ভ্রমণস্মৃতি

কোয়েটার ঈদস্মৃতি

আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব

এ বছর কুরবানী ঈদের কথা। ঈদের ২ সপ্তাহ পূর্বে ইসলামাবাদ নেমেছি। দেশের বাইরে এই প্রথম আসা। সবকিছুই মনে হয় নতুন। চোখের তারায় খেলা করে সদ্য শৈশবউত্তীর্ণ কৈশোরের কৌতুহল। সবকিছুকে নিজ দেশের অভিজ্ঞতার সাথে তুলনা করার চেষ্টা। এমনকি রাস্তার পার্শ্বে অবহেলায় পড়ে থাকা ঝোপজঙ্গলগুলোও নযর এড়ায় না। প্রতিটা মুহূর্তই যেন উপহার দিতে থাকে নিত্য নতুন বিস্ময়। তবে আসল বিস্ময়ের পালা শুরু হয়েছিল ঢাকা বিমানবন্দর থেকেই। ৩০শে সেপ্টেম্বর’১৩ সোমবার দুপুরে আববা-আম্মাসহ পরিবারের সবার উপস্থিতিতে বিদায় নিচ্ছি...অথচ আনন্দঘন কিংবা দুঃখঘন, কোন অনুভূতিই টের পাচ্ছি না। কেবলই ভয় হচ্ছে ইমিগ্রেশনে কোন ঝামেলা করে কি-না। পাকিস্তানের নাম শুনলে তো সারা বিশ্বেরই পিলে চমকায়। তার উপর বাংলাদেশ। পরিস্থিতি কেমন তা তো বলাই বাহুল্য। চেক-ইন করার পর বোর্ডিং কার্ড হাতে পেলাম। সেখান থেকে বিমানবন্দরের স্টাফ আবুবকর ভাই আমাকে ইমিগ্রেশনে ঢুকিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। ইমিগ্রেশনে বেশ কয়েকটি কাউন্টার। সেখানে বসে থাকা অফিসারদের চেহারা পড়ার চেষ্টা করছি। যাদেরকে দেখে আশ্বস্ত হওয়ার মত তাদের সামনে প্রচুর ভীড়। অপেক্ষা করছি। এদিকে সময় বয়ে যাচ্ছে। এমন সময় একজন অফিসার ফাঁকা হ’লেন। কিন্তু তাঁর চেহারা দেখে মনে হ’ল আমাকে আটকানোর জন্যই বুঝি তার নিয়োগ পাওয়া। চোখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু চোখের কোনে ধরা পড়ল তিনি আমার দিকেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। ইশারা পরিষ্কার। যেখানে বাঘের ভয় সেখানে রাত হয়। অবশেষে দ্বিধা ঝেড়ে কম্পিত পদে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। তিনি কাগজ-পত্র মনোযোগ দিয়ে দেখছেন আর আমি খুঁজছি ‘পাকিস্তান’ শব্দটা দেখে তাঁর চেহারায় কোনরূপ কুঞ্চনরেখা দৃশ্যমান হয় কি-না। বেশ কিছুক্ষণ সময় ধরে সবকিছু দেখে তিনি কেবল জিজ্ঞেস করলেন, কি উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন? আমি স্বাভাবিকভাবেই জওয়াব দিলাম। তিনি আর দ্বিরুক্তি না করে ছবি তোলার পর পাসপোর্ট ফেরৎ দিয়ে দিলেন। এত সহজে ব্যাপারটা হয়ে গেল যে, আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। বুক থেকে যেন বিরাট এক পাথর নেমে গেল। আলহামদুলিল্লাহ। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মন থেকে অফিসারকে একটা ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম। এতক্ষণে আমার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এল। পিছনে তাকিয়ে দেখলাম আমাদের কাউকে আর দেখা যাচ্ছে না। সামনে এগুলাম। ‘পিআইএ’র কাউন্টারের সামনে দেখি লম্বা লাইন। ফ্লাইটটি মূলতঃ দুবাই যাবে। মাঝখানে করাচিতে ট্রানজিট। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর বোর্ডিং পাস চেক করিয়ে তারপর ডিপার্চার লাউঞ্জে বসলাম। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে বিমানবন্দরের বিশাল রানওয়ে। আর অনাবাদী পতিত ভূমির মত পড়ে থাকা বিবর্ণ ধূসর টার্মিনাল গ্রাউন্ডে যাতায়াত করা বিমানগুলোকে মনে হচ্ছে যেন চরে বেড়ানো কিছু ঘাস ফড়িং। পিআইএ’র পিকে-০২৬৭ বোয়িং ৭৭৭ জেট এয়ারবাসটি তখন পার্কিং-এ চলে এসেছে। শীঘ্রই এনাউন্স হ’ল। ছোট্ট টানেল অতিক্রম করে ৩৯৩ জন যাত্রী বহন ক্ষমতাসম্পন্ন বিমানটিতে উঠে বসলাম। বিজনেস ক্লাসের পরের কম্পাউন্ডেই সীট পড়েছে।  তবে  জানালার  ধারে  না  হওয়ায়  একটু  হতাশ

ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, ইসলামাবাদ, পাকিস্তান।

হ’লাম। যাত্রী উঠার পরও বিমান ছাড়তে বেশ লেট হচ্ছে। সেই ফাঁকে প্রিয়জনদের সাথে আরেকবার কথা বললাম মোবাইলে। বেলা দেড়টার সময় প্লেন টেক অফের জন্য মুভ করা শুরু করল। ট্যাক্সিং-এর পর রানওয়েতে এসে প্লেন ক্ষণিকের জন্য থামে। তারপর ইঞ্জিন সবগুলো পূর্ণ চালু করে দিয়ে প্রবল গতিতে ধেয়ে যায় টেকঅফের জন্য। এ সময় গতি থাকে সাধারণতঃ ঘন্টায় ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশী। এই সময়টিই সবচেয়ে উপভোগ্য। প্রচন্ড গতিসম্পন্ন হয়ে একসময় বিশালদেহী যানটি ছোট্ট ধাক্কা দিয়ে ভূমির মায়া ছেড়ে উড়াল দিল দিগন্তের পানে। তারপর হেলেদুলে কোলাহল মুখর রাজধানী ঢাকার আকাশ চিরে ধীরে ধীরে উঠে যেতে লাগল দূরে...বহুদূরে। ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হ’তে লাগল নিচের যমীন।

সামনের টিভিপর্দায় প্রতি মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে বিমানের গতি ও অবস্থান। ঘন্টাখানেকের মধ্যে বাংলাদেশ ছেড়ে কলকাতা। কলকাতা হয়ে আহমেদাবাদ আর কত জানা-অজানা শহর-বন্দরের উপর দিয়ে চলতে লাগল বিমানটি। মাঝখানে টয়লেটে যাওয়ার সময় হঠাৎ দেখা হয়ে গেল আমাদের কুমিল্লার এক ভাইয়ের সাথে। তিনি দুবাই যাচ্ছেন। গত রামাযানে কুমিল্লায় সাংগঠনিক সফরে গিয়ে তার সাথে দেখা হয়েছিল। অনেকক্ষণ গল্প-গুজব হ’ল তাঁর সাথে। বিমানে অনেক সীটই ফাঁকা ছিল। তাই শেষ ঘন্টায় জানালার পাশে এক ফাঁকা সীটে বসলাম। নীচে মেঘের অপরূপ শ্বেত শুভ্র সাগর। সেই সাগরের ফাঁক গলে মাঝে মধ্যে দৃশ্যমান হচ্ছে যমীনের পটভূমিকায় ছবির মত অাঁকানো ফসলের ক্ষেত আর নদী-নালা। উপরের আসমান কেবলই ধূসর, কখনো বা লালচে গোলাপী। যমীন ও আসমানের মাঝে এক সুস্পষ্ট ভেদরেখা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেঘের প্রাচীর। তিন ঘন্টা পর বিকাল সাড়ে চারটায় করাচীর কাছাকাছি আসার পর বিমান নামতে শুরু করল। ধীরে ধীরে সুস্পষ্ট হ’তে শুরু করে নীচের পৃথিবী। আরব সাগরের তীরে করাচী শহর। তবে বিমান থেকে সাগরের দৃশ্যটি দেখা গেল না। কেবল চোখে পড়ল সিন্ধু নদ ও সিন্ধু অববাহিকার লালচে ধু ধু ময়দান। তারপর মুহূর্তকালের জন্য করাচী শহরটা খুব কাছ থেকে এক নযর দেখার সুযোগ দিয়ে বিমান ল্যান্ডিং পজিশনে চলে আসল। একটু পরেই ল্যান্ড করল। তারপর রানওয়েতে অনেকটা ঘুরে এসে দাঁড়িয়ে গেল জিন্নাহ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট টার্মিনালে। এয়ারপোর্টে নেমে ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে বেল্ট থেকে লাগেজ নামালাম। তারপর দ্রুত ডমেস্টিক টার্মিনালে চলে আসলাম। চেক-ইন করানোর জন্য দোতলায় উঠতেই এক মুরববী গোছের কর্মচারী গায়ে পড়ে খুব সহযোগিতা করার চেষ্টা করলেন। ইসলামাবাদ যাব শুনে আমার ট্রলি ঠেলে কাউন্টার পর্যন্ত নিয়ে আসলেন। তারপর লাগেজ চেক-ইন করিয়ে কাউন্টার থেকে বোর্ডিং কার্ড নিয়ে বের হচ্ছি এমন সময় মুরববী আবার হাযির। ১০০ টাকা চেয়ে বসলেন। আবার পরিচয়ও দিলেন যে, আমিও বাঙ্গালী। ঝাড়ি দিয়ে কিছু বলব ভাবছিলাম। কিন্তু তার চেহারা দেখে মায়াই হ’ল। সাথে সাথে আফসোস লাগল দেশের বাইরে এসেও বাঙ্গালীর স্বভাব-চরিত্র এতটুকু বদলায়নি দেখে।

