সাক্ষাৎকার

শায়খ হাদিয়ুর রহমান মাদানী

[পাকিস্তানের খাইবার-পাখতুনখোয়া প্রদেশের রাজধানী পেশাওয়ার শহরে অবস্থিত প্রসিদ্ধ আহলেহাদীছ মাদরাসা ‘জামে‘আতু ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইসমাঈল বুখারী (রহঃ)’। পূর্ব পেশাওয়ারের জিটি (গ্রান্ড ট্রাংক) রোড সংলগ্ন চমকানী মোড়ে মাদরাসাটি অবস্থিত। এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আফগানিস্তানে ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন’-এর অন্যতম প্রাণপুরুষ ও সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের খ্যাতনামা মুজাহিদ মাওলানা জামীলুর রহমান। আয়তনের দিক থেকে এটিই পেশাওয়ারের সবচেয়ে বড় আহলেহাদীছ মাদরাসা। বর্তমানে মাদরাসাটির অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন শায়খ জামীলুর রহমানেরই পুত্র শায়খ হাদিয়ুর রহমান মাদানী। সম্প্রতি গত ১২ই জানুয়ারী’১৪ তারিখে গবেষণা বিভাগ, ‘হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’-এর সাবেক পরিচালক আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব পেশাওয়ার সফরে গিয়ে এই মাদরাসাটি পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি মাদরাসার অধ্যক্ষ শায়খ হাদিয়ুর রহমানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন। সাক্ষাৎকারটি আরবী থেকে অনূদিত হ’ল-সম্পাদক]  

আত-তাহরীক : আপনার পিতা শায়খ জামীলুর রহমান আফগানীর পরিচয় এবং আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে আহলেহাদীছ আন্দোলনের প্রচার-প্রসারে তাঁর অবদান সম্পর্কে কিছু বলুন।

শায়খ হাদিয়ুর রহমান : শায়খ জামীলুর রহমানের মূল নাম ছিল মুহাম্মাদ হুসায়েন বিন আব্দুল মান্নান। পরে পাকিস্তানে আসার পর তিনি জামীলুর রহমান নামে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৩৯ সালে আফগানিস্তানের কুনাড় প্রদেশের নিঙ্গালাম গ্রামে এক হানাফী পরিবারে। কুনাড়েই তিনি প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য পাকিস্তানে আসেন। পাকিস্তানে এক মাদরাসার লাইব্রেরীতে ইমাম ইবনে তায়মিয়াহ ও মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাবের আক্বীদা সম্পর্কিত গ্রন্থগুলি পড়ার পর তিনি আহলেহাদীছ আক্বীদা গ্রহণ করেন। তারপর তিনি আফগানিস্তানে ফিরে গিয়ে দাওয়াতী ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং একটু একটু করে তার অনুসারীদের সংগঠিত করতে শুরু করেন। এভাবেই আফগানিস্তানে প্রথম সাংগঠনিকভাবে ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন’-এর কার্যক্রম শুরু হয়। তখন ‘উম্মতে মুসলিমাহ’ নামে সংগঠনটির কাজ চলত। এটা ছিল সোভিয়েত আগ্রাসনের প্রায় ২৫ বছর আগের ঘটনা। অতঃপর ১৯৮৫ সালে দিকে ‘জামা‘আতুদ দাওয়াহ ইলাল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ’ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন এবং আমীর হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

