প্রবন্ধ

হাদীছের অনুবাদ ও ভাষ্য প্রণয়নে ভারতীয় উপমহাদেশেরআহলেহাদীছ আলেমগণের অগ্রণী ভূমিকা 

(২য় কিস্তি) 

মূল (উর্দূ) : মাওলানা মুহাম্মাদ ইসহাক ভাট্টি

অনুবাদ : নূরুল ইসলাম

মাওলানা শামসুল হক আযীমাবাদী :

ভারতের বিহার প্রদেশে অসংখ্য আলেম জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তাঁরা পাঠদান ও গ্রন্থ রচনায় অপরিসীম খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে এক বিশাল ব্যক্তিত্ব ছিলেন মাওলানা শামসুল হক আযীমাবাদী।[1] তিনি ১২৭৩ হিজরীর ২৭শে যিলকদ (১৮৫৭ সালের ১৯শে জুলাই) জন্মগ্রহণ করেন। স্বীয় যুগের উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন আলেমদের নিকট থেকে জ্ঞানার্জন করেন। শেষে ১২৯৬ হিজরীর মুহাররম (জানুয়ারী ১৮৭৯ খ্রিঃ) মাসে মিয়াঁ সাইয়িদ নাযীর হুসাইনের কাছ থেকে হাদীছের সনদ গ্রহণ করেন। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে দুই বার মিয়াঁ ছাহেবের নিকটে যান এবং সর্বমোট আড়াই বৎসর তাঁর দরসের মজলিসে শামিল থাকেন। জ্ঞানার্জনের পর পাঠদানের খিদমত আঞ্জাম দেন এবং গ্রন্থ রচনার সাথেও যোগসূত্র বিদ্যমান থাকে। হাদীছ সম্পর্কে তাঁর রচনাবলীর মধ্যে নিম্নোক্ত গ্রন্থগুলো শামিল রয়েছে।

১. গায়াতুল মাকছূদ ফী হাল্লি সুনানি আবীদাঊদ : এই নামে সুনানে আবুদাঊদের এমন বিস্তারিত ব্যাখ্যা লেখার পরিকল্পনা তাঁর ছিল, যা বেশ কয়েক খন্ডে সমাপ্ত হবে। কিন্তু এর শুধুমাত্র এক খন্ড দিল্লীর আনছারী প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়েছে।[2] সুনিশ্চিতভাবে জানা যায় না যে, এই ব্যাখ্যাগ্রন্থটি কতদূর পর্যন্ত লেখা হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে যে, একুশ পারার ব্যাখ্যা সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু এর মাত্র দুই খন্ডের পান্ডুলিপি খোদাবখশ পাটনা লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত রয়েছে। অন্যান্য খন্ডগুলোর কোন হদিস পাওয়া যায় না।

২. আওনুল মা‘বূদ আলা সুনানি আবীদাঊদ : এটিও চারটি বৃহৎ খন্ডে বিভক্ত[3] সুনানে আবুদাঊদের শরাহ বা ব্যাখ্যাগ্রন্থ। এটিকে ‘গায়াতুল মাকছূদ’-এর সারসংক্ষেপ আখ্যায়িত করা হয়। ৭ বছরে এটির রচনা সমাপ্ত হয় এবং প্রথমবার ১৩১৮-১৩২৩ হিজরী পর্যন্ত ৫ বছরে প্রকাশিত হয়। আল্লাহ আলেমদের মধ্যে এই গ্রন্থের অপরিসীম গ্রহণযোগ্যতা দান করেছেন। উপমহাদেশে এ বিষয়ে এটিই প্রথম হাদীছের খিদমত, যা আঞ্জাম দেয়ার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে মাওলানা শামসুল হক আযীমাবাদী তৌফিক লাভ করেন।

৩. আত-তা‘লীকুল মুগনী আলা সুনানিদ দারাকুতনী : মাওলানা আযীমাবাদী স্বীয় গবেষণালব্ধ টীকা সহ প্রথমবার হাদীছের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ দারাকুতনীর ‘মতন’ (Text) প্রকাশ করেন। ১৩১০ হিজরীতে দিল্লীর ফারূকী প্রেস থেকে এই গ্রন্থটি প্রথম দু’খন্ডে প্রকাশিত হয়। এর ফটোকপি পাকিস্তানেও মুদ্রিত হয়েছে। তিনি হাদীছ বিষয়ে অনেক খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন, আমি আমার ‘দাবিস্তানে হাদীছ’ গ্রন্থে যার বিস্তারিত বিবরণ পেশ করেছি। এতে তাঁর কিছু খ্যাতিমান ছাত্রের নাম লিপিবদ্ধ করেছি এবং এটাও লিখেছি যে, তাঁর পরামর্শে কোন আলেম কোন গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করেছেন এবং তাহকীকী দৃষ্টিকোণ থেকে সেগুলো কতটা গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে।

মাওলানা শামসুল হক আযীমাবাদী মাত্র ৫৬ বছর আয়ু পান এবং ১৩২৯ হিজরীর ১৯শে রবীউল আওয়ালে তিনি (১৯১১ সালের ২০শে মার্চ) পরপারে পাড়ি জমান।

