প্রশ্নোত্তর

দারুল ইফতা

হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

প্রশ্ন (১/৮১) : কুরবানীর চামড়ার মূল্য কি যাকাত বা ছাদাক্বার ৮টি খাতে দান করতে হবে? দান না করে তা নিজে ভক্ষণ করলে শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

-রাকীবুল ইসলাম

ভেড়ামারা, কুষ্টিয়া।

উত্তর : যেহেতু কুরআনে বর্ণিত ছাদাক্বার খাত ৮টি এবং রাসূল (ছাঃ) কুরবানীর চামড়া ছাদাক্বা করার নির্দেশ দিয়েছেন, সেহেতু এর বাইরে তা দান করা বৈধ হবে না (তওবা ৬০, বুখারী, মুসলিম হা/১৩১৭; মিশকাত হা/২৬৩৮)। এছাড়া দান না করে তার মূল্য ভক্ষণ করাও নিষিদ্ধ। রাসূল (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি কুরবানীর চামড়া বিক্রয় করল (অর্থাৎ বিক্রয়লব্ধ মূল্য ভোগ করল) তার কুরবানী হ’ল না (হাকেম, বায়হাক্বী; ছহীহুল জামে‘ হা/৬১১৮)

প্রশ্ন (২/৮২) : মাসবূক অবশিষ্ট ছালাত আদায় করার সময় ইমামের অনুসরণের জন্য সালাম ফিরিয়ে তারপর তা আদায় করবে কি?

-আইয়ূব আলী

পাটগ্রাম, লালমণিরহাট।

উত্তর : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘ছালাতের যে অংশটুকু তোমরা পাও সেটুকু আদায় কর এবং যেটুকু বাদ পড়ে, সেটুকু পূর্ণ কর’ (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৬৮৬)। অর্থাৎ সালাম ফিরানো পর্যন্ত ইমামের অনুসরণ করবে। অতঃপর বাকী অংশ আদায় করার জন্য দাঁড়িয়ে যাবে। যেহেতু সালামের মাধ্যমে ছালাতের পরিসমাপ্তি ঘটে, আর মাসবূকের ছালাত শেষ হয়নি, সেহেতু ইমামের সাথে তাকে সালাম ফিরাতে হবে না। বরং বাকী ছালাত আদায় করার পর সালাম ফিরানোর মাধ্যমে তাকে ছালাত শেষ করতে হবে।

প্রশ্ন (৩/৮৩) : জুম‘আর ছালাতে নিয়মিতভাবে কুনূতে নাযেলা পাঠ করা যাবে কি?

-ওয়াহীদুয্যামান

পাঁচদোনা বাজার, নরসিংদী।

উত্তর : জুম‘আর ছালাতকে এজন্য খাছ করার ব্যাপারে রাসূল (ছাঃ)-এর কোন আমল পাওয়া যায় না। উপরন্তু কোন কোন তাবেঈ এরূপ নির্দিষ্টকরণকে বিদ‘আত বলেছেন (মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ হা/৫৪৫৫-৫৭)। ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বিপদাপদের ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে কুনূতে নাযেলা পাঠ করতেন। পরে তা পরিত্যাগ করতেন। তিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফজরের ছালাতের সাথে এটা পাঠ করতেন (যাদুল মা‘আদ ১/২৭৩)

প্রশ্ন (৪/৮৪) : একই ব্যক্তি ইমাম ও মুওয়াযযিনের দায়িত্ব পালন করতে পারবে কি?

-ইউসুফ, বিরামপুর, দিনাজপুর।

উত্তর : পারবেন, যদি তিনি উভয়ক্ষেত্রে যোগ্যতাসম্পন্ন ও ক্বিরাআতে পারদর্শী হন (বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/১১১৭-১৮)। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা রুকূকারীদের সাথে রুকূ কর’ (বাক্বারাহ ২/৪৩)

প্রশ্ন (৫/৮৫) : জামে‘ ছাগীর ও জামে‘ কাবীর গ্রন্থদ্বয়ের লেখকের নামসহ বিস্তারিত জানতে চাই।

মুস্তাফীযুর রহমান

পূর্বপাড়া, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

উত্তর : উক্ত গ্রন্থদ্বয়ের লেখক হ’লেন, হাফেয জালালুদ্দীন আব্দুর রহমান বিন আবুবকর সৈয়ূতী (রহঃ) (৮৪৯-৯১১ হিঃ)। তিনি তাফসীর, ফিক্বহ, হাদীছ, উছূল, ইতিহাস, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে প্রায় ছয়শ’ গ্রন্থ রচনা করেছেন। অধিক গ্রন্থ রচনার জন্য তাঁকে ‘ইবনুল কুতুব’ বা ‘বইয়ের সন্তান’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। উল্লেখ্য যে, শায়খ আলবানী (রহঃ) জামে‘ ছাগীর গ্রন্থের হাদীছ সমূহ যাচাই-বাছাই করে ছহীহুল জামে‘ ও যঈফুল জামে‘ নামে পৃথকভাবে গ্রন্থ সংকলন করেছেন।

প্রশ্ন (৬/৮৬) : যে ব্যক্তি মক্কার পথে মৃত্যুবরণ করবে কিয়ামতের দিন তার হিসাব গ্রহণ করা হবে না মর্মে বর্ণিত হাদীছটি কি ছহীহ?

-ছফিউল্লাহ খান

রাণীপুরা, কাঞ্চন, নারায়ণগঞ্জ।

উত্তর : হাদীছটি মওযূ‘ বা জাল। এটি বায়হাক্বী শু‘আবুল ঈমান, মুসনাদে হারেছ ও ইবনু ‘আদী সহ কয়েকটি গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। হাদীছটি হযরত জাবের ও আয়েশা (রাঃ) হ’তে মরফূ‘ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। প্রথম সূত্রে ইসহাক বিন বিশ্র আল-কাহেলী নামে একজন রাবী আছেন, যিনি ‘মিথ্যাবাদী’ হিসাবে অভিযুক্ত এবং দ্বিতীয় সূত্রে ‘আয়েয বিন নুসাইর নামে একজন রাবী আছেন, যিনি ‘অধিক ভুলকারী’ হিসাবে দুর্বল (দ্রঃ সিলসিলা যঈফাহ হা/২৮০৪)

প্রশ্ন (৭/৮৭) : হজ্জে গমনের সময় অনেকে মৃত্যুর আশংকায় অথবা যমযম পানিতে ধুয়ে বরকত হাছিলের জন্য কাফনের কাপড় নিয়ে যায়। এরূপ করা কি শরী‘আতসম্মত?

-শহীদুল্লাহ

রসূলপুর, সিরাজগঞ্জ।

উত্তর : এরূপ করা শরী‘আতসম্মত নয়। এছাড়া রাসূল (ছাঃ) হজ্জব্রত পালনকালে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তিকে তার ইহরামের পোষাকেই দাফন করার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ তিনি এ পোষাকেই ক্বিয়ামতের দিন তালবিয়াহ পাঠ করতে করতে উঠবেন’ (বুখারী হা/১৮৫১, মুসলিম, মিশকাত হা/১৬৩৭)। আর যমযম পানিতে কাফনের কাপড় ধৌত করে বরকত হাছিলের আকাঙ্খা করা কুসংস্কার মাত্র। যা অবশ্যই পরিত্যাজ্য (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৪০)

প্রশ্ন (৮/৮৮) : অন্যান্য প্রাণী হারাম হ’লেও মৃত মাছ খাওয়া জায়েয হওয়ার কারণ কি?

