প্রবন্ধ

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার গুরুত্ব ও ফযীলত

ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম

(২য় কিস্তি)

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার ফযীলত :

আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখার ফযীলত বহুবিধ। তন্মধ্যে কতিপয় দিক এখানে উল্লেখ করা হ’ল।-

১. আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমানের পরিচায়ক :

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ঈমানের পরিচায়ক। রাসূল (ছাঃ) বলেন, وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে’।[1]

২. আল্লাহর আনুগত্যের প্রকাশ :

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা আল্লাহর আনুগত্য করার বহিঃপ্রকাশ। মহান আল্লাহ বলেন, وَالَّذِيْنَ يَصِلُوْنَ مَا أَمَرَ اللهُ بِهِ أَنْ يُوْصَلَ وَيَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ وَيَخَافُوْنَ سُوْءَ الْحِسَابِ- ‘আর আল্লাহ যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে আদেশ করেছেন যারা তা অক্ষুণ্ণ রাখে, ভয় করে তাদের প্রতিপালককে এবং ভয় করে কঠোর হিসাবকে’ (রা‘দ ১৩/২১)

৩. আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম :

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার মাধ্যমে মহান আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এ সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেন, إِنَّ الرَّحِمَ شُجْنَةٌ مِنَ الرَّحْمَنِ تَقُوْلُ يَا رَبِّ إِنِّىْ قُطِعْتُ يَا رَبِّ إِنِّىْ ظُلِمْتُ يَا رَبِّ إِنِّىْ أُسِىءَ إِلَىَّ يَا رَبِّ يَا رَبِّ. فَيُجِيْبُهَا رَبُّهَا عَزَّ وَجَلَّ فَيَقُوْلُ أَمَا تَرْضَيْنَ أَنْ أَصِلَ مَنْ وَصَلَكِ وَأَقْطَعَ مَنْ قَطَعَكِ. ‘রেহেম’ (রক্তের বাঁধন) ‘রহমানের’ অংশ বিশেষ। সে বলবে, ‘হে প্রভু! আমি মাযলূম, আমি ছিন্নকৃত। হে প্রভু! আমার সাথে দুর্ব্যবহার করা হয়। হে প্রভু! হে প্রভু! তখন তার প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলা জবাব দিবেন, তুমি কি সন্তুষ্ট নও যে, যে ব্যক্তি তোমাকে ছিন্ন করবে, আমি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব এবং যে তোমাকে যুক্ত করবে, আমি তার সাথে সম্পর্ক জুড়ে রাখব’? [2]

৪. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর অছিয়ত প্রতিপালন করা :

নবী করীম (ছাঃ) ছাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমে স্বীয় উম্মতকে বিভিন্ন বিষয়ে অছিয়ত করেছেন। তন্মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা অন্যতম। সুতরাং আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুণ্ণ রাখা হ’লে তাঁর উপদেশ প্রতিপালন করা হবে। এ মর্মে হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِيْ ذَرٍّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ أَوْصَانِيْ خَلِيْلِيْ صلى الله عليه وسلم بِخِصَالٍ مِنَ الْخَيْرِ أَوْصَانِيْ أَنْ لاَّ أَنْظُرَ إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقِيْ وَأَنْ أَنْظُرَ إِلَى مَنْ هُوَ دُوْنِيْ وَأَوْصَانِيْ بِحُبِّ الْمَسَاكِيْنِ وَالدُّنُوِّ مِنْهُمْ وَأَوْصَانِيْ أَنْ أَصِلَ رَحِمِيْ وَإِنْ أَدْبَرَتْ... -

আবু যর গিফারী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমার বন্ধু নবী করীম (ছাঃ) আমাকে কতিপয় উত্তম গুণের ব্যাপারে উপদেশ দেন। তিনি আমাকে উপদেশ দেন যে, আমি যেন আমার চেয়ে উঁচু স্তরের লোকের দিকে লক্ষ্য না করি; বরং আমার চেয়ে নিম্নস্তরের লোকের দিকে তাকাই। তিনি আরো উপদেশ দেন, দরিদ্রদের ভালবাসতে ও তাদের নিকটবর্তী হ’তে। তিনি উপদেশ দেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে, যদিও তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে...’।[3]

৫. আল্লাহর নিকট অন্যতম প্রিয় আমল :

মানুষের কৃত অনেক আমল আল্লাহর নিকটে প্রিয় ও পসন্দনীয়। তন্মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা অন্যতম। এ মর্মে হাদীছে এসেছে,

وَعَنْ رَجُلٍ مِنْ خَثْعَمَ قَالَ أَتَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ فِيْ نَفَرٍ مِّنْ أَصْحَابِهِ فَقُلْتُ أَنْتَ الَّذِيْ تَزْعُمُ أَنَّكَ رَسُوْلُ اللهِ قَالَ نَعَمْ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُوْلَ الله أَيُّ الْأَعْمَالِ أَحَبُّ إِلَى اللهِ قَالَ الإيْمَانُ بِاللهِ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ ثُمَّ مَهْ قَالَ ثُمَّ صِلَةُ الرَّحِمُ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ ثُمَّ مَهْ قَالَ ثُمَّ الأَمْرُ بِالْمَعْرُوْفِ وَالنَّهِيْ عَنِ الْمُنْكَرِ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ أَيُّ الأَعْمَالِ أَبْغَضُ إِلَى اللهَ قَالَ الإشْرَاكُ بِاللهِ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ ثُمَّ مَهْ قَالَ ثُمَّ قَطَيْعَةُ الرَّحِمِ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ ثُمَّ مَهْ قَالَ ثُمَّ الأَمْرُ الْمَنُكَرِ وَالنَّهِيُ عَنِ الْمَعْرُوْفِ -

