স্মৃতিকথা

শফীকুলের সাথে কিছু স্মৃতি


মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব

আমার নিয়ম ছিল যেখানে জালসার দাওয়াত নিতাম, সেখানে ‘আহলেহাদীছ যুবসংঘ’ গঠনের শর্ত দিতাম। এছাড়া নিয়ম ছিল যাতায়াত খরচের অতিরিক্ত কোন টাকা নিতাম না। জোর করলে ‘যুবসংঘে’র রসিদ কেটে দিতাম। এমনি এক সফরে ১৯৮৩ সালে আমি জয়পুরহাট সদরের পলিকাদোয়া হাফেযিয়া মাদরাসার জালসায় যাই। অতঃপর জালসা শেষে সংশ্লিষ্ট সবার পরামর্শক্রমে মাহফূযুর রহমানকে আহবায়ক করে ‘আহলেহাদীছ যুবসংঘে’র ‘যেলা আহবায়ক কমিটি’ গঠন করি। যিনি এখন যেলা ‘আন্দোলন’-এর সভাপতি। জালসার এক পর্যায়ে মাহফূয সাথে করে এনে একজন যুবককে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, স্যার ছেলেটি গান গেয়ে সুনাম কুড়িয়েছে। আপনি ওর একটা হাম্দ শুনুন। শুনলাম ঘরের মধ্যে। মুগ্ধ হ’লাম ওর দরায কণ্ঠে। বললাম নাম কি? বলল, শফীউল আলম। বললাম, এ নাম চলবে না। বললাম, শফীকুল ইসলাম। সে রাযী হ’ল। বললাম, শফীকুল! আল্লাহ তোমাকে যে কণ্ঠ দিয়েছেন তা দিয়ে তুমি জান্নাত খরীদ করতে পার। বলল, স্যার আমি আনছার বাহিনীতে চাকুরী করি। সফীপুর (গাযীপুর) আনছার একাডেমীতে আমাকে দিয়ে থিয়েটারে গান করানো হয়। স্বল্প বেতনের চাকুরী। বাড়ীতে বৃদ্ধ পিতা একটা মুদিখানার দোকান করেন। বেচাকেনা খুবই কম। কোনমতে সংসার চলে। বললাম, বাজে গান ছাড়তে হবে। দোকানে বিড়ি-সিগারেট, তামাক-জর্দা বেচাকেনা চলবে না। বলল, স্যার এগুলি না থাকলে তো গ্রামে ব্যবসাই বন্ধ হয়ে যাবে। তাছাড়া আববা হয়ত মানবেন না। পরদিন আসার সময় আমি ওর দোকানে গেলাম। বৃদ্ধ পিতাকে বুঝালাম। হালাল পথে কম আয় করুন। তাতেই আল্লাহ বরকত দিবেন। সেদিন থেকে শফীকুলের যেন সব রূযীর দুয়ার বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু তার খুলূছিয়াত ও দৃঢ়তার কারণে আল্লাহর রহমতের দুয়ার খুলে গেল। এলাকায় এমন কোন সভা-সমিতি হয় না, যেখানে শফীকুলের ডাক পড়ে না। আমার নির্দেশ ছিল তুমি কারু কাছে কিছু চাইবে না। এমনকি চাওয়ার কথা মনেও আনবে না। তাতে আল্লাহ নারায হবেন। তুমি কেবল বলবে, আল্লাহ তোমার দেওয়া কণ্ঠকে আমি তোমার পথে ব্যয় করছি। তুমি আমাকে শক্তি দাও’! সে আজীবন আমার সে নির্দেশ মেনে চলেছে। প্রকাশ্য জালসাতে বহুবার এজন্য সে তার আমীরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছে। আমরা আশা করি আল-হেরার জাগরণী গেয়ে সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে সে যত নেকী অর্জন করেছে, তার একটা অংশ আল্লাহ এ অধমকে দান করবেন।

