প্রবন্ধ


উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে

আহলেহাদীছগণের অগ্রণী ভূমিকা

 

মূল (উর্দূ) : মাওলানা মুহাম্মাদ ইসহাক ভাট্টি
অনুবাদ : নূরুল ইসলাম
পিএইচ.ডি গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

(গত সংখ্যার পর)

৩. মালদহ বিদ্রোহ মামলা :

ভারতের বিভিন্ন এলাকা ও শহরে মুজাহিদগণের প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রগুলোর মধ্যে একটি ছিল মালদহ। এই কেন্দ্রটি বঙ্গ প্রদেশে ছিল। Our Indian Musalmans গ্রন্থের ইংরেজ লেখক ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার ১৮৭০ সালের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে (উর্দূ অনুবাদ : হামারে হিন্দুস্তানী মুসলমান, পৃঃ ১১৯) লিখছেন যে, ওহাবীদের জিহাদ আন্দোলনের এই কেন্দ্রটি ‘প্রায় ৩০ বছর’ পূর্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[1] এই হিসাবে ১৮৪০ সালের দিকে এই কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মালদহ যেলা ছাড়াও এর সংলগ্ন মুর্শিদাবাদ ও রাজশাহী যেলার কিছু অংশও এই কেন্দ্রে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ...এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মাওলানা বেলায়েত আলী আযীমাবাদীর খলীফা মাওলানা আব্দুর রহমান লাক্ষ্ণৌবী। যিনি মুজাহিদগণের জামা‘আতের সাথে সম্পর্ক রাখতেন। তিনি এই সূত্রে দক্ষিণ বাংলার মালদহ যেলায় গেলে সেখানে মুজাহিদগণের খিদমতের জন্য পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুকূল মনে হয় এবং সেই যেলার একটি গ্রামে তিনি আবাস গাড়েন। সেখানেই বিবাহ করেন এবং শিক্ষক হিসাবে কাজ করতে শুরু করেন।[2] গ্রামের ছোট-বড় জমিদার ও অন্যান্য লোকজন তাঁর নিকট থেকে জ্ঞানার্জন শুরু করে। হান্টারের বক্তব্য অনুযায়ী তিনি দারুণ তেজস্বী বক্তা ছিলেন এবং অত্যন্ত প্রভাব বিস্তারকারী ঢঙ্গে মানুষজনকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদের আহবান জানাতেন। এর  ফল এই হয়েছিল যে, অসংখ্য যুবক তাঁর ভক্ত হয়ে গিয়েছিল। তিনি লোকজনের নিকট থেকে রীতিমত অর্থ আদায় করে আযীমাবাদ (পাটনা) কেন্দ্রে পাঠাতেন। যাতে এই অর্থ সীমান্তবর্তী মুজাহিদগণের নিকট পৌঁছানো যায়।

মাওলানা আব্দুর রহমান লাক্ষ্ণৌবীর তত্ত্বাবধানে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যে সকল ব্যক্তি অর্থ সংগ্রহ করার জন্য নিযুক্ত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন রফীক মন্ডল।[3] কয়েক বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ১৮৫৩ সালে মুজাহিদগণকে সহযোগিতা করার ব্যাপারে রফীক মন্ডলের উপর সরকারের সন্দেহ হয়। তাঁকে তল্লাশি করা হলে এমন কিছু চিঠিপত্র উদ্ধার হয় যার মাধ্যমে একথা প্রমাণিত হয়ে যায় যে, মুজাহিদগণের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। এজন্য তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। কিছুদিন পর তিনি মুক্তি পেলে যাবতীয় সাংগঠনিক কাজ- যা তিনি নিজে আঞ্জাম দিতেন, স্বীয় পুত্র মৌলভী আমীরুদ্দীনকে সোপর্দ করে দেন।

মৌলভী আমীরুদ্দীন অত্যন্ত চৌকস ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর প্রভাবের পরিধি ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। গঙ্গা নদীর উভয় তীর ও উহার দ্বীপ সমূহে বসবাসরত মুসলমানদের মধ্যে এবং মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও রাজশাহী যেলায় তাঁর সুগভীর প্রভাব ছিল। তাঁর একনিষ্ঠতা ও কর্মোদ্দীপনার কারণে সবাই তাঁকে সম্মানের চোখে দেখত...।[4] মৌলভী আমীরুদ্দীন জিহাদের জন্য যে সকল ব্যক্তিকে সীমান্ত এলাকায় প্রেরণ করেছিলেন তার সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা কঠিন। অবশ্য হান্টারের বক্তব্য হল মুজাহিদগণের একটি সীমান্ত ঘাঁটির ৪৩০ জন ব্যক্তির মধ্যে কমবেশী শতকরা ১০ শতাংশ ওহাবী মুজাহিদ তাঁরই প্রেরিত ছিল।[5]

বাঙ্গালী মুসলমানদের মনে মুজাহিদগণকে সম্মানদানের প্রবল আগ্রহ লক্ষ্য করা যেত। এর বড় কারণ এটা ছিল যে, ইতিপূর্বে মাওলানা এনায়েত আলী আযীমাবাদী এই অঞ্চলসমূহে অনেক কাজ করেছিলেন। লোকজনের উপর তাঁর সততা ও একনিষ্ঠ কর্মকান্ডের দারুণ প্রভাব ছিল।[6]

১৮৭০ সালে মালদহে মাওলানা আমীরুদ্দীনের বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও বিদ্রোহের মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তাঁর সম্পত্তি বাযেয়াফ্তকরণ ও যাবজ্জীবন কারাদন্ড সহ কালাপানিতে নির্বাসনের সাজা হয়েছিল। ১৮৭২ সালের মার্চে তিনি কালাপানি পৌঁছেন। দশ-এগারো বছরের যুলুম-নির্যাতন ও দেশান্তরের পর ১৮৮৩ সালে (১৩০০ হিঃ) তিনি কালাপানি থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন।[7]

ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও মুজাহিদগণকে সাহায্য করার অপরাধে ওহাবীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে এটি ছিল তৃতীয়। ইংরেজদের নিকট একে ‘মালদহ বিদ্রোহ মামলা’ নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে।

৪. রাজমহল বিদ্রোহ মামলা :

মালদহ বিদ্রোহ মামলার অল্প কিছুদিন পর ১৮৭০ সালে ওহাবীদের বিরুদ্ধে রাজমহলে[8] চতুর্থ রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এই মামলার মূল টার্গেট ছিলেন ইবরাহীম মন্ডল।[9] যিনি রাজমহল শহরতলীর ইসলামপুর নামক স্থানের বাশিন্দা ছিলেন। বিহার প্রদেশের ভাগলপুর কমিশনারীতে রাজমহল অবস্থিত।

ইবরাহীম মন্ডল অত্যন্ত সাহসী ও মুত্তাক্বী ব্যক্তি ছিলেন। আযীমাবাদের (পাটনা) আলেমগণের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল। জামা‘আতে মুজাহিদীন-এর সক্রিয় কর্মী ছিলেন। সীমান্ত এলাকায় নগদ অর্থও প্রেরণ করতেন এবং জিহাদের জন্য লোকও পাঠাতেন। হান্টার তার Our Indian Musalmans  গ্রন্থে যেভাবে তাঁর কথা উল্লেখ করেছেন তা থেকে জানা যায় যে, ইংরেজ সরকারের নিকট ইনি অত্যন্ত বিপজ্জনক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি লিখছেন যে, ১৮৭০ সালে যখন ওহাবী আন্দোলনের কেন্দ্রগুলোর উপর আক্রমণ চালানো হয়েছিল, তখন ইবরাহীম মন্ডল ঐ সমস্ত ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যাদেরকে বিশেষভাবে ষড়যন্ত্র মামলার জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল। হান্টার এও বলেছেন যে, ‘তার ষড়যন্ত্রের জাল যেকোন দুর্বল সরকারকে ভীত-সন্ত্রস্ত করার জন্য যথেষ্ট ছিল’।

১৮৭০ সালের অক্টোবরে ইবরাহীম মন্ডলের যাবজ্জীবন কারাদন্ড সহ কালাপানিতে নির্বাসন ও সম্পত্তি বাযেয়াফ্তকরণের সাজা হয়েছিল।[10] মাওলানা মুহাম্মাদ জা‘ফর থানেশ্বরী- যিনি সেই দিনগুলিতে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে যাবজ্জীবন কারাদন্ড ভোগ করছিলেন, তিনি নিজ গ্রন্থ ‘কালাপানি’তে লিখছেন- ‘একজন বৃদ্ধ ও দুর্বল ব্যক্তি ইবরাহীম মন্ডলকে ইসলামপুরে গ্রেফতার করে এবং নিজেদের সাধারণ ও পুরনো সাক্ষীদের দ্বারা ইচ্ছামতো সাক্ষী  প্রদান করিয়ে বেচারাকে কালাপানিতে রওয়ানা করে দেয়’।

৫. আযীমাবাদের ২য় বিদ্রোহ মামলা :

মাওলানা আহমাদুল্লাহর বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রের প্রথম মামলা ১৮৬৫ সালে আযীমাবাদে (পাটনা) দায়ের করা হয়েছিল। এর ছয় বছর পর ১৮৭১ সালে ২য় মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলায় আসামী ছিলেন ৭ জন। এদের নাম হল- ১. মাওলানা মুবারক আলী ২. মাওলানা তাবারুক আলী ৩. হাজী দ্বীন মুহাম্মাদ ৪. হাজী আমীনু্দ্দীন ৫. পীর মুহাম্মাদ ৬. হাশমত দাদ খান ও ৭. আমীর খান।[11]

ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট বারবুরের আদালতে ১৮৭১ সালের ১লা মার্চে মামলার প্রাথমিক শুনানি শুরু হয়। ২৭শে মার্চে চার্জশিট প্রদান করে অপরাধীদেরকে সেশন জজ আদালতে সোপর্দ করে দেয়া হয়। ১৮৭১ সালের ১লা মে থেকে সেশন জজ মিঃ প্রিন্সপ মামলার শুনানি শুরু করেন। সরকারের পক্ষ থেকে গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করার জন্য ১৩৬ জন সাক্ষীর দীর্ঘ তালিকা আদালতকে প্রদান করা হয়। কিন্তু ১১৩ জনকে আদালতে হাযির করা হয়। ৪৬ জন ব্যক্তি আসামীদের পক্ষ থেকে ছাফাই সাক্ষ্য প্রদান করেন। মাঝখানে কিছুদিন শুনানি মুলতবী থাকে। অতঃপর ১৮৭১ সালের শেষের দিকে মামলার রায় শোনানো হয়। এটি ঈসায়ী ঊনবিংশ শতক ও হিজরী ত্রয়োদশ শতকের শেষ বড় ষড়যন্ত্র মামলা ছিল। যেটি ‘বড় ওহাবী মোকদ্দমা’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

