষের কাছে সস্তা খ্যাতি অর্জনের ধান্ধায় থাকে। সত্যিই নিম্নোক্ত প্রবাদটি তাদের জন্য খুব যথার্থ- حب الظهور يقطع الظهور ‘আত্মপ্রচারের লোভ খ্যাতি লাভের পথটিই রুদ্ধ করে দেয়’।

এজন্য আমি প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে সকল প্রকার ইসলামবিরোধী চরিত্র থেকে দূরে থাকার উপদেশ দিচ্ছি। নিজের জ্ঞান নিয়ে কোন প্রকার বাড়াবাড়ি এবং আত্মঅহমিকা প্রদর্শন থেকে বিরত থাকতে বলছি। সাথে সাথে দাওয়াতের ক্ষেত্রে কঠোরতা এবং রূঢ়তা পরিত্যাগ করে সর্বোত্তম পন্থা অনুসরণের পরামর্শ দিচ্ছি। কেননা আল্লাহ স্বীয় রাসূল (ছাঃ)- কে লক্ষ্য করে বলছেন, ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ ‘তুমি তোমার রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহবান কর এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক কর’ (নাহল ১৬/১২৫)

এই আয়াতটি নাযিল হয়েছে এই কারণে যে, সত্য স্বভাবতঃই মানুষের জন্য একটি ভারী বিষয়। তাই আল্লাহর অনুগ্রহ ব্যতীত মানুষের পক্ষে তা গ্রহণ করাও কঠিন। এমতাবস্থায় যদি হক-এর সাথে আরো ভারী কিছু যুক্ত করা হয়, অর্থাৎ হক প্রচারের ক্ষেত্রে কঠোরতা অবলম্বন করা হয়, তখন তা মানুষকে হক-এর নিকটবর্তী না করে বরং দূরে ঠেলে দেয়। এজন্য রাসূল (ছাঃ) ৩ বার বলেছিলেন, إِنَّ مِنْكُمْ لَمُنَفِّرِينَ ‘নিশ্চয়ই তোমাদের কেউ কেউ বিতাড়নকারী রয়েছে’ (আহমাদ হা/২২৩৯৮, সনদ ছহীহ)। আল্লাহ যেন আমাদেরকে এই বিতাড়নকারীদের অন্তর্ভুক্ত না করেন এবং কিতাব ও সুন্নাতের প্রাজ্ঞ অনুসারী হিসাবে কবুল করে নেন। আমীন! (মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম আশ-শায়বানী, হায়াতুল আলবানী: আছারুহু ওয়া ছানাউল উলামা আলাইহে, ১/৪৫২)।

 

ইসলামী সমাজ বিনির্মানের পথ ও পদ্ধতি

সম্পর্কে শায়খ আলবানী

বর্তমানে মুসলমানদের অবস্থা হ’ল এই যে, তারা বস্ত্তগত শক্তিতে বলীয়ান কাফের রাষ্ট্রসমূহ দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং এমন সব শাসকদের হাতে নিপীড়িত অবস্থায় দিনাতিপাত করছে, যারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করে না, আর করলেও তা খুব সামান্যই। যার ফলে সুযোগ ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তারা সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করার সুযোগ পাচ্ছে না। এক্ষেত্রে আমি মনে করি মুসলিম দলগুলোকে কেবল দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে অগ্রসর হতে হবে। আমি বিশ্বাস করি না এ দু’টি বিষয় ছাড়া মুসলমানদের এই দুর্বলতা, লাঞ্ছনা ও অপমান-অপদস্থতা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন উপায় আছে। আমি সকল বিশ্বাসী মুসলিম ভাই-বোনদেরকে বিশেষতঃ সচেতন ও প্রতিশ্রুতিশীল যুবকদেরকে বলছি, প্রথমতঃ যে বিষয়টি আমাদের জানতে হবে তা হ’ল, মুসলমানদের করুণ পরিস্থিতি। আর দ্বিতীয়তঃ যে বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে তা হ’ল, সমস্ত শক্তি-সামর্থ্য দিয়ে তা থেকে মুক্তির উপায় বের করার পথ অনুসন্ধান করা। কোটি কোটি মুসলমান আজ কেবল ভৌগলিক বাস্তবতা অথবা নিজের আত্মপরিচয় রক্ষার্থে মুসলিম। অর্থাৎ নিজের জাতীয়তা, পরিচয়পত্র এবং জন্মসনদে লিপিবদ্ধ পরিচিতি মোতাবেক মুসলিম। আজকে আমি তাদের উদ্দেশ্যে কিছুই বলব না। আমি পুনরায় সকলকে বলব, ঐ মুক্তিকামী যুবকদের হাতে মুক্তির কেবল দু’টি পথই খোলা আছে- (১) তাছফিয়াহ বা আক্বীদা সংশোধন (২) তারবিয়াত বা আমলী প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন।