মাওলানা আব্দুর রহমান মুবারকপুরী :

মাওলানা আব্দুর রহমান মুবারকপুরীর[4] জন্মস্থান আযমগড় যেলার (ইউপি) মুবারকপুর গ্রাম এবং জন্মসন ১২৮২ হিঃ (১৮৬৫ খ্রিঃ)। তিনি অত্যন্ত নরম মনের অধিকারী, আপাদমস্তক বিনয়ী ও নম্রতার মূর্তপ্রতীক আলেমে দ্বীন ছিলেন। অসংখ্য শিক্ষকের নিকট থেকে তিনি জ্ঞানার্জন করেন। কিছুদিন হাফেয আব্দুল্লাহ গাযীপুরীর দরসের মজলিসে অংশগ্রহণ করেন। হাফেয ছাহেব নিজের এই ছাত্রের যোগ্যতায় বিমুগ্ধ ছিলেন এবং তাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। প্রিয় শিক্ষকের পরামর্শে তিনি মিয়াঁ সাইয়িদ নাযীর হুসাইন দেহলভীর খিদমতে হাজির হন এবং তাঁর কাছ থেকে জ্ঞানার্জন করেন। এটি ১৩০৬ হিজরীর (১৮৮৯ খ্রিঃ) ঘটনা। ঐ সময় মাওলানা মুবারকপুরী ২৩ বছরের যুবক ছিলেন এবং মিয়াঁ ছাহেবের বয়স ৮৬ বছর অতিক্রম করেছিল। তিনি মিয়াঁ ছাহেবের কাছ থেকে ছহীহ মুসলিম, জামে তিরমিযী এবং সুনানে আবুদাঊদ পুরাপুরি পড়েন। এসব গ্রন্থ ছাড়াও তাফসীর, হাদীছ ও ফিকহের কতিপয় গ্রন্থ তাঁর নিকট পড়েন এবং সনদ গ্রহণ করেন।

মাওলানা মুবারকপুরী বিভিন্ন মাদরাসায় শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন এবং অনেক গ্রন্থও লিখেন। তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হল তিরমিযীর শরাহ ‘তুহফাতুল আহওয়াযী’ (تحفة الأحوذى)। উপমহাদেশে তিনিই প্রথম তিরমিযীর ব্যাখ্যা লিপিবদ্ধ করেন। এটি চারটি বৃহৎ খন্ডে বিভক্ত। ৩৪৪ পৃষ্ঠাব্যাপী এ গ্রন্থের উপর তাঁর ভূমিকা রয়েছে। যেটি স্বতন্ত্র খন্ডে মুদ্রিত হয়েছে। ভূমিকা সহ তুহফাতুল আহওয়াযী মোট পাঁচ খন্ড।[5] এটি মাওলানা মুবারকপুরীর হাদীছের এমন খিদমত, যার কারণে তিনি উপমহাদেশের আলেমদের মাঝে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত রয়েছেন।

মাওলানা আব্দুর রহমান মুবারকপুরী ১৩৫৩ হিজরীর ১৬ই শাওয়াল (১৯৩৫ সালের ২২শে জানুয়ারী) মৃত্যুবরণ করেন।

মাওলানা ওবাইদুল্লাহ রহমানী :

মাওলানা ওবাইদুল্লাহ রহমানী মুবারকপুরী[6] উপমহাদেশের প্রসিদ্ধ ও খ্যাতিমান আলেম ছিলেন। মাওলানা আব্দুর রহমান মুবারকপুরীর নিকটাত্মীয় ছিলেন। ১৩২৭ হিজরীর মুহাররম মাসে (ফেব্রুয়ারী ১৯০৯ খ্রিঃ) মুবারকপুর নামক স্থানে (যেলা আযমগড়) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিভিন্ন মাদরাসার অসংখ্য যোগ্য শিক্ষকের নিকট থেকে জ্ঞানার্জন করেন। ১৩৪৫ হিজরীতে (১৯২৭ খ্রিঃ) ‘দারুল হাদীছ রহমানিয়া’ (দিল্লী) থেকে শিক্ষা সমাপনী সনদ গ্রহণ করেন। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। সকল পরীক্ষায় সবর্দা প্রথম হতেন। ফারেগ হওয়ার পর দারুল হাদীছ রহমানিয়ার পরিচালক শায়খ আতাউর রহমান সেখানেই তাঁকে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন এবং তিনি এই দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেছিলেন। অতঃপর অসংখ্য আলেম ও ছাত্র তাঁর নিকট থেকে জ্ঞানার্জন করেন।

পাঠদানের পাশাপাশি গ্রন্থ রচনাও করেন। এর সূচনা এভাবে হয়েছিল যে, ‘তুহফাতুল আহওয়াযী’ রচনার সময় মাওলানা আব্দুর রহমান মুবারকপুরীর সাহায্যকারীর প্রয়োজন দেখা দিলে মাওলানা ওবাইদুল্লাহ রহমানীকেই তাঁর সাহায্যকারী নিযুক্ত করা হয়। অল্পবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ খিদমত আঞ্জাম দেন।