‘খাছ‘আম গোত্রের জনৈক লোক হ’তে বর্ণিত সে বলল, আমি নবী করীম (ছাঃ)-এর দরবারে আসলাম। তিনি তখন ছাহাবীদের একটি ক্ষুদ্র দলের সাথে ছিলেন। আমি বললাম, আপনিতো সেই ব্যক্তি যিনি ধারণা করেন যে, আপনি আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, হ্যাঁ। রাবী বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! কোন আমল আল্লাহর নিকটে পসনদনীয়? তিনি বললেন, আল্লাহর উপরে ঈমান আনা। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! এরপর কি? তিনি বললেন, আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুণ্ণ রাখা। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! এরপর কি? তিনি বললেন, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করা। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! কোন আমল আল্লাহর নিকটে অপসন্দনীয়? তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করা। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! এরপর কি? তিনি বললেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! এরপর কি? তিনি বললেন, গর্হিত কাজের নির্দেশ দেওয়া এবং সৎকাজে নিষেধ করা’।[4]

৬. বয়স ও রিযিক বৃদ্ধির উপায় :

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করলে মানুষের বয়স ও জীবিকা বৃদ্ধি পায়। এ সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেন, مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِىْ رِزْقِهِ، وَأَنْ يُنْسَأَ لَهُ فِىْ أَثَرِهِ، فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ ‘যে চায় যে, তার জীবিকা প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বৃদ্ধি পাক, সে যেন আত্মীয়-স্বজনের সাথে ঘনিষ্ঠ আচরণ করে’।[5] অন্যত্র তিনি বলেন, مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِىْ رِزْقِهِ، وَيُنْسَأَ لَهُ فِىْ أَثَرِهِ، فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ   ‘যে তার জীবিকার প্রশস্ততা এবং আয়ু বৃদ্ধি পসন্দ করে, সে যেন আত্মীয়-স্বজনের সাথে উত্তম আচরণ করে’।[6] এখানে বয়স বৃদ্ধির অর্থ হচ্ছে হায়াতে বরকত লাভ করা। সেই সাথে সুস্বাস্থ্য ও সুস্থ দেহ, শক্তিমত্তা এবং অধিক কাজ করার ক্ষমতা লাভ করা।[7] কেউ কেউ বলেন, বয়স ও রিযিক বৃদ্ধির তাৎপর্য হচ্ছে যে, আল্লাহ প্রকৃতই বান্দার বয়স ও জীবিকা বাড়িয়ে দেন। এখানে এ প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ নেই যে, বয়স ও রিযিক নির্ধারিত; সুতরাং তা কিভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে? কেননা হায়াত ও রিযক দু’ধরনের। যথা- ১. সাধারণ, যা কেবল আল্লাহ জানেন। এটা অপরিবর্তিত। ২. লিপিবদ্ধ, যা তিনি ফেরেশতাদের মাধ্যমে লিখিয়েছেন ও তাদের অবহিত করেছেন; বিভিন্ন কারণ ও ঘটনার প্রেক্ষিতে এটা হরাস-বৃদ্ধি হয়।[8]

৭. আত্মীয়দের মাঝে পারস্পরিক মুহাববত বৃদ্ধির মাধ্যম :

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করলে আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে ভালবাসার বন্ধন সুদৃঢ় হয়। হাদীছে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, مَنِ اتَّقَى رَبَّهُ وَوَصَلَ رَحِمَهُ نُسِىءَ فِيْ أَجَلِهِ وَثُرِىَ مَالُهُ وَأَحَبَّهُ أَهْلُهُ-  ‘যে ব্যক্তি তার প্রতিপালককে ভয় করে এবং তার আত্মীয়-স্বজনকে জুড়ে রাখে, তার মৃত্যু পিছিয়ে দেওয়া হয়, তার সম্পদ বৃদ্ধি করা হয় এবং তার পরিবার-পরিজন তাকে ভালবাসে’।[9] অন্য শব্দে এসেছে এভাবে, مَنِ اتَّقَى رَبَّهُ، وَوَصَلَ رَحِمَهُ، أُنْسِيءَ لَهُ فِيْ عُمُرِهِ وَثُرِىَ مَالُهُ، وَأَحِبَّهُ أَهْلُهُ. ‘যে ব্যক্তি তার প্রতিপালককে ভয় করে, আত্মীয়তার বন্ধন জুড়ে রাখে, তার আয়ু বর্ধিত করা হয়, তার ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করা হয় এবং তার পরিবার-পরিজন তাকে ভালবাসে।[10] তিনি আরো বলেন, تَعَلَّمُوْا مِنْ أَنْسَابِكُمْ مَا تَصِلُوْنَ بِهِ أَرْحَامَكُمْ فَإِنَّ صِلَةَ الرَّحِمِ مَحَبَّةٌ فِى الأَهْلِ مَثْرَاةٌ فِى الْمَالِ مَنْسَأَةٌ فِى الأَثَرِ. ‘তোমরা তোমাদের বংশপরিচয় শিখে নাও, যা দ্বারা তোমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবে। কেননা আত্মীয়তার সম্পর্ক পরিবার-পরিজনের মধ্যে হৃদ্যতা বৃদ্ধি করে, সম্পদ বাড়ায় এবং বয়স বৃদ্ধি করে’।[11]

৮. পৃথিবীর অধিবাসীদের উন্নয়ন :

