প্রশ্নোত্তর

দারুল ইফতা
হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

প্রশ্ন (১/৪০১) : রাসূল (ছাঃ) খারেজীদেরকে ‘জাহানণামের কুকুর’ বলেছেন। এর ব্যাখ্যা কী?

-আবুবকর, কুষ্টিয়া।

উত্তর : হযরত আবু আওফা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন, الْخَوَارِجُ كِلاَبُ النَّارِ ‘খারেজীরা জাহান্নামের কুকুর’ (ইবনু মাজাহ হা/১৭৩, সনদ ছহীহ)

হাদীছটির ব্যাখ্যায় ফায়যুল ক্বাদীর শরহ ছহীহুল জামে‌‘-এর প্রণেতা আল্লামা মানাভী বলেন, খারেজীদের ‘জাহান্নামের কুকুর’ বলার কারণ হ’ল, তারা ইবাদতে অগ্রগামী ও তৎপর। কিন্তু তাদের অন্তর বক্রতাপূর্ণ। শয়তানের ধোঁকায় পড়ে তারা দ্বীন থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। এমনকি তাওহীদের অনুসারীদেরকে বড় কোন অপরাধ করলেই তারা ‘কাফের’ ঘোষণা করে। তারা পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলোকে যথেচ্ছ অপব্যাখ্যা করে। অপরদিকে মুমিনের বৈশিষ্ট্য হ’ল, তারা অপরের দোষ-ক্রটি গোপন রাখে, মানুষের প্রতি দয়া করে, মানুষের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও অনুগ্রহ কামনা করে। অথচ বিভ্রান্ত খারেজীরা মানুষের মর্যাদাহানি করে, লজ্জিত করে, অবশেষে নিজেরাও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এটা কুকুরের বৈশিষ্ট্য এবং আচরণ। যেহেতু তারা আল্লাহর বান্দাদের উপর কুকুরের মত আগ্রাসী হয় এবং তাদের প্রতি তুচ্ছজ্ঞান ও শক্রতার ভাব নিয়ে তাকায়, তাই তারা তাদের কৃতকর্মের দরুণ জাহান্নামে প্রবেশকালে কুকুরের মত আকৃতি লাভ করবে, যেমনভাবে তারা ছিল দুনিয়ার বুকে আহলে সুন্নাতের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণে কুকুরের স্বভাববিশিষ্ট’ (ঐ, ৩/৫০৯; মিরক্বাত ১১/১৪১ পৃঃ)

একইভাবে আবু গালিব বলেন, একদা আবু উমামা বাহেলী (রাঃ) দামেশক মসজিদের সদর রাস্তায় খারেজীদের কতগুলো ঝুলন্ত মাথা দেখলেন। তখন তিনি বললেন, এরা হ’ল জাহান্নামের কুকুর। আসমানের নীচে এরা সবচেয়ে মন্দ নিহত। আর যারা এদের হত্যা করেছে তারা সবচেয়ে উত্তম। অতঃপর তিনি কুরআনের এ আয়াতটি পড়লেন, يَوْمَ تَبْيَضُّ وُجُوْهٌ وَتَسْوَدُّ وُجُوْهٌ ‘সে দিন কতক মুখ হবে সাদা আর কতক মুখ হবে কালো’ (আলে ইমরান ১০৬)। এ সময় আবু উমামাকে বলা হল, আপনি কি কথাগুলো আল্লাহর রাসূল হ’তে শুনেছেন? তিনি বললেন, একবার দু’বার তিন বার নয়, বরং গুণে গুণে সাত বার শুনেছি। আমি তাঁর নিকট হতে না শুনলে আপনাদের বলতাম না’ (তিরমিযী হা/৩০০০; ইবনে মাজাহ হা/১৭৬; মিশকাত হা/৩৫৫৪, সনদ ছহীহ)

উল্লেখ্য যে, বিদ‘আতীরা জাহান্নামের কুকুর বলে যে বর্ণনা এসেছে, তা যঈফ (সিলসিলা যঈফাহ হা/২৭৯২)

প্রশ্ন (২/৪০২): শরী‘আতের বিভিন্ন মাসআলার ক্ষেত্রে সালাফী আলেমগণের মাঝে মতপার্থক্য দেখা যায়। সাধারণ মানুষ কিভাবে অনুসরণ করবে?

-রফীক, ধনবাড়ী, টাংগাইল।

উত্তর : প্রথমতঃ দলীল-প্রমাণসহ ফৎওয়া জেনে নিবে। আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ হ’ল, যারা জানে না তারা পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে অভিজ্ঞ আলেমদের নিকট থেকে জেনে নিবে (নাহল ৪৩-৪৪)। ছাহাবীগণ একটি বিষয় একাধিক ছাহাবীর কাছে জানতেন (আহমাদ, আবুদাঊদ, ইবনে মাজাহ, মিশকাত হা/১১৫)। পরস্পরের নিকট দলীলও চাইতেন (তিরমিযী, মিশকাত হা/৩৫৫৪)। দ্বিতীয়তঃ রাসূল (ছাঃ) এবং ছাহাবায়ে কেরাম যেভাবে দলীল বুঝেছেন ঐভাবে গ্রহণ করতে হবে। মন মত বুঝলে চলবে না। তৃতীয়তঃ দ্বিমত দেখা দিলে কোনটি ছহীহ দলীলের নিকটবর্তী সেটা গ্রহণ করতে হবে। চতুর্থতঃ ফৎওয়াটি কোন পর্যায়ের তা দেখে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে হবে।

প্রশ্ন (৩/৪০৩): লায়লাতুল ক্বদরের লক্ষণ কি কি? ছহীহ হাদীছের আলোকে জানিয়ে বাধিত করবেন।