‘যুবসংঘে’র গঠনতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতার কারণে ছয় মাসের মধ্যে জয়পুরহাটে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সিরাজুল ইসলামকে পাঠানো হয়। সে ঐ সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস বিভাগের বি.এ সম্মানের ছাত্র ছিল। বর্তমানে ‘আন্দোলন’-এর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। জয়পুরহাট সদরের কোমরগ্রাম জামে মসজিদে প্রোগ্রাম হয়। সেখানে সকলের পরামর্শক্রমে নবগঠিত জয়পুরহাট যেলা ‘আহলেহাদীছ যুবসংঘে’র প্রচার সম্পাদক হিসাবে শফীকুলকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে জাতীয় সংগঠন হিসাবে ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর আবির্ভাব ঘটলে সে জয়পুরহাট যেলা ‘আন্দোলন’-এর অর্থ সম্পাদক নিযুক্ত হয়। তখন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে উক্ত দায়িত্ব পালন করে। যেলা সভাপতির ভাষ্যমতে মৃত্যুর ছ’দিন আগে টাকা-পয়সা হিসাব করে ৩৬,১০০ (ছত্রিশ হাযার একশ’) টাকা তার কাছে রয়েছে বলে জানায়। মৃত্যুর একদিন পরে যেলা ‘আহলেহাদীছ যুবসংঘে’র সভাপতি আবুল কালাম এবং শফীকুলের বড় ছেলে ও আরও কয়েকজন তার রেখে যাওয়া সংগঠনের টাকা রাখার প্লাস্টিক বয়েম থেকে টাকা ঢালে। গুণে দেখা গেল হিসাব মত উক্ত টাকাই রয়েছে। একটি টাকাও কম-বেশী নেই। ফালিল্লাহিল হাম্দ। উল্লেখ্য যে, শফীকুল তার প্রথম সন্তানের নাম আমার নামে রেখেছিল এবং তার জন্য দো‘আ চেয়েছিল। সম্ভবতঃ ১৯৯৫ সালের দিকে কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক হাফীযুর রহমান (বর্তমানে মৃত)-এর মাধ্যমে আমরা তার ঘরটি পাকা করে দেই। যেখানে তার পরিবার এখনও বাস করছে।

আল-হেরা শিল্পী গোষ্ঠীর সূচনা :

১৯৯১ সালের ২৫ ও ২৬শে এপ্রিল বৃহস্পতি ও শুক্রবার রাজশাহী মহানগরীর নওদাপাড়াতে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ’-এর ২য় জাতীয় সম্মেলন ও তাবলীগী ইজতেমার ১ম দিন বাদ আছর  রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপযেলাধীন ঝিনা এলাকা ‘আহলেহাদীছ যুবসংঘে’র ‘কর্মী’ যীনাত আলী রচিত ‘জাগরে যুবক নওজোয়ান’ গানটি পূর্ণ দরদ ঢেলে দিয়ে দরায কণ্ঠে গেয়ে সে মানুষকে পাগল করে দেয়। সেদিন সে ‘ভন্ড পীরে’র বদলে ‘ভক্ত পীর’ বলেছিল। পরে সংশোধন করে দেই। কিন্তু তাতে জোশ যেন কিছুটা কমে যায়। আসলে ওর ভুলটাই ভালো লাগছিল। এরপর থেকে সম্ভবতঃ এমন কোন বার্ষিক তাবলীগী ইজতেমা যায়নি, যেখানে সে জাগরণী গায়নি। ১ম নওদাপাড়া তাবলীগী ইজতেমায় ওর গান শুনে আমার হৃদয়ে আশার প্রদ্বীপ জ্বলে ওঠে। বহুদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের দীপশিখা দেখতে পাই। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই শফীকুলকে প্রধান ও সাতক্ষীরার আব্দুল মান্নান ও জাহাঙ্গীর আলমকে সাথী করে কেন্দ্রীয়ভাবে ‘আল-হেরা শিল্পী গোষ্ঠী’ গঠন করি। এভাবে শুরু হয় ‘আল-হেরা শিল্পী গোষ্ঠী’র পদযাত্রা। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে বিজাতীয় অপসংস্কৃতি এবং ইসলামের নামে শিরক ও বিদ‘আত মিশ্রিত আক্বীদা বিধ্বংসী গান-গযলের বিপরীতে তাওহীদ ও ছহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক ইসলামী কবিতা ও গানের মাধ্যমে দ্বীন প্রচারের সংকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়। সেই সাথে শুরু হয় আমার বিরুদ্ধে ফৎওয়ার তীরবৃষ্টি। সবকিছু মুখ বুঁজে সহ্য করে ‘আল-হেরা শিল্পী গোষ্ঠী’কে সাধ্যমত পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এগিয়ে নিয়েছি। যা এখন সমাজ পরিবর্তনে মোক্ষম হাতিয়ার হিসাবে শত্রু-মিত্র সকলের নিকট সমাদৃত হয়েছে। শফীকুলের গাওয়া গান এখন দেশে ও বিদেশে সর্বত্র সর্বাধিক পরিচিত। গানের মাধ্যমে সমাজ সংস্কারে তার অবদান সকলের নিকটে স্বীকৃত। তার গাওয়া গানে ঈমানদারগণের হৃদয়ে ঢেউ ওঠে। এমনকি ছোট্ট শিশুরাও শিহরিত হয়। সে চলে গেছে, কিন্তু তার জাগরণী গ্রামে-গঞ্জে এমনকি পর্ণকুটিরে সর্বত্র গুঞ্জরিত।