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা পৃথিবীবাসীদের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে এবং তাদের বয়স বৃদ্ধি করে। এ মর্মে হাদীছে এসেছে, আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) তাকে বলেছেন, إِنَّهُ مَنْ أُعْطِىَ حَظَّهُ مِنَ الرِّفْقِ فَقَدْ أُعْطِىَ حَظَّهُ مِنْ خَيْرِ الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَصِلَةُ الرَّحِمِ وَحُسْنُ الْخُلُقِ وَحُسْنُ الْجِوَارِ يَعْمُرَانِ الدِّيَارَ وَيَزِيْدَانِ فِى الأَعْمَارِ. ‘যাকে নম্রতা দান করা হয়েছে, তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের বহু কল্যাণ দেওয়া হয়েছে। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, উত্তম চরিত্র ও সৎ প্রতিবেশী দুনিয়ার অধিবাসীদের উন্নয়ন ঘটায় এবং বয়স বৃদ্ধি করে’।[12]

৯. দ্রুত ছওয়াব লাভের উপায় :

আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখলে অবিলম্বে ছওয়াব বা প্রতিদান লাভ করা যায়। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, لَيْسَ شَيْءٌ أُطِيعُ اللهَ فِيهِ أَعْجَلَ ثَوَابًا مِنْ صِلَةِ الرَّحِمِ، وَلَيْسَ شَيْءٌ أَعْجَلَ عِقَابًا مِنَ الْبَغْيِ وَقَطِيعَةِ الرَّحِمِ- ‘আল্লাহর আনুগত্যে সম্পন্ন এমন কোন কাজ নেই, যার মাধ্যমে দ্রুত ছওয়াব লাভ করা যায় আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ব্যতীত। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা ও বিদ্রোহ করা ব্যতীত কোন কাজে দ্রুত শাস্তি আপতিত হয় না’।[13]

১০. আত্মীয়তার সম্পর্ক ক্বিয়ামতের দিন সাক্ষী দিবে :

যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করবে ক্বিয়ামতের দিন অপরাপর আত্মীয়-স্বজন তার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, وَكُلُّ رَحِمٍ آتِيَةٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَمَامَ صَاحِبِهَا تَشْهَدُ لَهُ بِصِلَةٍ إِنْ كَانَ وَصَلَهَا وَعَلَيْهِ بِقَطِيْعَةٍ إِنْ كَانَ قَطَعَهَا-  ‘রক্তের বন্ধন ক্বিয়ামতের দিন তার সংশ্লিষ্টজনের সম্মুখে এসে দাঁড়াবে এবং যদি সে তাকে দুনিয়ায় যুক্ত রেখে থাকে, তবে সে তার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে, যদি সে তাকে দুনিয়ায় ছিন্ন করে থাকে, তবে সে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে’।[14]

১১. জান্নাতে প্রবেশের উত্তম মাধ্যম :

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করলে জান্নাতে প্রবেশ করা সহজ হয়। এ সম্পর্কে হাদীছে এসেছে, বারা ইবনু আযীব (রাঃ) বলেন, একদা জনৈক বেদুঈন নবী করীম (ছাঃ)-এর খেদমতে এসে আরয করল, হে আল্লাহর নবী (ছাঃ)!

عَلِّمْنِىْ عَمَلاً يُدْخِلُنِىْ الْجَنَّةَ فَقَالَ لَئِنْ كُنْتَ أَقْصَرْتَ الْخُطْبَةَ لَقَدْ أَعْرَضْتَ الْمَسْأَلَةَ أَعْتِقِ النَّسَمَةَ وَفُكَّ الرَّقَبَةَ فَقَالَ يَا رَسُوْلَ اللهِ أَوَلَيْسَتَا بِوَاحِدَةٍ قَالَ لاَ إِنَّ عِتْقَ النَّسَمَةِ أَنْ تَفَرَّدَ بِعِتْقِهَا وَفَكَّ الرَّقَبَةِ أَنْ تُعِيْنَ فِىْ عِتْقِهَا وَالْمِنْحَةُ الْوَكُوْفُ وَالْفَْىءُ عَلَى ذِى الرَّحِمِ الظَّالِمِ فَإِنْ لَمْ تُطِقْ ذَلِكَ فَأَطْعِمِ الْجَائِعَ وَاسْقِ الظَّمْآنَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوْفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ فَإِنْ لَمْ تُطِقْ ذَلِكَ فَكُفَّ لِسَانَكَ إِلاَّ مِنَ الْخَيْرِ.

অর্থাৎ আমাকে এমন একটি আমল শিক্ষা দিন যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, ‘তোমার কথা যদি এই পর্যন্তই হয়ে থাকে, তবে একটা প্রশ্নের মতো প্রশ্নই তুমি করেছ। গোলাম আযাদ কর এবং গর্দান মুক্ত কর’। সে ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! দু’টা একই বস্ত্ত নয় কি? নবী করীম (ছাঃ) বললেন, না, গোলাম আযাদ করা তো কোন গোলামকে আযাদ করাই এবং গর্দান মুক্ত করা মানে আত্মীয়-স্বজনের মুক্তির জন্য সাহায্য করা এবং প্রিয় বস্ত্ত (অর্থ-সম্পদ) দান করা। যদি তা না পার, তবে ক্ষুধার্তকে খাদ্য খাওয়াবে, পিপাসার্তকে পানি পান করাবে, সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে। যদি তাতেও সমর্থ না হও, তবে কল্যাণকর কথা ব্যতীত তোমার মুখ বন্ধ রাখবে’।[15]

অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَفْشُوا السَّلاَمَ وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ وَصِلُوا الأَرْحَامَ وَصَلُّوْا بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ بِسَلاَمٍ- ‘হে লোক সকল! পরস্পর সালাম বিনিময় কর, অন্যকে খাদ্য খাওয়াও, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখ, রাতে ছালাত আদায় কর মানুষ যখন ঘুমন্ত থাকে, নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ কর’।[16]

আত্মীয়তার সম্পর্ক বৃদ্ধির কতিপয় উপায় :