-আলে-ইমরান

দাউদপুর, নবাবগঞ্জ, দিনাজপুর।

উত্তর : লায়লাতুল ক্বদরের বাহ্যিক কোন নিদর্শন নেই। হযরত উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) আমাদের খবর দিয়েছেন যে, ‘ঐদিন সূর্য উঠবে, কিন্তু আলোকচ্ছটা থাকবে না’ (মুসলিম, মিশকাত হা/২০৮৮)। এর উপরে ভিত্তি করে অনেক বিদ্বান লায়লাতুল ক্বদর নির্দিষ্ট করেছেন। অথচ ওবাদাহ বিন ছামেত (রাঃ) প্রমুখাৎ বুখারী বর্ণিত হাদীছে এর ব্যাখ্যা এসেছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে লায়লাতুল ক্বদর সম্পর্কে খবর দেবার জন্য বের হ’লেন। তখন দু’জন মুসলিম তাঁর সামনে এসে গেল। তিনি বললেন, আমি তোমাদেরকে ক্বদরের রাত্রি সম্পর্কে খবর দেবার জন্য বের হয়েছিলাম। কিন্তু অমুক অমুকের সাথে দেখা হয়ে গেল। ফলে সেটা আমার থেকে উঠিয়ে নেওয়া হ’ল (অর্থাৎ নির্দিষ্ট দিন-ক্ষণের কথাটা আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হ’ল)। সম্ভবতঃ এটা তোমাদের জন্য ভাল হ’ল (বুখারী হা/২০২৩; মিশকাত হা/২০৯৫)। ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, হাদীছের ব্যাখ্যা এটাই হ’তে পারে যে, তিনি বের হয়েছিলেন কেবল ঐ বছরের লায়লাতুল ক্বদর নির্দিষ্ট করে বলার জন্য’ (তাফসীর ইবনে কাছীর)। অতএব বাহ্যিক নিদর্শন দেখে লায়লাতুল ক্বদর নির্দিষ্ট করার কোন সুযোগ নেই। কেননা রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা রামাযানের শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিগুলিতে লায়লাতুল ক্বদর সন্ধান কর’ (বুখারী হা/২০১৭; মিশকাত হা/২০৮৩)

প্রশ্ন (৪/৪০৪): জনৈক ব্যক্তি সূরা ক্বদর পাঠের অনেক ফযীলত বর্ণনা করেন। অতঃপর বলেন, যে ব্যক্তি ওযূ করার পর তা তিন বার পাঠ করবে, কিয়ামতের দিন সে নবীগণের সাথে পুনরুত্থিত হবে। এটা কি সঠিক?

-আব্দুল কুদ্দূস

বহদ্দার হাট, চট্টগ্রাম।

উত্তর : সূরা ক্বদর-এর ফযীলতের প্রমাণে অনেক ছহীহ হাদীছ রয়েছে। কিন্তু ওযূ করার পর পাঠের ফযীলত সম্পর্কে যে বর্ণনা এসেছে তা ভিত্তিহীন (আলবানী, সিলসিলা যঈফাহ হা/৬৮; আজলূনী, কাশফুল খাফা হা/২৫৬৬)। 

প্রশ্ন (৫/৪০৫): টিউমারযুক্ত ছাগল টিউমার অপসারণ করে কুরবানী করা বৈধ হবে কি? না কি এটা খুঁৎ বলে গণ্য হবে?

-ডাঃ আহসান, ইটাগাছা, সাতক্ষীরা।

উত্তর : কুরবানীর পশু ক্রয়-এর ব্যাপারে যেসব বিষয়গুলো লক্ষ্য করতে বলা হয়েছে টিউমার তার অন্তর্ভুক্ত নয়। (তিরমিযী, মিশকাত হা/১৪৬৩)। তাই টিউমারসহ কুরবানী করা যায়।

প্রশ্ন (৬/৪০৬): জিনদের নিকটে কোন নবীর আগমন ঘটেছে কি? মুমিন জিনেরা কোন্ নবীর অনুসরণ করে?

-আব্দুল মুমিন, আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা

উত্তর : জিনদের নিকটে কোন নবী এসেছেন মর্মে প্রমাণ পাওয়া যায় না। মুমিন জিনেরা আমাদের নবীর অনুসরণ করে। আল্লাহ বলেন, ‘জিনেরা বলল, আমরা যখন পথ নির্দেশক বাণী শুনলাম তখন তাতে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম’ (জিন  ১৩)। একটি বড় হাদীছে বলা হয়েছে, জিনেরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কুরআন তেলাওয়াত শুনে কুরআনের প্রতি ঈমান এনেছিল (বুখারী হা/৪৯২১)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, আমি সকল সৃষ্টি জগতের প্রতি প্রেরিত হয়েছি (মুসলিম, মিশকাত হা/৫৭৪৮)। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে নবীগণের উপর ও আসমানবাসীর উপর মর্যাদা দান করেছেন। তিনি তাঁকে সকল মানুষের প্রতি প্রেরণ করেছেন (সাবা ৩৪/২৮)। অতঃপর তাঁকে জিন ও ইনসানের প্রতি প্রেরণ করেছেন’ (মুক্বাদ্দামা দারেমী হা/৪৬, সনদ ছহীহ; মিশকাত হা/৫৭৭৩)

প্রশ্ন (৭/৪০৭) : বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির অসুস্থতার কারণে অনাদায়ী ছিয়ামের কাফফারা দেশে অবস্থানরত তার ভাই নিজ সম্পদ থেকে আদায় করে দিতে পারে কি?

-আব্দুল লতীফ

রাজপুর, কলারোয়া, সাতক্ষীরা।

উত্তর : কোন ব্যক্তির অসুস্থতার কারণে তার ছিয়ামের কাফফারা যে কোন ব্যক্তি আদায় করতে পারে। একজনের যিম্মাদারী অন্যজন নিতে পারে (মুসলিম, মিশকাত হা/১৮৩৭; বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৯০৭)। রাসূল (ছাঃ) ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জানাযা পড়াতেন না। তবে অন্য কেউ যিম্মাদারী নিলে জানাযা পড়াতেন (বুখারী, মিশকাত হা/২৯০৯)

প্রশ্ন (৮/৪০৮): কবরস্থানের পাশে জানাযার ছালাতের জন্য নির্ধারিত স্থানে মাইয়েতকে রাখার জন্য পৃথকভাবে ছাউনী নির্মাণ করা যাবে কি?

-আমীনুল ইসলাম

কালাই, জয়পুরহাট।

উত্তর : উক্ত মর্মে রাসূল (ছাঃ) এবং ছাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে কোন দলীল পাওয়া যায় না।

প্রশ্ন (৯/৪০৯): স্বপ্নে মৃত কোন ব্যক্তিকে কষ্টে থাকতে দেখলে করণীয় কি?