হাদীছের গবেষণালব্ধ খিদমতের ব্যাপারে মাওলানা রহমানীর এক বিশাল বড় কীর্তি হল মিশকাত শরীফের শরাহ। যার পুরা নাম ‘মির‘আতুল মাফাতীহ শারহু মিশকাতিল মাছাবীহ’ (مرعاة المفاتيح شرح مشكاة المصابيح)। এই শরাহটি সমাপ্ত না হলেও যতটুকু হয়েছে তা অত্যন্ত গুরুত্বের দাবীদার। প্রথমে এই গ্রন্থটি মাওলানা আতাউল্লাহ হানীফ ভূজিয়ানীর তত্ত্বাবধানে মাকতাবা সালাফিয়া (লাহোর) থেকে লিথো প্রেসে মুদ্রিত হয়েছিল। সেই সময় ছাপার এটিই প্রচলন ছিল। অতঃপর এই গ্রন্থটি জামে‘আ সালাফিয়া (বেনারস) কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত চমৎকার টাইপে ৯ খন্ডে প্রকাশ করে। ভারত, পাকিস্তান ও আরব দেশসমূহের ইলমী পরিমন্ডলে এটি সীমাহীন গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। উপমহাদেশে ইলমী ও তাহকীকী দৃষ্টিকোণ থেকে এই গ্রন্থটি প্রথম হওয়ার গৌরবের দাবীদার। এর পূর্বে এই ভূখন্ডে মিশকাতের এ ধরনের শরাহ কোন ভাষাতেই প্রকাশিত হয়নি।

মাওলানা ওবাইদুল্লাহ রহমানী কিছুদিন অসুস্থ থাকার পর ৮৫ বছর বয়সে  ১৯৯৪  সালের  ৬ই জানুয়ারী  (১৪১৪ হিজরীর

২৩শে রজব) নিজ জন্মভূমি মুবারকপুরে (যেলা আযমগড়) মৃত্যুবরণ করেন।

মাওলানা আব্দুস সালাম মুবারকপুরী :

এখন মাওলানা ওবাইদুল্লাহ রহমানী মুবারকপুরীর পিতা মাওলানা আব্দুস সালাম মুবারকপুরীর অনেক বড় অগ্রগণ্য ইলমী অবদান লক্ষ করুন! তিনি যেসব মুহাদ্দিছের নিকট থেকে জ্ঞানার্জন করেন তাঁদের মধ্যে মাওলানা আব্দুর রহমান মুবারকপুরী, হাফেয আব্দুল্লাহ গাযীপুরী, মিয়াঁ সাইয়িদ নাযীর হুসাইন দেহলভী ও শায়খ হুসাইন আরব ইয়ামানীর নাম উল্লেখযোগ্য।

মাওলানা আব্দুস সালাম মুবারকপুরী অধিক অধ্যয়নকারী আলেম ছিলেন। তাঁর জ্ঞানের পরিধি ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। পাঠদানের পাশাপাশি তাঁর রচনার সিলসিলাও জারি থাকত। ওলামায়ে কেরামের জীবনী সম্পর্কে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। মাওলানা ছানাউল্লাহ অমৃতসরীর ‘আখবারে আহলেহাদীছ’ (অমৃতসর) পত্রিকায় ১৯১৮ সালের ৩০শে আগস্ট আহলেহাদীছ আলেমদের জীবনী প্রকাশের একটা সিলসিলা শুরু হয়েছিল। ১৯২২ সালের ১৭ আগস্ট পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে চার বছর যেটা অব্যাহত ছিল। এই সময়ে উপমহাদেশের ৮২ জন আহলেহাদীছ আলেমের জীবনী প্রকাশিত হয়েছিল। এর মধ্যে এক তৃতীয়াংশ মাওলানা আব্দুস সালাম মুবারকপুরীর শুভ প্রচেষ্টার ফলশ্রুতি ছিল।

মাওলানা মুবারকপুরী উপমহাদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছেন। এগুলো ছাড়া তিনি ‘সীরাতুল বুখারী’ নামে যে গ্রন্থ রচনা করেছেন, পুরো উপমহাদেশে তার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। উর্দূ ভাষায় এটিই প্রথম গ্রন্থ যাতে বিস্তারিতভাবে ইমাম বুখারী (রহঃ)-এর জীবনী আলোচনা করা হয়েছে এবং মুহাদ্দিছ হিসাবে তাঁর মর্যাদার সকল দিক  ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিদ্বান মহলে এই গ্রন্থটি দারুণ গ্রহণযাগ্যতা অর্জন করেছে। এ বিষয়ে আরবী ভাষায় রচিত কোন গ্রন্থও এর মুকাবিলা করতে সক্ষম নয়। ১৩২৯ হিজরীতে (১৯১১ খ্রিঃ) প্রথমবার ‘সীরাতুল বুখারী’ প্রকাশিত হয়েছিল। এর পরে ভারতেও প্রকাশিত হয় এবং পাকিস্তানের কতিপয় প্রকাশনীও প্রকাশ করে।