মাওলানা আহমাদুল্লাহর গ্রেফতারির পর এই মামলার আসামী মাওলানা মুবারক আলীকে ছাদেকপুরের মুজাহিদ কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করা হয়েছিল। ইনি প্রথমে ১৮৬৮ সালে গ্রেফতার হন। এরপর ১৮৭১ সালের মামলায় ধৃত হন এবং তাঁকে এত কঠিন শাস্তি দেয়া হয় যে, কারাগারে থাকা অবস্থাতেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

মাওলানা মুবারক আলীর ছেলে মাওলানা তাবারুক আলীর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ ছিল যে, ১৮৬২ সালের যুদ্ধে সীমান্তের আম্বালা নামক স্থানে ইংরেজদের বিরুদ্ধে মুজাহিদগণ যে যুদ্ধ করেছিলেন- ইনি তৎকালীন আমীরে মুজাহিদীন মাওলানা আব্দুল্লাহর সাথে জিহাদে শরীক ছিলেন। তিনি মুজাহিদ বাহিনীর একটি বাহু পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। এই অপরাধে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদন্ডসহ কালাপানিতে নির্বাসনের সাজা হয়। ১৮৭২ সালের মার্চ মাসে মাওলানা আমীরুদ্দীন প্রমুখের সাথে কালাপানি পৌঁছেন। ১০ বছর জেল খাটার পর মুক্তি পান। হাজী দ্বীন মুহাম্মাদ ও পীর মুহাম্মাদকে কয়েকবার গ্রেফতার করা হয় এবং বিভিন্ন জেলে রাখা হয়। এভাবে হাজী আমীনুদ্দীনকেও বারবার গ্রেফতার করা হয় এবং বিভিন্ন মামলায় কয়েকবার ফাঁসানো হয়।

জিহাদ আন্দোলনের কতিপয় সাহায্যকারী :

বালাকোট যুদ্ধের পর পরিস্থিতি এমন দিকে মোড়  নেয় যে, আহলেহাদীছ আলেমগণই কেবল জিহাদ আন্দোলনের প্রকৃত সাহায্যকারী হন এবং এই জামা‘আতের সাথে কেবল তাদেরই সম্পর্ক বজায় থাকে। এরাই উপরোল্লিখিত পাঁচটি ওহাবী মামলার নিশানায় পরিণত হন। ঐ সমস্ত মামলার বিস্তারিত বিবরণ তো বহু দীর্ঘ। কিন্তু এখানে অত্যন্ত সংক্ষিপ্তাকারে ইঙ্গিতে আলোচনা করা হয়েছে।

এক্ষণে অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে মুজাহিদীন জামা‘আতের কতিপয় সাহায্যকারীর পরিচয় পেশ করা হচ্ছে :

১. মাওলানা শামসুল হক আযীমাবাদীর গভীর মনীষা সমগ্র উপমহাদেশে সুবিদিত ছিল। তিনি মিয়াঁ সাইয়িদ নাযীর হুসাইন দেহলভীর বহু গ্রন্থপ্রণেতা ছাত্র এবং জামা‘আতে মুজাহিদীন-এর সাহায্যকারী ছিলেন। তিনি ১৩২৯ হিজরীর ৯ই রবীঊল আউয়াল (১০ই মার্চ ১৯১১ খ্রিঃ) মৃত্যুবরণ করেন।

২. মাওলানা আব্দুল আযীয রহীমাবাদী উপমহাদেশের উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন আলেম ছিলেন। তিনি সর্বদা জামা‘আতে মুজাহিদীনকে আর্থিক ও ব্যক্তিগত সহযোগিতা প্রদান করেছেন। এটি চরম ইংরেজ সরকার বিরোধী জামা‘আত হওয়ায় এর যে কোন ধরনের সাহায্যকারী ইংরেজদের দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দিত ছিল। মাওলানাও সর্বদা তাদের ক্রোধের পাত্র ছিলেন। তিনি ১৩৩৬ হিজরীর ৪ঠা জুমাদাল আখেরাহ (১৭ই মার্চ ১৯১৮ খ্রিঃ) মৃত্যুবরণ করেন।

৩. কাযী মুহাম্মাদ সোলায়মান মানছূরপুরী পূর্ব পাঞ্জাবের সাবেক শিখ রাজ্য পাতিয়ালার সেশন জজ ছিলেন। এটা ছিল অনেক বড় পদ যাতে তিনি সমাসীন ছিলেন। তিনি গোপনে জামা‘আতে মুজাহিদীনকে প্রচুর আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। তিনি ১৩৪৯ হিজরীর ১লা মুহাররমে (৩০শে মে ১৯৩০) মৃত্যুবরণ করেন।

৪. মাওলানা আব্দুল কাদের ক্বাছূরী বিদ্যাবত্তা ও রাজনৈতিক দিক থেকে উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ও তাঁর পুত্ররা সর্বদা জামা‘আতে মুজাহিদীনের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি ১৩৬১ হিজরীর ৬ই যিলক্বদ (১৬ই নভেম্বর ১৯৪২ খ্রিঃ) মৃত্যুবরণ করেন।

৫. মাওলানা মুহিউদ্দীন আহমাদ ক্বাছূরী আহলেহাদীছ জামা‘আতের প্রসিদ্ধ আলেম ও মাওলানা আব্দুল কাদের কাছূরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন। ইংরেজ সরকার তাঁকে কঠিন শাস্তি দিয়েছিল। তিন বছর জলন্ধর যেলার দাসূহা নামক স্থানে তাঁকে নযরবন্দী করে রেখেছিল। উপমহাদেশকে ইংরেজদের নিকট থেকে স্বাধীন করানো এবং জামা‘আতে মুজাহিদীনকে সহযোগিতা করাই ছিল তাঁর অপরাধ। তাঁর মৃত্যু তারিখ ২৬শে যিলক্বদ ১৩৯০ হিজরী (২৪শে জানুয়ারী ১৯৭১ খ্রিঃ)।

৬. মাওলানা মুহাম্মাদ আলী ক্বাছূরী এম.এ ক্যান্টবও মাওলানা আব্দুল কাদের ক্বাছূরীর প্রিয়পুত্র ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ মুজাহিদ বাহিনীর কেন্দ্রে অবস্থান করেন এবং এই জামা‘আতের বেহিসাব আর্থিক সহযোগিতাও করেন। তিনি ১৩৭৫ হিজরীর ২৬শে জুমাদাল ঊলা (১২ই জানুয়ারী ১৯৫৬ খ্রিঃ) পরপারে পাড়ি জমান।

৭. মাওলানা মুহাম্মাদ আলী লাক্ষাবী মাদানী পাঞ্জাবের অনেক বড় আলেম পরিবারের খ্যাতিমান ব্যক্তি ছিলেন। জামা‘আতে মুজাহিদীনের বিশিষ্ট সাহায্যকারীদের মধ্যে তাঁকে গণনা করা হ’ত। তিনি ১৩৯৩ হিজরীর ২৩শে যিলক্বদ (১৯শে ডিসেম্বর ১৯৭৩ খ্রিঃ) এই নশ্বর পৃথিবী থেকে চিরস্থায়ী জগতে পাড়ি জমান। তিনি ‘বাক্বী’ (মদীনা মুনাউওয়ারাহ) কবরস্থানে দাফন হন।[12]

৮. মাওলানা আব্দুল ওয়াহেদ গযনভী উপমহাদেশের প্রসিদ্ধ আলেম পরিবারের খ্যাতিমান সদস্য ছিলেন। লাহোরের চীনাওয়ালী জামে মসজিদের খতীব ছিলেন। জামা‘আতে মুজাহিদীনকে সহযোগিতা করার কারণে তাঁকে ইংরেজ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অফিসারদের পুনঃপুনঃ জিজ্ঞাসাবাদ চলতে থাকত। তিনি ১৩৪৯ হিজরীতে (১৯৩০ খ্রিঃ) পরপারে পাড়ি জমান।

৯. হাফেয আব্দুস সাত্তার ওমরপুরী ১৩০১ হিজরীতে (১৮৮৪ খ্রিঃ) ওমরপুর (যেলা মুযাফফর নগর, ইউপি) নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মাওলানা আব্দুল গাফফার হাসান-এর পিতা ছিলেন এবং জামা‘আতে মুজাহিদীন-এর সাথে সম্পর্ক রাখতেন। ইংরেজ পুলিশ তাঁর পিছনে লেগে থাকত। সর্বশেষ ১৩৩৪ হিজরীর ১লা জুমাদাল ঊলা (৬ই মার্চ ১৯১৬ খ্রিঃ) সন্ধ্যায় গ্রেফতারী পরোয়ানা নিয়ে পুলিশ যখন তাঁর বাড়িতে পৌঁছে, তখন ঐ দিন সকালে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং তাঁকে দাফনও করা হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন!

এগুলি হল কতিপয় ব্যক্তির নাম। নতুবা অসংখ্য ব্যক্তি ছিলেন যারা যথারীতি মুজাহিদগণের কেন্দ্রে বড় অংকের অর্থ পাঠাতেন। তাঁদের মধ্যে আয়নুল কুযাত লাক্ষ্ণৌভী, মাওলানা যায়নুল আবেদীন (ঢাকা),[13] ডাঃ মুহাম্মাদ ফরীদ (দারভাঙ্গা), শায়খ আতাউর রহমান, প্রতিষ্ঠাতা, রহমানিয়া মাদরাসা, দিল্লী; হাফেয হামীদুল্লাহ দেহলভী, মাওলানা মুহাম্মাদ ইবরাহীম বেনারসী, হাফেয আব্দুল্লাহ গাযীপুরী, মাওলানা মুহাম্মাদ ইবরাহীম মীর শিয়ালকোটী, মাওলানা মুহাম্মাদ ইসমাঈল সালাফী, কাযী আব্দুর রহীম (গুজরানওয়ালা), মাওলানা আব্দুল খাবীর আযীমাবাদী, হাকীম নূরুদ্দীন লায়ালপুরী, শেঠ মুহাম্মাদ দাঊদ দেহলভী, হাজী আতাউল্লাহ উডানওয়ালা (যেলা ফায়ছালাবাদ) ও অন্যান্য অসংখ্য ব্যক্তি শামিল আছেন। না প্রত্যেকের নাম লিপিবদ্ধ করা সম্ভব, আর না তাদের পরিচয় পেশ করা সম্ভব।

আরো কতিপয় প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব :

