হক-এর পথে যত বাধা

জোরে ‘আমীন’ বলার অপরাধে মুছল্লীদের লাঠির আঘাতে মসজিদে লুটিয়ে পড়লাম

পাবনা যেলার অন্তর্গত আতাইকুলা থানার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের বালুঘাটা কেশবপুর গ্রামের খুব সাধারণ একটি পরিবারে আমার জন্ম। মা-বাবার বিবাহিত জীবনের সুদীর্ঘ ১৩ বছর পর জন্ম নেওয়া একমাত্র সন্তান হওয়ায় আমি বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে ছিলাম অতি আদরের। যাই হোক আমার মা অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন বিধায় ছোট বেলা থেকেই আমাকে ছালাত আদায় করতে হ’ত। শিক্ষাজীবনের শুরুতে বাবা-মা ব্র্যাক স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলেন। ফলে লেখাপড়ার পাশাপাশি আমার নাচ-গানের চর্চাও শুরু হয়। বাড়ির লোকজন ও আত্মীয়-স্বজন এতে অবশ্য খুশিই ছিল। হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার পর আমার মনে প্রশ্ন জাগতে শুরু করে, মুসলমানগণ এক আল্লাহর ইবাদত করে আর হিন্দুরা বিভিন্ন মূর্তির পূজা করে। কোন ধর্মটা সঠিক? বাবা মার চাপে মাঝে মধ্যে ইসলামী কিছু আচার-অনুষ্ঠান পালন করলেও মন-মানসিকতা ও বিশ্বাসে ধর্ম সম্পর্কে আমার  অবস্থান ছিল নড়বড়ে। এক পর্যায়ে আমার ছোট চাচা কয়েকজনকে নিয়ে মসজিদে একটি ইসলামী সংগঠনের দাওয়াতী কার্যক্রম শুরু করেন। তখন থেকে আবুল আলা মওদূদীসহ শিবিরের কর্মী ও সাথী সিলেবাসের বই, তাওহীদ, রিসালাত, আখেরাত, নামায-রোজার হাকিকত ইত্যাদি বইগুলি পড়ে শেষ করি এবং এর মাধ্যমে ধর্ম হিসাবে ইসলামের মৌলিকত্ব ও যথার্থতা সম্পর্কে আমার ধারণা মযবূত হয়। তিন মাস ব্যক্তিগত রিপোর্ট রাখা এবং কুরআন তেলাওয়াত শিক্ষা করার পর ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৮ রাত ৮-টায় আমি শিবিরের ‘সাথী’ হিসাবে শপথ গ্রহণ করি। সবেমাত্র তখন আমি কলেজে ভর্তি হয়েছি।

একদিন আমি চাচাত ভাই হৃদয় (সাথী)-এর বাড়িতে গিয়ে ইবনুল ক্বাইয়িমের ‘রাসূল (ছাঃ) কিভাবে নামাজ পড়তেন’ বইটি দেখলাম। পরে আমি তার কাছ থেকে বইটা নিয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে ফেলি। এই প্রথম জানতে পারলাম আহলেহাদীছদের ছালাত সম্পর্কে। এদিকে ছোট চাচা মাহফূযুর রহমান আল-আযহারে পড়ালেখা করতে গেলেন। সেখান থেকে মাঝে মাঝে যখন বাড়ি ফিরতেন, তখন আমার পড়া ইবনুল ক্বাইয়িমের বইটিতে উল্লিখিত পদ্ধতি মোতাবেক ছালাত আদায় করতেন। এজন্য এলাকার লোকজন তাকে লা মাযহাবী, রফাদানী বলত। আমি নিজেও এক সময় তার এই ছালাত অপসন্দ করতাম। কিন্তু বইটা পড়ার পর এবং তার এই ছালাত দেখার পর আমিও তার অনুরূপ ছালাত আদায় করা শুরু করি। যদিও তিনি কিছুদিন পর শিবিরের নেতা ও এলাকার লোকজনের চাপে হাদীছ মোতাবেক ছালাত আদায় করা বাদ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আমি কিন্তু বাদ দেইনি। হঠাৎ একদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং শিবিরের সদস্য মুমিন ভাইকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম ছহীহ হাদীছ মোতাবেক লিখিত এই বইটার প্রতি আপনারা আমল করেন না কেন? তিনি বললেন, এসব ছোটখাট ব্যাপার। আগে ‘হুকুমাত কায়েম’ হোক তখন সব ঠিক হয়ে যাবে।

