প্রবন্ধ


জামা‘আতবদ্ধ জীবন যাপনের আবশ্যকতা

মূল : ড. হাফেয বিন মুহাম্মাদ আল-হাকামী
অধ্যাপক, হাদীছ বিভাগ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।
অনুবাদ : আব্দুর রহীম, নিয়ামতপুর, নওগাঁ।
গবেষণা সহকারী, হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।

(শেষ কিস্তি)

অন্যায়কে প্রত্যাখ্যান করা জামা‘আতের অপরিহার্যতাকে নাকচ করে না :

পূর্বের আলোচনায় বর্ণিত দলীলসমূহ উপস্থাপনের মাধ্যমে আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, (নেতার মধ্যে) পাপ ও অন্যায় কাজ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও একজন মুসলিম ব্যক্তির উপর জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরা, নেতার কথা শ্রবণ করা ও তার আনুগত্য করা আবশ্যক। যতক্ষণ তিনি ছালাত কায়েম করেন এবং তার দ্বারা প্রকাশ্য কুফরী সংঘটিত না হয়, যা কুরআন ও ছহীহ হাদীছের দলীল দ্বারা প্রমাণিত। তবে এর মানে অন্যায়ের স্বীকৃতি দান এবং তাতে সন্তুষ্ট থাকা নয়। কারণ অন্যায়কে ঘৃণা করাও আবশ্যক। যিনি জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরা আবশ্যক করেছেন তিনিই অন্যায়কে ঘৃণা করা আবশ্যক করেছেন। আর এর আবশ্যকতার দলীল কুরআন মাজীদ ও রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছে রয়েছে। কুরআন মাজীদের দলীল হ’ল- আল্লাহ তা‘আলার বাণী, وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ- ‘তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহবান করবে, ভাল কাজের আদেশ দিবে এবং খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম’ (আলে ইমরান ৩/১০৪)

আর হাদীছ থেকে দলীল হ’ল- আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيْمَانِ- ‘তোমাদের মধ্যে কেউ কোন অন্যায় হ’তে দেখলে সে যেন তা হাত দিয়ে পরিবর্তন করে। তাতে সক্ষম না হ’লে যবান দিয়ে প্রতিবাদ করবে। তাতেও সক্ষম না হ’লে অন্তর থেকে ঘৃণা করবে। আর এটা হ’ল দুর্বলতম ঈমান’।[1]

উক্ত আয়াত ও হাদীছের নির্দেশ আবশ্যকতার (الوجوب) দাবী রাখে। অতঃপর যে জামা‘আত অাঁকড়ে ধরার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, সেটি সত্যের অনুগামী। আর সত্যের অনুসরণ বাতিলকে প্রত্যাখ্যান করা ও তাকে অস্বীকার করার দাবী রাখে। এটি ঐ জামা‘আত যার মধ্যে উত্তম গুণাবলী বিদ্যমান থাকে। উত্তম গুণাবলীর মধ্যে অন্যতম হ’ল- সৎ কাজের আদেশ দান ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা।[2] যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ- ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, তোমাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য। তোমরা ভাল কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে’ (আলে ইমরান ৩/১১০)। অনুরূপভাবে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ জামা‘আতের বিজয় লাভ ও টিকে থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَلَيَنْصُرَنَّ اللهُ مَنْ يَنْصُرُهُ إِنَّ اللهَ لَقَوِيٌّ عَزِيْزٌ- الَّذِيْنَ إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوْا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ-

‘আর আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন, যে তাকে সাহায্য করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী।   তারা এমন যাদেরকে আমি পৃথিবীতে ক্ষমতা দান করলে তারা ছালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে, সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে’ (হজ্জ ২২/৪০-৪১)। শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন,

وَوَلِيُّ الْأَمْرِ إنَّمَا نُصِّبَ لِيَأْمُرَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَى عَنْ الْمُنْكَرِ وَهَذَا هُوَ مَقْصُوْدُ الْوِلَايَةِ... يُوَضِّحُ ذَلِكَ: أَنَّ صَلَاحَ الْعِبَادِ بِالْأَمْرِ بِالْمَعْرُوْفِ وَالنَّهْيِ عَنْ الْمُنْكَرِ؛ فَإِنَّ صَلَاحَ الْمَعَاشِ وَالْعِبَادِ فِيْ طَاعَةِ اللهِ وَرَسُوْلِهِ، وَلَا يَتِمُّ ذَلِكَ إلَّا بِالْأَمْرِ بِالْمَعْرُوْفِ وَالنَّهْيِ عَنْ الْمُنْكَرِ...

