প্রবন্ধ

যাকাত ও ছাদাক্বা

আত-তাহরীক ডেস্ক

‘যাকাত’ অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া, পবিত্রতা ইত্যাদি। পারিভাষিক অর্থে ঐ দান যা আল্লাহর নিকটে ক্রমশঃ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং যাকাত দাতার মালকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে। ‘ছাদাক্বা’ অর্থ ঐ দান যার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয়। পারিভাষিক অর্থে যাকাত ও ছাদাক্বা মূলতঃ একই মর্মার্থে ব্যবহৃত হয়।

যাকাত ও ছাদাক্বার উদ্দেশ্য :

যাকাত ও ছাদাক্বার মূল উদ্দেশ্য হ’ল দারিদ্র্য বিমোচন ও ইসলামী ঐতিহ্য সংরক্ষণ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, إِنَّ اللهَ قّدْ فَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَاءِهِمْ فَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَاءِهِمْ- ‘আল্লাহ তাদের উপরে ছাদাক্বা ফরয করেছেন। যা তাদের ধনীদের নিকট থেকে নেওয়া হবে ও তাদের গরীবদের মধ্যে ফিরিয়ে দেওয়া হবে’।[1]

ইবাদতে মালী :

ইসলাম মুসলিম উম্মাহ্কে পৃথিবীর বুকে একটি অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। এজন্য যাকাতকে ‘ইবাদতে মালী’ তথা অর্থনৈতিক ইবাদত হিসাবে গণ্য করেছে। ছালাত ও ছিয়াম ইবাদতে বদনী বা দৈহিক ইবাদত, যার মাধ্যমে মানুষকে শুদ্ধাচারী ও উন্নত নৈতিকতা সম্পন্ন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক ইবাদতের মাধ্যমে মুসলিম সমাজে আর্থিক প্রবাহ সৃষ্টি করা হয়। সূদ সমাজের অর্থ-সম্পদকে শোষণ করে এক বা একাধিক স্থানে জমা করে। পক্ষান্তরে যাকাত ও ছাদাক্বা পুঁজি ভেঙ্গে দিয়ে তা জনসাধারণ্যে ছড়িয়ে দেয় ও হকদারগণকে ক্রয়ক্ষমতার অধিকারী বানায়। এর ফলে জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, يَمْحَقُ اللهُ الْرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ وَاللهُ لاَ يُحِبُّ كُلَّ كَفَّارٍ أَثِيْمٍ ‘আল্লাহ সূদকে নিশ্চিহ্ন করেন ও ছাদাক্বাকে বর্ধিত করেন। আল্লাহ কাফের ও পাপীকে ভালবাসেন না’ (বাক্বারাহ ২/২৭৬)

যাকাতের প্রকারভেদ :

যাকাত চার প্রকার মালে ফরয হয়ে থাকে। ১. স্বর্ণ-রৌপ্য বা সঞ্চিত টাকা-পয়সা ২. ব্যবসায়রত সম্পদ ৩. উৎপন্ন ফসল ৪. গবাদি পশু। টাকা-পয়সা একবছর সঞ্চিত থাকলে শতকরা আড়াই টাকা বা ৪০ ভাগের ১ ভাগ হারে যাকাত বের করতে হয়। ব্যবসায়রত সম্পদ ও গবাদি পশুর মূলধনের এক বছর হিসাব করে যাকাত দিতে হয়। উৎপন্ন ফসল যেদিন হস্তগত হবে, সেদিনই যাকাত (ওশর) ফরয হয়। এর জন্য বছরপূর্তি শর্ত নয়।

যাকাতের নিছাব :

১. স্বর্ণ-রৌপ্যে পাঁচ উক্বিয়া বা ২০০ দিরহাম। আল্লামা ইউসুফ কারযাভী বিস্তারিত আলোচনার পর বলেন, একালে স্বর্ণভিত্তিক নিছাব নির্ধারণ করাই আমাদের জন্য বাঞ্ছনীয়।[2] গহনাও স্বর্ণের যাকাত হিসাবে গণ্য।

২. ব্যবসায়রত সম্পদ-এর নিছাব স্বর্ণ-রৌপ্যের ন্যায়। চলতি বাজার দর হিসাব করে নিছাব পরিমাণ হ’লে তার যাকাত আদায় করেত হবে।

৩. খাদ্যশস্যের নিছাব পাঁচ অসাক্ব যা হিজাযী ছা‘ অনুযায়ী ৭৫০ কেজি বা ১৮ মন ৩০ কেজির মত হয়। এতে ওশর বা এক দশমাংশ নির্ধারিত। সেচা পানিতে হ’লে নিছফে ওশর বা ১/২০ অংশ নির্ধারিত।

