চিকিৎসা জগৎ

জলপাইয়ের পুষ্টিগুণ

শীতের বিভিন্ন রকম ফলের মধ্যে জলপাই অত্যন্ত পরিচিত ও পুষ্টিকর ফল। টক জাতীয় এ ফলটিতে বিভিন্ন খাদ্যউপাদান প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান। জলপাই থেকে তৈরি তেল মানব দেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এই তেল হাত-পায়ে ও গায়ে বিশেষ করে শীতকালে ব্যবহার করলে ত্বক সুন্দর ও মোলায়েম হয়। জলপাই কাঁচা ও পাকা অবস্থায় খাওয়া যায়। এর খাদ্যউপাদান সরাসরি শরীরে গৃহীত হয়। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, সি, লৌহ ও শর্করা বিদ্যমান। জলপাই আমাদের দেহের ভিটামিন এ. সি. অভাবজনিত রোগ থেকে রক্ষা করে। বিশেষ করে চামড়ার, চোখের হাড় ও দাঁতের নানা সমস্যা দূর করে।

১০০ গ্রাম খাবার উপযোগী জলপাইয়ের পুষ্টি উপাদান নিম্নরূপ : খাদ্য শক্তি ১৪৬ কিলোক্যালরি, শর্করা ১৬.২ গ্রাম, আঁশ ৩.৩ গ্রাম, আমিষ ১.০৩ গ্রাম, ভিটামিন-ই ৩.৮১ মিলিগ্রাম, ভিটামিন কে-১.৪ আইইউ, আয়রন ৩.১ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ৫২ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ৪২ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ১১ মিলিগ্রাম।

জলপাই চুলের সৌন্দর্য বর্ধন ও হজমে সাহায্য করে। এতে থাকা প্রচুর পরিমাণ আঁশ পেটের মল তৈরি ও বের হ’তে সাহায্য করে এবং মানব দেহের লাইপো-প্রোটিনের পরিমাণ কমিয়ে হার্ট বা হৃদপিন্ডকে সুস্থ রাখে। জলপাইয়ে প্রাকৃতিক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে, যা ক্যান্সারের জীবাণু ধ্বংস করতে সাহায্য করে। রক্তে চর্বির পরিমাণ কমায় এবং রক্ত চলাচলে সাহায্য করে। জলপাইয়ে থাকা উচ্চ হারে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল এজেন্ট দেহে কোন রোগ জীবাণু ঢুকলে বা তৈরী হ’লে তা মেরে ফেলে এবং সূর্যের অতি বেগুনী রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করে। দেহে আয়রণের অভাব পূরণ করে রক্তশূন্যতা দূর করে এবং দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। দেহে ক্যান্সার প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। জলপাই দেহের ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে উপকারী কোলেস্টেরল এইচডিএল (হাই ডেনসিটি লাইপ্রোটিন) তৈরি করে।

জলপাই হ’তে তৈরি তেল খুবই উপকারী। জলপাই তেল বা অলিভ অয়েল দিয়ে রান্না খাবার খেলে বিষণ্ণতা কমে। বৃদ্ধ বয়সে হাড়ের অস্টি ও পরোসিসজনিত ক্যালসিয়াম হাড়ের ক্ষয়ের পরিমাণ কমায়। অলিভ অয়েল হার্টের এজিং প্রসেস ধীরগতি করে। জলপাই তেলের মিশ্রিত খাবার খেলে কোলন ক্যান্সার কম হয়। অলিভ অয়েল শরীরে ব্যবহার করলে চামড়া সুস্থ, উজ্জ্বল ও মসৃণ থাকে। শরীরে কাঁটা-চিরার দাগ থাকলে দাগে নিয়মিত অলিভ অয়েল লাগালে দাগ সেরে যায়। শীতকালে অনেকেরই পা ফাটে, প্রতিদিন রাতে পা ভালো করে পরিষ্কার করে অলিভ অয়েল লাগলে ফাটা সেরে যায়। চুল ঝরলে ও চুল ভঙ্গুর হয়ে গেলে এ তেল নিয়মিত ব্যবহারে চুল ঝরা কমে এবং চুল সুন্দর হয়। অলিভ অয়েলে মনোস্যচুরেটেডফ্যাট থাকে, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত অলিভ অয়েল ব্যবহার করলে উচ্চ রক্তচাপ কমে। জলপাইয়ের এন্টি-অক্সিডেন্ট ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। বাতের ব্যথায় জলপাই বা জলপাই পাতা গুঁড়ো করে খেলে উপকার পাওয়া যায়। মাথায় উকুন হ’লে জলপাই পাতার রস নিয়ে সারা মাথায় লাগিয়ে ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেললে উকুন কমে যায়। ভাইরাস জনিত জ্বর, ক্রমাগত মোটা হওয়া, জন্ডিস, কাশি ইত্যাদির জন্য জলপাই পাতা গুঁড়ো করে খেলে উপকার পাওয়া যায়। জলপাইয়ের খোসায় বা বাকলে প্রচুর আঁশ থাকে যা খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। জলপাই দিয়ে তৈরী নানা ধরনের আচার সংরক্ষণ করে সারা বছর খাওয়া যায়।