‘নেতাকে নেতৃত্বের দায়িত্ব এজন্য দেওয়া হয় যে, তিনি সৎ কাজের আদেশ করবেন এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবেন। আর এটিই নেতৃত্বের মূল উদ্দেশ্য...। সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধের মধ্যে বান্দার কল্যাণ নিহিত থাকা এ বিষয়টিকে সুস্পষ্ট করে। কেননা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের মধ্যেই জীবন-জীবিকা ও বান্দার কল্যাণ রয়েছে। আর সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ ছাড়া এটি পূর্ণতা লাভ করতে পারে না...’।[3]

যখন খারাপ কাজসমূহকে প্রত্যাখ্যান করা জামা‘আতের জন্য এতটা গুরুত্বপূর্ণ, তখন মানুষের মধ্যে অসৎ কাজ থেকে নিষেধকারী ব্যক্তি জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরার অধিক হকদার। কিন্তু যে প্রত্যাখ্যানের এত গুরুত্ব সেটা হ’ল শারঈ নিয়ম-নীতির গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থেকে এবং সৃষ্টির সেরা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর দিক-নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রত্যাখ্যান করা। আর নবী (ছাঃ) অন্যায়কে পরিবর্তন করাকে সামর্থ্যের সাথে শর্তযুক্ত করেছেন এবং এ কাজে প্রবৃত্ত হওয়া ব্যক্তির ক্ষমতা অনুপাতে তার স্তর নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যেমনটি পূর্বের হাদীছে অতিবাহিত হয়েছে।

নবী (ছাঃ) ক্ষমতা থাকলে খারাপ কাজ হাত দ্বারা পরিবর্তন করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে তার থেকে বড় বা তার সমপর্যায়ের ফিৎনার আশঙ্কা থেকে নিরাপদ থাকতে হবে। এটি যদি বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হয়, তাহ’লে সে পরের    স্তরে ফিরে যাবে। আর সেটি হ’ল- পূর্বের শর্ত সাপেক্ষে যবান দ্বারা প্রতিবাদ করা। যদি এটিও সম্ভব না হয়, তাহ’লে সে তৃতীয় ও সর্বশেষ স্তরে ফিরে যাবে। আর তা হ’ল- অন্তর থেকে ঘৃণা করা। আর এটি খারাপ কাজকে ঘৃণা করা এবং সক্ষম হ’লে তা পরিবর্তনের নিয়ত রাখা। অন্তরের কর্মই (ঘৃণা করা) দায়ভার ও পাপবোধ থেকে মুক্ত থাকার জন্য যথেষ্ট। এজন্য নবী করীম (ছাঃ) অন্তর দিয়ে ঘৃণা করাকে ‘তাগয়ীর’ বা পরিবর্তন বলেছেন। যখন অপকর্মসমূহ এমন ব্যক্তির পক্ষ থেকে প্রকাশ পায়, যার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব রয়েছে। তখন অন্তর দিয়ে ঘৃণা করার প্রয়োজনীয়তা বেশী অনুভূত হয়। এরূপ ক্ষেত্রে প্রবল ধারণা হয় যে, প্রত্যাখ্যানকারী প্রত্যাখ্যান করার সময় ফিৎনা ও নিশ্চিত ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এজন্য নেতার আনুগত্য ও আদেশ শ্রবণের নির্দেশের সাথে সম্পৃক্ত করে এ ধরনের প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে রাসূল (ছাঃ)-এর দিক-নির্দেশনা এসেছে। আওফ বিন মালেক (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে এসেছে, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,

أَلاَ مَنْ وَلِىَ عَلَيْهِ وَالٍ فَرَآهُ يَأْتِى شَيْئًا مِنْ مَعْصِيَةِ اللهِ فَلْيَكْرَهْ مَا يَأْتِى مِنْ مَعْصِيَةِ اللهِ وَلاَ يَنْزِعَنَّ يَدًا مِنْ طَاعَةٍ-

