প্রবন্ধ

ইয়াতীম প্রতিপালন

 -ড. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হোসাইন

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎকারীর পরিণতি :

ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎকারীর শাস্তি অত্যন্ত মর্মান্তিক। দুনিয়াতে ক্ষমতার দাপটে ইয়াতীমের সম্পদ গ্রাস করা সম্ভব হ’লেও পরকালে ঐ ব্যক্তির বাঁচার কোন উপায় থাকবে না। অন্যান্য পাপীদের ন্যায় সেও বাম হাতে আমলনামা পেয়ে সেদিন আফসোস করে বলতে থাকবে-

يَا لَيْتَنِي لَمْ أُوْتَ كِتَابِيَهْ. وَلَمْ أَدْرِ مَا حِسَابِيَهْ. يَا لَيْتَهَا كَانَتِ الْقَاضِيَةَ. مَا أَغْنَى عَنِّي مَالِيَهْ. هَلَكَ عَنِّي سُلْطَانِيَهْ.

‘হায়! আমাকে যদি আমার আমলনামা না দেওয়া হ’ত। আমি যদি আমার হিসাব কি তা না জানতাম! হায়! আমার মৃত্যুই যদি আমার শেষ হ’ত! (আজ) আমার ধন-সম্পদ আমার কোনই কাজে আসল না। আমার ক্ষমতা আজ ধ্বংস হয়ে গেছে’ (হা-ক্কাহ ৬৯/২৫-২৯)

ইয়াতীমের সম্পদ যেন আত্মসাৎ না হয় সেজন্য অতি সাবধান করতঃ ইয়াতীমের সম্পদের নিকটবর্তী হ’তেও মহান আল্লাহ তা‘আলা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন,

وَلاَ تَقْرَبُوْا مَالَ الْيَتِيْمِ إِلاَّ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ.

‘আর ইয়াতীমের বয়োঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্য ব্যতীত তার বিষয় সম্পত্তির কাছেও যেও না’ (আন‘আম ১৫২)। তিনি আরও বলেন, وَلاَ تَقْرَبُوْا مَالَ الْيَتِيْمِ إِلاَّ بِالَّتِيْ هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ وَأَوْفُوْا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُوْلاً. ‘আর ইয়াতীমের বয়োঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্য ব্যতীত তাদের বিষয় সম্পত্তির কাছেও যেও না এবং তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ কর। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে’ (বানী ইসরাঈল ১৭/৩৪)। আলোচ্য আয়াতদ্বয়ে ‘ইয়াতীমের সম্পদের কাছেও যেও না’ অর্থ ইয়াতীমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কর না। যেমনটি হযরত আদম ও হাওয়া (আঃ)-কে সৃষ্টির পর নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণে নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, وَلاَ تَقْرَبَا هَـذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُوْنَا مِنَ الْظَّالِمِيْنَ ‘তোমরা এই বৃক্ষের নিকটেও যেও না। (যদি যাও) তাহ’লে তোমরা যালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে’ (বাক্বারাহ ২/৩৫)। মূলতঃ ইয়াতীমের সম্পদের হেফাযত ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যাদের উপর অর্পিত হবে তাদেরকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে আয়াতদ্বয়ে একথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ কোনভাবেও যেন ইয়াতীমদের সম্পদ আত্মসাৎ করা না হয়। কেননা ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করার শাস্তি অত্যন্ত কঠোর। ইয়াতীমের মাল আত্মসাৎ করা অর্থ আগুন ভক্ষণ করা। আল্লাহ বলেন, إِنَّ الَّذِيْنَ يَأْكُلُوْنَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُوْنَ فِيْ بُطُوْنِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيْرًا. ‘নিশ্চয়ই যারা ইয়াতীমদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে, তারা তাদের উদরে অগ্নি ভর্তি করে এবং সত্বরই তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে’ (নিসা ৪/১০)। অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাছীর (রঃ) বলেন, إذَا أَكَلُوْا أَمْوَالَ الْيَتَامَى بِلاَ سَبَبٍ، فَإِنَّمَا يَأْكُلُوْنَ نَارًا تَأَجَّجَ  فِيْ بُطُوْنِهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ. ‘তারা যদি বিনা কারণে ইয়াতীমদের সম্পদ ভক্ষণ করে, তাহ’লে তারা আগুন ভক্ষণ করবে। ক্বিয়ামতের দিন তাদের পেটে যেই আগুন প্রজ্বলিত হবে’।[1]