এইচ.এস.সি পরীক্ষার পর শিবিরের ‘সাথী’ ও ‘সদস্য’ সিলেবাসের সকল বই পড়ে শেষ করি। ‘ইসলামে রাজনৈতিক মতবাদ’ ও ‘রাসায়েল মাসায়েল’ ৬ খন্ড সম্পূর্ণ পড়ার পর বুঝতে পারি গণতন্ত্র ইসলামী আক্বীদা ও আদর্শের পরিপন্থী। অন্যদিকে গোলাম আযমের ‘ইক্বামাতে দ্বীন’ পড়ে বুঝতে পারি ‘হুকুমাত কায়েম’ হ’ল মূল কাজ। তাবলীগ জামাত, খানকা, মাদরাসার শিক্ষক ও মসজিদের ইমাম ইত্যাদি যারা দ্বীনের খেদমত করছেন তারা কেবল ‘খেদমতে দ্বীন’ করছেন। কিন্তু মূল ‘ইক্বামতে দ্বীন’-এর কাজ একমাত্র ‘জামায়াত’ই করছে। আমার ‘তাবলীগ জামাআত’ও খুব ভাল লাগত। ‘ফাযায়েলে আমল’ বা ‘তাবলীগী নিসাব’ কয়েকবার পড়েছি। যতই পড়ি ততই সব ছেড়ে মসজিদে দিন-রাত সবসময় কাটাতে ইচ্ছা করে। পীর-মুরীদীও অসম্ভব ভালবাসতাম। কিন্তু মাওলানা আব্দুর রহীম ছাহেবের ‘সুন্নাত ও বিদ‘আত’ এবং আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীরের ‘হাদিসের নামে জালিয়াতী’ পড়ে সব ভালবাসা গোল্লায় গেল। অবশেষে বুখারী ও মুসলিম থেকে ছালাত, যাকাত, ছিয়াম, জিহাদ, লিবাস, জানাযা, ঈমান ইত্যাদি অধ্যায় পড়ে শেষ করি। হাদীছের আলোকে মানব জীবন (১-৪ খন্ড), আসান ফিক্বহ (১-২ খন্ড), এন্তেখাবে হাদিস (১-২ খন্ড), রিয়াযুস সালেহীন (১-৪ খন্ড), রাহে আমল (১-২ খন্ড), হাদীস শরীফ (১-২ খন্ড), ‘মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে সঠিক পন্থা অবলম্বন’, ‘হাদীস সংকলনের ইতিহাস’সহ শিবিরের সাথী ও সদস্য সিলেবাসের সমস্ত বই এবং আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর-এর এইইয়াউস সুনান’ বইটি গভীরভাবে অধ্যয়ন করে ইসলাম সম্পর্কে মোটামুটি স্পষ্ট ধারণা লাভ করি। ইতিমধ্যে ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব স্যারের ‘হাদীছের প্রামাণিকতা’, ‘ইক্বামতে দ্বীন : পথ ও পদ্ধতি’, ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন কি ও কেন’ বইগুলো পড়ে একটি বিশুদ্ধ ইসলামী আন্দোলনের সন্ধান পাই। অবশেষে পাবনা শিবির অফিস তথা ‘মক্কা টাওয়ারে’ থাকা অবস্থায় আমি নিজেকে আহলেহাদীছ বলে প্রকাশ্য ঘোষণা দেই। এ কথা শুনে ছোট চাচা মাহফূয (বর্তমানে লন্ডনে আছেন) তার এক আত্মীয়কে ফোন করে এবং পাবনা শহর শাখার সভাপতিকে দিয়ে আমাকে একটি রুমে আটকে মারাত্মকভাবে প্রহার করায়। ফলে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি।