ভারতের একজন বিজ্ঞ গ্রন্থকার ও অনুবাদক ড. আব্দুল আলীম আব্দুল আযীম বাস্তাবী মাওলানা আব্দুস সালাম মুবারকপুরীর এই উর্দূ গ্রন্থের (সীরাতুল বুখারী) আরবী অনুবাদ করেন। যেটি তাহকীক ও তাখরীজ সহ প্রকাশিত হয়েছে এবং আরব বিশ্বের আলেমগণ এর দ্বারা উপকৃত হচ্ছেন।

এটা পরম সৌভাগ্যের কথা যে, উর্দূ ভাষাতে ইমাম বুখারীর প্রথম জীবনী লেখার মর্যাদা একজন ভারতীয় আলেম লাভ করেন এবং তার প্রথম আরবী অনুবাদ, তাহকীক ও তাখরীজের মুকুটও একজন ভারতীয় আলেমের মাথায় শোভা পায়।

মাওলানা আব্দুস সালাম মুবারকপুরী গ্রন্থ পাঠে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। কোন ব্যবসায়ীর নিকট নতুন কোন গ্রন্থ আসলে এবং তিনি সেটা অবগত হলে যেকোন মূল্যে তা ক্রয় করার চেষ্টা করতেন। গ্রন্থের প্রতি এই আকর্ষণ ও ভালবাসাই তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একদিন তিনি দিল্লীর জামে মসজিদ এলাকায় দারুল হাদীছ রহমানিয়া থেকে একটি গ্রন্থ ক্রয়ের জন্য যান। বই ক্রয় করে চাঁদনী চকে ঘণ্টাঘরের নিকটে রাস্তা পার হওয়ার সময় হঠাৎ একটি দ্রুতগামী ঘোড়ার গাড়ি এসে পড়ে। যার উপর কোন আরোহী ও চালক ছিল না। দ্রুত ধাবমান ঘোড়াটি মাওলানা আব্দুস সালাম মুবারকপুরীকে পিষ্ট করে চলে যায় এবং তিনি তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করেন। সদ্য ক্রীত গ্রন্থটি তাঁর হাতেই ছিল, যার সবুজ রংয়ের টাইটেল তাঁর রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। শোনা যায়, এই গ্রন্থটি নিজ সবুজ (এবং রক্তের লাল) রং সহ তাঁর গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে। ১৯২৪ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারী (১৩৪২ হিজরীর ১৮ই রজব) এই দুর্ঘটনা ঘটে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজে‘ঊন

ড. যিয়াউর রহমান আ‘যমী :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর বরকতময় হাদীছের প্রচার-প্রসার নবুঅতের যুগ থেকে অব্যাহত আছে এবং ইনশাআল্লাহ সর্বদা অব্যাহত থাকবে। মানুষেরা নিজেদের জ্ঞান ও অবস্থার চাহিদা অনুযায়ী কিয়ামত পর্যন্ত এই কল্যাণকর কাজে নিমগ্ন থাকবে। বর্তমান যুগে হাদীছের খাদেমদের দীর্ঘ তালিকায় আযমগড় যেলার ড. যিয়াউর রহমান আ‘যমীর নাম অত্যন্ত গুরুত্ববহ। ড. ছাহেব ১৯৪৩ সালে ভারতের  উত্তর প্রদেশের আযমগড় যেলার একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বংশ হিন্দুদের আর্য সমাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। ড. ছাহেব মাধ্যমিক পর্যন্ত নিজ গ্রামে শিক্ষার্জন করেন। অতঃপর আযমগড়ের শিবলী কলেজে ভর্তি হন। যেখানে মাধ্যমিক ক্লাসেরও ব্যবস্থা ছিল। ১৯৫৯ সালে তিনি এই কলেজের হাইস্কুল (শাখা) থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। তিনি স্কুল পাশ করে কলেজে ভর্তির জন্য প্রস্ত্তত ছিলেন। ইত্যবসরে এক বিশাল বড় বিপ্লব তাঁর জীবনের দুয়ারে কড়া নাড়ে। অধ্যয়নের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। এই আগ্রহই তাঁকে ইসলাম সম্পর্কিত গ্রন্থগুলো পড়তে উদ্বুদ্ধ করে এবং তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

এরপরে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয় যে, তিনি মদীনা মুনাউওয়ারায় পৌঁছে যান এবং মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ফারেগ হওয়ার পর সেখানেই অধ্যাপনা শুরু করেন। ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে আমার সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনি তাঁর বাড়িতে আমাকে দাওয়াত দিয়েছিলেন। আরো অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আমরা সেখানে রাতের খাবার গ্রহণ করি এবং অনেক রাত পর্যন্ত আলোচনা চলতে থাকে। আমার মনে পড়ছে ঐ সময় তিনি মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষদের ডীন ছিলেন। এর ৮ বছর পর ২০০৮ সালের ২৯শে জুন মদীনা মুনাউওয়ারাতেই তাঁর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। এবারও রাতের খাবার তাঁর বাড়িতেই খাই। ড. আব্দুর রহমান ফিরিওয়াঈ ও মাওলানা আব্দুল মালেক মুজাহিদও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এই দু’জন ব্যক্তি এই অকিঞ্চনের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য রিয়াদ থেকে এসেছিলেন। এঁরা দু’জন রিয়াদে প্রত্যাবর্তন করেন। কিন্তু আমি রাতে ড. আ‘যমীর বাসায় থাকি এবং আমরা দু’জন অনেক রাত পর্যন্ত আলোচনা করতে থাকি।

