প্রবন্ধ


নিয়মের রাজত্ব

রফীক আহমাদ
 শিক্ষক (অবঃ), বিরামপুর, দিনাজপুর।

 (পূর্ব প্রকাশিতের পর)

আল্লাহর মহারাজত্বে নিয়মের কোন শেষ নেই এবং তা বর্ণনা করাও সম্ভব নয়। মানুষ মরণশীল, এজন্যে আল্লাহ তা‘আলা ‘মৃত্যু’ নামে একটি বস্ত্ত সৃষ্টি করেছেন। যা পৃথিবীর কোন মানুষই দেখতে পায় না। তবে ইহকাল ও পরকালের মধ্যে যে সুদৃঢ় সীমারেখা রয়েছে, মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষকে উক্ত সীমারেখার দরজায় উপস্থিত করা হয়। সুতরাং মৃত্যু মোটেও ক্ষুদ্র বস্ত্ত নয়। মানব জীবনে মৃত্যুর গুরুত্ব অপরিসীম। যারা মৃত্যুকে ভুলে গিয়ে পৃথিবীতে পদচারণা করে তারা হতভাগ্য। আর যারা মৃত্যুকে স্মরণ করে পৃথিবীতে আল্লাহর ভয়ে বিনীত থাকে তারাই ভাগ্যবান।

মৃত্যুর মাধ্যমে পরকালে প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি পবিত্র কুরআনে পুনঃ পুনঃ উল্লিখিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, تَبَارَكَ الَّذِيْ بِيَدِهِ الْمُلْكُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ، الَّذِيْ خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلاً وَهُوَ الْعَزِيْزُ الْغَفُوْرُ-  ‘পুণ্যময় তিনি, যাঁর হাতে রাজত্ব। তিনি সব কিছুর উপর সর্বশক্তিমান। যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন, কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল’ (মুলক ৬৭/১-২)

অন্যত্র প্রত্যাদেশ হয়েছে, إِلَيْهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيْعاً وَعْدَ اللهِ حَقًّا إِنَّهُ يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيْدُهُ لِيَجْزِيَ الَّذِيْنَ آمَنُوْا وَعَمِلُوْا الصَّالِحَاتِ بِالْقِسْطِ وَالَّذِيْنَ كَفَرُوْا لَهُمْ شَرَابٌ مِّنْ حَمِيْمٍ وَعَذَابٌ أَلِيْمٌ بِمَا كَانُوْا يَكْفُرُوْنَ-  ‘তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে তোমাদের সবাইকে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য, তিনিই সৃষ্টি করেন প্রথমবার, আবার (মৃত্যুর পর) তৈরী করবেন তাদেরকে বদলা দেয়ার জন্য, যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে ইনছাফের সাথে। আর যারা কাফের হয়েছে, তাদের পান করতে হবে ফুটন্ত পানি এবং ভোগ করতে হবে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। এজন্য যে তারা কুফরী করছিল’ (ইউনুস ১০/৪)। তিনি আরো বলেন, كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ثُمَّ إِلَيْنَا تُرْجَعُوْنَ  ‘প্রত্যেক প্রাণকে মরণের স্বাদ নিতে হবে, অতঃপর তোমরা আমাদেরই কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে’ (আনকাবূত ২৯/৫৭)

মানুষ মাত্রেই মৃত্যুবরণ করবে আল্লাহর হুকুমে, নির্ধারিত সময়ে, নির্ধারিত সময়ের পূর্বেও নয়, পরেও নয়। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَنْ تَمُوْتَ إِلاَّ بِإِذْنِ الله كِتَاباً مُّؤَجَّلاً  ‘আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারো মৃত্যু হ’তে পারে না, সেজন্য একটা সময় নির্ধারিত রয়েছে’ (আলে ইমরান ৩/১৪৫)

এ বিষয়ে তিনি আরো বলেন, لِلَّذِيْنَ لاَ يُؤْمِنُوْنَ بِالآخِرَةِ مَثَلُ السَّوْءِ وَلِلّهِ الْمَثَلُ الأَعْلَىَ وَهُوَ الْعَزِيْزُ الْحَكِيْمُ، وَلَوْ يُؤَاخِذُ اللهُ النَّاسَ بِظُلْمِهِم مَّا تَرَكَ عَلَيْهَا مِنْ دَآبَّةٍ وَلَكِنْ يُؤَخِّرُهُمْ إلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لاَ يَسْتَأْخِرُوْنَ سَاعَةً وَلاَ يَسْتَقْدِمُوْنَ-  ‘যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, তাদের উদাহরণ নিকৃষ্ট এবং আল্লাহর উদাহরণই মহান, তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়। যদি আল্লাহ লোকদেরকে তাদের অন্যায় কাজের কারণে পাকড়াও করতেন, তবে ভূ-পৃষ্ঠে চলমান কোন কিছুকেই ছাড়তেন না। কিন্তু তিনি প্রতিশ্রুত সময় পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দেন। অতঃপর নির্ধারিত সময়ে যখন তাদের মৃত্যু এসে যাবে, তখন এক মুহূর্ত বিলম্বিত কিংবা তরান্বিত করতে পারবে না’ (নাহল ১৬/৬০, ৬১)

