প্রবন্ধ

বিদ‘আত ও তার পরিণতি

মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম

 (৪র্থ কিস্তি)

বিদ‘আতের উৎপত্তি

শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়া (রহঃ) বলেন, ‘ইলম ও ইবাদত বিষয়ক সর্বপ্রকার বিদ‘আত খুলাফায়ে রাশেদীনের খেলাফতকালের শেষের দিকেই প্রকাশ পায়।[1] যেমন এ বিষয়ে সতর্ক করে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِى فَسَيَرَى اخْتِلاَفاً كَثِيْراً، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِى وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِيْنَ الْمَهْدِيِّيْنَ، عَضُّوْا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ، وَإِيَّاكُمْ وَالْمُحْدَثَاتِ، فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ- ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি আমার পরে জীবিত থাকবে সে বহু ধরনের মতানৈক্য দেখতে পাবে। অতএব সে সময় তোমাদের অবশ্য কর্তব্য হবে আমার সুন্নাত ও আমার সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে চোয়ালের দাঁত দ্বারা মযবুতভাবে অাঁকড়ে ধরা। আর সাবধান! তোমরা (দ্বীনের ব্যাপারে) নতুন কাজ হতে বেঁচে থাকবে। কেননা প্রত্যেক নতুন কাজই বিদ‘আত’।[2]

ওছমান (রাঃ)-এর শাহাদত বরণের পরে যখন মুসলমানদের মধ্যে বিভক্তির সৃষ্টি হ’ল, ঠিক তখনই সর্বপ্রথম ‘হারূরিয়্যাহ’ বিদ‘আত প্রকাশ লাভ করল। অতঃপর ছাহাবায়ে কেরামের শেষ যামানায় ‘কদর’ অর্থাৎ তাক্বদীর বলে কিছু নেই এই বিশ্বাসের বিদ‘আত প্রকাশ লাভ করে। তার পরপরই ‘ইরজা’ অর্থাৎ আমল ঈমানের অংশ নয় এই বিশ্বাসের বিদ‘আত, ‘তাশায়্যু’ অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পরে আলী (রাঃ) প্রথম খলীফা হওয়ার যোগ্য অধিকারী এই বিশ্বাসের উপর গঠিত বিদ‘আত এবং ‘খাওয়ারেজ’ অর্থাৎ কাবীরা গুনাহগার কাফের ও চিরস্থায়ী জাহান্নামী বিশ্বাসের বিদ‘আত প্রকাশ লাভ করে। অতঃপর তাবেঈনদের শেষ যামানায় ওমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহঃ)-এর মৃত্যুর পরে খোরাসানে হিশাম ইবনে আব্দুল মালেক (রহঃ)-এর খেলাফতকালে জাহমিয়াহদের উৎপত্তি হয়। আর উল্লিখিত বিদ‘আতগুলি দ্বিতীয় শতাব্দী হিজরীতে সৃষ্টি হয়। সে সময় ছাহাবায়ে কেরামের অনেকেই জীবিত ছিলেন এবং তাঁরা এ সকল বিদ‘আতকে সাধ্যমত দমন করেছিলেন। অতঃপর ইসলামের সোনালী যুগের পরে এসে ‘মু‘তাযিলা’ (যারা নিজেদের জ্ঞান বা বিবেকের মানদন্ডে শরী‘আতকে মানে) বিদ‘আতের সৃষ্টি হয়। তারপর ‘তাছাউফ’ বা ‘ছূফীবাদ’ তথা কবরপূজারীদের জন্ম হয়। এভাবে যুগের আবর্তনে বিশ্বব্যাপী রকমারী বিদ‘আতের প্রাদুর্ভাব ঘটে।

বিদ‘আত সৃষ্টির কারণ

(১) অজ্ঞতা : আল্লাহ কর্তৃক নাযিলকৃত অহি-র বিধান তথা কুরআন ও ছহীহ হাদীছ সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান না থাকাই সমাজে বিদ‘আত সৃষ্টির প্রধান কারণ। সঠিক পথ না চেনার কারণে মানুষ যেমন পথ ভুল করে, তেমনি কুরআন ও ছহীহ হাদীছের যথার্থ জ্ঞান না থাকার কারণে মানুষ শরী‘আত বহির্ভূত কাজকে ইবাদত হিসাবে গ্রহণ করে। আর এজন্যই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জ্ঞানার্জনকে ফরয বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيْضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ ‘প্রত্যেক মুসলিমের উপর জ্ঞানার্জন করা ফরয’।[3] আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সম্বন্ধে ইলমবিহীন কথা বলতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوْا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُوْلُوْا عَلَى اللهِ مَا لَا تَعْلَمُوْنَ- ‘বল, আমার প্রতিপালক হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা, পাপাচার ও অসঙ্গত বিরোধিতাকে এবং কোন কিছুকে আল্লাহর শরীক করাকে, যার কোন দলীল তিনি অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কিছু বলাকে, যে সম্বন্ধে তোমাদের কোন জ্ঞান নেই’ (আ‘রাফ ৭/৩৩)। তিনি অন্যত্র বলেন, وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُوْلاً- ‘যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই সে বিষয়ে অনুমান দ্বারা পরিচালিত হয়ো না। নিশ্চয়ই কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় ওদের প্রত্যেকেই জিজ্ঞাসিত হবে’ (বানী ইসরাঈল ১৭/৩৬)

হাসান বছরী (রহঃ) বলেন,إِنَّ اَهْلَ الْبِدْعِ أَصَاغِرُ فِي الْعِلْمِ وَلِأَجْلِ ذَلِكَ صَارُوْا أَهْلَ الْبِدْعِ ‘নিশ্চয়ই বিদ‘আতীরা ইলমের দিক থেকে একেবারেই নগণ্য। আর এ কারণেই তারা বিদ‘আতী হয়েছে’।[4]

শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন,مَنْ دَعَا إلَى الْعِلْمِ دُوْنَ الْعَمَلِ الْمَأْمُوْرِ بِهِ كَانَ مُضِلاَّ وَمَنْ دَعَا إلَى الْعَمَلِ دُوْنَ الْعِلْمِ كَانَ مُضِلاَّ وَأَضَلُّ مِنْهُمَا مَنْ سَلَكَ فِي الْعِلْمِ طَرِيْقَ أَهْلِ الْبِدَعِ؛ فَيَتَّبِعَ أُمُوْرًا تُخَالِفُ الْكِتَابَ وَالسُّنَّةَ يَظُنُّهَا عُلُوْمًا وَهِيَ جَهَالاَتٌ وَكَذَلِكَ مَنْ سَلَكَ فِي الْعِبَادَةِ طَرِيْقَ أَهْلِ الْبِدَعِ، فَيَعْمَلُ أَعْمَالاً تُخَالِفُ الْأَعْمَالَ الْمَشْرُوْعَةَ يَظُنُّهَا عِبَادَاتٍ وَهِيَ ضَلاَلاَتٌ   ‘যে ব্যক্তি আমল ব্যতীত ইলমের দিকে আহবান করে সে পথভ্রষ্ট। আর যে ব্যক্তি ইলম বিহীন আমলের দিকে আহবান করে সেও পথভ্রষ্ট। এদের চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট সে ব্যক্তি, যে বিদ‘আতীদের পথে ইলম অন্বেষণ করে। ফলে সে কুরআন ও সন্নাত বহির্ভূত কর্মের অনুসরণ করে এবং ধারণা করে যে, ইহা ইলম; অথচ ইহা অজ্ঞতা। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি বিদ‘আতীদের পন্থায় ইবাদত করে সে ইসলামী শরী‘আত বহির্ভূত আমল করে এবং ধারণা করে যে, সে ইবাদত করছে; অথচ ইহা ভ্রষ্টতা’।[5]

অতএব জ্ঞান এমন এক আলোকবর্তিকা, যার মাধ্যমে মানুষ জান্নাতের পথ সুস্পষ্টভাবে দেখতে পায়। নিজেকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে এবং অন্যকেও রক্ষা করতে সক্ষম হয়। পক্ষান্তরে অজ্ঞতা এমন এক অন্ধকার, যার মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে নিজে জান্নাতের পথের দিশা হারিয়ে ফেলে এবং অপরকেও সে পথের সন্ধান দিতে পারে না। আর এরূপ অজ্ঞ ব্যক্তিরাই নিজে বিদ‘আতী হয় এবং ছহীহ, যঈফ ও জাল হাদীছের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণে অক্ষম হওয়ায় ভুল ফৎওয়া দেয়। সাথে সাথে মানব রচিত কিছ্ছা-কাহিনী ও স্বপ্নবৃত্তান্তের মাধ্যমে মানুষকে ভ্রষ্টতার শেষ সীমানায় নিক্ষেপ করে। ফলে নিজেরা পথভ্রষ্ট হয় এবং অপরকে পথভ্রষ্ট করে এবং পরকালে জাহান্নামের খড়ি হয়।

(২) প্রবৃত্তিপূজা : প্রবৃত্তিপূজা তথা নিজের মন যে কাজকে ভাল মনে করে তার অনুসরণ করা বিদ‘আত সৃষ্টির অন্যতম একটি কারণ। শয়তান মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার জন্য সদা বদ্ধপরিকর। সে ইসলাম বহির্ভূত কাজকে মানুষের সামনে খুব সুন্দর ও সুশোভিতরূপে উপস্থাপন করে। ফলে মানুষের মন তা সানন্দে গ্রহণ করে। ধীরে ধীরে তা এক সময় ইসলামের বিধান হিসাবে মানব সমাজে পরিচিতি লাভ করে। এমনকি শেষ পর্যন্ত মানুষ এর বিরুদ্ধে অবস্থানকারী কুরআন ও ছহীহ হাদীছকেই অগ্রাহ্য করে বসে। ফলে সে পথভ্রষ্ট জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

فَإِنْ لَمْ يَسْتَجِيْبُوْا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُوْنَ أَهْوَاءَهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِنَ اللهِ إِنَّ اللهَ لاَ يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِيْنَ-

‘অতঃপর তারা যদি তোমার আহবানে সাড়া না দেয়, তাহ’লে জানবে যে, তারা তো কেবল তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে। আল্লাহর পথনির্দেশ অগ্রাহ্য করে যে ব্যক্তি নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে তা অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত আর কে? আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে পথনির্দেশ করেন না’ (কাছাছ ২৮/৫০)। তিনি অন্যত্র বলেন, إِنْ يَتَّبِعُوْنَ إِلَّا الظَّنَّ وَمَا تَهْوَى الْأَنْفُسُ وَلَقَدْ جَاءَهُمْ مِنْ رَبِّهِمُ الْهُدَى- ‘তারা তো অনুমান এবং নিজেদের প্রবৃত্তিরই অনুসরণ করে, অথচ তাদের নিকট তাদের প্রতিপালকের পথনির্দেশ এসেছে’ (নাজম ৫৩/২৩)। তিনি অন্যত্র বলেন,

أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَنْ يَهْدِيْهِ مِنْ بَعْدِ اللهِ أَفَلاَ تَذَكَّرُوْنَ-

‘তুমি কি তাকে লক্ষ্য করেছ? যে তার খেয়াল-খুশীকে নিজ ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? আল্লাহ জেনেশুনেই তাকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং তার কর্ণ ও হৃদয়ে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তার চক্ষুর উপর রেখেছেন আবরণ। অতএব আল্লাহর পরে কে তাকে পথনির্দেশ করবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?’ (জাছিয়া ৪৫/২৩)

অতএব প্রবৃত্তিপূজা এমন এক মারাত্নক ব্যাধি যা মানুষকে সরল-সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে বক্রপথ অবলম্বনে বাধ্য করে। ফলে তার সামনে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের পর্বতসম দলীল পেশ করলেও সে তা অগ্রাহ্য করে নিজের মতের উপরই অটল থাকে। এমতাবস্থায় কুরআন ও ছহীহ হাদীছ শুনতে তার কর্ণ বধির এবং সরল ও সঠিক পথ দেখতে তার চক্ষু অন্ধ হয়ে যায়। এমনকি সে তার নিজের মতকে বলবৎ করার জন্য কুরআন ও ছহীহ হাদীছের অপব্যাখ্যায় লিপ্ত হয়। কখনো বা কুরআনের একটিমাত্র আয়াত অথবা হাদীছের কোন অংশকে নিজের মতের উপর দলীল হিসাবে পেশ করে নিজেকে কৃতার্থ মনে করে। অথচ পূর্ণ হাদীছ ও আয়াতের ব্যাখ্যা জানার প্রয়োজন মনে করে না। আর এর ফলেই সমাজে সৃষ্টি হয় নানা বিদ‘আত।

(৩) তাক্বলীদ বা অন্ধ অনুসরণ : আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে আশরাফুল মাখলূকাত তথা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসাবে দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন এবং তার সার্বিক জীবন পরিচালনার যাবতীয় বিধি-বিধান নাযিল করেছেন। সাথে সাথে নির্দেশ দিয়েছেন, اِتَّبِعُوْا مَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَلاَ تَتَّبِعُوْا مِنْ دُوْنِهِ أَوْلِيَاءَ قَلِيْلاً مَّا تَذَكَّرُوْنَ- ‘তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে যা অবতীর্ণ হয়েছে, তোমরা তার অনুসরণ কর, আর তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে অন্য কাউকে বন্ধুরূপে অনুসরণ কর না। তোমরা খুব অল্পই উপদেশ গ্রহণ করে থাক’ (আ‘রাফ ৭/৩)। অথচ মানুষ যখন আল্লাহর এই নির্দেশকে উপেক্ষা করে নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি বা মাযহাবের তাক্বলীদের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়েছে, ঠিক তখনই অনেক ক্ষেত্রে কুরআন ও ছহীহ হাদীছকে অগ্রাহ্য করে বিদ‘আতী কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়েছে।