তাছফিয়াহ হ’ল, মুসলিম যুবকদের নিকটে সেই বিশুদ্ধ ইসলামকে উপস্থাপন করা, যা যুগের পরিক্রমায় অনুপ্রবিষ্ট ভ্রান্ত আক্বীদা-বিশ্বাস, কুসংস্কার, বিদ‘আতসহ সকল প্রকার জাল-যঈফ হাদীছ হ’তে মুক্ত। এই আক্বীদাগত সংস্কারকে বাস্তবায়িত করা ব্যতীত দ্বিতীয় কোন পথ খোলা নেই। এই সংস্কার ব্যতীত মুসলমানদের মধ্যে কাংখিত শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার কোন সুযোগ নেই। 

এই ‘তাছফিয়াহ’র উদ্দেশ্য হ’ল, ইসলামকে একমাত্র চিকিৎসা হিসাবে উপস্থাপন করা, যা অনুরূপভাবে সেই আরবদের চিকিৎসা করেছিল, যারা একদিকে পারসিক, রোমীয়, হাবশীদের কাছে লাঞ্ছিত, নিপীড়িত অবস্থায় পতিত ছিল। অন্যদিকে আল্লাহর পরিবর্তে গায়রুল্লাহর ইবাদত করতো।

এই অবস্থান থেকে আমরা সকল ইসলামী দল ও গোষ্ঠীর বিরোধিতা করি এবং বিশ্বাস করি অবশ্যই তাছফিয়াহ এবং তারবিয়াত একত্রে শুরু করতে হবে। যদি আমরা রাজনীতি দিয়ে শুরু করি তাহ’লে আমরা দেখতে পাব যে, যারা এখন রাজনীতিতে ডুবে রয়েছে, তাদের আক্বীদা বিনষ্ট। আর ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের আচার-আচরণ অনেকটাই শরী‘আতবহির্ভূত। তারা কেবল আমভাবে ইসলামের নামে মানুষ জমায়েত করতেই ব্যস্ত। অথচ তাদের লক্ষ্য ও চিন্তাধারা সম্পর্কে ঐসব আমজনতার কোন স্পষ্ট ধারণা নেই। ফলে তাদের দৈনন্দিন জীবনাচারে ইসলামের কোন প্রভাব খুঁজে পাওয়া যায় না। দেখা যাবে, তাদের অধিকাংশ নিজেদের ব্যক্তিজীবনেই ইসলামী বিধি-বিধান বাস্তবায়ন করে না, যা তাদের পক্ষে সহজেই সম্ভবপর ছিল। অথচ একই সময়ে তারা উঁচু গলায় শ্লোগান দিচ্ছে لا حكم إلا لله ‘আল্লাহর হুকুম ব্যতীত কোন হুকুম চলবে না!’। বক্তব্যটি ঠিকই যে, অবশ্যই আল্লাহ নাযিলকৃত হুকুম ব্যতীত অন্য কোন হুকুম চলবে না। কিন্তু স্মরণ রাখতে হবে যে, فاقد الشيء لا يعطيه অর্থাৎ ‘যে ব্যক্তি নিজে যা হারিয়েছে, সে অন্যকে তা দিতে পারে না’। আধুনিক কালের অধিকাংশ মুসলমান নিজেদের জীবনে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা না করে যদি অন্যদের কাছে রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামী ভূমিকা কামনা করে, তবে কখনোই তারা তাদের উদ্দেশ্য পূরণে সক্ষম হবে না। কেননা কেউ যদি কোন জিনিস নিজেই হারিয়ে ফেলে, তবে তা অন্যকে দিতে পারে না। আর ঐসব শাসকগণ তো এই উম্মতেরই অন্তর্ভুক্ত। তাই শাসক-শাসিত উভয়কেই এ দুর্বলতার কারণ সম্পর্কে জানতে হবে। জানতে হবে কেন মুসলিম শাসকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইসলামের বিধান অনুযায়ী শাসন করছে না? কেন মুসলিম দাঈগণ অন্যদেরকে রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আহবান জানানোর পূর্বে নিজেদের জীবনে ইসলামী বিধান কার্যকর করছেন না। এর জওয়াব একটাই-তাদের কারোরই হয় ইসলাম সম্পর্কে ভাসা ভাসা জ্ঞান ছাড়া সঠিক জ্ঞান বা বুঝ নেই অথবা তারা চলাফেরা, জীবনযাপন, স্বভাবচরিত্র, পারস্পরিক লেনদেন কোন ক্ষেত্রেই ইসলামী মূল্যবোধের উপর গড়ে উঠেনি। ফলে আমার অভিজ্ঞতাবলে আমি যা বলতে পারি তারা বড় ধরনের ভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে। আর সেটি হ’ল দ্বীনের সঠিক বুঝ থেকে দূরে ছিটকে পড়া।

