হক-এর পথে যত বাধা

(১০) ছহীহ হাদীছ ভিত্তিক আমলের কারণে শারীরিক নির্যাতন ও হত্যার হুমকি

রাজশাহী বিভাগের নাটোর যেলাধীন সদর থানার বালিয়াডাঙ্গা গ্রাম। এই গ্রামেরই সন্তান আমরা পাঁচজন। আমি নূর হোসাইন, পিতা- মুহাম্মাদ বাচ্চু প্রধান। বাকী চারজন হচ্ছেন, মুহাম্মাদ জাহিদ হোসাইন, পিতা- মৃত মোত্তালেব খাঁ, আব্দুল বারেক, পিতা-মৃত আব্দুছ ছামাদ ব্যাপারী, মুহাম্মাদ আল-আমীন, পিতা- মুহাম্মাদ আলী ও রবীন, পিতা- শাহীনুর রহমান। আমাদের গ্রামটি সম্পূর্ণ হানাফী মাযহাবভুক্ত। আমরাও সে মোতাবেকই আমল করে আসছিলাম। হুযুর যা বলতেন অন্ধের মত তাই বিশ্বাস করতাম। শিরক-বিদ‘আতে আচ্ছন্ন আমাদের সমাজ। মহান আল্ল­াহর অগণিত শুকরিয়া যে, তিনি আমাদেরকে হক পথের পথিক হিসাবে কবুল করেছেন। আমরা ছহীহ আক্বীদা ও আমল সম্পর্কে যৎসামান্য জ্ঞান লাভ করে বুঝতে পারলাম যে, রাসূল (ছাঃ)-এর শিখানো পদ্ধতি অনুযায়ী আমাদের আমল হচ্ছে না। আমাদের ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ, যাকাত সব কিছুই যেন ভেজালযুক্ত। অথচ রাসূল (ছাঃ) সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, ‘যে কেউ এমন আমল করবে, যার মধ্যে আমার কোন নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত বা বাতিল’ (মুসলিম হা/১৭১৮)। ছালাতের ক্ষেত্রে তাঁর দ্ব্যার্থহীন বক্তব্য হচ্ছে- ‘তোমরা ছালাত আদায় কর সেভাবে, ঠিক যেভাবে আমাকে আদায় করতে দেখেছ’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৬৮৩)। সেকারণ আমরা হক-এর অনুসন্ধানে ব্রতী হই এবং এদেশের হকপন্থী জামা‘আত ‘আহলেহাদীছ’-এর সন্ধান লাভ করি।

অতঃপর ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর মুহতারাম আমীরে জামা‘আত প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্ল­াহ আল-গালিব রচিত ছালাতুর রাসূল সহ অন্যান্য আহলেহাদীছ আলেমদের লিখিত বই-পুস্তক পড়ে আমাদের অন্তরচক্ষু খুলে যায়। আমাদের মধ্যে জাহিদ চাচা সবার আগে ২০০৬ সালে আহলেহাদীছ আক্বীদা গ্রহণ করেন। তখন তিনি একাই ছিলেন। তেমন বাধার সম্মুখীন হননি। পরবর্তীতে ২০১১ সালে যখন আমরা বাকী তিন জন আহলেহদীছ হয়ে প্রকাশ্যে আমল শুরু করি তখনই দেখা দেয় যাবতীয় সমস্যা। আমাদের উপর নেমে আসে হিমাদ্রি সম বাধা। নেমে আসে মানসিক ও শারিরীক নির্যাতন।

আমরা গ্রামের মসজিদেই নিয়মিত ছালাত আদায় করি। যখন সশব্দে আমীন বলি, বুকের উপর হাত বাঁধি ও রাফ‘উল ইয়াদায়েন করি তখন অন্যান্য মুছল্ল­ীগণ আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন ও নানা প্রশ্ন করেন। আল-হামদুলি­ল্লাহ আমরা দলীল ভিত্তিক জবাব দিলে অনেকে সমর্থন না করলেও চুপ থাকেন ও বুঝার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাধ সাধে গ্রামের কতিপয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। যারা সাধারণ সরলপ্রাণ মুছল্লীদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলে। নানা অপবাদে আমাদেরকে জর্জরিত করে ফেলে। আমরা শুধু ধৈর্যের সাথে শ্রবণ করি ও সাধ্যপক্ষে সুযোগ মত বিনয়ের সাথে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করি।

