প্রশ্নোত্তর

দারুল ইফতা

হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

প্রশ্ন (১/২৪১) :  রাসূল (ছাঃ)-এর কবর কারা খুঁড়েছিলেন?

-রায়হান ইউসুফ ছিয়াম,বগুড়া।

উত্তর : ছাহাবী আবু ত্বালহা আনছারী (রাঃ)-এর নেতৃত্বে একদল ছাহাবী তাঁর জন্য ‘লাহাদ’ কবর খনন করেন (আহমাদ হা/৩৯, ১২৪৩৮; ইবনু মাজাহ হা/১৫৫৭, আল-বিদায়াহ ৫/২৬৭)

প্রশ্ন (২/২৪২) : সদ্য ভূমিষ্ট শিশুর ডান কানে আযান ও বাম কানে ইক্বামত শুনাতে হবে কি? না কেবল আযান শুনালেই যথেষ্ট হবে?

-আশরাফ আলী, হুগলী, ভারত।

উত্তর : সদ্য ভুমিষ্ট সন্তানের ডান কানে আযান ও বাম কানে ইক্বামত শুনানোর হাদীছটি মওযূ‘ বা জাল (মুসনাদে আবী ইয়া‘লা, সিলসিলা যঈফাহ হা/৩২১)। এক্ষণে ‘কেবল আযান দেওয়া’ সম্পর্কিত হাদীছটি শায়খ আলবানী (রহঃ) ইতিপূর্বে ‘হাসান’ (আবুদাঊদ হা/৫১০৫, ইরওয়া হা/১১৭৩) হিসাবে গণ্য করলেও পরবর্তীতে তিনি এটিকে ‘যঈফ’ হিসাবে উল্লেখ করে বলেন, আমি ইতিপূর্বে আবু রাফে‘ বর্ণিত এ হাদীছটি ‘হাসান’ বললেও এখন আমার নিকটে বর্ণনাটি যঈফ হিসাবে স্পষ্ট হয়েছে (সিলসিলা যঈফাহ হা/৬১২১)। তিনি বলেন, ...অতএব আমি সদ্য ভূমিষ্ট সন্তানের কানে আযান দেওয়ার বিধান সম্পর্কে আমার পূর্ববর্তী বক্তব্য থেকে ফিরে আসলাম (আলবানী, সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, অডিও ক্লিপ নং ৬২৩)। এ ব্যাপারে অপর মুহাক্কিক শু‘আইব আরনাউত্বও ঐক্যমত পোষণ করেছেন (তাহকীক মুসনাদে আহমাদ হা/২৭২৩০)। অতএব ‘যঈফ’ হিসাবে প্রমাণিত হওয়ার পর আযান দেওয়ার বিষয়টি আর আমলযোগ্য থাকে না।

সংশোধনী : ইতিপূর্বে মাসিক আত-তাহরীকের বিভিন্ন সংখ্যার প্রশ্নোত্তর কলামে (এপ্রিল ২০০০ (১/১৮১), জুন’০৩ (১০/৩১৫), মার্চ’০৫ (২/২০২) উক্ত হাদীছের ভিত্তিতে আযান দেওয়ার বিষয়টি জায়েয হিসাবে বলা হয়েছিল। এক্ষণে তা যঈফ হিসাবে প্রমাণিত হওয়ায় আমরা পূর্বের ফৎওয়া থেকে ফিরে আসছি। অতএব এ থেকে বিরত থাকাই কর্তব্য হবে।

প্রশ্ন (৩/২৪৩) : অনেক মসজিদে দেখা যায় মিহরাবের দু’পাশে বা ভিতরে কা‘বা শরীফ অথবা মসজিদে নববীর মিনারের ছবি লাগানো থাকে। এটা শরী‘আতসম্মত কি?

-রশীদুল ইসলাম, চট্টগ্রাম।

উত্তর : এটা শরী‘আতসম্মত নয়। মসজিদে কোনরূপ সাজ-সজ্জা ও জাঁকজমক না করা এবং মুছল্লীর দৃষ্টি কেড়ে নিতে পারে এরূপ যাবতীয় বস্ত্ত মসজিদ থেকে সরিয়ে ফেলা আবশ্যক (বুখারী হা/৫৯৫৯; মিশকাত হা/৭৫৮, ৭৫৭; আবুদাঊদ, নাসাঈ, মিশকাত হা/৭১৮-১৯)

 