উল্লিখিত বুযুর্গানে দ্বীন ছাড়াও আরো অনেক বুযুর্গ ছিলেন যারা স্থায়ীভাবে মুজাহিদগণের কেন্দ্রকে নিজেদের আবাসস্থল নির্ধারণ করেছিলেন এবং এই সঠিক পথে নিজেদের জীবন ওয়াক্ফ করে দিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে একজন বুযুর্গ ছিলেন ছূফী অলি মুহাম্মাদ (ফাতূহীওয়ালা, যেলা ক্বাছূর)। এই পবিত্র দলেরই একজন সদস্য ছিলেন মাওলানা মুহাম্মাদ বাশীর। ১৩৫৩ হিজরীর রামাযান মাসের প্রথম রাত্রে যাকে আব্দুল হালীম নামের এক ব্যক্তি মুজাহিদীন কেন্দ্র চামারকান্দে শহীদ করে দিয়েছিল। মাওলানা মুহাম্মাদ বাশীর মূলতঃ ফীরোযপুর যেলার (পূর্ব পাঞ্জাব) ‘মালওয়া’ নামক গ্রামের বাশিন্দা ছিলেন। তিনি ১৩০২ হিজরীতে (১৮৮৫ খ্রিঃ) জন্মগ্রহণ করেন। উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন আলেম ছিলেন। ১৩৩৩ হিজরীতে (১৯১৫ খ্রিঃ) মুজাহিদগণের কেন্দ্রে পৌঁছেছিলেন। অত্যন্ত বাস্তববাদী ও দূরদর্শী ব্যক্তি ছিলেন। জামা‘আতে মুজাহিদীনই তাঁর কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল।[14]

জামা‘আতে মুজাহিদীনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মাওলানা ফযলে এলাহী ওয়াযীরাবাদী। তিনি ১২৯৯ হিজরীর ২৭শে রামাযান (১২ই আগস্ট ১৮৮২ খ্রিঃ) ওয়াযীরাবাদে (যেলা গুজরানওয়ালা) জন্মগ্রহণ করেন। ১৯০০ সালে ম্যাট্রিক পাশ করে রেলওয়ে আদালতে চাকুরীতে নিয়োজিত হন। কিন্তু দ্রুত চাকুরী ছেড়ে দিয়ে ১৯০৩ সালে আসমাস্ত পৌঁছে যান। যেটি সে সময় মুজাহিদগণের কেন্দ্র ছিল এবং মাওলানা আব্দুল করীম ছিলেন জামা‘আতের আমীর। জিহাদ আন্দোলনে তিনি অপরিসীম খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। ইংরেজ সরকার তাঁকে কয়েকবার গ্রেফতার করে এবং জীবনের অনেকটা সময় তিনি জেলে বন্দী থাকেন। কেন্দ্রীয় আমীরের পক্ষ থেকে তাঁকে ভারতে মুজাহিদীন জামা‘আতের আমীর নিযুক্ত করা হয়েছিল। গোপনে তিনি সমগ্রদেশে ঘুরতেন এবং জামা‘আতের কর্মসূচী অনুযায়ী ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা চালাতেন। সরকার তাঁর বিরুদ্ধে অনেক মামলা দায়ের করেছিল। ৩০২ ধারা অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা মামলাও দায়ের করা হয়েছিল। এটা আশ্চর্যজনক ব্যাপার যে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও তিনি ব্রিটিশ সরকারের দায়ের করা মামলাসমূহে ভুগতে থাকেন। এভাবে বছরের পর বছর আত্মগোপন ও দেশান্তরের পর যখন উপমহাদেশের স্বাধীনতার ৮ মাস অতিবাহিত হয়েছিল, তখন ১৩৬৭ হিজরীর ১৭ই জুমাদাল আখেরাহ (২৭শে এপ্রিল ১৯৪৮ খ্রিঃ) তিনি নিজ জন্মভূমি ওয়াযীরাবাদে আসলে ব্রিটিশ আমলের দায়ের করা মামলাসমূহের আলোকে পাকিস্তান সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে। এজন্য লোকজন পাকিস্তান সরকারের নিকট তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং গভর্ণর জেনারেল, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে টেলিগ্রাম করলে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। তিনি ১৩৭০ হিজরীর ২৯শে রজব (&৫ই মে ১৯৫১ খ্রিঃ) ওয়াযীরাবাদে মুত্যুবরণ করেন এবং তাঁর অছিয়ত অনুযায়ী তাঁকে বালাকোটে দাফন করা হয়।[15]

জামা‘আতে মুজাহিদীনের উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন সদস্যগণের মধ্যে আরেকজন ছিলেন ছূফী আব্দুল্লাহ। যিনি ১৩০৪ হিজরীর (১৮৮৭ খ্রিঃ) দিকে ওয়াযীরাবাদে (যেলা গুজরানওয়ালা) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রাথমিক জীবন নানাভাবে অতিক্রান্ত হয় এবং কাছাকাছি ১৩২০ হিজরীতে (১৯০২ খ্রিঃ) তিনি জামা‘আতে মুজাহিদীনে যোগদান করেন। অতঃপর দ্রুত মুজাহিদগণের কেন্দ্রে চলে যান। তিনি এই জামা‘আতের অপরিসীম খিদমত করেন এবং এই পথে কঠিন কষ্ট সমূহ স্বীকার করেন। পুরা যৌবনকাল এ পথে ব্যয় করে দেন। ১৩৪১ হিজরীর (১৯২৩ খ্রিঃ) আগেপিছে উডানওয়ালায় (যেলা ফায়ছালাবাদ) আসেন এবং সেখানে ‘দারুল উলূম তা‘লীমুল ইসলাম’ নামে মাদরাসা চালু করেন। অসংখ্য ছাত্র ও আলেম এই দারুল উলূম থেকে ইলম হাছিল করেছেন। এরপর উডানওয়ালা থেকে তিন মাইল দূরত্বে মামূঁকাঞ্জনে ‘জামে‘আ তা‘লীমুল ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই জামে‘আটি কয়েক একর জমিতে অবস্থিত।

ছূফী আব্দুল্লাহ এমন আলেম ছিলেন যার দো‘আ কবুল হত। তাঁর দো‘আ কবুলের ঘটনাসমূহ অত্যন্ত আশ্চর্যজনক। আমি ‘তাযকেরায়ে ছূফী মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ’ নামে তাঁর পৃথক জীবনী গ্রন্থ রচনা করেছি। যেটি সাড়ে চারশ পৃষ্ঠাব্যাপী এবং মাকতাবা সালাফিইয়াহ, শীশমহল রোড, লাহোর সেটি প্রকাশ করেছে। তিনি ১৩৯৫ হিজরীর ১৪ই রবীউল আখের (২৮শে এপ্রিল ১৯৭৫) মৃত্যুবরণ করেন এবং জামে‘আ তা‘লীমুল ইসলাম (মামূঁকাঞ্জন)-এর সীমানার মধ্যে তাঁকে দাফন করা হয়।

জামা‘আতে মুজাহিদীন-এর সাথে মাওলানা আবুল কালাম আযাদের বিশেষ সম্পর্ক ছিল। এ জামা‘আতের আমীর মাওলানা আব্দুল করীমের সাথে মাওলানা আযাদের যোগাযোগ থাকত এবং জামা‘আতের বিভিন্ন সদস্যও গোপনে মাওলানার সাথে সম্পর্ক রাখত। আমীর ছাহেবের অনুরোধে একবার মাওলানা আযাদ তাঁর চিকিৎসার জন্য এক তরুণ ডাক্তারও সেখানে (মুজাহিদ কেন্দ্রে) প্রেরণ করেছিলেন। যিনি মাওলানার সম আক্বীদার লোক ছিলেন। এই ডাক্তার কিছুদিন সেখানে অবস্থান করেছিলেন।

এই হল জামা‘আতে মুজাহিদীন ও এর কতিপয় সাহায্যকারীর সংক্ষিপ্ত পরিচয়। এসকল ব্যক্তি আহলেহাদীছ মাসলাকের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং তাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মূল লক্ষ্য ছিল স্বৈরাচারী ইংরেজ সরকারের কবল থেকে উপমহাদেশকে মুক্ত করা।

জমঈয়তে ওলামায়ে হিন্দ প্রতিষ্ঠা :

এছাড়া উপমহাদেশে যেসব রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেগুলোতেও আহলেহাদীছ আম জনতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ আগ্রহভরে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বরং কোন কোন সংগঠন আহলেহাদীছ ওলামা ও নেতৃবৃন্দের প্রচেষ্টাতেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। যেমন ১৯১৯ সালের শেষের দিকে মাওলানা ছানাউল্লাহ অমৃতসরীর প্রচেষ্টায় ‘জমঈয়তে ওলামায়ে হিন্দ’ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এর প্রথম সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন মাওলানা ছানাউল্লাহ অমৃতসরী। যা ১৯২০ সালের ১লা জানুয়ারী মাওলানা আব্দুল বারী ফিরিঙ্গীমহলীর সভাপতিত্বে অমৃতসরে অনুষ্ঠিত হয়। তিনি লিখিত স্বাগত ভাষণ পাঠ করেছিলেন। অতঃপর মাওলানা ছানাউল্লাহ অমৃতসরীর প্রস্তাব ও প্রচেষ্টায় মুফতী কেফায়াতুল্লাহ দেহলভীকে জমঈয়তে ওলামায়ে হিন্দ-এর সভাপতি এবং মাওলানা আহমাদ সাঈদ দেহলভীকে সেক্রেটারী জেনারেল করা হয়েছিল।[16] ঐ সময় দেশের সব রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ ছিল। মতিলাল নেহরুর সভাপতিত্বে অমৃতসরেই কংগ্রেসের সম্মেলন হয়েছিল। ঐ প্যান্ডেলেই মাওলানা শওকত আলীর সভাপতিত্বে ‘অল ইন্ডিয়া খেলাফত মজলিস’-এর এবং সেখানেই হাকীম মুহাম্মাদ আজমাল খাঁর সভাপতিত্বে ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ’-এর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এখানেও অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ছিলেন মাওলানা ছানাউল্লাহ অমৃতসরী এবং তিনি লিখিত স্বাগত ভাষণ পেশ করেছিলেন।

মজলিসে আহরার প্রতিষ্ঠা :

১৯২৯ সালে ‘মজলিসে আহরার’ প্রতিষ্ঠা লাভ করলে মাওলানা সাইয়িদ মুহাম্মাদ দাঊদ গযনভী এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং তাঁকে এর সেক্রেটারী জেনারেল করা হয়।

মাওলানা আব্দুল কাদের ক্বাছূরী ১৯২০-১৯৩০ সাল পর্যন্ত পাঞ্জাব কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন। খেলাফত মজলিসের সভাপতিত্বও কয়েক বছর তাঁর ওপরে ন্যস্ত ছিল।