একই মর্মার্থে পূর্বোক্ত ৬নং আয়াতে উল্লিখিত وَمَنْ كَانَ غَنِيًّا فَلْيَسْتَعْفِفْ وَمَنْ كَانَ فَقِيرًا فَلْيَأْكُلْ بِالْمَعْرُوفِ ‘যে অভাবমুক্ত সে নিবৃত্ত থাকবে এবং যে ব্যক্তি অভাবগ্রস্ত হবে সে সঙ্গত পরিমাণ ভোগ করবে’ (নিসা ৬) -এর ব্যাখ্যায় ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, যে ধনী হবে, যার নিজের খাওয়া-পরার জিনিস যথেষ্ট থাকবে, তার কর্তব্য হবে তাদের মাল হ’তে কিছুই গ্রহণ না করা। এমতাবস্থায় মৃত জন্তু এবং প্রবাহিত রক্তের ন্যায় এ মাল তাদের জন্য সম্পূর্ণরূপে হারাম। তবে অভিভাবক দরিদ্র হ’লে তাকে লালন-পালন করার পারিশ্রমিক হিসাবে সময়ের প্রয়োজনে ও দেশ প্রথা অনুযায়ী তার মাল হ’তে গ্রহণ করা তার জন্য বৈধ। এক্ষেত্রে সে নিজের প্রয়োজন দেখবে এবং পরিশ্রমও দেখবে। যদি প্রয়োজন পরিশ্রম অপেক্ষা কম হয় তবে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করবে। আর যদি পরিশ্রম প্রয়োজন অপেক্ষা কম হয় তবে পরিশ্রমের বিনিময় গ্রহণ করবে।[2]

ইয়াতীমের মাল আত্মসাৎ মানুষকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করে। হযরত আবুহুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

اِجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوْبِقَاتِ قَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللهِ وَمَا هُنَّ قَالَ الشِّرْكُ بِاللهِ وَالسِّحْرُ وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَكْلُ الرِّبَا وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيْمِ وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الزَّحْفِ وَقَذْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ الْغَافِلاَتِ.

‘তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় হ’তে বেঁচে থাক। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল সেগুলি কী? রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহর সাথে শিরক করা, যাদু করা, মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা, সূদ খাওয়া, ইয়াতীমের মাল আত্মসাৎ করা, যুদ্ধক্ষেত্র হ’তে পলায়ন করা ও মুমিন সতীসাধ্বী মহিলার উপর যেনার অপবাদ দেয়া’।[3] অতএব ধ্বংস থেকে রক্ষা ও জাহান্নামের মর্মন্তুদ শাস্তি থেকে মুক্তির স্বার্থে ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎ থেকে বেঁচে থাকতে হবে। পাশাপাশি জান্নাতে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথী হওয়ার দৃঢ় প্রত্যাশায় ইয়াতীম প্রতিপালনে এগিয়ে আসতে হবে।

ইয়াতীম প্রতিপালনের ধরন :

ইয়াতীমের তত্ত্বাবধায়ক হওয়া নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যের ব্যাপার ও অত্যন্ত মর্যাদাকর বিষয়। যিনি এই মহান দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন তিনি অবশ্যই ইনছাফপরায়ণ হবেন। আপন সন্তানের ন্যায় ইয়াতীমের সার্বিক বিষয় দেখভাল করবেন। কখনো আদর করে, মাথায় হাত বুলিয়ে সহানুভূতি প্রদর্শন করবেন, আবার অবাধ্যতায় কখনো শাসন করবেন। দাঊদ (আঃ) বলতেন, كُنْ لِلْيَتِيْمِ كَالْأَبِ الرَّحِيمِ ‘ইয়াতীমদের প্রতি দয়াবান পিতার ন্যায় হয়ে যাও’।[4] অর্থাৎ সন্তানের প্রতি পিতা যেমন রহমদিল তেমনি ইয়াতীমের প্রতিও রহমদিল হ’তে হবে। ইয়াতীম প্রতিপালনের ধরন কী হবে এ সম্পর্কে নিম্নে আলোকপাত করা হল।-

