প্রবন্ধ


আহলেহাদীছ একটি বৈশিষ্ট্যগত নাম

মূল : শায়খ যুবায়ের আলী যাঈ
অনুবাদ : আহমাদুল্লাহ*
সৈয়দপুর, নীলফামারী।

 (শেষ কিস্তি)

[সালাফে ছালেহীন ও তাক্বলীদ]

৭৬. ছিক্বাহ লেখক, ইমাম আবু ওছমান সা‘ঈদ বিন মানছূর বিন শু‘বাহ আল-খুরাসানী আল-মাক্কী (মৃঃ ২২৭ হিঃ) সুয়ূত্বীর কথা মতে কারো তাক্বলীদ করতেন না (৬৭ নং উক্তি দ্রঃ)

৭৭. ছিক্বাহ, ছাবত, সুন্নী, ইমাম আবু রাজা কুতায়বা বিন সা‘ঈদ বিন জামীল আছ-ছাক্বাফী আল-বাগলানী (মৃঃ ২৪০ হিঃ) সুয়ূত্বীর মতে কারো তাক্বলীদ করতেন না (৬৭ নং উক্তি দ্রঃ)

ইমাম কুতায়বা বিন সা‘ঈদ বলেছেন, إذا رأيتَ الرجل يحب أهل الحديث، مثل يحيى بن سعيد القطان، وعبد الرحمن بن مهدي، وأحمد بن حنبل وإسحاق بن راهويه- وذكر قوما آخرين- فإنه على السنة ومن خالف هذا فاعلم أنه مبتدع- ‘যখন তুমি কোন ব্যক্তিকে ইয়াহ্ইয়া বিন সা‘ঈদ আল-ক্বাত্তবান, আব্দুর রহমান বিন মাহদী, আহমাদ বিন হাম্বল, ইসহাক বিন রাহওয়াইহ-এর মত (এবং তিনি আরো অনেকের নাম উল্লেখ করেছেন) আহলেহাদীছদের ভালবাসতে দেখবে তখন জানবে যে, নিশ্চয়ই সে ব্যক্তি সুন্নাতের উপরে (অর্থাৎ সুন্নী) রয়েছে। আর যে ব্যক্তি তাদের বিরোধিতা করবে, জানবে যে সে বিদ‘আতী’।[1]

ইমাম ইয়াহ্ইয়া আল-ক্বাত্তবান, ইমাম আব্দুর রহমান বিন মাহদী, ইমাম আহমাদ ও ইমাম ইসহাক বিন রাহওয়াইহ এরা সবাই কারো তাক্বলীদ করতেন না (৫, ৩১, ৩২ ও ৬৭ নং উক্তি দ্রঃ)

৭৮. ছিক্বাহ, হাফেয, ইমাম আবুল হাসান মুসাদ্দাদ বিন মুসারহাদ বিন মুসারবাল বিন মুসতাওরিদ আল-আসাদী আল-বাছরী (মৃঃ ২২৮ হিঃ) সুয়ূত্বীর মতে কারো তাক্বলীদ করতেন না (৬৭ নং উক্তি দ্রঃ)

৭৯. ছিক্বাহ, ছাবত, ইমাম আবু নু‘আইম ফযল বিন দুকায়েন ‘আমর বিন হাম্মাদ আত-তায়মী আল-মুলাঈ আল-কূফী (মৃঃ ২১৭ হিঃ) সুয়ূত্বীর কথামতে কারো তাক্বলীদ করতেন না (৬৭ নং উক্তি দ্রঃ)

৮০. ছিক্বাহ, ছাবত, ইমাম আবু মূসা মুহাম্মাদ ইবনুল মুছান্না বিন ওবায়েদ আল-বাছরী আল-আনাযী (মৃঃ ২৫২ হিঃ) সুয়ূত্বীর মতে কারো তাক্বলীদ করতেন না (৬৭ নং উক্তি দ্রঃ)

৮১. ছিক্বাহ, সত্যবাদী, ইমাম আবুবকর মুহাম্মাদ বিন বাশ্শার বিন ওছমান আল-‘আবদী আল-বাছরী ওরফে বুনদার (মৃঃ ২৫২ হিঃ) সুয়ূতবীর মতে কারো তাক্বলীদ করতেন না (৬৭ নং উক্তি দ্রঃ)

৮২. ছিক্বাহ, হাফেয, ফাযেল, ইমাম আবু আব্দুর রহমান মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন নুমায়ের আল-হামাদানী আল-কূফী (মৃঃ ২৩৪ হিঃ) সুয়ূত্বীর বক্তব্য মতে কারো তাক্বলীদ করতেন না (৬৭ নং উক্তি দ্রঃ)

৮৩. ছিক্বাহ, হাফেয, ইমাম আবু কুরাইব মুহাম্মাদ ইবনুল ‘আলা বিন কুরাইব আল-হামাদানী আল-কূফী (মৃঃ ২৪৭ হিঃ) সুয়ূত্বীর মতে কারো তাক্বলীদ করতেন না (৬৭ নং উক্তি দ্রঃ)

৮৪. ইমাম শাফে‘ঈর শিষ্য, ছিক্বাহ, ইমাম আবু আলী হাসান বিন মুহাম্মাদ ইবনুছ ছাবাহ আয-যা‘ফারানী আল-বাগদাদী (মৃঃ ২৬০ হিঃ) সুয়ূতবীর কথামতে কারো তাক্বলীদ করতেন না (৬৭ নং উক্তি দ্রঃ)

৮৫. ছিক্বাহ, ইমাম, হাফেয সুলায়মান বিন হারব আল-আযদী আল-বাছরী আল-ওয়াশিহী (মৃঃ ২২৪ হিঃ) সুয়ূত্বীর মতে কারো তাক্বলীদ করতেন না (৬৭ নং উক্তি দ্রঃ)

৮৬. ছিক্বাহ, সত্যবাদী, ইমাম আবুন নু‘মান মুহাম্মাদ ইবনুল ফযল আস-সাদূসী আল-বাছরী ওরফে ‘আরিম (মৃঃ ২২৪ হিঃ) সুয়ূত্বীর বক্তব্য মতে কারো তাক্বলীদ করতেন না (৬৭ নং উক্তি দ্রঃ)

ফায়েদা : ইমাম আবুন নু‘মান সম্পর্কে হাফেয যাহাবী বলেছেন, تغير قبل موته فما حدَّث ‘মৃত্যুর পূর্বে তার মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। তবে তিনি (এ অবস্থায়) কোন হাদীছ বর্ণনা করেননি’।[2]

প্রতীয়মান হ’ল যে, ইমাম আবুন নু‘মানের বর্ণনাসমূহের উপরে ইখতিলাত্বের অভিযোগ ভুল ও প্রত্যাখ্যাত ।

৮৭. জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী (সম্ভবতঃ হাফেয ইবনু হাযম আন্দালুসী থেকে উদ্ধৃত করতে গিয়ে) বলেছেন,ولم أجد أحدًا ممن يوصف بالعلم قديمًا وحديثًا يستجيز التقليد ولا يأمر به وكذلك ابن وهب وابن الماجشون والمغيرة بن أبى حازم ومطرف وابن كنانة لم يقلّدوا شيخهم مالكًا فى كل ما قال : بل خالفوه فى مواضع واختاروا غير قوله- ‘আমি প্রাচীন ও আধুনিক যুগের কোন আলেমকে পাইনি, যিনি তাক্বলীদকে জায়েয বলেন এবং এ ব্যাপারে হুকুম দেন। অনুরূপভাবে ইবনু ওয়াহাব, ইবনুল মাজিশূন, মুগীরাহ বিন আবু হাযিম, মুত্বাররিফ ও (ওছমান বিন ঈসা) ইবনু কিনানাহ তাদের শিক্ষক মালেক-এর প্রত্যেকটি কথার তাক্বলীদ করেননি। বরং অনেক জায়গায় তারা তাঁর বিরোধিতা করেছেন এবং অন্যের বক্তব্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন’।[3]

জানা গেল যে, (সত্যপরায়ণ ইমাম) আবু মারওয়ান আব্দুল মালেক বিন আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন আবু সালামাহ আল-মাজিশূন আল-কুরাশী আত-তায়মী আল-মাদানী (মৃঃ ২১৩ হিঃ) সুয়ূত্বীর দৃষ্টিতে তাক্বলীদ করতেন না।

