ইতিহাসের পাতা থেকে

সততা ও ক্ষমাশীলতার বিরল দৃষ্টান্ত

আব্দুর রহীম
শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।

আল্লাহ ক্ষমাশীল। তিনি ক্ষমাশীলতাকে পসন্দ করেন। পৃথিবীতে যারা ক্ষমাশীলতা ও উদারতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তাদের নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। তাদেরই একজন হ’লেন আববাসীয় খলীফা  মুক্তাফী লি-আমরিল্লাহ ও তাঁর পুত্র মুস্তানজিদের সময়ের সফল মন্ত্রী ইবনু হুবায়রাহ। আলোচ্য নিবন্ধে তাঁর মন্ত্রীত্ব লাভের ইতিহাস এবং সততা ও ক্ষমাশীলতার কিছু নমুনা তুলে ধরা হ’ল।-

তাঁর পুরো নাম আইনুদ্দীন আবুল মুযাফফর ইয়াহইয়া বিন মুহাম্মাদ বিন সাঈদ হুবায়রাহ আশ-শায়বানী। তিনি বাগদাদের নিকটবর্তী ‘আদ-দূর’ মতান্তরে ‘সাওয়াদ’ গ্রামে ৪৯৯ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। অত্যন্ত নিরীহ ও দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি। তাঁর বংশের লোকেরা কৃষি কাজ করত। জ্ঞানার্জন বা জ্ঞান দানের প্রতি আগ্রহী লোক তাদের গ্রামে তেমন ছিল না।

কিন্তু ইয়াহইয়া বিন মুহাম্মাদ বিন হুবায়রার অবস্থা ছিল ভিন্ন। তিনি শৈশবকাল থেকেই বুদ্ধিমান ছিলেন। জ্ঞান অন্বেষণের প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। যুবক বয়সে বাগদাদ গমন করে কুরআন-হাদীছ ও ফিক্হ সহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি জ্ঞানার্জন করেন। পরবর্তীতে আববাসীয় খলীফা মুক্তাফী লি-আমরিল্লাহ এবং তাঁর ছেলে মুস্তানজিদ বিল্লাহর সময় তিনি মন্ত্রীত্ব লাভ করেন। পূর্ব থেকেই তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল ও খুবই সাধারণ জীবন-যাপনকারী। সবসময় আলেম-ওলামার সাথে চলতেন এবং তাঁদের সাথেই অধিক সময় অতিবাহিত করতেন। তাঁদের মুখে যা শুনতেন, তা স্মরণ রাখতেন এবং লিখেও রাখতেন। তাঁর মুখস্থ শক্তিও ছিল প্রখর। কবিতা ও সাহিত্যেও তাঁর যথেষ্ট দখল ছিল। আলেমগণের বৈঠকে অংশগ্রহণ করায় তাঁর জ্ঞানে বাড়তি ইলম সংযোজন হ’ত। তিনি ফিকহে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ছিলেন। তবে আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় তিনি মানবেতর জীবন-যাপন করতেন। তাই তিনি সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকুরীর দরখাস্ত করা শুরু করলেন। কিন্তু চাকুরীর জন্য যেখানেই যেতেন, সেখান থেকে নিরাশ হয়ে ফিরে আসতেন। শেষ পর্যন্ত আববাসীয় খলীফা মুক্তাফী লি-আমরিল্লাহর দফতরে চাকুরীর জন্য দরখাস্ত পাঠালেন। কিন্তু যখনই তিনি তার দরখাস্তের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতেন, তখনই উত্তর আসত যে, এ মুহূর্তে কোন পদ খালি নেই। বহু চেষ্টার পরও তিনি চাকুরী পেলেন না।