আমি জেলখানায় গেলে দু’দিন পরেই সে আমাকে রাজশাহী কারাগারে দেখতে আসে। পরে তাকেও জেলখানায় যেতে হয়। জয়পুরহাট জেলখানায় তার কারারক্ষীরা বদলী হয়ে বগুড়া কারাগারে গেলে আমার সঙ্গে শফীকুলের গল্প করত। জেলখানায় তার তাক্বওয়া-পরহেযগারী-উপদেশ ও গানের মাধ্যমে সংস্কারমূলক বক্তব্যে সবাই ছিল মোহিত। পরে আব্দুর রহীম (যেলা সভাপতি) যখন বগুড়া জেলখানায় এল। তখন তার ব্যবহার ও আচরণে মুগ্ধ একই কারারক্ষীরা এসে বলত, স্যার! আপনার কর্মীরা সবাই কি এরকম? আপনারা ভোটে দাঁড়ান না কেন? আপনাদেরই দেশের ‘প্রেসিডেন্ট’ হওয়া উচিৎ।

কেন্দ্রীয় শিল্পী গোষ্ঠী গঠনের সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগঠনভুক্ত ২৩জন শিল্পী অংশগ্রহণ করে। তাদের মধ্যে শফীকুলসহ পূর্বোক্ত ৩জনকে কেন্দ্রীয় দায়িত্বে রেখে বাকীদের স্ব স্ব যেলায় কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। অতঃপর কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলদের প্রশিক্ষণের জন্য রেডিও বাংলাদেশ রাজশাহী কেন্দ্র থেকে দক্ষ ২জন প্রশিক্ষক আনা হয়। রাণীবাজার মাদরাসার ৩য় তলায় তখন আমাদের অফিস ছিল এবং সেখানেই প্রশিক্ষণ হয়। অতঃপর প্রশিক্ষণ শুরু হ’লে শফীকুলের কণ্ঠে প্রথম গানটি শুনেই প্রশিক্ষক দ্বয় বলে ওঠেন, আপনাদের প্রশিক্ষণের দরকার নেই। আল্লাহ প্রদত্ত কণ্ঠই যথেষ্ট। এতে আমাদের ঘষামাজার প্রয়োজন নেই। অতঃপর তারা সামান্য কিছু উপদেশ দিয়ে বিদায় নিলেন।

আমরা সমাজ সংস্কারমূলক বিভিন্ন কবিতা আহবান করি।  যেগুলো আমি নিজেই বাছাই করতাম। ভাষা ও বিষয়বস্ত্ত সংশোধন করতাম। কিছু ওরা নিজেরা মুখস্ত করে এসে আমাকে শুনাতো। অনেক ক্ষেত্রে সুরের তাল ও লয় এবং ছন্দ ও অন্তমিল ঠিক করে দিতাম। এরপর সেটা জালসায় বলার অনুমতি দিতাম। আমার সঙ্গে থাকলে যখন ওরা জালসায় সেগুলি গাইত, তখনও অনেক সময় সংশোধন করে দিতাম। শ্রোতাদের উৎসাহ দেখে ও সুধীদের প্রশংসাবাণী শুনে আমি এর নাম রাখলাম ‘জাগরণী’। এর দ্বারা আমার উদ্দেশ্য ছিল গান ও সঙ্গীত নাম দু’টি পরিহার করা। কারণ এই নামগুলি ধর্মনিরপেক্ষ ও বিদ‘আতী ইসলামী দলগুলি ব্যবহার করে থাকে। আলহামদুলিল্লাহ আমাদের সে উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে। এখন দেশে জাগরণী অর্থ হ’ল ‘আল-হেরার জাগরণী’। কোন অনুষ্ঠানের শুরুতে কুরআন তেলাওয়াতের পরই ‘জাগরণী’ এখন বিষয়বস্ত্ত হয়ে উঠেছে। এমনকি এক সময় শফীকুলের নামই হয়ে ওঠে, ‘জাগরণী’। জালসায় গিয়ে লোকেরা জিজ্ঞেস করে ‘জাগরণী’ এসেছে কি? শুনেছি পশ্চিম বঙ্গের লালগোলা সহ বিভিন্ন শহরে ও বাজারে এমনকি আইসক্রীম বিক্রেতারাও ‘আল-হেরা’র জাগরণী বাজিয়ে থাকে। এভাবে আল-হেরার জাগরণী সমাজের তৃণমূল পর্যায়ে দেড় হাযার বছর পূর্বেকার আল-হেরার শিহরণ জাগিয়ে তোলে। যা আগামী দিনে আল-হেরার জান্নাতী পথে সমাজ পরিবর্তনে বড় অবদান রাখবে বলে আমরা আশা করি। এভাবে শফীকুল ও তার সাথী লেখকবৃন্দ ও শিল্পীগণ আল্লাহকে যে ‘উত্তম ঋণ’ দিয়েছে, তার সর্বোত্তম বদলা যেন তারা আল্লাহর নিকটে পান, আমরা সেই দো‘আ করি।