-আব্দুল করীম সরদার

বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর : মুমিনের পরিচয় হ’ল মেনে নেওয়া (হাশর ৫৯/৭)। কারণ অনুসন্ধান করা নয়। বিশ্বাস রাখতে হবে যে, শরী‘আতের প্রতিটি বিধানই মানুষের কল্যাণের জন্য নির্ধারিত। তবে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অনেক কিছু প্রমাণিত হচ্ছে। যেমন মৃত মাছ ভক্ষণ জায়েয হওয়ার পিছনে কারণ হ’ল- স্থলভাগের সকল প্রাণী বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং কার্বণ ডাই অক্সাইড ত্যাগ করে। তাই যখন এসব প্রাণীকে যবেহ করা হয়, তখন বিষাক্ত কার্বণ ডাই অক্সাইড রক্তের সাথে বের হয়ে যায়। কিন্তু যখন শ্বাসরোধ করা হয় বা স্বাভাবিকভাবে এসব প্রাণী মৃত্যুবরণ করে, তখন বিষাক্ত রক্ত দেহাভ্যন্তরে গোশতের সাথে থেকে যায়। যা মানুষের জন্য ক্ষতিকর। সেকারণ এসব মৃত প্রাণী খাওয়া নিষিদ্ধ। অন্যদিকে মাছ পানি থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে, যা কার্বণ ডাই অক্সাইড মুক্ত। সুতরাং স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করলেও তাতে ক্ষতিকর কোন উপাদান থাকে না। এজন্যই জলজ হালাল প্রাণী মৃত হ’লেও মানুষের জন্য তা হালাল করা হয়েছে (আত্বীয়া মুহাম্মাদ সালেম, শরহ বুলূগুল মারাম ২/৪)। 

প্রশ্ন (৯/৮৯) : জন্মগতভাবে শিং বা কান না থাকলে উক্ত পশু কুরবানী করা জায়েয হবে কি?

-সারোয়ার হোসাইন

ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

উত্তর : এরূপ পশু কুরবানী করা জায়েয। তবে যেহেতু রাসূল (ছাঃ) শিংওয়ালা পশু কুরবানী দিয়েছেন (বুখারী হা/১৭১২; মিশকাত হা/১৪৫৩) সেহেতু শিংওয়ালা পশু কুরবানী করাই উত্তম। 

প্রশ্ন (১০/৯০) : মসজিদের ভিতরে প্রজেক্টর বা টিভির মাধ্যমে ইসলামী অনুষ্ঠান প্রদর্শন করায় শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

-মামূনুর রশীদ

রাণীগঞ্জ, দিনাজপুর।

উত্তর : টিভি, প্রজেক্টর উভয়টিই আধুনিক প্রচার মাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। যা ভাল-মন্দ উভয় কাজেই ব্যবহার করা সম্ভব। সুতরাং মসজিদ সহ যে কোন স্থানে ইসলামী অনুষ্ঠান প্রচারে এগুলি ব্যবহার করায় শরী‘আতে কোন বাধা নেই।   

প্রশ্ন (১১/৯১) : বৃষ্টি ও সেচ উভয়ের সমন্বয়ে ফসল উৎপাদিত হ’লে কি হিসাবে ওশর প্রদান করতে হবে?

-আব্দুল মজীদ

সাহারবাটী, মেহেরপুর।

উত্তর : শুধু বৃষ্টি, বন্যা বা নালার পানিতে ফসল উৎপন্ন হ’লে ১০ ভাগের এক ভাগ ওশর দিতে হবে এবং শুধু সেচের পানিতে উৎপাদন হ’লে ২০ ভাগের এক ভাগ ওশর দিতে হবে (বুখারী, মিশকাত হা/১৭৯৭)। ওশর ও নিছফে ওশর সম্পর্কিত হাদীছের মর্ম অনুযায়ী ইমাম শাওকানী (রহঃ) বলেন, ‘যে শস্য চাষে অধিক খরচ হয় না, সেখানে দশ ভাগের একভাগ এবং যে শস্য চাষের খরচ অধিক, সেখানে বিশ ভাগের এক ভাগ ওশর দিতে হবে’। ইমাম নববী বলেন, ‘এ বিষয়ে বিদ্বানগণ সকলে একমত’ (নায়লুল আওত্বার ৫/১৮১ পৃঃ ‘ফসল ও ফলের যাকাত’ অনুচ্ছেদ)

প্রশ্ন (১২/৯২) : মসজিদে কোন একটি স্থানকে নিজের জন্য নির্ধারণ করে নেওয়া শরী‘আতসম্মত হবে কি?

-শরফুদ্দীন সিকান্দার

কলাবাগান, ঢাকা।

উত্তর : মসজিদে কোন স্থানকে নির্দিষ্ট করে নেওয়া শরী‘আতসম্মত নয়। আব্দুর রহমান বিন শিবল (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তিনটি কাজ করতে নিষেধ করেছেন। সিজদায় কাকের ন্যায় ঠোকর মারতে, হিংস্র প্রাণীর ন্যায় হাত বিছিয়ে দিতে এবং মসজিদের কোন স্থানকে নিজের জন্য নির্দিষ্ট করে নিতে। উট যেভাবে নিজের জন্য স্থান নির্ধারণ করে নেয়’ (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৯০২)। এ বিষয়ে হাফেয ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, এ ধরনের কাজ মুছল্ল­ীকে রিয়া-য় উপনীত করে (মির‘আতুল মাফাতীহ ৩/২২৩ পৃঃ ‘সিজদা ও তার ফযীলত’ অধ্যায়)

প্রশ্ন (১৩/৯৩) : মহিলারা ট্রেনের মহিলা কামরায় মাহরাম ব্যতীত ভ্রমণ করলে শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

-ছাবির আলী মোল্লা

পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

উত্তর : কোন মহিলা মাহরাম ব্যতীত সফর করতে পারে না’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৫১৩)। তবে নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হ’লে অভিভাবক নিজ দায়িত্বে যে কোন ব্যবস্থা অবলম্বন করতে পারেন (বুখারী হা/৩৫৯৫; মিশকাত হা/৫৮৫৭, ‘নবুঅতের আলামত’ অনুচ্ছেদ)

প্রশ্ন (১৪/৯৪) : বিবাহের ওয়ালীমা কি বিয়ের পরের দিন করাই যরূরী। না পরে করা যাবে?

-আতীকুল ইসলাম

বড় বনগ্রাম, রাজশাহী।

উত্তর : বাসর রাতের পরের দিন ওয়ালীমা করাই সুন্নাত। রাসূল (ছাঃ) যয়নব বিনতে জাহশ (রাঃ)-এর সাথে বাসর রাত অতিবাহিত করার পর ওয়ালীমা করেছিলেন (বুখারী হা/৫১৭০)। তবে তিনদিন পর্যন্তও বিলম্বিত করা যায়। রাসূল (ছাঃ) ছাফিয়াহ (রাঃ)-কে বিবাহের পর তিনদিন যাবৎ ওয়ালীমা খাইয়েছিলেন (মুসনাদে আবু ইয়া‘লা হা/৩৮৩৪, সনদ হাসান)।  

প্রশ্ন (১৫/৯৫) : জনৈক আলেম বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, পৃথিবীতে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে সিজদা দেওয়ার অনুমতি দিলে মাকে সিজদার অনুমতি দিতাম। উক্ত বক্তব্য সঠিক কি?