ইবনু হুবায়রা বলেন, আমার যখন সকল পাথেয় শেষ হয়ে গেল তখন আমি আমার পরিবারের লোকদের পরামর্শে বাগদাদ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। প্রথমেই আমি মা‘রূফ আল- কারখীর কবর যিয়ারত করলাম। অতঃপর বাগদাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হ’লাম। বাগদাদের পথে একটি মহল্লা অতিক্রম করার সময় অদূরেই একটি পরিত্যক্ত মসজিদ চোখে পড়ল। সেখানে দু’রাক‘আত ছালাত আদায়ের লক্ষ্যে প্রবেশ করতেই এক পার্শ্বে এক রোগীকে একটি বাঁশের তৈরি চাটাইয়ের উপর পড়ে থাকতে দেখলাম। আমি তার শিয়রে বসে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার কোন্ জিনিস খেতে ইচ্ছা হয়? লোকটি বলল, আমার আতা খাওয়ার খুব ইচ্ছা হচ্ছে। আমি রোগীকে অপেক্ষা করতে বলে বাজারে ফলের দোকানে গেলাম। নিজের পোশাক বন্ধক রেখে দু’টি আতা ও একটি আপেল কিনে নিয়ে আসলাম। অতঃপর ফলগুলো রোগীর সামনে পেশ করলাম। লোকটি একটি আতা খেয়ে বলল, মসজিদের দরজা বন্ধ করে দাও। আমি তার কথা মত মসজিদের দরজা বন্ধ করে দিলাম। এর পর তিনি চাটাইয়ের  উপর থেকে সরে গিয়ে বললেন, তুমি এ জায়গাটা খনন কর। আমি তার কথা মত খনন করে একটি জগ দেখতে পেলাম। তিনি বললেন, এটা তুমি গ্রহণ কর, তুমিই এর হকদার। আমি বললাম, আপনার কি কোন ওয়ারিছ নেই? তিনি বললেন, না। তবে আমার এক ভাই ছিল। সে বহুদিন আগে হারিয়ে গেছে। আমি শুনেছি, সে নাকি মারা গেছে। আর আমরা রাছাফার অধিবাসী ছিলাম। এরপর তিনি তার জীবনের পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করলেন। জীবনের ইতিহাস বলতে বলতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।

আমি তাকে গোসল, জানাযা ও দাফন সম্পন্ন করে জগটি নিয়ে রওয়ানা হ’লাম। ঐ জগে দেখলাম পাঁচশ দীনার রয়েছে। আমি আমার গ্রাম আদ-দূরে না গিয়ে বাগদাদ অভিমুখে যাত্রা শুরু করলাম। এরপর আমি দজলা নদীর কিনারে গিয়ে পৌঁছলাম। সেখানে এক মাঝিকে দেখলাম, সে খুব পুরাতন পোশাক পরিহিত। আর সে বার বার বলছে আমার নৌকায় আসুন, আমার নৌকায় আসুন। আমি নদী পার হওয়ার জন্য তার নৌকায় গিয়ে উঠলাম। আমি লক্ষ্য করলাম যে, যে লোকটিকে আমি কাফন-দাফন করে আসলাম তার চেহারার সাথে মাঝির চেহারার অধিক মিল রয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার বাড়ি কোথায়? সে বলল, আমি রাছাফা শহরের অধিবাসী। আমার সন্তান ছিল। কিন্তু আমি এখন একা এবং রিক্তহস্ত। আমি বললাম, তোমার কোন আত্মীয়-স্বজন নেই? সে বলল, না। তবে আমার এক ভাই ছিল। বহুদিন থেকে তার সাথে কোন সাক্ষাৎ নেই। আল্লাহ তার জীবনে কি ঘটিয়েছেন, তা আমার জানা নেই। আমি তাকে বললাম, তোমার চাদর বিছিয়ে দাও, সে তার চাদর বিছিয়ে দিল। আমি জগে থাকা সকল মুদ্রা তার চাদরে ঢেলে দিলাম। এতে সে হতভম্ব হয়ে গেল। আমি তাকে তার ভাইয়ের সব ঘটনা খুলে বললাম। সে আমাকে অর্ধেক সম্পদ নিতে অনুরোধ করল, আমি তাকে বললাম, আল্লাহর কসম! আমি একটা মুদ্রাও গ্রহণ করব না। নদী পার হয়ে আমি খলীফার রাজ প্রাসাদে গিয়ে চাকুরীর জন্য আবেদন পত্র লিখলাম (ইবনু খাল্লি­কান, ওয়া ফায়াতূল আ‘ইয়ান ৬/২৩৯-৪০; আবু মুহাম্মাদ সুলায়মান ইয়াফেঈ, মিরআতুল জিনান ওয়া ইবারাতুল ইয়াক্বযান ১/৩৫৪)