আত্মীয়তার সম্পর্ককে সুদৃঢ় ও মযবূত করা এবং তা অক্ষুণ্ণ ও অবিচল রাখার জন্য কিছু কাজ সম্পন্ন করা যরূরী। নিম্নে সেসব উল্লেখ করা হ’ল।-

১. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত হওয়া :

কোন জিনিসের ফলাফল ও শুভ পরিণতি অবগত হ’লে সে কাজ সম্পাদনে মানুষ উৎসাহী ও আগ্রহী হয় এবং তা সম্পাদনে সচেষ্ট ও যথাসাধ্য তৎপর হয়। তাই আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার গুরুত্ব ও ফযীলত অবগত হওয়া আবশ্যক।

২. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার পরিণতি জানা :

আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার পাপ ও পরিণতি অবগত হ’লে মানুষ এসব থেকে সাবধান হবে। তাছাড়া এ কারণে যে পার্থিব অনিষ্ট রয়েছে তা জানলে এ বন্ধন সংরক্ষণে সচেষ্ট হবে।

৩. আল্লাহর নিকটে সাহায্য প্রার্থনা :

আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা নেকীর কাজ। তাই এ কাজ করার জন্য আল্লাহর কাছে তাওফীক কামনা করতে হবে। পক্ষান্তরে এ সম্পর্ক ছিন্ন করা পাপ। তাই এ পাপ থেকে বেঁচে থাকার জন্যও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হবে।

৪. আত্মীয়-স্বজনের দুর্ব্যবহার সুন্দরভাবে মোকাবিলা করা :

জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর মাঝে মুহাববত বজায় রাখা, তাদের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করা এবং অসদাচরণেও ধৈর্য ধারণ করা ও তা সুন্দরভাবে মোকাবিলা করা। যেমন হাদীছে এসেছে, একদা এক ব্যক্তি নবী করীম (ছাঃ)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ (ছাঃ)! আমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন রয়েছে, আমি তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করি, কিন্তু তারা আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। আমি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করি কিন্তু তারা আমার সাথে অসদাচরণ করে। তারা আমার সাথে গোয়ার্তুমি করে। আমি সহ্য করি। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘যদি তোমার বক্তব্য ঠিক হয়, তবে তো তুমি যেন তাদের মুখে উত্তপ্ত ছাই পুরে দিচ্ছ। তোমার কারণে তাদের দুর্ভোগ আছে। যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি এরূপ করতে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ হ’তে একজন সাহায্যকারী তাদের মুকাবিলায় তোমার সাথে থাকবেন’।[17]

৫. ভুলের পর তাদের পেশকৃত কৈফিয়ত গ্রহণ করা :

আত্মীয়-স্বজন ভুল করার পর কৈফিয়ত পেশ করলে তাদের সে কৈফিয়ত গ্রহণ করা এবং তাদের ক্ষমা করে দেওয়া। যেমন ইউসুফ (আঃ) স্বীয় ভাইদের পেশকৃত কৈফিয়ত গ্রহণ করেন এবং তাদের ক্ষমা করে দেন (ইউসুফ ১২/৯১-৯২)

৬. তাদের অপরাধ ক্ষমা করে দেওয়া :

মানুষ মাত্রই ভুল করে, অপরাধ করে। সুতরাং আত্মীয়-স্বজনের কৃত অপরাধ ক্ষমা করে দেওয়া উদার চিত্ত ও ভদ্র-শালীন মানুষের পরিচয়। তাদের এ অপরাধ ভুলে যাওয়া এবং পরবর্তীতে কখনো এসব তাদের সামনে উচ্চারণ না করা। এতে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটবে।

৭. তাদের সাথে বিনয়ী ও নম্র আচরণ করা :

আত্মীয়দের সাথে নম্র-ভদ্র আচরণ করলে সর্ম্পক মযবূত হয়। সম্পর্কের সেতুবন্ধন অক্ষুণ্ণ থাকে। আত্মীয়-স্বজন আরো নিকটতর হয়। তাই আত্মীয়দের ভুল-ত্রুটি আমলে না নিয়ে তা উপেক্ষা করার চেষ্টা করতে হবে।

৮. তাদের ভুল-ত্রুটি উপেক্ষা করা :

মানুষের ভুল-ত্রুটি উপেক্ষা করা মহত্ত্বের পরিচয়। বিশাল হৃদয়ের মানুষের পক্ষেই এটা সম্ভব। এর মাধ্যমে হৃদ্যতা বৃদ্ধি পায়, বৈরিতা দূরীভূত হয়।

৯. তাদের জন্য সাধ্যমত ব্যয় করা :

আত্মীয়দের জন্য সাধ্যমত ব্যয় করা। কেননা তাদের জন্য দান করলে অধিক ছওয়াব পাওয়া যায় এবং আত্মীয়তার  সম্পর্ক রক্ষা হয়। যেমন আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মদীনার আনছারগণের মধ্যে আবূ তালহা (রাঃ) সর্বাধিক খেজুর বাগানের মালিক ছিলেন। মসজিদে নববীর নিকটবর্তী বায়রুহা নামক বাগানটি তার কাছে অধিক প্রিয় ছিল। আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তার বাগানে প্রবেশ করে এর সুপেয় পানি পান করতেন। আনাস (রাঃ) বলেন, যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হ’ল, ‘তোমরা যা ভালবাস তা হ’তে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করবে না’ (আলে ইমরান ৯২)। তখন আবু তালহা (রাঃ) আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা যা ভালবাস তা হ’তে ব্যয় না করা পর্যন্ত কখনো পুণ্য লাভ করবে না’ (আলে ইমরান ৯২)। আর বায়রুহা বাগানটি আমার কাছে অধিক প্রিয়। এটি আল্লাহর নামে ছাদাক্বাহ করা হ’ল, আমি এর কল্যাণ কামনা করি এবং তা আল্লাহর নিকট আমার জন্য সঞ্চয়রূপে থাকবে। কাজেই আপনি যাকে দান করা ভাল মনে করেন তাকে দান করুন। তখন আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘তোমাকে ধন্যবাদ, এ হচ্ছে লাভজনক সম্পদ, এ হচ্ছে লাভজনক সম্পদ। তুমি যা বলেছ, তা শুনলাম। আমি মনে করি, তোমার আপনজনদের মধ্যে তা বণ্টন করে দাও’। আবু তালহা (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমি তাই করব। অতঃপর তিনি তার আত্মীয়-স্বজন, আপন চাচার বংশধরের মধ্যে তা বণ্টন করে দিলেন’।[18]