মৃত্যুর তাৎপর্য সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, هُوَ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن تُرَابٍ ثُمَّ مِن نُّطْفَةٍ ثُمَّ مِنْ عَلَقَةٍ ثُمَّ يُخْرِجُكُمْ طِفْلاً ثُمَّ لِتَبْلُغُوا أَشُدَّكُمْ ثُمَّ لِتَكُونُوا شُيُوخاً وَمِنكُم مَّن يُتَوَفَّى مِن قَبْلُ وَلِتَبْلُغُوا أَجَلاً مُّسَمًّى وَلَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ  ‘তিনিই তো তোমাদের সৃষ্টি করেছেন মাটির দ্বারা। অতঃপর শুক্রবিন্দু দ্বারা, অতঃপর জমাট রক্ত দ্বারা, অতঃপর তোমাদেরকে বের করেন শিশুরূপে, অতঃপর তোমরা যৌবনে পদার্পণ কর, অতঃপর বার্ধক্যে উপনীত হও। তোমাদের কারো কারো এর পূর্বেই মৃত্যু ঘটে এবং তোমরা নির্ধারিত কালে পৌঁছ এবং তোমরা যাতে অনুধাবন কর’ (গাফির/মুমিন ৪০/৬৭)

মৃত্যুর এই চিত্রই কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। মৃত্যু আল্লাহর হুকুম বা একটা বিশেষ ব্যাবস্থা। এখানে শুধু কিছুক্ষণ মানব আত্মাকে অচল করে দেয়া হয় এবং নির্ধারিত সময়ে মৃতদেহে সেই আত্মাকে সংযোজন করা হয়। অতঃপর মানুষের কর্ম অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গৃহীত হয়। মৃত্যু নামে মানব আত্মার এই রূপান্তর কত যে মর্মান্তিক, কত ভয়াবহ, কত হৃদয়বিদারক, কত দুঃখজনক তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। মানব জীবনের সংশোধনের জন্য এটা একটা স্থায়ী ব্যবস্থা।

আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে একটা নির্ধারিত সময়ের জন্য পৃথিবীতে প্রেরণ করেন। শুধু মানুষ নয়; আল্লাহর নিয়মের মহারাজত্বে প্রতিটি বস্ত্তই নির্ধারিত সময়ের জন্য সৃষ্টি হয়েছে। সে সময় শেষে সবার ধ্বংস (মৃত্যু) অনিবার্য। নভোমন্ডল ভূ-মন্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যে সৃষ্ট বস্ত্তগুলো প্রধানত জীব ও জড় দু’ভাগে বিভক্ত। জীবের জন্ম-মৃত্যু আছে। কিন্তু জড় বস্ত্ত বিশেষ করে আসমান-যমীন, সূর্য-চন্দ্র, গ্রহ-নক্ষত্র, পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগর প্রভৃতির সৃষ্টি কঠিনতর এবং স্থিতিকাল দীর্ঘতম। কিন্তু বিশ্বজগতও নশ্বর। তবে এখানকার বৃহৎ বিপুলায়তন ও বিশালকায় সৃষ্টিগুলো যেমন আমাদের দৃষ্টিতে অসীম ও অনন্ত, তেমনি তাদের বয়সের দীর্ঘতাও অকল্পনীয়। নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টির প্রাগৈতিহাসিক কাহিনী মানব সম্প্রদায়ের নিকট সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। তবে এটা সত্য যে, এরা আল্লাহর ইচ্ছায় এক নির্ধারিত সময়ের জন্য সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, مَا خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَجَلٍ مُّسَمًّى وَالَّذِيْنَ كَفَرُوْا عَمَّا أُنذِرُوْا مُعْرِضُوْنَ-  ‘নভোমন্ডল, ভূমন্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যে সবকিছু আমরা যথাযথভাবে এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্যেই সৃষ্টি করেছি’ (আহকাফ ৪৬/৩)

অন্যত্র আল্লাহ বলেন, يَعْلَمُوْنَ ظَاهِراً مِّنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُوْنَ، أَوَلَمْ يَتَفَكَّرُوْا فِي أَنفُسِهِمْ مَا خَلَقَ اللهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَجَلٍ مُّسَمًّى وَإِنَّ كَثِيْراً مِّنَ النَّاسِ بِلِقَاءِ رَبِّهِمْ لَكَافِرُوْنَ-  ‘তারা পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিক জানে এবং তারা পরকালের খবর রাখে না। তারা কি তাদের মনে ভেবে দেখে না যে, আল্লাহ নভোমন্ডল, ভূমন্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে ও নির্ধারিত সময়ের জন্য’ (রূম ৩০/৭-৮)