পরবর্তীতে সেই মেস ছেড়ে দিয়ে অন্য মেসে উঠতে বাধ্য হই। আমাদের গ্রামে ও এলাকায় অপপ্রচারণা চালানো হয় এবং আমার বিরুদ্ধে মানুষকে উস্কে দেওয়া হয়। সর্বপ্রথম চাচাতো ভাই সাগর, শাহজাহান (সাথী ছিল) ও সালমান আমার দাওয়াতে সাড়া দেয়। আমার বন্ধু রাজশাহী মেডিকেলের ছাত্র ডাঃ মাহফূযুর রহমানের সাথে দীর্ঘক্ষণ এ বিষয়ে আলোচনা করি। সে আত-তাহরীকের ওয়েবসাইট থেকে বিভিন্ন বইপত্র পড়ালেখা করে এবং অবশেষে আমার দাওয়াত গ্রহণ করে। সে তখন শিবিরের সাথী এবং পাঠচক্রের সদস্য ছিল।

সর্বশেষ গত রামাযানে বন্ধু মাহফূযের সাথে সাক্ষাতের জন্য বাড়ি যাই। মসজিদে জামা‘আতের সাথে ছালাত আদায়ের সময় অভ্যাসমত জোরে আমীন বলায় উপস্থিত মুছল্লীদের মধ্যে শোরগোল সৃষ্টি হয়। সেদিন ছিল রবিবার। বাদ আছর বাবা ফোন করে বললেন, তোকে মারার জন্য মসজিদের মুছল্লীরা সবাই লাঠি হাতে নিয়ে প্রস্ত্তত। মসজিদে আসিস না। বন্ধু মাহফূয সব শুনে যেতে দিল না। যাহোক পরদিন দুপুরে ছিয়াম অবস্থায় যোহর ছালাতে তাকবীরে তাহরীমার পরে উপস্থিত হই। সালাম ফিরানোর সাথে সাথে আমাকে কাঠের টুকরা দিয়ে শরীরে আঘাত করা হয়। আমি রক্তাক্ত হয়ে যাই। পরে ইমাম ছাহেবের সামনে সবাই মিলে মসজিদ থেকে আমাকে বের করে দেয়। আমার অপরাধ হচ্ছে আমীন জোরে বললে মুছল্লীদের ছালাতে ব্যাঘাত ঘটে। একই কারণে শাহজাহান ও সালমানকেও ছালাত শুরু করার পর মসজিদ থেকে বের করে দেয়া হয়। পরবর্তী ১৫ দিন বাড়ির বাইরেও যেতে পারছিলাম না। অবশেষে ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে সবার সাথে ছালাত পড়তে গিয়েও বাধা পাই। বাধ্য হয়ে একাই বাড়িতে পড়তে হয়। এখনও অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে আমাকে এ পথ থেকে সরিয়ে দেয়ার অব্যাহত প্রচেষ্টা চলছে। যে চাচাকে প্রথম দেখেছিলাম সঠিক পথের উপর, সে এখন হয়ে গেছে বড় বিদ‘আতী। এর একটাই কারণ, না জেনে, না বুঝে অন্যের প্রচারণায় অন্ধ দল ও ব্যক্তি পূজা। তাই হক্ব জেনে-বুঝেও ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। আমি এখন হাযারো সমস্যা ও কষ্টের মাঝেও প্রশান্তি পাই, আশার আলোয় উজ্জীবিত হই। যে হক্বের সন্ধান আমি পেয়েছি, তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে সর্বদা তাকীদ অনুভব করি। আল্লাহ আমাকে হক্বের উপর টিকিয়ে রাখুন এবং সকলকে হক্ব বুঝার ও মানার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

-ইকবাল বিন জিন্নাহ

রসায়ন বিভাগ, পাবনা সরকারী এডওয়ার্ড কলেজ।

 