ওয়েটিং লাউঞ্জে ঢুকে শুনি বিমান ঘন্টাখানেক লেট। এই ফাঁকে আছর ও মাগরিব ছালাত আদায় করে নিলাম। তারপর ইসলামাবাদে একটা মেসেজ পাঠালাম এক পাকিস্তানীর মোবাইল থেকে। সন্ধ্যা ৭-টার সময় এনাউন্স হ’ল। পিআইএ’র এই ডোমেস্টিক ফ্লাইটটি বেশ ছোট। সীট এবারো পড়ল মাঝের সারিতে। প্রায় শ’খানেক যাত্রী নিয়ে বিমান উড়াল দিল ৭-টার কিছু পরে। নীচে সন্ধ্যার পর ঝলমলে করাচী শহরটা দেখাচ্ছিল দারুন। প্রায় ২ ঘন্টার যাত্রা। রাতের আকাশে দেখারও তেমন কিছু নেই। তাই দু’ঘন্টা সময় পেপার পড়ে আর নাশতা করেই কাটিয়ে দিলাম। ঠিক ৯-টার সময় রাওয়ালপিন্ডির বেনযীর ভুট্টো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করল বিমান। নামার পর এরাইভ্যাল লাউঞ্জে ঢুকে বেল্ট থেকে লাগেজ উদ্ধার করতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হ’ল। চোখের সামনে দিয়ে চলে যাওয়া ধূলোয় ধুসরিত ব্যাগটি যে আমারই তা প্রথমে ধরতে পারিনি। পরে বেল্ট ফিরে যাওয়ার শেষ মুহূর্তে দৌড়ে গিয়ে নিয়ে আসতে হ’ল। বাইরে বের হয়ে দেখি আমার নাম বাংলায় লিখে দাঁড়িয়ে আছে ইসলামিক ইউনিভার্সিটির একমাত্র বাঙ্গালী হাবীব ভাই এবং তার পাকিস্তানী বন্ধু আব্দুল কাইয়ূম ভাই। এগিয়ে গেলাম সেদিকে। লম্বা সালাম ও কোলাকুলি হ’ল। এ সময় আতিফ ভাইও এসে উপস্থিত হ’লেন। জানতাম তিনি রিসিভ করতে আসবেন। তবে তিনি যে স্বয়ং পাকিস্তানের প্রখ্যাত ইসলামী শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ সংস্থা ‘আল-হুদা ইন্টারন্যাশনাল’-এর পরিচালক ড. ফারহাত হাশেমীর জামাই তা আমার জানা ছিল না। তৎক্ষণাৎ পরিচয়ে তিনি কেবল বললেন, আমি আল-হুদা ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের দায়িত্বে আছি। হাবীব ভাই তাকে বলল, ‘আমরা তো তাকে নিতে এসেছি। আর বাঙালী মানুষ, আমাদের সাথে থাকলেই তার সুবিধা হবে’। আতীফ ভাই বললেন, ‘কিন্তু আমি তো আল-হুদায় সবকিছুর এনতেযাম করে রেখেছি’। আমি তো পড়লাম বেকায়দায়। শেষে উর্দূতে তারা নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ পরামর্শ করার পর সিদ্ধান্ত হ’ল হাবীব ভাইয়ের সাথে যাওয়ার। আতিফ ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা রওয়ানা হ’লাম ইসলামাবাদের দিকে। রাত ১০টার দিকে পৌঁছে গেলাম এইচ-৭ এলাকায় ঠিক ফয়ছাল মসজিদের পার্শ্বেই অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটির ওল্ড স্টুডেন্ট হোস্টেল ‘কুয়েত হোস্টেলে’।

শুরু হ’ল ইসলামাবাদে আমার নতুন যিন্দেগী। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সংক্রান্ত কাজ এবং প্রশাসনিক অফিসে দৌড়াদৌড়ি করতে প্রায় ২ সপ্তাহ চলে গেল। এরই মধ্যে ঈদের ছুটিও চলে আসল। প্রায় ১০ দিন ছুটি। শুরু হ’ল ইসলামাবাদে আমার নতুন যিন্দেগী। ইসলামাবাদে সে সময় অবস্থান করছিল আমাদের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় শাহীন। আমারই সমবয়সী ও ছোটবেলার খেলার সাথী। বালুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটার বোলান মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা শেষে সেখানেই এক মেডিকেলে সে ডাক্তার হিসাবে কাজ করছে। ইসলামাবাদে এসেছিল ভিসা সংক্রান্ত কাজে। ভিসার কাজ শেষে কোয়েটা ফিরে যাওয়ার পূর্বে আমাকে কোয়েটা সফরের দাওয়াত দিল। সামনে ঈদের ছুটি বলে আমিও সাগ্রহে সাড়া দিলাম।

নির্ধারিত দিন তথা ১২ অক্টোবর ভোরে রাওয়ালপিন্ডির ফায়যাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে লাহোরের উদ্দেশ্যে আমরা রওনা হ’লাম ‘স্কাইওয়েজ’ কোচে। পাকিস্তানের বিখ্যাত ‘মটরওয়ে’ ধরে ইসলামাবাদ থেকে লাহোর প্রায় ৫ ঘন্টার পথ। ৪ লেনের সুপ্রশস্ত এই মটরওয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হ’ল, এর যে কোন স্থানে যুদ্ধ বিমান ল্যান্ড করতে পারবে। ভারতের সাথে টেক্কা দেয়ার আয়োজনটা যে বেশ ভালভাবেই সম্পন্ন করে রেখেছে পাকিস্তান, তার কিছুটা অনুমান করা গেল।