-আনীসুর রহমান

চাটমোহর, পাবনা।

উত্তর: কথাটি ভিত্তিহীন। সঠিক বক্তব্য হ’ল, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘আমি যদি কাউকে কারু জন্য সিজদা করার হুকুম দিতাম’ তাহ’লে স্ত্রীকে বলতাম তার স্বামীকে সিজদা করার জন্য’ (আবুদাউদ হা/২১৪২, তিরমিযী হা/১১৫৯; মিশকাত হা/৩২৫৫)

প্রশ্ন (১৬/৯৬) : নতুনভাবে ছালাত শুরু করার ক্ষেত্রে যদি কোন সূরা বা দো‘আ মুখস্থ না থাকে তাহ’লে তার জন্য করণীয় কি?

-সাঈদুর রহমান

গাংণী, মেহেরপুর।

উত্তর : তাকে অন্ততঃ আল্লাহু আকবার, সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বা আল্লাহুম্মাগফিরলী বলতে হবে। আব্দুল্লাহ বিন আওফা (রাঃ) বলেন, একজন ব্যক্তি এসে রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করল, আমি কুরআন জানি না। অতএব আমাকে এর স্থলে কিছু শিখিয়ে দিন। তিনি বললেন, তুমি বল ‘সুবহানাল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লাহ ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল ‘আলিঈল ‘আযীম। তখন সে বলল, এ তো আল্লাহর জন্য, আমার জন্য কি? তিনি বললেন, তুমি বল আল্লাহুম্মারহামনী ওয়ারযুক্বনী ওয়া আ‘ফিনী ওয়াহদিনী (আবুদাউদ হা/৮৩২, নাসাঈ হা/৯২৪)। অন্য বর্ণনায় এসেছে দুই সিজদার মাঝে ‘রবিবগফিরলী’ বলবে (ইবনু মাজাহ হা/৮৯৭)। তবে এটি স্রেফ সাময়িক কালের জন্য। কেননা সূরা ফাতিহা ব্যতীত ছালাত সিদ্ধ হয় না (বুখারী হা/৭৫৬; মুসলিম হা/৩৯৪)। সাথে সাথে প্রয়োজনীয় সূরা ও দো‘আ সমূহ শেখার চেষ্টা করতে হবে।

প্রশ্ন (১৭/৯৭) : আরশ সম্পর্কে উমাইয়া বিন আবী সালতের যে কবিতা রাসূল (ছাঃ) সত্যায়ন করেছেন (رجل وثور ....إلا معذبة وإلا تجلد) বলে হাদীছে বর্ণিত হয়েছে (আহমাদ হা/২৩১৪, আবু ইয়া‘লা হা/২৪৮২)। হাদীছটির বিশুদ্ধতা জানিয়ে বাধিত করবেন।

-ডাঃ আমীরুল ইসলাম

শান্তিনগর, জয়পুরহাট।

উত্তর : হাদীছটি যঈফ (আলবানী, যিলালুল জান্নাহ হা/৫৭৯, শু‘আইব আরনাঊত্ব, আহমাদ হা/২৩১৪)

প্রশ্ন (১৮/৯৮) : সিরিয়ার শাসকগোষ্ঠী আলাভী বা নুছায়রিয়াদের আক্বীদা সম্পর্কে জানতে চাই।

-আব্দুল হাসীব

মীরপুর, ঢাকা।

উত্তর : শী‘আদের ইছনা ‘আশারিয়া ফেরকা থেকে বের হওয়া এই গোষ্ঠীটির আক্বীদা কুফরীর পর্যায়ভুক্ত। তাদের প্রধান আক্বীদাগুলি হ’ল : (১) এরা বিশ্বাস করে যে, আলী (রাঃ) তাদের প্রভু। তিনি কাউকে জন্ম দেননি, তাকে কেউ জন্ম দেয়নি। তিনি মারা যাননি, তিনি পানাহার করেন না। (২) তারা খ্রিষ্টানদের ন্যায় ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করে। তাদের মতে, আলীর মধ্যে আল্লাহ প্রবেশ করেছেন। অতঃপর আলী মুহাম্মাদকে সৃষ্টি করেছেন, মুহাম্মাদ সৃষ্টি করেছেন সালমান ফারেসীকে, আর সালমান ফারেসী সৃষ্টি করেছেন পঞ্চ ইয়াতীমকে, যাদের হাতে রয়েছে আসমান-যমীনের নিয়ন্ত্রণ। তারা হ’লেন, মিকদাদ, আবু যর গিফারী, আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা, উছমান বিন মায‘উন ও কুন্বর বিন কাদান (ইনি মানুষের শরীরে রূহ সঞ্চারকারী)। (৩) তারা মনে করে যে, মৃত্যুর পর আলী-এর রূহ মেঘমালায় অবস্থান করছে। সেজন্য তারা মেঘকে সালাম দেয় এবং বিশ্বাস করে যে, মেঘের গর্জন আলী (রাঃ)-এর ধমক এবং বিদ্যুতের চমক তার চাবুকের আঘাত। (৪) তারা হজ্জব্রত পালন করে না। বরং একে কুফরী এবং মূর্তিপূজা বলে আখ্যায়িত করে (৫) তারা মানুষের পুনর্জন্মে বিশ্বাসী। ফলে কিয়ামত, পরকাল, প্রতিদান ও হিসাব-নিকাশকে তারা অস্বীকার করে (ড. গালিব বিন আলী ইওয়াজী, ফিরাক্ব মু‘আছারাহ ২/৫৬১-৬৩)

এদের সম্পর্কে শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, এরা ইহুদী-নাছারাদের চেয়েও এমনকি মূর্তিপূজক হিন্দুদের চেয়েও বড় কাফের। এরা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধরত তাতার ও ফিরিঙ্গী যোদ্ধাদের চেয়ে অধিক ক্ষতিকর। অতীতে বাগদাদের ইসলামী খেলাফত কেবল তাদের সহযোগিতার কারণেই তাতারদের হাতে ধ্বংস হয়েছিল (ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ৩৫/১৪৯-১৫০)

(এদের বর্তমান ভূমিকা বিস্তারিত জানার জন্য পাঠ করুন ‘তাওহীদের ডাক’ পত্রিকা, সেপ্টে-অক্টো’১৩ পৃঃ ৩০-৩৭)

প্রশ্ন (১৯/৯৯) : কোন ব্যক্তি জুম‘আর ছালাতের জন্য মসজিদে গেলে তার প্রতি কদমে এক বৎসরের নফল ছালাত ও ছিয়ামের সমান নেকী হবে মর্মে বর্ণিত হাদীছটির সত্যতা জানিয়ে বাধিত করবেন।

-মুহসিন কামাল

মধ্য বাসাবো, ঢাকা।

উত্তর : হাদীছটি ছহীহ। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুম‘আর দিন ভালভাবে গোসল করে। অতঃপর সকাল সকাল মসজিদে যায় পায়ে হেঁটে, গাড়ীতে নয় এবং আগে ভাগে নফল ছালাত শেষে ইমামের কাছাকাছি বসে ও মনোযোগ দিয়ে খুৎবার শুরু থেকে শুনে এবং অনর্থক কিছু করে না, তার প্রতি পদক্ষেপে এক বছরের ছিয়াম ও ক্বিয়ামের অর্থাৎ দিনের ছিয়াম ও রাতের বেলায় নফল ছালাতের সমান নেকী হয়’ (তিরমিযী, আবুদাঊদ হা/৩৪৫, নাসাঈ, মিশকাত হা/১৩৮৮)

[আত-তাহরীক ৩য় বর্ষ মে ২০০০ (২১/২৩১) নং প্রশ্নোত্তরে ভুল ছিল। এজন্য আমরা দুঃখিত -সম্পাদক]।

প্রশ্ন (২০/১০০) : কোন বিষয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হ’লে নফল ছালাত আদায় করতে হবে মর্মে শরী‘আতে কোন নির্দেশনা আছে কি?