১. লালন-পালন ও শিষ্টাচার শিক্ষা দান : সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠা শিশুর জন্মগত অধিকার। কিন্তু শৈশবে পিতৃবিয়োগের কারণে এটি অনেকাংশেই বিঘ্নিত হয়। সঠিকভাবে খাওয়া-পরার অভাবে তার শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি যথাযথভাবে হয়ে ওঠে না। সেকারণ যিনি ইয়াতীমের দায়িত্বশীল হবেন তার উচিত হবে নিজ সন্তানের ন্যায় ইয়াতীম সন্তানের লালন-পালনেরও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। তার সঠিক পরিচর্যা করা, উপযুক্ত খাদ্য, প্রয়োজনীয় পোষাক-পরিচ্ছদ ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

পাশাপাশি শৈশব থেকেই তাকে শিষ্টাচার শিক্ষা দিতে হবে। আলী (রাঃ) বলেন,

 لَيْسَ الْيَتِيْمُ الَّذِىْ مَاتَ وَالِدُهُ * اِنَّ الْيَتِيْمَ يَتِيْمُ الْعِلْمِ وَالْأَدَبِ

‘যার পিতা মারা গেছে সে প্রকৃত ইয়াতীম বা অনাথ নয়। বরং জ্ঞান ও শিষ্টাচারে দৈন্য ব্যক্তিই প্রকৃত ইয়াতীম’।[5]

বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করা, সাক্ষাতে সালাম প্রদান করা, গৃহে প্রবেশ ও বের হওয়ার আদব, খাওয়া-পরার আদব, ঘুমানো ও ঘুম থেকে ওঠার আদব, ছালাতের নিয়ম ও প্রয়োজনীয় দো‘আ-কালাম প্রভৃতি দৈনন্দিন জীবনে চলার নিয়ম-পদ্ধতি শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ ইয়াতীমের তত্ত্বাবধায়কের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে ত্রুটি হ’লে জবাব প্রদানেও অক্ষম হ’তে হবে। কেননা প্রত্যেককেই সেদিন স্ব স্ব দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, أَلَا كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ ‘সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমরা প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে’।[6]

২. শিক্ষা-দীক্ষা : ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব ব্যাপক। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম অবতীর্ণ ৫টি আয়াতের প্রথম শব্দটিই হচ্ছে اِقْرَأْ ‘পড়’। আল্লাহ বলেন, اِقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ.  خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ.  اِقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ.  الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ. عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ. ‘পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তপিন্ড হ’তে। পড়! আর তোমার পালনকর্তা বড়ই দয়ালু। যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দান করেছেন’ (‘আলাক্ব ৯৬/১-৫)। আলোচ্য আয়াতে পড়াকে শর্তযুক্ত করে দেয়া হয়েছে আল্লাহর সাথে। অর্থাৎ এমন বিষয়ে পড়াশুনা করা আবশ্যক, যার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সম্বন্ধে সঠিক ইলম হাছিল হয়। পক্ষান্তরে যে ইলম মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, মানুষকে নাস্তিক বানায়, ঐ ইলম এখানে উদ্দেশ্য নয়। ঐ ইলম অর্জন থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন, قُلْ هَلْ يَسْتَوِْي الَّذِيْنَ يَعْلَمُوْنَ وَالَّذِيْنَ لاَ يَعْلَمُوْنَ ‘বলুন! যারা জ্ঞানী এবং যারা মূর্খ তারা কি সমান?’ (যুমার ৩৯/৯)। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيْضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ ‘প্রত্যেক মুসলমানের উপর ইলম অর্জন করা ফরয’।[7] অতএব সুন্দর জীবনের জন্য সুস্থ জ্ঞান হাছিল আবশ্যক। যার ভিত্তিমূল হচ্ছে পরিবার। মাতৃক্রোড়েই শিক্ষার শুভ সূচনা হয়। ছোট্ট শিশুটি মায়ের কাছেই দুই ঠোট নেড়ে অস্ফুট ভাষায় তার আবেদন প্রকাশের চেষ্টা করে। অতঃপর ক্রমান্বয়ে যত বড় হয় ততই নতুন কিছু শিখে। পিতা-মাতাই সন্তানের প্রথম শিক্ষক। সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলার জন্য পিতা-মাতার দায়িত্ব সর্বাগ্রগণ্য। কিন্তু পিতৃহীন বা পিতৃ-মাতৃহীন ইয়াতীম শিশুটি এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত। সেকারণ তার দায়-দায়িত্ব অর্পিত হবে যার তত্ত্বাবধানে সে বড় হবে তার উপর। পিতা-মাতার অবর্তমানে তিনিই ইয়াতীম শিশুটির শিক্ষার প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করবেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাকে ইলমে দ্বীন শিক্ষা দিবেন এবং তার একাডেমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করবেন। এভাবে একজন ইয়াতীমকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণের সর্বাত্মক চেষ্টা করা একজন ‘কাফীল’ বা তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব।