দুপুর ১-টা নাগাদ লাহোর পেঁŠছে গেলাম। শান্ত, পরিচ্ছন্ন ইসলামাবাদ শহরের পুরোটাই বিপরীত লাহোর সিটি। সংক্ষিপ্ত দেখায় ময়লা-আবর্জনা, ট্রাফিক জ্যাম, ঘনবসতি সবকিছু মিলিয়ে উপমহাদেশের প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম কেন্দ্রভূমি লাহোরকে ঢাকা শহরের চেয়ে বেশী দুর্দশাগ্রস্ত মনে হ’ল। এমনকি শহরের একপাশ দিয়ে সিন্ধু নদের যে শাখাটি বয়ে গেছে তার দশাও ঠিক আমাদের বুড়িগঙ্গার মতই। ঐতিহ্যবাহী লাহোর রেলস্টেশন থেকে ‘কোয়েটা এক্সপ্রেস’ ধরে আমাদের যাত্রার পরিকল্পনা। ঈদের সময় বলে ট্রেনে কোন সীট ছিল না। তাই শাহিনদের মেডিকেল কলেজের জুনিয়র একটি ব্যাচ শিক্ষা সফর শেষে ঐ ট্রেনেই ফেরৎ যাচ্ছিল, তাদের সহযাত্রী হ’লাম আমরা। বিকাল ৫-টায় ট্রেন ছাড়ল। ২৪ ঘন্টার লম্বা জার্নি। তবে একই সাথে সবাই এক বগিতে থাকায় পারস্পরিক গল্প-গুজবে সময়টা খুব ভালই কাটল। ওরা অধিকাংশই ছিল বালুচ। তাই বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে অনেক কথা শোনার সুযোগ হ’ল। পাঞ্জাবীদের প্রতি দেখলাম তাদের অধিকাংশেরই চরম ক্ষোভ। এ ক্ষোভটা যে সম্পদের অসমবণ্টনের অভিযোগের চেয়ে অধিকতরভাবে জাতিগত বিদ্বেষপ্রসূত, তা স্পষ্টই অনুভূত হ’ল। ইসলামাবাদেও দেখেছি পাঞ্জাবীদের মধ্যে নিজেদের জাতীয়তা নিয়ে একটা বিশেষ গর্ববোধ কাজ করে। বহু জাতি আর বহু গোষ্ঠীর দেশ পাকিস্তান। জাতীয়তা নিয়ে এত বিভেদের মধ্য দিয়েও দেশের অখন্ডতা টিকিয়ে রাখা শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে যে কতটা কঠিন তা কিছুটা হ’লেও অনুভব করা যায়। যাইহোক আমি বাংলাদেশী জেনে ওরা আমাকে যেন অতি আপনজন ভেবে নিল। কারণ বাংলাদেশও একসময় পাকিস্তান থেকে পৃথক হয়ে গেছে। রাতে ওরা নিজেদের স্লিপিং বেড ছেড়ে দিয়ে আমার শোয়ার ব্যবস্থা করে দিল। ফলে ঘুমের কোন সমস্যা হয়নি। ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি ফয়ছালাবাদ, ভাওয়ালপুর হয়ে আমরা সিন্ধুর প্রসিদ্ধ সাক্কার যেলা অতিক্রম করছি। কিছুক্ষণ পরই সামনে পড়ল উপমহাদেশের বিখ্যাত নদ সিন্ধু আর তার উপর সুদৃশ্য আইয়ুব রেলওয়ে ব্রীজ। সেই ছোট থেকেই সিন্ধু নদের বিপুল যশ-খ্যাতি শুনে তার প্রতি ভিতরে ভিতরে যে বিরাট শ্রদ্ধাবোধ তৈরী হয়েছিল তা আজ যেন হঠাৎ উবে গেল। ঘোলা পানি ও আর প্রস্থে আমাদের পদ্মা ও যমুনার অর্ধেক এই সিন্ধু নদের সাথে আমার কল্পনার সিন্ধু নদের যে যোজন যোজন ফারাক। অনেকটা আশাহত হলাম। তারপর সাক্কার শহর পার হয়ে গ্রামের পথে যাত্রা শুরু হতেই আবিষ্কার করলাম আমার বাংলাদেশ। সাত সকালে কাঁচা সূর্যের মিষ্টি আলোয় সেই বাংলার সবুজ ধানক্ষেত, বাংলার বক-ফিঙে-শালিক, বাংলার লাল শাপলারা ফিরে এসে কি যে স্বস্তির পরশ বুলিয়ে দিচ্ছিল, তা অবর্ণনীয়। সিন্ধু প্রদেশ ধান ও গমের জন্য বিখ্যাত। সিন্ধু নদের প্রভাবেই এখানে চারিদিকে এত সবুজের ছড়াছড়ি। দুপুর নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম বেলুচিস্তানের খারান মরুভূমিতে। মরুভূমির দৃশ্য আগে কখনও বাস্তবে দেখিনি। মাইলের পর মাইল ধু ধু বিরাণ বালুকাময় পাথরমিশ্রিত ভূমি। দিগন্ত রেখায় নিঃসীম শূন্যতা। কখনও কখনও দেখা যায় কাটা-গুল্ম কিংবা কাশফুলের ঝাড়। দূরের পাথুরে রুক্ষ পাহাড়ে দেখা যায় দুম্বা ও ভেড়ার সারি। কখনও ছবিতে দেখা আরব মরুর সেই বিখ্যাত সারিবদ্ধ হয়ে হেঁটে চলা উটের পাল জীবন্ত হয়ে ধরা দেয়। কখনও গাধা বা খচ্চরের বাহনে অলস বসে থাকতে দেখা যায় বেদুইন দুম্বাপালকদের। ঠা ঠা শুষ্ক মরু তেপান্তরে বেদুঈনদের দু’চারটা তাঁবুরও দেখা মেলে। কিভাবে জীবন ধারণ করে এরা! আমি অপলক তাকিয়ে থাকি। নিজের অজান্তেই কল্পনায় ভেসে আসে শি‘আবে আবু তালেব, বদর, ওহোদ, খন্দকের যুদ্ধের দৃশ্য। এমন ভয়ংকর মরুভূমিতেই তো ছাহাবীগণ না খেয়ে না দেয়ে দিনের পর দিন কাটিয়েছেন। যুদ্ধের ময়দানে প্রাণ বাজি রেখে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়ে গেছেন। কল্পনায় একে একে ভাসতে থাকে ইতিহাসের নানা দৃশ্য। সেই বিরাণ মরুভূমির পথ অতিক্রম করে আমরা যখন সিবি পৌঁছলাম তখন বেলা ২-টা।