আর দাওয়াতের ময়দানে তাঁর খেদমত সম্পর্কে যেটুকু বলব, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন’ তথা ছহীহ আক্বীদার প্রচার ও প্রসারে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুনাড়সহ পাকিস্তানের পেশাওয়ারে যত আহলেহাদীছ মসজিদ-মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার পিছনে মূল ভূমিকা ছিল তাঁরই। প্রথম তিনি যে দাওয়াতী কার্যক্রম শুরু করেছিলেন তাতে সাড়া দিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন বহু সত্যপিয়াসী মানুষ। কুনাড় সহ অন্যান্য প্রদেশের অনেক আলেম-ওলামা সমবেত হয়েছিলেন তাঁর পার্শ্বে। উঁচু কবর, মাযারসমূহ ভেঙ্গে ফেলা এবং এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার মাধ্যমে সমাজে একটা তাওহীদী জাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন। ফলে সরকারের নযরে পড়ে যান তারা এবং বিদ‘আতী ও মুশরিকদের কারসাজিতে তাদের অনেককেই কারাবন্দী হ’তে হয়। এ অবস্থার মধ্য দিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হ’লে পরিস্থিতি পরিবর্তন হয় এবং শায়খ জামীলুর রহমান দাওয়াতের পাশাপাশি আফগান জিহাদে সম্পৃক্ত হন। প্রথমদিকে তিনি ইখওয়ানী মতাদর্শপুষ্ট গুলবুদ্দীন হেকমতিয়ারের ‘হিযবে ইসলামী’ সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং কুনাড় প্রদেশের আমীর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ‘হিযবে ইসলামী’র আদর্শিক দুর্বলতা লক্ষ্য করে তিনি দলত্যাগ করেন এবং স্বতন্ত্র আহলেহাদীছ সংগঠন হিসাবে ‘জামা‘আতুদ দাওয়াহ ইলাল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ’ প্রতিষ্ঠা করেন। যা আফগানিস্তানের একমাত্র আহলেহাদীছ সংগঠন হিসাবে অদ্যাবধি দাওয়াতী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর নেতৃত্বেই কুনাড়ে সালাফী মানহাজের উপর প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের জানুয়ারী মাসে। এসময় আরব ওলামায়ে কেরাম তাঁর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। শায়খ আলবানী, শায়খ বিন বায, শায়খ উছায়মীনও তাঁর প্রতি শুভেচ্ছাবার্তা ও উপদেশবাণী প্রেরণ করেন। ছোট্ট স্বাধীন রাষ্ট্রটিতে অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলামী আদালত প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেখানে শারঈ আইন মোতাবেক শাসনকার্য পরিচালিত হ’ত। ফলে সেখানে মক্কা-মদীনার মত শান্তি ও নিরাপত্তার সুবাতাস ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু অচিরেই সালাফী বিদ্বেষী কুনারের অপর প্রভাবশালী সংগঠন গুলবুদ্দীন হেকমতিয়ারের নেতৃত্বাধীন ‘হিযবে ইসলামী’ যে কোন মূল্যে এই নতুন রাষ্ট্রটিকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য বদ্ধপরিকর হয় এবং সাত দলীয় হানাফী মুজাহিদ জোট গঠন করে। অতঃপর ১৯৯১ সালের মাঝামাঝি তারা কুনাড় প্রদেশের কেন্দ্রস্থলে বোমা হামলা চালিয়ে বহু মানুষ হত্যা করে এবং রাজধানী আস‘আদাবাদ দখল করে নেয়। ফলে সালাফী মুজাহিদগণ পিছু হটতে বাধ্য হন এবং শায়খ জামীলুর রহমান আফগান-পাক সীমান্তবর্তী ট্রাইবাল এরিয়ায় এসে বাজোড় এজেন্সিতে আশ্রয় নেন। অবশেষে ঐ বছর ৩০ আগস্ট শুক্রবার জুম‘আর ছালাতের পূর্বে আততায়ীর গুলিতে তিনি মর্মান্তিকভাবে নিহত হন।                 

আত-তাহরীক : শায়খ জামীলুর রহমান আফগানীর নিহত হওয়ার ঘটনাটি বলুন। কারা এর পিছনে দায়ী ছিল বলে আপনারা মনে করেন?

