হকের দিশা পেলাম যেভাবে

হকের উপরে অবিচল থাকতে দৃঢ় প্রত্যয়ী

-ইঞ্জিনিয়ার সাঈদুর রহমান
কন্দর্পপুর, চাঁন্দাশ, মহাদেবপুর, নওগাঁ।

আমি ইঞ্জিনিয়ার সাঈদুর রহমান। নওগাঁ যেলাধীন মহাদেবপুর থানার অন্তর্গত চাঁন্দাশ ইউনিয়নের কন্দর্পপুর গ্রামের অধিবাসী। পূর্ব-পুরুষদের আক্বীদা অনুযায়ী নানা বিদ‘আতী কর্মকান্ড সহ মাযহাবী পদ্ধতিতে ইবাদত-বন্দেগীতে অভ্যস্ত ছিলাম। সঙ্গত কারণে আহলেহাদীছদেরকে ঘৃণা করতাম। ছালাতে জোরে আমীন শুনলে রাগ হ’ত। আহলেহাদীছ বলতে ভ্রান্ত আক্বীদার অনুসারী মনে করতাম। লেখাপড়ার সুবাদে রাজশাহী শহরে দীর্ঘদিন ছিলাম। নগরীর উপশহরে মারকায মসজিদে তাবলীগ জামা‘আতের আলোচনায় মাঝে-মধ্যে যেতাম।

রাজশাহী যাওয়া-আসার সময় বিভিন্ন দেয়ালে ‘সকল বিধান বাতিল কর, অহি-র বিধান কায়েম কর’ লেখাটি দেখলেই ভাবতাম ভ্রান্ত দলের শ্লোগান। কিছুদিন পর বিয়ে করলাম রাজশাহী যেলাস্থ বাগমারা উপযেলাধীন ভাগনদী গ্রামে। এলাকাটি আহলেহাদীছ অধ্যুষিত। পার্শ্ববর্তী নখোপাড়া, ডোখলপাড়া, ভাগনদী, কোনাবাড়িয়া গ্রামগুলো বিশেষভাবে আহলেহাদীছ অধ্যষিত হিসাবে পরিচিত। জুম‘আর দিনে ভাগনদী বাজার সংলগ্ন কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খত্বীব মাওলানা মুহাম্মাদ তাওফীকুল ইসলামের খুৎবা মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। তাঁর কাছে ছালাত সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্ন করলে তিনি ছহীহ হাদীছ ভিত্তিক জবাব দিতেন। তিনি ও ভাগনদী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে কর্তব্যরত কনস্টেবল জনাব আসাদুল্লাহ আমাকে বলতেন, পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ ভিত্তিক আমল ছাড়া কোন ইবাদত কবুল হবে না। জনাব আসাদুল্লাহ এক সময় মাযহাবপন্থী ছিলেন। বর্তমানে তিনি একজন একনিষ্ঠ আহলেহাদীছ। তারা আমাকে ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব রচিত ও ‘হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’ প্রকাশিত ‘ছালাতুর রাসূল (ছাঃ)’ নামক বইটি সংগ্রহ করতে বললেন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী রাজশাহী শহরের সোনাদিঘীর মোড় থেকে বইটি সংগ্রহ করলাম।

ছোটবেলা থেকেই ইসলামী বই পুস্তক বেশ মনোযোগ দিয়ে পড়তাম। ‘ছালাতুর রাসূল (ছাঃ)’ বইটি পড়ে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। বইটির প্রত্যেকটি বিষয়ে ছহীহ হাদীছের প্রমাণ সহ সূত্র উল্লেখ আমাকে যার পর নাই আকৃষ্ট করে। অতঃপর শুরু হয় বিভিন্ন আহলেহাদীছ আলেমগণের লেখা বই-পুস্তক সংগ্রহ ও অধ্যয়ন। বর্তমানে ছহীহ হাদীছ ভিত্তিক লিখিত অনেক বই পুস্তক আমার সংগ্রহে রয়েছে। আমি জানতে পারলাম, ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত ছালাত সম্পর্কিত বিভিন্ন মাসয়ালা-মাসায়েল। জানতে পারলাম রাসূল (ছাঃ)-এর ছালাত আদায়ের সঠিক পদ্ধতি। স্বচ্ছ ধারণা পেলাম যঈফ ও জাল হাদীছ সম্পর্কে। এটিও অনুধাবন করলাম যে, ছহীহ হাদীছ বর্তমান থাকতে কোন যঈফ বা দুর্বল হাদীছের উপর আমল করা যাবে না।

অতঃপর শুরু হ’ল নতুন জীবন। শুরু করলাম ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী ছালাত আদায়। আমার এই আমল পরিবর্তন দেখে এবং প্রচলিত পদ্ধতির বিপরীত ভিন্ন পদ্ধতিতে ছালাত আদায় দেখে আমার গ্রামের অনেকেই আমাকে নানাভাবে ঠাট্টা করতে লাগল। তাদেরকে ছহীহ হাদীছের কথা বললে, তারা দেশের বড় বড় আলেমগণের উদাহরণ পেশ করে। একপর্যায়ে আমি তাদের নিকট উপহাসের পাত্রে পরিণত হ’লাম। তারা বলতে লাগল, সাঈদুর ‘লা-মাযহাবী’ হয়ে গেছে। আহলেহাদীছের এলাকায় বিয়ে করে সে আহলেহাদীছ হয়ে গেছে। তাদের মতে, দেশের বড় বড় আলেমগণ কি ভুল করছেন? বিশ্ব ইজতেমায় বিভিন্ন দেশের আলেমগণ এসে কি বিদ‘আত করে যান? এভাবে নানা যুক্তি-তর্ক পেশ করতে থাকে। তারপরও আমি মাযহাবী মসজিদে একা একা ছালাতে ছহীহ হাদীছের উপর আমল করা অব্যাহত রাখি। মুনাজাত ছেড়ে দেই। আমার পিতাও ছহীহ হাদীছের কথা শুনে সে অনুযায়ী আমল শুরু করলেন। যদিও তিনি এখনো মাযহাবী আদর্শ থেকে পুরোপুরি সরে আসতে পারেননি। বর্তমানে আমি আমার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় অনেক মাযহাবী ভাইকে ছহীহ হাদীছের উপর আমল করার জন্য দাওয়াত অব্যাহত রেখেছি। আল্লাহর রহমতে অনেকে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন।

নানা বাধা-বিপত্তির পরও নিজেকে ছহীহ হাদীছের উপর দৃঢ় রাখার প্রত্যয়ে জীবন-যাপন করছি। মহান আল্লাহ আমাদেরকে হকের পথে অবিচল থেকে ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন- আমীন!

 

 

HTML Comment Box is loading comments...