‘সাবধান! কারো উপর যদি কোন শাসক নিযুক্ত হয়। অতঃপর সে যদি শাসকের পক্ষ থেকে আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কোন কাজ হ’তে দেখে, তখন সে যেন তার আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কাজকে ঘৃণা করে এবং অবশ্যই যেন আনুগত্যের হাত গুটিয়ে না নেয়’।[4] উম্মে সালামা (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে এসেছে, নবী করীম (ছাঃ) বলেন,إِنَّهُ سَيَكُونُ عَلَيْكُمْ أُمَرَاءُ، فَتَعْرِفُونَ وَتُنْكِرُونَ، فَمَنْ كَرِهَ فَقَدْ بَرِئَ، وَمَنْ أَنْكَرَ فَقَدْ سَلِمَ، وَلَكِنْ مَنْ رَضِيَ وَتَابَعَ- ‘অচিরেই তোমাদের উপর এমন কতিপয় আমীর নিযুক্ত করা হবে, যাদের কিছু ভাল কাজের কারণে তোমরা সন্তুষ্ট হবে এবং তাদের কিছু খারাপ কাজের কারণে তাদেরকে অপসন্দ করবে। যে ব্যক্তি তাদের খারাপ কাজকে ঘৃণা করল সে মুক্তি পেল এবং যে ব্যক্তি তাদের প্রতিবাদ করল সে নিরাপত্তা লাভ করল। কিন্তু যে ব্যক্তি তাদের পসন্দ করল এবং তাদের অনুসরণ করল (সে ক্ষতিগ্রস্ত হ’ল)’।[5]

ইমাম নববী (রহঃ) এ হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘এর অর্থ হ’ল যে ব্যক্তি খারাপ কাজকে ঘৃণা করল, সে তার গুনাহ ও শাস্তি থেকে মুক্তি পেল। এটি সে ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যে হাত এবং যবান দ্বারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করার ক্ষমতা রাখে না। সে যেন মন থেকে তা ঘৃণা করে এবং দায়মুক্ত হয়ে যায়...। لَكِنْ مَنْ رَضِيَ وَتَابَعَ (কিন্তু যে ব্যক্তি তাদের প্রতি খুশি হ’ল এবং তাদের অনুসরণ করল) অর্থাৎ যে ব্যক্তি তাদের অন্যায়ের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করল এবং তাদের অনুসরণ করল, তার জন্য গুনাহ এবং শাস্তি অবধারিত। এখানে যে ব্যক্তি অন্যায় কাজ সমূহ অপসারণ করতে অপারগ হ’ল তার কেবল নীরবতা পালনে কোন গুনাহ না হওয়ার দলীল রয়েছে। তবে অন্যায়ের প্রতি খুশি থাকা, অন্তরে ঘৃণা না করা বা তার অনুসরণ করাতে গুনাহ রয়েছে।[6] অতএব অন্যায়কে প্রত্যাখ্যান করার ক্ষেত্রে এটিই আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর দিক-নির্দেশনা। আর আল্লাহর হুরমত রক্ষার ব্যাপারে তাঁর থেকে অধিক আগ্রহী কেউ নেই। তবে শক্তি প্রয়োগ বা যবান দ্বারা যে প্রতিবাদ করার সাথে ফিৎনা বা অনিষ্টের আশংকা রয়েছে, সেটি রাসূল (ছাঃ)-এর আদর্শের বিপরীত প্রত্যাখ্যান এবং বিদ‘আতীদের পদ্ধতির সাথে সামঞ্জস্যশীল। শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) প্রতিবাদের স্তরসমূহ বর্ণনা করার পর বলেন, ‘এ ব্যাপারে দু’দল লোক ভুল করে থাকে। একদল লোক নিম্নের আয়াতের অপব্যাখ্যা করে তাদের উপর সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধের যে অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব রয়েছে তা ত্যাগ করে। যেমন আবুবকর (রাঃ) তাঁর খুৎবায় বলেন, ‘হে লোক সকল! তোমরা এ আয়াতটি পাঠ করে থাক-يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوْا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا  اهْتَدَيْتُمْ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর তোমাদের নিজেদের দায়িত্ব। যদি তোমরা সঠিক পথে থাক তাহ’লে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না’ (মায়েদাহ ৫/১০৫)। অথচ তোমরা একে অপাত্রে রাখ। আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি,إِنَّ النَّاسَ إِذَا رَأَوُا الْمُنْكَرَ لاَ يُغَيِّرُوْنَهُ أَوْشَكَ أَنْ يَعُمَّهُمُ اللهُ بِعِقَابِه-ِ ‘লোকেরা যখন অসৎকাজ হ’তে দেখবে অথচ তা পরিবর্তন করবে না, তখন আল্লাহ তা‘আলা অতিসত্বর তাদের সকলের উপর ব্যাপক শাস্তি আরোপ করবেন’।[7]