সতর্কীকরণ : মূলে মুগীরাহ বিন আবু হাযেম আছে। অথচ সঠিক হ’ল মুগীরাহ ও ইবনু আবী হাযেম। যেমনটি ইবনু হাযমের জাওয়ামিউস সীরাহ (১/৩২৬ পৃঃ) থেকে প্রতীয়মান হয়। মুগীরাহ দ্বারা উদ্দেশ্য ইবনু আব্দুর রহমান আল-মাখযূমী এবং ইবনু আবী হাযেম দ্বারা উদ্দেশ্য আব্দুল আযীয।

৮৮. সত্যবাদী, ফক্বীহ, মুগীরাহ বিন আব্দুর রহমান ইবনুল হারিছ বিন আব্দুল্লাহ বিন ‘আইয়াশ আল-মাখযূমী আল-মাদানী (মৃঃ ১৮৮ হিঃ) সুয়ূত্বীর মতে কারো তাক্বলীদ করতেন না (৮৭ নং উক্তি দ্রঃ)

৮৯. সত্যবাদী, ফক্বীহ, আব্দুল আযীয বিন আবু হাযেম আল-মাদানী (মৃঃ ১৮৪ হিঃ) সুয়ূত্বীর মতে তাক্বলীদ করতেন না (৮৭ নং উক্তি দ্রঃ)

৯০. ইমাম মালেকের ভাগ্নে, নির্ভরযোগ্য ইমাম আবু মুছ‘আব মুত্বাররিফ বিন আব্দুল্লাহ বিন মুত্বাররিফ আল-ইয়াসারী আল-মাদানী (মৃঃ ২২০ হিঃ) সুয়ূতবীর মতে তাক্বলীদ করতেন না (৮৭ নং উক্তি দ্রঃ)

৯১. হাফেয ইবনু হাযম আন্দালুসী বলেছেন,ثم أصحاب الشافعي، وكانوا مجتهدين غير مقلدين كأبي يعقوب البويطي وإسماعيل بن يحيى المزني- ‘অতঃপর ইমাম শাফে‘ঈর ছাত্রগণ। তারা মুজতাহিদ ও গায়ের মুক্বাল্লিদ ছিলেন। যেমন- আবু ইয়াকূব আল-বুওয়ায়ত্বী ও ইসমাঈল বিন ইয়াহ্ইয়া আল-মুযানী’।[4]

প্রতীয়মান হ’ল যে, ইবনু হাযমের নিকটে ইমাম শাফে‘ঈ (রহঃ)-এর শিষ্য আবু ইয়াকূব ইউসুফ বিন ইয়াহ্ইয়া আল-মিছরী আল-বুওয়ায়ত্বী (নির্ভরযোগ্য ইমাম, ফক্বীহদের সর্দার, মৃঃ ২৩১ হিঃ) গায়ের মুক্বাল্লিদ ছিলেন।

৯২. ছিক্বাহ, ইমাম, ফক্বীহ আবু ইবরাহীম ইসমাঈল বিন ইয়াহ্ইয়া বিন ইসমাঈল আল-মুযানী আল-মিসরী (মৃঃ ২৬৪ হিঃ) ইবনু হাযমের কথামতে গায়ের মুক্বাল্লিদ ছিলেন (৪ ও ৯১ নং উক্তি দ্রঃ)

আবু আলী আহমাদ বিন আলী ইবনুল হাসান বিন শু‘আইব বিন যিয়াদ আল-মাদায়েনী (মৃঃ ৩২৭ হিঃ) হাসানুল হাদীছ। জমহূর তাকে ছিক্বাহ বলেছেন। তিনি স্বীয় শিক্ষক ইমাম মুযানী (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, ‘যে ব্যক্তি তাক্বলীদের ফায়ছালা করে তাকে বলা যায়, তোমার ফায়ছালার কোন দলীল কি তোমার কাছে আছে? যদি সে বলে, হ্যাঁ, তাহ’লে সে তাক্বলীদকে বাতিল করে দিল। কেননা দলীল সেই ফায়ছালাকে তার নিকটে আবশ্যক করেছে, তাক্বলীদ নয়। আর যদি সে বলে, দলীল ছাড়া। তবে তাকে বলা যায়, তাহ’লে তুমি কিসের জন্য রক্ত প্রবাহিত করেছ, লজ্জাস্থানকে হালাল করে দিয়েছ এবং সম্পদসমূহ নষ্ট করেছ? অথচ আল্লাহ তোমার উপরে এসব হারাম করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তুমি দলীল ছাড়াই তা হালাল করে দিলে’?[5]

এই দীর্ঘ উদ্ধৃতিতে ইমাম মুযানী অত্যন্ত সুন্দর ও সাধারণের বোধগম্য পদ্ধতিতে তাক্বলীদকে বাতিল সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন!

৯৩. মালাকাহর খতীব আল্লামা আবু মুহাম্মাদ আব্দুল আযীম বিন আব্দুল্লাহ বিন আবুল হাজ্জাজ ইবনুশ শায়খ বালাবী (মৃঃ ৬৬৬ হিঃ) সম্পর্কে হাফেয যাহাবী এবং খলীল বিন আয়বাক আছ-ছাফাদী দু’জনেই বলেছেন, وله اختيارات لا يقلد فيها أحدا- ‘তার নির্দিষ্ট কিছু মাসআলা ছিল। সেগুলোতে তিনি কারো তাক্বলীদ করতেন না’।[6]

৯৪. সুয়ূত্বী হাফেয ইবনু হাযম থেকে বর্ণনা করেছেন, ومن آخر ما أدركنا على ذلك شيخنا أبو عمر الطلمنكى فما كان يقلّد أحدًا وذهب إلى قول الشافعي فى بعض المسائل والآن محمد بن عوف لايقلّد أحدًا وقال بقول الشافعي فى بعض المسائل- ‘আমরা তাক্বলীদ না করার উপর সর্বশেষ যাদেরকে পেয়েছি তাদের মধ্যে আমাদের উস্তাদ আবু ওমর আত-ত্বলামানকী রয়েছেন। তিনি কারো তাক্বলীদ করতেন না। তিনি কতিপয় মাসআলায় শাফে‘ঈর মতাবলম্বন করেছেন। আর বর্তমানে রয়েছেন মুহাম্মাদ বিন ‘আওফ, যিনি কারো তাক্বলীদ করেন না। তিনি কতিপয় মাসআলায় শাফে‘ঈর কথামত ফৎওয়া দিয়েছেন’।[7]

প্রমাণিত হ’ল যে, ছিক্বাহ, ইমাম, হাফেয আবু ওমর আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ আল-মু‘আফিরী আল-আন্দালুসী আত-ত্বলামানকী (মৃঃ ৪২৯ হিঃ) হাফেয ইবনু হাযমের দৃষ্টিতে কারো তাক্বলীদ করতেন না।

ইমাম ত্বলামানকী সম্পর্কে হাফেয যাহাবী বলেছেন, الإمام المقرئ المحقق المحدث الحافظ الأثري- ‘তিনি ইমাম, ক্বারী, মুহাক্কিক, মুহাদ্দিছ, (হাদীছের) হাফেয ও আছারী’।[8]

৯৫. কতিপয় হানাফী ও গায়ের হানাফী ফক্বীহ আবু বকর আল-ক্বাফফাল, আবু আলী এবং ক্বাযী হুসায়েন থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তারা বলেছেন,لسنا مقلّدين للشافعي بل وافق رأينا رأيه- ‘আমরা শাফে‘ঈর মুক্বাল্লিদ নই।  বরং  আমাদের

মত তাঁর মতের সাথে মিলে গিয়েছে’।[9]

জানা গেল যে, (এই আলেমদের নিকটে) আল্লামা আবু বকর আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন আব্দুল্লাহ আল-ক্বাফফাল আল-মারওয়াযী আল-খুরাসানী আশ-শাফে‘ঈ (মৃঃ ৪১৭ হিঃ) মুক্বাল্লিদদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।

৯৬. পূর্বের উদ্ধৃতিসমূহ দ্বারা প্রমাণিত রয়েছে যে, ক্বাযী আবু আলী হুসায়েন আল-মারওয়াযী আশ-শাফে‘ঈ (মৃঃ ৪৬২ হিঃ) মুক্বাল্লিদদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না (৯৫ নং উক্তি দ্রঃ)