-আতীকুল ইসলাম

নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

উত্তর : শরী‘আতে এরূপ নির্দেশনা রয়েছে। রাসূল (ছাঃ) যখন কোন বিষয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তেন, তখন তিনি নফল ছালাতে দন্ডায়মান হ’তেন (আবুদাঊদ হা/১৩১৯, মিশকাত হা/১৩২৫, সনদ হাসান)। এছাড়া রাসূল (ছাঃ) যখন কোন দুঃখ বা সংকটের সম্মুখীন হ’তেন, তখন এই দো‘আটি পড়তেন  يَا حَىُّ يَا قَيُّوْمُ بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيْثُ ইয়া  হাইয়ু ইয়া ক্বাইয়ূমু বিরাহমাতিকা আস্তাগীছ’ (হে চিরঞ্জীব! হে বিশ্বচরাচরের ধারক! আমি আপনার রহমতের আশ্রয় প্রার্থনা করছি) (তিরমিযী, মিশকাত হা/২৪৫৪)

প্রশ্ন (২১/১০১) : জনৈক আলেম বলেন যে, ঈদের ছালাতে ছানা পাঠ করা যাবে না। উক্ত বক্তব্যের কোন ভিত্তি আছে কি?

-সিরাজুল ইসলাম মাস্টার

দামনাশ, বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখনই কোন ছালাত আরম্ভ করতেন, তখনই তাকবীরে তাহরীমের পর দো‘আয়ে ইস্তেফতাহ পড়তেন (মুসলিম, মিশকাত হা/৮১৩, ‘তাকবীরে তাহরীমার পরে পঠনীয়’ অনুচ্ছেদ)। ঈদের ছালাতেও অনুরূপভাবে প্রথম তাকবীরের পর ছানা পাঠ করতে হবে (ইবনু কুদামা, মুগনী মাসআলা নং ১৪১৬; ওছায়মীন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১৬/২৪০)। তবে জানাযার ছালাতে ছানা না পড়াই মুস্তাহাব (নববী, মাজমূ‘ শারহুল মুহাযযাব ৫/২৩৪, মাজমূ‘ ফাতাওয়া উছায়মীন ১৭/১১৯)

প্রশ্ন (২২/১০২) : ই‘তিকাফে প্রবেশ করার ও বের হওয়ার সঠিক সময় জানিয়ে বাধিত করবেন।

-ইউনুস

মাহমূদপুর, জামালপুর।

উত্তর : ই‘তিকাফ স্থলে সূর্যাস্তের পূর্বে প্রবেশ করবে এবং ঈদের আগের দিন বাদ মাগরিব বের হবে। রাসূল (ছাঃ) রামাযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন (বুখারী হা/২০২৫, মুসলিম; মিশকাত হা/২০৯৭)। আর শেষ দশক বলতে শেষ দশ রাত্রিকে বুঝানো হয় (সূরা ফজর ২)। আর ২০ তারিখ সুর্যাস্তের মাধ্যমে ২১ তারিখ শুরু হয় এবং ১লা শাওয়ালের চন্দ্রোদয়ের মাধ্যমে শেষ হয়। কোন কোন বিদ্বান আয়েশা (রাঃ) কর্তৃক রাসূল (ছাঃ) ই‘তিকাফের ই্চ্ছা করলে ফজরের ছালাত আদায় করার পর তাঁর ই‘তিকাফস্থলে প্রবেশ করতেন (আবুদাঊদ হা/২৪৬৪, ইবনু মাজাহ হা/১৭৭১) মর্মে বর্ণিত হাদীছটি থেকে ফজরের পর ইতিকাফ শুরুর ব্যাপারে মত প্রকাশ করলেও তার জবাবে ওলামায়ে কেরাম বলেন, রাসূল (ছাঃ) আগের দিন সূর্যাস্তের সময় মসজিদে প্রবেশ করে ফজর পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করতেন এবং এরপর স্বীয় ই‘তিকাফস্থলে একাকী হ’তেন (নববী, শরহ মুসলিম ৮/৬৮, ফিক্হুস সুন্নাহ ২/৪৩৭)

প্রশ্ন (২৩/১০৩) : টিভি, ইন্টারনেট তথা মিডিয়া বর্তমানে সমাজকে অশ্লীল কাজে উদ্বুদ্ধ করার প্রধানতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে এগুলি ধর্মীয় জ্ঞানার্জনেরও অন্যতম মাধ্যম। এক্ষণে এ ব্যাপারে আমাদের করণীয় কি?

-সুমাইয়া খাতুন

বান্দাইখাড়া, আত্রাই, নওগাঁ।

উত্তর : কেবল টিভি-ইন্টারনেটই নয় বরং বর্তমান সমাজের সার্বিক পরিস্থিতি মানুষকে সর্বদা পাপের দিকে প্ররোচিত করছে। মূলতঃ এগুলো সবই কিয়ামতের আলামত মাত্র (মুসনাদে বাযযার, সিলসিলা ছহীহাহ হা/২২৩৮)। তবুও এগুলির মধ্যেই সৎভাবে জীবনযাপন করতে হবে এবং সাধ্যমত ‘মুনকার’ এড়িয়ে চলতে হবে। সাথে সাথে সকল প্রকার বৈধ পন্থায় দ্বীনের দাওয়াত দিতে হবে। মক্কায় ইসলামের প্রথমযুগে রাসূল (ছাঃ) যুল-মাজায নামক বাজারে গিয়ে লোকদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন (ইবনু খুযায়মাহ হা/১৫৯, ইবনু হিববান হা/৬৫৬২)। যদিও বাজারকে হাদীছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্থান বলা হয়েছে (মুসলিম, মিশকাত হা/৬৯৬)। কিন্তু রাসূল (ছাঃ)-এর লক্ষ্য ছিল অধিক সংখ্যক লোকের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো। বর্তমান যুগে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া আপামর জনসাধারণের নিকটে দাওয়াত পোঁছে দেওয়ার এক বড় মাধ্যম। সুতরাং এর মাধ্যমে সর্বস্তরের মানুষকে ইসলামী বিধি-বিধান অনুসরণের প্রতি আহবান জানাতে হবে এবং সকল প্রকার অশ্লীলতা হ’তে মানুষকে দূরে রাখার জন্য প্রচার চালাতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি হিকমত ও উত্তম নছীহতের সাথে আল্লাহ্র পথে দাওয়াত দাও’ (নাহল ১২৫)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা আমার পক্ষ হ’তে একটি আয়াত জানা থাকলেও তা অন্যকে পৌঁছে দাও (বুখারী, মিশকাত হা/১৯৮)

প্রশ্ন (২৪/১০৪) : দেনমোহরের অর্থ পরিশোধ করার পূর্বে স্ত্রী মারা গেলে এবং তার পরিবারের সাথে সম্পর্ক না থাকায় তা স্ত্রীর ওয়ারিছদেরকে ফেরত প্রদান করা সম্ভব না হ’লে করণীয় কি?