শায়খ হাদিয়ুর রহমান : ১৯৯১ সালের ৩০ আগস্ট। আমার পিতা বাজোড় এজেন্সিতে নিজের বাড়িতে বসেছিলেন এবং জুম‘আর ছালাতে যাওয়ার প্রস্ত্ততি নিচ্ছিলেন। এমন সময় বাড়ির সামনে একটি মটরগাড়ি এসে দাঁড়ায়। গাড়ি থেকে একজন মিসরী আরোহী নেমে আসে এবং আববার সাথে দেখা করতে চায়। তাঁর কক্ষে প্রবেশের মুখে সাধারণতঃ সবাইকে চেক করা হ’ত। কিন্তু আরবদের প্রতি বিশেষ সম্মানের কারণে তিনি নিরাপত্তারক্ষীদেরকে বলে দিয়েছিলেন তাদের দেহ তল্লাশী না করার জন্য। সেই সুযোগে উক্ত মিসরী আততায়ী পকেটে পিস্তল নিয়ে তাঁর কক্ষে প্রবেশ করে। আববা মসজিদের উদ্দেশ্যে বের হবেন, ঠিক সে সময় আততায়ী পিস্তল বের করে তাঁর মাথায় ও মুখে গুলি চালায়। ফলে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। লোকটি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় এবং রক্ষীদের গুলিতে নিহত হয়। কেন বা কারা এই ঘটনার পিছনে ছিল তা আমরা নিশ্চিত বলতে পারব না। তবে এটা যে সালাফী দাওয়াতের প্রতি প্রচন্ড বিদ্বেষ পোষণকারী কোন গ্রুপের কাজ ছিল, তা নিঃসন্দেহে অনুমান করা যায়। তারা এ কাজে একজন মিসরীয়কে ব্যবহার করেছিল যেন আরবদের সাথে আমাদের বিদ্যমান সুসম্পর্ক নষ্ট করা যায়।

আত-তাহরীক : আপনি এবং আপনাদের পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে কে কোথায় আছেন? পেশাওয়ারেই কি আপনারা স্থায়ী হয়ে গেছেন?

শায়খ হাদিয়ুর রহমান : আমি কুনাড় প্রদেশেই জন্মগ্রহণ করেছি। আমার বয়স এখন ৩৮ বছর। যখন আমার বয়স ছিল প্রায় ১ বছর, তখন আমার আববা সপরিবারে পাকিস্তানে হিজরত করেন। পেশাওয়ারেরই বিভিন্ন সালাফী মাদরাসায় আমি প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করি। অতঃপর মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাই। সেখানে ২ বছর ছানুবিয়াহ সহ মোট নয় বছর অধ্যয়ন করি এবং শরী‘আ বিভাগ থেকে লিসান্স ডিগ্রী লাভ করি। আমরা ৮ ভাই-বোন। এক ভাই ড. যিয়াউর রহমান মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ.ডি করার পর বর্তমানে জামে‘আতুল ইমাম মুহাম্মাদ বিন সঊদ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। আরেক ভাই এনায়াতুর রহমান আমার সাথেই আমাদের সমাজকল্যাণ সংস্থার পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং সবার ছোট ভাই বর্তমানে মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। এছাড়া আরেক ভাই আলতাফুর রহমান ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ইসলামাবাদ থেকে ফারেগ হয়েছে। আমি ১৯৯৫ সালে পাকিস্তানেই বিয়ে করেছি এবং আমার দুই সন্তান রয়েছে। আমার মা এখনও জীবিত আছেন এবং পেশাওয়ারেই আমার কাছে থাকেন। বর্তমানে আমরা পেশাওয়ারের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেলেও ভবিষ্যতে ইচ্ছা আছে আবার কোনদিন মাতৃভূমি কুনাড়ে ফিরে যাওয়ার।  

আত-তাহরীক : এই মারকাযটি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এবং বর্তমানে মাদরাসাটি কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে সে সম্পর্কে কিছু বলুন।