দ্বিতীয় দল : এরা বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, ধৈর্য, কল্যাণ-অকল্যাণ এবং সামর্থ্য ও অক্ষমতার কথা চিন্তা না করেই সাধারণভাবে শক্তি প্রয়োগ বা বক্তব্যের মাধ্যমে আদেশ করতে চায়...। অতঃপর নিজেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসারী ধারণা করে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে। অথচ সে তাঁর সীমা অতিক্রমকারী। যেমন খারেজী, মু‘তাযিলা, রাফেযী প্রভৃতি বিদ‘আতী ও প্রবৃত্তিপূজারী বহু দল সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধে নিজেকে নিয়োজিত করে। এরা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ, জিহাদ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভুল পথে পরিচালিত হয়। উপকারিতার তুলনায় এর ক্ষতি অনেক বেশী। এজন্য মহানবী (ছাঃ) নেতাদের অত্যাচারে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন এবং যতক্ষণ তারা ছালাত কায়েম করে ততক্ষণ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, أَدُّوْا إِلَيْهِمْ حَقَّهُمْ وَسَلُوا اللهَ حَقَّكُمْ ‘তোমরা তাদের প্রাপ্য তাদের কাছে পৌঁছে দিবে আর তোমাদের প্রাপ্যের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে’।[8] ইবনু তায়মিয়া (রহঃ) আরো বলেন,

وَلِهَذَا كَانَ مِنْ أُصُوْلِ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ لُزُوْمُ الْجَمَاعَةِ وَتَرْكُ قِتَالِ الْأَئِمَّةِ وَتَرْكُ الْقِتَالِ فِي الْفِتْنَةِ، وَأَمَّا أَهْلُ الْأَهْوَاءِ كَالْمُعْتَزِلَةِ فَيَرَوْنَ الْقِتَالَ لِلْأَئِمَّةِ مِنْ أُصُوْلِ دِيْنِهِمْ-

‘এজন্য আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মূলনীতি হ’ল-জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরা, নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিহার করা এবং ফিৎনার সময় যুদ্ধ পরিত্যাগ করা। পক্ষান্তরে মু‘তাযিলাদের মত প্রবৃত্তিপূজারীরা নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে তাদের দ্বীনের মূলনীতি মনে করে’।[9]

ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন,

إن النبي صلّى الله عليه وسلم شرع لأمته إيجاب إنكار المنكر ليحصل بإنكاره من المعروف ما يحبه الله ورسوله، فإذا كان إنكار المنكر يستلزم ما هو أنكر منه وأبغض إلى الله ورسوله، فإنه لا يسوغ إنكاره، وإن كان الله يبغضه ويمقت أهله، وهذا كالإنكار على الملوك والولاة بالخروج عليهم، فإنه أساس كل شر وفتنة إلى آخر الدهر.

