সম্পাদকীয়    (বার পঠিত)

মুরসির বিদায়

মুরসির পতন। গণতান্ত্রিক বিশ্ব নীরব। ইসলামী বিশ্ব হতবাক। ইসলামী নেতাদের মুখ বন্ধ। মিসরের ইতিহাসের সর্বপ্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত (৫১.৭%) প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ মুরসির পতন হ’ল মাত্র এক বছরের মাথায় গত ৩রা জুলাই’১৩ বুধবার। এখন তিনি সেনাবাহিনীর হেফাযতে। মিথ্যা মামলা সাজিয়ে কারাগারে পাঠানোর অপেক্ষায়। অতঃপর হয় ফাঁসি, নয় মুক্তি অথবা যাবজ্জীবন কারাবাস। ইতিমধ্যে শতাধিক নিহত হয়েছে সেনাবাহিনীর গুলিতে। বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। যে তাহরীর স্কয়ার ২০১২ সালে মুরসিকে ক্ষমতায় আনার মূল ভূমিকায় ছিল, সেই স্কয়ারে এখন মুরসির বিদায়ে আনন্দ উল্লাস চলছে। খুশীতে চলছে সমানে নারী ধর্ষণ। ৪ দিনে মাত্র ৯১ জন নারী প্রকাশ্যে গণধর্ষিতা। জানিনা ইতিমধ্যে আরও কত অনাচার ঘটেছে সেখানে ও অন্যখানে।

পাশ্চাত্যের গ্রহণযোগ্য ‘মডারেট’ ইসলামী দল হওয়া সত্ত্বেও তাকে সরালো কারা? এক কথায় জবাব আমেরিকা। কাদের মাধ্যমে সরালো? মিসরীয় সেনাবাহিনী ও বিরোধী দল সমূহের মাধ্যমে। কেন সরালো? সবকিছু উজাড় করে দিয়েও ওবামার পূর্ণ সন্তুষ্টি অর্জন করতে না পারার কারণে। সেনাবাহিনীর বেঁধে দেয়া ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শর্ত মানতে ব্যর্থ হওয়ায় সেনাবাহিনী প্রেসিডেন্ট মুরসিকে উৎখাত করার পরেও ওবামা কেন একে সেনা অভ্যুত্থান বলছেন না? কেননা তাতে সেনাবাহিনীকে দেয়া তাদের বার্ষিক নিয়মিত সহযোগিতা বন্ধ করতে হ’ত। ১৯৮৫ সালে গৃহীত এক মার্কিন আইনে বলা আছে যে, কোন দেশে কোন নির্বাচিত সরকার সেনা অভ্যুত্থানে উৎখাত হ’লে সেদেশে মার্কিন সাহায্য বন্ধ করতে হবে। ওবামা সে জন্যেই ‘মিলিটারী ক্যু’ না বলে গণ অভ্যুত্থানের পক্ষে সেনাবাহিনীর সমর্থন বলছেন। অথচ উৎখাতের প্রায় ছয় মাস আগে থেকে ওবামা ও ইস্রাঈলী প্রশাসনের হর্তাকর্তাদের সঙ্গে সেনা প্রশাসনের দেন-দরবার চলছে। এমনকি বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট আল-বারাদী ইসরাঈলেরই প্রস্তাবিত ব্যক্তি।

মিসরের এই ঘটনায় গণতন্ত্র যে স্রেফ একটা প্রতারণা সেটাই আবার প্রমাণিত হ’ল। তাদের বহু ঘোষিত  বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা সবই কেবল ইসলাম বিরোধীদের জন্য, ইসলামপন্থীদের জন্য নয়। ইসলামপন্থীরা জনগণের ভোটে ক্ষমতায় গেলেও ইসলামের কোন বিধান কায়েম করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না বা করতে দেয়া হবে না, এটাই হ’ল গণতন্ত্রীদের মূল কথা। তুরস্ক, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ তার জাজ্জ্বল্যমান প্রমাণ। মিসর হ’ল তার একেবারে টাটকা প্রমাণ।