৯৭. আবু আলী আল-হাসান (আল-হুসায়েন) বিন মুহাম্মাদ বিন শু‘আইব আস-সিনজী আল-মারওয়াযী আশ-শাফে‘ঈ (মৃঃ ৪৩২ হিঃ) মুক্বাল্লিদদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না (৯৫ নং উক্তি দ্রঃ)

প্রতীয়মান হ’ল যে, যে সকল আলেমকে শাফে‘ঈ বলা হয়, তারা  তাদের  ঘোষণা এবং সাক্ষ্য অনুযায়ী মুক্বাল্লিদদের  অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।[10]

৯৮. শায়খুল ইসলাম হাফেয তাক্বিউদ্দীন আবুল আববাস আহমাদ বিন আব্দুল হালীম আল-হার্রানী ওরফে ইবনু তায়মিয়াহ (মৃঃ ৭২৮ হিঃ) বলেছেন, إنَّمَا أَتَنَاوَلُ مَا أَتَنَاوَلُهُ مِنْهَا عَلَى مَعْرِفَتِي بِمَذْهَبِ أَحْمَدَ، لَا عَلَى تَقْلِيدِي لَهُ- ‘আহমাদের মাযহাব হ’তে আমি কেবলমাত্র ঐ বিষয়গুলি গ্রহণ করি, যেগুলি আমার জানা আছে। আমি তার তাকবলীদ করি না’।[11]

হাফেয ইবনু তায়মিয়াহ বলেছেন, ‘যদি কেউ এটা বলে যে, সাধারণ মানুষের উপর অমুক অমুকের তাক্বলীদ ওয়াজিব, তাহ’লে এটা কোন মুসলমানের কথা নয়’।[12]

তিনি আরো বলেন, ‘কোন একজন মুসলমানের উপরেও আলেমদের মধ্য হ’তে কোন একজন নির্দিষ্ট আলেমের সকল কথায় তাক্বলীদ ওয়াজিব নয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ব্যতীত কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির মাযহাবকে অাঁকড়ে ধরা কোন একজন মুসলমানের উপর ওয়াজিব নয় যে, সব বিষয়ে তারই আনুগত্য শুরু করে দিবে’।[13]

হাফেয ইবনু তায়মিয়াহ সম্পর্কে  তার  ছাত্র হাফেয  যাহাবী বলেছেন, المجتهد المفسر ‘তিনি একজন মুফাসসির ও মুজতাহিদ’।[14]

৯৯. হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম আল-জাওযিইয়াহ (মৃঃ ৭৫১ হিঃ) তাক্বলীদের খন্ডনে ‘ই‘লামুল মুওয়াক্কিঈন ‘আন রবিবল ‘আলামীন’ নামে একটি জবরদস্ত কিতাব লিখেছেন এবং বলেছেন, وَإِنَّمَا حَدَثَتْ هَذِهِ الْبِدْعَةُ فِي الْقَرْنِ الرَّابِعِ الْمَذْمُومِ عَلَى لِسَانِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ‘আর (তাক্বলীদের) এই বিদ‘আত চতুর্থ হিজরীতে আবিষ্কৃত হয়েছে। যেটি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যবানে নিন্দিত’।[15]

আহলেহাদীছদের নিকটে সালাফে ছালেহীনের ঐক্যমত পোষণকৃত বুঝের আলোকে কুরআন, হাদীছ ও ইজমার উপরে আমল হওয়া উচিত। আর তাক্বলীদ জায়েয নয়। যেহেতু হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িমও এই মাসলাকেরই প্রবক্তা ও আমলকারী ছিলেন, সেহেতু যাফর আহমাদ থানবী দেওবন্দী স্বীয় খাছ দেওবন্দী ধাঁচে বলেছেন,لأنا رأينا أن ابن القيم الذى هو الأب لنوع هذه الفرقة- ‘কেননা আমরা দেখেছি যে, ইবনুল ক্বাইয়িমই হ’লেন এই ধরনের (অর্থাৎ আহলেহাদীছ) ফিরক্বার জনক’।[16]

১০০. হাফেয আবূ আব্দুল্লাহ শামসুদ্দীন মুহাম্মাদ বিন আহমাদ বিন ওছমান আয-যাহাবী (মৃঃ ৭৪৮ হিঃ) বহু জায়গায় স্পষ্টভাবে তাক্বলীদের বিরোধিতা করেছেন এবং বলেছেন,

 وكل إمام يؤخذ من قوله ويُترك إلا إمام المتقين الصادق المصدوق الأمين المعصوم صلوات الله وسلامه عليه، فيا لله العجب من عالم يقلد دينه إماما بعينه في كل ما قال مع علمه بما يرد على مذهب إمامه من النصوص النبوية فلا قوة إلا بالله-

‘মুত্তাকীদের নেতা, সত্যবাদী, সত্যায়নকৃত, বিশ্বস্ত, নিষ্পাপ নবী (ছাঃ) ব্যতীত প্রত্যেক ইমামের কথা গ্রহণ ও বর্জন করা যায়। আল্লাহর কসম! এটা আশ্চর্যজনক যে,  একজন আলেম তার দ্বীনের ক্ষেত্রে কোন নির্দিষ্ট ইমামের প্রত্যেক কথায় তাক্বলীদ করে। অথচ সে জানে যে, ছহীহ হাদীছসমূহ তার ইমামের মাযহাবকে বাতিল করে দেয়। অতঃপর নেই কোন শক্তি আল্লাহ ব্যতীত’।[17]

হাফেয  যাহাবীর উক্তির শেষে ‘(লা হাওলা) ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ লেখা একথার দলীল যে, তাঁর নিকটে তাক্বলীদ একটি শয়তানী কাজ। এজন্য আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা তিনি আমাদেরকে এই শয়তানী কাজ থেকে সর্বদা রক্ষা করুন! আমীন!! (১১নং উক্তি দ্রঃ)

আমরা আমাদের দাবী এবং তাক্বলীদ শব্দের শর্ত অনুযায়ী মুসলিম উম্মাহর একশ (১০০) আলেমের এমন উদ্ধৃতিসমূহ পেশ করেছি, যারা স্পষ্টভাবে তাক্বলীদ করতেন না অথবা তাক্বলীদের বিরোধী ছিলেন। আমাদের জানা মতে কোন একজন বিশ্বস্ত, সত্যবাদী, ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন ও নির্ভরযোগ্য ইমাম থেকে প্রচলিত তাক্বলীদের আবশ্যকতা অথবা এর উপরে আমল প্রমাণিত নেই। আর দুনিয়ার কোন ব্যক্তি এই গবেষণার বিপরীতে কোন নির্ভরযোগ্য ইমাম থেকে তাক্বলীদের অপরিহার্যতা বা এর উপরে আমলের একটি উদ্ধৃতিও পেশ করতে পারবে না। وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا ‘যদিও তারা পরস্পরের সাহায্যকারী হয়’ (বনী ইসরাঈল ১৭/৮৮)আল-হামদুলিল্লাহ।

সতর্কীকরণ : একশ উদ্ধৃতিসমৃদ্ধ এই গবেষণার উদ্দেশ্য আদৌ এটা নয় যে, এই প্রবন্ধে যে সকল আলেমের উল্লেখ নেই বা নাম নেই, তারা তাক্বলীদ করতেন। বরং  তাক্বলীদের নিষিদ্ধতার উপরে তো খায়রূল কুরূনের (স্বর্ণ যুগ) ইজমা রয়েছে।[18]

এরা ছাড়া আরো অনেক আলেমও ছিলেন, যাদের থেকে সুস্পষ্টভাবে তাক্বলীদ শব্দ প্রয়োগের সাথে সাথে এর (তাক্বলীদ) নিষিদ্ধতা ও প্রত্যাখ্যান প্রমাণিত রয়েছে। যেমন-

(১) জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী (মৃঃ ৯১১ হিঃ) তাক্বলীদের  খন্ডনে ‘আর-রাদ্দু ‘আলা মান উখলিদা ইলাল  ‘আরয ওয়া জাহেলা ‘আন্নাল ইজতিহাদা ফী কুল্লি আছরিন ফারয’ (الرد على من أخلد إلى الأرض وجهل أن الاجتهاد فى كل عصر فرض) শিরোনামে একটি গুরুত্বপূর্ণ  গ্রন্থ লিখেছেন এবং এতে باب فساد التقليد ‘তাক্বলীদের ফিতনা’ অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন। আর হাফেয ইবনু হাযম থেকে সমর্থনমূলকভাবে উদ্ধৃত করেছেন যে, التقليد حرام ‘তাক্বলীদ হারাম’ (ঐ, পৃঃ ১৩১)