মাওলানা আবুল কাসেম বেনারসী (মৃঃ ২৫শে নভেম্বর ১৯৪৯ খ্রিঃ/৩রা ছফর ১৩৬৯ হিঃ) দেশের স্বাধীনতার জন্য অবস্থার প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলসমূহে অন্তর্ভুক্ত হন এবং জেল-যুলুমের কষ্ট সহ্য করেন। তিনি জামা‘আতে মুজাহিদীন-এরও অনেক বড় সাহায্যকারী ছিলেন। মাওলানা আবুল কালাম আযাদের রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কেও মানুষ অবগত আছে। ‘তাহরীকে রেশমী রূমাল’ বা ‘রেশমী রুমাল আন্দোলনে’ও এঁরা শামিল ছিলেন।[17] এ সম্পর্কিত গ্রন্থগুলিতে বহু আহলেহাদীছ ওলামা ও নেতৃবৃন্দের নাম লিখিত আছে। সীমান্ত প্রদেশের ‘খোদায়ী খিদমতগার জামা‘আতে’ও অসংখ্য আহলেহাদীছ সক্রিয় ছিলেন এবং কারাবন্দী হয়েছিলেন। বিস্তারিত আলোচনার স্থান এটা নয়। অতএব এখানেই এ বিষয়ে আলোচনার ইতি টানছি। শুধু এটা উল্লেখ করাই উদ্দেশ্য যে, উপমহাদেশের স্বাধীনতার জন্য আহলেহাদীছ জামা‘আত সর্বদা সক্রিয় ভূমিকায় ছিল।



* পিএইচ.ডি গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

[1]. দি ইন্ডিয়ান মুসলমান্স, অনুবাদ : এম. আনিসুজ্জামান (ঢাকা : খোশরোজ কিতাব মহল, ২০০০), পৃঃ ৬৬।-অনুবাদক

[2]. মাওলানা আব্দুর রহমান লাক্ষ্ণৌবী মূলতঃ মালীহাবাদ, লাক্ষ্ণৌ-এর মানুষ ছিলেন। পাটনা কেন্দ্রের নির্দেশক্রমে তাঁকে মালদহ অঞ্চলে দাওয়াত ও জিহাদের তৎপরতা বৃদ্ধির জন্য পাঠানো হয়েছিল। তিনি দিলালপুর কেন্দ্রের (বিহার, ভারত) মুজাহিদ নেতা মাওলানা আহমাদুল্লাহ আযীমাবাদীর কন্যাকে বিবাহ করেন। সেখানে অবস্থিত শামসুল হুদা মাদরাসায় তিনি শিক্ষকতা করতেন এবং গোপনে মুজাহিদ প্রশিক্ষণ দিতেন। বাংলা অঞ্চলের জিহাদ সংগঠক রফীক মন্ডলকে তিনিই খেলাফত দিয়ে যান। খ্যাতনামা আলেম গাযী মাওলানা আব্দুল মান্নান ও মাওলানা আব্দুল হান্নান দিলালপুরী (মৃঃ ২৫শে নভেম্বর ১৯৮২) আব্দুর রহমান লাক্ষ্ণৌবীর পুত্র ছিলেন। দ্রঃ আহলেহাদীছ আন্দোলন (পিএইচ.ডি থিসিস), পৃঃ ৪০৯, ৪২৭ (টীকা ৩০) ও ৪৪২-৪৪৩।-অনুবাদক।

[3]. রফীক মন্ডল ওরফে রফী মোল্লা বিন বরকতুল্লাহ একজন অতি সাধারণ ব্যক্তি ছিলেন। হান্টার তাঁকে নিম্নশ্রেণীর কৃষক বলে উল্লেখ করেছেন (দি ইন্ডিয়ান মুসলমান্স, পৃঃ ৬৬)। মাওলানা আব্দুর রহমান লাক্ষ্ণৌবীর নিকট থেকে শিক্ষা অর্জন করে তিনি জিহাদ আন্দোলনের একজন নিবেদিতপ্রাণ ও প্রতিভাবান কর্মীতে পরিণত হন। বর্তমান বাংলাদেশের সীমান্ত যেলা চাঁপাই নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানার অন্তর্গত পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত নারায়ণপুর কেন্দ্রের (প্রতিষ্ঠাকাল সম্ভবতঃ ১৮৪০ খ্রিঃ) তিনি প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ছিলেন। ১৮৪০ সালের আগে-পিছে মাওলানা এনায়েত আলী আযীমাবাদীর হাতে তিনি জিহাদের বায়‘আত গ্রহণ করেন এবং উত্তরবঙ্গে জিহাদ আন্দোলনের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন (আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ৪৩৬-৩৭)। হান্টারের ভাষ্য অনুযায়ী ১৮৪৩ সালের মধ্যেই তাঁর অতুলনীয় সাংগঠনিক প্রতিভার মাধ্যমে তিনি ‘প্রায় আশি হাযার অনুগামীর এক বিরাট দল’ গড়ে তুলেন, যারা ‘প্রত্যেকে ব্যক্তিগত স্বার্থকে গোটা সম্প্রদায়ের স্বার্থ বলে বিবেচনা করত’ (দি ইন্ডিয়ান মুসলমান্স, পৃঃ ৮৫)। রাজশাহী, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, মালদহ এলাকায় জিহাদ আন্দোলনের প্রচার-প্রসারে ও সমাজ সংস্কারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তদানীন্তন সময়ে এসব এলাকার মুসলমানেরা শিরক-বিদ‘আত ও কুসংস্কারে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিল।  তারা হিন্দুদের মতো মাথায় টিকি রাখত। মেয়েরা নদীর তীরে কাপড় খুলে রেখে গোসল করতে নামত। দরগাহ ও পীরপূজায় সকলে অভ্যস্ত ছিল। তিনি ব্যাপক দাওয়াতী কর্মতৎপরতা গ্রহণ করে হুক্কা বন্ধ করেন। দরগাহ ও পীরপূজার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলেন। মাথার টিকি কাটা শুরু করেন। নদীর পাড় থেকে নগ্ন মেয়েদের কাপড় বাড়ীতে এনে পরে তাদের স্বামীদের ডাকিয়ে নছীহত করে কাপড় ফিরিয়ে দিতে লাগলেন। এভাবে সর্বত্র আলোড়ন সৃষ্টি হলে কুচক্রীমহল ও বিদ‘আতী-কবরপূজারী আলেমরা তাঁর বিরুদ্ধে শাসন কর্তৃপক্ষের কান ভারি করে তুলল। ফলে রফী মোল্লা ১৮৫৩ সালে গ্রেফতার হয়ে মুর্শিদাবাদ-এর জঙ্গীপুর জেলে নীত হন। কিন্তু অল্প দিন পরেই মুক্তি পান (আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ৪১০-১১, ৪১৩-১৪, ৪৩৬-৩৮)। রফী মোল্লার পৌত্র স্বনামধন্য আলেম মাওলানা আহমাদ হোসাইন শ্রীমন্তপুরী বলেন যে, ভারতের বিহার প্রদেশের পূর্ণিয়া সদর, কিষাণগঞ্জ, পূর্ণিয়া যেলার বাইশী, ধরমগঞ্জ, দীঘলবাঁক, ছাহেবগঞ্জ যেলার বার হারোয়া থানা, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ যেলার সূতী থানাধীন নূরপুর, সুজনীপাড়া, শেরপুর, বাহাদুরপুর প্রভৃতি এলাকা এবং পশ্চিম দিনাজপুর যেলার ইটাহার, রায়গঞ্জ, করণদীঘি, গোয়ালপুকুর, চোপড়-ইসলামপুর, গঙ্গারামপুর, তপন প্রভৃতি থানা সমূহের নদী তীরবর্তী এলাকা এমনকি পশ্চিমবঙ্গের গল্গলিয়া রেলস্টেশনের বিপরীতে নেপালের ঝাপ্পা ও ভদ্রপুর থানার বহুলোক তাঁর ও তাঁর পুত্র আমীরুদ্দীনের তাবলীগে আহলেহাদীছ হয়েছেন। রফী মোল্লা তাঁর ২য় স্ত্রীর ছেলে শুকরুদ্দীনকে জিহাদের উদ্দেশ্যে সিত্তানা মুজাহিদ ঘাঁটিতে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পরে তিনি বাড়ী ফিরে এলে তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে মোল্লাজী কথাবার্তা বন্ধ করে দেন এবং সেই বেদনায় মর্মাহত হয়ে কিছুদিনের মধ্যেই চাঁপাই নারায়ণপুরে মৃত্যুবরণ করেন। সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। পরে নদীগর্ভে কবরটি বিলীন হয়ে যায় (আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ৪৩৭, ৪৪০)। রফী মোল্লার জীবদ্দশায় তাঁর ১ম স্ত্রীর ছেলেরা অর্থাৎ কামীরুদ্দীন, আমীরুদ্দীন ও শামসুদ্দীন বিহারের আগলই নারায়ণপুরে চলে আসেন। ২য় স্ত্রীর ছেলে শুকরুদ্দীন গাযী, সাখাওয়াতুল্লাহ ও মুহাম্মাদ আলী মন্ডলের বংশধরগণের অনেকে রফী মোল্লার ইন্তেকালের প্রায় ত্রিশ বছর পরে নদী ভাঙ্গনের ফলে নারায়ণপুর ত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং আগলই- নারায়ণপুরে তাদের অংশের প্রাপ্য ২২ বিঘা জমি বিক্রি করে বর্তমানে পশ্চিম দিনাজপুর যেলার ইটাহার থানাধীন শ্রীমন্তপুর গ্রামে বসবাস শুরু করেন (ঐ, পৃঃ ৪৪০)।-অনুবাদক