নভোমন্ডল, ভূমন্ডল ও এদের মধ্যবর্তী সমুদয় সৃষ্টি একটা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য সৃজিত হয়েছে। সুতরাং এগুলো চিরস্থায়ী নয়, বরং অস্থায়ী ও ক্ষণস্থায়ী। এরপর চিরস্থায়ী জগত রয়েছে যা পরকাল নামে সুপরিচিত। পৃথিবীর সমুদয় সৃষ্টির নির্ধারিত সময় পূর্ণ হয়ে গেলে আল্লাহ তা‘আলার হুকুমে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। একমাত্র আল্লাহর সত্তা সমুন্নত, অক্ষয় ও চিরস্থায়ী থাকবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ ঘোষণা করেন,كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ، وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ-  ‘ভূপৃষ্ঠের সবকিছুই ধ্বংসশীল। একমাত্র তোমার মহিমাময় ও মহানুভব পালনকর্তার চেহারা ব্যতীত’ (আর-রহমান ৫৫/২৬-২৭)। অন্যত্র আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব (ছাঃ)-কে প্রত্যাদেশের মাধ্যমে বলেন, وَتَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِيْ لاَ يَمُوْتُ وَسَبِّحْ بِحَمْدِهِ وَكَفَى بِهِ بِذُنُوْبِ عِبَادِهِ خَبِيْراً-  ‘তুমি সেই চিরঞ্জীবের (আল্লাহর) উপর ভরসা কর, যাঁর মৃত্যু নেই এবং তাঁর প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা কর’ (ফুরকান ২৫/৫৮)

আল্লাহ আরো বলেন, كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ لَهُ الْحُكْمُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُوْنَ  ‘আল্লাহর চেহারা ছাড়া অন্য সবকিছুই ধ্বংস হবে। হুকুম তাঁরই, তাঁরই দিকে তোমাদের ফিরিয়ে আনা হবে’ (কাছাছ ২৮/৮৮)। আল্লাহ তা‘আলা নভোমন্ডল, ভূমন্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু একটা নির্ধারিত সময়ের জন্য সৃষ্টি করেছেন। সে সময় শেষে এগুলোর ধ্বংস হবে ক্বিয়ামতের মাধ্যমে। ‘ক্বিয়ামত’ একটি নির্দিষ্ট দিন বা সময়ের নাম। ক্বিয়ামত শব্দের অর্থ প্রলয়ের দিন, ধ্বংসের দিন। এর জন্য একটা সময় নির্ধারিত আছে, মহান আল্লাহ ছাড়া তা কেউ জানে না। ক্বিয়ামতের আগমন একটি আকস্মিক ব্যাপার। ক্বিয়ামতের কথা বোঝাতে গিয়ে আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীময় কিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগের নমুনা রেখে দিয়েছেন। যেমন ভূমিকম্প, সুনামি, হ্যারিকেন, টর্নেডো, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি।

ক্বিয়ামতের নির্ধারিত সময় উপস্থিত হ’লেই আল্লাহ তা‘আলা নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল ধ্বংসের জন্য সিঙ্গায় ফুঁক দিতে ইসরাফীল (আঃ)-কে হুকুম দিবেন। ইসরাফীল (আঃ)-এর সিঙ্গায় ফুঁক দেওয়ার ফলে ক্বিয়ামতের তান্ডবলীলা শুরু হবে।

তৎকালীন অবস্থার বর্ণনা পবিত্র কুরআনে এভাবে এসেছে,إِذَا وَقَعَتِ الْوَاقِعَةُ، لَيْسَ لِوَقْعَتِهَا كَاذِبَةٌ، خَافِضَةٌ رَّافِعَةٌ، إِذَا رُجَّتِ الْأَرْضُ رَجًّا، وَبُسَّتِ الْجِبَالُ بَسًّا، فَكَانَتْ هَبَاء مُّنبَثًّا-  ‘যখন ক্বিয়ামতের ঘটনা ঘটবে, যার বাস্তবতার কোন সংশয় নেই। এটা কাউকে নীচু করে দেবে, কাউকে সমুন্নত করে দেবে, যখন প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে পৃথিবী এবং পর্বতমালা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে, অতঃপর তা হয়ে যাবে উৎক্ষিপ্ত ধূলিকণা’ (ওয়াকি‘আহ ৫৬/১-৬)