-ওয়াহীদুযযামান

মান্দা, নওগাঁ।

উত্তর : উক্ত দেনমোহর স্ত্রীর সম্পদ হিসাবে বিবেচিত হবে। অতএব সন্তান থাকলে চার ভাগের একভাগ স্বামী ওয়ারিছ হিসাবে গ্রহণ করবে। বাকী সম্পদ ছেলে-মেয়ে সহ অন্যান্য ওয়ারিছদের মাঝে বণ্টন করে দিবে। আর যদি সন্তান না থাকে তাহ’লে স্বামী অর্ধেক নিবে। বাকী সম্পদ অন্যান্যদের মাঝে বণ্টন করবে। তবে ওয়ারিছদের মাঝে তা বণ্টন করা সম্ভব না হ’লে, উক্ত সম্পদ স্ত্রীর নামে ছাদাক্বায়ে জারিয়া করবে।

প্রশ্ন (২৫/১০৫) : ইসলামী নির্দেশনা অনুযায়ী একজন আমীরের নির্ধারিত কোন মেয়াদকাল আছে কি?

-আব্দুর রহমান

গোদাগাড়ী, রাজশাহী।

উত্তর : ইসলামী শরী‘আত অনুযায়ী আমীর বা ইমাম যতদিন স্বীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে সক্ষম হবেন, ততদিন পালন করে যাবেন। তবে রাষ্ট্রের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মজলিসে শূরা যখন তাকে এ দায়িত্বের জন্য অক্ষম মনে করবে, তখন তাকে অব্যাহতি দিবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘কওমের ঐ আমীর কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবেন, কওমের লোকেরা যাকে (তার যুলুমের কারণে) অপসন্দ করে’ (তিরমিযী হা/৩৫৯)

প্রশ্ন (২৬/১০৬) : খলীফাগণের নির্বাচন পদ্ধতি কি ছিল?

-আব্দুল জলীল, জলঢাকা, নীলফামারী।

উত্তর : পদ্ধতিগত সামান্য পার্থক্য থাকলেও প্রত্যেকেই উম্মতের শ্রেষ্ঠ মানুষদের মাধ্যমেই নির্বাচিত হয়েছিলেন। যার সার-সংক্ষেপ নিম্নে বর্ণিত হ’ল।-

১ম খলীফা হযরত আবুবকর (রাঃ) : রাসূলে করীম (ছাঃ) স্বীয় অনুপস্থিতিতে আবুবকর (রাঃ)-কে দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছিলেন (বুখারী হা/৭১৩, মুসলিম হা/৪১৮; মিশকাত হা/১১৪০)। পরবর্তীতে সাকীফা বনু সা‘এদায় মিলিত হয়ে আলোচনার একপর্যায়ে হযরত আবুবকর (রাঃ)-এর হাতে ওমর (রাঃ)-এর বায়‘আত গ্রহণের মাধ্যমে তা কার্যকর হয়। অতঃপর সকলে তাঁকে খলীফা হিসাবে মেনে নেন (বুখারী হা/৬৮৩০; আল-আহকাম, পৃঃ ৭; ইবনু জারীর তাবারী, তারীখুর রুসুল ওয়াল মুলূক ৩/২৪১-২৪৩)

২য় খলীফা ওমর (রাঃ) : বিদায়ী খলীফা আবুবকর (রাঃ) মৃত্যুকালীন সময়ে বিশিষ্ট ছাহাবীগণের সাথে পরামর্শক্রমে পরবর্তী খলীফা হিসাবে তাঁকে নির্বাচন করেন। অতঃপর বিষয়টি উপস্থিত ছাহাবায়ে কেরামের নিকটে তিনি পেশ করলে সকলে তাতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন (তারীখে ত্বাবারী ২/৩৫২, ৩৫৩; ইবনু সা‘দ, তাবাক্বাতুল কুবরা ৩/১৯৯-২০০)

৩য় খলীফা ওছমান (রাঃ) : ওমর (রাঃ) শাহাদাত বরণকালে ছয়জনকে নিয়ে একটি ‘শূরা’ গঠন করে দেন, যাদের প্রত্যেকেই দুনিয়াতে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ছিলেন। তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে ওছমান (রাঃ)-কে পরবর্তী খলীফা হিসাবে নির্বাচন করেন (বুখারী হা/৩৭০০; আল-বিদায়াহ ৭/১৫২)

৪র্থ খলীফা আলী (রাঃ) : ওছমান (রাঃ)-এর শাহাদাত বরণের পর হযরত আলী (রাঃ)-কে খেলাফত গ্রহণের অনুরোধ করা হ’লে তিনি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘এটা তোমাদের এখতিয়ার নয়। বরং এটি বদরী ছাহাবা ও শূরা সদস্যদের দায়িত্ব। তাঁরা একত্রে বসে যাকে মনোনীত করবেন, তিনিই খলীফা হবেন’ (আশ-শূরা পৃঃ ১০৩)। পরবর্তীতে মুহাজির ও আনছার ছাহাবীগণের অনুরোধ মসজিদে নববীতে তিনি বায়‘আত গ্রহণ করেন। রাসূল (ছাঃ)-এর চাচা আববাস (রাঃ) সর্বপ্রথম তার বায়‘আত গ্রহণ করলে বাকী সকলে তাঁর প্রতি আনুগত্যের বায়‘আত নেন (আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৭/২২৫-২৬; তারীখে ত্বাবারী ৪/৪২৭-২৮)

চারজন খলীফা নির্বাচিত হয়েছিলেন উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের পরামর্শক্রমে। তাঁদের মধ্যে দুনিয়াবী কোন স্বার্থ ছিল না, ছিল না নেতৃত্বের প্রতি সামান্যতম কোন লোভ। তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল জান্নাত। উম্মতের একান্ত প্রয়োজনেই কেবল তাঁরা খেলাফতের এই কঠিন দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং বর্তমান যুগের নেতৃত্ব চেয়ে নেওয়ার এ রাজনীতির সাথে ইসলামী খেলাফতের সামান্যতম কোন সম্পর্ক নেই (বিস্তারিত দ্রঃ ‘ইসলামী খেলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন’ বই)।  

প্রশ্ন (২৭/১০৭) : ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন’ কেবল দাওয়াতী কাজ করে, রাজনৈতিক ময়দানে তাদের কোন কার্যক্রম নেই। অতএব এটি কি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী আন্দোলন?

-আহমাদুল্লাহ, বুড়িচং, কুমিল্লা।

উত্তর : ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন’ একটি খাঁটি ও পূর্ণাঙ্গ ইসলামী আন্দোলনের নাম। যে আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনসহ সমাজের সকল ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ ইসলামী শরী‘আত বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালানো হয়। দুনিয়াবাসীর প্রতি এ আন্দোলনের একমাত্র আহবান- আসুন! পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে জীবন গড়ি। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শরী‘আতের বিধানসমূহ পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এ আন্দোলনের সকল কর্মসূচী প্রণীত। যা হক-এর পথে দাওয়াত ও বাতিলের বিরুদ্ধে আপোষহীন জিহাদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে ইনশাআল্লাহ। এটাই হ’ল নবীগণের চিরন্তন তরীকা। কেননা ব্যক্তির আক্বীদা-আমল ও চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন ব্যতীত স্থায়ীভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন কখনোই সম্ভব নয়।

প্রশ্ন (২৮/১০৮) : প্রয়োজনীয় ছবি তোলা ও প্রিন্ট করার ব্যবসা করা যাবে কি?