-সজীব, কাজলা, রাজশাহী।

উত্তর : উক্ত ব্যক্তির জন্য শরী‘আতে কোন করণীয় বিধান নেই। সমাজে স্বপ্ন দেখে দান-খয়রাত করার যে প্রথা চালু আছে তা বিদ‘আত। এগুলো থেকে বিরত থাকতে হবে। সাধারণভাবে মৃত ব্যক্তির মাগফেরাতের জন্য দো‘আ করবে এবং ছাদাক্বা করবে (মুসলিম, মিশকাত হা/১৬১৯; বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৯৫০)

প্রশ্ন (১০/৪১০): পত্র-পত্রিকায় সংবাদের প্রয়োজনে যেসব ছবি ছাপানো হয় তা কি শরী‘আত সম্মত? যদি না হয় তবে এসব পত্রিকা ক্রয় করা বা পাঠ করা যাবে কি?

-আব্দুল কাদের, রাজশাহী।

উত্তর : বাধ্যগত অবস্থা না হ’লে পত্র-পত্রিকায় প্রাণীর ছবি ছাপানো উচিৎ নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আল্লাহ যা তোমাদের উপর হারাম করেছেন তা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। তবে তোমাদেরকে বাধ্য করা হ’লে তোমরা হারাম বস্ত্তও আহার করতে পার’ (আন‘আম ১১৯)। অবশ্যই প্রাণীর ছবি থেকে বেঁচে থাকতে হবে। ছবিপূর্ণ পত্রিকা ক্রয় করা থেকে বিরত থাকা উচিত। কিনলে এগুলো এমন স্থানে রাখতে হবে যেখানে মানুষের চোখ পড়ে না। কেননা রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ঐ ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না, যে ঘরে কুকুর অথবা (প্রাণীর) ছবি থাকে’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৪৮৯)

প্রশ্ন (১১/৪১১) : মাথা ন্যাড়া করা কি জায়েয? স্থায়ীভাবে মাথা ন্যাড়া রাখতে শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

- আফযাল, শেফিল্ড, ইংল্যান্ড।

উত্তর : স্থায়ীভাবে মাথা ন্যাড়া করা যাবে না। এটা খারেজীদের একটি বৈশিষ্ট্য (বুখারী হা/৭৫৬২; আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৩৫৪৩)। তবে সাময়িক কারণে মাথা ন্যাড়া করা যায় (নাসাঈ, মিশকাত হা/৪৪৬৩)। ওমরা ও হজ্জ করার পর মাথা ন্যাড়া করার অথবা চুল খাটো করার বিধান রয়েছে (ফাৎহ ৪৮/২৭; মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৬৪৮)। উল্লেখ্য যে, চুলের গোড়ায় নাপাকি থাকবে মনে করে অনেক মুরববী সর্বদা মাথা ন্যাড়া করে রাখেন। আর দলীল হিসাবে আলী (রাঃ)-এর নামে বর্ণিত একটি হাদীছ পেশ করেন, যার সনদ যঈফ (আবুদাঊদ হা/২৪৮ ও ২৪৯; মিশকাত হা/৪৪৪; সিলসিলা যঈফাহ হা/৯৩০ ও ৩৮০১)

প্রশ্ন (১২/৪১২) : মৃতের জন্য দ্রুত দাফন করার বিধান থাকা সত্ত্বেও রাসূল (ছাঃ)-এর দাফন মৃত্যুর দু’দিন পরে সম্পন্ন হওয়ার কারণ কি?

-আব্দুল্লাহ, তেরখাদা, খুলনা।

উত্তর : রাসূল (ছাঃ) সোমবারে মৃত্যুবরণ করেন। অতঃপর মঙ্গলবার সারাদিন তাঁর জানাযা চলে দশ জন করে ঘরের ভিতরে গিয়ে। ফলে দিন শেষে বুধবার দিবাগত রাতে তাঁর দাফনকার্য সম্পন্ন হয় (আর-রাহীক্ব ৪৭১-৭২)। বিলম্বের কারণ হ’ল, খলীফা নির্বাচনে মতপার্থক্য হওয়া। তবে ছাহাবায়ে কেরাম সোমবার সন্ধ্যার পূর্বেই খলীফা নির্বাচন সম্পন্ন করেন (ঐ)

প্রশ্ন (১৩/৪১৩) : আমি উকিলের সহকারী হিসাবে কাজ করি। এখানে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র লেখালেখি করতে হয়। আমার এ পেশা কি হালাল?

-আফসার, হুগলী, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

উত্তর : উক্ত পেশা মৌলিকভাবে হারাম নয়। তবে এর মাধ্যমে যদি অন্যায় কর্মে সহযোগিতা করা হয়, তাহ’লে গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হবে। আর আল্লাহ তা‘আলা গুনাহের কাজে সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছেন (মায়েদাহ ২)। উপ মহাদেশে প্রচলিত আইন সমূহের অধিকাংশ কুরআন ও হাদীছের বিরোধী। তাই মুসলিম আইনজীবী ও আইন প্রণেতাদের উচিত এগুলি পরিবর্তনে সচেষ্ট হওয়া। কেননা আল্লাহ বলেন, ‘যে কেউ সৎ সুফারিশ করবে, সে তার অংশ পাবে এবং যে কেউ মন্দ সুফারিশ করবে, সে তার অংশ প্রাপ্ত হবে। আর আল্লাহ হ’লেন সকল বিষয়ে শক্তি দাতা’ (নিসা ৪/৮৫)

প্রশ্ন (১৪/৪১৪) : নিষিদ্ধ সময়ে ঘুম থেকে উঠলে ছালাত আদায় করা যাবে কি? না উক্ত সময় অতিক্রান্ত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে?

-আব্দুল্লাহিল কাফী, ছোটবনগ্রাম, রাজশাহী।

উত্তর : ক্বাযা ছালাত ঘুম ভাঙ্গা বা স্মরণ হওয়ার সাথে সাথেই আদায় করতে হবে (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৬০১, ৬০৪)। এর জন্য কোন নিষিদ্ধ সময় নেই।

প্রশ্ন (১৫/৪১৫) : গোসল করার পর ওযূ করার কোন প্রয়োজনীতা আছে  কি?

