হাদীছের গল্প

যে পরিমাণ সম্পদ থাকলে মেহমান আপ্যায়ন আবশ্যিক হয়

শারমীন আখতার
পিঞ্জুরী, কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ।

কুরআন ও হাদীছ মানবতার মুক্তির দিশারী। এর মাধ্যমে মানুষ হকের দিশা পায়। মানুষের জীবনের করণীয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করে। প্রার্থনাকারীর ও মেহমানের আপ্যায়ন করা কখন আবশ্যক হয় এ বিষয়টি জানতে তাই নিম্নোক্ত  হাদীছের অবতারণা।

হাসান বাছরী (রহঃ) বলেন, কায়স ইবনু আছেম সা‘দী (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর খেদমতে উপস্থিত হ’লাম। তখন তিনি বললেন, তিনি হচ্ছেন তাঁবুবাসীদের সর্দার! আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ (ছাঃ)! আমার কী পরিমাণ মাল থাকলে কোন যাচ্ঞাকারী এবং মেহমানের আমার উপর কোন হক অবশিষ্ট থাকবে না? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, চল্লিশটি (পশু) উত্তম। আর ঊর্ধ্ব সংখ্যা হচ্ছে ষাট, আর দুই শতের মালিকদের তো বিপদ। অবশ্য যে ব্যক্তি উট বা বকরী ছাদাক্বা প্রদান করে, তার পশু দ্বারা অপরের উপকার করে এবং হৃষ্টপুষ্ট পশু যবেহ করে যাতে নিজেও খেতে পারে এবং ভদ্র স্বভাবের অভাবীদেরকে এবং যাচ্ঞাকারীদেরকেও খাওয়াতে পারে (তার জন্য ভাবনার কোন কারণ নেই। কারণ সে মালের হক আদায় করেছে)। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ (ছাঃ)! এটা তো অতি উত্তম স্বভাব। কিন্তু আমি যে প্রান্তরে বাস করি, সেখানে তো কেউ আমার পশুর প্রাচুর্যের কারণে আসে না যে, আমি তাকে খাওয়াতে পারি! রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তুমি কিরূপ পশু দান-খয়রাত করে থাক? আমি বললাম, দাঁত বিশিষ্ট ও দাঁতহীন উভয় প্রকারের পশুই দান করে থাকি। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তুমি কিভাবে দুধ পানের জন্য উষ্ট্রী ধার দিয়ে থাক? আমি বললাম, আমি শত সংখ্যক দান করে থাকি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, প্রজননের ব্যাপারে (যদি কেউ তোমার পশুপালের সাহায্য নিতে চায় তখন) তুমি কি করে থাক? আমি বললাম, লোকজন তাদের গর্ভ গ্রহণকারিণী উটনী নিয়ে আসে এবং আমার উষ্ট্রপালের মধ্যকার যে উটটিকে প্ররোচিত করতে পারে, তা নিয়ে যায় এবং যতদিন তার প্রয়োজন থাকে এটা তার কাছে রেখে দেয়। প্রয়োজন শেষে আবার তা ফিরিয়ে দিয়ে যায়। তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তোমার নিজের মাল তোমার কাছে অধিকতর প্রিয় নাকি তোমার উত্তরাধিকারীদের মালই তোমার কাছে অধিকতর প্রিয়? রাবী বলেন, আমার মাল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তোমার মাল হ’ল ঐ মাল যা তুমি নিজে পানাহারের মাধ্যমে ভোগ কর অথবা নিজে (আল্লাহর রাস্তায়) দান করে থাক। তাছাড়া অবশিষ্ট সমস্ত সম্পদই তোমার উত্তরাধিকারীদের মাল। (কারণ এটা শেষ পর্যন্ত তাদেরই দখলে আসবে)। তখন আমি বললাম, এবার ফিরে গেলে নিশ্চয়ই তার সংখ্যা কমিয়ে ফেলব।

অতঃপর (নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট হ’তে প্রত্যাবর্তনের পর) যখন তার মৃত্যুর সময় আসন্ন হ’ল, তিনি তার পুত্রদেরকে ডেকে একত্র করে বললেন, বৎসরা! তোমরা আমার উপদেশ শ্রবণ কর। কেননা আমার চেয়ে তোমাদের অধিকতর মঙ্গলকামী উপদেশদাতা আর কাউকে পাবে না। আমার মৃত্যুর পর আমার জন্য বিলাপ করবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পর তাঁর জন্য বিলাপের ব্যবস্থা করা হয়নি। আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে বিলাপের ব্যাপারে নিষেধ করতে শুনেছি। আর আমার কাফন দিবে সেই বস্ত্রে যে বস্ত্রে আমি ছালাত আদায় করি। তোমাদের মধ্যকার বয়োজ্যেষ্ঠদেরকে সর্দার নির্বাচিত করবে। কেননা যতদিন তোমরা তোমাদের বয়োজ্যেষ্ঠদেরকে সর্দার বানাতে থাকবে, ততদিন তোমাদের পিতৃপুরুষের প্রতিনিধিত্ব তোমাদের মধ্যে বর্তমান থাকবে। আর যখন তোমরা তোমাদের মধ্যকার বয়ঃকনিষ্ঠদেরকে সর্দার নির্বাচিত করবে, তখন লোকসমক্ষে তোমাদের পিতৃপুরুষের অবমাননা সূচিত হবে এবং নিজেদের মধ্যে একে অপরকে যুহদ (সংসারের প্রতি অনাসক্ত)-এর প্রেরণা যোগাবে। নিজেদের সংসার ধর্ম সমুন্নত রেখ। কেননা এতে অন্যের দ্বারস্থ হ’তে হয় না। তোমরা ভিক্ষাবৃত্তি হ’তে অবশ্যই বিরত থাকবে। কেননা এটা হচ্ছে নিকৃষ্টতর পেশা। আর যখন তোমরা আমাকে দাফন করবে, তখন আমার কবর মাটির সাথে মিলিয়ে সমান করে দিবে। কেননা আমার এবং ঐ পার্শ্ববর্তী জনপদে বসবাসরত বকর ইবনু ওয়ায়েল গোত্রের মধ্যে প্রায়ই মনোমালিন্য চলত। পরে তাদের মধ্যকার কোন নির্বোধ ব্যক্তি এমন কোন কর্ম করে বসবে, তোমাদের পক্ষ হ’তে যার পাল্টা ব্যবস্থা তোমাদের দ্বীন ধর্মের জন্য অনিষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে (আদাবুল মুফরাদ হা/৯৬৪, সনদ ছহীহ)

সমাপনী : এ হাদীছে কি পরিমাণ সম্পদ থাকলে ভিক্ষুককে দান করা এবং মেহমানের আপ্যায়ন করা অপরিহার্য হয় তা বিবৃত হয়েছে। প্রত্যেক চতুষ্পদ পশুর মালিকের করণীয় এবং নিজের প্রকৃত সম্পদ কোনটা তা বর্ণিত হয়েছে। সেই সাথে মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তি কর্তৃক উত্তরসূরীর জন্য প্রয়োজনীয় উপদেশ দান করা হয়েছে। যে বিষয়গুলো আমল করা অতি যরূরী। আল্লাহ আমাদের সকলকে এ হাদীছটির উপরে পূর্ণ আমল করার তাওফীক দান করুন- আমীন!

HTML Comment Box is loading comments...