৪. গবাদি পশু : (ক) উট ৫টিতে একটি ছাগল (খ) গরু-মহিষ ৩০টিতে ১টি দ্বিতীয় বছরে পদার্পণকারী বাছুর (গ) ছাগল-ভেড়া-দুম্বা ৪০টিতে একটি ছাগল।[3]

যাকাতুল ফিৎর :

এটিও ফরয যাকাত, যা ঈদুল ফিৎরের ছালাতে বের হওয়ার আগেই মাথা প্রতি এক ছা‘ বা মধ্যম হাতের চার অঞ্জলী (আড়াই কেজি) হিসাবে দেশের প্রধান খাদ্যশস্য হ’তে প্রদান করতে হয়।

(ক) আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় উম্মতের ক্রীতদাস ও স্বাধীন, পুরুষ ও নারী, ছোট ও বড় সকলের উপর মাথা পিছু এক ছা‘ খেজুর, যব ইত্যাদি (অন্য বর্ণনায়) খাদ্যবস্ত্ত ফিৎরার যাকাত হিসাবে ফরয করেছেন এবং তা ঈদগাহের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পূর্বেই আমাদেরকে জমা দেয়ার নির্দেশ দান করেছেন’।[4]

(খ) উপরোক্ত হাদীছে প্রমাণিত হয় যে, ফিৎরা ছোট-বড়, ধনী-গরীব সকল মুসলিম নর-নারীর উপরে ফরয। উহার জন্য ‘ছাহেবে নিছাব’ অর্থাৎ সাংসারিক প্রয়োজনীয় বস্ত্তসমূহ বাদে ২০০ দিরহাম বা সাড়ে ৫২ তোলা রূপা কিংবা সাড়ে ৭ তোলা স্বর্ণের মূল্যের সমপরিমাণ টাকার মালিক হওয়া শর্ত নয়।

(গ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যুগে মদীনায় ‘গম’ ছিল না। মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর যুগে সিরিয়ার গম মদীনায় আমদানী হ’লে উচ্চ মূল্যের বিবেচনায় তিনি গমে অর্ধ ছা‘ ফিৎরা দিতে বলেন। কিন্তু ছাহাবী আবু সাঈদ খুদরীসহ অন্যান্য ছাহাবী মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর এই ইজতিহাদী সিদ্ধান্ত অমান্য করেন এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নির্দেশ ও প্রথম যুগের আমলের  উপরেই  কায়েম  থাকেন। ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, ‘যাঁরা অর্ধ ছা‘ গমের ফিৎরা দেন, তাঁরা মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর ‘রায়’-এর অনুসরণ করেন মাত্র’।[5]

ছাদাক্বা ব্যয়ের খাত সমূহ :

ইমাম কুরতুবী বলেন, কুরআনে ‘ছাদাক্বাহ’ শব্দটি মুৎলাক্ব বা এককভাবে এলে তার অর্থ হবে ফরয ছাদাক্বা।[6] পবিত্র কুরআনে সূরায়ে তওবা ৬০নং আয়াতে ফরয ছাদাক্বা সমূহ ব্যয়ের আটটি খাত বর্ণিত হয়েছে। যথা-

১. ফক্বীর : নিঃসম্বল ভিক্ষাপ্রার্থী, ২. মিসকীন : যে ব্যক্তি নিজের প্রয়োজন মিটাতেও পারে না, মুখ ফুটে চাইতেও পারে না। বাহ্যিকভাবে তাকে সচ্ছল বলেই মনে হয়, ৩. ‘আমেলীন : যাকাত আদায়ের জন্য নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ, ৪. ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট ব্যক্তিগণ। অমুসলিমদেরকে ইসলামে দাখিল করাবার জন্য এই খাতটি নির্দিষ্ট, ৫. দাসমুক্তির জন্য। এই খাত বর্তমানে শূন্য। তবে অনেকে অসহায় কয়েদী মুক্তিকে এই খাতের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করেছেন (কুরতুবী), ৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি : যার সম্পদের তুলনায় ঋণের অংক বেশী। কিন্তু যদি তার ঋণ থাকে ও সম্পদ না থাকে, এমতাবস্থায় সে ফক্বীর ও ঋণগ্রস্ত দু’টি খাতের হকদার হবে, ৭. ফী সাবীলিল্লাহ বা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা। খাতটি ব্যাপক। তবে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বা জিহাদের খাতই প্রধান। আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা দান ও বিজয়ী করার জন্য যেকোন ইসলামী পথে ব্যয় হবে, ৮. দুস্থ মুসাফির : পথিমধ্যে কোন কারণবশতঃ পাথেয় শূন্য হয়ে পড়লে পথিকগণ এই খাত হ’তে সাহায্য পাবেন। যদিও তিনি নিজ দেশে বা বাড়ীতে সম্পদশালী হন। ফিৎরা অন্যতম ফরয যাকাত হিসাবে তা উপরোক্ত খাত সমূহে বা ঐগুলির একাধিক খাতে ব্যয় করতে হবে। খাত বহির্ভূতভাবে কোন অমুসলিমকে ফিৎরা দেওয়া জায়েয নয়।[7]