-মনোয়ার, আওরঙ্গাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

উত্তর : পবিত্রতা অর্জনের নিয়তে ওযূ করে সর্বাঙ্গ ধৌত করাই গোসলের সুন্নাতী নিয়ম। এভাবে গোসল করলে পুনরায় ওযূ করার প্রয়োজন নেই (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৪৩৫; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৪১) তবে ওযূ ছাড়াই গোসল করলে পরে ওযূ না করলে ছালাত হবে না।

প্রশ্ন (১৬/৪১৬) : মসজিদে ঘুমানো ও খাওয়া-দাওয়া করা জায়েয কি?

-ডা. আরফান, আসাম, ভারত।

উত্তর : মসজিদে সাময়িকভাবে ঘুমানো ও খাওয়া-দাওয়া করা জায়েয। আব্দুল্লাহ্ ইবনু ওমর (রাঃ) অবিবাহিত যুবক ছিলেন, যিনি রাসূল (ছাঃ)-এর যুগে মসজিদে ঘুমাতেন (নাসাঈ হা/৭২২)। তিনি বলেন, আমরা যুবকরা রাসূল (ছাঃ)-এর যুগে মসজিদে ঘুমাতাম (তিরমিযী হা/৩২১; ইবনু মাজাহ হা/৭৫১)। মসজিদে খাওয়া-দাওয়া করাও বৈধ। ছাহাবী আব্দুল্লাহ বিন হারেছ (রাঃ) বলেন, আমরা রাসূল (ছাঃ)-এর যামানায় মসজিদে রুটি ও গোশত খেতাম’ (ইবনু মাজাহ, সনদ হাসান, হা/৩৩০০, ‘খাদ্য’ অধ্যায়)

প্রশ্ন (১৭/৪১৭) : স্ত্রীর মোহরের যাকাত এবং মায়ের অলংকারের যাকাত আদায় করা কি স্বামীর উপর আবশ্যক? এছাড়া স্ত্রী এবং কন্যার অলংকার পৃথকভাবে নিছাব পরিমাণ না হ’লে, তা একত্রিত করে যাকাত দিতে হবে কি?

-রুবেল, চট্টগ্রাম।

উত্তর : স্ত্রীর মোহর আর মায়ের স্বর্ণের যাকাত আদায় করা তাদের উপরই ফরয। স্বামী বা সন্তানের উপর নয়। তবে স্বামী বা সন্তান স্বেচছায় তাদের যাকাত আদায় করতে পারে। আর স্ত্রী এবং কন্যার সম্পদ পৃথক হ’লে এবং নিছাব পরিমাণ হ’লে তারা পৃথকভাবেই যাকাত দিবে। একত্রিত করে যাকাত দেওয়ার কোন বিধান শরী‘আতে নেই (আবুদাউদ ১৫৭৩, ৭৪, ৭৯, ৮০; মিশকাত হা/১৭৯৯)। তবে স্ত্রী, কন্যা ও নিজের সম্পদ যদি একত্রিত থাকে তাহ’লে এক সঙ্গে মিলিয়ে যাকাত দিবে।

প্রশ্ন (১৮/৪১৮) : কোন মুশরিক ব্যক্তিকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য মসজিদের কোন দায়িত্ব দেওয়া যাবে কি?

-শামীম, ঝিকরগাছা, যশোর।

উত্তর : যাবে না (তওবা ১৭)। তবে এজন্য যাকাতের একটি খাত থেকে তাদেরকে সাহায্য করা যেতে পারে (তওবা ৬০)

প্রশ্ন (১৯/৪১৯) : জনৈক ব্যক্তি ৬ তলা একটি ফ্ল্যাট বাড়ী ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে দু’বছরের জন্য ভাড়া দিল। এ সময়ে গ্রহীতা উক্ত বাড়ির ভাড়া পাবে। ২ বছর পর গ্রহীতাকে মূল মালিক ৫ লাখ টাকা ফেরত প্রদান সাপেক্ষে বাসার মালিকানা ফেরত পাবে। এরূপ চুক্তি কি শরী‘আত সম্মত?

-আব্দুল্লাহ রকী, ঢাকা।

উত্তর : এরূপ চুক্তি শরী‘আত সম্মত নয়। বরং সূদের অন্তর্ভুক্ত। বন্ধক এক ধরনের কর্য। আর কর্যের মাধ্যমে লাভ গ্রহণ করা সূদ। ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, যে কর্য লাভ  বহন করে সে কর্য গ্রহণ করা নিষিদ্ধ (ইরওয়া হা/১৩৯৭)

প্রশ্ন (২০/৪২০) : ছেলে সন্তানের পেশাব থেকে কতদিন যাবৎ পানি ছিটিয়ে পবিত্র হওয়া যায়?

-উম্মে হাবীবা, মোহনপুর, রাজশাহী।

উত্তর : মায়ের দুধ ছাড়া অন্য খাদ্য খাওয়া শুরু করার পূর্ব পর্যন্ত পানি ছিটিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা যাবে (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৭)। অর্থাৎ মায়ের দুধ ব্যতীত অন্য খাদ্য ভক্ষণ দ্বারাই যখন সন্তানের চাহিদা পূরণ হয়ে যাবে, সে পর্যন্ত পানি ছিটিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা জায়েয (তুহফাতুল আহওয়াযী ১/২০২ পৃঃ; ফৎহুলবারী ১/৩২৬)

প্রশ্ন (২১/৪২১) : মসজিদ সম্প্রসারণের সময় কারণবশতঃ যাকাত, ফিতরা ও ওশরের টাকা আদায়কৃত মূল অর্থের সাথে মিশে গেছে, যার পরিমাণ কারো জানা নেই। এক্ষণে এরূপ মসজিদে ছালাত আদায় জায়েয হবে কি?

-আবুল কাসেম, সাপাহার, নওগাঁ।

উত্তর : এটাকে ভুল হিসাবেই গণ্য করতে হবে এবং উক্ত অর্থ অনুমান করে বের করে যাকাতের নির্ধারিত খাতে ব্যয় করতে হবে (তওবা ৬০)। সাথে সাথে এরূপ ভুল যেন না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। তবে এরূপ ভুলের জন্য উক্ত মসজিদে ছালাত আদায় করতে কোন বাধা নেই।

প্রশ্ন (২২/৪২২) : গ্রামের কোন কোন ব্যক্তিকে দেখা যায় বিভিন্ন রোগের জন্য পানি পড়া দেন। এভাবে দেওয়া কি শরী‘আত সম্মত?