ঐ সময় ড. যিয়াউর রহমান আ‘যমী হাদীছ সম্পর্কে এমন কাজ করছিলেন, যা আজ পর্যন্ত কেউ করেনি। তিনি এমন একটি হাদীছের গ্রন্থ সংকলন করছিলেন, যেটি সকল ছহীহ হাদীছকে শামিল করবে। তিনি এই সংকলনের নাম নির্ধারণ করেছিলেন ‘আল-জামে আল-কামেল ফিল হাদীছ আছ-ছহীহ আশ-শামেল’ (الجامع الكامل في الحديث الصحيح الشامل)। ২০০১ সালের জুনের শেষাবধি এর ৯টি বৃহৎ খন্ড সংকলিত হয়েছিল। যাতে ঈমান, ইলম ও ইবাদত অর্থাৎ ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ ও যাকাত সম্পর্কিত ছহীহ হাদীছ সমূহ সকল হাদীছ গ্রন্থ থেকে যাচাই-বাছাই করে একত্রিত করা হয়েছিল। এ সকল তথ্য-উপাত্ত সুবিন্যস্ত অবস্থায় তিনি আমাকে দেখিয়েছিলেন। ড. ছাহেবের ধারণা এমনটা ছিল যে, অবশিষ্ট খন্ডগুলো সমাপ্ত হলে সকল ছহীহ হাদীছের সংখ্যা দাঁড়াবে ১২/১৫ হাযার। তিনি ২০০০ সালের দিকে এই কাজ শুরু করেছিলেন এবং ২০১৩ সালে তা সমাপ্ত হওয়ার কথা ছিল।

এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং এমন কাজ যেটা কোন আলেম অদ্যাবধি করেননি। কেবল ড. যিয়াউর রহমান আ‘যমী সেদিকে মনোযোগ দেন এবং ইনশাআল্লাহ বর্তমানে তা সমাপ্তের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে থাকবে।

আমি ‘গুলিস্তানে হাদীছ’ গ্রন্থে হাদীছের খাদেমদের আলোচনায় ড. ছাহেবের উপর বিস্তারিত প্রবন্ধ লিখতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু লিখতে পারিনি। বর্তমানে ঐ ধরনের গ্রন্থ ‘চামানিস্তানে হাদীছ’ গবেষণাধীন রয়েছে। ইনশাআল্লাহ এ গ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে আলোচনা আসবে।

এক মহিলার সোনালী কীর্তি :

ইমাম বুখারী (রহঃ) ও তাঁর ছহীহ বুখারী সম্পর্কিত অত্যন্ত চমৎকার একটি কাজের আলোচনা করা এখানে যরূরী। যেটি করেছেন লাহোরের গাযালাহ হামিদ বাট নাম্নী এক মহিলা। এ সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে সামান্য ভূমিকা।

লাহোরের এক খ্যাতিমান আলেম ছিলেন প্রফেসর আব্দুল কাইয়ূম। যিনি ১৯০৯ সালের ১৫ই জানুয়ারী (১৩২৬ হিজরীর ২৩শে যিলহজ্জ) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবারে ইলম ও আমলের অনন্য সম্মিলন পাওয়া যেত। তিনি আরবীতে এম.এ করেন এবং পরীক্ষায় প্রথম স্থান  অধিকার করেন। কিছুকাল পর তিনি প্রফেসর পদে উন্নীত হন। ১৯৪৭-১৯৬৮ সাল পর্যন্ত তিনি লাহোর সরকারী কলেজে আরবী সাহিত্য পড়াতে থাকেন। চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণের পর পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির উর্দূ ইসলামী বিশ্বকোষ প্রকল্পের সিনিয়র সম্পাদক হিসাবে যোগদান করেন।

১৯৪৮ সালের ২৪শে জুলাই ‘মারকাযী জমঈয়তে আহলেহাদীছ’ নামে পাকিস্তানে আহলেহাদীছ জামা‘আতের সংগঠন প্রতিষ্ঠা লাভ করলে প্রফেসর আব্দুল কাইয়ূমকে এর সেক্রেটারী জেনারেল করা হয়। আর মাওলানা সাইয়িদ মুহাম্মাদ দাঊদ গযনভীকে সভাপতি নির্বাচন করা হয়। প্রফেসর ছাহেব ১৯৮৯ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।