সিবি থেকে কোয়েটা পর্যন্ত সংযোগ সড়কটিই বিখ্যাত বোলান পাস। পশ্চিম বেলুচিস্তানের টোবা কাকার রেঞ্জের এই পাহাড়ী পথটি সিবি থেকে সড়ক ও রেলপথ দ্বারা কোয়েটা পর্যন্ত সংযুক্ত। দক্ষিণ এশিয়ার সাথে আফগানিস্তানের কান্দাহার প্রদেশের সংযোগ সড়ক হিসাবে শত শত বছর ধরে ব্যবসায়ী, সৈন্যদল এবং পর্যটকরা এই পাসটি ব্যবহার করে আসছে। সম্ভাব্য রুশ হামলা প্রতিরোধের জন্য ১৮৭৬ সালে সর্বপ্রথম বৃটিশরা এখানে রেলওয়ে স্থাপনের পরিকল্পনা করে এবং ১৮৯৭ সালে তা সম্পন্ন হয়। এ সময় পাহাড়ের নীচে সুড়ঙ্গ কেটে নির্মাণ করা হয় মোট ১৭টি টানেল। সবচেয়ে দীর্ঘ টানেলটির দৈর্ঘ্য প্রায় দুই কি.মি. (১৭০০মি.)। ১৪১ কি.মি. দীর্ঘ এই বোলান পাস রেলপথটি শুরু হয়েছে সিবি থেকে, যার উচ্চতা সী লেভেল থেকে ৪৩৫ ফুট উঁচুতে। আর কোয়েটার কিছু পূর্বে কোলপুর স্টেশনে এর উচ্চতা দাঁড়িয়েছে ৫৮৭৪ ফুট। এভাবে ক্রমশ উঁচূ হয়ে উঠে যাওয়া এই সুদীর্ঘ পথটি অতিক্রম করতে ট্রেনের পিছনে সেট করতে হয় অতিরিক্ত আরেকটি ইঞ্জিন। দীর্ঘ যাত্রার প্রায় পুরোটা পথে একপার্শ্বে শুকিয়ে আসা পাথুরে বোলান নদীর নীল-সবুজ হাতছানি, অপর পার্শ্বে জীবন্ত ভাস্কর্যের মত দাঁড়িয়ে থাকা খাড়া উঁচু পাহাড় ঘেঁষে ইতিহাসখ্যাত বোলান হাইওয়ে। নিজেকে সাক্ষী রেখে এই গিরিখাতটি অতিক্রম করার সময় কি যে এক শ্বাসরুদ্ধকর থ্রিলিং অনুভূতি  হয়েছিল তা ভাষায় বর্ণনাতীত।

লাহোর থেকে ঠিক ২৪ ঘন্টা জার্নির পর ১৩ই অক্টোবর বিকাল ৫-টায় আমরা শতবর্ষের পুরোনো কোয়েটা রেলস্টেশনে এসে পৌঁছলাম। সেখান থেকে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে বারুরী রোড সংলগ্ন বোলান মেডিকেল কলেজের পার্শ্বেই ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলে এসে উপস্থিত হ’লাম। আফ্রিকান, ফিলিস্তীনী, জর্দানী, নেপালী, কাশ্মীরী ও বাংলাদেশীসহ বিভিন্ন দেশের শ’খানেক ছাত্র এই হোস্টেলে আছে। কোয়েটায় অবস্থানকালীন দিনগুলিতে এই হোস্টেলেই ছিলাম।

এবার ঈদ প্রসঙ্গে আসা যাক। ঈদের আগের দিন আব্দুল বাছীর ভাইকে ফোন দিলাম। ইসলামাবাদে তিনি আমার খুব ঘনিষ্ট সালাফী বন্ধু। তবে তার পৈত্রিক নিবাস এই কোয়েটাতেই। এখানকার সবকিছু তার জানার কথা। তিনি জানালেন শহরের মধ্যে ২টি আহলেহাদীছ ঈদের জামা‘আত হয়। একটি ‘মারকাযী জমঈয়তে আহলেহাদীছ’ পরিচালিত এবং অপরটি জামা‘আতুত দা‘ওয়া’ কর্তৃক পরিচালিত। ২টা মোবাইল নাম্বারও দিলেন। কিন্তু মোবাইলে যোগাযোগ করে লাভ হ’ল না। পশতু ঢঙের উর্দূ আমি কিছুই বুঝলাম না, তারাও ইংলিশ বোঝেন না। পরে আব্দুল বাছীর ভাই তাদের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে মেসেজ করে দিলেন। শহরের কেন্দ্রস্থলে আকরাম হাসপাতালের পার্শ্বস্থ ইনছাফ কার পার্কিং-এ ঈদ জামা‘আতের আয়োজন করা হয়েছে। সকালে উঠে প্রস্ত্ততি নিলাম। কিন্তু শাহীনের বন্ধুরা শহরমুখো যেতে বার বার নিষেধ করল। শাহীন নিজেও ভয় পাচ্ছে। কোয়েটা শহর এমনিতেই জঙ্গি হামলাপ্রবণ এলাকা। আর বিশেষ উপলক্ষগুলোকে কেন্দ্র করে বোমাবাজি, খুনখারাবি বেড়ে যায়। এফসি (Frontier corps) ভারী অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে ২৪ ঘন্টা সারা শহর টহল দিচ্ছে, তবুও এর কোন বিরাম নেই। যাইহোক ওদের নিষেধ স্বত্ত্বেও আমি কোয়েটার আহলেহাদীছদের দেখে যাওয়ার সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইলাম না। শাহিনকে নিয়ে অনেকটা জোর করেই রওয়ানা হ’লাম। সকাল ৮-টায় জামা‘আত। মাত্র ১৫ মিনিট সময় হাতে ছিল। রাস্তায় উঠেই সিএনজি পেয়ে গেলাম। ফাঁকা রাস্তায় একটানে পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে। শহরের নির্মীয়মান নতুন ফ্লাইওভারের ঠিক পার্শ্বেই কার পার্কিং-এর অভ্যন্তরে ঈদ জামা‘আতের আয়োজন। মহিলাদের জন্য সেখানে আলাদা ব্যবস্থা। এই শহরে আর কোথাও কোন মসজিদ বা ঈদ জামা‘আতে মহিলাদের অংশগ্রহণ করার সুযোগ নেই। কেবল আহলেহাদীছ জামা‘আতেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঈদের মাঠে প্রবেশের সময় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা রীতিমত ভড়কে দেয়ার মত। এমনকি খত্বীব ছাহেবকে ঘিরেও সিভিল পোষাকে দাঁড়িয়ে আছে অস্ত্রধারীরা। ঈদ ছালাতে অংশগ্রহণ করল নারী-পুরুষ মিলিয়ে সহস্রাধিক মুছল্লী। উর্দূ ভাষায় জ্বালাময়ী খুৎবা দিলেন খত্বীব ছাহেব। বিষয়বস্ত্ত কুরবানী থেকে শুরু করে ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের আক্রমণের বিরুদ্ধে মুসলিম সমাজের করণীয় পর্যন্ত গড়ালো। ছালাত শেষ হ’লে আমরা খত্বীব ছাহেবের সাথে দেখা করলাম। বর্তমানে তিনি কোয়েটা জামা‘আতুদ দাওয়াহ’র আমীর। নাম মুহাম্মাদ আশফাক। বাংলাদেশ থেকে এসেছি জেনে তাদের মারকাযে যাওয়ার জন্য দাওয়াত দিলেন এবং ঠিকানা বলে দিলেন। আমি যাওয়ার চিন্তা করেছিলাম। কিন্তু শাহীন এবার চরমভাবে বেঁকে বসল, আর রিস্ক নিতে রাযী নয় সে। অস্ত্রধারীদের তৎপরতা দেখে আমিও সে চিন্তা বাদ দিলাম। হোস্টেলে ফেরার পথে দেখলাম সারা শহর সুনসান। ঈদের দিন হ’লেও শহরে ঈদের কোন আমেজ টের পাওয়া গেল না। জিজ্ঞেস করে জানলাম যে কোন উৎসবের দিন এখানে সবচেয়ে বেশী ভয়ের দিন। কেননা এদিন কোন না কোন অঘটন ঘটবে এটাই নাকি স্বাভাবিক। হোস্টেলে ফিরে দেখলাম সবাই ছালাত শেষ করে চলে এসেছে। আফ্রিকানরা হোস্টেলের মধ্যেই দুম্বা যবেহ করে কাটা-বাছা শুরু করেছে ইতিমধ্যে। বাঙালী আযীযের রুমে আমরা তিন বাঙ্গালী, ২ কাশ্মীরী আর ২ নেপালী মিলে রান্নার আয়োজন শুরু করলাম।