সুয়ূত্বী তাঁর অন্য একটি গ্রন্থে বলেছেন,

والذى يجب أن يقال : كل من انتسب إلى إمام غير رسول الله صلى الله عليه وسلم يوالى على ذلك ويعادى عليه فهو مبتدع خارج عن السنة والجماعة سواء كان فى الأصول أو الفروع-

‘এটা বলা ওয়াজিব (ফরয) যে, প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি যে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ব্যতীত অন্য কোন ইমামের দিকে সম্বন্ধিত হয়ে যায় এবং এই সম্বন্ধকরণের উপর সে বন্ধুত্ব এবং শত্রুতা পোষণ করে, তবে সে বিদ‘আতী এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত থেকে খারিজ। চাই (এই সম্বন্ধ) মূলনীতিতে হোক বা শাখা-প্রশাখাগত বিষয়ে হোক’।[19]

(২) যায়লাঈ (মৃঃ ৭৪৩ হিঃ/১৩৪৩ খ্রিঃ) হানাফী (!) বলেছেন, فالمقلد ذهل والمقلد جهل ‘মুক্বাল্লিদ ভুল করে এবং মুক্বাল্লিদ মূর্খতা করে’।[20]

(৩) বদরুদ্দীন ‘আয়নী (৭৬২-৮৫৫ হিঃ) হানাফী (!) বলেছেন,فالمقلد ذهل والمقلد جهل وآفة كل شيء من التقليد- ‘মুক্বাল্লিদ ভুল করে এবং মুক্বাল্লিদ মূর্খতা করে। আর তাক্বলীদের কারণে সকল বস্ত্তর বিপদ’।[21]

(৪) ইমাম ত্বাহাবী (২৩৮-৩২১ হিঃ) হানাফী (!) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন, وهل يقلد إلا عصبي أو غبي ‘গোঁড়া ও আহম্মক ব্যতীত কেউ তাক্বলীদ করে কি’?[22]

(৫) আবূ হাফছ ইবনুল মুলাক্কিন (মৃঃ ৮০৪ হিঃ) বলেছেন,وغالب ذلك إنما يقع (من) التقليد، ونحن (براء منه) بحمد الله ومنه- ‘সাধারণতঃ তাক্বলীদের কারণে এমন কথাবার্তা হয়। আর আমরা আল্লাহর প্রশংসা ও তাঁর অনুগ্রহের সাথে তা থেকে মুক্ত’।[23]

(৬) আবূ যায়েদ কাযী ওবায়দুল্লাহ আদ-দাবূসী (মৃঃ ৪৩০ হিঃ/১০৩৯ খ্রিঃ) হানাফী (!) বলেছেন, ‘তাক্বলীদের সারমর্ম এই যে, মুক্বাল্লিদ নিজেকে চতুষ্পদ জন্তুর সাথে একাকার করে দেয়...। যদি মুক্বাল্লিদ নিজেকে এজন্য জন্তু বানিয়ে নিয়েছে যে, সে বিবেক ও অনুভূতি শূন্য। তাহ’লে তার (মস্তিষ্কের) চিকিৎসা  করানো উচিৎ’।[24]

(৭) বড় আলেম, শায়খ মুহাম্মাদ ফাখের বিন মুহাম্মাদ ইয়াহ্ইয়া বিন মুহাম্মাদ আমীন আল-আববাসী আস-সালাফী এলাহাবাদী (মৃঃ ১১৬৪ হিঃ) তাক্বলীদ করতেন না। বরং কুরআন ও হাদীছের দলীলের উপরে আমল করতেন এবং নিজে ইজতিহাদ করতেন।[25]

তিনি (ফাখের এলাহাবাদী) বলেছেন, জমহূর-এর নিকটে নির্দিষ্ট কোন মাযহাবের তাক্বলীদ করা জায়েয নেই। বরং ইজতিহাদ ওয়াজিব...। তাক্বলীদের বিদ‘আত হিজরী চতুর্থ শতাব্দীতে সৃষ্টি হয়েছে’।[26]

আলেম কুরআন, হাদীছ, ইজমা ও সালাফে ছালেহীনের আছার দ্বারা ইজতিহাদ করবেন। অন্যদিকে জাহেলের ইজতিহাদ এই যে, সে ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন আলেমের কাছ থেকে কুরআন ও হাদীছের মাসআলাগুলি জিজ্ঞাসা করে সেগুলির উপর আমল করবে। আর এটা তাক্বলীদ নয়।

(৮) আবুবকর অথবা আবূ আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আহমাদ বিন আব্দুল্লাহ ওরফে ইবনু খুওয়াইয মিনদাদ আল-বাছরী আল-মালেকী (হিজরী ৪র্থ শতাব্দীর শেষে মৃত) বলেছেন,

اَلتَّقْلِيْدُ مَعْنَاهُ فِي الشَّرْعِ الرُّجُوْعُ إِلَى قَوْلٍ لاَ حُجَّةَ لِقَائِلِهِ عَلَيْهِ، وَهَذَا مَمْنُوْعٌ مِنْهُ فِي الشَّرِيْعَةِ، وَالِاتِّبَاعُ مَا ثَبَتَ عَلَيْهِ حُجَّةٌ-

‘শরী‘আতে তাক্বলীদের অর্থ হ’ল, এমন ব্যক্তির কথার দিকে ধাবিত হওয়া যে বিষয়ে তার কোন দলীল নেই। আর এটি শরী‘আতে নিষিদ্ধ। পক্ষান্তরে ইত্তেবা হ’ল যেটি দলীল দ্বারা সাব্যস্ত’।[27]

সতর্কীকরণ : হাফেয ইবনু আব্দুল বার্র এই উক্তিটি উল্লেখ করেছেন এবং কোন প্রত্যুত্তর দেননি। সুতরাং প্রতীয়মান হ’ল যে, এটি ইবনু খুওয়াইয মিনদাদের অপ্রচলিত উক্তিসমূহের মধ্য হ’তে নয়।[28]

(৯) সমকালীনদের মধ্য থেকে ইয়েমনের প্রসিদ্ধ শায়খ মুক্ববিল বিন হাদী আল-ওয়াদি‘ঈ বলেছেন, ‘তাক্বলীদ হারাম। কোন মুসলমানের জন্য  জায়েয নয় যে, সে আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে (কারো) তাক্বলীদ করবে’।[29]

(১০) সঊদী আরবের প্রধান বিচারপতি (পরে গ্র্যান্ড মুফতী) শায়খ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (১৯১৩-১৯৯৯ খ্রিঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহর প্রশংসা যে আমি গোঁড়া নই। তবে আমি কুরআন ও হাদীছ অনুযায়ী ফায়ছালা করি। আমার ফৎওয়া সমূহের ভিত্তি ‘আল্লাহ বলেছেন’ এবং রাসূল বলেছেন’-এর উপর। হাম্বলী বা অন্যদের তাক্বলীদের উপরে নয়’।[30]

(১১) ইবনুল জাওযীর তাক্বলীদ না করার ব্যাপারে দেখুন তাঁর ‘আল-মুশকিলু মিন হাদীছিছ ছহীহায়েন’ (১/৮৩৩) গ্রন্থটি এবং মাসিক ‘আল-হাদীছ’ (হাযরো), ৭৩ সংখ্যা।

ব্রেলভীদের পীর সুলতান বাহূ বলেছেন, ‘চাবি হ’ল সরাসরি সংঘবদ্ধতা। আর তাক্বলীদ হ’ল অসংঘবদ্ধতা এবং পেরেশানী। বরং তাক্বলীদপন্থী জাহিল এবং পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে থাকে’।[31]

সুলতান বাহূ আরো বলেছেন, ‘তাওহীদপন্থীরা হেদায়াতপ্রাপ্ত, সাহায্যপ্রাপ্ত এবং তাহকীককারী হয়। তাক্বলীদপন্থীরা দুনিয়াদার, অভিযোগকারী এবং মুশরিক হয়’।[32]