ইহূদী-নাছারা আন্তর্জাতিক চক্র তাদের সাম্রাজ্যবাদী লিপ্সা ও শাসন-শোষণ অব্যাহত রাখার স্বার্থে হেন অপকর্ম নেই যা করতে পারে না। গণতন্ত্র তাদের দেওয়া একটা গালভরা বুলি মাত্র। ২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৫১ সালে ইরানে সর্বপ্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার এসেছিল মোহাম্মাদ মোছাদ্দেক-এর নেতৃত্বে। তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ও তাদের অনুগ্রহভাজন ছিলেন। কিন্তু অপরাধ করেছিলেন এই যে, তিনি ইরানী তৈল কোম্পানী জাতীয়করণের মাধ্যমে প্রথমবারের মত দেশের তৈল সম্পদের মালিকানা ইরানী জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। সেই সাথে পাহলবী রাজার ক্ষমতা কমিয়ে নির্বাচিত সরকার প্রধানের ক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ফলে সেদেশের তৈল লুণ্ঠনকারী মার্কিন ও বৃটিশ চক্র তাদের স্ব স্ব গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ১৯৫৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের প্লট তৈরী করে। যে মোছাদ্দেক ছিলেন ইরানী জনগণের অবিসংবাদিত নেতা, লাখ লাখ ডলার খরচ করে তার বিরুদ্ধে সেদিন তেহরানে লাখো মানুষের ঢল নামানো হয়। যাতে তাঁর পতন ঘটে এবং পাহলবী রাজার মাধ্যমে তাদের শোষণের পথ অবারিত রাখা হয়। ১৯৬০ সালে তুরস্কের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আদনান মেন্দারেসকে ইসলামপন্থী হবার অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত করে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। ১৯৯২ সালে আলজেরিয়ার নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করতে যাওয়া ইসলামিক সালভেশন ফ্রন্ট নেতাদের কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। ফলে গৃহযুদ্ধে সেখানে লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়। ২০০৬ সালে ফিলিস্তীনে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার খেসারত ইসলামপন্থী হামাসকে আজও দিতে হচ্ছে ভিতরে-বাইরে অবরোধ ও হামলার শিকার হয়ে। মুরসি তেমনি জিতে হেরেছেন। মিসর এখন বিভক্ত। এটাই পাশ্চাত্যের কাম্য। মিসরে ইসরাঈলের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখাই পাশ্চাত্যের ব্রত। ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ইসরাঈলের সাথে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি করেন। যার প্রধান ধারাই ছিল ইসরাঈলের অস্তিত্বের স্বীকৃতি ও সুরক্ষা। বিনিময়ে আমেরিকা ইসরাঈলের পরে মিসরকে তাদের সেরা সাহায্যপ্রাপ্ত দেশের মর্যাদা দেয়। প্রতি বছর প্রদত্ত ১৫০ কোটি ডলার সাহায্যের মধ্যে ১৩০ কোটি ডলার কেবল সেনাবাহিনীর জন্য বরাদ্দ করা হয়, যার কোন হিসাব নেওয়ার অধিকার মিসর সরকারের থাকবে না। এভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সেরা সেনাবাহিনীকে মার্কিনীরা কব্জায় নেয়। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