ক্বিয়ামতের আরও কঠিন বর্ণনা দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, فَإِذَا نُفِخَ فِي الصُّوْرِ نَفْخَةٌ وَاحِدَةٌ، وَحُمِلَتِ الْأَرْضُ وَالْجِبَالُ فَدُكَّتَا دَكَّةً وَاحِدَةً، فَيَوْمَئِذٍ وَقَعَتِ الْوَاقِعَةُ، وَانْشَقَّتِ السَّمَاءُ فَهِيَ يَوْمَئِذٍ وَاهِيَةٌ، وَالْمَلَكُ عَلَى أَرْجَائِهَا وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٍ ثَمَانِيَةٌ-  ‘যখন সিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে, একটি মাত্র ফুৎকার এবং পৃথিবী ও পর্বতমালা উত্তোলিত হবে ও চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়া হবে, সেদিন ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে। সেদিন আকাশ বিদীর্ণ হবে ও বিক্ষিপ্ত হবে এবং ফেরেশতাগণ আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে। আটজন ফেরেশতা আপনার পালনকর্তার আরশকে তাদের ঊর্ধ্বে বহণ করবে’ (হাক্কাহ ৬৯/১৩-১৭)। একই মর্মে ঘোষিত হয়েছে যে, فَإِذَا نُقِرَ فِي النَّاقُوْرِ، فَذَلِكَ يَوْمَئِذٍ يَوْمٌ عَسِيْرٌ، عَلَى الْكَافِرِيْنَ غَيْرُ يَسِيْرٍ-  ‘যেদিন সিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, সেদিন হবে কঠিন দিন। কাফেরদের জন্য এটা সহজ নয়’ (মুদ্দাছছির ৭৪/৮-১০)। সে দিনের ভয়াবহতার বর্ণনা দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন,إِذَا السَّمَاءُ انْفَطَرَتْ، وَإِذَا الْكَوَاكِبُ انْتَثَرَتْ، وَإِذَا الْبِحَارُ فُجِّرَتْ، وَإِذَا الْقُبُوْرُ بُعْثِرَتْ، عَلِمَتْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ وَأَخَّرَتْ-  ‘যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে, যখন নক্ষত্র সমূহ খসে পড়বে, যখন সমুদ্রকে উত্তাল করে তোলা হবে এবং যখন কবর সমূহ উম্মোচিত হবে, তখন প্রত্যেকে জেনে নিবে সে কি অগ্রে প্রেরণ করেছে এবং কি পশ্চাতে ছেড়ে এসেছে’ (ইনফিতার ৮২/১-৫)

উপরোক্ত আয়াতগুলোতে ক্বিয়ামতের এক ভয়াল দৃশ্য ফুটে উঠেছে। মাত্র একটি ফুৎকারেই পৃথিবীর সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। এটা কত কঠিন বিষয়, কত ভয়ঙ্কর, অচিন্তনীয় ও অবর্ণনীয় বিষয় তা এক পরাক্রমশালী আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।

মহান আল্লাহ তাঁর সুবিশাল নিয়মের রাজত্বে তাঁর সর্বাধিক প্রিয় প্রতিনিধি মানব সৃষ্টি করেন এবং তাকে প্রচুর জ্ঞান দান করেন। এজন্য মানুষের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হ’ল এক আল্লাহর অস্তিত্ব ও আনুগত্য স্বীকার করে নেয়া। আল্লাহর আনুগত্য করার সুফল এবং আনুগত্য না করার কুফল সম্বন্ধেও বিশদ বিবরণ রয়েছে কুরআনে। মানুষের জীবনকালকে দু’ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। একটি নির্ধারিত সময়কাল নশ্বর ইহজগত, অপরটি অনির্ধারিত সময়কাল অবিনশ্বর পরজগত। আমরা বর্তমান নশ্বর ইহজগতের অধিবাসী, জন্ম হ’তে মৃত্যু পর্যন্ত এখানে এক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যে সুশৃংখল জীবন যাপন করতে হবে। এটা পরম করুণাময় আল্লাহর আদেশ। এই আদেশ পালনে রয়েছে তাঁর অনাবিল সন্তুষ্টি এবং (পরকালে) এক মহা পুরস্কার। পক্ষান্তরে এই আদেশ অমান্যকারীরা আল্লাহর অসন্তুষ্টিতে নিপতিত হবে এবং পরকালে এক ভয়াবহ শাস্তির সম্মুখীন হবে।

কিয়ামতের পরে সকলকে একত্রে সমবেত করা প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, وَنُفِخَ فِي الصُّوْرِ فَإِذَا هُم مِّنَ الْأَجْدَاثِ إِلَى رَبِّهِمْ يَنْسِلُوْنَ، قَالُوْا يَا وَيْلَنَا مَنْ بَعَثَنَا مِن مَّرْقَدِنَا هَذَا مَا وَعَدَ الرَّحْمَنُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُوْنَ، إِنْ كَانَتْ إِلَّا صَيْحَةً وَاحِدَةً فَإِذَا هُمْ جَمِيْعٌ لَّدَيْنَا مُحْضَرُوْنَ، فَالْيَوْمَ لَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئاً وَلَا تُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ-  ‘সিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, তখনই তারা কবর থেকে তাদের পালনকর্তার দিকে ছুটে চলবে। তারা বলবে, হায় আমাদের দুর্ভোগ! কে আমাদের নিদ্রাস্থল থেকে উত্থিত করল? রহমান আল্লাহ তো এরই ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং রাসূলগণ সত্য বলেছিলেন। এটা তো হবে কেবল এক মহানাদ। সেই মুহূর্তেই তাদের সবাইকে আমাদের সামনে উপস্থিত করা হবে। আজকের দিনে কারও প্রতি যুলুম করা হবে না এবং তোমরা যা করবে কেবল তারই প্রতিদান পাবে’ (ইয়াসীন ৩৬/৫১-৫৪)