৩. ঈমান ও ছহীহ আক্বীদা শিক্ষা দান :

ইসলাম স্বভাবজাত ধর্ম বা দ্বীনে ফিতরাত। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, مَا مِنْ مَوْلُودٍ إِلاَّ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ، فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ- ‘প্রতিটি শিশুই ফিতরাত তথা ইসলাম গ্রহণের যোগ্যতাসহ জন্মগ্রহণ করে। তারপর তার পিতামাতা তাকে ইহুদী, খৃষ্টান বা অগ্নিপূজক বানায়’।[8] আলোচ্য হাদীছ থেকে বুঝা যায় যে, ঈমান, বিশুদ্ধ আক্বীদা ও সুন্দর চরিত্রে চরিত্রবান হওয়ার যোগ্যতা প্রতিটি শিশুর মধ্যেই বিদ্যমান আছে। যদি শিশুর পিতামাতা বা অভিভাবক এ ব্যাপারে যত্নবান হয় এবং পরিবেশ যদি অনুকূলে থাকে তবে শিশুর মধ্যে অনুপম চরিত্রের বিকাশ ঘটে। আর যদি পিতামাতা বা অভিভাবক এ বিষয়ে অবহেলা করে কিংবা পরিবেশ প্রতিকূলে থাকে, তবে শিশুর চরিত্র বিনষ্ট হয়ে যায়। সেকারণ পিতা-মাতা বা অভিভাবকের দায়িত্ব হচ্ছে সন্তানকে সদুপদেশের মাধ্যমে সঠিক পথের সন্ধান দেওয়া। তাকে আল্লাহর অস্তিত্বের কথা, তাঁর একত্ববাদের কথা এবং তাঁর উপর ঈমান আনার কথা বলা। চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্র, আসমান-যমীনের প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং এ সব কিছুর যে একজন স্রষ্টা আছেন তার কথা সন্তানদেরকে বুঝানো। অতঃপর পর্যায়ক্রমে নবী-রাসূল, ফিরিশতা, মৃত্যু, আখেরাত, জান্নাত ও জাহান্নাম সম্পর্কে অবহিত করা ও এসব বিষয়ে ঈমান আনতে বলা। পাশাপাশি শিরক ও বিদ‘আতের ভয়াবহতা তুলে ধরা এবং এসব থেকে বেঁচে থাকতে বলা। যেমনটি লোকমান তাঁর সন্তানকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন,

وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِاِبْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لاَ تُشْرِكْ بِاللهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيْمٌ- ... يَا بُنَيَّ إِنَّهَا إِنْ تَكُ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ فَتَكُنْ فِيْ صَخْرَةٍ أَوْ فِي السَّمَاوَاتِ أَوْ فِي الْأَرْضِ يَأْتِ بِهَا اللهُ إِنَّ اللهَ لَطِيْفٌ خَبِيْرٌ- يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلاَةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوْفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُوْرِ- وَلاَ تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلاَ تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللهَ لاَ يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُوْرٍ- وَاقْصِدْ فِيْ مَشْيِكَ وَاغْضُضْ مِنْ صَوْتِكَ إِنَّ أَنْكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيْرِ-