প্রেসিডেন্ট হয়েই মুরসি প্রথমে গাজা সফর করেন। সিনাইয়ের রাফাহ সীমান্ত খুলে দেন। অতঃপর সঊদী আরব ও ইরান সফর করেন। পরে ইরানী প্রেসিডেন্ট মিসর সফর করেন। এরপর তিনি সংবিধান সংশোধন করার উদ্যোগ নেন। এতে তিনি ইসরাঈল ও ওবামার সন্দেহে পতিত হন। মুবারকপন্থী প্রার্থী বিগত নির্বাচনে দ্বিতীয় (৪৮.৩) স্থানে ছিল। এছাড়াও ছিল নোবেলজয়ী আল-বারাদীর দল ও অন্যান্যরা। তাছাড়া ছিল দীর্ঘ ৩০ বছরের মোবারকপন্থী শক্তিশালী আমলাচক্র। সেই সাথে স্বাধীনচেতা সেনাবাহিনী। যারা এখন মিসরের মোট সম্পদের প্রায় ৪০ শতাংশের মালিক। সেদেশের প্রায় সব শিল্প ও কল-কারখানার মালিকানা সেনাবাহিনী সদস্যদের হাতে। তাদের বিলাসী জীবন যাপনের পাশে হতদরিদ্র নিঃস্ব জনগণ যুগ যুগ ধরে শোষিত হ’তে হ’তে এখন কংকালসার হয়ে পড়েছে। একটা ভোট দেওয়া ছাড়া তাদের কোনই শক্তি বা ক্ষমতা নেই। তাদের বিরাট আশা ছিল মুরসিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু তারা জানেনা যে, ভোটের মৌসুমে জনগণকে সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস বলা হলেও ভোটাধিকারহীন সেদেশের প্রায় ৮ লাখের অধিক সেনাবাহিনীই রাষ্ট্রের মূল ক্ষমতার উৎস। সাথে সাথে তাদের উপরে রয়েছে মার্কিন ছড়ি ও আর্থিক টোপ। তাদের সংবিধানে সেনাবাহিনীকে এমন ক্ষমতা দেওয়া আছে যে, তারা ইচ্ছা করলে সংবিধান স্থগিত করতে পারে। তাদের মনোনীত সাংবিধানিক আদালত যেকোন সময় নির্বাচিত জাতীয় সংসদ বাতিল করে দিতে পারে। মুরসির বেলায় সব হাতিয়ারই তারা প্রয়োগ করেছিল। ফলে মুরসি বাধ্য হন আপোস করতে। পতনের সপ্তাহখানেক আগে তিনি কায়রোতে লক্ষাধিক সমর্থক জড়ো করে জোরালো ভাষণ দিয়ে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরোধিতা করেন এবং সেখানে আমেরিকার প্রস্তাবিত নো ফ্লাই জোন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাকে সমর্থন দেন। এমনকি তিনি গাজাবাসীদের বাঁচার পথ রাফাহ সীমান্ত যা খুলে দিয়েছিলেন তা আবার বন্ধ করে দেন। এমনকি মোবারকের আমলে রাস্তার তল দিয়ে চালু করা টানেল বা সুড়ঙ্গ পথটুকুও শেষ পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু তাতেও মার্কিন প্রভুরা খুশী হননি। শেষে পতনের আগ রাতের সর্বশেষ ভাষণে তিনি সেনাবাহিনীর চাহিদা মোতাবেক আপোষ প্রস্তাবের ঘোষণা দেন। কিন্তু তাতে আর কাজ হয়নি। তিনি ভেবেছিলেন, মার্কিনীরা আর যাই হৌক জনগণের ভোটকে সম্মান করবে। নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু তাঁর সব হিসাবই ভুল প্রমাণিত হ’ল। তাঁর সবচেয়ে বড় ভুল ছিল সেনাবাহিনীর গায়ে হাত দেয়া। তিনি মোবারক আমলের সেনাপ্রধানকে সরিয়ে তাঁর পসন্দের ব্যক্তিকে সেনাপ্রধান করলেন। অথচ সেই-ই তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে সরিয়ে দিল। কারণ তিনি বুঝলেন, যিনি তার পূর্বসূরীকে সরিয়েছেন তিনি দু’দিন পরে তাকেও সরাবেন। তাছাড়া তিনি সংবিধান সংশোধন করেন। যদিও সেখানে সেনাবাহিনীর গায়ে হাত দেননি। ইন্দোনেশিয়া, মিসর, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিয়ানমার ও যেসব দেশে সেনাবাহিনীই মূল ক্ষমতাধর, সেসব দেশে গণতন্ত্র একটা শ্রুতিমধুর শব্দ মাত্র। যার কোন বাস্তবতা নেই। বিশেষ করে বছরের পর বছর ধরে সেনাবাহিনী যখন একটা ব্যবসায়িক শ্রেণীতে পরিণত হয় এবং দেশের ধনিক শ্রেণী ও তাদের বশংবদ রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলে, তখন তাদের এই লাভজনক অবস্থান সামান্যতম ক্ষুণ্ণ হৌক, এটা তারা চায় না। তাই মুরসির উচিৎ ছিল সর্বাগ্রে দেশে সুশাসন কায়েম করা। সবার সাথে সদাচরণ করা ও নিজেকে সকল দেশবাসীর প্রেসিডেন্ট হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। যেমন প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা ইমাদুদ্দীন আব্দুল গফুর সম্প্রতি আমেরিকার দি ওয়াশিংটন পোষ্টকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, প্রেসিডেন্টের ঘোষণা করা উচিৎ যে, তিনি মিসরের সকল মানুষের প্রেসিডেন্ট। কিন্তু আসল সমস্যা হ’ল, মিসরের অনেক মানুষই ভাবে যে, তিনি সকল মিসরীয়ের প্রেসিডেন্ট নন’। আমরা মনে করি, বিষয়টি কেবল ঘোষণা দেওয়ার নয় বরং আচরণের ব্যাপার। আর এটা কেবল তখনই সম্ভব, যখন দল ও প্রার্থীবিহীনভাবে ইসলামী পন্থায় নির্বাচন হবে। দলীয় ভোটে নির্বাচিত ব্যক্তি কখনোই বাস্তবে নির্দলীয় হতে পারেন না, অতি মানব কোন ব্যক্তি ছাড়া।