অন্যত্র আল্লাহ বলেন, يَوْمَ يُنْفَخُ فِي الصُّوْرِ فَتَأْتُوْنَ أَفْوَاجاً، وَفُتِحَتِ السَّمَاءُ فَكَانَتْ أَبْوَاباً، وَسُيِّرَتِ الْجِبَالُ فَكَانَتْ سَرَاباً، إِنَّ جَهَنَّمَ كَانَتْ مِرْصَاداً، لِلْطَّاغِيْنَ مَآباً-  ‘যে দিন সিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, তখন তোমরা দলে দলে সমাগত হবে। আকাশ বিদীর্ণ হয়ে তাতে বহু দরজা সৃষ্টি হবে এবং পর্বতমালা চালিত হয়ে মরীচিকা হয়ে যাবে। নিশ্চয়ই জাহান্নাম প্রতীক্ষায় থাকবে; সীমালংঘনকারীদের আশ্রয়স্থল রূপে’ (নাবা ৭৮/১৮-২২)

তিনি আরো বলেন, يَوْمَ يُنْفَخُ فِي الصُّوْرِ وَنَحْشُرُ الْمُجْرِمِيْنَ يَوْمَئِذٍ زُرْقاً، يَتَخَافَتُوْنَ بَيْنَهُمْ إِن لَّبِثْتُمْ إِلَّا عَشْراً، نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَقُوْلُوْنَ إِذْ يَقُوْلُ أَمْثَلُهُمْ طَرِيْقَةً إِن لَّبِثْتُمْ إِلَّا يَوْماً-  ‘যে দিন সিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে, সেদিন আমরা অপরাধীদেরকে সমবেত করব নীল চক্ষু অবস্থায়। তারা চুপিসারে পরস্পর বলাবলি করবে, তোমরা মাত্র দশদিন অবস্থান করেছিলে। তারা কি বলে তা আমরা ভালভাবে জানি। তাদের মধ্যে যে অপেক্ষাকৃত উত্তম পথের অনুসারী সে বলবে, তোমরা মাত্র একদিন অবস্থান করেছিলে’ (তোয়া-হা ২০/১০২-১০৪)

ক্বিয়ামতের দীর্ঘতা বর্তমান এক দিনের হিসাবে পঞ্চাশ হাযার বছরের সমান। পৃথিবী ধ্বংসের দিবস ‘ক্বিয়ামত’-এর দীর্ঘতা সম্বন্ধে আল্লাহ বলেন, يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ ثُمَّ يَعْرُجُ إِلَيْهِ فِيْ يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ أَلْفَ سَنَةٍ مِّمَّا تَعُدُّوْنَ  ‘তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সমস্ত কর্ম পরিচালনা করেন, অতঃপর তা তাঁর কাছে পৌঁছবে এমন একদিনে যার পরিমাণ তোমাদের গণনায় হাযার বছরের সমান’ (সাজদাহ ৩২/৫)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوْحُ إِلَيْهِ فِيْ يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِيْنَ أَلْفَ سَنَةٍ  ‘ফেরেশতাগণ ও রূহ আল্লাহ তা‘আলার দিকে ঊর্ধ্বগামী হয় এমন এক দিনে যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাযার বছর’ (মা‘আরিজ ৭০/৪)

উপরোক্ত আয়াত দু’টিতে ক্বিয়ামতের দীর্ঘতার বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে। সময়ের দীর্ঘতা ও স্বল্পতা পরিবেশ ও পরিস্থিতির উপরই প্রধানত নির্ভরশীল। সেই দিনে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে এবং তাদের কর্মফলের কারণে, সেই দিনের দৈর্ঘ্য বিভিন্ন দলের পক্ষে বিভিন্ন রূপ হবে। কাফেরদের জন্য পঞ্চাশ হাযার বা এক হাযার বছর, মুমিনদের জন্যে এক ছালাতের ওয়াক্তের সমান হবে।

ক্বিয়ামতের পর হাশরের ময়দানে মহাবিচারক আল্লাহ তাঁর বিচার কার্যালয় স্থাপন করবেন। ঐ বিচারালয়ে মানুষের কর্মের বিচার করা হবে। সিঙ্গায় দ্বিতীয় ফুৎকারের পর মানুষ দলে দলে ঊর্ধ্বশ্বাসে আল্লাহর দিকে দৌড়াতে থাকবে এবং নিজেদের জন্য নির্ধারিত স্থানে গিয়ে ঠাঁই নিবে। কারণ ঐ সমাবেশ স্থলে মানুষের কর্মফল অনুযায়ী আলাদা আলাদা অবস্থান স্থল নির্ধারিত থাকবে। সবচেয়ে বিষ্ময়ের বিষয় হ’ল এজগতে মানুষ যেভাবে প্রত্যেকে নিজ নিজ আবাসস্থল বা বাড়ী-ঘর চেনে, ক্বিয়ামতের ঐ দিনেও সে তার নিজ জায়গা চিনে নিবে।

মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই মানুষ নিজের ভাল-মন্দ বুঝতে পারে, স্বচক্ষেই ভালর শুভ প্রতিদান এবং মন্দের অশুভ প্রতিফল দেখতে পায়। অতঃপর ক্বিয়ামতের দ্বিতীয় সিঙ্গায় ফুৎকারে মানুষ কবর হ’তে যে যেখানে ছিল, সেখান হ’তে উঠে হাশরের ময়দানে সমবেত হবে এবং সে তার পাপ-পুণ্য স্বচক্ষে দেখতে পাবে। এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ তা‘আলাই বিচারদিবসের একমাত্র মালিক। তিনি বলেন, مَالِكِ يَوْمِ الدِّيْنِ  ‘যিনি বিচার দিবসের মালিক’ (ফাতিহা ১/৩)

অন্যত্র আল্লাহ বলেন, إِنَّ يَوْمَ الْفَصْلِ كَانَ مِيْقَاتاً  ‘নিশ্চয়ই বিচার দিবস নির্ধারিত রয়েছে’ (নাবা ৭৮/১৭)। অতঃপর বিচারের জন্য ন্যায়ের মানদন্ড (দাঁড়িপাল্লা) স্থাপন করা হবে। আল্লাহ বলেন, وَنَضَعُ الْمَوَازِيْنَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئاً وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا وَكَفَى بِنَا حَاسِبِيْنَ  ‘আমরা ক্বিয়ামতের দিন ন্যায় বিচারের মানদন্ড স্থাপন করব। সুতরাং কারও প্রতি যুলুম করা হবে না। যদি কোন আমল সরিষার দানা পরিমাণ হয়, আমরা তা উপস্থিত করব এবং হিসাব গ্রহণের জন্য আমরাই যথেষ্ট’ (আম্বিয়া ২১/৪৭)

অন্যত্র তিনি বলেন, وَالْوَزْنُ يَوْمَئِذٍ الْحَقُّ فَمَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَأُوْلَـئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ، وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِيْنُهُ فَأُوْلَـئِكَ الَّذِيْنَ خَسِرُواْ أَنْفُسَهُمْ بِمَا كَانُوْا بِآيَاتِنَا يِظْلِمُوْنَ-  ‘সেদিন যথার্থই ওযন করা হবে, অতঃপর যাদের পাল্লা ভারী হবে তারা সফলকাম হবে এবং যাদের পাল্লা হাল্কা হবে, তারাই এমন হবে, যারা নিজেদের ক্ষতি করেছে। কেননা তারা আমাদের আয়াতসমূহ অস্বীকার করতো’ (আ‘রাফ ৭/৮-৯)

পার্থিব জগতের ন্যায়-অন্যায়ের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণের জন্য সেদিন প্রতিটি মানুষের সংগৃহীত আমলনামা ওযন করা হবে। এজন্য সেখানে স্থাপিত দাঁড়িপাল্লায় একদিকে ভাল কাজগুলো ও অন্যদিকে মন্দ কাজগুলো তুলে দিয়ে পরিমাপ করা হবে। এতে ভাল কাজের বা নেকীর পাল্লা ভারী হ’লে সে হবে সৌভাগ্যবান, আর মন্দ কাজ বা পাপের পাল্লা ভারী হ’লে সে হবে দুর্ভাগা।

ক্বিয়ামতের দিন বিচার হবে শুধু জিন-ইনসানের অন্য কোন প্রাণী বা জড়বস্ত্তরও নয়। কারণ তারা সবাই সর্বদা আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকত এবং আল্লাহর শেখানো পদ্ধতিতে তাঁর ইবাদত করত, সিজদা করত। অর্থাৎ সবাই তাঁর আদেশ পালন করত। কাজেই আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে অতি সহজে তাদের বিচার-ফায়ছালা করবেন। কিন্তু জিন ও মানুষের মধ্যে সবাই আল্লাহর আদেশ পালন করে না। তাই তাদের কর্ম অনুযায়ী বিচার হবে, সবার পাপ-পুণ্য দাঁড়িপাল্লায় পরিমাপ করা হবে এবং সত্য ও ন্যায়ভিত্তিক ওযন হবে। প্রত্যেকটি মানুষ নিজ নিজ হিসাব পুরোপুরি বুঝবে, তাতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হবে না।