[4]. রফী মোল্লার পুত্র মৌলভী আমীরুদ্দীন পিতার নিকট থেকে প্রাপ্ত জিহাদ আন্দোলনের গুরুদায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন এবং উল্লিখিত এলাকা সমূহে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলেন। সাংগঠনিক দক্ষতা ও দূরদর্শিতার ফলে তাঁর তত্ত্বাবধানে মালদহ কেন্দ্রটির গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায় এবং বাস্তবিকই এটি বাংলার সকল যেলাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর একটি প্রসিদ্ধ ঘাঁটিতে পরিণত হয়। সেজন্য পাটনার নেতৃবৃন্দ তথা মাওলানা এনায়েত আলী, ফাইয়ায আলী ও মাকছূদ আলী জিহাদ সংগঠনের কাজে এখানে এসেই অবস্থান করতেন (ড. কিয়ামুদ্দীন আহমাদ, হিন্দুস্তান মেঁ ওহাবী তাহরীক, পৃঃ ১৮৪-১৮৫)। ১৮৬৮ সালের দিকে আমীরুদ্দীনের আন্দোলন কেমন সুসংগঠিত ও ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল, তার কিছুটা স্বীকৃতি হান্টার-এর রিপোর্টে পাওয়া যায়। যেমন তিনি বলেন, ‘বর্তমানে একটিমাত্র প্রদেশের (বঙ্গদেশের) ওহাবীদের উপরে নযর রাখা এবং তাদের তৎপরতাকে সীমার মধ্যে রাখতে গিয়ে ইংরেজ সরকারকে যে অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, তার পরিমাণ স্কটল্যান্ডের এক তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা অধ্যুষিত একটি বৃটিশ যেলার বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ ও ফৌজদারী অপরাধ দমনের কাজে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয় তার সমান। ষড়যন্ত্র (অর্থাৎ আন্দোলন) এত ব্যাপক এলাকা জুড়ে বিস্তার লাভ করেছে যে, এর কোথায় শুরু, তা বুঝা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। প্রতিটি যেলা কেন্দ্রে হাযার হাযার পরিবারের মাঝে অসন্তোষের বিষ ছড়াচ্ছে। কিন্তু এই তৎপরতার একমাত্র সম্ভাব্য সাক্ষী হচ্ছে এর কর্মীরা, যারা তাদের নেতার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার চেয়ে মৃত্যুবরণকেই শ্রেয় বলে মনে করে’ (দি ইন্ডিয়ান মুসলমান্স, পৃঃ ৮৫)। ১৮৭০ সালের মালদহ মামলার সরকারী রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘প্রথম থেকে বিচারের সময় পর্যন্ত ধর্মযুদ্ধের জন্য লোক সংগ্রহ করার কাজে তিনি আন্তরিক নিষ্ঠার পরিচয় দেন’ (ঐ, পৃঃ ৬৭)। ১৮৭০ সালে আমীরুদ্দীন গ্রেফতার হন এবং মুর্শিদাবাদ জেলে নীত হন। তাঁর গ্রেফতারের কারণ সম্পর্কে স্বীয় ভাতিজা মাওলানা আহমাদ হোসাইন শ্রীমন্তপুরীর মত হল- তিনি নারায়ণপুর মারকাযের নিকটবর্তী শিবগঞ্জ থানার অন্তর্গত তেররশিয়া-দুর্লভপুর অঞ্চলে তাবলীগী সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে গ্রামের জনৈক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির বাড়ীতে দাওয়াত ছিল। খানাপিনার সময় বাড়ীওয়ালা প্রথানুযায়ী তার প্রথম সন্তানসম্ভবা পুত্রবধুর জন্য তার বাপের বাড়ী থেকে প্রেরিত বিশেষভাবে তৈরি বিরাট আকারের গুড়ের ‘বাতাসা’ তাঁকে খেতে দেন। তিনি এটাকে কুসংস্কার বলে ফিরিয়ে দেন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এতে বাড়ীওয়ালা ক্ষুব্ধ হন এবং স্থানীয় থানার মুসলমান দারোগা মুর্তযা এবং জনৈক নুরু ফকীরের বাপ ওমর ফকীর-এর মাধ্যমে গোপনে স্থানীয় ইংরেজ প্রতিনিধিকে জানিয়ে দেন যে, এই ব্যক্তি রাজদ্রোহ প্রচার করেন এবং ‘খোরাসানে’ (আফগান সীমান্তের মুল্কা-সিত্তানা মূল ঘাঁটিকে খোরাসান বা বড় গুদাম বলা হত) টাকা পাঠান। ফলে তিনি সেখানেই গ্রেফতার হন এবং জিজ্ঞাসাবাদে সবকিছু অকপটে স্বীকার করেন। তাঁর সরলতায় মুগ্ধ হয়ে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট উকিলের মাধ্যমে তাঁকে একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে রাজদ্রোহের বিষয়টি অস্বীকার করতে ইংগিত করেন, যাতে তাঁকে  ‘পাগল’ বলে ছেড়ে দেওয়া যায়। কিন্তু তিনি রাযী হননি (আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ৪১২, ৪৩৯, ৪৫৯-৬০)।  তবে তাঁর গ্রেফতারের কারণ সম্পর্কে যে কথা এলাকায় প্রচলিত আছে তা এই যে, অন্যূন ২৫ কিলোমিটার দূরের ‘পাকুড়’ গ্রামের বিদ‘আতীরা তাদের প্রেরিত একজন ছাত্রের মাধ্যমে দিলালপুরের গোপন তথ্য জানতে পারে এবং ইংরেজ সরকারের কাছে তা ফাঁস করে দেয়। যার পরিণতিতে তাঁকে গ্রেফতার বরণ করতে হয় (আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ৪৪২)। তাঁর বিচার কলিকাতা হাইকোর্টে প্রেরিত হ’লে সেখানে তাকে ফাঁসির আদেশ শুনানো হয়। এতে খুশী হয়ে জোরে ‘আল-হামদুলিল্লাহ’ বলে উঠলে উক্ত আদেশ রদ করে কালাপানিতে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর দেওয়া হয় (ঐ, পৃঃ ৪১২, ৪৬০)। পরে সেখানকার একটি মাদরাসায় তিনি শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হন। একদিন তিনি ইংরেজ কর্মকর্তার ছেলেকে বললেন, তোমার আববা যে উদ্দেশ্যে আমাকে এখানে আটকে রেখেছেন, সে কাজ এখনও চলছে না বন্ধ হয়েছে? ছেলের মুখে একথা শুনে উক্ত অফিসারের সুফারিশক্রমে ১১ বছর পরে তিনি মুক্তি পান। অন্যান্য বন্দীদের সাথে ছাড়া পেয়ে ১৮৮৩ সালের ৩রা মার্চে কালাপানির পোর্ট ব্লেয়ার ত্যাগ করে হিন্দুস্থান অভিমুখে রওয়ানা হন এবং যথাসময়ে বাড়িতে পৌঁছেন (ঐ, পৃঃ ৪১২, ৪৩৯)। অতঃপর নিজ জন্মস্থান পাটনায় থাকার আবেদন মঞ্জুর হলে তিনি মাওলানা আব্দুর রহীমের সাথে সেখানে থাকতে শুরু করেন। প্রত্যেক মাসে তাঁকে একবার স্থানীয় পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট-এর নিকট হাযিরা দিতে হত। পুলিশকে অবহিত না করে শহরের বাইরে কোথাও যাওয়ার অনুমতি ছিল না (হিন্দুস্তান মেঁ ওহাবী তাহরীক, পৃঃ ৩৩০)। বিহারের ছাহেবগঞ্জের আগলই-নারায়ণপুরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন (আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ৪১৯)। আমীরুদ্দীনের অনেক ভক্ত চাঁপাই নবাবগঞ্জের ভোলাহাট থেকে হিজরত করে মালদহ যেলার বাট্না, কারবোনা প্রভৃতি এলাকায় বসবাস করছেন- যারা সকলেই আহলেহাদীছ (ঐ, পৃঃ ৪৩৭)। রফী মোল্লা ও আমীরুদ্দীনের আন্দোলনের ফলাফল সম্পর্কে আহলেহাদীছ আন্দোলন-এর উপর পিএইচ.ডি ডিগ্রী অর্জনকারী ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব তাঁর থিসিসে বলেন, ‘রফী মোল্লা ও আমীরুদ্দীনের সূচিত আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট সংগ্রহ করা সম্ভব না হ’লেও তার বাস্তব ফসল হিসাবে যা আমরা এখন প্রত্যক্ষ করি, তা এই যে, উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ বরেন্দ্র অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক নাগরিক শিরক ও বিদ‘আত হ’তে তওবা করে মুসলিম ও ‘আহলেহাদীছ’ হয়েছেন এবং অদ্যাবধি বৃহত্তর রাজশাহী, দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ ও মালদহ অঞ্চল সর্বাধিক আহলেহাদীছ অধ্যুষিত অঞ্চল হিসাবেই পরিচিত। তাদের মধ্যে এখনও শিরক ও বিদ‘আত বিরোধী মনোভাব বজায় আছে (আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ৪৩৮-৩৯)।-অনুবাদক

[5]. দি ইন্ডিয়ান মুসলমান্স, পৃঃ ৬৮।-অনুবাদক।

[6]. মাওলানা বেলায়েত আলীর মেজভাই মাওলানা এনায়েত আলী ১৮৩৩-১৮৪৩ এবং ১৮৪৭-১৮৪৯ দু’বারে মোট বারো বছর বাংলাদেশ অঞ্চলে জিহাদের প্রচার ও সংগঠনে অতিবাহিত করেন (আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ৪০৯, ৪৩৫)। মাওলানার ভাতিজা মাওলানা আব্দুর রহীম ছাদেকপুরী ‘তাযকেরায়ে ছাদেক্বাহ’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘তিনি প্রথমবারে একটানা সাত বৎসর এই অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে অবর্ণনীয় কষ্টভোগ ও ধৈর্যের সাথে ভ্রমণ করেছেন। তিনি লাখো মানুষকে অন্ধকার গহবর হতে টেনে এনে হেদায়াতের আলোকবর্তিকার একনিষ্ঠ প্রেমিক বানিয়েছেন এবং তাদেরকে কুরআন ও হাদীছের অনুসরণের প্রতি আগ্রহী করেছেন। তাঁর মাধ্যমে হেদায়াতপ্রাপ্ত ও তাঁদের উত্তরাধিকারী সন্তান-সন্ততিগণ আজও বাংলাদেশে বিভিনণ অঞ্চলে ‘মুহাম্মাদী’ নামে পরিচিত’ (আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ২৭১, ৩০১)। মাওলানা ছানাউল্লাহ অমৃতসরী (১২৮৭-১৩৬৭/১৮৬৮-১৯৪৮) ১৯১৩ সালে একবার বাংলাদেশ ভ্রমণে আসেন। তিনি পশ্চিম বাংলার দুম্কা ও মুর্শিদাবাদ যেলার কয়েকটি গ্রাম যেমন দিলালপুর, ইসলামপুর, জঙ্গীপুর ও বর্তমান বাংলাদেশের চাঁপাই নবাবগঞ্জ যেলাধীন নারায়ণপুর প্রভৃতি গ্রাম সফর করেন। পাঞ্জাবে ফিরে গিয়ে তিনি স্বীয় ‘আখবারে আহলেহাদীছ’ নামক সাপ্তাহিক পত্রিকায় তাঁর সংক্ষিপ্ত সফর বৃত্তান্ত প্রকাশ করেন। সেখানে একস্থানে তিনি বলেন, ‘আমি এই সফরে কেবলি চিন্তা করেছি বাংলাদেশে আহলেহাদীছের সংখ্যা এত বেশী কিভাবে হ’ল ও কার দ্বারা হ’ল? আমাকে বলা হ’ল যে, এসব মাওলানা এনায়েত আলী ও বেলায়েত আলীর বরকতেই হয়েছে’ (আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ২৭১, ৩০১-৩০২)। গবেষক ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব মাওলানা এনায়েত আলী সম্পর্কে বলেন, ‘মাওলানার কর্মোদ্দীপনা ছিল কিংবদন্তীর মতো। যেকাজেই তাঁকে লাগানো হ’ত, সেকাজেই তিনি সেরা প্রমাণিত হ’তেন। যখন থেকেই তিনি আমীর সৈয়দ আহমাদ ব্রেলভী ও আল্লামা ইসমাঈল (রহঃ)-এর সংস্পর্শে এসেছিলেন, তখন থেকেই এই জমিদারপুত্র সকল আরামকে হারাম করে আমীরের নির্দেশ মোতবেক দাওয়াত ও জিহাদের পথে জানমাল ওয়াক্ফ করে দেন। তাঁর দাওয়াতী তৎপরতার প্রায় সবটুকু সময় কেটেছিল বাংলাদেশ অঞ্চলে। দুইবার প্রায় একযুগ বাংলার গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে শিরক ও বিদ‘আতে নিমজ্জিত মুসলিম সমাজে তিনি যে ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন, তার তুলনা হয় না। ফলে তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত সীমান্তের সশস্ত্র জিহাদে বাঙ্গালী মুসলমানেরাই অধিক সংখ্যায় যোগদান করে, যা তাঁর মৃত্যুর পরেও জারি থাকে। বাংলাদেশে সর্বাধিক সংখ্যক আহলেহাদীছ থাকার মূলে তাঁরই অবদান ছিল সবচাইতে বেশী। তাঁর সংস্কার কার্যক্রমের মধ্যে একটি ঘটনা নিম্নরূপ : একদা পাবনা শহরে তাবলীগে এসে তিনি ‘চাপা মসজিদে’ ওঠেন। সেদিন ছিল মাদার পীরের বাঁশ উঠানো উৎসব। ঢাকঢোল পিটিয়ে বিরাট আকারে উৎসব চলছিল। মাওলানা সোজা উৎসবমঞ্চে উঠে গিয়ে শিরক ও বিদ‘আতের বিরুদ্ধে এক দরদমাখা জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন। উৎসবের হোতা গাদল খাঁ সহ উপস্থিত শত শত লোক তওবা করে মাওলানার হাতে বায়‘আত করেন। পাবনার রাধাকান্তপুরের উক্ত গাদল খাঁ ও তার পুত্র মাওলানা মুহাম্মাদ আলী খাঁ আজীবন জিহাদ ও আহলেহাদীছ আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন (আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ৩০৩-৩০৪)। তাঁর কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘জিহাদ আন্দোলনের আমীর মাওলানা এনায়েত আলী তৎকালীন যশোর যেলার হাকিমপুরকে কেন্দ্র করে বর্তমানে উত্তর ২৪ পরগনা, সাতক্ষীরা, খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, বগুড়া অঞ্চলে ব্যাপক তাবলীগী তৎপরতা চালাতে থাকেন। তিনি কোন এলাকায় গেলে প্রথমে নছীহতের মাধ্যমে তাদেরকে শিরক ও বিদ‘আতমুক্ত হবার আহবান জানাতেন। অতঃপর মসজিদ না থাকলে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করতেন ও ইমাম নিয়োগ করতেন। ইমাম নিয়োগের পর তাঁর নেতৃত্বে জামা‘আত কায়েম করতেন ও স্থানীয় যাবতীয় বিবাদ মীমাংসার দায়িত্ব উক্ত ইমামের উপরে ন্যস্ত করতেন (ঐ, পৃঃ ৪১৪)।-অনুবাদক