বায়তুল মাল জমা করা সুন্নাত

ফিৎরা ঈদের এক বা দু’দিন পূর্বে বায়তুল মালে জমা করা সুন্নাত। ইবনু ওমর (রাঃ) অনুরূপভাবে জমা করতেন। ঈদুল ফিৎরের দু’তিন দিন পূর্বে খলীফার পক্ষ হ’তে ফিৎরা জমাকারীগণ ফিৎরা সংগ্রহের জন্য বসতেন ও লোকেরা তাঁর কাছে গিয়ে ফিৎরা জমা করত। ঈদের পরে হকদারগণের মধ্যে বণ্টন করা হ’ত।[8]

যাকাত-ওশর-ফিৎরা-কুরবানী ইত্যাদি ফরয ও নফল ছাদাক্বা  রাষ্ট্র  কিংবা  কোন বিশ্বস্ত ইসলামী সংস্থা-র নিকটে জমা করা, অতঃপর সেই সংস্থা-র মাধ্যমে বণ্টন করাই হ’ল বায়তুল মাল বণ্টনের সুন্নাতী তরীকা। ছাহাবায়ে কেরামের যুগে এ ব্যবস্থাই চালু ছিল। তাঁরা কখনোই নিজেদের যাকাত নিজেরা হাতে করে বণ্টন করতেন না। বরং যাকাত সংগ্রহকারীর নিকটে গিয়ে জমা দিয়ে আসতেন। এখনও সঊদী আরব, কুয়েত প্রভৃতি দেশে এ রেওয়াজ চালু আছে। কেননা নিজ হাতে নিজের যাকাত বণ্টন করার মধ্যে একাধিক মন্দ দিক নিহিত রয়েছে। যেমন- ১. এর দ্বারা সীমিত সংখ্যক লোক উপকৃত হয়। ২. স্বজনপ্রীতির আধিক্য হ’তে পারে। ৩. নিজের মধ্যে ‘রিয়া’ ও অহংকার সৃষ্টি হ’তে পারে। ফলে যাকাত কবুল না হওয়ার নিশ্চিত সম্ভাবনা দেখা দিবে। ৪. এর দ্বারা দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য বড় ধরনের কোন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। ৫. দেশের অন্যান্য এলাকার হকদারগণ মাহরূম হয়। ৬. যারা আসতে পারে, তারাই পায়। যারা চায় না বা আসতে পারে না, তারা বঞ্চিত হয়। ৭. একাধিক যাকাত দাতার নিকটে সমর্থ লোকেরা ভিড় করে এবং বেশী পেয়ে যায়। পক্ষান্তরে যারা দৌড়াতে অসমর্থ, তারা বঞ্চিত হয়।

পরিশেষে বলব, বাংলাদেশের ব্যাংক সমূহে মুসলমানদের সঞ্চিত হাযার হাযার কোটি টাকার বার্ষিক শতকরা আড়াই টাকা হারে যদি যাকাত নেওয়া হয় এবং দেশের মোট উৎপন্ন ফসলের ১/১০ বা ১/২০ অংশ ওশর হিসাবে আদায় করা হয়, অনুরূপভাবে এলাকার কুরবানী ও ফিৎরা সমূহ স্ব স্ব বায়তুল মালে জমা করে তা সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যয়-বণ্টন ও বিনিয়োগ করা হয়, তাহ’লে ইনশাআল্লাহ যাকাত ও ছাদাক্বাই হ’তে পারে বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনের স্থায়ী কর্মসূচী। আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দিন- আমীন!!



[1]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৭৭২ ‘যাকাত’ অধ্যায়।

[2]. ইসলামের যাকাত বিধান ১/২৫২ পৃঃ।

[3]. বিস্তারিত নিছাব দ্রঃ ‘বঙ্গানুবাদ খুৎবা’ অধ্যায় দেখুন।

[4]. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৮১৫ ও ১৮১৬।

[5]. ফাৎহুল বারী (কায়রো: ১৪০৭ হিঃ) ৩/৪৩৮ পৃঃ।

[6]. ঐ, তাফসীর ৪/১৬৮ পৃঃ।

[7]. ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৩৮৬; মির‘আৎ হা/১৮৩৩-এর ব্যাখ্যা, ১/২০৫-৬।

[8]. দ্রঃ বুখারী, ফাৎহুল বারী হা/১৫১১-এর আলোচনা, মির‘আৎ ১/২০৭ পৃঃ।

 

 

HTML Comment Box is loading comments...