এরি মধ্যে আমাদের গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান জনাব ওমর ফারূক গত রামাযান মাসের আগের শুক্রবার মাগরিবের ফরয ছালাত শেষে ঘোষণা দেন যে, সুন্নাত পড়ে আপনারা সকলে বসবেন কিছু যরূরী কথা আছে। দেখা গেল যরূরী বিষয় আর কিছু নয়, বিষয় হচ্ছি আমরা। চেয়ারম্যান ছাহেব আমাদেরকে সম্বোধন করে বলতে লাগলেন যে, ‘তোরা যা শুরু করেছিস, তাতে গ্রামের মুছল্লীদের সমস্যা হচ্ছে। তোরা যে আমল করছিস, তা মিথ্যা। এগুলো ছেড়ে দিয়ে সমাজের সবার সাথে মিলে মিশে চল’। রাফ‘উল ইয়াদায়েন সম্পর্কে বলেন, ‘এটি করা হ’ত ইসলামের প্রথম যুগে, যখন নতুন মুসলমানরা নামাযের সময় হাতের ফাঁকে ও বগলের নীচে মূর্তি রাখত’। আমাদের মধ্য থেকে আল-আমীন হাদীছের রেফারেন্স সহ কিছু কথা বললে কোন জবাব দিতে না পেরে রাগত স্বরে চেয়ারম্যান বললেন, ‘তোরা যা পারিস কর’। স্থানীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি জনাব রূহুল আমীন সর্বৈব মিথ্যাচার করে বলতে লাগলেন, ‘এরা জেএমবি, এরা শিবির, এরা কাফের, এরা মসজিদে বোমা মারে। এরা মুছল্ল­ীদের নামাযে সমস্যার সৃষ্টি করে...’ ইত্যাদি অনেক কিছু। আমরা শুধু ধৈর্যের সাথে শ্রবণ করেছি। অতঃপর পরের জুম‘আয় ইমাম ছাহেব খুৎবায় আমাদেরকে শয়তান, কাফের, নিম্নশ্রেণীর মুসলিম ইত্যাকার নানান কটুক্তি করে মারাত্মকভাবে বিষোদগার করে।

চেয়ারম্যানের ভাতিজা খোরশেদ মুছল্লীদের বলে যে, নূর হোসাইন যদি বুকে হাত বেঁধে নামায পড়ে তাহ’লে পিছন থেকে লাথি মেরে ফেলে দিবেন। তাতেও না থামলে প্রয়োজনে খুন করব এবং থানায় গিয়ে মামলা করে দিব যে, এরা জেএমবির লোক।