-শহীদুল ইসলাম, দুর্গাপুর, রাজশাহী।

উত্তর : সাধারণভাবে প্রাণীর ছবি তোলা নিষিদ্ধ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৪৪৯৮, ‘ছবিসমূহ’ অনুচ্ছেদ)। ছবি সম্পর্কিত হাদীছসমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, সম্মানের উদ্দেশ্যে অর্ধদেহী বা পূর্ণদেহী সকল প্রকার প্রাণীর ছবি টাঙানো বা স্থাপন করা নিষিদ্ধ। তবে বাধ্যগত কারণে, জনগুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যে, রেকর্ড রাখার স্বার্থে ও হীনকর কাজে ব্যবহারের জন্য ছবি তোলা চলে (দ্রঃ ‘ছবি ও মূর্তি’ বই)। সে হিসাবে পাসপোর্ট, ভিসা, আইডেন্টিটি কার্ড, লাইসেন্স, পলাতক আসামী ধরার জন্য, গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড রাখার জন্য ইত্যাদি বাধ্যগত ও যরূরী কারণে ছবি তোলা জায়েয। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সাধ্যমত আল্লাহকে ভয় কর’ (তাগাবুন ১৬; বাক্বারাহ ২৩৩, ২৮৬)। তবে বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে  কেবল এসব কাজের জন্য উক্ত ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন। সুতরাং এরূপ পেশা থেকে দূরে থাকাই উত্তম।

প্রশ্ন (২৯/১০৯) : আমরা যেভাবে প্রতি বছর কুরবানীর বিধান পালন করে থাকি। ইব্রাহীম (আঃ) যতদিন বেঁচে ছিলেন তিনিও কি প্রতি বছর কুরবানী করেছিলেন?

শফীকুল ইসলাম, গাবতলী, বগুড়া।

উত্তর : আল্লাহ বলেন, প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমরা কুরবানীর বিধান দিয়েছি (হজ্জ ২২/৩৪)। সুতরাং ইবরাহীম (আঃ)-এর উপরেও উক্ত বিধান জারী ছিল তাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে তার পদ্ধতি ও বিধান সম্পর্কে আমাদের জানানো হয়নি।

প্রশ্ন (৩০/১১০) : ওয়ারিছের অনুমতি সাপেক্ষে কোন ব্যক্তি কি তার সম্পূর্ণ সম্পদ কাউকে দান করতে পারেন? অনুমতি প্রদানের পর পরবর্তীতে তা পুনরায় দাবী করলে সেক্ষেত্রে করণীয় কি?

মুহসিন, কলারোয়া, সাতক্ষীরা।

উত্তর : সম্পদের অধিকারী ব্যক্তি উত্তরাধিকারীদের অনুমতি নিয়ে স্বেচ্ছায় যাকে খুশী দান করতে পারেন। তাবূকের যুদ্ধের সময় রাসূল (ছাঃ) ছাহাবায়ে কেরামকে দান করা জন্য উদ্বুদ্ধ করলে আবুবকর (রাঃ) পরিবার-পরিজন থাকা সত্ত্বেও তাঁর সম্পূর্ণ সম্পদ দান করে দেন (আবুদাঊদ হা/১৬৭৮)

আর অনুমতি প্রদানের পর তা ফিরিয়ে নেওয়ার কোন সুযোগ নেই। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, দান করে ফেরত নেওয়া বমি করে বমি খাওয়ার ন্যায় (আবুদাঊদ হা/৩৫৩৯)

প্রশ্ন (৩১/১১১) : ব্রাক, আশা, কেয়ার প্রভৃতি এনজিওতে চাকুরী করা বা তাদের সাথে যে কোন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করায় শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

-লিয়াকত আলী

সোনাবাড়িয়া, কলারোয়া, সাতক্ষীরা।

উত্তর : এধরনের এনজিওতে চাকুরী করা শরী‘আতসম্মত হবে না। কেননা এরা সমাজে কিছু কিছু ভাল কাজের আড়ালে ক্ষুদ্র ঋণের নামে সূদী কার্যক্রমে মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। এছাড়াও তারা ধর্মান্তরকরণ, নারীর পর্দাহীনতা, একসন্তান নীতি প্রভৃতি ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ডে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। সুতরাং এসব এনজিওতে চাকুরী করার মাধ্যমে মূলতঃ অন্যায় কর্মে সহায়তা করা হবে। আর গুনাহের কাজে সহায়তা করা নিষিদ্ধ (মায়েদাহ ২)

প্রশ্ন (৩২/১১২) : বেড়ানো বা পড়াশুনার উদ্দেশ্যে অমুসলিম দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

-আব্দুর রঊফ, শাহজাহানপুর, বগুড়া।

উত্তর : কোন বাধা নেই। তবে এর জন্য কিছু শর্ত রয়েছে। (১) নিজের ঈমান-আক্বীদা সংরক্ষণ করা সম্ভব হ’লে। (২) নিজেকে সকল প্রকার পাপের কর্ম থেকে হেফাযত করতে সক্ষম হ’লে। যদি এ দু’টি শর্ত পূরণ করা সম্ভব হবে না বলে নিশ্চিত ধারণা হয়, তবে সেখানে যাওয়া থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়। কেননা দুনিয়া পাওয়ার জন্য আখেরাতকে হারানো মুমিনের জন্য বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক নয়। নিতান্তই যেতে বাধ্য হ’লে সেখানে গিয়ে নিজের আক্বীদা ও আমলগত স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে হবে। অন্যদের সাথে মিশতে হ’লে তাদের হেদায়াতের উদ্দেশ্যে মিশতে হবে। কোন অবস্থাতেই অমুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া যাবে না। তাদের সামঞ্জস্য অবলম্বন করা যাবে না। তাহ’লে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৪৩৪৭)। তাছাড়া রাসূল (ছাঃ) মুশরিকদের মাঝে বসবাসকারী প্রত্যেক মুসলিম থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছেন (আবুদাঊদ হা/২৬৪৫, তিরমিযী হা/১৬০৪)। অর্থাৎ মুসলিম পরিবেশেই তাকে থাকতে হবে। বিরোধী পরিবেশে থেকে ঈমান হারালে সে দায়িত্ব তাকেই বহন করতে হবে।

প্রশ্ন (৩৩/১১৩) : আমার স্বামীকে ২০ বছর যাবৎ নানাভাবে বুঝানোর পরেও মাসে কয়েকদিন ব্যতীত সে ছালাত আদায় করে না। এক্ষণে উক্ত স্বামীর সাথে বসবাস করা জায়েয হবে কি?

-শিরীন শারমীন, ধানমন্ডি, ঢাকা।

উত্তর : ঐ ব্যক্তির ছালাত মুনাফিকের ছালাত হিসাবে গণ্য হবে (নিসা ৪/১৪২)। ছালাতের ফারয়িযাতকে প্রকাশ্যে অস্বীকার না করা পর্যন্ত সে প্রকৃত কাফের নয়। অতএব তার সঙ্গে বসবাস করা যাবে। তবে তার উপর কঠোরতা আরোপ করতে হবে (তওবা ৯/৭৩)। তাকে সাধ্যমত হেদায়াতের চেষ্টা করে যেতে হবে। অন্যথা ‘খোলা’-র মাধ্যমে তার থেকে পৃথক হয়ে যেতে হবে (বুখারী হা/৫২৭৩; নাসাঈ হা/৩৫১০; মিশকাত হা/৩২৭৪)

প্রশ্ন (৩৪/১১৪) : লওহে মাহফূয সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই।

-এনামুল হক, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

উত্তর : লওহে মাহফূয হচ্ছে এক কিতাব। যার মধ্যে সকল সৃষ্টির তাক্বদীর সহ অতীত এবং ভবিষ্যতের যাবতীয় বিষয় লিখিত আছে (তিরমিযী হা/২১৫৫; মিশকাত হা/৯৪)। কুরআনও তার মধ্যে লিখিত রয়েছে (বুরূজ ২২)

প্রশ্ন (৩৫/১১৫) : জিন ও মানুষ ব্যতীত অন্য কোন উন্নত বুদ্ধি সম্পন্ন সৃষ্টি সম্পর্কে কুরআন ও ছহীহ হাদীছে কিছু পাওয়া যায় কি?