‘নবী করীম (ছাঃ) খারাপ কাজ প্রত্যাখ্যান করাকে তাঁর উম্মতের জন্য আবশ্যকীয় বিধান রূপে নির্ধারণ করেছেন, যাতে সেটা প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে এমন ভালো কাজ অর্জিত হয় যা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ছাঃ) পসন্দ করেন। তবে যখন খারাপ কাজ প্রত্যাখ্যান করা তার থেকে খারাপ ও মন্দ কাজকে আবশ্যক করে দেয় এবং তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে অপসন্দনীয় হয়, তখন সেই খারাপ কাজকে প্রত্যাখ্যান করা বৈধ হবে না। যদিও আল্লাহ তা‘আলা একে ঘৃণা করেন এবং এর সম্পাদনকারীকে অপসন্দ করেন। আর এটি রাজা-বাদশাহ ও শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার মাধ্যমে তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করার মতো। কেননা শেষ যামানা অবধি এটি সকল অনিষ্ট ও ফিৎনার মূল ভিত্তি’। তিনি আরো বলেন, ‘প্রথম ওয়াক্ত থেকে দেরীতে ছালাত প্রতিষ্ঠাকারী নেতাদের বিরুদ্ধে ছাহাবায়ে কেরাম যখন যুদ্ধের অনুমতি প্রার্থনা করে বললেন, أَفَلاَ نُقَاتِلُهُمْ ‘আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না’? তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন,لاَ، مَا أَقَامُوا الصَّلاَةَ ‘না, যতক্ষণ তারা ছালাত কায়েম করে’।[10]

তিনি আরো বলেন, مَنْ رَاىَ مِنْ أَمِيْرِهِ شَيْئًا يَكْرَهُهُ فَلْيَصْبِرْ وَلاَ يَنْزِعَنَّ يَدًا عَِنْ طَاعَةٍ-  ‘যে তার আমীরের মধ্যে কোন অপসন্দনীয় কাজ দেখবে, সে ধৈর্য ধারণ করবে এবং অবশ্যই আনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে নেবে না’।[11] ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইসলামে ছোট-বড় যত ফিৎনা সংঘটিত হয়েছে তা নিয়ে চিন্তা করবে, সে এই মূলনীতির লঙ্ঘন এবং খারাপ কাজ দেখে ধৈর্য ধারণ না করার বিষয়টি দেখতে পাবে। আর এর অপসারণ চাইতে গিয়ে তার থেকে বড় ফিৎনার জন্ম হয়। রাসূল (ছাঃ) মক্কায় বড় বড় খারাপ কাজসমূহ প্রত্যক্ষ করতেন। কিন্তু তিনি তা পরিবর্তন করতে সক্ষম হননি। বরং আল্লাহ তা‘আলা যখন মক্কা বিজয় দান করলেন এবং সেটি ইসলামের আবাসস্থলে পরিণত হ’ল, তখন তিনি বায়তুল্লাহ পরিবর্তনের এবং ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তির উপর তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করলেন। কিন্তু তাঁর ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এর চেয়ে বড় ফিৎনা সংঘটিত হওয়ার আশংকায় এ কাজ থেকে তিনি বিরত থাকলেন। কারণ কুরাইশদের নতুন ইসলাম গ্রহণ এবং সদ্য কুফরী থেকে বের হয়ে আসায় তারা তা সহ্য করতে পারত না’।[12]

উপসংহার :

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যাঁর রহমতে বক্ষ সমূহ উন্মুক্ত হয় এবং কর্মসমূহ সহজ হয়। এই গবেষণাকর্ম সমাপ্তকরণে সাহায্য ও সহজীকরণের জন্য আমি আল্লাহর প্রশংসা করছি। অতঃপর আলোচনা দু’টি অধ্যায়ে সম্পন্ন হয়েছে। প্রথম অধ্যায়কে শুদ্ধতা ও দুর্বলতার দিক থেকে জামা‘আতবদ্ধভাবে বসবাসের হাদীছসমূহ পর্যালোচনা করার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এ বিষয়ে ছহীহ হাদীছের সংখ্যা বিশটি, হাসান ছয়টি এবং যঈফ মাত্র চারটিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এতগুলো ছহীহ ও হাসান হাদীছ জামা‘আতের ব্যাপারে নবী করীম (ছাঃ)-এর গুরুত্বারোপের প্রতি নির্দেশ করে। সাথে সাথে এ ব্যাপারে ছাহাবায়ে কেরাম এবং আলেম-ওলামার গুরুত্ব প্রদানের কথাও প্রমাণ করে। কারণ তাঁরা ঐ হাদীছসমূহ মুখস্থ ও সংরক্ষণ করেছেন এবং তাঁদের পরবর্তীদের কাছে বর্ণনা করেছেন। আর দ্বিতীয় অধ্যায়কে উক্ত হাদীছসমূহকে ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আলেম-ওলামার বক্তব্য পর্যালোচনা করে আমি দেখেছি যে, এগুলো পূর্ববর্তী দৃষ্টিকোণ থেকে (শুদ্ধতা ও দুর্বলতার দিক) কোন অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ তারা ঐ সকল হাদীছের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং তাতে বর্ণিত বিধি-বিধান সাব্যস্তকরণে তার পূর্ণ হক আদায় করেছেন। পূর্বের আলোচনায় জামা‘আতবদ্ধ ভাবে বসবাসের হাদীছসমূহে ফিকহী পর্যালোচনার সময় আমার কাছে অনেক উপকারিতা ও গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল প্রতিভাত হয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হ’ল-