[7]. মুক্তির সময় তিনি স্মৃতি হিসাবে আন্দামানের ঝিনুক, শামুক, কড়ি ও কাঠের বাক্স নিয়ে আসেন। যা এখনো তাঁর উত্তরাধিকারীদের নিকট মওজুদ রয়েছে (আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ৪১২, ৪১৯, ৪২৮, টীকা-৪৩)।-অনুবাদক

[8]. রাজমহল প্রথমে মালদহ যেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরে সেটিকে মুর্শিদাবাদ যেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। বর্তমানে তা বিহার প্রদেশের সাঁওতাল পরগনার একটি সাব-ডিভিশন। গঙ্গা নদীর এপারে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ যেলা এবং ওপারে রাজমহল অবস্থিত। মালদহ ও রাজমহল কেন্দ্র দু’টি মিলেমিশে জিহাদ আন্দোলনের কাজ করত। দ্রঃ আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ৪৪০।-অনুবাদক

[9]. ইবরাহীম মন্ডল ছিলেন মূলতঃ নারায়ণপুরের নিকটবর্তী মুর্শিদাবাদ যেলাধীন লালগোলা থানার ঝাউডাঙ্গা গ্রামের বাশিন্দা। পরে তিনি সম্ভবতঃ ১৮৪০ সাল হতে ১৮৫৩ সালের রফী মোল্লা গ্রেফতার হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে রাজমহলের ইসলামপুরে (দিলালপুরের তিন মাইল উত্তরে) হিজরত করেন। তাঁর অনুরোধেই রফী মোল্লা দিলালপুরে হিজরত করেছিলেন (আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ৪২৭-২৮, ৪৩৯-৪০)। রফী মোল্লার পৌত্র মাওলানা আহমাদ হোসাইন শ্রীমন্তপুরীর বক্তব্য অনুযায়ী রফী মোল্লা নিজ হাতে ইবরাহীম মন্ডলের মাথার টিকির চুল কেটে ‘আহলেহাদীছ’ করেন এবং তাঁকে ঐ এলাকার দায়িত্বশীল হিসাবে বায়‘আত নেন। এর ফলে ইবরাহীম মন্ডলের দুই মেয়ের বিবাহ সংকট দেখা দিলে রফী মোল্লা নিজের দুই ছেলে কামীরুদ্দীন ও শামসুদ্দীনের সাথে তাদের বিয়ে দেন (ঐ, পৃঃ ৪২৮, ৪৬০)। জিহাদের বায়‘আত গ্রহণকারী ইবরাহীম মন্ডল ইসলামপুরে এসে চুপ থাকেননি। তিনি পাহাড়ীয়া অঞ্চলের লোকদেরকে জিহাদের উদ্দেশ্যে সংগঠিত করতে থাকেন। তাঁর নিরলস দাওয়াত ও জিহাদের তৎপরতার ফলে স্থানটি কালক্রমে মুজাহিদ কেন্দ্রে পরিণত হয়। তাছাড়া একদিকে প্রশস্ত নদী ও অপরদিকে দুর্গম পাহাড়ীয়া অঞ্চল হওয়ার কারণে স্থানটি মুজাহিদগণের ট্রে্নিং ও আশ্রয় কেন্দ্র হওয়ার উপযুক্ত ছিল। পরবর্তীতে পাটনা কেন্দ্র থেকে প্রেরিত মাওলানা আহমাদুল্লাহ এখানে আসেন এবং ইবরাহীম মন্ডলজীর পরামর্শক্রমে দুই মাইল দক্ষিণে ‘দিলালপুর’ নামক স্থানটিকে কেন্দ্র হিসাবে বাছাই করেন ও সেখানে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন (ঐ, পৃঃ ৪৪১)। রাজমহলের সহকারী পুলিশ কমিশনার উইলমোট (Wilmot) পুলিশের ডিআইজি রেইলী-কে (Reily) অতিরিক্ত সহকারী পুলিশ কমিশনার নবকেষ্ট ঘোষকে মালদহে পাঠানোর জন্য অনুরোধ জানান। ঘোষ সেখানে যান এবং এক সপ্তাহ অবধি রেশমী কাপড়ের ঝুট ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে ঘুরে ঘুরে বহু তথ্য ও সাক্ষ্য সংগ্রহ করেন। তিনি তথ্য সংগ্রহকালে অবগত হন যে, কালিয়া চকের (মালদহ) কয়েকটি গ্রামে জিহাদের জন্য ফান্ড সংগ্রহ করা হয়। অত্র এলাকায় নাযীর সরদার নামে এক ব্যক্তি চাঁদা সংগ্রহের অন্যতম দায়িত্বশীল। তিনি চাঁদা সংগ্রহ করে ইবরাহীম মন্ডলের কাছে পাঠিয়ে দেন। ঘোষ সব তথ্য লাভ করে ফিরে গিয়ে মালদহের ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট ৮ জন চাঁদা সংগ্রহকারীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারির আবেদন করেন। এদের মধ্যে নাযীর সরদার ও ইবরাহীম মন্ডল অন্যতম। ডিআইজি পুলিশ রেইলী সতর্কতাবশতঃ নিজে রাজমহলে না গিয়ে নবকেষ্ট ঘোষকে সড়কপথে ইসলামপুরে পাঠিয়ে দেন। যাতে তাঁর (ডিআইজি) উপস্থিতি টের পেয়ে মন্ডলজী পালাতে না পারেন। ঘোষ এবার এক মুসলমান শিক্ষকের বেশ ধরে টিউশনি তালাশের বাহানায় সেখানে গিয়ে অবস্থান নেন। ঘটনাক্রমে মন্ডলজীর এক ভাতিজার সাথে ঘোষের দেখা হয়ে যায়। সে ঘোষকে একথা বলে সরাসরি তার চাচার কাছে নিয়ে যায় যে, আমার চাচা যেকোন শিক্ষকের সহযোগিতার জন্য পুরা গ্রামে সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি। ঘোষের পিছে পিছে দুই পুলিশ কনস্টেবলও সেখানে যায়। তাদের সহায়তায় ঘোষ মন্ডলজীকে গ্রেফতার করেন। সহকারী কমিশনার উইলমোট ও তার সহকারী ইবরাহীম মন্ডলকে গ্রেফতারের ব্যাপারে ঘোষকে সহযোগিতা করার জন্য রাজমহল থেকে হাতিতে আরোহণ করে ইসলামপুর এসেছিলেন। দ্রঃ হিন্দুস্তান মেঁ ওহাবী তাহরীক, পৃঃ ৩০২-৩০৪।-অনুবাদক

[10]. ১৮৭২ সালে তিনি কালাপানিতে দ্বীপান্তর হন। ১৮৭৬ সালে সেখান থেকে ফিরে আসেন (আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ৪১৯)।- অনুবাদক