মা‘ছূমী (রহঃ) বলেন,وَالْعَجَبُ مِنْ هَؤُلَاءِ الْمُقَلِّدِيْنَ لِهَذِهِ الْمَذَاهِبِ الْمُبْتَدِعَةِ الشَائِعَةِ وَالْمُتَعَصِّبِيْنَ لَهَا، فَإِنَّ أَحَدَهُمْ يَتَّبِعُ مَا نُسِبَ إِلَى مَذْهَبِهِ مَعَ بُعْدِهِ عَنِ الْدَّلِيْلِ، وَيَعْتَقِدُهُ كَأَنَّهُ نَبِيٌّ مُرْسَلٌ، وَهَذَا نَأْيٌ عَنِ الْحَقِّ، وَبُعْدٌ عَنِ الْصَّوَابِ، وَقَدْ شَاهَدْنَا وَجَبَرْنَا أَنَّ هَؤُلَاءِ الْمُقَلِّدِيْنَ يَعْتَقِدُوْنَ أَنَّ إِمَامَهُمْ يَمْتَنِعُ عَلَى مِثْلِهِ الْخَطَأُ، وَأَنَّ مَا قَالَهُ هُوَ الْصَّوَابُ أَلْبَتَّةَ، وَأَضْمَرَ فِيْ قَلْبِهِ أَنَّهُ لَا يَتْرُكُ تَقْلِيْدَهُ وَإِنْ ظَهَرَ الْدَلِيْلُ عَلَى خِلَافِهِ- ‘প্রচলিত নব আবিষ্কৃত মাযহাব সমূহের অন্ধ অনুসারীদের ব্যাপারে আশ্চর্যের বিষয় হ’ল, নিশ্চয়ই তাদের কেউ (মুকাল্লিদ) তারই অনুসরণ করে, যা কেবল মাত্র তার  মাযহাবের দিকে সম্পর্কিত, যদিও তা দলীল থেকে অনেক দূরে হয় এবং বিশ্বাস করে যে তিনি (অনুসরণীয় ইমাম) আল্লাহ প্রেরিত নবী। আর অন্যজন হক্ব এবং সঠিকতা থেকে অনেক দূরে। আর আমরা লক্ষ্য করেছি এবং পরীক্ষা করে দেখেছি যে, নিশ্চয়ই ঐ সমস্ত মুক্বাল্লিদরা বিশ্বাস করে যে, তাদের ইমামের এরূপ ভুল হওয়া অসম্ভব। বরং তিনি যা বলেছেন তাই সঠিক। কিন্তু তারা তাদের অন্তরে গোপন রেখেছে যে, তারা কখনই তাদের (অনুসরণীয় ইমাম) তাক্বলীদ ছাড়বে না, যদিও দলীল তার বিপরীত হয়’।[6]

কামাল বিন হুমাম হানাফী (রহঃ) বলেন,إِنَّ الْتِزَامَ مَذْهَبٍ مُعَيَّنٍ غَيْرُ لَازِمٍ عَلَى الصَحِيْحِ، لِأَنَّ الْتِزَامَهُ غَيْرُ مُلْزَمٍ، إِذْ لاَ وَاجِبَ إِلَّا مَا أَوْجَبَهُ اللهُ وَرَسُوْلُهُ، وَلَمْ يُوْجِبُ اللهُ وَلَا رَسُوْلُهُ عَلَى أَحَدٍ مِنَ النَّاسِ أَنْ يَتَمَذْهَبَ بِمَذْهَبِ رَجُلٍ مِنَ الأَئِمَّةِ، فَيُقَلِّدُهُ فِيْ دِيْنِهِ فِيْ كُلِّ مَا يَأْتِيْ  وَيَذَرُ دُوْنَ غَيْرِهِ، وَقَدْ انْطَوَتِ القُرُوْنُ الفَاضِلَةُ عَلَى عَدَمِ القَوْلِ بِلُزُوْمِ التَمَذْهُبِ بِمَذْهَبٍ مُعَيَّنٍ- ‘ছহীহ মতে নির্দিষ্ট কোন মাযহাবের অন্ধ অনুসরণ করা অপরিহার্য নয়। কেননা তার (মাযহাবের) অন্ধ অনুসরণ অপরিহার্য করা হয়নি। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ছাঃ) যা ওয়াজিব করেননি তা কখনই ওয়াজিব হবে না। আর অল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ) মানুষের মধ্যে কারো উপর ইমামগণের কোন একজনের মাযহাবকে এমনভাবে গ্রহণ করা ওয়াজিব করনেনি যে, দ্বীনের ব্যাপারে তার (ইমাম) আনীত সকল কিছুই গ্রহণ করবে এবং অন্যের সকল কিছু পরিত্যাগ করবে। নির্দিষ্ট কোন মাযহাবের অন্ধ অনুসরণ অপরিহার্য হওয়ার কথা বলা ছাড়াই মর্যাদাপূর্ণ শতাব্দী সমূহ অতিবাহিত হয়েছে।[7]

সাবেক সঊদী গ্র্যান্ড মুফতী, বিশ্ববরেণ্য আলেমে দ্বীন শায়খ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্ল­াহ বিন বায (রহঃ) বলেন, ‘চার মাযহাবের কোন এক মাযহাবের তাক্বলীদ করা ওয়াজিব’ মর্মে প্রচলিত কথাটি নিঃসন্দেহে ভুল; বরং চার মাযহাবসহ অন্যদের তাক্বলীদ করা ওয়াজিব নয়। কেননা কুরআন ও সুন্নাহ-এর ইত্তেবা করার মধ্যেই হক নিহিত আছে, কোন ব্যক্তির তাক্বলীদের মধ্যে নয়’।[8]