অন্য হাদীছে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবন মাসঊদ (রাঃ)-এর স্ত্রী যায়নাব (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মহিলাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘হে নারী সমাজ! তোমরা (দান) ছাদাক্বাহ কর যদিও তা তোমাদের গহনাপত্রের মাধ্যমে হয়’। যায়নাব (রাঃ) বলেন, একথা শুনে আমি গিয়ে আমার স্বামী আব্দুল্লাহকে বললাম, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে ছাদাক্বাহ করতে বলেছেন। আর তুমি তো গরীব অভাবী মানুষ, তাই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস কর, তোমাকে দান করলে তা দান হিসাবে গণ্য হবে কি-না? তা না হ’লে অপর কাউকে দান করব। রাবী বলেন, আমার স্বামী আব্দুল্লাহ আমাকে বললেন, বরং তুমিই যাও। অতঃপর আমিই গেলাম এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দরজায় আনছার সম্প্রদায়ের অপর এক মহিলাকে একই উদ্দেশ্যে দাঁড়ানো দেখলাম। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হ’লেন অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ও প্রভাবশালী লোক। অতঃপর বিলাল (রাঃ) বের হয়ে আসলে আমরা তাকে বললাম, আপনি গিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলুন, দু’জন মহিলা দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তারা আপনার কাছে জানতে চাচ্ছে- যদি তারা তাদের নিজ স্বামীকে দান করে এবং তাদের ঘরেই প্রতিপালিত ইয়াতীমকে দান করে তাহ’লে কি তা আদায় হবে? আর অনুরোধ হ’ল আমাদের পরিচয় তাঁকে জানাবেন না। রাবী বলেন, অতঃপর বিলাল (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, মহিলাদ্বয় কে কে? তিনি বললেন, একজন আনছার গোত্রের এবং অপরজন যায়নাব? তিনি বললেন, আব্দুল্লাহর স্ত্রী যায়নাব। অতঃপর তাঁকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, لَهُمَا أَجْرَانِ أَجْرُ الْقَرَابَةِ وَأَجْرُ الصَّدَقَةِ. ‘তারা উভয়েই তাদের দানের জন্য দ্বিগুণ ছওয়াব পাবে। এক. নিকটাত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহারের জন্য। দুই. ছাদাক্বাহ করার জন্য’।[19]

অন্য বর্ণনায় এসেছে, ইবনু আববাসের গোলাম কুরাইব হ’তে বর্ণিত, أَنَّ مَيْمُوْنَةَ بِنْتَ الْحَارِثِ رضى الله عنها أَخْبَرَتْهُ أَنَّهَا أَعْتَقَتْ وَلِيْدَةً وَلَمْ تَسْتَأْذِنِ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم، فَلَمَّا كَانَ يَوْمُهَا الَّذِىْ يَدُوْرُ عَلَيْهَا فِيْهِ قَالَتْ أَشَعَرْتَ يَا رَسُوْلَ اللهِ أَنِّى أَعْتَقْتُ وَلِيْدَتِىْ قَالَ أَوَفَعَلْتِ. قَالَتْ نَعَمْ. قَالَ أَمَا إِنَّكِ لَوْ أَعْطَيْتِيْهَا أَخْوَالَكِ كَانَ أَعْظَمَ لأَجْرِكِ. অর্থাৎ মায়মূনাহ বিনতে হারিছ (রাঃ) তাকে সংবাদ দেন যে, নবী করীম (ছাঃ)-এর অনুমতি ব্যতীত তিনি তার বাঁদিকে মুক্ত করে দিলেন। অতঃপর তার ঘরে নবী করীম (ছাঃ)-এর অবস্থানের দিন তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আপনি কি জানেন না যে, আমি আমার বাঁদি মুক্ত করে দিয়েছি? তিনি বললেন, ‘তুমি কি তা করেছ’? মায়মূনাহ (রাঃ) বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, ‘শোন! তুমি যদি তোমার মামাদেরকে এটা দান করতে তাহ’লে তোমার জন্য বেশী নেকীর কাজ হ’ত’।[20] অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, الصَّدَقَةُ عَلَى الْمِسْكِيْنِ صَدَقَةٌ وَهِىَ عَلَى ذِى الْقَرَابَةِ اثْنَتَانِ صَدَقَةٌ وَصِلَةٌ. ‘দরিদ্রকে দান করলে কেবল ছাদাক্বার ছওয়াব মেলে। আর আত্মীয়কে দান করলে ছাদাক্বার ছওয়াব ও আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষার ছওয়াব উভয়ই পাওয়া যায়’।[21]

১০. খোঁটাদান পরিহার ও তাদের নিকট দাবী-দাওয়া থেকে বিরত থাকা :

দান করে খোঁটা দেওয়া পাপ এবং এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। রাসূল (ছাঃ) বলেন, لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنَّانٌ ‘খোঁটাদানকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না’।[22] বিধায় আত্মীয়-স্বজনকে দান করে খোঁটা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। তেমনি তাদের নিকট থেকে কোন কিছু চাওয়া বা তাদের নিকটে কোন কিছু দাবী করা থেকেও বিরত থাকতে হবে।