অনেকে কেবল ভক্তি-ভালোবাসা দেখানোর উদ্দেশ্যে ক্বিবলার দিকে কা‘বা ও মাসজিদুল হারাম অথবা মসজিদে নববীর মিনারের ছবি ব্যবহার করে থাকেন এবং এমন আকুতি পেশ করে থাকেন যেন স্বয়ং কা‘বাই পূজনীয়। অথচ ক্বিবলা নির্দেশক এবং আল্লাহর ঘর হওয়া ব্যতীত কা‘বার নিজস্ব কোন মর্যাদা নেই। আল্লাহর সামনে সিজদা করার জন্য আল্লাহর নির্দেশেই মুসলমান কা‘বাগৃহের অভিমুখী হয়। অতএব পূজার বস্ত্তর ন্যায় ক্বিবলার দিকে কা‘বার ছবি রাখা গর্হিত কাজ। 

প্রশ্ন (৪/২৪৪) : জুম‘আর ছালাতের পর ছয় রাক‘আত সুন্নাত আদায়ের বিষয়টি কি ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত?

-যার্রাফ যারীফ, হারাগাছ, রংপুর।

উত্তর : জুম‘আর ছালাতের পর দুই, চার বা ছয় রাক‘আত সুন্নাত ছালাত আদায় করা যায়। রাসূল (ছাঃ) জুম‘আর ছালাতের পরে তাঁর বাড়িতে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করতেন (আবুদাউদ হা/১১৩২)। তিনি বলেন, তোমাদের কেউ যখন জুম‘আর ছালাত আদায় করবে তখন সে যেন তার পরে চার রাক‘আত ছালাত আদায় করে (মুসলিম হা/৮৮১; মিশকাত হা/১১৬৬)। ছয় রাক‘আতের সমর্থনে আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) ও আলী (রাঃ)-এর আমল পাওয়া যায়। তারা জুম‘আর ছালাতের পর প্রথমে দু’রাক‘আত, এরপর চার রাক‘আত আদায় করতেন এবং আদায়ের নির্দেশ দিতেন (তিরমিযী হা/৫২৩; মিশকাত হা/১১৮৭)। অতএব জুম‘আর পর দুই, চার ও ছয় রাক‘আত সুন্নাত ছালাত রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত।

প্রশ্ন (৫/২৪৫) : জনৈক ব্যক্তি বলেন, একজন আহলেহাদীছ ফাসেক একজন শিরক-বিদ‘আতে লিপ্ত আবেদের চেয়ে বহুগুণ উত্তম। এ বক্তব্যের সত্যতা জানতে চাই।

-চঞ্চল মাষ্টার*

ক্ষেতলাল, জয়পুরহাট।

           *[আরবীতে ইসলামী নাম রাখুন (স.স.)]

উত্তর : উক্ত বক্তব্যটি যথার্থ। কারণ একজন আহলেহাদীছ ফাসেক যত বড় গুনাহেই লিপ্ত হৌক না কেন সাধারণতঃ সে শিরক-বিদ‘আতে লিপ্ত হয় না। আর শিরক একটি অমার্জনীয় পাপ। যা থাকলে তার জন্য আল্লাহ জান্নাতকে হারাম করে দেন (মায়েদাহ ৫/৭২)। আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা শিরক ব্যতীত অন্য সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন (নিসা ৪/৪৮, ১১৬)। হাদীছে কুদসীতে আল্লাহ বলেন, হে আদম সন্তান! তুমি যদি আমার নিকট ক্ষমার আশা রাখো এবং ক্ষমা চাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব। ... তুমি যদি পৃথিবী পরিমাণ গুনাহ নিয়ে আমার নিকটে উপস্থিত হও এবং আমার সাথে কাউকে শরীক না করে আমার সামনে আস, তাহ’লে আমি পৃথিবী পরিমাণ ক্ষমা নিয়ে তোমার কাছে উপস্থিত হব’ (তিরমিযী হা/৩৫৪০; মিশকাত হা/২৩৩৬)

রাসূল (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে নতুন কিছু সৃষ্টি করবে, তা প্রত্যাখ্যাত (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৪০)। তিনি বলেন, ইসলামে প্রত্যেক নবোদ্ভূত বস্ত্ত হ’ল বিদ‘আত, আর প্রত্যেক বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণাম হ’ল জাহান্নাম’ (নাসাঈ হা/১৫৭৮)।  

বিদ‘আতী কিয়ামতের দিন হাউয কাওছারের পানি পাবে না। কেননা রাসূল (ছাঃ) তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলবেন, দূর হও! দূর হও! যে ব্যক্তি আমার পরে আমার দ্বীনকে পরিবর্তন করেছ’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫৫৭১)। অথচ অন্যান্য বড় পাপে জড়িত মুসলিমরা রাসূল (ছাঃ)-এর শাফা‘আতের অন্তর্ভুক্ত হবে (আবুদাউদ হা/৪৭৩৯; তিরমিযী হা/২৪৩৫, ইবনু মাজাহ হা/৪৩১০)। জেনে-শুনে বিদ‘আতকারীর কোন আমল গ্রহণযোগ্য হবে না যতক্ষণ না সে তওবা করে ফিরে আসে’ (বুখারী হা/৩১৭২; মুসলিম হা/১৩১৭; মিশকাত হা/২৭২৮, ত্বাবারাণী, ছহীহ আত-তারগীব হা/৫৪)