-রাশেদুল ইসলাম, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর।

উত্তর : চিকিৎসা হিসাবে ঝাড়ফুঁক বা পানিপড়া দেওয়া যাবে, যদি তাতে শিরকী কালেমা না থাকে (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৪৫২৭, ২৮; ফাতাওয়া উছায়মীন ১/১০৮ পৃঃ)

প্রশ্ন (২৩/৪২৩) : আমরা জানি জান্নাত আটটি ও জাহান্নাম সাতটি। বর্তমানে অনেকে বিষয়টি ভুল বলে আখ্যায়িত করছেন। কোনটি সঠিক?

-আবু তাহের, বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর : জান্নাত ৮টি এবং জাহান্নাম ৭টি বলে সমাজে যে কথা প্রচলিত রয়েছে, তার কোন দলীল পাওয়া যায় না। ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী জান্নাতের দরজা আটটি আর জাহান্নামের দরজা সাতটি (আহমাদ, ছহীহাহ হা/১৮১২, বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৯৫৭)। এছাড়া জান্নাত ও জাহান্নামের অসংখ্য স্তর রয়েছে। যেমন একটি হাদীছে জান্নাতের ১০০টি স্তর রয়েছে বলা হয়েছে (তিরমিযী হা/২৫৩১)। অন্য হাদীছে মুজাহিদদের জন্য ১০০টি স্তরের কথা বলা হয়েছে (বুখারী, মিশকাত হা/৩৭৮৭)। উল্লেখ্য যে, ‘জান্নাত’ শব্দটিকে পবিত্র কুরআনে বহুবচন ব্যবহার করে মূলতঃ অনেক বাগান বুঝানো হয়েছে (ফাতহুল ক্বাদীর ১/৫৪ পৃঃ)

প্রশ্ন (২৪/৪২৪) : লাইব্রেরীতে শিরক ও বিদ‘আত মিশ্রিত বই-পুস্তক বিক্রি করে উপার্জিত অর্থ হালাল হবে কি?

-শফীউদ্দীন আহমাদ, নরসিংদী।

উত্তর : পেশা হিসাবে বই বিক্রয়ের পেশা নিঃসন্দেহে হালাল এবং উত্তম। এর মাধ্যমে বিশুদ্ধ দ্বীন প্রচারে বড় ভূমিকা রাখা যায়। যা সর্বাধিক নেকী হাছিলের মাধ্যম। তবে শিরক ও বিদ‘আতের দিকে আহবানকারী বই-পুস্তক বিক্রি করলে কঠিন গুনাহের ভাগিদার হ’তে হবে। এটা তার জন্য গুনাহে জারিয়াহ বা চলমান পাপে পরিণত হবে, যা মৃত্যুর পরও জারি থাকবে (মুসলিম হা/২৬৭৪; মিশকাত হা/১৫৮)

প্রশ্ন (২৫/৪২৫) : সিএনজি, অটো, রিক্সা প্রভৃতির মালিকেরা তাদের প্রতিদিনের ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়। অথচ চালকের লাভ কম-বেশী হয়। এরূপ চুক্তি শরী‘আত সম্মত কি?

-আব্দুল্লাহ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

উত্তর : পারস্পরিক সম্মতিতে এরূপ চুক্তিকে ইজারা বলা হয়, যা ইসলামী শরী‘আতে অনুমোদিত (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৯৭৪)। এটি এক ধরনের ব্যবসা। আর ব্যবসায় লাভ-লোকসান হ’তেই পারে।

প্রশ্ন (২৬/৪২৬) : পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ধরনের দাড়ি দেখা যায়। দাড়ি রাখার সুন্নাতী নিয়ম কি? ইবনে ওমর (রাঃ)-এর আমল অনুসরণ করা যাবে কি?

-দেলোয়ার, রিয়াদ, সঊদী আরব।

উত্তর : দাড়ির ব্যাপারে রাসূল (ছাঃ)-এর স্পষ্ট নির্দেশ হ’ল, তোমরা দাড়ি ছেড়ে দাও ও গোঁফ ছাটো এবং মুশরিকদের বিপরীত কর’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৪৪২১)। রাসূল (ছাঃ)-এর স্পষ্ট নির্দেশ জানার পর অন্য কারো মত অনুসরণের  কোন সুযোগ নেই (আহযাব ৩৩/৩৬)

উল্লেখ্য যে, ইবনু ওমর (রাঃ) যখন হজ্জ ও ওমরা করতেন তখন এক মুষ্টির অতিরিক্ত দাড়ি কেটে ফেলতেন (বুখারী হা/৫৮৯২)। এটা তাঁর ব্যক্তিগত আমল এবং হজ্জ ও ওমরার সাথে সম্পৃক্ত। তবে রাসূল (ছাঃ) থেকে কোন সময় কোন অবস্থাতেই দাড়ি খাটো করার কোন ছহীহ দলীল পাওয়া যায় না। অতএব সবাইকে রাসূল (ছাঃ)-এর অনুসরণ করতে হবে। নইলে ক্বিয়ামতের দিন পস্তাতে হবে (ফুরক্বান ২৭ ও ২৮)

প্রশ্ন (২৭/৪২৭) : দ্বীনী শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে যদি কেউ একটি বা দু’টি সন্তানের অধিক না নেওয়ার পরিকল্পনা করে, তবে তা জায়েয হবে কি?

-আব্দুল্লাহ, ঢাকা।

উত্তর : জায়েয হবে না। কারণ কারু কোন লক্ষ্য বাস্তবায়ন আল্লাহর রহমত ব্যতীত সম্ভব নয়। বরং অধিক সন্তানই ইসলামী সমাজে কাম্য। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা প্রেমময়ী ও অধিক সন্তানদায়িনী নারীকে বিবাহ কর। কারণ কিয়ামতের দিন আমি আমার উম্মতের সংখ্যাধিক্য নিয়ে গর্ব করব’ (আবুদাঊদ, নাসাঈ, মিশকাত হা/৩০৯১)। তবে স্ত্রী ও সন্তানের স্বাস্থ্যের দিকে লক্ষ্য রেখে স্ত্রীর সম্মতিক্রমে আযল বা সাময়িক জন্ম নিয়ন্ত্রণ করা যায় (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩১৮৪)

প্রশ্ন (২৮/৪২৮) : পিতৃপরিচয়হীন জারজ সন্তানকে মাতার সাথে সম্বন্ধযুক্ত করে ডাকা যাবে কি?