[11]. বিখ্যাত চামড়া ব্যবসায়ী আমীর খান ও হাশমত দাদ খান পাটনা শহরের আলমগঞ্জের বাশিন্দা ছিলেন। কলকাতায় এই দুই ভাইয়ের চামড়ার প্রসিদ্ধ আড়ৎ ছিল। সরকার তাদের ব্যাপারে অনেক আগ থেকেই সন্দিহান ছিল। সরকারের নিকট এই মর্মে রিপোর্ট ছিল যে, যখন আলী ভ্রাতৃদ্বয়কে (এনায়েত আলী ও বেলায়েত আলী) মুচলেকা দিতে বলা হয়েছিল, তখন তারাই তাদের যামিন হয়েছিলেন। তাছাড়া ইবরাহীম মন্ডলের নিকট জিহাদের ফান্ডের জন্য যে নগদ অর্থ জমা হ’ত সেগুলো আমীর খানের মাধ্যমে আশরাফীতে (স্বর্ণমুদ্রাবিশেষ) রূপান্তরিত করা হ’ত এবং মুবারক আলীর মাধ্যমে গোপনে সেগুলো সীমান্তের জিহাদ কেন্দ্রে পাঠানো হ’ত। তাই সরকার তাদেরকে গ্রেফতারের ব্যাপারে সর্বদা সজাগ ছিল। কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে গ্রেফতার করতে পারছিল না। ১৮৬৯ সালের ১৪ই জুন তাবারুক আলীর শ্বশুর পীর মুহাম্মাদকে গ্রেফতারের পর তাঁর নিকটে আমীর খানের একটি পত্র পাওয়া যায়। সরকার প্রমাণ হাতে পেয়ে ১৮৬৯ সালের ৯ই জুলাই কলকাতা থেকে আমীর খানকে গ্রেফতার করে গয়া জেলে বন্দী করে। অতঃপর দ্রুত আলীপুর (কলকাতা) জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। পরে হাশমত দাদ খানকেও গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের সময় আমীর খানের বয়স ছিল ৭৫ বছর এবং হাশমত দাদ খানের বয়স ছিল ৬৭ বছর। গ্রেফতারের পর তাদের চামড়ার আড়ৎ লুট হয়ে যায়। ১৮৭০ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত তাদেরকে গ্রেফতারের কোন কারণ জানানো হয়নি এবং তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলাও রুজু করা হয়নি। ফলে খান ভ্রাতৃদ্বয় সরকারকে চ্যালেঞ্জ করেন যে, হয় তাদেরকে গ্রেফতারের কারণ জানানো হোক, না হয় তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হোক। অতঃপর ১৮৭১ সালের মার্চে পাটনায় তাদের মামলার শুনানি শুরু হয়। তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ আন্দোলনে আর্থিক সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়। পরে রায়ে হাশমত দাদ খানকে ছেড়ে দেয়া হয়। কেননা তার বিরুদ্ধে কোন চাক্ষুস সাক্ষ্য পাওয়া যায়নি। তিনি ১৮৭৮ সালের কিছু পূর্বে মৃত্যুবরণ করেন। আমীর খান ৯ বছরের বেশী জেল খাটার পর ১৮৭৮ সালের নভেম্বরের শুরুতে গভর্ণর জেনারেল লর্ড লিটনের (Lord Lytton) সুফারিশক্রমে মুক্তি পান এবং তার পরপরই ৮ই নভেম্বর তারিখে ৮৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। দু’জনকেই পাটনাতে দাফন করা হয় (হিন্দুস্তান মেঁ ওহাবী তাহরীক, পৃঃ ৩০৭, ৩১৭-১৯, ৩২৭-২৮, ৩৩০-৩২; আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ৪১৯।-অনুবাদক

[12]. মাননীয় লেখক এখানে জান্নাতুল বাক্বী লিখেছেন। এটি মারাত্মক ভুল এবং ভ্রান্ত ফের্কা শী‘আদের অনুকরণ মাত্র।-অনুবাদক

[13]. এক্ষেত্রে ঢাকার বংশাল নিবাসী হাজী বদরুদ্দীন ওরফে বট্টু হাজীর  কথাও সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।দ্রঃ হিন্দুস্তান মেঁ ওহাবী তাহরীক, পৃঃ ৩০৫; আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ৪৭৪; মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান, মর্দে মুজাহিদ হাজী বদরুদ্দীন (ময়মনসিংহ : ১৯৭২), পৃঃ ২১-২২।-অনুবাদক

[14]. তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত দ্রঃ আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ৩১০-১১।-অনুবাদক

[15]. বর্তমানে বালাকোটে সাইয়িদ আহমাদ শহীদের কবরের পাশেই তাঁর কবর রয়েছে। দ্রঃ আহলেহাদীছ আন্দোলন, পৃঃ ৩১২; আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব, ‘বালাকোটের রণাঙ্গনে’, আত-তাহরীক, আগস্ট ২০১৪, পৃঃ ৩৫।-অনুবাদক।

[16]. ১ম বিশ্বযুদ্ধের পর (১৯১৪-১৯১৮) মিন্টু মরলে (Minto Morley) ভারতীয়দের জন্য একটি স্কীম নিয়ে ভারতে আসেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে এটি ‘মিন্টু মরলে স্কীম’ নামে পরিচিত। এ প্রেক্ষিতে মাওলানা আব্দুল বারী ফিরিঙ্গীমহলীর উৎসাহে লাক্ষ্ণৌতে ওলামায়ে কেরামের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভারতীয় মুসলমানদের কিছু ধর্মীয় বিষয় বিবেচনার জন্য আলেমগণের একটি প্রতিনিধি দল মিন্টু মরলের সাথে দেখা করবে মর্মে প্রস্তাব পেশ করা হয়। লাক্ষ্ণৌর সেই সম্মেলনে প্রখ্যাত আহলেহাদীছ আলেম, ফাতিহে কাদিয়ান ও শেরে পাঞ্জাব খ্যাত মুনাযির মাওলানা ছানাউল্লাহ অমৃতসরী উপস্থিত ছিলেন। তিনি দেশের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিষয়ে ইসলামের আলোকে জনসাধারণকে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদানের জন্য আলেমগণের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উক্ত সম্মেলনে পেশ করেন। তাঁর প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে দু’দিন পর্যন্ত আলোচনা অব্যাহত থাকে। কিন্তু কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া ছাড়াই সম্মেলন সমাপ্ত হয়। তথাপি মাওলানা অমৃতসরী নিরাশ না হয়ে বিভিন্ন জালসা ও সম্মেলনে এবং সাপ্তাহিক ‘আখবারে আহলেহাদীছ’ পত্রিকায় এ ধরনের অরাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার উপরে আলোকপাত করতে থাকেন। অতঃপর ১৯১৯ সালের নভেম্বর মাসের শেষের দিকে তাঁর প্রচেষ্টায় দিল্লীতে একটি তাবলীগী জালসা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশবরেণ্য ওলামায়ে কেরাম অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই সুযোগে  তিনি লাক্ষ্ণৌ সম্মেলনে পেশ করা প্রস্তাব পুনরায় উত্থাপন করেন। অনেক আলেম তাঁর এ প্রস্তাবকে সমর্থন করেন। ১৯১৯ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে অমৃতসরে খেলাফত মজলিস ও মুসলিম লীগের সম্মেলন ছিল। এতে খেলাফত ও তুরস্কের বিষয়ে আলোচনার জন্য দেশের অনেক প্রথিতযশা আলেমের অংশগ্রণের আশা করা হচ্ছিল। এ উপলক্ষে মাওলানা ছানাউল্লাহ অমৃতসরী ও মাওলানা সাইয়িদ দাঊদ গযনভী আলেমগণকে অমৃতসরে আসার দাওয়াত দেন। যাতে এই সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগিয়ে জমঈয়তে ওলামায়ে হিন্দ গঠনের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। দিল্লী সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯১৯ সালের ২৮শে ডিসেম্বর অমৃতসরে ভারতবর্ষের আলেমগণের এক ঐতিহাসিক সম্মেলন শুরু হয়। এতে দেশবরেণ্য ৫২ জন আলেম অংশগ্রহণ করেন। দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার পর ‘জমঈয়তে ওলামায়ে হিন্দ’ নামে সর্বভারতীয় আলেমগণের সংগঠন প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সম্মেলনে মাওলানা অমৃতসরী মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ কেফায়াতুল্লাহ দেহলভীকে সভাপতি এবং মাওলানা আহমাদ সাঈদ দেহলভীকে সেক্রেটারী করার প্রস্তাব দিলে মাওলানা সালামাতুল্লাহ জয়রাজপুরী ও মাওলানা মুহাম্মাদ আকরম খাঁ তাতে সমর্থন দেন। এই সম্মেলনে ২৩ সদস্য বিশিষ্ট মজলিসে আমেলা গঠিত হয়। হাকীম মুহাম্মাদ আজমাল খাঁ সংগঠনের নীতিমালার খসড়া তৈরীর জন্য একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব পেশ করেন। ফলে সর্বসম্মতিক্রমে মাওলানা ছানাউল্লাহ অমৃতসরী, মাওলানা মুহাম্মাদ আকরম খাঁ, মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ কেফায়াতুল্লাহ ও মাওলানা খায়রুযযামানের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি নীতিমালা তৈরী করে ১লা জানুয়ারী ১৯২০ইং তারিখে পেশ করলে তা গৃহীত হয়। এ অধিবেশনে মাল্টা দ্বীপে বন্দী মাওলানা মাহমূদুল হাসান দেওবন্দীর মুক্তির বিষয়ে প্রথম রেজুলেশন পাশ হয়েছিল। মাওলানার মুক্তির দাবীতে ভাইসরয়কে টেলিগ্রাম করা হয়েছিল। এর খরচ বহন করেছিলেন মাওলানা অমৃতসরী। ১৯২০ সালের ১৯-২১শে নভেম্বর দিল্লীতে মাওলানা মাহমূদুল হাসান দেওবন্দীর সভাপতিত্বে জমঈয়তের দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এতে পাঁচ শতাধিক আলেম অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে মাওলানা আব্দুল্লাহিল কাফী, মাওলানা আব্দুল্লাহিল বাকী ও মাওলানা মুহাম্মাদ আকরম খাঁ অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রস্তাব পেশ থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠা লাভ এবং তা ফুলে ফলে সুশোভিত হওয়া পর্যন্ত মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, মাওলানা ছানাউল্লাহ অমৃতসরী, মাওলানা আব্দুল্লাহিল কাফী, সাইয়িদ মুহাম্মাদ ফাখের এলাহাবাদী, মাওলানা মুহাম্মাদ জুনাগড়ী, মাওলানা মুহাম্মাদ ইবরাহীম মীর শিয়ালকোটী, মাওলানা সাইয়িদ দাঊদ গযনভী, মাওলানা মুহাম্মাদ আতাউল্লাহ হানীফ ভূজিয়ানী, মাওলানা মুহাম্মাদ হানীফ নাদভী, মাওলানা আব্দুল গাফফার গযনভী, মাওলানা আবুল কাসেম সায়েফ বেনারসী, মাওলানা আব্দুল হক অমৃতসরী, মাওলানা আব্দুল ওয়াহ্হাব আরাভী, মাওলানা আব্দুল কাদের ক্বাছূরী, মাওলানা মুহাম্মাদ আলী ক্বাছূরী প্রমুখ খ্যাতিমান আহলেহাদীছ আলেমগণ এ সংগঠনের অন্যতম সিপাহসালার ছিলেন। দেশ বিভাগের পর সত্তুর দশকে মাওলানা আব্দুল ওয়াহ্হাব আরাভীর সভাপতিত্ব পর্যন্ত তিনি সহ মাওলানা আব্দুল জলীল রহমানী, মাওলানা মুহাম্মাদ দাঊদ রায, মাওলানা আবুল কাসেম সায়েফ বেনারসী প্রমুখ আহলেহাদীছ আলেমগণ সংগঠনের নেতা ছিলেন। মাওলানা আরাভী একই সাথে ‘অল ইন্ডিয়া আহলেহাদীছ কনফারেন্স’ ও জমঈয়তে ওলামায়ে হিন্দের সভাপতি ছিলেন। মাওলানা ফারে কালীত ও মুহাম্মাদ সোলায়মান ছাবির বছরের পর বছর জমঈয়তের মুখপত্র ‘আল-মাঈয়াহ’ (المعية) পত্রিকায় ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে নিদ্রামগ্ন মুসলিম জাতিকে জাগ্রত করেছেন। মূলতঃ আহলেহাদীছ ও হানাফী উভয় ঘরানার আলেমগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ভিত্তিতে এই সংগঠন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। অথচ পরে হানাফী আলেমগণ এটাকে নিজেদের দিকে সম্পৃক্ত করে নিয়েছে (বিস্তারিত আলোচনা দ্রঃ মাওলানা আব্দুল ওয়াহ্হাব খালজী, ‘জমঈয়তে ওলামায়ে হিন্দ কী তাসীস মেঁ ওলামায়ে আহলেহাদীছ কা বুনিয়াদী কিরদার’, মাসিক ‘মুহাদ্দিছ’ (উর্দূ), জামে‘আ সালাফিইয়াহ, বেনারস, ২৬/৬ সংখ্যা, জুন ২০০৮, পৃঃ ২১-২৫; হাকীম মাহমূদ আহমাদ, ওলামায়ে দেওবন্দ কা মাযী (লাহোর : ইদারা নাশরুত তাওহীদ ওয়াস সুন্নাহ, ২০০৩), পৃঃ ২৯-৩০; মাওলানা আব্দুল মজীদ খাদিম সোহদারাভী, সীরাতে ছানাঈ, পৃঃ ৩৬৯-৩৭০; ছফিউর রহমান মুবারকপুরী, ফিতনায়ে কাদিয়ানিয়াত আওর মাওলানা ছানাউল্লাহ অমৃতসরী, পৃঃ ৭০-৭২)।-অনুবাদক