৩ বছর ৬ মাস ৬ দিন পর ২০০৮ সালের ২৮শে আগস্ট বগুড়া যেলা কারাগার থেকে যামিনে মুক্তি লাভ করার পর শফীকুল ও তার সাথী জাহাঙ্গীর, আব্দুল মান্নান ও আমানুল্লাহর কাছে নতুন অনেকগুলি গান শুনি। যেগুলির বিষয়বস্ত্ত ছিল আমার কারামুক্তি। বিভিন্ন সফরে যাতায়াতকালে মাইক্রোর মধ্যে যখনই ওদের প্রাণখোলা গানগুলি শুনতাম, তখনই বলতাম, তোমরা দ্রুত এগুলি রেকর্ড কর। জানিনা কে কখন বিদায় নেব। অন্যেরা না শুনলেও শফীকুল শুনেছিল। তাই গত ২৭ ও ২৮শে আগস্ট’১৫ ‘আন্দোলন’-এর বার্ষিক কর্মী সম্মেলনের একদিন পূর্বে এসে সে একক কণ্ঠে ৫৩টি গান রেকর্ড করায়। এক পর্যায়ে ‘আমেলা’ চলাকালে সে ‘দারুল ইমারতে’ এসে একটা গান শুনাবার আবদার করে। ওর আবেগ দেখে ‘আমেলা’ স্থগিত করে অনুমতি দিলাম। তারপর সে দাঁড়িয়ে গানটি শুনালো। বললাম, এটা চলবে না। খুশী হয়ে বলল, স্যার! এটা কাউকে শুনাইনি। বাদ দিলাম। পরের দিন পুনরায় এলে আমি তাকে বললাম, আমার সাড়ে এগার মাস বয়সী যমজ নাতি-নাতনী জাওয়াদ-জুমানা তোমার জাগরণী শুনে কান্না বন্ধ করে। তারপর ‘আহলেহাদীছ আন্দোলনের কভু মরণ নাই’ জাগরণী শুনে ওরা হেলতে-দুলতে শুরু করে। যতক্ষণ জাগরণী চলে, ততক্ষণ ওরা হেলতেই থাকে। ঠাট্টা করে আমরা বলি এরা এখুনি শফীকুলের শিষ্য হয়ে গেল। একথা শুনে আমার ছেলেদের মাধ্যমে ওদেরকে নীচে এনে কোলে নিয়ে সে আদর করে এবং তাদের জন্য দো‘আ করে। এটাই ছিল ‘দারুল ইমারতে’ শফীকুলের সর্বশেষ আগমন এবং আমাদের সঙ্গে সর্বশেষ দেখা। এভাবেই গান রেকর্ড করার মাধ্যমে সে যেন নিজের অজান্তেই তার মৃত্যুর আগে তার আমীরের আদেশ পালন করে গেল।...

তার জাগরণীর বৈশিষ্ট্য :