১. ঐ সকল হাদীছে বর্ণিত জামা‘আত দ্বারা কুরআন ও হাদীছের অনুসারী গোষ্ঠী এবং একজন নেতার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ জনগোষ্ঠী উদ্দেশ্য, যিনি তাদেরকে শরী‘আত অনুযায়ী পরিচালনা করবেন।

২. পূর্ববর্তী অর্থে ক্বিয়ামত পর্যন্ত জামা‘আত বিদ্যমান থাকবে।

৩. জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরা আবশ্যক এবং তা থেকে বেরিয়ে যাওয়া হারাম।

৪. দুনিয়া ও আখেরাতে জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরার উপকারিতা অনেক এবং তা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কুফলও ভয়াবহ।

৫. নেতাদের পক্ষ থেকে যুলুম-অত্যাচারের শিকার হওয়া জামা‘আত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বৈধতা প্রদান করে না।

৬. শারঈ নিয়ম-নীতি অনুযায়ী অন্যায় কাজ প্রত্যাখ্যান করা জামা‘আতকে অাঁকড়ে ধরার পরিপন্থী নয়।

এছাড়াও এই গবেষণাকর্মটি অনেক ফলাফল ও অন্যান্য বহু উপকারিতাকে শামিল করেছে, যা পাঠকগণ এই আলোচনার মধ্যে জানতে পারবেন ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তা‘আলার নিকট প্রার্থনা, তিনি যেন এই গবেষণা দ্বারা (মানুষকে) উপকৃত করেন এবং এর গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করেন। তিনিই উত্তম প্রার্থনা কবুলকারী।

وَسُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ وَسَلامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ-



[1]. মুসলিম হা/৪৯, মিশকাত হা/৫১৩৭

[2]. আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,إِنَّ اللهَ لَيَسْأَلُ الْعَبْدَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يَقُولَ مَا مَنَعَكَ إِذْ رَأَيْتَ الْمُنْكَرَ أَنْ تُنْكِرَهُ فَإِذَا لَقَّنَ اللهُ عَبْدًا حُجَّتَهُ قَالَ يَا رَبِّ رَجَوْتُكَ وَفَرِقْتُ مِنَ النَّاسِ ‘আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন বান্দাকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করবেন। এক পর্যায়ে তাকে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি যখন অন্যায় কাজ হ’তে দেখেছিলে তখন তোমাকে তা প্রতিহত করতে কিসে বারণ করেছিল? (সে জবাবদানে ব্যর্থ হ’লে) আল্লাহ তা‘আলা তাকে তার যথাযথ উত্তর শিখিয়ে দিবেন। তখন সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার রহমতের আশা করেছিলাম এবং মানুষের ভয়ে তা ত্যাগ করেছিলাম’ (ইবনু মাজাহ হা/৪০১৭/; আহমাদ হা/১১২৩০; ছহীহুল জামে‘ হা/১৮১৮; ইবনু হিববান হা/৭৩৪৮)।

عَنْ أَبِىْ سَعِيْدٍ الْخُدْرِىِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم: أَلاَ لاَ يَمْنَعَنَّ أَحَدَكُمْ رَهْبَةُ النَّاسِ أَنْ يَقُولَ بِحَقٍّ إِذَا رَآهُ أَوْ شَهِدَهُ أَوْ سَمِعَهُ. قَالَ: وَقَالَ أَبُو سَعِيدٍ: وَدِدْتُ أَنِّى لَمْ أَسْمَعْهُ-  