(৪) শারঈ বিষয়ে অতিরঞ্জন বা বাড়াবাড়ি : মানব জাতির উপর অবশ্য কর্তব্য হ’ল, অহি-র বিধান যেভাবে নাযিল হয়েছে তাকে সেভাবেই অক্ষুণ্ণ রাখা। আল্লাহ যাকে যে মর্যাদা দিয়েছেন তাকে সে মর্যাদায় ভূষিত করা। কিন্তু মানুষ শারঈ বিষয়ে অতিরঞ্জন বা বাড়াবাড়ি করতে করতে অনেক সুন্নাত বা নফলকে ফরযে পরিণত করেছে। ইসলামী শরী‘আতে কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না, এমন বিষয়কে ফযীলতের উচ্চ শিখরে সমুন্নীত করে নিকৃষ্ট বিদ‘আতের জন্ম দিয়েছে। খৃষ্টানরা ঈসা (আঃ)-কে নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে করতে আল্লাহর পুত্র বানিয়েছে। ছূফীরা মাটির তৈরী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে নূরের তৈরী বানিয়ে আল্লাহর আসনে বসিয়েছে। স্বয়ং আল্লাহ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর মৃত্যুর ঘোষণা দিলেও বাংলার অধিকাংশ মানুষ তা উপেক্ষা করে রাসূল (ছাঃ)-কে জীবিত ঘোষণা দিয়ে তাঁর জন্ম দিবস উপলক্ষে অসংখ্য বিদ‘আত করে চলেছে। আর এ কারণেই ইসলামী শরী‘অতে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوْا فِيْ دِيْنِكُمْ غَيْرَ الْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعُوْا أَهْوَاءَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّوْا مِنْ قَبْلُ وَأَضَلُّوْا كَثِيْرًا وَضَلُّوْا عَنْ سَوَاءِ السَّبِيْلِ-  ‘বল, হে কিতাবধারীগণ! তোমরা তোমাদের দ্বীন সম্বন্ধে অন্যায় বাড়াবাড়ি কর না এবং যে সম্প্রদায় ইতিপূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে, অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে ও সরল পথ হ’তে বিচ্যুত হয়েছে, তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ কর না’ (মায়েদাহ ৫/৭৭)। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,إِيَّاكُمْ وَالْغُلُوَّ فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِالْغُلُوِّ فِى الدِّينِ ‘তোমরা (দ্বীনের মধ্যে) অতিরঞ্জন বা বাড়াবাড়ি থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে’।[9]

(৫) যঈফ ও জাল হাদীছের অনুসরণ : বিদ‘আতীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে যঈফ ও জাল হাদীছের ভিত্তিতে বিদ‘আতী কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে বিদ‘আতী কাজকে বলবৎ করার জন্য কুরআন ও ছহীহ হাদীছের অপব্যাখ্যা করে। তাদেরকে সংশোধনের উদ্দেশ্যে যদি বলা হয় যে, তোমরা যে হাদীছের ভিত্তিতে আমলটি করছ সেটি যঈফ অথবা জাল, তাহ’লে সাথে সাথে তারা বলে উঠে, হাদীছ কি কখনো যঈফ অথবা জাল হয়? অথচ একথাই সঠিক যে, রাসূল (ছাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীছ কখনো যঈফ ও জাল হয় না। বরং যেসব কথা ও কর্ম রাসূল (ছাঃ) থেকে প্রমাণিত নয়; অথচ তা রাসূল (ছাঃ)-এর দিকে সম্বন্ধিত করা হয় তাই মূলতঃ যঈফ ও জাল হাদীছ হিসাবে প্রমাণিত। আর এরূপ অসংখ্য যঈফ ও জাল হাদীছ সমাজে প্রচলিত আছে এবং এর অধিকাংশই হাদীছের কিতাবগুলিতে লিপিবদ্ধ হয়েছে। ফলে মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে এবং বিদ‘আতকে ছাড়তে তাদের কষ্ট হচ্ছে। একশ্রেণীর আলেম সমাজ উক্ত হাদীছগুলির যঈফ ও জাল হওয়ার কারণ জানলেও মাযহাবী গোঁড়ামী ও তাদের ইলমের অহংকারের কারণে সেগুলোকে সমাজে জিইয়ে রেখেছে। আল্লাহ তাদেরকে হেদায়াত দান করুন। আমীন!

(৬) বিধর্মীদের অনুকরণ : মুসলমানরা বিধর্মীদের অনুকরণে মুসলিম সমাজে অনেক বিদ‘আত চালু করেছে। যেমন- কবরপূজা, পীরপূজা, ঈদে মীলাদুন্নবী, কবরে ও শহীদ মীনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের অসংখ্য বিদ‘আত বিধর্মীদের অনুকরণেই সৃষ্টি হয়েছে। আর মুসলমনরা যে বিধর্মীদের অনুকরণ করবে এমন ভবিষ্যদ্বাবাণীও রাসূল (ছাঃ) করে গেছেন। তিনি বলেন,

لَيَأْتِيَنَّ عَلَى أُمَّتِيْ مَا أَتَى عَلَى بَنِيْ إِسْرَائِيْلَ حَذْوَ النَّعْلِ بِالنَّعْلِ حَتَّى إِنْ كَانَ مِنْهُمْ مَنْ أَتَى أُمَّهُ عَلاَنِيَةً لَكَانَ فِيْ أُمَّتِيْ مَنْ يَصْنَعُ ذَلِكَ وَإِنَّ بَنِيْ إِسْرَائِيْلَ تَفَرَّقَتْ عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِيْنَ مِلَّةً وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِيْ عَلَى ثَلاَثٍ وَسَبْعِيْنَ مِلَّةً كُلُّهُمْ فِيْ النَّارِ إِلاَّ مِلَّةً وَاحِدَةً قَالُوْا وَمَنْ هِىَ يَا رَسُوْلَ اللهِ قَالَ مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِيْ-

‘নিশ্চয়ই আমার উম্মতের উপর তেমন অবস্থা আসবে, যেমন এসেছিল বনু ইস্রাঈলের উপর এক জোড়া জুতার পরস্পরে সমান হওয়ার ন্যায়। এমনকি তাদের মধ্যে যদি কেউ এমনও থাকে, যে তার মায়ের সাথে প্রকাশ্যে যেনা করেছে, আমার উম্মতের মধ্যেও তেমন লোক পাওয়া যাবে যে এমন কাজ করবে। আর বনু ইস্রাঈল ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল, আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। সবাই জাহান্নামে যাবে, একটি দল ব্যতীত। তারা বললেন, সেটি কোন দল হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)? তিনি বললেন, যারা আমি ও আমার ছাহাবীগণ যার উপরে আছি, তার উপর টিকে থাকবে’।[10] আর বিধর্মীদের অনুকরণের পরিণতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ ‘যে ব্যক্তি যে কওমের অনুকরণ করবে ক্বিয়ামতের দিন সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে’।[11]

অতএব বিধর্মীদের অনুকরণে বিদ‘আতী কর্মকান্ডে লিপ্ত হ’লে অবশ্যই জাহান্নামে যেতে হবে। আর এথেকে রক্ষা পেতে হ’লে রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরামের পথ তথা একমাত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের অনুসরণ করতে হবে।