পরদিন আমি খলীফার দরবারে চাকুরীর খবর নিতে গেলাম। আমাকে দেখামাত্র সেখানকার লোকেরা বলল, তুমি কোথায় ছিলে, আমরা তোমাকে খুঁজছিলাম। তোমার জন্য এখানে একটা চাকুরীর ব্যবস্থা হয়েছে। আমি সেখানে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে খুব দ্রুত খলীফা মুক্তাফী লি-আমরিল্লাহর ট্রেজারী অফিসার হয়ে গেলাম। এরপর সেক্রেটারীয়েটে পৌঁছলাম এবং খলীফার সাথে কাজ করতে থাকলাম। খলীফা আমার আমানতদারী ও চরিত্র মাধুর্য অবলোকন করে ৫৪৪ হিজরীতে আমাকে তাঁর মন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ দিলেন। অতঃপর খলীফার মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মুস্তানজিদ বিল্লাহ খলীফা হ’লে তিনিও আমাকে স্বপদে বহাল রাখলেন।

ইবনু হুবায়রাহ (রহঃ) ছহীহ বুখারী ও মুসলিমের ব্যাখ্যা গ্রন্থ সহ বহু ইসলামী গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। ইবনুল জাওযী বলেন, তিনি সত্যের সন্ধানে সচেষ্ট ছিলেন, তিনি রেশমের কাপড় পরতেন না। কারো প্রতি যলুম করা থেকে সতর্ক থাকতেন। তিনি বলেন, আমি যখন খলীফার প্রাসাদে প্রবেশ করলাম, তখন খলীফা আমাকে বললেন, তুমি পোশাক পরিবর্তন কর। একজন খাদেম রেশমের পোশাক নিয়ে এসে আমাকে পরিধান করতে বলল। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি এ পোশাক পরিধান করব না। খাদেম খলীফাকে সংবাদ দিলে তিনি বললেন, আল্লাহর কসম দিয়ে সে যখন বলেছে যে, সে রেশম পরবে না, তাহ’লে সে নিজের পোশাকেই থাক (যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ১৫/১৭২-১৭৩)। তিনি ৫৬০ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত মন্ত্রী হিসাবেই বহাল ছিলেন।

তাঁর অসামান্য ক্ষমাশীলতার দু’টি ঘটনা-

(১) ইবনুল জাওযী বর্ণনা করেন, একদিন আমরা মন্ত্রী ইবনু হুবায়রার পাশে বসে ছিলাম। এ সময় এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তিকে হাতকড়া লাগিয়ে তার নিকট নিয়ে এসে বলল, সে  আমার ভাইকে হত্যা করেছে। মন্ত্রী তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি তার ভাইকে হত্যা করেছ?, সে স্বীকার করল। নিহতের ভাই বলল, সে যেহেতু স্বীকার করেছে, তাকে আমাদের হাতে সোপর্দ করুন, আমরা তাকে হত্যা করব। তিনি আসামীর দিকে তাকিয়ে চিনে ফেললেন যে, এ ব্যক্তি তাঁর গ্রাম আদ-দূরের অধিবাসী। সে মন্ত্রীর সাথে কোন এক সময় খারাপ আচরণ করেছিল। তিনি বললেন, তাকে হত্যা কর না; বরং তাকে ছেড়ে দাও। এ কথা শুনে বাদী বলল, এটা কি করে হয়, সেতো আমার ভাইয়ের হত্যাকারী? মন্ত্রী বললেন, তোমরা তাকে বিক্রি করে দাও। অতঃপর তিনি নিজে ছয়শ’ দীনার দিয়ে তাকে কিনে নিয়ে মুক্ত করে দিলেন এবং বললেন, তুমি এখানে যতদিন ইচ্ছা অবস্থান কর। শুধু তাই নয় মন্ত্রী ইবনু হুবায়রা তাকে ৫০ দীনারও প্রদান করলেন। আমরা বললাম, আপনি তো তার সাথে অত্যন্ত সদাচরণ করলেন। মহানুভবতার পরিচয় দিলেন এবং তার প্রতি সর্বোচ্চ ইহসান করলেন। তখন তিনি বললেন, তোমরা কি জান যে, আমি ডান চোখে কিছু দেখতে পাই না? আমরা বললাম, আমাদের তো তা জানা নেই! তিনি বললেন, মূলতঃ আমার ডান চোখ অন্ধ। আর এর জন্য এ ব্যক্তিই দায়ী, যার পক্ষ থেকে আমি মুক্তিপণ আদায় করলাম এবং ইহসান করলাম। একদিন আমি আদ-দূরের এক রাস্তায় বসেছিলাম, আমার হাতে ফিক্হের একটি কিতাব ছিল, যা পাঠে আমি মশগূল ছিলাম। এ ব্যক্তি একটি ফলের টুকরী নিয়ে এসে বলল, এটা বহন করে আমার সাথে চল। আমি বললাম, আমি ব্যস্ত, অন্য কাউকে ঠিক কর। তখন সে সজোরে আমাকে চড়-ঘুষি মারা শুরু করল। এমনকি সে আমার চোখ উপড়ে ফেলল। অতঃপর সে চলে গেল। এরপর আমি তাকে কোথাও দেখিনি। আমার সাথে তার কৃত আচরণের কথা স্মরণ করে ভাবলাম, আমি সাধ্যমত ভালো কাজের মাধ্যমে তার খারাপ আচরণের প্রতিদান দিব। আমি তাকে এই দুরবস্থায় দেখে প্রতিশোধ না নিয়ে অনুগ্রহ করলাম।