শায়খ হাদিয়ুর রহমান : মাদরাসাটি আমার পিতার হাতেই ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে বর্তমান ভবনটি তাঁর মৃত্যুর পর সঊদী ক্রাউন প্রিন্স আমীর সালমান বিন আব্দুল আযীয আলে শায়েখের নির্দেশনা ও আর্থিক সহযোগিতায় ১৯৯৬ সালে স্থাপিত হয়। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মাটিতে শিরক ও বিদ‘আতের অপ্রতিরোধ্য জোয়ার ঠেকানোর জন্য ছহীহ আক্বীদা সম্পন্ন মসজিদ ও মাদরাসা নির্মাণের লক্ষ্যে আমার পিতা এই মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। সেসময় মধ্যপ্রাচ্যের দ্বীনদরদী ভাইয়েরা তাঁর সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। পেশাওয়ারের আফগান শরণার্থী শিবিরে এখন প্রায় ২৭টি মসজিদ রয়েছে, যার বেশ কয়েকটি আমার পিতার হাতে তৈরী করা। ফলে এই মসজিদগুলোর মাধ্যমে শরণার্থী আফগানীদের মধ্যে সালাফী আক্বীদার প্রসার ঘটেছে এবং তাদের মধ্য থেকে শিরক-বিদ‘আতের কুসংস্কার ধিরে ধিরে দূর হয়ে যাচ্ছে, ফালিল্লা-হিল হামদ

মাদরাসায় বর্তমানে ছাত্রাবাস ও ক্লাসরুম মিলিয়ে প্রায় ৮০টি কক্ষ রয়েছে। একটি ইয়াতীমখানাও রয়েছে। ভর্তি ফিস ছাড়া ছাত্রদের নিকট থেকে কোনরূপ অর্থ নেয়া হয় না। থাকা-খাওয়া ফ্রী। ২০ জন শিক্ষকের বসবাসের জন্য ক্যাম্পাসের মধ্যেই পৃথক কোয়ার্টার রয়েছে। মাদরাসার উচ্চতর সার্টিফিকেট পাকিস্তান ও আফগানিস্তান শিক্ষামন্ত্রণালয় কর্তৃক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। এছাড়া সঊদী আরবের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে মু‘আদালাহ রয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এই মাদরাসার ‘মা‘হাদ শারঈ’ এবং ‘কুল্লিয়াহ শারঈয়াহ’ থেকে মোট ১৪৩৩ জন ছাত্র ফারেগ হয়েছে। আমাদের সিলেবাস সরকারী এবং সঊদী আরবের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিলেবাসের সমন্বয়ে নিজস্ব আঙ্গিকে তৈরী করা। এবতেদায়ী (৬ বছর) পর্যন্ত পশতু ভাষায় শিক্ষা দেয়া হ’লেও ‘মুতাওয়াসসিতাহ’ (৩ বছর), ছানুবিয়াহ (৩ বছর) এবং কুল্লিয়াতে (৪ বছর) সম্পূর্ণ আরবী মিডিয়ামে পাঠদান করা হয়। ফলে এখানকার ছাত্ররা আরবী ভাষায় অনেক দক্ষ। বর্তমানে এখানে ৩৮ জন শিক্ষক-কর্মচারী সহ প্রায় ৫০০ ছাত্র রয়েছে। সর্বপ্রথম প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন মিসরী শায়খ আহমাদ আবু ছুহায়েব (১৯৮৫-১৯৯৩ইং)। অতঃপর শায়খ রফীকুল্লাহ বিন সামীউল্লাহ নাজীবী (১৯৯৩-২০০৩ইং)। আর ২০০৩ সাল থেকে আমিই এই দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত রয়েছি।

এছাড়া আমরা সমাজকল্যাণমূলক কাজ করে থাকি। গত এক বছরেই আমাদের সংস্থার মাধ্যমে ৪১টি মসজিদ নির্মিত হয়েছে পেশাওয়ার এবং পার্শ্ববর্তী যেলা সমূহে।

আত-তাহরীক : পেশাওয়ারে বর্তমানে আহলেহাদীছ আন্দোলনের দাওয়াত সম্প্রসারিত হচ্ছে কেমন?