এভাবেই নানা সমালোচনা ও বাধা-বিপত্তির মধ্যে চলতে থাকে আমাদের দিন। উপস্থিত হয় ২০১৩ সালের পবিত্র ঈদুল আযহা। যথারীতি ঈদের ছালাত আদায় করি স্থানীয় ঈদগাহতেই। সামাজিক নিয়ম অনুযায়ী কুরবানীর গোশতের তিনভাগের একভাগ সমাজে প্রেরণ করলে আমাদের গোশত গ্রহণ না করে ফেরত দেওয়া হয়। ফলে সে গোশত আমরা নিজেরাই গরীব-মিসকীনদের মধ্যে বন্টন করে দেই। অতঃপর ঈদের পরদিন ১৭ অক্টোবর তারিখে গ্রাম্য পুলিশ দিয়ে শালিস ডাকা হয়। প্রসঙ্গ আর কিছু নয়, আমরা যারা নতুন আহলেহাদীছ হয়েছি তারা। অতঃপর সন্ধ্যা ৭-টায় উপস্থিত হ’লাম। সাবেক চেয়ারম্যান আমাদের বিভিন্নভাবে প্রশ্ন করতে লাগলেন, আর আমরা সাধ্যমত জবাব দিতে লাগলাম। আমাদের অপরাধ হচ্ছে বুকে হাত বাঁধা, রাফ‘উল ইয়াদায়েন করা, জোরে আমীন বলা ইত্যাদি ছহীহ হাদীছ ভিত্তিক আমল। এতে নাকি তাদের ছালাতে সমস্যা হয়। আমাদের মধ্যেকার একজনের পিতা রেগে তার সন্তান সম্পর্কে  মজলিসের  উদ্দেশ্যে  বলেন,  ‘সে আমার অবাধ্য সন্তান, কু-সন্তান। সে যদি আমার সন্তান হ’ত তাহ’লে আমরা এবং আমাদের বাপ-দাদারা যেভাবে নামায পড়েছি, সেও ঠিক সেভাবেই নামায পড়ত। এরা শয়তান, কাফের, এদের জুতাপেটা করতে হবে’ ইত্যাদি অনেক কিছু। স্থানীয় আরেক নেতা রূহুল আমীন বলেন, আমরা প্রায় ৪০০ ঘর লোক এক সমাজে বসবাস করি। অথচ এরা ফিৎনা সৃষ্টি করে সমাজকে বিভক্ত করছে। এদের শাস্তি অনিবার্য। একপর্যায়ে চেয়ারম্যান বললেন, ‘তোরা যে বই পড়িস সে বইগুলি নিয়ে আয়’। তখন আমরা বঙ্গানুবাদ ছহীহ বুখারী, ছহীহ মুসলিম, তাফসীরে ইবনে কাছীর হাযির করলে বলেন, ‘এগুলি ইহুদী-নাছারাদের বই। এগুলি খুলবেন না। খুললে পথভ্রষ্ট হয়ে যাবেন। এরা ড. আসাদুল্লাহ আল-গালিবের লোক। এরা সংগঠন থেকে অনেক টাকা পায়’। মিথ্যাচার আর কাকে বলে! দুর্ভাগ্য যে, আমরা কুরআন-হাদীছ থেকে রেফারেন্স সহ বললে সেটা হয় মিথ্যা, আর চেয়ারম্যান কিচ্ছা-কাহিনী বললে সেটা হয় সত্য! নির্বুদ্ধিতা আর কাকে বলে! দুর্ভাগ্যজনক হ’লেও সত্য যে, আমাদের সমাজের অধিকাংশ লোকই নেশাদ্রব্যে আসক্ত। জুয়া-লটারী তাদের