-ড. ইমরান

হাতিরপুল, ধানমন্ডি, ঢাকা।

উত্তর : ডাকা যাবে (বুখারী হা/৫৩০৯, ‘তালাক’ অধ্যায়, ৩০ অনুচ্ছেদ)

প্রশ্ন (২৯/৪২৯) : অনেকে বলেন, অপবিত্র অবস্থায় কুমড়ার বড়ি তৈরী করলে বড়ি টক হয়ে যায়। এ কথার কোন ভিত্তি আছে কি?

-মঈনুদ্দীন, নওহাটা, রাজশাহী।

উত্তর: উক্ত কথা ভিত্তিহীন ও কুসংস্কার। বরং অপবিত্র অবস্থায় প্রয়োজনীয় সকল কাজই করা যাবে (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৪৫১)

প্রশ্ন (৩০/৪৩০) : অজান্তে কবরের উপর মসজিদ নির্মিত হওয়ার পর এখন করণীয় কি? জানার পর উক্ত মসজিদে ছালাত আদায় হবে?

-হুরমাতুল্লাহ মিঞা, রাণীনগর, নওগাঁ।

উত্তর : যদি সেখানকার প্রবীণ লোকদের তথ্যমতে লাশ মাটি হয়ে গেছে বলে সর্বোচ্চ ধারণা হয়, তাহ’লে সেখানে ছালাত আদায়ে বাধা নেই। আর যদি এটা নিয়ে ফিৎনার আশংকা থাকে, তাহ’লে খুঁড়ে দেখতে হবে এবং লাশের কোন চিহ্ন পেলে তা উঠিয়ে অন্যত্র দাফন করতে হবে (ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৩০১ পৃঃ; তালখীছু আহকামিল জানাইয, পৃঃ ৯১-৯৪)। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, তোমরা কবরের দিকে ফিরে ছালাত আদায় কর না এবং কবরের উপরে ছালাত আদায় করো না’ (ত্বাবারাণী কাবীর, সিলসিলা ছহীহাহ হা/১০১৬)। উল্লেখ্য যে, ভারতের বাবরী মসজিদের নীচে রামমন্দির থাকার মিথ্যা দাবীতে উক্ত মসজিদ ভেঙ্গে ফেলা হয় এবং এ ঘটনায় শত শত মুসলমানের মৃত্যু ঘটে। তাই মুসলিম সমাজকে মসজিদ ভাঙ্গা ও গড়ার ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।  

প্রশ্ন (৩১/৪৩১) : চিংড়ি মাছ খাওয়ার ব্যাপারে শরী‘আতে কোন নিষেধাজ্ঞা আছে কি? দাঊদ (আঃ)-এর দেহে সৃষ্ট পোকাই চিংড়ি মাছ’ বলে সমাজে যে কথা চালু আছে তার কোন ভিত্তি আছে কি?

-আব্দুল্লাহ, যশোর।

উত্তর : চিংড়ি মাছ খাওয়া জায়েয। কারণ এটি মৎস প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘নদীর শিকার তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে’ (মায়েদা ৯৬) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং উহার মৃত হালাল (আবুদাউদ হা/৮৩; তিরমিযী হা/৬৯)। ‘দাঊদ (আঃ)-এর দেহে সৃষ্ট পোকাই চিংড়ি মাছ’ বলে সমাজে যে কথা প্রচলিত আছে তা ভিত্তিহীন। উক্ত মিথ্যা ঘটনা দাঊদ (আঃ)-এর ব্যাপারে নয় বরং আইয়ূব (আঃ) সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়। উল্লেখ্য, তাকে কঠিন রোগে ফেলে দেহে পোকা ধরানো, দেহের সব মাংস খসে পড়া, পচে-গলে দুর্গন্ধময় হয়ে যাওয়ায় ঘর থেকে বের করে জঙ্গলে ফেলে আসা, ১৮ বা ৩০ বছর ধরে রোগ ভোগ করা, আত্মীয়-স্বজন সবাই তাকে ঘৃণাভরে ছেড়ে চলে যাওয়া ইত্যাদি সবই নবীবিদ্বেষী ও নবী হত্যাকারী ইহুদী গল্পকারদের বানোয়াট মিথ্যাচার ছাড়া কিছুই নয় (দ্রঃ নবীদের কাহিনী ১/২৫৫)। আল্লাহ তাঁকে ‘ধৈর্যশীল’ ও ‘সুন্দর বান্দা’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন (ছোয়াদ ৩৮/৪৪)

প্রশ্ন (৩২/৪৩২) : ওযূ করার পর কাঁচা পেঁয়াজ বা রসুন খেলে ওযূ ভেঙ্গে যাবে কি?

-শহীদুল্ল­াহ, নলত্রী, গোদাগাড়ী, রাজশাহী।

উত্তর : কাঁচা পেঁয়াজ বা রসুন খাওয়া ওযূ ভঙ্গের কারণ নয়। বরং এগুলো খেয়ে মসজিদে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ এর দুর্গন্ধে মুছল্লী এবং ফেরেশতা উভয়েই কষ্ট পায় (মুসলিম হা/৫৬৪)। তবে রান্না করে খেলে অথবা মুখ পরিষ্কার করে দুর্গন্ধ দূর করে মসজিদে গেলে কোন দোষ নেই (মুসলিম হা/৫৬১)।   

প্রশ্ন (৩৩/৪৩৩) : কোন কোন এলাকায় আয়না দেখে হারানো বস্ত্ত খুঁজে বের করার প্রচলন রয়েছে। এই নিয়ম কি শরী‘আত সম্মত?