প্রশ্ন (৬/২৪৬) : খেলাধুলার সামগ্রী যেমন ব্যাট, ফুটবল, লাটিম ইত্যাদি বিক্রয়ের দোকান করায় শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

-গোলাম রববানী,

ভোলাহাট, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।

উত্তর : নির্দোষ বিনোদন ও খেলাধুলার জন্য এসবের ব্যবহার ও ক্রয়-বিক্রয়ে কোন বাধা নেই। যদিও ব্যবহারকারীর মন্দ ব্যবহারের জন্য কখনো কখনো এসব খেলা হারামের পর্যায়ে চলে যায়। তবে তার জন্য ব্যবহারকারী দায়ী হবে, উক্ত সামগ্রী নয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির কাজে পরস্পরকে সাহায্য কর এবং পাপ ও সীমা লংঘনের কাজে একে অপরকে সাহায্য করো না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠোর শাস্তি দানকারী’ (মায়েদাহ ৫/২)

প্রশ্ন (৭/২৪৭) : ওযায়ের কি নবী ছিলেন? নবী না হলে তিনি কোন নবীর আমলে দুনিয়ায় ছিলেন? এছাড়া কওমে তুববা‘ কোন নবীর কওম? বিস্তারিত জানতে চাই।

-আব্দুল ওয়ারেছ, মান্দা, নওগাঁ।

উত্তর : এ বিষয়ে কেবল এতটুকু জানা যায় যে, ওযায়ের এবং তুববা‘ উভয়েই সৎ ব্যক্তি ছিলেন এবং তুববা দ্বীনে ইবরাহীমের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, আমি জানি না তুববা‘ মাল‘উন (অভিশপ্ত কাফের) ছিল কি না? আমি আরো জানি না যে, ওযায়ের নবী ছিলেন কি না? (আবুদাউদ হা/৪৬৭৪)। তিনি বলেন, তোমরা তুববা‘ কে গালি দিয়ো না। কারণ তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন’ (সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৪২৩)। অর্থাৎ ইবরাহীমের দ্বীন কবুল করেছিলেন। আল্লাহ বলেন, জঙ্গলবাসীরা ও তুববার কওম সবাই রাসূলদের মিথ্যা বলেছিল’ (ক্বাফ ৫০/১৪)। ক্বাতাদাহ বলেন, এখানে আল্লাহ তুববার সম্প্রদায়কে মিথ্যারোপকারী বলেছেন, তুববাকে নয় (ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা ক্বাফ ১৪ আয়াত)

প্রশ্ন (৮/২৪৮) : বিভিন্ন সভা-সম্মেলনের শুরুতে কুরআন তেলাওয়াত করা কি বিদ‘আত? রাসূল (ছাঃ)-এর যুগে এরূপভাবে যেকোন অনুষ্ঠান শুরু হ’ত বলে প্রমাণ পাওয়া যায় কি?

-ডা. মোশাররফ হোসাইন

ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ, নওদাপাড়া, রাজশাহী।

উত্তর : কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে কোন সভা-সম্মেলন শুরু করায় কোন বাধা নেই। তবে সর্বপ্রথম হামদ ও ছানা পাঠ করতে হবে (আহমাদ হা/১৫২৬, ছহীহাহ হা/১৬৯)

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, أصحاب النبي صلى الله عليه و سلم إذا جلسوا كان حديثهم يعني الفقه إلا أن يقرأ رجل سورة أو يأمر رجلا بقراءة سورة ‘ছাহাবায়ে কেরাম যখন কোন আলোচনা তথা ফিক্বহী আলোচনার মজলিসে বসতেন তখন তাদের মধ্যে একজন কোন সূরা পাঠ করতেন অথবা একজনকে কুরআনের কোন একটি সূরা পাঠ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হ’ত (হাকেম হা/৩২২, যাহাবী, সনদ ছহীহ, বায়হাক্বী, আল-মাদখাল হা/৩১৩; ইবনু সা‘দ ২/৩৭৪)