শায়খ হাদিয়ুর রহমান : পেশাওয়ারে আহলেহাদীছ আন্দোলনের অবস্থা এখন অনেক ভাল। এখানে প্রায় কয়েক শতাধিক মসজিদ নির্মিত হয়েছে গত এক দশকে। কেবল ২০১৩ সালেই আমরা আমাদের সংস্থার মাধ্যমে ৪১টি মসজিদ নির্মাণ করেছি পেশাওয়ারসহ আশ-পাশের যেলাগুলোতে। পেশাওয়ারে আমাদের এই মাদরাসার মত আরো প্রায় ১৫টি বড় মাদরাসা রয়েছে। এছাড়া ছোটখাটো আরো প্রায় ৫০টি আহলেহাদীছ মাদরাসা রয়েছে। এসব মাদরাসার শিক্ষার্থীরা একটা বড় ভূমিকা রাখছে এ অঞ্চলে বিশুদ্ধ আক্বীদার প্রচার ও প্রসারে। তবে সাংগঠনিকভাবে আমরা সংঘবদ্ধ নই। এমনকি বর্তমানে আমাদের প্রকাশিত কোন সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকাও নেই। এই দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। আপাততঃ এ সকল দ্বীনী মাদরাসার মাধ্যমেই আমরা যতদূর সম্ভব দাওয়াতী কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।   

আত-তাহরীক : আফগানিস্তানে আহলেহাদীছ আন্দোলনের দাওয়াত কেমন চলছে?

শায়খ হাদিয়ুর রহমান : আলহামদুলিল্লাহ কুনাড়, নূরিস্তান, বাদাখশানসহ আফগানিস্তানের অন্য সকল প্রদেশেই এখন দাওয়াতী কার্যক্রম জোরদারভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ছহীহ আক্বীদার ছায়াতলে সমবেত হচ্ছে বহু মানুষ। মুশরিক-বিদআতীদের পক্ষ থেকে বাঁধা আসে যথেষ্ট, তবে পূর্বের তুলনায় অনেক কম। তবে ইখওয়ানীরা এখনও আমাদের প্রতি যথেষ্ট বিদ্বেষ পোষণ করে। সর্বোপরি দিন দিন মানুষের মধ্যে দ্বীন সম্পর্কে সচেতনতা যত বাড়ছে, পীর-পূজা, কবরপূজা, শিরক-বিদআতী নানা রসম-রেওয়াজ তত কমে আসছে আলহামদুলিল্লাহ। মাদরাসা-মসজিদগুলো ছাড়াও আমার পিতার প্রতিষ্ঠিত আফগানিস্তানের প্রথম আহলেহাদীছ সংগঠন ‘জামা‘আতুদ দাওয়া ইলাল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ’ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। বর্তমানে সংগঠনটির আমীরের দায়িত্ব পালন করছেন শায়খ সামীউল্লাহ নাজীবী। তিনি দুবাইয়ে বসবাস করছেন এবং সেখান থেকেই সংগঠন পরিচালনা করেন। পাকিস্তানের মত ওখানে আমাদের মাঝে সাংগঠনিক কোন বিভক্তি নেই। ফলে মাদরাসাগুলোর অধিকাংশ এই সংগঠনের নির্দেশনা মোতাবেক পরিচালিত হয়। আর মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সহ পেশাওয়ারের আহলেহাদীছ মাদরাসাগুলো থেকে ফারেগ হওয়া ছাত্ররা বর্তমানে দ্বীন প্রচারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। আমাদের এই মাদরাসাতে বর্তমানে যেসব ছাত্ররা আছে, তাদের অর্ধেকই আফগানিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা। প্রতিবছরই এ সংখ্যা বাড়ছে। এরা দেশে ফিরে গিয়ে আহলেহাদীছ আন্দোলনের খাদেম হিসাবে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে।