(৭) নিজের জ্ঞানকে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের উপর প্রাধান্য দেওয়া : আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে অন্যান্য মাখলূকাতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছেন। আর এই শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড হিসাবে মানুষকে দান করেছেন বিবেক বা বুদ্ধি। মানুষ সেই বিবেক-বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের মানদন্ডে ভাল-মন্দের পার্থক্য নিরূপণ করবে। কিন্তু মানুষ কুরআন ও ছহীহ হাদীছকে উপেক্ষা করে নিজের বিবেকের মানদন্ডে ভাল-মন্দের পার্থক্য নিরূপণ করতে গিয়ে ভাল কাজের দোহাই দিয়ে বিদ‘আতে হাসানার নামে অসংখ্য বিদ‘আতের জন্ম দিয়েছে। অথচ ইসলামী শরী‘আতে বিদ‘আতে হাসানার কোন অস্তিত্ব নেই। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,إِنَّ أَصْدَقَ الْحَدِيْثِ كِتَابُ اللهِ وَأَحْسَنَ الْهَدْىِ هَدْىُ مُحَمَّدٍ وَشَرَّ الأُمُوْرِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ وَكُلَّ ضَلاَلَةٍ فِيْ النَّارِ- ‘নিশ্চয়ই সর্বোত্তম কথা হ’ল আল্লাহর কিতাব, আর সর্বোত্তম হিদায়াত হ’ল মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর হিদায়াত। সর্বনিকৃষ্ট কাজ হ’ল (শরী‘আতের মধ্যে) নব আবিষ্কার। আর প্রত্যেক নব আবিষ্কারই বিদ‘আত এবং প্রত্যেক বিদ‘আতই গোমরাহী। আর প্রত্যেক গোমরাহীর পরিণামই জাহান্নাম’।[12]

(৮) পীর-দরবেশের মিথ্যা কাশ্ফ ও স্বপ্নের প্রবঞ্চনা : ছূফী মতবাদে বিশ্বাসী একশ্রেণীর পীর, দরবেশ ও ফকীরেরা  তাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে কাশফের মিথ্যা দাবী করে। এমনকি তাদের মধ্যে অনেকে আবার সরাসরি আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের কথাও বলে থাকে। তাদের কাছে কুরআন ও ছহীহ হাদীছ তুলে ধরলে তারা বলে, তোমাদের এই জ্ঞানের সনদ তো এক মৃত ব্যক্তি থেকে অপর মৃত ব্যক্তি। আর আমাদের জ্ঞানের সনদ স্বয়ং আললাহ। সরাসরি আল্লাহ আমাদেরকে দ্বীনের ইলম শিক্ষা দিয়ে থাকেন। তোমাদের ইলম কিতাবের মধ্যে বিদ্যমান, আর আমাদের ইলম কলবের মধ্যে বিদ্যমান। আমাদের মাদরাসায় লিখা-পড়ার প্রয়োজন হয় না। এভাবে তারা শারঈ বিষয়ে অজ্ঞ ব্যক্তিদের সামনে এধরনের নানা বুলি আওড়িয়ে মানবতার মুক্তির সনদ কুরআন ও ছহীহ হাদীছকে উপেক্ষা করে নিজেদের মস্তিষ্কপ্রসূত কাল্পনিক ভাবাবেগকে কারামতের দোহাই দিয়ে অসংখ্য শিরক ও বিদ‘আতের জন্ম দিয়ে থাকে। আল্লাহ তাদেরকে হেদায়াত দান করুন। আমীন!

(৯) ওলামায়ে কেরামের নীরবতা ও স্বার্থান্বেষণ : আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُوْنَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ-

‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা (মানুষকে) কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দিবে ও অসৎকাজে নিষেধ করবে; আর ওরাই হবে সফলকাম’ (আলে-ইমরান ৩/১০৪)। আল্লাহ তা‘আলা মহান এই দায়িত্ব পালনের জন্য আম্বিয়ায়ে কেরামকে নিয়োজিত করেছিলেন। বর্তমানে এই দায়িত্ব ওলামায়ে কেরামের উপর অর্পিত হয়েছে। কেননা রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, إِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الأَنْبِيَاءِ ‘নিশ্চয়ই আলেমগণ আম্বিয়ায়ে কেরামের ওয়ারিছ’।[13] কিন্তু দুঃখের বিষয় হ’ল, বর্তমানে অধিকাংশ আলেম আম্বিয়ায়ে কেরামের ওয়ারিছ হওয়ার পরিবর্তে তাঁদের দুশমনে পরিণত হয়েছে। সমাজে তাদের নেতৃত্ব, পকেট ভর্তি টাকা ও পেট ভর্তি ভাল খাদ্য হাছিলের উদ্দেশ্যে এবং ইমামতির চাকুরী হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর উপর মিথ্যারোপ করে অসংখ্য বিদ‘আতকে লালন করছে। আজকেই যদি ঘোষণা দেওয়া হয় যে, মীলাদ করলে কোন টাকা দেওয়া হবে না, শবে বরাত উপলক্ষে কোন হালুয়া-রুটি ও মিষ্টি বিতরণ হবে না, তাহলে তারাই এগুলোকে বিদ‘আত বলে ঘোষণা দিবে। এতে কোন সন্দেহ নেই। আর এরূপ আলেমদের পরিণাম ভয়াবহ। আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ سُئِلَ عَنْ عِلْمٍ يَعْلَمُهُ فَكَتَمَهُ أُلْجِمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِلِجَامٍ مِنْ نَارٍ- ‘যে ব্যক্তি তার জানা ইলম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়েও তা গোপন করে রাখে, ক্বিয়ামতের দিন তাকে আগুনের লাগাম পরিয়ে দেওয়া হবে’।[14]

পক্ষান্তরে হক্বপন্থী ওলামায়ে কেরামের অধিকাংশ দুনিয়া অর্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আবার অনেকেই বিলাসবহুল আলস্য জীবন-যাপন করছেন; সামান্য কষ্ট স্বীকার করতে তারা সম্মত নন। এহেন পরিস্থিতিতে হক্ব প্রচারে তাদের হাতে কোন সময় নেই। এছাড়াও যারা হক্ব প্রচারের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন তাদের সংখ্যা অতীব নগণ্য। ফলে তাদের পক্ষে সর্বস্তরের মানুষের নিকট হক্ব পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। যার কারণে সমাজ থেকে বিদ‘আত দূরীভূত হচ্ছে না; বরং আরো বাড়ছে।

বিদ‘আতের প্রকারভেদ

বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিদ‘আত কয়েক ভাগে বিভক্ত। নিম্নে দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী প্রকারভেদ আলোচনা করা হ’ল।