প্রশ্ন হ’ল, বঞ্চিত দলটি ও তাদের সমর্থক জনগণ এখন কোন পথে যাবে? মনে পড়ে বর্তমান আল-কায়েদা নেতা ডাঃ আয়মন আল-জাওয়াহেরী চৌদ্দ বছর বয়সে ইখওয়ানুল মুসলেমীনে (মুসলিম ব্রাদারহুডে) যোগ দেন। পরে ১৯৫৪ সালে সোভিয়েত ঘেঁষা প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দুন নাছের ইখওয়ানকে নিষিদ্ধ করলে অন্যান্যদের সাথে তিনিও রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে কারাগারে নির্মমভাবে নির্যাতিত হন। ফলে কারামুক্তির পরে তিনি সশস্ত্র আন্দোলনের পথ বেছে নেন। সে হিসাবে বলা যায় গণতন্ত্রের দাবীদারদের যুলুম-নির্যাতনই বিশ্বব্যাপী চরমপন্থী আন্দোলনসমূহের ব্যাপ্তিলাভের অন্যতম প্রধান কারণ। তাই দেখা যায় মুরসি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর আল-কায়েদা নেতা ডাঃ আয়মন তাঁকে ৫৮ মিনিটের এক দীর্ঘ অডিও বার্তা প্রেরণ করে বলেন, গণতন্ত্র একটি প্রতারণা মাত্র। এর মাধ্যমে আপনি মিসরের নির্যাতিত জনগণের বা অবরুদ্ধ ফিলিস্তীনীদের কোন কল্যাণ করতে পারবেন না। এভাবে একদিকে পুরানো সাথী আয়মন আল-জাওয়াহেরীর তীব্র সমালোচনা এবং অন্যদিকে সেনাবাহিনী, আদালত ও আমলাতন্ত্রের নিষ্ঠুর অসহযোগিতা ও সাথে সাথে বিরোধী দল সমূহের অন্যায় চাপ মুরসিকে একেবারে কোনঠাসা করে ফেলে।

প্রশ্ন হ’ল, ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত ইসলামপন্থীরা কি করবে? জবাব হ’ল, তারা এর পক্ষে জনমত গঠন করবে এবং সরকারের প্রতি উপদেশদাতা ও চাপ সৃষ্টিকারী দল হিসাবে কাজ করবে। সরকারের ভাল কাজের প্রশংসা করবে এবং মন্দ কাজের প্রতিবাদ করবে। তারা সর্বদা জনকল্যাণে কাজ করে যাবে। ধর্ম-বর্ণ ও দল-মত নির্বিশেষে সকল মানুষের অধিকার আদায়ে সর্বদা সোচ্চার থাকবে। সরকারী যুলুম সহ্য করবে ও মন্দ লোকদের গালি হযম করবে। তথাপি জনবিচ্ছিন্ন হবে না। সকল কাজের লক্ষ্য থাকবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। লক্ষ্যচ্যুত হ’লেই সে কক্ষচ্যুত নক্ষত্রের মত হারিয়ে যাবে জনান্তিকে। আর আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত দল কখনো জনগণের অন্তরে স্থায়ী আসন লাভ করতে পারে না।