সতর্কতা : অপারেশনের পর পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত জলপাই খাওয়া যাবে না।

লাউয়ের ওষধিগুণ

লাউ গাছের আগা, ডগা, ফল সবই অত্যন্ত পুষ্টিকর ও ঔষধিগুণ সমৃদ্ধ। আমাদের দেশের গ্রাম কিংবা শহরের সকল মানুষের কাছে পরিচিত ও ব্যাপক জনপ্রিয় ও সুস্বাদু সবজি লাউ। এটা সর্বত্র সারা বছরই পাওয়া যায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন এ সবজি তাই আমাদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। লাউ-এর আদি নিবাস আফ্রিকা। পরে তা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। লতানো জাতীয় উদ্ভিদ লাউয়ে ভিটামিন বি.সি. শর্করা ও খাদ্য শক্তি পাওয়া যায়। এর পাতায় এ.সি. ও ক্যালসিয়াম প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। বীজে থাকে ৪৫% ফ্যাট এসিড, প্রোটিন, অ্যামাইনোএসিড ইত্যাদি। বীজের তেল মাথাব্যথা দূর করে।

প্রতি ১০০ গ্রাম খাবার উপযোগী লাউ গাছের পাতায় খাদ্য উপাদান হ’ল- প্রোটিন ২.৩ গ্রাম, শর্করা ৬.১ গ্রাম, চর্বি ০.৭ গ্রাম, ক্যালসিয়াম, ৮০ গ্রাম, ক্যারোটিন ১৮৭ মাইক্রোগ্রাম, ভিটামিন সি ৯০ মিলিগ্রাম, খাদ্যশক্তি ৩৯ কিলোক্যালরি।

১০০ গ্রাম খাবার উপযোগী লাউ-এ খাদ্য উপাদান হ’ল- জলীয় অংশ ৮৩.১ গ্রাম, প্রোটিন ১.১ গ্রাম, শর্করা ১৫.১ গ্রাম, চর্বি ০.১ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ২৬ গ্রাম, লৌহ ০.৭ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৪ মিলিগ্রাম, খাদ্যশক্তি ৬৬ কিলোক্যালরি, খনিজ পদার্থ ০.৫ গ্রাম, কার্বোহাইড্রেট ২.৫ গ্রাম, ফসফরাস ১০ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি ১০.০৩ মিলিগ্রাম, বি ২.০১ মিলিগ্রাম, নিয়াসিন ০.০২ মিলিগ্রাম। তাছাড়া এতে ম্যাগনেসিয়াম, জিংক, ওমেগা ৬, ফ্যাটি এসিড আছে। এছাড়া লাউয়ের নানা ঔষধি গুণাগুণও রয়েছে। কোষ্ঠকাঠিন্য রোগে নিয়মিত লাউ খেলে উপকার পাওয়া যায়। বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলারা প্রায়ই কোষ্ঠকাঠিন্য রোগে আক্রান্ত হন। তারা লাউ খেয়ে উপকার পাবেন।

লাউ গাছের পাতা শাকও খুবই উপকারী। যাদের খাবার কম হজম হয় বা অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে, তাদের জন্য লাউ খুবই উপকারী সবজি। নিয়মিত খেলে কর্মশক্তি বৃদ্ধি পায়। যাদের শরীর গরম বা মাথা গরম থাকে, তারা লাউ খেলে উপকার পাবেন। হৃদরোগে আক্রান্ত ও হাই-প্রেসারের রোগীরা নিয়মিত লাউ খেলে উপকার পাবেন। লাউ খেলে শরীরের চামড়ার আর্দ্রতা বজায় থাকে। ফলে শীতকালে চামড়ার টান টান ভাব কমে যায়।

কানের ব্যথায় লাউ গাছের নরম ডগার রস দিলে উপকার পাওয়া যায়। লাউ গাছের পাতার রসের সাথে চিনি মিশিয়ে খেলে জন্ডিস রোগে উপকার হয়। যাদের ঘুম কম হয় তারা রাতে লাউ খেলে রাত জাগার প্রবণতা কমে ঘুম আসতে পারে। যাদের সব সময় মাথা গরম থাকে তারা লাউ এর বীজ বেটে মাথার তালুতে রাখলে বা ভরণ দিলে উপকার পাবেন। খাওয়ায় অরুচি হ’লে লাউ-এর সবজি বা লাউ-এর বাকলের ভাজি খেলে সমস্যা কমে যাবে ইনশাআল্লাহ।

\ সংকলিত \

 

 

HTML Comment Box is loading comments...