এমনকি আজকের দিনে কোন কোন দাঈ মনে করেন যে, সালাফীরা কেবল তাওহীদের দাওয়াতেই জীবনপাত করে  গেল। সুবহানাল্লাহ, কতই না মূর্খতায় ডুবে আছে সেই ব্যক্তি, যে অজ্ঞতাবশতঃ এমন কথা বলে। যদি সে প্রকৃতপক্ষে গাফেল নাও হয়, তবুও সকল নবী ও রাসূলের দাওয়াত সম্পর্কে তার জানার কমতি আছে। কেননা সকল নবীর দাওয়াত ছিল, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং ত্বাগূত থেকে বেঁচে থাক’ (নাহল ১৬/৩৬)। নূহ (আঃ) ৯৫০ বছর যাবৎ কেবল এই দাওয়াতই দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি নতুন কোন সংস্কার করেননি, কোন বিধান প্রবর্তন করেননি, কোন রাজনীতি করেননি। বরং তিনি কেবল বলেছিলেন, হে আমার কওম! তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর এবং ত্বাগূত থেকে বেঁচে থাক’।

এটাই ছিল পূর্ববর্তী সালাফ আম্বিয়ায়ে কেরামের কার্যক্রম! তাহ’লে এই সকল মুসলিম দাঈগণ কিভাবে এত নীচে নেমে যেতে পারেন যে, তারা সেই একই কার্যক্রমের জন্য সালাফীদের নিন্দা করেন?

দ্বিতীয় উপায় হ’ল তারবিয়াত বা প্রশিক্ষণ। যুবকদেরকে এমনভাবে প্রশিক্ষিত করতে হবে যেন তারা পূর্ববর্তীদের মত দুনিয়ার প্রতি মোহগ্রস্ত না হয়ে পড়ে। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, وَاللهِ مَا الْفَقْرَ أَخْشَى عَلَيْكُمْ. وَلَكِنِّى أَخْشَى عَلَيْكُمْ أَنْ تُبْسَطَ الدُّنْيَا عَلَيْكُمْ كَمَا بُسِطَتْ عَلَى مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ فَتَنَافَسُوهَا كَمَا تَنَافَسُوهَا وَتُهْلِكَكُمْ كَمَا أَهْلَكَتْهُمْ ‘আল্লাহর কসম! তোমরা দারিদ্রে্য নিপতিত হবে এ আশংকা আমি করি না। বরং আমি ভয় করি যখন তোমাদের সামনে দুনিয়াবী চাকচিক্যের দুয়ার উন্মুক্ত হবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের মত। ফলে তাদের মত তোমরাও পরস্পর সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে এবং তা তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেবে, যেভাবে ধ্বংস করেছিল পূর্ববর্তীদেরকে’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫১৬৩)