প্রথম দৃষ্টিকোণ : শারঈ দলীল দ্বারা সাব্যস্ত হওয়া অথবা না হওয়ার দিক থেকে বিদ‘আত দুই প্রকার। যথা :

(ক) البدعة الحقيقية (আল-বিদ‘আতুল হাক্বীকিয়্যাহ) তথা প্রকৃত বিদ‘আত : বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক ইমাম শাত্বিবী (রহঃ) আল-ই‘তিছাম নামক গ্রন্থে বলেছেন,

إِنَّ الْبِدْعَةَ الْحَقِيْقِيَّةَ الَّتِيْ لَمْ يَدُلُّ عَلَيْهَا دَلِيْلٌ شَرْعِيٌّ لاَ مِنْ كِتَابٍ وَلاَ مِنْ سُنَّةٍ وَلاَ إِجْمَاعٍ وَلاَ اسْتِدْلاَلٍ مُعْتَبَرٍ عِنْدَ أَهْلِ الْعِلْمِ وَلاَ فِي الْجُمْلَةِ وَلاَ فِيْ التَّفْصِيْلِ وَلِذَلِكَ سُمِّيَتْ بِدْعَةٌ لِأَنَّهَا مُخْتَرَعَةٌ عَلَى غَيْرِ مِثَالٍ سَابِقٍ-

‘প্রকৃত বিদ‘আত হ’ল, যার সমর্থনে শরী‘আতের কোন দলীল নেই। না আল্লাহর কিতাব, না তাঁর রাসূলের সুন্নাত, না ইজমার কোন দলীল, না এমন কোন দলীল পেশ করা যায় যা জ্ঞানীদের নিকট গ্রহণযোগ্য। না মোটামুটিভাবে, না বিস্তারিত ও খুটিনাটিভাবে। এজন্য এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘বিদ‘আত’। কেননা তা পূর্ব দৃষ্টান্তহীন নতুন আবিষ্কৃত বিষয়’।[15]

উদাহরণ : (১) আযানের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ করা বিদ‘আতে হাক্বীকী। কেননা তা কুরআন, ছহীহ হাদীছ ও ইজমায়ে ছাহাবা দ্বারা সাব্যস্ত নয়।

(২) বর্তমান সমাজে প্রচলিত ‘শবেবরাত’ বিদ‘আতে হাক্বীক্বী-এর অন্তর্ভুক্ত। কেননা কুরআন ও ছহীহ হাদীছে এর কোন অস্তিত্ব নেই। রাসূল (ছাঃ), ছাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈনে ইযামের কেউ কখনো ‘শবেবরাত’ পালন করেননি। কিন্তু মানুষ অফুরন্ত ছওয়াব হাছিলের আশায় ‘শবেবরাত’ উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের ইবাদতে লিপ্ত হয়।

(৩) ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’, ইসলামে যার কোন অস্তিত্ব নেই। রাসূল (ছাঃ), ছাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈনে ইযামের কেউ কখনো ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ উদ্যাপন করেননি। কিন্তু মানুষ তা ছওয়াবের আশায় করে থাকে।

এরূপ অসংখ্য বিদ‘আত রয়েছে যার কোন অস্তিত্ব ইসলামী শরী‘আতে নেই। কিন্তু সমাজে নেকীর কাজ হিসাবে প্রচলিত আছে। আর এরূপ অস্তিত্বহীন বিদ‘আতকেই বিদ‘আতে হাক্বীক্বী বলা হয়।

(খ) البدعة الإضافية (আল-বিদ‘আতুল ইযাফিয়্যাহ) বা বাড়তি বিদ‘আত : এর দু’টি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এক দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি এমন ইবাদত, যা কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত এবং অপর দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি বিদ‘আত, যা মূলতঃ কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হ’লেও এর স্থান, সময় ও পদ্ধতি সুন্নাহ পরিপন্থী।

উদাহরণ : (১) আযানের পরে রাসূল (ছাঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ করা শরী‘আত সম্মত। কিন্তু উচ্চৈঃস্বরে দরূদ পাঠ করা সুন্নাত পরিপন্থী, যা বিদ‘আতে ইযাফী-এর অন্তর্ভুক্ত।

(২) জুম‘আর খুৎবা আরম্ভ হওয়ার পূর্বে মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে আযান দেওয়া সুন্নাত। পক্ষান্তরে মসজিদের ভেতরে খতীবের সামনে দাঁড়িয়ে নিম্ন স্বরে আযান দেওয়া সুন্নাত পরিপন্থী, যা বিদ‘আতে ইযাফী-এর অন্তর্ভূক্ত।

(৩) পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের পূর্বে ও পরে সর্বমোট ১২ রাক‘আত ছালাত, যাকে ‘সুনানুর রাওয়াতেব’ বলা হয়। তা জামা‘আতবদ্ধ ছাড়াই একাকী আদায় করা শরী‘আত সম্মত। পক্ষান্তরে উল্লিখিত ছালাতগুলো জামা‘আতবদ্ধভাবে আদায় করা সুন্নাহ পরিপন্থী, যা বিদ‘আতে ইযাফী-এর অন্তর্ভুক্ত।

(৪) কুরআন তেলাওয়াত একটি উত্তম ইবাদত, যার প্রতিটি হরফের বিনিময়ে দশটি করে নেকী অর্জন করা যায়। কিন্তু ছালাতে রুকূ এবং সিজদা অবস্থায় কুরআন তেলাওয়াত সুন্নাত পরিপন্থী, যা বিদ‘আতে ইযাফী-এর অন্তর্ভুক্ত।

(৫) মৃত ব্যক্তির জন্য শোক পালন করা শরী‘আত সম্মত। কিন্তু শোক পালনের নামে দাঁড়িয়ে এক বা দু’মিনিট নীরবতা পালন করা অথবা কিছু সংখ্যক মানুষ মৃতের বাড়িতে একত্রিত হয়ে সকলে মিলে শোক পালন করা সুন্নাত পরিপন্থী, যা বিদ‘আতে ইযাফী-এর অন্তর্ভুক্ত।

(৬) শা‘বান মাস বেশী বেশী ছিয়াম পালনের মাস। যে মাসে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সবচেয়ে বেশী নফল ছিয়াম পালন করেছেন। কিন্তু মধ্য শা‘বানে শবেবরাতের উদ্দেশ্যে দিনে ছিয়াম ও রাতে ছালাত আদায় করা ইসলামী শরী‘আত পরিপন্থী, যা বিদ‘আতে ইযাফী-এর অন্তর্ভুক্ত।