-ওয়ালীউল্লাহ, চারঘাট, রাজশাহী।

উত্তর : এটা কুফুরী পদ্ধতি। কারণ এটা এক ধরনের গায়েবী খবর প্রকাশ করা। আর গায়েবী খবর কেবলমাত্র আল্লাহই জানেন (নামল ৬৫)। এটা গণকরা করে থাকে। তাদের কাছে যেতে শরী‘আতে নিষেধ করা হয়েছে (আবুদাঊদ হা/৩৯০৪; মিশকাত হা/৪৫৯৯)। এমনকি যদি কেউ গণককে এ বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসাও করে, তাহ’লে তার চল্লিশ দিনের ছালাত কবুল হবে না’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৪৫৯৫)। অতএব এটা করা এবং করানো দু’টিই হারাম এবং শিরকের অন্তর্ভুক্ত।

প্রশ্ন (৩৪/৪৩৪) : ১৯৬৫ সালে একটি হিন্দু পরিবার অল্প কিছু অর্থ নিয়ে তাদের জমি আমাকে দিয়ে যায়। পরে তারা ফেরত না নেওয়ায় আমি নিজের নামে লিখে অদ্যাবধি তা ভোগ করছি। এক্ষণে এটা কি আমার সম্পদ হিসাবে গণ্য হবে?

-পোস্ট মাস্টার, মাধবদী, নরসিংদী।

উত্তর : যে কোন বিনিময়েই হৌক না কেন উভয়ের সম্মতিতে যদি উক্ত বিক্রয় সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহ’লে তা নিজের নামে লিখে নিয়ে ভোগ করায় কোন বাধা নেই (নিসা ৪/২৯)। তবে এক্ষেত্রে কোন কূট-কৌশল অবলম্বন করা হ’লে কঠিন গুনাহের ভাগিদার হ’তে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কারো এক বিঘত পরিমাণ যমীন জোর করে দখল করেছে, ক্বিয়ামতের দিন তার গলায় সাত তবক পরিমাণ যমীন বেড়ি রূপে পরিয়ে দেওয়া হবে’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৯৩৮)। অন্য হাদীছে এসেছে, ক্বিয়ামতের দিন ঐ মাটির বোঝা তার গর্দানে চাপিয়ে দেওয়া হবে (আহমাদ, ছহীহাহ হা/২৪২)

প্রশ্ন (৩৫/৪৩৫) : ছালাত শেষে সালাম ফিরানোর সময় মাঝখানে একটু বিরত দেওয়ার কোন বিধান আছে কি?

-আরাফাত, বিরামপুর, দিনাজপুর।

উত্তর : সালাম ফিরানোর সময় প্রথমে ডান দিকে ও পরে বাম দিকে সালাম ফিরাবে (মুসলিম, মিশকাত হা/৯৪৩)। মাঝখানে বিরতি দেওয়ার কোন বিধান নেই। তবে প্রথমে ডাইনে সালাম ফিরিয়ে অবশ্যই দম ছাড়বে। অতঃপর বামে সালাম ফিরাবে। এমনটি নয় যে, এক দমে দুই সালাম শেষ করবে কোনরূপ বিরতি ছাড়াই।

প্রশ্ন (৩৬/৪৩৬) : রামাযানের ১ম দশ দিন রহমত, ২য় দশ দিন মাগফেরাত ও শেষ দশ দিন জাহান্নাম হ’তে মুক্তির সময়। উক্ত হাদীছটি কি ছহীহ?

-শরীফুল ইসলাম, মীরপুর, ঢাকা।

উত্তর : হযরত সালমান ফারেসী (রাঃ) হ’তে উক্ত মর্মে বায়হাক্বী বর্ণিত হাদীছটি যঈফ (আলবানী, মিশকাত হা/১৯৬৫ ‘ছিয়াম’ অধ্যায়)। বরং অনেক ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, পুরা রামাযান মাসই রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের মাস। এ মাসে জান্নাত ও রহমতের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজা সমূহ বন্ধ করা হয় (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৯৫৬ ‘ছিয়াম’ অধ্যায়)। এ মাসে বহু লোক জাহান্নাম থেকে মুক্তি প্রাপ্ত হয় (তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১৯৬০)

প্রশ্ন (৩৭/৪৩৭) : মৃত্যুসংবাদ প্রচার করার ব্যাপারে শরী‘আতের বিধান কি?

-মুজাহিদুর রহমান, তানোর, রাজশাহী।

উত্তর : (বাজারে বা মাইকে উচ্চৈঃস্বরে) মৃতব্যক্তির শোক সংবাদ প্রচার করা জায়েয নয় (তিরমিযী হা/৯৯৫, ইবনু মাজাহ হা/১৪৭৬)। তবে নিকটাত্মীয়, পরিচিত জন ও মুসলিমদের নিকটে সাধারণভাবে মৃত্যুসংবাদ জানানো যাবে। হাবশার বাদশাহ নাজাশী মৃত্যুবরণ করলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার মৃত্যুসংবাদ মুসলমানদের জানিয়ে দেন এবং জানাযার ছালাত আদায় করেন’ (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমাহ, ৯/১৪২; বুখারী হা/১২৪৫)

প্রশ্ন (৩৮/৪৩৮) : টেলিফোন বা মোবাইল ফোনে সালামের পরিবর্তে হ্যালো বলা হয়। এটা কি ঠিক?

-হুমায়ন কবীর, বংশাল, ঢাকা।

উত্তর : ‘হ্যালো’ (Hallo) শব্দটি ইংরেজী Interjection বা সম্বোধন ও বিস্ময় সূচক অব্যয়, যা ‘আহবান’ অথবা সম্বোধনের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। চালু পরিভাষা হিসাবে এটি বলায় কোন দোষ নেই। কারণ এটি কোন শিরকী কালাম নয়। তবে আহুত ব্যক্তি মুসলমান হলে তাকে ‘সালাম’ দিয়েই সম্বোধন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘কেউ সালামের পূর্বে কথা আরম্ভ করলে তার উত্তর দিয়ো না’ (সিলসিলা ছহীহাহ হা/৮১৬)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘যে ব্যক্তি সালাম দিয়ে কথা শুরু করে না, তোমরা তাকে কথা বলার অনুমতি দিয়ো না’ (বায়হাক্বী শু‘আবুল ঈমান, মিশকাত হা/৪৬৭৬; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৮১৭)। উল্লেখ্য যে, ‘হ্যালো’ না বলে ‘হ্যালূ’ (Halloo) বললে তার অর্থ হবে ‘কুকুরের প্রতি চিৎকার দেওয়া’।