নিত্যসঙ্গী। ছালাত-ছিয়ামের ধারে কাছেও এরা নেই। অনেকে শুধু সাপ্তাহিক ও দুই ঈদের ছালাতে অভ্যস্ত। অথচ এদের নিয়ে সমাজ নেতাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। সমাজ রসাতলে গেলেও এ সকল নেতাদের তাতে কিছু আসে যায় না। আর আমরা যারা নিয়মিত মসজিদে জামা‘আতের সাথে পাঁচওয়াক্ত ছালাতে অভ্যস্ত, ছহীহ আক্বীদা ও আমলের পাবন্দী, আমাদেরকে নিয়েই তাদের যত মাথা ব্যাথা।

অতঃপর চেয়ারম্যান একপর্যায়ে আমাকে বলেন যে, ‘তোর আববা আমাদের মত নামায পড়ে, তুই তোর বাবার কথা শুনিসনা কেন’? তখন আমি বললাম, পিতা-মাতার কুরআন-হাদীছ ভিত্তিক কথা শুনা যাবে। কিন্তু কুরআন-হাদীছ বিরোধী বা শিরক-বিদ‘আত ভিত্তিক কোন নির্দেশ মানা যাবে না। উদাহরণ হিসাবে আমি হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কথা তুলে ধরলাম। তখন হঠাৎ চেয়ারম্যান ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতা ছিলেন মুশরেক। তোর পিতা কি মুশরেক? এই বলে তিনি আমার উপর চড়াও হ’লেন এবং উপস্থিত জনতার সামনে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করলেন। পরিবেশ তখন থমথমে। আমার সাথী তিনজনও হতবাক ও আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। অতঃপর তিনি বললেন, তোরা এই গ্রামের সন্তান, এই গ্রামেই থাকতে হবে। এই গ্রামে প্রচলিত হানাফী মাযহাবের তরীকা অনুযায়ীই নামায পড়তে হবে। ইমাম আবু হানীফার কথা মত চলতে হবে। এর বাইরে কোন কিছু মানা যাবে না। আমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হ’ল, ইমাম আবু হানীফার কথা মানব কি-না? উপায়ান্তর না দেখে ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর দ্ব্যার্থহীন বাণী إذا صح الحديث فهو مذهبى ‘যেটা ছহীহ হাদীছ, সেটাই আমার মাযহাব’ (রাদ্দুল মুহতার ১/৬৭ পৃঃ) স্মরণ করে স্বীকারোক্তি দেই যে, হ্যাঁ আমরা ইমাম আবু হানীফার কথাই মানব। অর্থাৎ ইমাম আবূ হানীফার নির্দেশ অনুযায়ী ছহীহ হাদীছ ভিত্তিক আমল করব। অতঃপর শালিস থেকে আমাদের মুক্তি মেলে। এই রায়ের মাধ্যমেই তথাকথিত এই শালিস বৈঠক শেষ হয়।