আগের দিনই কোয়েটার প্রসিদ্ধ লিয়াকত বাযার ও জিন্নাহ বাযার থেকে ঈদের কেনাকাটা করা হয়েছিল। কিছুক্ষণ ওদের রান্নাবান্নায় সঙ্গ দিয়ে আমি ক্ষান্তি দিলাম। ওদের হৈ-হুলে­াড়ে ঈদের আমেজটা টের পাওয়া যাচ্ছিল ভালই। কিন্তু দেশের কথা মনে পড়ে আর ভাল লাগল না। বাইরে এসে দেশে আত্মীয়-স্বজনের সাথে কথা বলে নিঃসঙ্গতা কাটানোর চেষ্টা করলাম। কেবল দেশের বাইরেই নয়, পরিবারের বাইরেও এই প্রথম ঈদ। খারাপ তো লাগবেই। রান্নার কিছুটা দেরি দেখে একাকী বাইরে বের হ’লাম। কোয়েটার ঈদটা কি সত্যিই এতটাই শান্ত, অনাড়ম্বর? আশ-পাশের পাড়াগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। এই ঈদের দিনও গলির মোড়ে মোড়ে অস্থায়ী ব্যারাকে এফসির সতর্ক প্রহরা। এদের বাড়িঘরগুলো বাইরে থেকে প্লাস্টার করে না। তাই কোটিপতির বাড়িও বাইরে থেকে নিতান্ত সাধারণই মনে হয়। কিন্তু ভিতরে ঢুকলে বোঝা যায় রীতিমত জান্নাত তৈরী করে রেখেছে। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এমনই এক বাড়ির মালিকের সাথে দেখা হ’ল। মুরববীকে জিজ্ঞেস করলাম, হাজীসাব! এখানকার মানুষ কোরবানী করে কোথায় (এখানে মুরুববীদের হাজীসাব বলে সম্বোধন করা হয়, হজ্জ না করা সত্ত্বেও)? কোথাও তেমন সাড়া দেখছি না। তিনি আমার বাংলাদেশী পরিচয় জেনে ভিতরে নিয়ে গেলেন। ভিতরে ঢুকে দেখি এলাহী কারবার! ৮টি দুম্বা যবেহ করা হয়েছে এক বাড়িতেই। পরিবারের প্রাপ্ত বয়স্ক প্রত্যেকের জন্য একটা। মুরববী খুব আগ্রহভরে সব দেখালেন আর বসিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ছেলেমেয়েরা কোথায় কি করে শুনালেন। জিজ্ঞেস করলাম, এত সুন্দর ইংলিশ কিভাবে শিখলেন। তিনি বললেন, আমরা বালুচরা ব্যবসায়ী জাতি। ব্যবসার প্রয়োজনে আমাদের অনেক ভাষাই শিখতে হয়। বর্ডার এলাকা বলে এখানকার মানুষ অধিকাংশই ইংলিশ জানে। তারপর ট্র্যাডিশনাল বালুচদের মত দুপুরে খেয়ে যাওয়ার জন্য খুব পীড়াপীড়ি করলেন। অবশেষে নানা অজুহাত দিয়ে এক কাপ গাহওয়া (কফি) পান করে বিদায় নিলাম। বালুচ, পাঠানদের আতিথেয়তা নিয়ে অনেক গল্প শুনেছি। পাকিস্তানে এসেও বিভিন্ন জায়গায় তার পরিচয় পেয়েছি। তবে কোয়েটা এসে শুনলাম ভিন্ন কথা। মেডিকেল পড়ুয়া আযীযের মতে, বাঙ্গালীরা দাওয়াত দিলে সাধারণতঃ অন্তর থেকেই দেয়। কিন্তু এখানে বিষয়টা অনেকটা ট্র্যাডিশনাল। অর্থাৎ মেহমানকে খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করা এটা এদের স্বভাবজাত। তার অর্থ এই নয় যে, দাওয়াত কবুল করতে হবে। এমনকি ‘কসম সে’, ‘দিল সে’ বলে চাপাচাপি করলেও, সেক্ষেত্রে শুকরিয়া বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বিদায় নেয়াই নাকি এখানকার ভদ্রতা। তাই ব্যাপারটা যতটা না আন্তরিক তার চেয়ে বেশী ফরমাল এবং লোক দেখানো ভদ্রতা।