তবে কুনাড় (প্রতিষ্ঠাতা : মাওলানা জামীলুর রহমান), নূরিস্তান (প্রতিষ্ঠাতা : মাওলানা আফযাল) ও বাদাখশানে (প্রতিষ্ঠাতা : মাওলানা শারেকী) যে আহলেহাদীছ হুকুমতগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ৯০-এর দশকে, তা এখন আর বিদ্যমান নেই। এখন প্রদেশগুলো আফগান সরকারের নিয়ন্ত্রণেই পরিচালিত হচ্ছে।   

আত-তাহরীক : আফগানিস্তানে আহলেহাদীছ আন্দোলনের দাওয়াত প্রচারে সরকারী কোন বাধা আছে কি?

শায়খ হাদিয়ুর রহমান : না, সরকারীভাবে আমাদেরকে কোনরূপ বাধা দেয়া হয় না। সরকার কেবল চায় আমরা যেন রাজনৈতিক বিষয়গুলিতে নাক না গলাই। ‘জামা‘আতুদ দাওয়াহ’ সংগঠনটি ৯০-এর দশকে ইসলামী সরকারের অধীনে একবার নির্বাচনে অংশ নিলেও পরবর্তীতে আর কখনও রাজনৈতিক কোন মঞ্চে আসে নি এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নি। তারা মূলতঃ সাধারণ মানুষকে কুরআন-সুন্নাহের দিকে আহবানের দায়িত্ব পালন করছেন। গণতন্ত্রের বিষয়ে আমাদের অবস্থান সম্পর্কে এটুকুই বলব যে, এ ব্যাপারে ইসলামের বক্তব্য এবং আমাদের বক্তব্য ভিন্ন কিছুই নয়। আমরা ইসলাম ব্যতীত অন্য কিছুর অনুসরণ করি না। এর বেশী কিছু বলতে চাই না।     

আত-তাহরীক : বাংলাদেশের সালাফী ভাইদের উদ্দেশ্যে আপনার বক্তব্য কি?

শায়খ হাদিয়ুর রহমান : আমি বাংলাদেশী আহলেহাদীছ ভাইদের প্রতি শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। তাদের প্রতি আমাদের একটাই অনুরোধ থাকবে দাওয়াতের ময়দানে আপনারা সবসময় ঐক্যবদ্ধ ও সংঘবদ্ধ থাকুন। কেননা একতার মাঝেই বরকত ও কল্যাণ নিহিত। 

আত-তাহরীক : আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

শায়খ হাদিয়ুর রহমান : শুকরিয়া, বারাকাল্লাহু ফীকুম। এই প্রথম কোন বাংলাদেশী সালাফী ভাইয়ের সাথে মিলিত হ’তে পেরে আমাদেরও খুব ভাল লাগছে। বাংলাদেশের আহলেহাদীছদের সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারলাম এবং উপকৃত হলাম। যে বই দুটি পেলাম (ছালাতুর রাসূল ছাঃ এবং আহলেহাদীছ আন্দোলন কি ও কেন’-এর ইংরেজী অনুবাদ) আমি তা সযত্নে আমাদের লাইব্রেরীতে রাখব। এই মারকাযে আপনারা আবারও আসবেন। বাংলাদেশী আহলেহাদীছ ভাইদের প্রতিও আমাদের সালাম ও শুভেচ্ছা রইল।

[আফগানিস্তানে আহলেহাদীছ আন্দোলন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পিএইচডি থিসিস ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন : উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ’ ৪৯৬-৫০০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ‘আফগানিস্তানে আহলেহাদীছ আন্দোলন’ অধ্যায়টি পাঠ করুন- সম্পাদক]

 

 

 

HTML Comment Box is loading comments...