(৭) ফরয ছালাতের পরে একাকী দো‘আ বা মুনাজাত করা শরী‘আত সম্মত। এ সময় দো‘আ করার জন্য রাসূল (ছাঃ) অনেকগুলো দো‘আ আমাদেরকে শিখিয়ে দিয়েছেন, যা পাঠ করতে ১০-১৫ মিনিট সময় লাগবে। কিন্তু উক্ত সময় ইমাম ও মুক্তাদীর সম্মিলিত মুনাজাত, যা রাসূল (ছাঃ) এবং ছাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত নয়, তা বিদ‘আতে ইযাফী-এর অন্তর্ভুক্ত।

অতএব বিদ‘আতে হাক্বীকী এবং বিদ‘আতে ইযাফী-এর মধ্যে পার্থক্য হ’ল, ইসলামে যার কোন ভিত্তি নেই এমন কিছুকে নেকীর কাজ মনে করে পালন করা বিদ‘আতে হাক্বীকী। পক্ষান্তরে যে ইবাদত মৌলিকভাবে কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু স্থান, সময় ও পদ্ধতি কুরআন ও সুন্নাহ পরিপন্থী তাকে বিদ‘আতে ইযাফী বলা হয়।

দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি : কর্মে বাস্তবায়ন এবং বর্জনের দিক থেকে বিদ‘আত দু’প্রকার।

(ক) البدعة الفعلية তথা কর্মগত বিদ‘আত : এটা এমন কর্মকে বলা হয়, যা ইসলামী শরী‘আত সমর্থিত নয়। অথচ উক্ত কর্মের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর নৈকট্য হাছিল করতে চায়।

বিদ‘আতীরা এই প্রকার বিদ‘আত সবচেয়ে বেশী করে থাকে। যেমন- শবেবরাতের নিয়তে শা‘বান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে ১০০ রাক‘আত ছালাত আদায় করা । শবে মে‘রাজের নিয়তে ২৭ রজবের রাতে ইবাদত করা। ঈদে মীলাদুন্নবী পালন করা সহ বিভিন্ন দিবস পালন করা ইত্যাদি যা কুরআন ও ছহীহ হাদীছ বিরোধী।

(খ) البدعة الةركية তথা বিদ‘আত : বর্জনমূলক ইসলামী শরী‘আতে বৈধ অথবা ওয়াজিব কোন বিষয়কে আল্লাহর নৈকট্য হাছিলের উদ্দেশ্যে বর্জন করা এ শ্রেণীভুক্ত বিদ‘আত। যেমন- আল্লাহর নৈকট্য হাছিলের উদ্দেশ্যে হালাল কোন পশুর গোশত না খাওয়া যেমনভাবে হিন্দুরা গরুর গোশত খায় না। আল্লাহর নৈকট্য হাছিলের উদ্দেশ্যে বিবাহ না করা যেমনভাবে খ্রীষ্টান পাদ্রীরা বিবাহ করে না।

তৃতীয় দৃষ্টিভঙ্গি : বিশ্বাস ও কর্মে বাস্তবায়নের দিক থেকে বিদ‘আত দু’প্রকার।

(ক) البدعة الإعةقادية তথা বিশ্বাসগত বিদ‘আত : তা হল, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে প্রমাণিত প্রসিদ্ধ বিষয়ের বিপরীত কোন বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা, যদিও সে তার বিশ্বাস অনুযায়ী আমল না করে।[16]

যেমন- খারেজী, শী‘আ, মু‘তাযেলা, মুরজিয়া, জাহমিয়া ক্বাদারিয়া সহ বিভিন্ন পথভ্রষ্ট দলগুলির আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ) সম্পর্কে ভ্রান্ত আক্বীদা বা বিশ্বাস।

(খ) البدعة العملية  তথা কর্মগত বিদ‘আত : তা হল, এমন কোন কাজকে ইবাদত হিসাবে পালন করা, যা ইসলামী শরী‘আত সমর্থিত নয়।[17] অর্থাৎ সুন্নাত পরিপন্থী আমল করা।

মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন (রহঃ) কর্মের মাধ্যমে বিদ‘আতের প্রকারভেদ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, সুন্নাত অনুযায়ী আমল করতে গেলে ছয়টি বিষয়ে সুন্নাতের অনুসরণ করতে হবে।[18] তা হল,

(১) السبب তথা কারণ বা উদ্দেশ্য : অর্থাৎ কেউ যদি এমন কোন কারণে বা উদ্দেশ্যে ইবাদত করে যা কুরআন ও ছহীহ হাদীছ পরিপন্থী, তাহলে তা সুন্নাত বিরোধী আমল হিসাবে গণ্য হবে, যা আল্লাহ তা‘আলা কবুল করবেন না। যেমন- তাহাজ্জুদের ছালাত একটি উত্তম ইবাদত। কিন্তু শবেবরাত অথবা শবে মে‘রাজের উদ্দেশ্যে রাতে তাহাজ্জুদের ছালাত আদায় করা বিদ‘আত। কেননা উল্লিখিত কারণ বা উদ্দেশ্যে ছালাত আদায়ের বিধান কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়।

(২) الجنس তথা শ্রেণী বা প্রকার : অর্থাৎ কেউ যদি এমন শ্রেণী বা প্রকারের ইবাদত করে যা কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়, তা সুন্নাত পরিপন্থী ইবাদত হিসাবে গণ্য হবে এবং আল্লাহ তা‘আলার নিকট কবুল হবে না। যেমন- উট, গরু, ছাগল অথবা ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা কুরবানী করা কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু উল্লিখিত পশুর পরিবর্তে কেউ যদি ঘোড়া দ্বারা কুরবানী করে তাহলে তা সুন্নাত পরিপন্থী ইবাদত হিসাবে গণ্য হবে, যা আল্লাহ তা‘আলা কবুল করবেন না।

(৩) القدر তথা পরিমাণ : অর্থাৎ যতটুকু ইবাদত কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত কেবল ততটুকুই পালন করতে হবে। এর অতিরিক্ত করলে তা সুন্নাত পরিপন্থী আমল হিসাবে গণ্য হবে, যা আল্লাহ তা‘আলার নিকট কবুল হবে না। যেমন- যোহরের চার রাক‘আত ফরয ছালাতের স্থানে পাঁচ রাক‘আত আদায় করলে সুন্নাত পরিপন্থী হবে। অনুরূপভাবে তারাবীহ-এর ছালাত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কখনো ১১ রাক‘আতের বেশী আদায় করেননি। কিন্তু যদি কেউ এই সুন্নাতকে উপেক্ষা করে ২০ রাক‘আত আদায় করে তাহ’লে তা সুন্নাত পরিপন্থী ইবাদতে পরিণত হবে, যা আল্লাহ তা‘আলার নিকট কবুল হবে না।