যাইহোক বেরিয়ে এসে অলি-গলি ঘোরার সময় দেখলাম বাড়ি-ঘরের বন্ধ দরজা দিয়ে রাস্তায় রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ঢাকার রাস্তাগুলোয় যে দৃশ্য দেখা যায় ঈদের সময়। এতক্ষণে বোঝা গেল কুরবানী চলছে সব বাড়ির ভিতরেই। পাড়া থেকে বেরিয়ে আসার পর বিশাল খেলার মাঠে দেখলাম ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে জড়ো হয়েছে। আমাদের দেশের মত নানা পোষাকে সুসজ্জিত হয়ে আনন্দ করছে। ফেরিওয়ালারা ঘুরছে সেই বেলুন, সেই বেতের বাঁশি নিয়ে। বাহ, ঈদ তাহ’লে হয় এখানে! এতক্ষণে মনে হ’ল ঈদ হচ্ছে আজ। সাজানো উট ও ঘোড়া নিয়ে বের হয়েছে একদল লোক। সেসব উট আর ঘোড়ার পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে শিশুরা। ওদের দেখাদেখি প্রথমবারের মত আমিও উটে চড়ার সুযোগটা কাজে লাগালাম। কোয়েটায় নানা জাতের মানুষের বসবাস। বালুচ থেকে শুরু করে পার্সী, তাজিক, আফগান মুহাজির, শী‘আ হাজারা এরূপ নানা জাতির উপস্থিতি দেখা যায়। চেহারা দেখেই মুহূর্তের মধ্যেই বোঝা যায় সেই বিভিন্নতা। এই মাঠের উপস্থিত শিশুদের মধ্যে তাই দেখছি বিপুল বৈচিত্র্য। একেকজন যেন একেকটা জাতির বৈশিষ্ট্য ধারণ করে আছে। খুব ভাল লাগছিল এই শিশুদের মেলাটি। তবে আশ্চর্যের বিষয় হ’ল, এরূপ একটি স্থানেও প্রাপ্ত বয়স্কা কোন নারীর ঘোরাফিরা নেই। যে ক’দিন কোয়েটায় ছিলাম, বেপর্দা কোন মহিলা চোখে পড়েনি। মজার ব্যাপার হ’ল, এখানকার মহিলারা আমাদের দেশের মত বোরক্বা পরে না, বরং মাথা থেকে পা পর্যন্ত লম্বা চাদর পরে ঘোমটা দিয়ে চলাফেরা করে। কেউ কেউ আফগানী বোরক্বাও পরে। কিন্তু সউদী স্টাইল বোরক্বা পরে এমন মহিলার সংখ্যা খুবই কম। পর্দার সাথে অবাধে তারা চলাফেরা করছে সর্বত্র। ইসলামাবাদের মত এই মফস্বল শহরেও দেখলাম বিভিন্ন বয়সের নারী কার বা জীপ ড্রাইভ করে বাজারে যাচ্ছে বা বাচ্চাদের স্কুলে রেখে আসছে। সিটি সার্ভিসের প্রতিটি গাড়ীতে মহিলা ও পুরুষের আলাদা বসার জায়গা। কোন প্রাইভেট গাড়িতে যদি মহিলা থাকে তাহ’লে পুলিশ সেই গাড়ি চেক করে না। নারীদের প্রতি যথেষ্ট সম্মানবোধ আছে প্রত্যেকের মধ্যেই। 

সেই পাড়া থেকে বের হয়ে আসার পর দুপুর হয়নি দেখে পার্শ্ববর্তী ‘চিল্টান’ পাহাড়ের গিরিখাত এবং ছোট ছোট গুহাগুলো দেখে আসলাম। এই পাহাড়ের উপর থেকে পুরো কোয়েটা শহর খুব চমৎকারভাবে দেখা যায়। ‘কোয়েটা’ শব্দের অর্থ দুর্গ। পুরো শহরটা চারিদিক দিয়ে গাছ-পালাবিহীন পাথর ও বালি মাটির পাহাড় দিয়ে দুর্গের মতই ঘেরা, এটাই বোধহয় নামকরণের কারণ। সমুদ্র যেমন সকালে, দুপুরে, রাতে ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়, এখানকার ন্যাড়া পাহাড়গুলোও ঠিক তাই। সকালে তার চেহারা ঝকঝকে নীল আকাশের নীচে সুদৃঢ় চীনের প্রাচীরের মত সুগম্ভীর, কালচে। দুপুরে তার গায়ে নীলাভ ধোঁয়াশা। বিকেলে সূর্যের লাল রঙে রঞ্জিত অসাধারণ টুকটুকে লাল। আর রাতে বিশেষ করে পূর্ণিমার রাতে অপার্থিব রূপালী বরণ। সবমিলিয়ে সবুজ পাহাড়ের নৈসর্গিক রূপের বিপরীতে এই নিরাভরণ পাহাড়ের সৌন্দর্যও যে কম নয়, সেটা অনুভব করলাম ভালভাবেই।