কথা, কণ্ঠ ও ছন্দ মিলিয়ে গান হয়। কিন্তু যখন সেটা হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়, তখন তা অন্যের হৃদয়কে প্রভাবিত করে। এদিক দিয়ে শফীকুল ছিল অনন্য ও অতুলনীয়। আল্লাহপাক তাকে কেবল কণ্ঠ দেননি, দিয়েছিলেন মানুষের প্রতি দরদভরা প্রাণ। আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ঈমান এবং ইমারতের প্রতি নিখাদ আনুগত্য ও শ্রদ্ধাবোধ। গানের কথার মাধ্যমে নিজের আদর্শ চেতনা মিশিয়ে তাতে প্রাণের মাধুরী ঢেলে দিয়ে যখন সে গাইত, তখন তা অন্যের হৃদয়তন্ত্রীতে আঘাত হানত। মরিচা ধরা অন্তর পরিচ্ছন্ন হয়ে জেগে উঠত। জান্নাতহারা আদম সন্তান জান্নাতের ডাক পেয়ে যেন পাগলপারা হয়ে যেত। ৫৮ বছরের জীবনের শেষদিকে যখন সে তার পুরানো গানগুলি গাইত, তখন শেষ হলেই শ্রোতারা বলে উঠত, আরও একটা চাই। তাদের আবেগ অনেক কষ্টে থামাতে হ’ত। বয়সের পরিবর্তন হ’লেও তার আবেগে ও কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন আসেনি। সম্মেলন সমূহে আমি উঠার আগে সে আমার পসন্দ মত জাগরণী গাইত। বার্ষিক কেন্দ্রীয় তাবলীগী ইজতেমায় ১ম দিন বাদ আছর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এবং ১ম ও ২য় দিন বাদ এশা যখন সে জাগরণী গাইত, তখন দূর থেকে শ্রোতারা বুঝে নিত যে, এবার ‘আমীরে জামা‘আত’ ভাষণ দিবেন। কাজ-কাম বন্ধ করে তখন সবাই ময়দানে ছুটে আসত। গভীর রাতে ইজতেমা প্যান্ডেলে মানুষ ঘুমিয়ে গেলে যদি শফীকুল উঠত, সাথে সাথে শ্রোতারা ঘুম থেকে জেগে উঠে বসে যেত। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা এমনকি অবুঝ শিশুরাও তার গানে মুগ্ধ হ’ত। মূলতঃ এখানেই ছিল শফীকুলের জাগরণীর স্বার্থকতা। আজ হয়তোবা কণ্ঠ পাওয়া যাবে, কিন্তু সেই প্রাণ পাওয়া যাবে কি? শফীকুলের স্থান তাই পূরণ হবার নয়। এরপরেও আমরা আল্লাহর নিকট আশাবাদী।

শেষদিকে সে হয়ে উঠেছিল একজন জনপ্রিয় বক্তা। বক্তৃতা শিল্পে সে এমনই দক্ষতা অর্জন করেছিল যে, বিরোধীদের মজলিসে দাঁড়িয়েও সে হাসতে হাসতে সংগঠনের দাওয়াত দিত। মৃত্যুর দু’দিন আগে ১১ই ডিসেম্বর শুক্রবার এমনই এক পরিবেশে পাবনার কুলনিয়াতে দেওয়া ভাষণের শেষ দিকে যেলা সভাপতি শিরীন বিশ্বাসের ভাষ্যমতে যখন সে শ্রোতাদের জিজ্ঞেস করে, ভাইয়েরা অন্তর থেকে বলুন, যদি কেউ মানুষকে দাওয়াত দেয়, ‘আসুন! পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে জীবন গড়ি’ তাহ’লে দাওয়াতটা কি অন্যায় হবে? তখন সকলে বলল, না। তখন সে বলল, ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’ ‘বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ’ ‘সোনামণি’ ও ‘আহলেহাদীছ মহিলা সংস্থা’ জনগণের কাছে এই দাওয়াতই দিয়ে থাকে। এতে কি আপনাদের কোন আপত্তি আছে? সকলেই বলল, না। ভাইয়েরা আমার! আগামী ২৫ ও ২৬শে ফেব্রুয়ারী’১৬ বৃহস্পতি ও শুক্রবার ২৬তম বা©র্র্ষক তাবলীগী ইজতেমা অন্যান্য বারের ন্যায় এবারও রাজশাহীর নওদাপাড়াতে অনুষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ। আপনারা সবাই সেখানে যাবেন। কুরআন ও ছহীহ হাদীছের ওয়ায শুনবেন’। পাশেই বসা বিরোধী নেতারা থ’ হয়ে তার কথা শুনলো। কিন্তু কিছুই বলার ছিল না। এর দু’দিন পর ১৩ই ডিসেম্বর রবিবার বগুড়ার মেন্দীপুর মাদরাসার জালসায় যেলা সভাপতি আব্দুর রহীমের ভাষ্যমতে সে সর্বশেষ জাগরণী গায় ‘কত ইসলামী দল ঘুরছে বাংলার পরে, শোন বন্ধু রে’..। এখানে দেওয়া তার জীবনের সর্বশেষ প্রায় দেড় ঘণ্টার ভাষণের মাধ্যমে আল্লাহর পথে দাওয়াত দিয়ে আল্লাহর পথের এ দাঈ আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে আল্লাহর নিকটে চলে গেল। কিন্তু তার স্মৃতি রইল চির অমলিন। আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নছীব করুন। -আমীন!

 

HTML Comment Box is loading comments...