১১. স্বজনদের অল্প উপঢৌকনেও তুষ্ট থাকা :

উপহার-উপঢৌকন দিলে পারস্পরিক মুহাববত বৃদ্ধি পায়। মানুষের সাধ ও সাধ্যের সমন্বয় না ঘটলে, পরস্পরকে উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে যথোপযুক্ত বস্ত্ত উপহার প্রদান করতে পারে না। তাই আত্মীয়দের প্রদত্ত উপহারে সন্তুষ্ট হওয়া প্রয়োজন, যদিও তা পরিমাণে কম হয়।

১২. তাদের অবস্থা ও অবস্থানের প্রতি লক্ষ্য রাখা :

মাঝে-মধ্যে আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ-খবর রাখা, বছরে একবার হ’লেও তাদের সাথে সাক্ষাৎ করা প্রত্যেকের কর্তব্য। সেটা সম্ভব না হ’লে অন্তত টেলিফোন বা মোবাইলে খোঁজ-খবর নেওয়া এবং তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা যরূরী। তাদের সাথে হাসিমুখে কথা বলা এবং যথাসাধ্য সুসম্পর্ক বজায় রাখা। তাদের অধিকার পরিপূর্ণভাবে আদায় করা। এছাড়া তাদের মর্যাদা ও স্তর অনুযায়ী যথোপযুক্ত সম্মান করা। এতে করে আত্মীয়তার বন্ধন অটুট থাকবে এবং পরস্পরের মধ্যে হৃদ্যতা বৃদ্ধি পাবে।  

১৩. তাদের কষ্ট না দেওয়া ও তাদের সমস্যা দূর করা :

কোন আত্মীয়কে কখনও কষ্ট না দেওয়া এবং তাদের সমস্যাবলী যথাসাধ্য দূর করার চেষ্টা করা। আত্মীয়-স্বজন যখন জানবে যে, অমুক ব্যক্তি আত্মীয়দের সাথে উত্তম ব্যবহার করে, সে কাউকে কষ্ট দেয় না এবং তাদের অসুবিধা দূর করতে সচেষ্ট ও তাদের সমস্যায় সহযোগিতা করে, তখন তার সাথে সকলে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে; তার প্রতিও সকলে সহমর্মী ও সহযোগী হবে।

১৪. তাদের ভৎর্সনা ও তিরস্কার করা থেকে বিরত থাকা :

আত্মীয়-স্বজন বাড়ীতে আসলে আনন্দিত হওয়া এবং তাদের সমাদর করা। কখনও কোন কাজে ত্রুটি হ’লে তাদের ভৎর্সনা ও তিরস্কার না করা। শালীন ব্যক্তি মাত্রই মানুষের যথোপযুক্ত হক প্রদান করে থাকেন। তিনি নিজের হকের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করেন না; অপরে তার অধিকার আদায় করুক বা না করুক সেদিকেও লক্ষ্য রাখেন না; বরং অপরের হক আদায়ে তৎপর থাকেন। তেমনি কোন আত্মীয় কারো যথাযথ হক আদায় না করলেও তাকে তিরস্কার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

১৫. আত্মীয়দের সমালোচনা সহ্য করা :

বিশিষ্ট ব্যক্তিগণের অন্যতম গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাদের সাথে অতি জঘন্য, যন্ত্রণা ও পীড়াদায়ক আচরণ করা হ’লেও তাঁরা সেসব অম্লান বদনে সহ্য করেন এবং তাদের সাথে খারাপ আচরণ করেন না, বরং উত্তম ব্যবহার করেন। সুতরাং আত্মীয়দের সাথেও অনুরূপ আচরণ করতে হবে। কখনও তারা সমালোচনা করলেও তা সহ্য করতে হবে। এতে তারা আরো নিকটতর হবে।

১৬. আত্মীয়দের সাথে হাসি-ঠাট্টায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করা :

সমাজের সকল মানুষ সব জিনিস পসন্দ করে না। যেমন অনেকে হাসি-ঠাট্টা পসন্দ করেন না। আত্মীয়দের মাঝেও অনুরূপ মানুষ থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই তাদের মন মেজায বুঝে হাসি-মশকরা করতে হবে এবং এতেও মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে। যাতে এসব তুচ্ছ কারণে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন না হয়।

১৭. ঝগড়া-বিবাদের পথ পরিহার করা :

মানুষ হিসাবে পরস্পর মনোমালিন্য সৃষ্টি হ’তে পারে। আর এটা কখনো ঝগড়া-বিবাদে রূপ নেয়। কিন্তু আত্মীয়দের মাঝে যাতে এরূপ না ঘটে তার যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। কেননা এর মাধ্যমে শত্রুতা সৃষ্টি হয়, অন্তরে প্রতিশোধ পরায়ণতা জেগে ওঠে। কাজেই ঝগড়া-বিবাদের পথ সর্বোতভাবে পরিহার করতে হবে।

১৮. পরস্পর উপঢৌকন বিনিময় করা :

উপহার-উপঢৌকন মুহাববত বৃদ্ধি করে, খারাপ ধারণা দূরীভূত করে এবং আন্তরিক বিদ্বেষকে প্রতিহত করে। তাই আত্মীয়দের মাঝে পরস্পর হাদিয়া বিনিময় করা আবশ্যক। রাসূল (ছাঃ) বলেন, تَهَادُّوْا تَحَابُّوْا ‘তোমরা পরস্পরকে হাদিয়া দাও, একে অপরের মধ্যে হৃদ্যতা বৃদ্ধি কর’।[23]

১৯. আত্মীয়কে চোখের মণি ভাবা :