এক্ষেত্রে মিসরের সালাফীদের কথা স্মরণযোগ্য। ২০১১ সালের বিপ্লবে তারা খেই হারিয়ে রাতারাতি গণতন্ত্রী হয়ে যায়। অতঃপর আন-নূর পার্টি গঠন করে নির্বাচনে নেমে পড়ে। জনগণের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা আগে থেকেই ছিল। ফলে তারা এককভাবে ১১১টি ও জোটগতভাবে ১২৩টি আসন লাভ করে। সেই সাথে মুরসির দলের ২৩৮টি মিলে তারা সরকারের পার্টনার হয়ে যায়। তাদের এই তাক লাগানো সাফল্যে চমকে যায় সবাই। তাদেরকে যিনি এপথে এনেছিলেন সেই তরুণ নেতা ইমাদুদ্দীন আবদুল গফুর প্রেসিডেন্ট মুরসির ঘনিষ্ঠ তিনজন উপদেষ্টার অন্যতম নির্বাচিত হন। তিনি আন-নূর পার্টিকে অন্যদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে বলেন। এতে সালাফীরা সঙ্গত কারণেই অসম্মত হন। তখন তিনি বেরিয়ে গিয়ে জানু’১৩ থেকে ‘আল-ওয়াত্বান’ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। ওয়াশিংটন পোষ্টের সাথে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমরা আমেরিকাকে আমাদের বন্ধু মনে করি’। আমরা বলি, আমেরিকা যাদের বন্ধু হয়, তাদের অন্য কোন শত্রুর প্রয়োজন হয় না। বরং এরাই সুকৌশলে সালাফীদের পথচ্যুত করেছে। বর্তমান বিপ্লবে আন-নূর পার্টি সেক্যুলারদের সঙ্গে এক হয়ে মুরসির পতন ঘটিয়েছে। কিন্তু যখন দেখেছে যে, সেনাবাহিনীই রয়েছে মূল ক্ষমতায়, তখন আবার পিছুটান দিয়েছে। এখন তারা কারু সাথে নেই। অথচ সেনা সমর্থিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ৩৫ জনের সব সদস্যই সেক্যুলার। সেখানে কেউ ইসলামপন্থী নেই। এভাবে সালাফীরা আদর্শচ্যুত হয়ে একূল-ওকূল দু’কূল হারালো। জনগণের এতদিনের শ্রদ্ধাবোধ সবই নিমেষে উবে গেল। তারা ভেবে নিল সেক্যুলার ও ব্রাদারহুডের মত সালাফীরাও ক্ষমতা দখলের জন্য সবকিছু করে। বাংলাদেশের সালাফীদের এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।

মুরসির পতনে শিক্ষণীয় বিষয় এই যে, ইসলামী শাসন ইসলামী তরীকায় আসতে হবে। আর তা হ’ল, দল ও প্রার্থীবিহীন নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার পক্ষে জনগণের রায় গ্রহণ করা। সেখানে যিনি খলীফা হবেন, তিনি সকল দল ও মতের লোকদের প্রতি ইসলামী নীতি অনুযায়ী সদাচরণ করবেন। সকলের দাবী-দাওয়া সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করবেন। আল্লাহভীতি ও আনুগত্যের দর্শনে সকলকে উদ্বুদ্ধ করবেন। বিদেশী চাপ থেকে দেশকে মুক্ত করার চেষ্টা করবেন। দেশবাসী যদি তার আন্তরিকতা বুঝতে পারে, তাহলে তারা তার জন্য জীবন দেবে। শত্রু-মিত্র সবাই তার প্রতি সহানুভূতিশীল হবে। এমতাবস্থায় বিদেশীরা চক্রান্ত করলেও ব্যর্থ হবে। আর নিহত হলেও তিনি হবেন ‘শহীদ’। জনগণের হৃদয়ে তিনি থাকবেন প্রেরণার উৎস হয়ে। ইসলামী নেতারা ইসলামের দিকে ফিরে আসবেন কি? আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন- আমীন! (স.স.)

 

HTML Comment Box is loading comments...