* নূর হোসাইন

বালিয়াডাঙ্গা, নাটোর।

(১১) যেভাবে হকের দিশা পেলাম!

আমার বাড়ি চাঁপাই নবাবগঞ্জ যেলার শিবগঞ্জ থানার রসূলপুর গ্রামে। আমরা এখানকার নতুন বাসিন্দা। এ এলাকার একটি মাদরাসা হ’তে দাখিল পাশ করি ২০১০ সালে। তারপর আলিমে ভর্তি হই চাঁপাই নবাবগঞ্জ যেলার হেফযুল উলূম কামিল মাদরাসায়। আমি থাকতাম মাদরাসা হোস্টেলে। কয়েক মাস পর আমার পাশের রুমে কয়েকজন ভাই আসলো। খবর নিয়ে জানলাম তারা এ মাদরাসায় কামিলে ভর্তি হয়েছে। সেই ভাইদের সাথে আমার একটা ভাল সম্পর্ক হয়ে যায়। আমি দেখতাম তাদের ছালাত আর আমার ছালাতে অনেক পার্থক্য। আমি তাদেরকে বললাম যে, আপনারা কেন এভাবে ছালাত আদায় করেন? তারা বলে যে, হাদীছ অনুযায়ী এটাই ছালাতের সঠিক পদ্ধতি। আমি অবাক হয়ে গেলাম। তারা আমাকে দাওয়াত দেয় যেন আমিও তাদের মত করে ছালাত আদায় করি। আমি দাওয়াত গ্রহণ করলাম। আমাদের ক্লাশে যে মিশকাত শরীফ পড়ানো হয় তাতে দেখলাম যে এটাই ছালাতের সঠিক পদ্ধতি। তারপর থেকে ছহীহ হাদীছ মোতাবেক ছালাত আদায় করা শুরু করি। ঐ ভাইদের কাছ থেকেই জানলাম, আহলেহাদীছ আন্দোলন সম্পর্কে। তাদের মোবাইল থেকে আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ, আমানুল্লাহ বিন ইসমাঈল, মোযাফফর বিন মুহসিন, মুতীউর রহমান মাদানীর বেশ কিছু বক্তব্য সংগ্রহ করি। এই বক্তব্যগুলো শুনার পর আসল হক সম্পর্কে জানতে পারলাম। একদিন বাড়ি এসে আমার গ্রামের একটি ছেলেকে সঠিক ছালাত আদায় করা সম্পর্কে বললাম। আমাদের গ্রামের সকলেই হানাফী মাযহাবের অনুসারী। তাই সে আমার কথা বিশ্বাস করতে পারল না। তারপর তাকে আমি মিশকাত থেকে কয়েকটি হাদীছ দেখালাম। তারপর সে বুঝতে পারে এবং হাদীছ মোতাবেক জোরে আমীন, পায়ে পা মিলিয়ে দাঁড়ানো, বুকে হাত বাধা, রাফ‘উল ইয়াদায়েন করে ছালাত আদায় করা শুরু করে। এক সময় আমরা ফরয ছালাতের পর মুনাজাত করাও ছেড়ে দেই। কিন্তু হানাফী মসজিদের কারণে তারা আমাদের এভাবে ছালাত আদায় করা মেনে নিতে পারে না। তারা জোরে আমীন বলাতে বিরক্ত মনে করে এবং পায়ে পা মিলিয়ে দাঁড়ানোকে মান সম্মানের  হানী মনে করে। কিন্তু আমরা তাদের কথায় কান না দিয়ে ছহীহ হাদীছ মোতাবেক ছালাত আদায় করে যাই। আমরা আমাদের আরেক বন্ধুকে হকের দাওয়াত দিলে সেও তা গ্রহণ করে। ফলে এলাকাবাসী আমাদের উপর ভীষণ রেগে যায়। তারা বলে, আমরা নাকি পাগল হয়ে গেছি। তারা আমাদের বিরুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র চালাতে থাকে। আমাদের মসজিদের ইমাম আমাদের সম্পর্কে নানা বাজে কথা বলে। একদিন তাকে আমরা হাদীছ দেখালাম। কিন্তু তিনি তা মানলেন না বরং নানা যুক্তি দেখালেন, যা কুরআন ও ছহীহ হাদীছের সাথে মিলে না। হুযুরের সাথে আমাদের দু’কথা হ’লে এলাকাবাসী আমাদের উপর ভীষণ ক্ষেপে যায়। তারা বলে যে, তোরা কত জানিস যে হুযুরের সাথে তর্ক করছিস। এলাকাবাসী কেউ আমাদের পক্ষে নেই। এলাকাবাসীর কেউ কেউ বলে, আমরা নাকি জঙ্গি, আমাদেরকে নাকি পুলিশে দিবে। আবার কেউ বলে, তোরা এ মসজিদে ছালাত আদায় করতে আসবি না। এলাকার একদল যুবক, যাদের কুরআন ও হাদীছের কোন জ্ঞান নেই তারা আমাদের বিভিন্ন যুক্তি দেখায়। কিন্তু আমরা তাদের কথা না মানার কারণে তারা আমাদেরকে মারার হুমকি দেয় এবং বিভিন্ন বাজে কথা বলে। সবচেয়ে বেশি আমাদের বিরোধিতা করছে ইমাম ছাহেব। সাধারণ জনগণ হয়তোবা না জানার কারণে আমাদের বিরুদ্ধাচরণ করছে। কিন্তু ইমাম ছাহেবতো জেনে বুঝেই করছেন। এখন পরিস্থিতি চরম অবস্থায় পৌঁছেছে যে, ছহীহভাবে ছালাত আদায় করাও আমাদের পক্ষে অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। ছালাতের প্রতি ওয়াক্তেই লোকেরা আমাদের অপমান করে। এলাকার মহিলা-পুরুষ কেউই আমাদের মেনে নিতে পারে না। এমতাবস্থায় আমাদের পাশে দাঁড়াবার মতো কেউ নেই। একমাত্র আল্লাহই আমাদের সহায়। এহেন প্রতিকূলতার মাঝেও আমরা দৃঢ় মনোবলের সাথে এগিয়ে চলেছি। আল্লাহ আমাদের কুরআন ও ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী আমল করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!!