আত্মীয়-স্বজনকে নিজের দেহের অংশ হিসাবে জ্ঞান করে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চিন্তা মনে না আনা। বরং তাদের সম্মান-মর্যাদাকে নিজের সম্মান এবং তাদের অপমানকে নিজের লাঞ্ছনা মনে করা। আত্মীয়দের প্রতি কারো এরূপ মনোভাব থাকলে এ বন্ধন আরো সুদৃঢ় হবে।

২০. আত্মীয়দের সাথে বৈরিতা অনিষ্ট ও বিপদের কারণ :

আত্মীয়-স্বজনের সাথে শত্রুতা ও বৈরী মনোভাব না থাকা। এতে অকল্যাণ ও বিপদের পথ প্রশস্ত হয়। কেননা মানুষ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। নিজের জীবন চলার পথে অন্যের সাহায্য-সহযোগিতা তার প্রয়োজন হয়। এ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে আত্মীয়রা সর্বাগ্রে এগিয়ে আসে। আর আত্মীয়দের সাথে বৈরিতা থাকলে তারা বিপদ-মুছীবতের সময়ও দূরে থাকে। ফলে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি আরো অকল্যাণ ও বিপদের সম্মুখীন হয়। এজন্য আত্মীয়দের সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

২১. যথাসময়ে আত্মীয়দের স্মরণ করতে আগ্রহী হওয়া :

যথাসময়ে আত্মীয়দের স্মরণ করার অর্থ হচ্ছে বিবাহ-শাদী, ওয়ালীমা বা এ ধরনের অনুষ্ঠান ও সমাবেশে তাদেরকে দাওয়াত দেওয়া এবং তাদের অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ভুলবশত কেউ বাদ পড়ে গেলে তার কাছে গিয়ে কৈফিয়ত পেশ করে, সাধ্যমত তাকে রাযী-খুশি করা। এতে সম্পর্ক আরো বৃদ্ধি পাবে।

২২. আত্মীয়দের মাঝে বিবাদ মীমাংসায় উৎসাহী হওয়া :

আত্মীয়দের পরস্পরের মাঝে বিবাদ মীমাংসার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা। কেননা আত্মীয়দের মাঝের ঝগড়া-বিবাদ ও ফিৎনা-ফাসাদ মিটিয়ে না ফেললে এটা বাড়তে থাকে। যা এক সময় অন্যান্য আত্মীয়দের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এই বিবাদের অগ্নি সকলকে জ্বালিয়ে মারে। পক্ষান্তরে বিবাদ মিটিয়ে ফেললে সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়।

২৩. পরিত্যক্ত সম্পদ বণ্টনে দ্রুততা :

কোন স্বজনের রেখে যাওয়া সম্পদ উত্তরাধিকারীদের মাঝে দ্রুত বণ্টনের ব্যবস্থা করা। সেই সাথে বণ্টনে ন্যায়-ইনছাফ বজায় রাখা, যাতে প্রত্যেক প্রাপক তার যথাযথ অংশ পায়। আর পরিত্যক্ত সম্পদ নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টির পূর্বেই এ কাজ সম্পন্ন করা শ্রেয়। এতে আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে সম্পর্ক কালিমামুক্ত ও নিষ্কলুষ হয়।

২৪. যৌথ অনুষ্ঠানে ঐক্যমতের প্রতি আগ্রহী হওয়া :

কোন যৌথ অনুষ্ঠানে সকল ক্ষেত্রে সবার সাথে ঐক্যমত পোষণ করার প্রতি আগ্রহী হওয়া। নিজের মত প্রতিষ্ঠা বা নিজের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অটল থাকার মন-মানসিকতা পরিহার করা। তাদের মধ্যে হৃদ্যতা বৃদ্ধি, পরামর্শ প্রদান, সকলের প্রতি অনুগ্রহ করা এবং সততা ও আমানত রক্ষা করা। আর প্রত্যেকেই নিজের জন্য যা পসন্দ করবে অন্যের জন্যও তাই পসন্দ করবে। তদ্রূপ প্রত্যেককেই নিজের ও অপরের হক সম্পর্কে অবগত হওয়া। তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করা এবং সমস্যা সমাধানের জন্য বিস্তারিত ও খোলামেলা আলোচনা করা। তাদের সাথে ঘনিষ্ট আচরণ করা এবং অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণ থেকে সর্বোতভাবে বিরত থাকা। কখনও তাদেরকে উপেক্ষা না করা। কেউ কোন ব্যাপারে একমত না হ’লেও তার সাথে ভাল ব্যবহার করা। এভাবে চলতে পারলে তাদের মধ্যে রহমত অবধারিত হবে, হৃদ্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং তাদের মধ্যে বরকত নাযিল হবে।

২৫. আত্মীয়তার প্রমাণ সংরক্ষণ :

আত্মীয়তার প্রমাণ সংরক্ষণ দু’ভাবে করা যায়। (ক) কাগজে আত্মীয়দের নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর লিখে সংরক্ষণ করা এবং সকলকে কপি দেওয়া। বংশীয় সম্পর্ক বা আত্মীয়তার সম্পর্ক লিখে বা মুখস্থ করে সংরক্ষণের ব্যাপারে হাদীছে নির্দেশ এসেছে। যেমন জুবায়র ইবনু মুতঈম (রাঃ) বলেন, তিনি ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-কে মিম্বরের উপর ভাষণরত অবস্থায় বলতে শুনেছেন,

تَعْلَمُوْا أَنْسَابَكُمْ، ثُمَّ صِلُوْا أَرْحَامَكُمْ، وَاللهِ إِنَّهُ لَيَكُوْنُ بَيْنَ الرَّجْلِ وَبَيْنَ أَخِيْهِ الشَّيْءُ، وَلَوْ يَعْلَمُ الَّذِيْ بَيْنَهُ وَبَيْنَهُ مِنْ دَاخِلَةِ الرَّحِمِ، لَأَوْزَعَهُ ذَلِكَ عَنْ اِنْتِهَاكِهِ.