-কাবীরুল ইসলাম, ঢাকা।

উত্তর : কুরআন ও হাদীছে জিন, মানুষ আর ফেরেশতা ছাড়া অন্য কোন উন্নত বুদ্ধি সম্পন্ন সৃষ্টি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় না। যদি থেকেও থাকে তাহ’লে তা গায়েবী বিষয়। সে সম্পর্কে আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।

প্রশ্ন (৩৬/১১৬) : আলেমগণের মাঝে মতভেদের কারণ কি এবং এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের করণীয় কি? কিরূপ মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে গোনাহ হয় না? ব্যাখ্যাগত মতপার্থক্যের কারণে যে সামাজিক বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়, সেক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের করণীয় কি?

-লাবীব

শর্ষিনা, নেছারাবাদ, পিরোজপুর।

উত্তর : আলেমগণের মাঝে মতভেদের কারণগুলো হচ্ছে : (১) কুরআন এবং ছহীহ হাদীছ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও ফৎওয়া প্রদান করা। (২) নিজ নিজ মাযহাবের অন্ধ অনুসরণ করা। (৩) ছহীহ দলীল পাওয়া সত্ত্বেও রেওয়াজ বা বাপ-দাদার দোহাই দিয়ে অথবা যিদ ও হঠকারিতা বশতঃ নিজের মতকে প্রাধান্য দেওয়া। (৪) সালাফে ছালেহীনের বুঝকে অগ্রাহ্য করা। এসব কারণে উক্ত আলেমগণ অবশ্যই গুনাহগার হবেন এবং উপরোক্ত নিদর্শনসমূহ কোন আলেমের মধ্যে পাওয়া গেলে তার থেকে দূরে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য কর্তব্য হবে।

হকপন্থী আলেমগণের মাঝেও অনেকসময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে মতভেদ পরিদৃষ্ট হয়। যার কারণসমূহ নিম্নরূপ : (১) কোন বিষয়ে কোন আলেমের নিকটে দলীল না পৌঁছা। (২) দলীল ভুলে যাওয়ার কারণে ফৎওয়া ভুল হওয়া (৩) দলীলের ব্যাখ্যায় বুঝ ভিন্ন হওয়া (৪) যে দলীলের ভিত্তিতে ফৎওয়া প্রদান করা হয়েছে, তা পরবর্তীতে যঈফ প্রমাণিত হওয়া (৫) ছহীহ দলীল সমূহের মাঝে সমন্বয়ে ব্যর্থ হওয়া ইত্যাদি। ছাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে শুরু করে যুগ পরস্পরায় এরূপ বহু দৃষ্টান্ত দেখা যায়। এরূপ অনাকাংখিত এবং ইজতিহাদী ভুলের কারণে তাদের গোনাহগার হতে হবে না। কিন্তু এইসব মতভেদকে কেন্দ্র করে কোন বিদ্বানের প্রতি অতিভক্তি বা অতিবিদ্বেষ পোষণের কারণেই মূলতঃ সামাজিক বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কর্তব্য হবে বক্তব্যগুলি যাচাই করা এবং যাঁর বক্তব্য বিশুদ্ধতম হাদীছের সর্বাধিক অনুকূলে এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের ব্যাখ্যা ও সালাফে ছালেহীনের বুঝের সাথে সামঞ্জস্যশীল হবে, সেটি গ্রহণ করা। সাথে সাথে হকপন্থী সকল বিদ্বানের প্রতি সুধারণা পোষণ করা।

প্রশ্ন (৩৭/১১৭) : অনেক গৃহকর্তা বা কত্রী কাজের মানুষদের সাথে দাস-দাসীর ন্যায় আচরণ করে থাকে এবং তাদের অনেক নীচু পর্যায়ের বলে মনে করে। তাদেরকে নিম্ন মানের পোষাক, খাবার, আবাসস্থল প্রদান করে। এক্ষণে এরূপ আচরণের পরিণাম এবং এদের সাথে আচরণ কেমন হওয়া উচিত সে সম্পর্কে জানিয়ে বাধিত করবেন।

-নূরে আলম ছিদ্দীক্বী, মতিঝিল, ঢাকা।

উত্তর : ইসলামের দৃষ্টিতে সকল মানুষের অধিকার সমান। প্রত্যেকেই এক আদমের সন্তান। কারু উপর কারু কোন প্রাধান্য নেই তাক্বওয়া ব্যতীত (আহমাদ হা/২৩৫৩৬; ছহীহাহ হা/২৭০০)। যিনি যতবেশী আল্লাহভীরু, তিনি ততবেশী সম্মানিত (হুজুরাত ৪৯/১৩)। আল্লাহ মানুষে মানুষে কর্মবিভাগ সৃষ্টি করেছেন, তাদের পরস্পর থেকে কাজ নেবার জন্য (যুখরুফ ৪৩/৩২)। কাউকে মনিব, কাউকে কর্মচারী বানানোর মধ্যে রয়েছে এক দূরদর্শী মহাপরিকল্পনা। যার মাধ্যমে আল্লাহ পৃথিবী পরিচালনা করে থাকেন। এই কর্মবিভাগের মধ্যে প্রত্যেকের জন্য রয়েছে পরীক্ষা। কে সবচেয়ে সুন্দর আমল করতে পারে (মুল্ক ৬৭/২)

হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, আমি দশ বছর রসূল (ছাঃ)-এর খেদমত করেছি, আমার সব কর্ম তিনি যেভাবে চাইতেন সেভাবে করতে পারতাম না। তা সত্ত্বেও তিনি কখনও আমাকে সামান্যতম কষ্ট দিয়ে কথা বলেননি এবং তিনি বলেননি যে, কেন এটা করেছ এবং কেন এটা করনি? (আবুদাঊদ হা/৪৭৭৪)। রাসূল (ছাঃ) মনিবদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, তোমাদের অধীনস্তদের তোমরা তাই খেতে দাও, যা তোমরা খাও। তাদেরকে তাই পরিধান করাও, যা তোমরা পরিধান কর। তাদেরকে এমন দায়িত্ব দিয়ো না যা তাদেরকে অপারগ করে দেয়। যদি তাদেরকে কোন কষ্টকর কাজ দাও, তাহ’লে তোমরা তাদেরকে সহযোগিতা কর (ইবনু মাজাহ হা/৩৬৯০)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘যখন তোমাদের কারও খাদেম খানা তৈরী করে, অতঃপর সে উক্ত খানা তার মালিকের সম্মুখে উপস্থিত করে, অথচ সে আগুনের তাপ ও ধোঁয়ার কষ্ট সহ্য করেছে, তবে যেন মালিক তাকে নিজের সাথে বসায় এবং নিজের সাথে খানা খাওয়ায়। খাদ্যের পরিমাণ কম হ’লে অন্তত তা হ’তে এক/দুই লোকমা খাদ্য যেন তার হাতে তুলে দেয়’ (মুত্তাফাক ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৩৩৪৭)

তিনি বলেন, যে ব্যক্তি কাউকে অন্যায়ভাবে গালি দেয়, অপবাদ দেয়, অপরের মাল ভক্ষণ করে, খুন করে, প্রহার করে বা কোনরূপ অন্যায় করে, ক্বিয়ামতের দিন তার নিকট হ’তে তার পূর্ণ প্রতিশোধ নেওয়া হবে’ (মুসলিম হা/২৫৮১)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, তোমরা তোমাদের দুর্বল শ্রেণীর মধ্যে আমাকে তালাশ কর। কেননা তোমরা রূযীপ্রাপ্ত হয়ে থাক ও সাহায্য প্রাপ্ত হয়ে থাক তোমাদের দুর্বলদের মাধ্যমে (আবুদাঊদ হা/২৫৯৪)। অতএব গরীবদের প্রতি দয়াশীলতাই রাসূল (ছাঃ)-এর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তাছাড়া ধনীদের পাঁচশ’ বছর পূর্বে গরীবরা জান্নাতে প্রবেশ করবে’ (তিরমিযী হা/২৩৫১)। অতএব তাদেরকে অমর্যাদা নয় বরং সম্মান করা কর্তব্য।

প্রশ্ন (৩৮/১১৮) : যেসব বিদ‘আতীদের সালাম প্রদান করা যাবে না তাদের কোন পর্যায় রয়েছে কি? না কি সাধারণভাবে সকল প্রকার বিদ‘আতীকেই সালাম প্রদান থেকে বিরত থাকতে হবে?