ছহীহভাবে ছালাত আদায় করায় নিজের পিতাও বিদ্রূপ করা শুরু করলেন

আমি যাকারিয়া খন্দকার। চুয়াডাঙ্গা যেলার দামুড়হুদা উপযেলার ছোট্ট গ্রাম চারুলিয়ায় আমার বাসস্থান। প্রাথমিক জীবনে কিছুকাল মাদরাসায় পড়েছিলাম। এরপর স্কুলজীবনে কিছুকাল ইসলামী ছাত্র সংগঠনের কর্মী ছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহকে রাযী-খুশি করা। অনেক মিছিল মিটিং-এ গিয়েছি। হাড় কাঁপানো শীতের রাতে ভোট চাইতে গিয়েছি। পারিবারিক সমর্থন পেয়েছি। কিন্তু কখনও নফসকে খুশি করতে পারতাম না। ভাবতাম ভোট আর রাজনীতিই কি তাহ’লে ইসলাম। যে মানুষগুলো আদর্শের নামে অন্য মানুষকে হত্যা করতে পারে, সেই মানুষগুলো সঠিক দ্বীন পালন করছে কি-না এ ব্যাপারে চরম সন্দেহের কারণে সেই ছাত্রসংগঠন ছেড়ে দিলাম। ভাবলাম ছালাত আদায় করব, ইসলাম মানব, একা একাই ইনশাআল্লাহ জান্নাত পাব। মাধ্যমিক স্কুলে কোন মসজিদ নেই। আমার পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক জনাব রূহুল আমীন স্যার গাছতলায় ছালাত পড়তেন। একদিন আমি তাঁর পাশে ছালাতে দাঁড়ালাম। দেখলাম তিনি একটু ভিন্ন নিয়মে ছালাত আদায় করলেন। আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম আপনি এভাবে ছালাত আদায় করলেন কেন? স্যার আমাকে কিছু হাদীছ শোনালেন। অতঃপর বললেন, তোমার বাড়ি কোন হাদীছের বই আছে? আমি বললাম, বুখারী শরীফ আছে। তিনি ওটা স্কুলে আনতে বললেন। আমি স্কুলে বইটা আনলে তিনি কিছু হাদীছ নোট করে দেন। আমি দেখে হতবাক হই। তাহ’লে এতবড় আলেমরা ভুল করছে? বিশ্বাস করতে পারলাম না কিছুই। বাড়িতে বললে নিশ্চিত মার খেতে হবে। কারণ আমার দাদাও একজন বড় ইমাম। কিছু দিন পরের কথা, রূহুল স্যার বললেন, কুনিয়া চাঁদপুর আমাদের একটা প্রোগ্রাম আছে, এসো। আমি ও আমার বন্ধু দীপু কুনিয়া চাঁদপুর গেলাম। এক মসজিদে প্রোগ্রামটা হচ্ছিল। এক ভাইয়া বক্তব্য রাখছিলেন। মনে হচ্ছিল তার কথায় জাদু আছে। প্রত্যেক কথায়ই যেন হাদীছ। কিছু প্রশ্ন করলাম ভাইয়াকে ব্যক্তিগতভাবে। সন্তোষজনক উত্তর পেলাম। ভাবলাম আমাকে জানতে হবে অনেক। হাদীছ পড়া শুরু করলাম। এরপর থেকে জীবনে আসলো নতুন অধ্যায়। বিকেলে খেলতাম, খেলা বাদ দিয়ে খেলার মাঠে বুখারী শরীফ পড়ি। হাদীছ মতো চলার চেষ্টা করি। ছহীহভাবে মসজিদে ছালাত পড়তে গেলে লোকেরা বলল যে, বুখারীর এসব হাদীছ এখন আর চলবে না। তারপর শুনালো বগলে পুতুল রাখার প্রসিদ্ধ কেচ্ছা। কথাগুলো স্যারকে বললে স্যার প্রকৃত ঘটনা বুঝিয়ে দিতেন। কিছুদিন পর দেখলাম আমি যেন আর আমি নেই। যে লোকগুলো আমাকে গ্রামে এক বাক্যে ভাল বলে চিনত, তারা আমাকে ঘৃণা করে। খেলার মাঠে ক্যাপ্টেন ছিলাম, সেই দলের কেউ তাদের পাশে বসতে দেয় না। যে দাদাকে এত ভালবাসি, সেই দাদা আমার ছালাত দেখে টিটকারি দেয়। বাড়ি থেকে বের করে দিতে চায়। আমার পিতা প্রতিদিন রাতে হাত ঝেড়ে ব্যাঙ্গ করে। ভাল করে একটা কথা পর্যন্ত কেউ বলে না। শুধু পাশে পেলাম মাকে। ঘরে