অর্থাৎ তোমাদের বংশপঞ্জিকা (নসবনামা) জেনে রাখ এবং (তদনুযায়ী) ঘনিষ্ঠজনদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা কর। আল্লাহর কসম! অনেক সময় কোন ব্যক্তি ও তার (বংশানুক্রমিক) ভাইয়ের মধ্যে (অপ্রীতিকর) কিছু একটা ঘটে যায়; যদি সে জানতে পারত যে, তার এবং এর মধ্যে রক্তের বন্ধন বিদ্যমান রয়েছে, তবে তারা তাকে তার ভাইকে অপদস্থ করা হ’তে নিবৃত্ত করত।[24] অন্য বর্ণনায় এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেছেন,

اَحْفَظُوْا أَنْسَابَكُمْ، تَصِلُوْا أَرْحَامَكُمْ؛ فَإِنَّهُ لاَ بَعُدَ بِالرِّحْمِ إِذَا قَرَّبْتَ، وَإِنْ كَانَتْ بَعِيْدَةً، وَلاَ قَرُبَ بِهَا إِذَا بَعُدَتْ، وَإِنْ كَانَتْ قَرِيْبَةً، وَكُلُّ رِحْمٍ أَتَيِهٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَمَامَ صَاحِبِهَا، تَشْهَدْ لَهُ بِصِلَةٍ؛ إِنْ كَانَ وَصَلَهَا، وَعَلَيْهِ بِقَطِيْعَةٍ إِنْ كَانَ قَطَعَهَا.

‘বংশপঞ্জিকা সংরক্ষণ কর (এবং তদনুযায়ী) ঘনিষ্ঠজনদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখ। কেননা দূরের আত্মীয়ও ঘনিষ্ঠ আচরণ দ্বারা ঘনিষ্ঠতর হয়ে যায় এবং নিকটাত্মীয়ও ঘনিষ্ঠ আচরণের অভাবে দূর হয়ে যায়। রক্তের বন্ধন কিয়ামতের দিন তার সংশ্লিষ্টজনের সম্মুখে এসে দাঁড়াবে এবং যদি সে তাকে দুনিয়ায় যুক্ত রেখে থাকে, তবে সে তার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে, যদি সে তাকে দুনিয়ায় ছিন্ন করে থাকে, তবে সে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে’।[25]

(খ) আত্মীয়দের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার সময় সন্তান-সন্ততিকে সঙ্গে নেওয়া। যাতে তাদের সাথে সম্পর্ক রক্ষায় তারা অভ্যস্ত হয় এবং তাদের সাথে পরিচিত হয়।

২৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম মনে করা :

সর্বোপরি সকল ক্ষেত্রে  কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর রাযী-খুশির উদ্দেশ্যে কাজ করতে হবে, এতে অন্য কাউকে শরীক করা চলবে না। সকল কাজ হবে নেকী ও তাক্বওয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা, জাহিলী কোন বিষয়ের সংরক্ষণ ও উন্নয়ন লক্ষ্য হবে না। তেমনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকে ছওয়াব অর্জন ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করলে এ সম্পর্কে কখনও চিড় ধরবে না।

[চলবে]



[1]. বুখারী হা/৬১৩৮।

[2]. আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৬৫, সনদ ছহীহ।

[3]. ছহীহ আত-তারগীব হা/২৫২৫, সনদ ছহীহ।

[4]. ছহীহ আত-তারগীব হা/২৫২২, সনদ ছহীহ।

[5]. বুখারী হা/২০৬৭, ৫৯৮৫; মুসলিম হা/২৫৫৭।

[6]. বুখারী হা/৫৯৮৬; মুসলিম হা/২৫৫৭।

[7]. কাতী‘আতুর রাহিমু, ১/৯ পৃঃ।

[8]. ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমু‘ ফাতাওয়া, ৮/৫১৭, ৫৪০।

[9]. আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৫৮, সনদ হাসান।

[10]. আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৫৯, সনদ হাসান।

[11]. তিরমিযী হা/১৯৭৯; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৭৬; মিশকাত হা/৪৯৩৪।

[12]. মুসনাদ আহমাদ; সিলিসিলা ছহীহাহ হা/৫১৯; ছহীহ আত-তারগীব হা/২৫২৪।

[13]. বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা ১০/৬২; ছহীহুল জামে‘ হা/৫৩৯১; ছহীহাহ হা/৯৭৮।

[14]. আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৭৩; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৭৭।

[15]. আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৬৮; মিশকাত হা/৩৩৮৪, সনদ ছহীহ।

[16]. ইবনু মাজাহ হা/৩৩৭৪; মিশকাত হা/১৯০৭; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৫৬৯।

[17]. মুসলিম হা/২৫৫৮; মিশকাত হা/৪৯২৪; আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৫২।

[18]. বুখারী হা/১৪৬১; মুসলিম হা/৯৯৮; মিশকাত হা/১৯৪৫।

[19]. বুখারী হা/১৪৬৬; মুসলিম হা/১০০০; মিশকাত হা/১৯৩৪।

[20]. বুখারী হা/২৫৯২

[21]. তিরমিযী হা/৬৫৮; ইবনু মাজাহ হা/১৮৪৪; মিশকাত হা/১৯৩৯, সনদ ছহীহ।

[22]. বুখারী হা/৬৬৮৪; মুসলিম হা/২৫৫৬; মিশকাত হা/৪৯২২।  

[23]. আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৫৯৪, সনদ হাসান।

[24]. আল-আদাবুল মুকরাদ হা/৭২, সনদ ছহীহ

[25]. আল-আদাবুল মুকরাদ হা/৭৩, সনদ ছহীহ

 

 

HTML Comment Box is loading comments...