একশটি উদ্ধৃতির মধ্যে উল্লেখিত আলেমগণ এবং পরে উল্লেখিতদের মোকাবেলায় দেওবন্দী ও ব্রেলভী ফিরক্বার আলেমরা এটা বলেন যে, তাক্বলীদ ওয়াজিব এবং অতীত কালের আলেমগণ মুক্বাল্লিদ ছিলেন।

এই তাক্বলীদপন্থীদের চারটি উদ্ধৃতি এবং শেষে সেগুলির জবাব পেশ করা হ’ল-

(১) মুহাম্মাদ ক্বাসেম নানূতুভী দেওবন্দী (১২৪৮-১২৯৭ হিঃ) বলেছেন, ‘দ্বিতীয় এই যে, আমি ইমাম আবূ হানীফার মুক্বাল্লিদ। এজন্য আমার বিপরীতে আপনি যে কথাই বিরোধিতা স্বরূপ পেশ করবেন সেটা ইমাম আবূ হানীফার হতে হবে। এ কথা আমার উপর হুজ্জাত (দলীল) হবে না যে, শামী এটা লিখেছেন এবং দুর্রে মুখতার গ্রন্থকার এটা বলেছেন। আমি তাদের মুক্বাল্লিদ নই’।[33]

(২) মাহমূদ হাসান দেওবন্দী (১২৬৮-১৩৩৯ হিঃ) একটি মাসআলা সম্পর্কে বলেছেন, ‘হক ও ইনছাফ এই যে, এই মাসআলায় শাফে‘ঈর মত অগ্রগণ্য। আর আমরা মুক্বাল্লিদ। আমাদের উপর আমাদের ইমাম আবূ হানীফার তাক্বলীদ ওয়াজিব। আল্লাহই ভালো জানেন’।[34]

(৩) আহমাদ রেযা খান ব্রেলভী (১২৭২-১৩৪০ হিঃ)أجلى الأعلام أن الفتوى مطلقا على قول الإمام শিরোনামে একটি পুস্তিকা লিখেছেন। যার অর্থ ‘ফৎওয়া কেবলমাত্র ইমাম আবূ হানীফার কথার উপরেই হবে’!

তাক্বলীদ সম্পর্কে মিথ্যা বলতে গিয়ে এবং ধোঁকা দিতে গিয়ে আহমাদ রেযা খান ব্রেলভী বলেছেন, ‘বিশেষতঃ তাক্বলীদের মাসআলায় তাদের মাযহাব অনুযায়ী এগারোশ বছরের আইম্মায়ে দ্বীন, কামেল আলেম-ওলামা এবং আওলিয়ায়ে আরিফীন (আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন) সবাই মুশরিক আখ্যা পাচ্ছেন। আল্লাহর কাছে পানাহ চাই’।[35]

(৪) আহমাদ ইয়ার নাঈমী ব্রেলভী বলেছেন, ‘আমাদের দলীল এই বর্ণনাগুলি নয়। আমাদের আসল দলীল তো ইমামে আযম আবূ হানীফা (রহঃ)-এর আদেশ’।[36]

নিবেদন রইল যে, এগারোশ বছরে কোন একজন ছিক্বাহ ও ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন আলেম থেকে আপনাদের প্রচলিত তাক্বলীদের আবশ্যকতা অথবা বৈধতার কথা বা কর্মে কোন প্রমাণ নেই। আমার পক্ষ থেকে সকল দেওবন্দী ও ব্রেলভীকে চ্যালেঞ্জ থাকল যে, এই গবেষণামূলক প্রবন্ধে উল্লেখিত একশটি নির্ভরযোগ্য উদ্ধৃতির মোকাবেলায় খায়রুল কুরূনের ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন সালাফে ছালেহীন থেকে স্রেফ দশটি উদ্ধৃতি পেশ করুক। যেখানে এটি লিখিত আছে যে, মুসলমানদের উপরে চাই তারা (আলেম হোক বা সাধারণ মানুষ) ইমাম চতুষ্টয় (ইমাম আবূ হানীফা, মালেক, শাফে‘ঈ ও আহমাদ)-এর মধ্য থেকে স্রেফ একজনের তাক্বলীদ ওয়াজিব এবং অবশিষ্ট তিনজনের (তাক্বলীদ) হারাম। আর মুক্বাল্লিদের জন্য এটা জায়েয নয় যে, সে স্বীয় ইমামের কথাকে বর্জন করে কুরআন ও হাদীছের উপর আমল করবে। যদি থাকে তবে উদ্ধৃতি পেশ করুক।

আর যদি এমন কোন প্রমাণ না থাকে এবং আদৌ নেই। বরং আমার উল্লেখিত উদ্ধৃতিসমূহ এই বানোয়াট তাক্বলীদী মূর্তিকে টুকরো টুকরো করে ধ্বংস করে দিয়েছে। অতএব এগারো শত বছরের আলেমদের নাম বলে মিথ্যা ভয় দেখাবেন না। খায়রুল কুরূনের সকল সালাফে ছালেহীনের ইজমা এবং পরবর্তী জমহূর সালাফে ছালেহীনের তাক্বলীদ বিরোধিতা এবং খন্ডন করা এ কথার দলীল যে, এই মাসআলাটি (তাক্বলীদ করা) সালাফে ছালেহীনের একেবারেই বিপরীত। যদি প্রচলিত তাক্বলীদকে ওয়াজিব বলা হয় তাহলে কুরআন, হাদীছ ও ইজমার বিরোধিতা করার সাথে সাথে চৌদ্দশত বছরের সালাফে ছালেহীনের  বিরোধিতা এবং খন্ডন আবশ্যক হয়ে যায়। যা মূলতঃ বাতিল। অমা ‘আলায়না ইল্লাল বালাগ।

কতিপয়  ফায়েদা :

(১) আল্লামা সুয়ূত্বী (মৃঃ ৯১১ হিঃ) বলেছেন, والذى يجب أن يقال : كل من انتسب إلى إمام غير رسول الله صلى الله عليه وسلم يوالى على ذلك ويعادى عليه فهو مبتدع خارج عن السنة والجماعة سواء كان فى الأصول أو الفروع- ‘এটা বলা ওয়াজিব (ফরয) যে, প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি যে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ব্যতীত অন্য কোন ইমামের দিকে সম্বন্ধিত হয়ে যায় এবং এই সম্বন্ধকরণের উপর সে বন্ধুত্ব এবং শত্রুতা পোষণ করে, তবে সে বিদ‘আতী এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত থেকে খারিজ। চাই (এই সম্বন্ধ) মূলনীতিতে হোক বা শাখা-প্রশাখাগত বিষয়ে হোক’।[37]

(২) ইমাম হাকাম বিন উতায়বা (মৃঃ ১১৫ হিঃ) বলেছেন, لَيْسَ أَحَدٌ مِنْ خَلْقِ اللهِ إِلَّا يُؤْخَذُ مِنْ قَوْلِهِ وَيُتْرَكُ إِلَّا النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ‘নবী (ছাঃ) ব্যতীত আল্লাহর সৃষ্টিকুলের মধ্যে এমন কেউ নেই যার কথা গ্রহণ বা বর্জন করা যাবে’।[38]

আহলেহাদীছ কখন থেকে আছে আর দেওবন্দী ও ব্রেলভী মতবাদের সূচনা কখন হয়েছে :

প্রশ্ন : আমরা এটা শুনতে থাকি যে, আহলেহাদীছগণ ইংরেজদের আমলে শুরু হয়েছে। পূর্বে এদের কোন অস্তিত্ব ছিল না। দয়া করে পাকিস্তান ও হিন্দুস্তানের অতীতকালের আহলেহাদীছ আলেমদের নাম সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ লিখবেন। ধন্যবাদ। -মুহাম্মাদ ফাইয়ায দামানভী, ব্রাডফোর্ড, ইংল্যান্ড।

জবাব : যেভাবে আরবী ভাষায় ‘আহলুস সুন্নাহ’ অর্থ সুন্নাতপন্থী, সেভাবে আহলুল হাদীছ অর্থ হাদীছপন্থী। যেভাবে সুন্নাতপন্থী দ্বারা ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন সুন্নী ওলামা এবং তাদের অনুসারী ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন সাধারণ জনগণকে বুঝায়, সেভাবে হাদীছপন্থী দ্বারা ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন মুহাদ্দেছীনে কেরাম এবং তাদের অনুসারী ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন সাধারণ জনগণকে বুঝায়।

স্মর্তব্য যে, আহলে সুনণাত এবং আহলেহাদীছ একই দলের দু’টি গুণবাচক নাম মাত্র। ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন মুহাদ্দেছীনে কেরামের কয়েকটি শ্রেণী রয়েছে। যেমন-

(১) ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)। (২) তাবেঈনে এযাম (রহঃ)। (৩) তাবে তাবেঈন। (৪) আতবা‘এ তাবে তাবেঈন (তাবে তাবেঈন-এর শিষ্যগণ)। (৫) হাদীছের হাফেযগণ। (৬) হাদীছের রাবীগণ। (৭) হাদীছের ব্যাখ্যাকারীগণ এবং অন্যান্যগণ। আল্লাহ তাদের উপর রহম করুন!

ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন মুহাদ্দিছগণের ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন জনগণের কয়েকটি শ্রেণী রয়েছে। যেমন-

(১) উচ্চশিক্ষিত। (২) মধ্যম শিক্ষিত। (৩) সামান্য শিক্ষিত  এবং (৪) নিরক্ষর সাধারণ মানুষ।

এই সর্বমোট এগারোটি (৭+৪) শ্রেণীকে আহলেহাদীছ বলা হয়। আর তাদের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলি নিম্নরূপ-

১. কুরআন, হাদীছ ও ইজমায়ে উম্মতের উপরে আমল করা।

২. কুরআন, হাদীছ ও ইজমার বিপরীতে কারো কথা না মানা।

৩. তাক্বলীদ না করা।

৪. আল্লাহ তা‘আলাকে সাত আসমানের ঊর্ধ্বে স্বীয় আরশের উপরে সমুন্নীত হিসাবে মানা। যেটি তাঁর মর্যাদার উপযোগী সেভাবে।

৫. ঈমানের অর্থ হৃদয়ে বিশ্বাস, মুখে স্বীকৃতি এবং কর্মে বাস্তবায়ন।

৬. ঈমানের  হরাস-বৃদ্ধির আক্বীদা পোষণ করা।

৭. কুরআন ও হাদীছকে সালাফে ছালেহীনের বুঝ অনুযায়ী অনুধাবন করা এবং এর বিপরীতে সকলের কথা প্রত্যাখ্যান করা।

৮. সকল ছাহাবী,  নির্ভরযোগ্য ও সত্যবাদী তাবেঈন, তাবে তাবেঈন, আতবা‘এ তাবে তাবেঈন এবং সকল বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন মুহাদ্দিছগণের প্রতি ভালবাসা পোষণ করা ইত্যাদি।

ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (৬৬১-৭২৮ হিঃ) বলেছেন, صَاحِبُ الْحَدِيثِ عِنْدَنَا مَنْ يَسْتَعْمِلُ الْحَدِيثَ ‘আমাদের নিকটে আহলেহাদীছ ঐ ব্যক্তি যিনি হাদীছের উপরে আমল করেন’।[39]

হাফেয  ইবনু  তায়মিয়াহ (৬৬১-৭২৮) বলেছেন,

وَنَحْنُ لَا نَعْنِي بِأَهْلِ الْحَدِيثِ الْمُقْتَصِرِينَ عَلَى سَمَاعِهِ أَوْ كِتَابَتِهِ أَوْ رِوَايَتِهِ بَلْ نَعْنِي بِهِمْ: كُلَّ مَنْ كَانَ أَحَقَّ بِحِفْظِهِ وَمَعْرِفَتِهِ وَفَهْمِهِ ظَاهِرًا وَبَاطِنًا وَاتِّبَاعِهِ بَاطِنًا وَظَاهِرًا-

‘আমরা আহলেহাদীছ বলতে কেবল তাদেরকেই বুঝি না যারা হাদীছ শুনেছেন, লিপিবদ্ধ করেছেন বা বর্ণনা করেছেন। বরং আমরা আহলেহাদীছ দ্বারা ঐ সকল ব্যক্তিকে বুঝিয়ে থাকি, যারা হাদীছ মুখস্থকরণ এবং গোপন ও প্রকাশ্যভাবে তার জ্ঞান লাভ ও অনুধাবন এবং অনুসরণ করার অধিক হকদার’।[40]

হাফেয ইবনু তায়মিয়াহর উল্লেখিত উক্তি থেকেও আহলেহাদীছ-এর (আল্লাহ তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করুন) দু’টি শ্রেণী সাব্যস্ত হয় :

১. হাদীছের প্রতি আমলকারী মুহাদ্দেছীনে কেরাম।

২. হাদীছের উপরে আমলকারী সাধারণ জনগণ।

হাফেয ইবনু তায়মিয়াহ আরো বলেছেন,

وَبِهَذَا يَتَبَيَّنُ أَنَّ أَحَقَّ النَّاسِ بِأَنْ تَكُونَ هِيَ الْفِرْقَةُ النَّاجِيَةُ أَهْلُ الْحَدِيثِ وَالسُّنَّةِ؛ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ مَتْبُوعٌ يَتَعَصَّبُونَ لَهُ إلَّا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ-

‘আর এর মাধ্যমে সুস্পষ্ট হয় যে, লোকদের মধ্য হ’তে নাজাতপ্রাপ্ত ফিরক্বা হওয়ার সবচাইতে বেশী হকদার হ’ল আহলেহাদীছ ও আহলে সুন্নাহ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ব্যতীত তাদের এমন কোন অনুসরণীয় ব্যক্তি (ইমাম) নেই, যার জন্য তারা পক্ষপাতিত্ব করে’।[41]

হাফেয ইবনু কাছীর (৭০১-৭৭৪ হিঃ)يَوْمَ نَدْعُو كُلَّ أُنَاسٍ بِإِمَامِهِمْ ‘যেদিন আমরা ডাকব প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের নেতা সহ’ (ইসরা ৭১) আয়াতের ব্যাখ্যায় কতিপয় সালাফ (ছালেহীন) থেকে বর্ণনা করেছেন যে,هَذَا أَكْبَرُ شَرَفٍ لِأَصْحَابِ الْحَدِيثِ لِأَنَّ إِمَامَهُمُ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- ‘আহলেহাদীছদের জন্য এটাই সর্বোচ্চ মর্যাদা যে, তাদের একমাত্র ইমাম হলেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)’।[42] তাদেরকে ক্বিয়ামতের দিন তাদের ইমামের নামে ডাকা হবে।

সুয়ূত্বীও (৮৪৯-৯১১ হিঃ) লিখেছেন,لَيْسَ لِأَهْلِ الْحَدِيثِ مَنْقَبَةٌ أَشْرَفَ مِنْ ذَلِكَ لِأَنَّهُ لَا إِمَامَ لَهُمْ غَيْرُهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- ‘আহলেহাদীছদের জন্য এর চাইতে অধিক
মর্যাদাপূর্ণ আর কিছুই নেই। কেননা মুহাম্মাদ (ছাঃ) ছাড়া
তাদের আর কোন ইমাম নেই’।[43]

ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল, ইমাম বুখারী এবং ইমাম আলী  ইবনুল মাদীনী ও অন্যান্যগণ (আল্লাহ তাদের উপর রহম করুন) আহলুল হাদীছদেরকে ‘ত্বায়েফাহ মানছূরাহ’ অর্থাৎ সাহায্যপ্রাপ্ত দল হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন।[44]

ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের নির্ভরযোগ্য উস্তাদ ইমাম আহমাদ বিন সিনান আল-ওয়াসিত্বী (রহঃ) বলেছেন,  ‘দুনিয়াতে এমন কোন বিদ‘আতী নেই, যে আহলেহাদীছদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে না’।[45]

ইমাম কুতায়বা বিন সাঈদ আছ-ছাক্বাফী (মৃঃ ২৪০ হিঃ, বয়স ৯০ বছর) বলেছেন, ‘যখন তুমি কোন ব্যক্তিকে দেখবে যে সে আহলুল হাদীছের প্রতি ভালবাসা পোষণ করে তখন (বুঝে নিবে যে) এই ব্যক্তি সুন্নাতের উপরে আছে’।[46]

হাফেয ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) লিখেছেন, ‘মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, ইবনু খুযায়মাহ, আবু ইয়া‘লা, বাযযার প্রমুখ আহলেহাদীছ মাযহাবের উপরে ছিলেন। তারা কোন নির্দিষ্ট আলেমের মুক্বাল্লিদ ছিলেন না...’।[47]