প্রফেসর আব্দুল কাইয়ূমের পুত্র মেজর যুবায়ের কাইয়ূম মৃত্যুর দ্বিতীয় দিন সমবেদনা জানানোর জন্য আমাকে তাঁর বোন গাযালাহ হামিদ বাটের বাড়িতে নিয়ে যান। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে মুহতারামা গাযালাহ বলেন, তিনি ১৯৬৬ সালে পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি থেকে আরবীতে এম.এ করেছিলেন এবং ‘শুরূহে ছহীহ বুখারী’ (شروح صحيح بخارى) শিরোনামে এম.এ থিসিস করেছিলেন। আমি একথা শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলাম। আমি সেই সময় ‘ইদারায়ে ছাকাফাতে ইসলামিয়াহ’-এর সাথে জড়িত ছিলাম। ইদারার পক্ষ থেকে আমি ঐ থিসিসটি গ্রন্থাকারে ছাপিয়ে দিয়েছিলাম। বিষয়বস্ত্তর দিক থেকে এই গ্রন্থটি অত্যন্ত গুরুত্বের দাবীদার। ছহীহ বুখারীর ভাষ্যগ্রন্থসমূহ লেখার সূচনা কবে হয়েছিল এবং কোন কোন আলেম এই বরকতপূর্ণ খিদমত আঞ্জাম দিয়েছিলেন, সম্মানিতা লেখিকা বিস্তারিতভাবে তা আলোচনা করেছেন। উপমহাদেশে এটি ব্যতিক্রমধর্মী কাজ, যেটি লাহোরের প্রাচীন আহলেহাদীছ পরিবারের যোগ্য মহিলা অত্যন্ত গবেষণা করে লিখেছেন। এতে ছহীহ বুখারীর দু’শর অধিক ব্যাখ্যাগ্রন্থের পরিচিতি সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে। আমি এ গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছি।

মাওলানা আতাউল্লাহ হানীফ ভূজিয়ানী :

মাওলানা মুহাম্মাদ আতাউল্লাহ হানীফ ভূজিয়ানী[7] প্রসিদ্ধ আলেম ছিলেন। যিনি অবস্থার চাহিদা অনুপাতে শিক্ষকতা ও বক্তৃতা প্রদানের সাথে সাথে গ্রন্থ রচনার সিলসিলাও অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি ১৯০৯ সালের আগে-পরে ভূজিয়ান (যেলা অমৃতসর, পূর্ব পাঞ্জাব) নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যেসকল শিক্ষকের কাছ থেকে জ্ঞানার্জন করেন তাঁদের মধ্যে মাওলানা আব্দুর রহমান ভূজিয়ানী, মাওলানা আব্দুল জাববার খান্ডিলবী, মাওলানা আবু সাঈদ শারফুদ্দীন দেহলভী, উসতাযে পাঞ্জাব মাওলানা আতাউল্লাহ লাক্ষাবী ও হাফেয মুহাম্মাদ গোন্দলবীর নাম উল্লেখযোগ্য। মাওলানা আতাউল্লাহ হানীফ ভূজিয়ানীর কাছ থেকে অনেক আলেম ও ছাত্র জ্ঞানার্জন করেন। তাঁর রচনাবলীর মধ্যে সুনানে নাসাঈর হাশিয়া বা পাদটীকা ‘আত-তা‘লীকাতুস সালাফিয়্যাহ’ (التعليقات السلفية) অত্যন্ত গুরুত্ব লাভ করেছে। আল্লাহ এই

গ্রন্থের দারুণ সুখ্যাতি দান করেছেন এবং অসংখ্য আলেম এই গ্রন্থ থেকে উপকৃত হয়েছেন। আমার যতদূর মনে পড়ছে মাওলানা আতাউল্লাহ পাঞ্জাবের প্রথম আলেম, যিনি আরবী ভাষায় কুতুবে সিত্তাহর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সুনানে নাসাঈর আরবীতে টীকা লিখেছেন।

মাওলানা আতাউল্লাহ হানীফ ভূজিয়ানী ১৯৮৭ সালের ৩রা অক্টোবর (১৪০৮ হিজরীর ৯ই ছফর) মৃত্যুবরণ করেন। তিনি সারা জীবন সাদাসিধে ও ইলমের খিদমতে অতিবাহিত করেন।

মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জানবায :

মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জানবাযের পাঠদান ও গ্রন্থ রচনাগত খিদমতের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। তিনি ১৯৩৪ সালে ফিরোযপুর যেলার (পূর্ব পাঞ্জাব, ভারত) ‘চক বধুকে’ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার সহ ঐ এলাকার সকল মানুষ লাক্ষাবী আলেমদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন এবং দ্বীনী মাসায়েল বুঝার জন্য তাঁদের নিকটেই প্রত্যাবর্তন করতেন। মুহাম্মাদ আলী জানবায ‘দারুল হাদীছ রহমানিয়া’ ফারেগ মাওলানা মুহাম্মাদ রহমানীর নিকট নিজ পিতৃপুরুষের গ্রামে (চক বধুকে) জ্ঞানার্জন শুরু করেন। ভারত ভাগের সময় এরা নিজ জন্মস্থান ত্যাগ করে পাকিস্তানে চলে আসেন এবং লায়েলপুর যেলার (বর্তমানে ফায়ছালাবাদ) এক গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। ঐ সময় মুহাম্মাদ আলী জানবাযের বয়স ছিল ১৩ বছর। পাকিস্তানে তিনি বিভিন্ন মাদরাসার শিক্ষকদের নিকট থেকে জ্ঞানার্জন করেন। যাঁদের মধ্যে হাফেয মুহাম্মাদ গোন্দলবীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৫৮ সালে তিনি জামে‘আ সালাফিয়া (ফায়ছালাবাদ) থেকে ফারেগ হন এবং এখানেই ছাত্রদেরকে পড়াতে শুরু করেন। এরপরে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয় যে, তিনি শিয়ালকোটে চলে যান এবং সেখানে পৃথকভাবে বসবাস করতে থাকেন। ওখানে ‘জামে‘আ রহমানিয়া’ নামে মাদরাসাও চালু করেন।

মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জানবায দরস-তাদরীসের পাশাপাশি লেখালেখিও করেন এবং বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করে নিজেই প্রকাশ করেন। তাঁর রচনাবলীর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রচনা হল সুনানে ইবনু মাজাহর শরাহ বা ব্যাখ্যা ‘ইনজাযুল হাজাহ’ (انجاز الحاجة)। আরবী ভাষায় রচিত এই শরাহটি ১২ খন্ডে ও ৭৩৯১ পৃষ্ঠায় বিন্যস্ত। নিঃসন্দেহে এটি এ বিষয়ে এক অতুলনীয় শরাহ। আরো কতিপয় আলেম সুনানে ইবনু মাজাহর শরাহ লিখেছেন, কিন্তু কলেবর ও বিষয়বস্ত্তর দিক থেকে এই শরাহটি সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যেটি উপমহাদেশের পাঞ্জাব প্রদেশের এই আলেম লিখেছেন।

মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জানবায ১৪২৯ হিজরীর ১৫ই যিলহজ্জ (২০০৮ সালের ১৩ই ডিসেম্বর) শিয়ালকোটে মৃত্যুবরণ করেন। আমি তাঁর জানাযায় শরীক ছিলাম। আল্লামা ইহসান ইলাহী যহীরের ছোট ভাই প্রফেসর ড. ফযলে ইলাহী তাঁর জানাযার ছালাত পড়ান।

মাওলানা মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ আলাবী :

মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জানবাযের পূর্বে আরবী ভাষায় ‘মিফতাহুল হাজাহ’ (مفةاح الحاجة) নামে ইবনু মাজাহর হাশিয়া বা পাদটীকা লিখেছিলেন মাওলানা মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ আলাবী পাঞ্জাবী। তিনি ১৩১২ হিজরীর ১০ই জুমাদাল উলা (১৮৯৪ সালের ১০ই নভেম্বর) এ গ্রন্থের পান্ডুলিপি সমাপ্ত করেন। তিনি অত্যন্ত নেক্কার ও গভীর জ্ঞানের অধিকারী আলেম ছিলেন। মূলতঃ তিনি হাযারা এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। হায়দারাবাদে (দাক্ষিণাত্য) চলে গিয়েছিলেন এবং জীবনের বৃহদাংশ সেখানেই অতিবাহিত করেন। প্রায় ৮০ বছর আয়ু পেয়ে ১৩৬৬ হিজরীর (১৯৪৭ খ্রিঃ) দিকে মৃত্যুবরণ করেন। প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ শায়খ হুসাইন বিন মুহসিন আনছারী ইয়ামানীর নিকট ইলমে হাদীছ অধ্যয়ন করেন। তাঁর রচনাবলীর মধ্যে মুসনাদে আহমাদের উর্দূ অনুবাদ এবং অন্যান্য গবেষণামূলক কর্মকান্ড শামিল রয়েছে।

মাওলানা মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ আলাবী পাঞ্জাবী লিখিত এই হাশিয়া সম্মানিত টীকাকারের জীবদ্দশায় প্রথমবার ১৩১৫ হিজরীতে (১৮৯৭ খ্রিঃ) লক্ষ্ণৌতে সুনানে ইবনে মাজাহর সাথে মুদ্রিত হয়। দ্বিতীয়বার ১৩৯৪ হিজরীর জুমাদাল উলাতে (জুন ১৯৭৪ খ্রিঃ) ‘ইদারাহ ইহইয়াউস সুন্নাহ আন-নাবাবিয়্যাহ’, ডি ব্লক, সারগোধা, পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত হয়। তৃতীয়বারও এই প্রতিষ্ঠানই ১৩৯৮ হিজরীর মুহাররম মাসে (জানুয়ারী ১৯৭৮ খ্রিঃ) প্রকাশ করে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় মুদ্রণের তত্ত্বাবধান করেন ‘ইদারাহ ইহইয়াউস সুন্নাহ আন-নাবাবিয়্যাহ’ (সারগোধা)-এর পরিচালক মাওলানা আবুস সালাম মুহাম্মাদ ছিদ্দীক।

হাফেয ছানাউল্লাহ মাদানী :

শায়খুল হাদীছ মুফতী হাফেয ছানাউল্লাহ মাদানী পাকিস্তানের তাদরীসী ও তাছনীফী (পাঠদান ও গ্রন্থ রচনা) পরিমন্ডলে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য এক নাম। প্রথমতঃ তিনি হাফেয আব্দুল্লাহ রোপড়ীর কাছ থেকে জ্ঞানার্জন করেন। অতঃপর মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখানকার উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষকদের নিকট থেকে জ্ঞানার্জন করেন। ফারেগ হওয়ার পর হাফেয আব্দুর রহমান মাদানীর ‘জামে‘আ রহমানিয়া’-তে (লাহোর) শায়খুল হাদীছ হিসাবে খিদমত আঞ্জাম দিতে শুরু করেন।