[17]. ১৯১৪ সালের পর মাওলানা মাহমূদুল হাসান দেওবন্দী এ আন্দোলন শুরু করেছিলেন বলে বলা হয়ে থাকে। যদিও ব্রিটিশ নথিপত্রে এর প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধী ও মাওলানা আবুল কালাম আযাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আর মাওলানা মাহমূদুল হাসানকে তাদের দ্বারা প্রভাবিত ও তাদের কর্মী বলা হয়েছে। কিন্তু দেওবন্দীরা তাঁকেই এর প্রতিষ্ঠাতা বলে থাকে। এ আন্দোলনের উদ্যোক্তা যেই হোক না কেন এতে দেওবন্দের সকল আলেমের নিরঙ্কুশ সমর্থন ছিল না। কারণ মাওলানা মাহমূদুল হাসান, মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী, মাওলানা আযীয গুল ও মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধী ছাড়া অন্য কোন দেওবন্দী আলেমের নাম ব্রিটিশ নথিতে পাওয়া যায় না। এ আন্দোলনের প্রেক্ষাপট হচ্ছে- ১ম বিশ্বযুদ্ধের রণদামামা বেজে উঠলে ভারতের সেনা ছাউনীগুলো একেবারে খালি হয়ে যায়। ভারতে নিযুক্ত ব্রিটিশ সৈন্যদেরকে ইরাক, ফিলিস্তীন, সাইপ্রাস ও আশপাশের দেশগুলোতে তুর্কীদের উপর আক্রমণ করার জন্য প্রেরণ করা হয়। এই সুযোগে চামারকান্দের মুজাহিদ নেতারা বিশেষতঃ মাওলানা ফযলে এলাহী ওয়াযীরাবাদী ও মাওলানা মুহাম্মাদ বাশীর লাহোরী জার্মান দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করে কাবুলে তাদের একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণের অনুরোধ জানায়। যাতে ভারতের স্বাধীনতার জন্য কোন কার্যকর কর্মসূচী গ্রহণ করা যায়। কাবুলে জার্মান মিশন ব্যর্থ হলেও সেখানে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, জামা‘আতে মুজাহিদীন-এর সদস্যবৃন্দ হিন্দুস্তানের বড় বড় রাজ্যের রাজা ও নওয়াবদের কাছে জার্মান রাষ্ট্রদূতের চিঠি পৌঁছিয়ে দিবেন। যাতে ভারতের স্বাধীনতার জন্য জার্মানী বৃটিশদের বিরুদ্ধে ভারতে আক্রমণ করলে এখানকার রাজা ও নওয়াবরা বেঁকে না বসেন। এ চিঠিগুলো রেশমী রুমালে লিপিবদ্ধ হওয়ায় এ আন্দোলনের নাম হয়েছিল ‘তাহরীকে রেশমী রূমাল’। মূলতঃ এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশকে এদেশ থেকে উৎখাতের জন্য উছমানীয় তুর্কী খলীফা, জার্মানী ও আফগানিস্তানের নিকট থেকে সাহায্য লাভ করা। একটি জাতীয়তাবাদী সরকার প্রতিষ্ঠা ছিল এর লক্ষ্য। এজন্য এতে শিখ ও হিন্দুরাও শামিল ছিল। সেকারণ একে খাঁটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বলা যায় না। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন হওয়ার কারণে এতে বহু আহলেহাদীছ অংশগ্রহণ করেন। এঁদের মধ্যে মাওলানা মুহাম্মাদ ইবরাহীম মীর শিয়ালকোটী, মাওলানা আব্দুল আযীয রহীমাবাদী, মৌলভী আব্দুল হক, মাওলানা আব্দুল করীম (জিহাদ আন্দোলনের আমীর), আব্দুল খালেক, হাফেয আব্দুল্লাহ গাযীপুরী, আব্দুল্লাহ শেখ (শিয়ালকোট), আব্দুল লতীফ, আব্দুল মজীদ, মাওলানা আব্দুল কাদের ক্বাছূরী, মাওলানা সাইয়িদ আব্দুস সালাম ফারূকী (দিল্লীর প্রসিদ্ধ আহলেহাদীছ প্রেস ফারূকী-এর মালিক), মাওলানা আব্দুর রহীম (লাহোরের চীনাওয়ালী জামে মসজিদের সাবেক ইমাম), মৌলভী আব্দুর রহীম আযীমাবাদী, মাওলানা ফযলে এলাহী ওয়াযীরাবাদী, মাওলানা মহিউদ্দীন কাছূরী, মাওলানা মুহাম্মাদ আলী কাছূরী, মুহাম্মাদ আসলাম, মুহাম্মাদ এলাহী (ফযলে এলাহী ওয়াযীরাবাদীর ভাই), নাযীর আহমাদ কাতিব, রশীদুল্লাহ (ঝান্ডার পীর), মাওলানা ছানাউল্লাহ অমৃতসরী, মৌলভী অলি মুহাম্মাদ ফাতূহীওয়ালা ওরফে মৌলভী মূসা, নওয়াব যমীরুদ্দীন আহমাদ-এর নাম ব্রিটিশ নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে (হাফেয ছালাহুদ্দীন ইউসুফ, তাহরীকে জিহাদ : জামা‘আতে আহলেহাদীছ আওর ওলামায়ে আহনাফ (গুজরানওয়ালা-পাকিস্তান : নাদওয়াতুল মুহাদ্দিছীন, ১৪০৬ হিঃ/১৯৮৬ খ্রিঃ), পৃঃ ৭৮-৮০)

পূর্ণ বিশ্বস্ততা, আমানতদারিতা ও দূরদর্শিতার সাথে আহলেহাদীছ আলেম ছূফী আব্দুল্লাহ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ৭টি চিঠি নেপাল, জয়পুর, যোধপুর-এর মহারাজা এবং গোয়ালিয়র, অন্ধ্রপ্রদেশ-এর রাজা ও ভাওয়ালপুরের নওয়াবের নিকট পৌঁছিয়ে দেন। ১টি চিঠি মাওলানা মুহাম্মাদ আলী ও শওকত আলীর (আলী ভ্রাতৃদ্বয়) নিকট পৌঁছিয়ে তাঁদেরকে সেটি রামপুরের নওয়াবের নিকট  পৌঁছানোর দায়িত্ব দেয়া হয়। অন্যদিকে মাত্র একটি চিঠি প্রদান করা হয়েছিল মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধীকে। তিনি সেটি নওমুসলিম আব্দুল হকের হাতে দিয়ে মাওলানা গোলাম মুহাম্মাদের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়ার কথা বলেন। যাতে তিনি পত্রটি মাওলানা মাহমূদুল হাসান দেওবন্দীর নিকট পৌঁছিয়ে দেন। কিন্তু মুলতান ছাউনী স্টেশনে খান বাহাদুর রব নওয়ায খান তাঁর নিকট থেকে চিঠিটি হস্তগত করে পাঞ্জাবের গভর্ণর মাইকেল ওডওয়ার (Michael Oddware)-কে দিয়ে দেন। ফলে সব জারিজুরি ফাঁস হয়ে যায়। মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধীর শিষ্য ক্যাপ্টেন যাফর আহসান স্বীয় আত্মজীবনী ‘আপবীতী’-এ উল্লেখ করেছেন যে, ‘এ বিশ্বাসঘাতকতার পুরস্কার স্বরূপ আব্দুল হক পুলিশে চাকরি পায় আর খান বাহাদুর রব নওয়ায পান নগদ অর্থ’। তিনি এটাও বলেছেন যে, ‘আব্দুল হক আমাদের নিকট গোয়েন্দা হিসাবে এসেছিল’ (ওলামায়ে দেওবন্দ কা মাযী, পৃঃ ২৪৬-২৪৭)। ব্রিটিশ নথিতে ১৩ জন বিশ্বাসঘাতকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যারা ইংরেজ সিআইডির নিকট তথ্য ফাঁস করে এ আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এমনকি মাওলানা মাহমূদুল হাসানের অত্যন্ত আস্থাভাজন ও তাঁর হিজায সফরের সময় তাঁর স্থলাভিষিক্ত মাওলানা শাহ আব্দুর রহীম রায়পুরীও ইংরেজদের জিজ্ঞাসাবাদে দৃঢ়তার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হন। দেওবন্দী আলেমগণের কারণেই এ আন্দোলন ব্যর্থ হয়। দেওবন্দী আলেমগণ একে তাদের একক কৃতিত্ব বলে দাবী করেন, যা প্রকৃত ইতিহাসকে আড়াল করার শামিল (মাওলানা কাযী মুহাম্মাদ আসলাম সায়েফ ফীরোযপুরী, তাহরীকে আহলেহাদীছ তারীখ কে আয়েনে মেঁ (লাহোর : মাকতাবা কুদ্দূসিয়া, ২০০৫), পৃঃ ২৮৪-২৮৭; তাহরীকে জিহাদ, পৃঃ ৭৩-৮৪; Maulana Muhammad Miyan, Silken Letters Movement, Translated by: Muhammadullah Qasemi (Deoband : Shaikhul Hind Academy, 2012) p. 49.) -অনুবাদক

 

HTML Comment Box is loading comments...