(২) একদিন এক তুর্কী সিপাহী ইবনু হুবায়রার কক্ষে প্রবেশ করল। তখন তিনি তাঁর নিরাপত্তারক্ষীদেরকে বললেন, তাকে বিশ দীনার দিয়ে বাহির থেকেই বিদায় করে দাও। সে যেন দ্বিতীয়বার আমার দফতরে প্রবেশ করতে না পারে। অতঃপর তিনি পাশে বসে থাকা লোকদেরকে বললেন, একদা আমার গ্রাম আদ-দূরে এক ব্যক্তি নিহত হ’ল। তখন তুর্কী সিপাহীরা এসে আমাকে সহ গ্রামবাসীকে তাড়িয়ে নিয়ে চলল। এ সিপাহী ঐ ব্যক্তি, আমরা যার নিয়ন্ত্রণে ছিলাম। সে আমাদের হাত পিছনে বেঁধে নিজে ঘোড়ায় আরোহণ করে আমাদেরকে তার আগে চলার নির্দেশ দিল। পথিমধ্যে আমার সাথীরা তাকে টাকা দিতে লাগল। যে টাকা দেয়, সিপাহী তাকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু আমার নিকটে নিজেকে মুক্ত করানোর মত কিছুই ছিল না। সে তখন আমাকে নির্দয়ভাবে প্রহার করতে থাকে। আছরের ছালাতের সময় হয়ে গেল। আমি ছালাতের জন্য অনুমতি চাইলাম। সে অনুমতি না দিয়ে উল্টো আমাকে গালি দিল। আজ তার অবস্থা কিভাবে পরিবর্তন হয়েছে? আল্লাহ আমাকে তার উপরে বিজয়ী করেছেন। আমি চাইলে আজ তার কাছ থেকে বদলা নিতে পারতাম। কিন্তু আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম। (ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ১২/২৫০; ইবনু রজব, কিতাবুল যাইল আলা ত্বাবাকাতিল হানাবেলা ২/১২৭; যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ১৫/১৭৪)

উপসংহার :

খলীফা মুক্তাফী বলতেন, আববাসীয় খলীফাগণ ইবনু হুবায়রার মত সৎ ও যোগ্য মন্ত্রী  আর কাউকে পায়নি (আল-বিদায়াহ ১২/২৫০)। তিনি কখনও রেশমের পোশাক পরিধান করেননি। তিনি কখনও কারো প্রতি যুলুম করননি। তিনি উত্তম স্বভাবের লোক ছিলেন। খলীফা মুস্তানজিদ বিল্লাহ তার প্রতি খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন। খলীফার খাদেম মারজান বলেন, খলীফা মুস্তানজিদ তার প্রশংসায় কবিতা রচনা করেছেন। তিনি সালাফী আক্বীদা সম্পন্ন ছিলেন (তদেব)। ইবনু হুবায়রার জীবনী থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। আমরা যদি তাঁর মত অনাড়ম্বর জীবন-যাপন করতে পারি এবং সততা ও ক্ষমাশীলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি, তাহ’লে ইহকালে ও পরকালে কামিয়াবী হাছিল করতে পারব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সকলকে তাওফীক দান করুন- আমীন!

HTML Comment Box is loading comments...