উপরোল্লেখিত বক্তব্যসমূহ দ্বারা প্রতীয়মান হ’ল যে, আহলেহাদীছ দ্বারা উদ্দেশ্য হ’ল দু’টি দল-

(ক) ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন ও গায়ের মুক্বাল্লিদ সালাফে ছালেহীন ও সম্মানিত মুহাদ্দিছগণ।

(খ) সালাফে ছালেহীন ও সম্মানিত মুহাদ্দিছগণের (অনুসারী) ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন এবং গায়ের মুক্বাল্লিদ সাধারণ জনগণ।

লেখক তার একটি গবেষণা প্রবন্ধে শতাধিক ওলামায়ে ইসলামের উদ্ধৃতি পেশ করেছেন। যারা তাক্বলীদ করতেন না। তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনের নাম নিম্নরূপ : ইমাম মালেক, ইমাম শাফে‘ঈ, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল, ইমাম ইয়াহ্ইয়া বিন সাঈদ আল-ক্বাত্ত্বান, ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবূদাঊদ আস-সিজিস্তানী, ইমাম তিরমিযী, ইমাম ইবনু মাজাহ, ইমাম নাসাঈ, ইমাম আবুবকর ইবনু আবী শায়বাহ, ইমাম আবূদাঊদ আত্ব-ত্বায়ালিসী, ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের আল-হুমায়দী, ইমাম আবূ ওবায়েদ আল-ক্বাসেম বিন সাল্লাম, ইমাম সাঈদ বিন মানছূর, ইমাম বাক্বী বিন মাখলাদ, ইমাম মুসাদ্দাদ, ইমাম আবূ ই‘য়ালা আল-মূছিলী, ইমাম ইবনু খুযায়মাহ, ইমাম যুহলী, ইমাম ইসহাক্ব বিন রাহওয়াইহ, মুহাদ্দিছ বায্যার, মুহাদ্দিছ ইবনুল মুনযির, ইমাম ইবনু জারীর ত্বাবারী, ইমাম সুলতান ইয়াকূব বিন ইউসুফ আল-মার্রাকুশী আল-মুজাহিদ ও অন্যান্যগণ। তাদের সবার উপরে আল্লাহ রহম করুন! এ সকল আহলেহাদীছ আলেমগণ শত শত বছর পূর্বে পৃথিবী থেকে চলে গেছেন।

আবূ মানছূর আব্দুল ক্বাহির বিন তাহের আল-বাগদাদী সিরিয়া, জাযীরাহ (আরব উপদ্বীপ), আযারবাইজান, বাবুল আবওয়াব (মধ্য তুর্কিস্তান) প্রভৃতি সীমান্তের অধিবাসীদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘তারা সকলেই আহলে সুন্নাত-এর অন্তর্ভুক্ত আহলেহাদীছ মাযহাবের উপরে আছেন’।[48]

আবূ আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আহমাদ ইবনুল বান্না আল-বিশারী আল-মাক্বদেসী (মৃঃ ৩৮০ হিঃ) মুলতান সম্পর্কে  বলেছেন,مذاهبهم : أكثرهم أصحاب حديث  ‘তাদের মাযহাব হ’ল তারা অধিকাংশ আছহাবুল হাদীছ’।[49]

১৮৬৭ সালে দেওবন্দ মাদরাসা শুরুর মাধ্যমে দেওবন্দী ফিরক্বার সূচনা হয়েছে। আর ব্রেলভী ফিরক্বার প্রতিষ্ঠাতা আহমাদ রেযা খান ব্রেলভী ১৮৫৬ সালের জুনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

১. দেওবন্দী ও ব্রেলভী ফিরক্বা দু’টির জন্মের বহু পূর্বে শায়খ মুহাম্মাদ ফাখের বিন মুহাম্মাদ ইয়াহ্ইয়া বিন মুহাম্মাদ আমীন আল-আববাসী আস-সালাফী এলাহাবাদী (১১৬৪ হিঃ/১৭৫১ইং) তাক্বলীদ করতেন না। বরং কুরআন ও হাদীছের দলীলসমূহের উপরে আমল করতেন এবং নিজে ইজতিহাদ করতেন।[50]

২. শায়খ মুহাম্মাদ হায়াত বিন ইবরাহীম আস-সিন্ধী আল-মাদানী (১১৬৩ হিঃ/১৭৫০ইং) তাক্বলীদ করতেন না এবং তিনি আমল বিল-হাদীছ তথা হাদীছের উপরে আমলের  প্রবক্তা ছিলেন।

মুহাম্মাদ হায়াত সিন্ধী, মুহাম্মাদ ফাখের এলাহাবাদী এবং আব্দুর রহমান মুবারকপুরী তিনজন সম্পর্কে মাস্টার আমীন উকাড়বী [নাভির নীচে হাত বাঁধার হাদীছের আলোচনা প্রসঙ্গে] লিখেছেন, ‘এই তিন গায়ের মুক্বাল্লিদ ব্যতীত কোন হানাফী, শাফে‘ঈ, মালেকী, হাম্বলী এটাকে লেখকের ভুলও বলেননি’।[51]

৩. আবুল হাসান মুহাম্মাদ বিন আব্দুল হাদী আস-সিন্ধী আল-কাবীর (মৃঃ ১১৪১ হিঃ/১৭২৯ ইং) সম্পর্কে আমীন উকাড়বী লিখেছেন, ‘মূলতঃ এই আবুল হাসান সিন্ধী গায়ের মুক্বাল্লিদ ছিলেন’।[52]

এসব উদ্ধৃতি হিন্দুস্তানের উপরে ইংরেজদের দখলদারিত্ব কায়েমের বহু পূর্বের। এজন্য আপনি যাদের কাছ থেকে এটা শুনেছেন যে, ‘আহলেহাদীছগণ ইংরেজদের আমলে সৃষ্টি হয়েছে, এর আগে এদের কোন নাম-গন্ধ ছিল না’ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও অপবাদ।

রশীদ  আহমাদ লুধিয়ানবী দেওবন্দী লিখেছেন,  ‘কাছাকাছি দ্বিতীয়-তৃতীয় হিজরী শতকে হকপন্থীদের মাঝে শাখা-প্রশাখাগত মাসআলা সমূহের সমাধানকল্পে সৃষ্ট মতভেদের প্রেক্ষিতে পাঁচটি মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ চার মাযহাব ও আহলেহাদীছ। তৎকালীন সময় থেকে অদ্যাবধি উক্ত পাঁচটি তরীকার মধ্যেই হক সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে মনে করা হয়’।[53]

এই উক্তিতে লুধিয়ানবী ছাহেব আহলেহাদীছদের প্রাচীন হওয়া, ইংরেজদের আমলের বহু পূর্বে থেকে বিদ্যমান থাকা এবং হকপন্থী হওয়া স্বীকার করেছেন।

হাজী ইমদাদুল্লাহ মাক্কীর রূপক খলীফা মুহাম্মাদ আনওয়ারুল্লাহ ফারূক্বী ‘ফযীলত জঙ্গ’ লিখেছেন, ‘বস্ত্ততঃ সকল ছাহাবী আহলেহাদীছ ছিলেন’।[54]

মুহাম্মাদ ইদরীস কান্ধলবী দেওবন্দী লিখেছেন, ‘আহলেহাদীছ তো ছিলেন সকল ছাহাবী’।[55]

আমার পক্ষ থেকে সকল দেওবন্দী ও ব্রেলভীর নিকট জিজ্ঞাসা, ঊনবিংশ বা বিংশ ঈসায়ী শতকের (অর্থাৎ ইংরেজদের হিন্দুস্তান দখলের আমল) পূর্বে কি দেওবন্দী বা ব্রেলভী মতবাদের মানুষ বিদ্যমান ছিল? যদি থাকে তাহ’লে স্রেফ একটি ছহীহ ও স্পষ্ট উদ্ধৃতি পেশ করুক। আর যদি না থেকে থাকে তাহ’লে প্রমাণিত হ’ল যে, ব্রেলভী ও দেওবন্দী মাযহাব উভয়টিই হিন্দুস্তানের উপর ইংরেজদের দখলদারিত্ব কায়েমের পরে সৃষ্ট। অমা ‘আলায়না ইল্লাল বালাগ।

(১৪ই ফেব্রুয়ারী ২০১২ইং)