* তাওহীদুল ইসলাম, নয়ন, পলক

সাং- শেখটোলা, উপযেলা- শিবগঞ্জ, যেলা- চাঁপাই নবাবগঞ্জ

(১২) যেভাবে আহলেহাদীছ আক্বীদা গ্রহণ করলাম

আমার নিজ যেলা জামালপুরের পার্শ্ববর্তী শেরপুরে কর্মরত অবস্থায় জনৈক ডাক্তার ফরহাদ হোসাইনের সাথে পরিচয় হয়। তার কাছে গেলে তিনি আমাকে কুরআনের উল্লেখযোগ্য কিছু আয়াত ও হাদীছ পড়তে বলেন। যা পাঠে আমার মনে প্রশ্ন জাগে, তাহ’লে কি আমরা ভুল পথে আছি? অতঃপর আমি আমার গ্রামের ইমাম ছাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, ইমাম ছাহেব! ছহীহ বুখারীর প্রথম খন্ডে দেখলাম বুকে হাত বাঁধতে হবে, সশব্দে আমীন বলতে হবে, রাফঊল ইয়াদায়েন করতে হবে। কিন্তু আমরা তা করি না কেন? ইমাম ছাহেব তখন আমাকে এই সকল বই পড়তে নিষেধ করলেন। এতে আমার জানার আগ্রহ আরো তীব্র হ’ল। ছহীহ হাদীছ থেকে সুস্পষ্ট দলীল পেয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করে আমি বুকে হাত বাঁধা, রাফঊল ইয়াদায়েন করা, সশব্দে আমীন বলা শুরু করে দিলাম। এক পর্যায়ে গ্রামে গুঞ্জন উঠল আমি নাকি কাদিয়ানী হয়ে গেছি! এসব কথা আববা-আম্মার কানেও গেল। আববাকে বুঝাতে পেরেছিলাম যে, আমি প্রমাণ ছাড়া কোন কথা বলি না। কিছুদিন পরেই আববা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। আববাকে আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতবাসী করুন- আমীন! কিন্তু  আম্মাকে বুঝাতে পারি না। এক পর্যায়ে বুঝতে পারেন। কিন্তু বলেন, আমার কাছে গ্রামের মানুষের আজেবাজে মন্তব্য যেন না আসে।

সর্বশেষ ঘটনা ঘটে গত ঈদুল ফিতরের ছালাতে। বৃষ্টির কারণে ঈদের ছালাত পড়ছিলাম মসজিদে। আমি প্রথম রাক‘আতে সাত তাকবীর দিলাম, পরের রাক‘আতে যখন কিরাতের আগেই পাঁচ তাকবীর দিলাম তখন আমার দুই পাশের দু’জন ছালাতের মধ্যেই যেন কিছু বলবে মনে হ’ল। অতঃপর ছালাত শেষ হ’ল, খুৎবা শেষ হ’ল এবং দীর্ঘ এক মুনাজাত হ’ল। কিন্তু আমি মুনাজাত করি নাই। ছালাত পড়াচ্ছিলেন আমার চাচাত ভাই। সে কউমী মাদরাসায় লেখাপড়া করে। ছালাত শেষ করে বাড়িতে আসলাম। জানতে পারলাম, আমাকে নিয়ে তুলকালাম শুরু হয়েছে, আমার চাচাত ভাইকে লোকেরা বলছে, তোমারই ভাই এভাবে ছালাত আদায় করে, তুমি কিছু বল না কেন? ঐ দিন শুক্রবার আমার সেই ভাই জুম‘আর ছালাত আদায় করালো। মসজিদে দু’টি খুৎবা দেওয়ার আগে আরেকটি খুৎবা বাংলায় দেওয়া হয়। সেই খুৎবায় গ্রামবাসীর মন জয় করার হীন মানসে বলল, আহলেহাদীছের নামে যত ইচ্ছা মিথ্যা কথা এবং আমি ভুল পথে আছি বলে খুৎবায় তিরষ্কার করল। অতঃপর মসজিদ থেকে বের হয়ে আমার চাচাত ভাইয়ের সাথে কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে সে বলে, হাত বাঁধার নিয়ম বুকের উপরেও আছে, নাভির নিচেও আছে। নাভির নিচে রাখাই ছহীহ। তখন আমি বললাম, তোর মা অর্থাৎ আমার চাচী বুকে হাত বাঁধে কেন? সে বলে, মেয়েরা বুকে হাত বাঁধবে। তখন আমি বললাম, আমার দু’টি প্রশ্ন- (১) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কোথায় বলেছেন, পুরুষরা নাভির নিচে হাত বাঁধবে, আর নারীরা বুকে বাঁধবে। (২) ঈদের তাকবীর সংখ্যা সম্পর্কে ইবনু মাজাহ ও আবূদাঊদে ৩০টি হাদীছ দেখালাম, তুই আমাকে একটি হাদীছ দেখাবি যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছয় তাকবীরে ঈদের ছালাত আদায় করেছেন? গ্রামবাসীর কাছেও প্রশ্ন দু’টি দেওয়া আছে প্রায় এক মাস হয়ে গেল। কোন উত্তর আজো পাইনি। আমি বলেছি, সঠিক উত্তর দেখাতে পারলে মেনে নেব। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন- আমীন!!

* মুহাম্মাদ এনামুল হক

বকশীগঞ্জ, জামালপুর।

 

 

HTML Comment Box is loading comments...