‘স্মরণ কর, যখন লোকমান উপদেশ দিতে গিয়ে তার পুত্রকে বলেছিল, হে বৎস! আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক কর না। নিশ্চয়ই শিরক মহা অন্যায়’। ‘হে বৎস! যদি তা (পুণ্য ও পাপ) সরিষার দানা পরিমাণও হয় এবং তা থাকে শিলাগর্ভে অথবা আকাশে কিংবা মৃত্তিকার নীচে, আল্লাহ তা উপস্থিত করবেন। আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবগত’। ‘হে বৎস! ছালাত কায়েম কর, সৎ কাজের আদেশ দাও, আর অসৎ কাজের নিষেধ কর এবং বিপদাপদে ধৈর্যধারণ কর। এটাই তো দৃঢ় সংকল্পের কাজ’। ‘অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা কর না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ কর না। নিশ্চয়ই আল্লাহ উদ্ধত, অহংকারীকে পসন্দ করেন না’। ‘(হে বৎস!) তুমি সংযতভাবে পদক্ষেপ ফেলবে এবং তোমার কণ্ঠস্বর নীচু করবে, নিশ্চয়ই গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর’ (লোক্বমান ৩১/১৩, ১৬-১৯)

ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, আমি একদিন নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিছনে বসা ছিলাম। এমন সময় তিনি আমাকে বললেন,

يَا غُلاَمُ إِنِّيْ أُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ اِحْفَظْ اللهَ يَحْفَظْكَ اِحْفَظِ اللهَ تَجِدْهُ تُجَاهَكَ إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللهَ وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللهِ وَاعْلَمْ أَنَّ الْأُمَّةَ لَوْ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوْكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوْكَ إِلاَّ بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ لَكَ وَلَوْ اجْتَمَعُوْا عَلَى أَنْ يَضُرُّوْكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوْكَ إِلاَّ بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ عَلَيْكَ رُفِعَتِ الْأَقْلاَمُ وَجَفَّتِ الصُّحُفُ-

‘হে বৎস! আমি তোমাকে কিছু কথা শিক্ষা দিব। তুমি আল্লাহর হুকুমের হেফাযত কর, আল্লাহ তোমাকে হেফাযত করবেন, আল্লাহর বিধানের হেফাযত কর, আল্লাহকে তোমার সামনে পাবে। যখন কিছু চাইবে একমাত্র আল্লাহর কাছেই চাইবে, আর যখন সাহায্য প্রার্থনা করবে কেবল আল্লাহর কাছেই করবে। জেনে রেখ, সমস্ত জাতি যদি তোমার উপকার করার জন্য একত্রিত হয় তাহ’লে এতটুকু উপকারই করতে পারবে, যা আল্লাহ লিখে রেখেছেন। আর যদি তারা তোমার কোন ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে একত্রিত হয় তাহ’লেও ততটুকু ক্ষতিই করতে পারবে, যা আল্লাহ লিখে রেখেছেন। কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে এবং কালি শুকিয়ে গেছে’।[9]

লোকমান কর্তৃক স্বীয় সন্তানকে প্রদত্ত ধারাবাহিক উপদেশ এবং আলোচ্য হাদীছে কিশোর ইবনে আববাসকে প্রদত্ত মহানবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপদেশ থেকে এ কথা দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার হয় যে, ঈমান ও ছহীহ আক্বীদা শিক্ষাদানের উপযুক্ত বয়স হচ্ছে শিশু-কিশোর বয়স। সেকারণ ইয়াতীমের দায়িত্বশীল ব্যক্তি এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তার অধীনস্থ ইয়াতীম সন্তানকে ঈমান ও বিশুদ্ধ আক্বীদা শিক্ষা দিবেন। শিরক বিমুক্ত খালেছ তাওহীদপন্থী ও বিদ‘আতমুক্ত প্রকৃত সুন্নাতপন্থী হিসাবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হবেন। তবেই তিনি নিজেকে একজন সফল ইয়াতীম প্রতিপালনকারী হিসাবে আত্মতৃপ্তি লাভে ধন্য হবেন।