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘সাবধান! মানুষের ভয় তোমাদের কাউকে যেন সত্য কথা বলতে বাধা না দেয়, যখন সে অন্যায় দেখবে, প্রত্যক্ষ করবে বা শ্রবণ করবে। বর্ণনাকারী বলেন, আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন, আমি আকাঙ্ক্ষা করছিলাম যে, যদি এ হাদীছটি না শুনতাম (তাহ’লে ভাল হ’ত)’! (আহমাদ হা/১১০৩০; ইবনু মাজাহ হা/৪০০৭; ছহীহ তারগীব হা/২৭৫১; ছহীহাহ হা/১৬৮)।

সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা না দিলে আল্লাহ দো‘আ কবুল করবেন না। আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, مُرُوْا بِالْمَعْرُوْفِ  وَانْهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ قَبْلَ أَنْ تَدْعُوْا فَلاَ يُسْتَجَابَ لَكُمْ   ‘এমন সময় আসার পূর্বেই তোমরা সৎকাজের আদেশ প্রদান কর এবং অসৎ কাজে থেকে নিষেধ করো, যখন তোমরা দো‘আ করবে, কিন্তু তোমাদের দো‘আ কবুল করা হবে না’ (ইবনু মাজাহ হা/৪০০৪; ছহীহুল জামে‘ হা/৫৮৬৮; ছহীহ তারগীব হা/২৩২৫)। তিনি আরো বলেন, إِذَا عُمِلَتِ الْخَطِيئَةُ فِى الأَرْضِ كَانَ مَنْ شَهِدَهَا فَكَرِهَهَا وَقَالَ مَرَّةً:  أَنْكَرَهَا، كَمَنْ غَابَ عَنْهَا وَمَنْ غَابَ عَنْهَا فَرَضِيَهَا كَانَ كَمَنْ شَهِدَهَا  ‘যখন পৃথিবীতে কোন পাপকাজ সংঘটিত হবে আর সেখানে উপস্থিত ব্যক্তি সে কাজকে অপসন্দ করবে (অন্য বর্ণনায় রয়েছে, সে তা ঘৃণা করবে), তাহ’লে সে অনুপস্থিত ব্যক্তির ন্যায়। আর যে ব্যক্তি অনুপস্থিত থেকে সে কাজকে সমর্থন করবে সে উপস্থিত ব্যক্তির ন্যায়’ (আবূদাঊদ হা/৪৩৪৫; ছহীহ তারগীব হা/২৩২৩; ছহীহুল জামে‘ হা/৬৮৯; মিশকাত হা/৫১৪১।-অনুবাদক।

[3]. আস-সিয়াসিয়াতুশ শারঈয়্যাহ; মাজমূ‘ ফাতাওয়া ২৮/৩০৬

[4]. মুসলিম হা/১৮৫৫; ছহীহাহ হা/৯০৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৩২৫৮; মিশকাত হা/৩৩৭০।

[5]. মুসলিম হা/১৮৫৪; আহমাদ হা/২৬৫৭১; ছহীহাহ হা/৩০০৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৩৬১৮; মিশকাত হা/৩৬৭১।

[6]. মুসলিম হা/১৮৫৪-এর ব্যাখ্যা, শারহ ছহীহ মুসলিম ৪/১২/২৪৩

[7]. ইবনু মাজাহ হা/৪০০৫; আহমাদ হা/০১; তিরমিযী হা/৩০৫৭; ছহীহাহ হা/১৫৬৪; মিশকাত হা/৫১৪২

[8]. বুখারী হা/৭০৫২; তিরমিযী হা/২১৯০; মিশকাত হা/৩৬৭২

[9]. রিসালাতুল আমর বিল মা‘রূফ ওয়ান নাহি আনিল মুনকার, পৃঃ ৩৯-৪০; মাজমূ‘ ফাতাওয়া ২৮/১২৮

[10]. মুসলিম হা/১৮৫৪

[11]. মুসলিম হা/১৮৫৫; দারেমী হা/২৭৯৭; ছহীহাহ হা/৯০৭

[12]. ই‘লামুল মুওয়াক্কিঈন ৩/২

 

 

 

 

HTML Comment Box is loading comments...