(৪) الكيفية তথা পদ্ধতি : অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যে ইবাদত যে পদ্ধতিতে আদায় করেছেন সে ইবাদত ঠিক সে পদ্ধতিতে আদায় করলেই কেবল সুন্নাতের অনুসরণ করা হবে। কিন্তু যদি কেউ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর পদ্ধতিকে বাদ দিয়ে নিজের মস্তিস্কপ্রসূত পদ্ধতিতে ইবাদত করে তাহলে তা সুন্নাত পরিপন্থী আমলে পরিণত হবে, যা আল্লাহ তা‘আলার নিকট কবুল হবে না। যেমন- দো‘আ বা মুনাজাত একটি উত্তম ইবাদত। কিন্তু তা হতে হবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর পদ্ধতি অনুযায়ী। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন যে পদ্ধতিতে মুনাজাত করেছেন, তখন ঠিক সেই পদ্ধতিতে মুনাজাত করতে হবে। কিন্তু ফরয ছালাতের পরে, ঈদের ছালাতের পরে, মৃত মানুষকে দাফন করার পরে, বিবাহ বৈঠকে বর্তমানে প্রচলিত দলবদ্ধ মুনাজাত রাসূল (ছাঃ)-এর পদ্ধতির বিপরীত হওয়ায় তা স্পষ্ট বিদ‘আত।

(৫) الزمان তথা সময় : অর্থাৎ যে সময় যে ইবাদত কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত, ঠিক সে ইবাদত সে সময় পালন করতে হবে। সময়ের ব্যতিক্রম করলে সুন্নাত পরিপন্থী আমলে পরিণত হবে, যা আল্লাহর নিকট গৃহীত হবে না। যেমন- কেউ যদি ফযীলতের মাস হিসাবে রামাযান মাসে পশু যবেহের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাছিল করতে চায়, তাহ’লে তা বিদ‘আত হবে। কেননা পশু যবেহের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাছিল শুধুমাত্র কুরবানী ও আক্বীকাহ দ্বারাই হবে, যা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।

(৬) المكان তথা স্থান : অর্থাৎ যে স্থানে যে ইবাদত কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত, ঠিক সে ইবাদত সে স্থানেই পালন করতে হবে। স্থান পরিবর্তন করলে সুন্নাত পরিপন্থী আমলে পরিণত হবে, যা আল্লাহর নিকট কবুল হবে না। যেমন- রামাযানের শেষ দশকে মসজিদে ই‘তিকাফ করা কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু কেউ যদি মসজিদের পরিবর্তে বাড়িতে ই‘তিকাফ করে তাহলে তা সুন্নাত পরিপন্থী আমলে পরিণত হবে, যা আল্লাহ তা‘আলার নিকট কবুল হবে না।

চতুর্থ দৃষ্টিভঙ্গি : হুকুমের দিক থেকে বিদ‘আত দু’প্রকার।

(ক) البدعة المكفرة তথা কুফরী বিদ‘আত : তা হল, কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত ইসলামী শরী‘আতের অকাট্য কোন বিষয়কে অস্বীকার করা। যেমন- কোন ফরযকে অস্বীকার করা, কোন হালাল বস্ত্তকে হারাম ও হারাম বস্ত্তকে হালাল মনে করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর আদেশ-নিষেধের ব্যতিক্রম বিশ্বাস করা ইত্যাদি।

(খ) البدعة غير المكفرة তথা কুফরী নয় এমন বিদ‘আত : ইহা কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত ইসলামী শরী‘আতের কোন বিষয়কে অস্বীকার করা নয়। যেমন- মারওয়ানিয়্যাহদের বিদ‘আত যারা ছাহাবীগণের ফযীলত অস্বীকার করে। তারা কোন ছাহাবীকে মর্যাদাবান বলে স্বীকার করে না এবং কোন ছাহাবীকে কাফেরও বলে না।

[চলবে]



* লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদী আরব।

[1]. ইবনু তাইমিয়াহ মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১০/৩৫৪ পৃঃ।

[2]. আবুদাউদ হা/৪৬০৭; তিরমিযী হা/২৬৭৬; ইবনু মাজাহ হা/৪২; মিশকাত হা/১৬৫, ‘সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা’ অনুচ্ছেদ, বঙ্গানুবাদ (এমদাদিয়া) ১/১২২ পৃঃ; আলবানী, সনদ ছহীহ।

[3]. ইবনু মাজাহ হা/২২৪; মিশকাত হা/২১৮; আলবানী, সনদ ছহীহ, ছহীহুল জামে‘ হা/৩৯১৩।

[4]. আবু ইসহাক আশ- শাতিবী, আল-ই‘তিছাম ২/২০৪ পৃঃ।

[5]. শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১১/২৭ পৃঃ।

[6]. আল-মা‘ছূমী, হাদিয়্যাতুস সুলতান ৭৬ পৃঃ।

[7]. আল-মা‘ছূমী, হাদিয়্যাতুস সুলতান ৫৬ পৃঃ।

[8]. আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্ল­াহ বিন বায, মাজমূ ফাতাওয়া, ৩/৭২ পৃঃ। 

[9]. মুসনাদে আহমাদ হা/৩২৪৮; ইবনু মাজাহ হা/৩০২৯; আলবানী, সনদ ছহীহ; সিলসিলা ছহীহাহ হা/১২৮৩। 

[10]. তিরমিযী হা/২৬৪১; মিশকাত হা/১৭১; আলবানী, সনদ হাসান; ছহীহুল জামে‘ হা/৫৩৪৩। 

[11]. আবুদাউদ হা/৪০৩১; মিশকাত হা/৪৩৪৭; আলবানী, সনদ ছহীহ; ছহীহুল জামে‘ হা/৬১৪৯। 

[12]. নাসাঈ হা/১৫৭৮; আলবানী, সনদ ছহীহ; ছহীহুল জামে‘ হা/১৩৫৩। 

[13]. আবূদাউদ হা/৩৬৪১; ইবনু মাজাহ হা/২২৩; মিশকাত হা/২১২; আলবানী, সনদ ছহীহ; ছহীহুল জামে‘ হা/৬২৯৭।

[14]. আবূদাউদ হা/৩৬৫৮;  তিরমিযী হা/২৬৪৯; ইবনু মাজাহ হা/২৬৪; মিশকাত হা/২২৩; আলবানী, সনদ ছহীহ; ছহীহুল জামে‘ হা/৬২৮৪।

[15]. ইমাম শাতিবী (রহঃ), আল-ই‘তিছাম ১/২৮৬ পৃঃ।

[16]. আলী মাহফূয, আল-ইবদা‘ ফী মাযাররিল ইবতিদা‘, পৃঃ ৪৬।

[17]. তদেব।

[18]. মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছাইমীন, আল-ইবদা‘ ফী কামালিশ শারঈ ওয়া খাতারিল ইবতিদা‘, পৃঃ ২১-২৪।

 

 

 


 

 

 

 

HTML Comment Box is loading comments...