-ইউসুফ মোল্লা

আলীবহর, শ্যামপুর, ঢাকা।

উত্তর : বিদ‘আতীর বিদ‘আত যদি শিরক বা কুফরীর পর্যায়ভুক্ত হয়, তাহ’লে তাকে সালাম প্রদান করা যাবে না। যেমন নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট কিছু প্রার্থনা করা বা তাকে অসীলা ধরা, অথবা আওলিয়াগণ মরেন না, তারা অপরকে সাহায্য করতে পারেন এরূপ আক্বীদা পোষণ করা। শিরক বা কুফরের পর্যায়ভুক্ত না হলেও সালাম দেয়া থেকে বিরত থাকা যাবে, যদি এর দ্বারা ধর্মীয় কোন উপকার হয়। যেমন সালাম না দিলে যদি তার বিদ‘আত পরিত্যাগের সম্ভাবনা থাকে। তবে যদি এরূপ ধর্মীয় উপকার হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তাহ’লে তাকে সালাম দিয়ে নছীহত করা অব্যাহত রাখবে।  কেননা কোন মুসলিম ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশী কথা বলা বন্ধ রাখতে রাসূল (ছাঃ) নিষেধ করেছেন (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫০২৭)

প্রশ্ন (৩৯/১১৯) : রাসূল (ছাঃ)-এর অসীলায় প্রার্থনা করা বা কোন বিপদে তার নিকটে সাহায্য কামনা করা কি শরী‘আতসম্মত?

-আব্দুল কাদের, মোল্লাহাট, বাগেরহাট।

উত্তর : রাসূল (ছাঃ)-এর অসীলায় প্রার্থনা করা বা কোন বিপদে তার নিকটে সাহায্য কামনা করা বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ বলেন, ‘(হে নবী!) তুমি বলে দাও যে, আমি তোমাদের কোনরূপ ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতা রাখি না’ (জিন ৭২/২১)। রাসূল (ছাঃ) নিজ কন্যা ফাতেমা (রাঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বলেন, হে ফাতেমা বিনতে মুহাম্মাদ! তুমি নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও। আমি ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর শাস্তি থেকে তোমাকে রক্ষায় কিছুই করতে পারব না’ (মুসলিম হা/২০৪; মিশকাত হা/৫৩৭৩)। আল্লাহ বলেন, হে নবী! তুমি বলে দাও, আমি আমার নিজের কোন উপকার ও ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখি না, আল্লাহ যা চান তা ব্যতীত। আর আমি যদি গায়েব জানতাম, তাহ’লে অধিক অধিক কল্যাণ লাভ করতাম এবং আমাকে কোন ক্ষতি স্পর্শ করতে পারত না (আ‘রাফ ৭/১৮৮)। যে রাসূল নিজের কোন উপকার করার ক্ষমতা রাখেন না, মৃত্যুর পরে তাঁর পক্ষে অপরের উপকার করা কিভাবে সম্ভব? তাহ’লে তো তিনি জামাতা আলী এবং নাতি হাসান ও হোসাইনকে নিহত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারতেন।

ওমর ফারূক (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহ! আমরা তোমার নবীর অসীলায় বৃষ্টি প্রার্থনা করতাম এবং তুমি আমাদের বৃষ্টি দিতে। এখন (তাঁর মৃত্যুর পরে) নবীর চাচা (আববাস)-এর অসীলায় বৃষ্টি প্রার্থনা করছি। অতএব তুমি আমাদের বৃষ্টি দাও! অতঃপর বৃষ্টি হ’ত (বুখারী হা/১০১০; মিশকাত হা/১৫০৯)। এতে পরিষ্কার যে, জীবিত মানুষের অসীলা ধরা যায়। কিন্তু মৃত মানুষের নয়। তাই তিনি নবী-রাসূল বা যেই-ই হৌন না কেন। সেজন্যই রাসূল (ছাঃ) আব্দুল্লাহ্ ইবনু আববাসকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তুমি কিছু চাইলে আল্লাহ্র নিকটেই চাও, সাহায্য প্রার্থনা করলে আল্লাহ্র কাছেই প্রার্থনা কর’ (আহমাদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/৫৩০২)। কিছু যঈফ ও জাল হাদীছ দ্বারা ছূফীরা অসীলা সাব্যস্ত করার চেষ্টা করে থাকে মাত্র (দ্রঃ আলবানী, আত-তাওয়াসসুল পৃঃ ১০১-০৩)

প্রশ্ন (৪০/১২০) : অনেক মানুষকে ইসলামের বিভিন্ন বিধান সম্পর্কে বললে তারা সেগুলিকে শাখাগত বিষয় বলে এড়িয়ে যান। যেমন দাড়ি রাখা প্রসঙ্গে। এক্ষণে দ্বীনের মধ্যে মৌলিক ও শাখাগত বিষয় বলে কোন পার্থক্য আছে কি?

-মুখতার, বাগহাটা, নরসিংদী।

উত্তর : আল্লাহ বলেন, আমার রাসূল তোমাদেরকে যা দেন তা  গ্রহণ  কর এবং  যা নিষেধ করেন,  তা থেকে বিরত হও’ (হাশর ৫৯/৭)। আর তিনি কোন কথাই বলেন না আল্লাহ্র ‘অহী’ ব্যতীত (নাজম ৫৩/৩-৪)। অতএব তাঁর আনীত ইসলামের ছোট-বড় সকল বিধানই মর্যাদার দিক দিয়ে সমান। ছাহাবায়ে কেরাম সকল আদেশ-নিষেধকে সমান মর্যাদা দিতেন ও তা পালনের জন্য জীবনপাত করতেন। অতএব গুরুত্বের বিবেচনায় কমবেশী হ’লেও মর্যাদায় সবই সমান। বিশেষ করে দাড়ি রাখাটা হ’ল একটি নিদর্শনমূলক সুন্নাত। যেটি সকল নবী-রাসূলের পালিত সুন্নাত। এটি রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাত অনুযায়ী রাখতে হবে, অন্যের অনুকরণে নয়। অতএব শরী‘আতে যে বস্ত্ত যেভাবে বলা হয়েছে, সেভাবেই পালন করতে হবে। মূল ও শাখা বলে পার্থক্য বা হালকা করা যাবে না। ফক্বীহগণ শব্দ দু’টি ব্যবহার করে থাকেন গুরুত্ব বুঝানোর জন্য। হালকা বা অবজ্ঞা করার জন্য নয়।

 

 

HTML Comment Box is loading comments...