ছালাত আদায় করতাম। মা ঘরের দরজা দিয়ে দিত, কেউ দেখে ব্যাঙ্গ করবে বলে। আমি মায়ের কাছে কাঁদতাম, জান্নাতে যাব বলে কি নিজের বাবাকেও বিসর্জন দিতে হবে? এভাবে আর কত সহ্য করা যায়? মাও কাঁদত। আর বলত, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। এভাবে দিন কাটছিল। আমি এসএসসি পরীক্ষার কোচিং করার জন্য একটা কোচিং সেন্টারে ভর্তি হ’লাম। পরিচিত হ’লাম সোহাগ নামের একজন বন্ধুর সাথে। সেও ছিল ছহীহ আক্বীদার অনুসারী। তার বাবা আমাদের ইংলিশ টিচার। তার জীবনী শুনে সমস্ত দুঃখ ভুলে গেলাম। যখন জানলাম তাকেও কাঁদতে হয়, তার পিতাও তাকে কষ্ট দেয়, তখন ভাবলাম আমি একা নই, অনেকেই হয়ত আমার মত আছে। অনুপ্রেরণা পেলাম। দাওয়াতী কাজ বাড়িয়ে দিলাম। আমার দাওয়াত গ্রহণ করল হাসীব নামের এক বন্ধু এবং নাঈম নামের একজন বড় ভাই। আর আমার একমাত্র সহযোগী ছিল দীপু। আমরা ওয়াক্তের ছালাত বিভিন্ন স্থানে পড়তাম। আছর আর মাগরিব পড়তাম খেলার মাঠে। আমাদের ব্যবহার ও আচরণে মুগ্ধ হয়ে ছোট ভাইয়েরা ও কিছু বন্ধু পাশে এসে বসত। ছহীহ বুখারী হাতেই থাকত। হাদীছ দেখিয়ে ওদেরকে ছহীহভাবে ছালাত আদায় করা শিখিয়ে দিতাম। কিছুদিনের মধ্যে আমাদের সমমনা সদস্য হ’ল প্রায় ৮/১০ জন। ফলে গ্রামে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হ’ল। আমাকে মারবে সবাই সিদ্ধান্ত নিল অথবা গ্রাম থেকে বের করে দেবে। পরের দিন শুক্রবার আমরা জুম‘আর ছালাত আদায় করতে গিয়েছি। আমাদের আমীন শুনে আর রাফঊল ইয়াদাইন দেখে ছালাত শেষে ওরা সবাইকে বের করে দিল। মসজিদ থেকে আমাকে হুমকি দিল আবার কেউ গালি দিল। ছোট ভাইয়েরা যারা গ্রামে ভাল ছাত্র হিসাবে আমাকে সম্মান করত তারাও গালি দিতে বাদ দিল না। বুকভরা কষ্ট নিয়ে বাড়িতে গেলাম। আববু যেতে না যেতেই বলল, ‘ইট দিয়ে মেরে লোকে মাথা ফাটিয়ে দেবে, রাস্তায় পড়ে থাকবি, কেউ হাসপাতালে নিয়ে যাবে না’। ছোট চাচা বলল, ‘বেশি বুঝিস, না? বাড়ি থেকে বের করে দেব’। মনে আছে সেদিন দরজায় দাঁড়িয়ে আল্লাহকে কেঁদে কেঁদে বলেছিলাম, এদের হেদায়াত দাও, আল্লাহ এদের হক্ব বুঝার জ্ঞান দাও। রাতে আববু আমাকে বললেন, তোর বুখারীতে দেখা হাদীছ আমি দেখব। আববুকে হাদীছ দেখালাম, মনটা একটু নরম হ’ল। কিছুদিন পরে আহসানুল হক ভাইয়াকে দাওয়াত দিলাম আর আববুকে কৌশলে বলেছিলাম, কোনটা ঠিক আজকে বুঝে নিয়েন। ভাইয়া হাদীছগুলো সম্পর্কে বলছে এমন সময় আমার দূর সম্পর্কের এক চাচা এসে শুরু করল গালি-গালাজ। আববুরা ক্ষেপে গিয়ে তাকে ওখান থেকে বের করে দেন। ঐদিনই আববু আর সেজ চাচা আল্লাহর রহমতে হক্ব বুঝে ফেলেন। ভাইয়া কিছু বই দিয়ে গেলেন দাদুকে। আববুও সেগুলো দিলেন চাচাদের পড়তে। তারা হক্ব বুঝলেন কিন্তু সমাজের ভয়ে হক্বের উপর আমল করলেন না। আমার পরিবারের প্রত্যেক সদস্য ডাঃ জাকির নায়েকের খুব ভক্ত। আমি আমার বন্ধু সোহাগের কাছ থেকে ‘মুসলিম উম্মাহর ঐক্য’ বিষয়ক লেকচারটি আনলাম ও সবাইকে শোনালাম।