হোস্টেলে ফিরে বাঙ্গালী রান্না আর কাশ্মীরী রান্না খেলাম। আনাড়ী হাতেও এদের রান্না এত সুন্দর হয়েছে যে ঈদের দিনটা সত্যিই ঈদের মত হয়ে উঠল এবার। সেদিনই সন্ধ্যার পর স্থানীয় তাবলীগ জামা‘আতের মারকাযে বিদেশীদের জন্য বিরাট খানা-দানার আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে যাওয়ার জন্য আগের দিন আমাদেরকে দাওয়াত দিয়ে গিয়েছিলেন এই মেডিকেলের প্রাক্তন ছাত্র ফারহান ভাই। তিনি স্থানীয় বালুচ এবং তাবলীগের সক্রিয় কর্মী। আমাদের সবাইকে জীপ ও কারে বহন করে খুব সম্মানের সাথে নিয়ে গেলেন কোয়েটা রেলস্টেশনের পার্শ্বে তাদের মারকাযে। মাগরিব পর আলোচনা শুরু হ’ল। বক্তব্যের বিষয়বস্ত্ত আল্লাহর পথে মেহনত করলে আল্লাহ কিভাবে সাহায্য করেন ইত্যাদি। বক্তা নিজে বহু দেশে চিল্লা দিয়েছেন। সেসব দেশে মানুষের কাছে কেমন যত্ন-খাতির পেয়েছেন, একের পর এক সেসব গল্প শুরু করলেন। এ সময় এক ফিলিস্তীনী ছাত্র (পরে কথা বলে জেনেছি আহলেহাদীছ) বেকায়দা কান্ড করে বসল। হাত উঁচু করে কথা বলার অনুমতি চেয়ে সে ভাঙ্গা ভাঙ্গা উর্দূতে বলা শুরু করল, ‘এসব গল্প শুনে আমরা কি করব? আমাদেরকে সঠিক আক্বীদা সম্পর্কে কিছু বলুন! ছালাত, ছিয়াম সঠিকভাবে পালনের নিয়ম-কানূন সম্পর্কে কিছু বলুন। আজকে মুসলিম উম্মাহ সারা বিশ্বে কাফিরদের হাতে নির্যাতিত হচ্ছে, সেসব নিয়ে কিছু বলুন। গত চার বছর যাবৎ আমি এখানে নিয়মিত আসি। কিন্তু এসব নিয়ে কোন কথা শুনি না’। ঝিমিয়ে পড়া পুরো মজলিস হঠাৎ সচকিত হয়ে উঠল। বক্তা নিজেও বেশ বিব্রত। কিছুটা সামলে নিয়ে তারপর বললেন, ‘এটা মজলিসের আদব নয়, কোন প্রশ্ন থাকলে শেষে করবেন’। তবে বক্তা এবারে কিছুটা লাইনে আসলেন। গল্প ছেড়ে দ্বীনের পথে ফিরে আসার গুরুত্ব নিয়ে সুন্দর কিছু কথা বললেন শেষ পর্যায়ে। তবে আফসোসের বিষয় গোটা বক্তব্যে তিনি একটি আয়াত বা একটি হাদীছও উপস্থাপন করলেন না।

মজলিস শেষে বক্তা সহ অনেক মুরববীদের সাথেই পরিচয় হ’ল। বাংলাদেশ থেকে এসেছি জেনে তারা তাদের বাংলাদেশ সফরের বৃত্তান্ত তুলে ধরলেন। কেউ কেউ বাংলাদেশে অবস্থান করেও আমি কখনও টঙ্গীর ইজতেমায় যাইনি শুনে চোখ কপালে তুললেন। কেউ কেউ এখনও পর্যন্ত চিল্লায় যাইনি কেন এ নিয়ে খুব উদ্বেগ প্রকাশ করলেন...ইত্যাদি। খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন ছিল একেবারে খানদানী কায়দায়। চিকেন আর দুম্বার বড় সাইজের দুই মাটন চাপ এক সাথে তুলে দিলেন কাশ্মীরের ইউনুস ভাই। সাথে ইয়া বড় আফগানী রুটি। ট্র্যাডিশনাল খাবারের প্রতি আমার আকর্ষণ বেশী। তাই খুব আগ্রহ সহকারে দু’চার লোকমা তোলার পর আমার অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। দুম্বার অসহনীয় গন্ধে এক বিব্রতকর অবস্থা। যে গন্ধটি তাদের কাছে অতি লোভনীয় হিসাবে বিবেচিত, সেটি আমার ভিতরে নাড়ি-ভূড়ি উল্টানোর প্রক্রিয়া শুরু করল। পোলাও ছিল, তাও আর খাওয়ার রুচি হ’ল না। কেবল ফলমূল খেয়ে আর অন্যদের খাওয়া দেখে এ যাত্রা পার করলাম। তারপর বিদায়ের পালা। তারা আমাদেরকে আবার হোস্টেলে পৌঁছে দিলেন খুব তা‘যীমের সাথে। বিশেষ করে ফারহান ভাইয়ের খেদমত ভোলার মত নয়। সব মিলিয়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দেশের বাইরের প্রথম ঈদটা কেটে গেল।

 

 

 

 

HTML Comment Box is loading comments...