আরেকটি রোগ থেকে মুসলমানদের অবশ্যই বেঁচে থাকতে হবে যেন কোনভাবেই তা হৃদয়ে স্থান না পেতে পারে। তা হ’ল, দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা এবং মৃত্যুকে ভয় না করা (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৫৩৬৯)। এটা এমন একটি রোগ যার চিকিৎসা করা এবং মানুষকে তা থেকে রক্ষা করা অত্যাবশ্যক। এর সমাধানটি একটি হাদীছের শেষাংশে রাসূল (ছাঃ) উল্লেখ করেছেন এভাবে, حَتَّى تَرْجِعُوا إِلَى دِينِكُمْ ‘যতক্ষণ না তোমরা দ্বীনের পথে ফিরে আসবে’ (আবুদাঊদ হা/৩৪৬২)। অর্থাৎ মুক্তির পথ প্রতিভাত হবে বিশুদ্ধ দ্বীনের দিকে ফিরে আসার মাধ্যমে, যে দ্বীনের উপর অটুট ছিলেন রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরাম।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, إِنْ تَنْصُرُوا اللهَ يَنْصُرْكُمْ ‘যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন’ (মুহাম্মাদ ৪৭/৭)। মুফাসসিরগণ একমত যে, অত্র আয়াতে আল্লাহকে সাহায্য করা অর্থ হ’ল, তাঁর হুকুম-আহকাম অনুযায়ী আমল করা। সুতরাং আল্লাহকে সাহায্য করা যদি আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন না করা ব্যতীত অসম্ভব হয়, তাহ’লে আমরা কিভাবে বাস্তব জিহাদে অবর্তীণ হব, যখন আমরা আল্লাহকে সাহায্য করছি না? কেননা আমাদের আক্বীদা যেমন অশুদ্ধ, নৈতিকতাও তেমন ধ্বংসোন্মুখ হয়ে পড়েছে। সুতরাং জিহাদ শুরুর পূর্বে এই অবহেলা-উন্নাসিকতা আর বিবাদ-বিসম্বাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা এবং বিশুদ্ধ আক্বীদা ও আত্মশুদ্ধি অর্জনের প্রচেষ্টাই হবে আমাদের আবশ্যকীয় প্রাথমিক কর্মসূচি। আল্লাহ বলেন, لاَ تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوْا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ ‘তোমরা পরস্পর ঝগড়া করো না, তাহ’লে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে’ (আনফাল ৮/৪৬)। সুতরাং যখন আমরা এই মতবিরোধ ও গাফিলতির পরিসমাপ্তি ঘটাতে সক্ষম হব এবং তদস্থলে পারস্পরিক ঐক্য-ভালোবাসার জাগরণ সৃষ্টি করতে পারব, তখন সেটাই হবে আমাদের দুনিয়াবী শক্তির মূল চাবিকাঠি। আল্লাহ বলেন,أَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ   ‘তাদের মুকাবিলার জন্য তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী শক্তি ও অশ্ববাহিনী প্রস্ত্তত কর’(আনফাল ৮/৬০)।

চারিত্রিক দিক থেকেও মুসলমানদের অবস্থা ধ্বংসাত্মক এবং মারাত্মক বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত। তাইতো সালাফী নন এমন একজন বিখ্যাত মুসলিম দাঈর বক্তব্য (কাযী হাসান হুযায়মী) আমাকে বিস্মিত করেছে, যদিও তাঁর অনুসারীরা তাঁর বক্তব্য  অনুযায়ী চলেন না। তিনি বলেছেন, أَقِيْمُوْا دَوْلَةَ الْإِسْلاَمِ فِيْ قُلُوْبِكُمْ تُقَمْ لَكُمْ فِيْ أَرْضِكُمْ ‘তোমরা তোমাদের হৃদয়ে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা কর, তবেই তোমাদের রাষ্ট্রে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা লাভ করবে’। অধিকাংশ দাঈ ভুল করেন যখন তারা আমাদের এই মূলনীতিকে অবহেলা করেন। একই ভুল করে বসেন যখন তারা বলে বসেন,

إن الوقت ليس وقت التصفية والتربية ، وإنما وقت التكتل والتجمُّع

‘এখন তো তাছফিয়াহ ও তারবিয়াতের সময় নয়। বরং এখন তো ঐক্যবদ্ধ ও সংঘবদ্ধ হওয়ার সময়’। অথচ এ অবস্থায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া কিভাবে সম্ভব হ’তে পারে যখন মৌলিক ও শাখা-প্রশাখাগত নীতিতে বিভেদ বিরাজমান?... এ দুর্বলতাই আজ মুসলমানদের মাঝে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হ’ল যেটা আমি আগেই বলেছি, বিশুদ্ধ ইসলামের দিকে যথাযথভাবে ফিরে আসা এবং সমাজে তাছফিয়াহ ও তারবিয়াহর নীতি বাস্তবায়ন করা। আশা করি এটুকুই যথেষ্ট হবে। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক (মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম আশ-শায়বানী, হায়াতুল আলবানী ওয়া আছারুহু ওয়া ছানাউল উলামা আলাইহে ৩৭৭-৩৯১)



[1]. ৩৭ হিজরী থেকেই বাতিলপন্থীরা মাথা চাড়া দেয়, যাদের হাতে হযরত ওছমান ও পরে হযরত আলী (রাঃ) শাহাদাত বরণ করেন। এভাবে ১ম শতাব্দী হিজরীর ১ম ভাগ থেকেই সাবাঈ, খারেজী, শী‘আ এবং ২য় ভাগে ক্বাদারিয়া, মুরজিয়া, মু‘তাযিলা প্রভৃতি ভ্রান্ত ফেরকা সমূহ জন্মলাভ করে। অতঃপর চতুর্থ শতাব্দী হিজরীতে এসে হানাফী, শাফেঈ, মালেকী, হাম্বলী প্রভৃতি তাক্বলীদী মাযহাবসমূহের প্রচলন ঘটে।

 

 

HTML Comment Box is loading comments...