এরপর সবাই আমল শুরু করল ছহীহভাবে। এরপর গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল আমি পীর হয়েছি। আমার কাছে সবাই বায়‘আত নিচ্ছে। দাদা, আববু সবাই আমার কাছে বায়‘আত নিয়েছে। ফলে আববু, দাদা সবার মসজিদে যাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিল লোকজন। আমার চাচা মসজিদে দাঁড়িয়ে এক হাজীকে জিজ্ঞেস করলেন, সঊদীতে আমীন জোরে বলে নাকি আস্তে বলে? তিনি কসম করে বললেন, আস্তে বলে। লোকে তাই বিশ্বাস করল। এরপর ঐ হাজী ছাহেব যার সাথে আমার আববুর খুব বন্ধুত্ব ছিল সে আববুকে মারার হুমকি দেয়। তখন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম আবার খুশিও হয়েছিলাম এই ভেবে যে, প্রত্যেকের পরীক্ষা নিবেন আল্লাহ। আমার দো‘আ কবুল হয়ে গেল। কিন্তু হারালাম অনেক কিছু। আমার প্রথম জীবনের বন্ধু দীপু, নাঈম ভাই, ছোটভাই আলামীন সমাজের চাপে টিকতে পারল না। এখন সামাজিক চাপ আমার পুরো পরিবারের উপর। আর আল্লাহর রহমতে এতে দ্বীন প্রচার বাড়ছে বৈ কমছে না।

এখন বাইরের নতুন কিছু ভাই যোগ দিয়েছেন আমাদের এই ছোট্ট জামা‘আতে। ইতিমধ্যে একটা লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করেছি। আল্লাহ চাইলে হক্বের প্রচার বাড়তে থাকবে। এখন আমাকে সেই হাজী ছাহেব দেখলে সহ্য করতে পারে না। পায়ের টাখনুর উপর কাপড় দেখে বলে, ‘জানোয়ার, কাপড় উচিয়ে ভাব নেয়’। যাই হোক অবশেষে যারা হক্বের পথে সংগ্রামে বাধার শিকার হয়ে হতাশ হচ্ছেন তাদেরকে বলি ধৈর্য ধরুন, শত্রুদের জন্য দো‘আ করুন। ওরাই আপনার ভবিষ্যতের বন্ধু হবে ইনশাআল্লাহ। আমার পরিবারের একজনমাত্র চাচা যিনি আমাকে ডাক্তারি পড়াতে চেয়েছিলেন, বর্তমানে সঊদী আরবে থাকেন, আমাদের পরিবারের এই অবস্থা দেখে আমার সাথে সম্পর্ক প্রায় ত্যাগই করেছেন। পরিবারের কারো সাথে তিনি আর কথা বলেন না। তার জন্য আমি বিশেষভাবে দো‘আ চাইছি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে জান্নাতের পথে অটুট থাকার এবং জান্নাতে যাওয়ার তাওফীক দান করুন-আমীন!

-যাকারিয়া খন্দকার

চারুলিয়া, দামুড়হুদা, চুয়াডাঙ্গা।

 

HTML Comment Box is loading comments...