\ সমাপ্ত \



[1]. খতীব বাগদাদী, শারফু আছহাবিল হাদীছ, হা/১৪৩, সনদ ছহীহ।

[2]. যাহাবী, আল-কাশিফ, ৩/৭৯, রাবী নং ৫১৯৭।

[3]. সুয়ূত্বী, আর-রাদ্দু ‘আলা মান উখলিদা ইলাল আরয, পৃঃ ১৩৭।

[4]. জাওয়ামিউস সীরাহ, ১/৩৩৩।

[5]. খতীব বাগদাদী, আল-ফক্বীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, ২/৬৯-৭০, সনদ হাসান।

[6]. তারীখুল ইসলাম, ৪৯/২২৬; আল-ওয়াফী বিল-অফায়াত, ১৯/১২।

[7]. আর-রাদ্দু ‘আলা মান উখলিদা ইলাল আরয, পৃঃ ১৩৮।

[8]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১৭/৫৬৭; উপরন্তু দেখুন : ৭ নং উক্তি।

[9]. দেখুন : আব্দুল হাই লাক্ষ্ণৌবী, আন-নাফে‘উল কাবীর লিমায়ঁ য়ুতালি‘উ আল-জামে‘ আছ-ছাগীর, পৃঃ ৭; তাক্বরীরাতুর রাফি‘ঈ, ১/১১; আত্ব-তাক্বরীর ওয়াত-তাহবীর, ৩/৪৫৩

[10]. উপরন্তু দেখুন : সুবকী, ত্বাবাক্বাতুশ শাফেঈয়াহ আল-কুবরা, ২/৭৮, মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম ইবনুল মুনযির আন-নিশাপুরী-এর জীবনী এবং ১১ নং উক্তি দ্রঃ।

[11]. ইবনুল ক্বাইয়িম, ই‘লামুল মুওয়াক্কিঈন, ২/২৪১-২৪২

[12]. ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ২২/২৪৯

[13]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ২০/২০৯; আরো দেখুন : দ্বীন মেঁ তাক্বলীদ কা মাসআলা, পৃঃ ৪০

[14]. তাযকিরাতুল হুফফায, ৪/১৪৯৬; হা/১১৭৫

[15]. ই‘লামুল মুওয়াক্কিঈন, ২/২০৮; দ্বীন মেঁ তাক্বলীদ কা মাসআলা, পৃঃ ৩২।

[16]. ই‘লাউস সুনান, ২০/৮, শিরোনাম : ‘আদ-দ্বীনুল ক্বাইয়িম’; আরো দেখুন : ১নং উক্তির আগের ভূমিকা

[17]. তাযকিরাতুল হুফফায, ১/১৬ , আব্দুল্লাহ বিন মাস‘ঊদ (রাঃ)-এর জীবনী দ্রঃ

[18]. দেখুন : আর-রাদ্দু ‘আলা মান উখলিদা ইলাল আরয, পৃঃ ১৩১-১৩২; দ্বীন মেঁ তাক্বলীদ কা মাসআলা, পৃঃ ৩৪-৩৫

[19]. আল-কানযুল মাদফূন ওয়াল ফুলকুল মাশহূন, পৃঃ ১৪৯; দ্বীন মেঁ তাক্বলীদ কা মাসআলা, পৃঃ ৪০-৪১

[20]. নাছবুর রায়াহ, ১/২১৯

[21]. আল-বিনায়া শরহে হিদায়া, ১/৩১৭

[22]. লিসানুল মীযান, ১/২৮০

[23]. আল-বারুল মুনীর ফী তাখরীজিল আহাদীছ ওয়াল -আছার আল-ওয়াকি‘আহ ফিশ-শারহিল কাবীর, ১/২৯৩

[24]. তাক্ববীমুল আদিল্লাহ ফী উছূলিল ফিক্বহ, পৃঃ ৩৯০; মাসিক ‘আল-হাদীছ’, হাযরো, সংখ্যা ২২, পৃঃ ১৬

[25]. দেখুন : নুযহাতুল খাওয়াতির, ৬/৩৫০, ক্রমিক নং ৬৩৬

[26]. রিসালাহ নাজাতিয়াহ, পৃঃ ৪১-৪২; দ্বীন মেঁ তাক্বলীদ কা মাসআলা, পৃঃ ৪১

[27]. জামে‘উ বায়ানিল ইলম ওয়া ফাযলিহী, পৃঃ ২৩১

[28]. দেখুন : লিসানুল মীযান, ৫/২৯৬

[29]. তুহফাতুল মুজীব আলা আসইলাতিল হাযির ওয়াল গারীব, পৃঃ ২০৫; দ্বীন মেঁ তাক্বলীদ কা মাসআলা, পৃঃ ৪৩

[30]. আল-ইক্বনা‘, পৃঃ ৯২; দ্বীন মেঁ তাক্বলীদ কা মাসআলা, পৃঃ ৪৩

[31]. তাওফীকুল হেদায়াত, পৃঃ ২০, প্রগ্রেসিভ বুক্স, লাহোর

[32]. ঐ, পৃঃ ১৬৭

[33]. সাওয়ানিহে ক্বাসেমী, ২/২২

[34]. তাক্বরীরে তিরমিযী, পৃঃ ৩৬; দ্বীন মেঁ তাক্বলীদ কা মাসআলা, পৃঃ ২৪

[35]. ফাতাওয়া রিযভিয়াহ, ১১/৩৮৭

[36]. জাআল হাক্ব, ২/৯১, কুনূতে নাযেলাহ, ২য় অনুচ্ছেদ

[37]. আল-কানযুল মাদফূন ওয়াল ফুলকুল মাশহূন, পৃঃ ১৪৯; দ্বীন মেঁ তাক্বলীদ কা মাসআলা, পৃঃ ৪০-৪১

[38]. জামে‘উ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহী, ২/৯১, ২য় সংস্করণ, ২/১১২, ৩য় সংস্করণ, ২/১৮১, সনদ হাসান লি-যাতিহী

[39]. খত্বীব, আল-জামে‘,  হা/১৮৬, সনদ ছহীহ

[40]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ৪/৯৫।

[41]. ঐ, ৩/৩৪৭

[42]. তাফসীর ইবনে কাছীর ৪/১৬৪

[43]. তাদরীবুর রাবী, ২/১২৬, ২৭তম প্রকার।

[44]. দেখুন : হাকেম, মা‘রিফাতু উলূমিল হাদীছ, হা/২; ইবনু হাজার আসক্বালানী একে ছহীহ বলেছেন (ফাৎহুল বারী, ১৩/২৯৩, হা/৭৩১১-এর অধীনে); খত্বীব বাগদাদী, মাসআলাতুল ইহতিজাজ বিশ-শাফেঈ, পৃঃ ৪৭; সুনানে তিরমিযী, আরেযাতুল আহওয়াযী সহ, ৯/৪৭, হা/২২২৯

[45]. হাকেম, মা‘রিফাতু উলূমিল হাদীছ,  পৃঃ ৪, সনদ ছহীহ

[46]. শারফু আছহাবিল হাদীছ, হা/১৪৩, সনদ ছহীহ। বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন : আমার গ্রন্থ তাহক্বীক্বী মাক্বালাত (১/১৬১-১৭৪)।

[47]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ২০/৩৯-৪০; তাহক্বীক্বী  মাক্বালাত, ১/১৬৮  

[48]. উছূলুদ্দীন, পৃঃ ৩১৭

[49]. আহসানুত তাক্বাসীম ফী মা‘রিফাতিল আক্বালীম, পৃঃ ৪৮১

[50]. দেখুন : নুযহাতুল খওয়াতির, ৬/৩৫১; তাহক্বীক্বী মাক্বালাত, ২/৫৮

[51]. তাজাল্লিয়াতে ছফদর, ২/২৪৩, আরো দেখুন : ঐ ৫/৩৫৫

[52]. ঐ, ৬/৪৪

[53]. আহসানুল ফাতাওয়া, ১/৩১৬

[54]. হাক্বীক্বাতুল  ফিক্বহ, ২য় খন্ড (করাচী : ইদারাতুল কুরআন ওয়াল উলূম  আল-ইসলামিয়াহ), পৃঃ ২২৮

[55]. ইজতিহাদ আওর তাক্বলীদ কী বেমিছাল তাহক্বীক্ব, পৃঃ ৪৮

 

HTML Comment Box is loading comments...