প্রশ্ন (৩৯/৪৩৯) : সূরা মায়েদার ১৫নং আয়াতের ব্যাখ্যা জানিয়ে বাধিত করবেন।

-রাশেদুল ইসলাম, মীরপুর, ঢাকা।

উত্তর : আয়াতটির অনুবাদ হ’ল, ‘হে আহলে কিতাবগণ! তোমাদের কাছে আমাদের রাসূল এসেছেন, যিনি বহু বিষয় তোমাদের সামনে বিবৃত করেন, যেসব বিষয় তোমরা তোমাদের কিতাব থেকে গোপন কর। আরও বহু বিষয় তিনি এড়িয়ে যান (অর্থাৎ প্রকাশ করেন না)। বস্ত্ততঃ তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ হ’তে এসেছে একটি জ্যোতি ও আলোকময় গ্রন্থ’।

উক্ত আয়াতে ‘নূর’ দ্বারা কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ কুরআন শিরকের অন্ধকার হ’তে মানুষকে তাওহীদের আলোর পথে বের করে আনে। এখানে ‘কিতাবুম মুবীন’  (كتابٌ مبينٌ) ‘নূর’ (نُوْرٌ) -এর উপর عطف بيان হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ বলছেন, ‘তোমাদের নিকট আল্লাহর নিকট থেকে এসেছে একটি জ্যোতি ও সমুজ্জ্বল গ্রন্থ’ (মায়েদাহ ১৫)। যেমন ইতিপূর্বে সূরা নিসা ১৭৪-৭৫ আয়াতে بُرْهَانٌ نُورًا مُبِينًا বলে কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। অমনিভাবে সূরা আ‘রাফ ১৫৭ আয়াতের কুরআনকে ‘নূর’ বলা হয়েছে (বিস্তারিত দ্রষ্টব্য আত-তাহরীক, আগস্ট’১১ প্রশ্নোত্তর নং৭/৪০৭)

উল্লেখ্য যে, اَوَّلُ مَا خَلَقَ اللهُ نُوْرِى ‘আল্লাহ সর্বপ্রথম আমার নূর সৃষ্টি করেন’ বলে যে হাদীছ প্রচলিত আছে তা জাল (আজলূনী, কাশফুল খাফা হা/৮২৭; ছহীহাহ হা/৪৫৮-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নূরের তৈরী ছিলেন না। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘হে রাসূল! তুমি বলে দাও যে, আমি তোমাদেরই মত একজন মানুষ... (কাহফ ১১০)

প্রশ্ন (৪০/৪৪০) : কোন ব্যক্তি যদি অলসতার কারণে মসজিদের না গিয়ে বাড়ীতে ছালাত আদায় করে তাহ’লে তার ছালাত হবে কি? বর্তমান সমাজে এ ধরনের লোকের সংখ্যা অনেক।

-সোহরাব, রিয়ায, সঊদী আরব।

উক্তর : অলসতার কারণে মসজিদে না গিয়ে বাড়ীতে ছালাত আদায় করা গ©র্র্হত কাজ। কারণ রাসূল (ছাঃ) এই অভ্যাসের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি আযান শুনল অথচ কোন ওযর ছাড়াই মসজিদে আসল না তার ছালাত হবে না’ (ইবনু মাজাহ হা/৭৯৩, সনদ ছহীহ)। অন্য হাদীছে এসেছে, রাসূল (ছাঃ) এই শ্রেণীর লোকদেরকে ঘরের মধ্যে বন্দী করে ঘরে আগুন ধরিয়ে জ্বালিয়ে দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছেন (বুখারী হা/৬৪৪; মিশকাত হা/১০৫৩)। তাছাড়া তিনি অন্ধ ব্যক্তিকেও বাড়ীতে ছালাত পড়ার অনুমতি দেননি (মুসলিম হা/১৫১৮; মিশকাত হা/১০৫৪)। ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি মসজিদ ছেড়ে বাড়ীতে ছালাত আদায় করল সে রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাত পরিত্যাগ করল। আর যে ব্যক্তি নবীর সুন্নাত পরিত্যাগ করল সে পথভ্রষ্ট হ’ল’ (আবুদাঊদ হা/৫৫০)

 

দৃষ্টি আকর্ষণ
প্রিয় পাঠক-পাঠিকা ভাই ও বোনেরা!

মাসিক আত-তাহরীক সূচনালগ্ন থেকে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ ভিত্তিক দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে দ্বীনে হক প্রচারে নিরন্তর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। নিয়মিত প্রকাশনার ১৬ বছর পেরিয়ে আপনাদের প্রিয় আত-তাহরীক আগামী অক্টোবরে ১৭তম বর্ষে পদার্পণ করতে যাচ্ছে ইনশাআল্লাহ। এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় আমরা পাঠকদের সামর্থ্যের বিষয়টি মাথায় রেখেই পত্রিকার মূল্য নির্ধারণ করেছি। দেশের দ্রব্যমূল্যের ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বগতি সত্ত্বেও আমরা দীর্ঘ দিন এর মূল্য বৃদ্ধি করিনি। এর মধ্যে কাগজ ও কালির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যাপকভাবে। ছাপা, বাঁধাই ও ফিল্ম খরচও বেড়েছে অনেকগুণ। সেকারণ পূর্ব নির্ধারিত মূল্যে পত্রিকা সরবরাহ দুরূহ হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া বহু বিজ্ঞ পাঠক ও লেখক ‘আত-তাহরীক’ সংরক্ষণের সুবিধার্থে হোয়াইট পেপারে (সাদা কাগজে) ছাপানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তাই আগামী অক্টোবর/১৩ (১৭তম বর্ষ ১ম সংখ্যা) থেকে আপনাদের প্রিয় ‘আত-তাহরীক’ সাদা কাগজে  ছাপানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। বিধায় আত-তাহরীকের মূল্য ১৬/- টাকার পরিবর্তে ২০/- টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী অক্টোবর’১৩ থেকে নতুন মূল্য কার্যকর হবে ইনশাআল্লাহ। আত-তাহরীকে খিদমতের তুলনায় এ নতুন মূল্য বৃদ্ধি পাঠকদের মনোকষ্টের কারণ হবে না বলে আমাদের একান্ত বিশ্বাস। পাঠক, গ্রাহক ও এজেন্টদের এই সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। -সম্পাদক।

HTML Comment Box is loading comments...