৪. উপযুক্ত বয়সে বিবাহের ব্যবস্থা করা : ইয়াতীমের দায়িত্বশীলের এটিও অন্যতম দায়িত্ব যে, বিবাহের বয়স হ’লে তাদের বিবাহের ব্যবস্থা করা। শারঈ দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী পাত্র-পাত্রী নির্বাচন করে তাদের বিবাহের কার্য সুসম্পন্ন করা। কেননা বিবাহ মুসলিম জীবনের একটি অন্যতম অনুসঙ্গ। বিবাহের মাধ্যমে যেমন নিঃসঙ্গতা দূরীভূত হয়, চিন্তা প্রশমিত হয়, ঠিক তেমনি তাক্বওয়া বা পরহেযগারিতা বৃদ্ধি পায়। অশান্ত মনে প্রশান্তি ফিরে আসে। মহান আল্লাহ বলেন, وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوْا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً  ‘আর মহান আল্লাহর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই তোমাদের সঙ্গিনীদেরক সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের নিকট শান্তি পাও এবং তিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মধ্যে পরস্পরে ভালবাসা ও দয়া’ (রূম ৩০/২১)। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ، وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ، وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ ‘হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহ করতে সক্ষম তারা যেন বিবাহ করে। কারণ বিবাহ দৃষ্টি অবনত রাখতে ও গুপ্তাঙ্গের হেফাযতে অধিক কার্যকর। আর যে ব্যক্তি বিবাহ করতে অক্ষম সে যেন ছিয়াম রাখে। কেননা ছিয়াম যৌনচাহিদাকে অবদমিত রাখে’।[10]

উপসংহার :

বাহ্যত ইয়াতীমরা সমাজে মর্যাদাহীন। তাদের পিতৃহীনতা যেন তাদের অপরাধ। অথচ বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বিশ্বনবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন ইয়াতীম। তিনিই ইয়াতীমদের বিশ্বময় নেতা। সুতরাং ইয়াতীম ও অসহায়দের অবজ্ঞা-অবহেলার চোখে দেখার কোনই অবকাশ নেই। আর এ অবহেলা কেবলমাত্র তাদের পক্ষেই সম্ভব যারা অবিশ্বাসী ও মিথ্যারোপকারী। আল্লাহ বলেন, أَرَأَيْتَ الَّذِيْ يُكَذِّبُ بِالدِّيْن فَذَلِكَ الَّذِيْ يَدُعُّ الْيَتِيمَ  وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِيْنِ-  ‘তুমি কি দেখেছ তাকে, যে বিচার দিবসে মিথ্যারোপ করে? সে হ’ল ঐ ব্যক্তি, যে ইয়াতীমকে গলাধাক্কা দেয় এবং অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দানে উৎসাহিত করে না’ (মা‘ঊন ১০৭/১-৩)। সুতরাং ইয়াতীমদের গলাধাক্কা নয়, বরং তাদের যথাযথ প্রতিপালনে এগিয়ে আসতে হবে। যা পবিত্র কুরআনের বহু আয়াত ও একাধিক ছহীহ হাদীছ দ্বারা নির্দেশিত। ইয়াতীম প্রতিপালন করা জান্নাতী লোকদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। জান্নাতে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জিত হয় ইয়াতীম প্রতিপালনের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে হৃদয় কোমল হয়, রিযিক প্রশস্ত হয় এবং রহমত ও বরকত নাযিল হয়।  সুতরাং এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ ও নেকীর কাজে মুমিন মাত্রেরই এগিয়ে আসা উচিত। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন- আমীন!!


[1]. মুখতাছার তাফসীরে ইবনে কাছীর (বৈরুতঃ দারুল কুরআনিল কারীম, ৭ম সংস্করণ ১৪০০ হিঃ/১৯৮১ খৃঃ), ১ম খন্ড, পৃঃ ৩৬১

[2]. তাফসীর ইবনে কাছীর, বঙ্গানুবাদ: ড. মুহাম্মাদ মুজীবুর রহমান (ঢাকা: তাফসীর পাবলিকেশন্স কমিটি, ৮ম সংস্করণ, সেপ্টেম্বর ২০০৮), ৪র্থ-৭ম খন্ড, পৃঃ ২৮৮

[3]. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫২ ‘ঈমান’ অধ্যায়

[4]. বায়হাকী, শু‘আবুল ঈমান হা/১০৫২৮; ছহীহ আদাবুল মুফরাদ, তাহক্বীক্ব আলবানী হা/১০৩, সনদ ছহীহ

[5]. জামীউ দাওয়াবীনিশ শি‘রিল আরাবী ১০/১৭০।

[6]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৮৫

[7]. বায়হাক্বী, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/২১৮ সনদ হাসান

[8]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৯০

[9]. আহমাদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/৫৩০২, সনদ ছহীহ

[10]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩০৮০

HTML Comment Box is loading comments...