উল্লেখ্য, মানুষ ব্যতীত অন্য কোন প্রাণী ও জড়বস্ত্তর কোন শত্রু ছিল না। এজন্যে তারা স্বচ্ছতায় বহাল ছিল। কিন্তু মানুষের শত্রু শয়তান মানুষের শিরা উপ-শিরায় প্রবেশ করে তাকে পাপাচার করতে প্ররোচিত ও প্রভাবিত করত। যারা বুদ্ধিমান, ধর্মভীরু ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী তারা তা বুঝত এবং তাদের অন্তরে তা ঠাঁই পেত না। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাসী তারা বিপথগামী হয়ে ভ্রান্ত পথে যাত্রা করত। এজন্য জান্নাতে প্রবেশকারী বা ক্বিয়ামতের বিচারে বিজয়ীদের একটা বিশেষ পরিচয় দিয়ে আল্লাহ বলেন, يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُوْنَ، إِلَّا مَنْ أَتَى اللهَ بِقَلْبٍ سَلِيْمٍ، وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِيْنَ، وَبُرِّزَتِ الْجَحِيْمُ لِلْغَاوِيْنَ-  ‘সে দিবসে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন উপকারে আসবে না। কিন্তু যে শুদ্ধ অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে (সে কৃতকার্য হবে)। জান্নাত আল্লাহভীরুদের নিকটবর্তী করা হবে এবং বিপথগামীদের সামনে উন্মোচিত করা হবে জাহান্নাম’ (শো‘আরা ২৬/৮৮-৯১)

মানুষের মধ্যে স্বচ্ছ মনের অধিকারীরা আল্লাহর প্রিয় পাত্র। তাই তাদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ، ارْجِعِيْ إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَّرْضِيَّةً، فَادْخُلِيْ فِيْ عِبَادِيْ، وَادْخُلِيْ جَنَّتِيْ-  ‘হে প্রশস্ত মন! তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর’ (ফজর ৮৯/২৭-৩০)

আল্লাহ তা‘আলা মানুষের উদ্দেশ্যে বহু সুসংবাদ ও সতর্কবাণী প্রেরণ করেছেন সেগুলি মেনে চলে পরকালে মুক্তি লাভের নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যথা তাদের ব্যর্থতার কথাও বর্ণনা করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি সৃষ্টি করেছি জাহান্নামের জন্য বহু জিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, তা দ্বারা বিবেচনা করে না। তাদের চোখ রয়েছে, তা দ্বারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর’ (আ‘রাফ ৭/১৭৯)

আল্লাহর অবাধ্য ও পাপী লোকর সম্পর্কে বলা হয়েছে ‘যেদিন পরিবর্তিত করা হবে এ পৃথিবীকে অন্য পৃথিবীতে এবং পরিবর্তিত করা হবে আকাশ সমূহকে এবং লোকেরা পরাক্রমশালী এক আল্লাহর সামনে পেশ হবে, তুমি ঐদিন পাপীদেরকে পরস্পরে শৃংখলাবদ্ধ দেখবে। তাদের জামা হবে আলকাতরার এবং তাদের মুখমন্ডলকে আগুন আচ্ছন্ন করে ফেলবে। যাতে আল্লাহ প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের প্রতিদান দেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। এটা মানুষের একটা সংবাদনামা এবং যাতে এতদ্বারা ভীত হয় এবং যাতে জেনে নেয় যে, উপাস্য তিনিই একক এবং যাতে বুদ্ধিমানরা চিন্তা-ভাবনা করে’ (ইবরাহীম ১৪/৪৮-৫২)

আল্লাহর রাজত্বে তাঁর নিয়মের কোন ব্যতিক্রম নেই, এটা বোঝাবার জন্যই তাঁর প্রয়াস প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তাঁর মহাশক্তির বাস্তব নমুনা আকষ্মিকভাবে অবতীর্ণ হয় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের অজ্ঞাতসারে। এগুলোর ধ্বংস ইতিহাস খুবই ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক। এগুলোও আল্লাহর নিয়মের অন্তর্ভুক্ত। প্রাগৈতিহাসিক ধ্বংস কাহিনীগুলো মানুষের জন্য বিশেষ স্মরণীয়। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের ও তাঁর আদেশ পালনের জন্যেই এগুলোর অবতারণা।

এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে তাঁর নিকটে আত্মসমর্পণ করলেই তাঁর নিয়মের রাজত্বের প্রতিও গভীর বিশবাসী ও শ্রদ্ধাশীল হওয়া সম্ভব, অন্যথা নয়। কারণ যারা সত্যিকারভাবে আল্লাহর প্রতি বা তাঁর অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাসী তারাই আল্লাহ প্রদত্ত নিয়মপ্রণালী অনুযায়ী কাজ করবে এবং সেটাই হবে সঠিক কাজ। এরা শুধু পৃথিবীতে নিরঙ্কুশ শান্তি প্রতিষ্ঠার ও সঠিক ধর্ম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে। এরাই হবে আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। পক্ষান্তরে যারা শয়তানের প্ররোচনা আল্লাহর প্রতি সন্দেহ পোষণ করে, অন্য কোন কিছুকেও আল্লাহর সমকক্ষ মনে করে বিশ্বাস করবে ও তাঁর ইবাদত করবে। তারা বিশ্বাসীদেরকে তাদের দলে নেওয়ার চেষ্টা করবে, সম্ভব হ’লে অন্যায়-অত্যাচারও করবে। দেশে দেশে অশান্তির বীজ বপণ করে সন্ত্রাস, খুন, গুম, ধর্ষণ, অপহরণ, ছিনতাই, বিশ্বাসঘাতকতা, মিথ্যাচার দ্বারা পৃথিবীর শান্তি বিনষ্ট করবে। এরা আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অযোগ্য বলে গণ্য হবে।

উপরোক্ত দু’টি দলই প্রধানত ক্বিয়ামতের দিন চূড়ান্ত বিচারের সম্মুখীন হবে। হাশরের ময়দান তো মানুষের জন্য বিচারালয় হিসাবে স্থাপিত হবে। এটা আল্লাহর বিশ্বাসী বান্দাদের জন্য হবে আশীর্বাদ এবং অবিশ্বাসী বান্দাদের জন্য হবে চরম অভিশাপ। আল্লাহর নিয়মের রাজত্বে যাবতীয় নিয়মের মধ্যে ক্বিয়ামত দিবসের বিষয় কঠিন ও কল্পনাতীত। সকল মানুষের ন্যায়-অন্যায়ের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচার করাই এ দিবসের প্রতিপাদ্য।

আলোচ্য প্রবন্ধে বর্ণিত সৃষ্টির ইতিহাস, মানুষের প্রতি আল্লাহর আদেশ-নিষেধ অতঃপর পৃথিবীর সমাপ্তি এবং নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের ধ্বংসকাহিনী নিয়মের রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত। অতঃপর হাশরের ময়দানে পৃথিবীর আদি হ’তে অন্ত পর্যন্ত মানুষের বিচার, আল্লাহর ক্ষমতার বর্ণনা মানুষের জন্য কত বিষ্ময়ের ও ভীতির বিষয় তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এগুলোর প্রতি বিশ্বাস তথা মহান আল্লাহর এই মহাপরিকল্পনার প্রতি বিশ্বাসী হওয়াই আল্লাহর পক্ষ অবলম্বনের এবং আশ্রয় লাভের পথ। যার শেষ প্রান্তে রয়েছে পরকালের উত্তম আবাসগৃহ জান্নাত। পক্ষান্তরে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ, জীবনের স্থায়ীত্বকাল, কবরের অবস্থান, পৃথিবীর ধ্বংসকাহিনী, হাশরের ময়দানের বিচার ব্যবস্থার আয়োজন আল্লাহর অলৌকিক ক্ষমতার মহাপ্রদর্শন প্রভৃতির প্রতি অবিশ্বাস আল্লাহর বিপক্ষ অবলম্বনের পথ, যার শেষ প্রান্তে রয়েছে পরকালের নিকৃষ্ট চিরস্থায়ী আবাসগৃহ জাহান্নাম।

বস্ত্ততঃ দুনিয়ার হিসাবের সমাপ্ত হ’লেই পৃথিবীর ধ্বংসাদেশ দেয়া হবে। অতঃপর আল্লাহর প্রতিশ্রুত বিধান মতে সকল মানুষকে ক্বিয়ামত বা হাশরের ময়দানে সমবেত করা হবে বিচারের জন্য। বিচারের পর প্রত্যেকেই পরকালের নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে যাবে। মানুষ পরকালের ঠিকানায় পৌঁছে দেখবে এক নতুন জগতের নতুন আবাসগৃহ জান্নাত অথবা জাহান্নাম। পৃথিবীর সব কথাই মানুষের মনে থাকবে। যারা জান্নাতে যাবে তাদেরও পৃথিবীর ভাল-মন্দ সব কাজ মনের মধ্যে ভীড় জমাবে এবং আল্লাহর প্রতি বার বার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। আর যারা জাহান্নামে যাবে তারাও নিজেদের দোষ সমূহ এবং তার ইন্ধনদাতাদের স্মরণ করবে বা সন্ধান করবে। কিন্তু তাতে কোন লাভ হবে না, তখন শুধু দুঃখ-কষ্ট আর অনুতাপই হবে।

সৃষ্টির সূচনা হ’তে লয় পর্যন্ত সুদীর্ঘ হাযার হাযার বছর সময়ের কর্মকান্ডের হিসাবের আল্লাহর নিয়মের রাজত্বের এক দিক সমাপ্ত। শুরু হবে অনন্তকালের রাজত্ব। সেটাই পরকাল। আমরা সকলেই আল্লাহর সেই রাজত্বে শান্তি-সুখে থাকতে চাই। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দিন-আমীন!

 

 

HTML Comment Box is loading comments...