তিনি নিজেও ‘মারকাযু আনছারিস সুন্নাহ’ নামে একটি প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে ফারেগ হওয়া পরিশ্রমী ছাত্রদেরকে পাঠদান, লেখনী ও বক্তৃতার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। যদিও সেখানে অল্পসংখ্যক ছাত্রকে ভর্তি করা হয়, কিন্তু এটি একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমন্ডিত উন্নত প্রতিষ্ঠান এবং লাহোরে এ বিষয়ে এটিই প্রথম প্রচেষ্টা। এর কার্যক্রম দেখে অনুমিত হয় যে, ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতে এই প্রতিষ্ঠানটি উন্নতি করবে এবং এর অনেক সুফল দৃশ্যমান হবে। ইলমের সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলা হাফেয ছানাউল্লাহ মাদানীকে আমলের গুণেও গুণান্বিত করেছেন।

সাপ্তাহিক ‘আল-ই‘তিছাম’ ও অন্যান্য পত্র-পত্রিকায় তাঁর ফৎওয়াসমূহ প্রকাশের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। ‘ফাতাওয়া মাদানিয়াহ ছানাইয়াহ’ নামে তাঁর ফৎওয়া সমষ্টির এক খন্ড আমাদের প্রিয় বন্ধু মাওলানা কারী আব্দুশ শুকূর মাদানী নিজ প্রকাশনা সংস্থা ‘দারুল ইরশাদ’, ২১৪ বি, সাবযাহ যার স্কীম, লাহোর থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছেন। দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশের জন্য প্রস্ত্তত করছেন। মূলতঃ এখানে এটা উল্লেখ করা উদ্দেশ্য যে, মুফতী হাফেয ছানাউল্লাহ মাদানী ‘জায়েযাতুল আহওয়াযী’ (جائزة الأحوذى) নামে ৪ খন্ডে জামে তিরমিযীর শরাহ লিখেছেন। হাফেয ছাহেব পাঞ্জাব প্রদেশের প্রথম আলেম, যিনি আরবী ভাষায় এই বিশাল বড় খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন।

হাফেয ছাহেব এখন আরবী ভাষায় ছহীহ বুখারীর ব্যাখ্যা লিখছেন। অদ্যাবধি অনেক আলেম ছহীহ বুখারীর উর্দূ অনুবাদ করেছেন এবং খুব সুন্দরভাবে করেছেন। হৃদয়ের গভীর থেকে ঐ সকল আলেমের শুকরিয়া আদায় করছি যে, তাঁরা এদিকে মনোনিবেশ করেছেন এবং হাদীছের এই মর্যাদাপূর্ণ বিশাল গ্রন্থের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করে উর্দূভাষীদেরকে নবী (ছাঃ)-এর হাযার হাযার হাদীছ ও অগণিত নির্দেশনার সাথে পরিচিত করানোর বরকতপূর্ণ চেষ্টা করেছেন এবং করছেন। আল্লাহই তাদেরকে এই কল্যাণকর কাজের প্রতিদান দানকারী এবং ইনশাআল্লাহ অবশ্যই তিনি তা দিবেন। কিন্তু আরবী ভাষায় এর বিস্তারিত ব্যাখ্যার ব্যাপারে উপমহাদেশের হাফেয ছানাউল্লাহ মাদানী গুরুত্ব প্রদান করেছেন। যিনি পাঞ্জাব প্রদেশের লাহোর মহানগরীর বাসিন্দা। দো‘আ রইল আল্লাহ যেন তাঁকে এই বিশাল বড় কাজ সমাপ্ত করার তৌফিক দান করেন।

(ক্রমশঃ)



* পিএইচ.ডি গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

[1]. শামসুল হক আযীমাবাদী সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুন : অনুবাদক প্রণীত মনীষী চরিত, মাসিক আত-তাহরীক, অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০০৫।-অনুবাদক

[2]. সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, করাচীর হাদীছ একাডেমী থেকে এর মোট ৩ খন্ড প্রকাশিত হয়েছে। -অনুবাদক

[3]. আল-মাকতাবাতুস সালাফিয়্যাহ, মদীনা মুনাউওয়ারাহ থেকে এটি ১৪ খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে।-অনুবাদক

[4]. আব্দুর রহমান মুবারকপুরী সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুন: অনুবাদক প্রণীত মনীষী চরিত, মাসিক আত-তাহরীক, জুন-আগস্ট ২০০৫।-অনুবাদক

[5]. বৈরূতের দারুল ফিকর থেকে এটি ১২ খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে।-অনুবাদক

[6]. ওবাইদুল্লাহ মুবারকপুরী সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন : অনুবাদক প্রণীত মনীষী চরিত, মাসিক আত-তাহরীক, জুন-সেপ্টেম্বর ও নভেম্বর ২০১০। -অনুবাদক

[7]. আতাউল্লাহ হানীফ ভূজিয়ানী সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন : অনুবাদক প্রণীত মনীষী চরিত, মাসিক আত-তাহরীক, মে ২০০৫। -অনুবাদক

 

 

 

 


HTML Comment Box is loading comments...