খতীব বাগদাদী, ইবনুছ ছালাহ, ইবনু কাছীর, ইমাম নববী, সৈয়ূতী সহ অনেক ওলামায়ে সালাফ যেকোন মজলিস শুরুর পূর্বে হামদ ও ছানাসহ কুরআন তেলাওয়াতকে মুস্তাহাব বলে আখ্যায়িত করেছেন (খতীব বাগদাদী, আল-জামে‘ ২/৬৮; মুক্বাদ্দামা ইবনুছ ছালাহ ২২৪ পৃঃ, ইবনু কাছীর, আল-বা‘এছুল হাছীছ ১৫৩ পৃঃ, সৈয়ূতী তাদরীবুর রাবী ২/৫৭৩)।

শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেন, কুরআনের কিছু অংশ তেলাওয়াত করার মাধ্যমে মজলিস শুরু করার বিষয়টি সালাফে ছালেহীনের আমল দ্বারা প্রমাণিত (আলবানী, সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, অডিও ক্লিপ নং ৪০২)

কোন কোন আলেম এভাবে তেলাওয়াত করার বিষয়টি দলীল বিহীন আখ্যায়িত করেছেন (ওছায়মীন, আল-বিদঊ ওয়াল মুহদাছাত ৫৪০ পৃঃ)। কেউ কেউ এটাকে বিদ‘আত বলে ১৩৪২ হিজরীর পূর্বে এর অস্তিত্ব ছিল না বলেছেন (শায়খ বকর আবু যায়েদ, তাছহীহুদ দো‘আ ৯৮ পৃঃ, ফাতাওয়া আব্দুর রাযযাক আফীফী ২২১ পৃঃ)। যা আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বর্ণিত উপরোক্ত আছারটি দ্বারা ভুল প্রমাণিত হয়।

প্রশ্ন (৯/২৪৯) : আমাদের মসজিদের কিছু মুছল্লী মাঝে মাঝে ছালাতের পর বাড়ি ও দোকানে গিয়ে গিয়ে ছহীহ দ্বীনের দাওয়াত প্রদান করেন। যা তাবলীগ জামা‘আতে ভাইদের আমলের সাথে মিলে যায়। এক্ষণে এটি জায়েয হবে কি?

মুর্তাযা, টাঙ্গাইল।

উত্তর : বিশুদ্ধ আক্বীদা ও আমলের দাওয়াত মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়ায় জন্য এরূপ পন্থা অবলম্বন করায় শরী‘আতে কোন বাধা নেই। তা তাবলীগ জামা‘আতের সাথে বা অন্য কোন বাতিল দলের ভাল কাজের সাথে মিলে গেলেও তাতে কোন অসুবিধা নেই। তবে দাঈকে স্থান-কাল-পাত্র বুঝে প্রজ্ঞার সাথে দাওয়াত দিতে হবে। সেই সাথে যে বিষয়ে দাওয়াত দিবেন সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকা আবশ্যক। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি হিকমত (কুরআন ও সুন্নাহ) ও উত্তম নছীহতের সাথে আল্লাহর পথে দাওয়াত দাও এবং তাদের সাথে বিতর্ক করো উত্তম পন্থায়’ (নাহল ১৬/১২৫)। তিনি বলেন, ‘বলুন! এটাই আমার পথ। আমি ও আমার অনুসারীগণ ডাকি আল্লাহর দিকে, জাগ্রত জ্ঞান সহকারে। আল্লাহ পবিত্র এবং আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই’ (ইউসুফ ১২/১০৮)

প্রশ্ন (১০/২৫০) : জামা‘আত চলাকালীন সময়ে পিছনের কাতারে একাকী হয়ে গেলে সামনের কাতার থেকে কাউকে টেনে আনতে হবে কি?

-হান্নান সরকার

ফুলবাড়িয়া, ময়মনসিংহ।

উত্তর : এমতাবস্থায় পিছনে একাকী দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করবেন। সামনের কাতার থেকে টেনে নেওয়া মর্মে বর্ণিত হাদীছটি অত্যন্ত যঈফ (ত্বাবরাণী আওসাত্ব হা/৭৭৬৪;মাজমা‘উয যাওয়ায়েদ হা/২৫৩৭; যঈফাহ হা/ ৯২১-৯২২;)। আর সামনের কাতার থেকে টেনে নিলে সে ব্যক্তি কাতারকে বিচ্ছিন্নকারী হিসেবে গণ্য হয়ে আল্লাহর রহমত থেকেও বিচ্ছিন্ন হবে (আবুদাউদ হা/৬৬৬; মিশকাত হা/১১০২)। তাছাড়া সামনের কাতার থেকে মুছল্লীকে পেছনে টেনে আনলে কাতারে শূন্যতা সৃষ্টি হয় (ফাতাওয়া উছায়মীন ১৩/৩৮)

উল্লেখ্য যে, একাকী পেছনের কাতারে দাঁড়িয়ে ছালাত হবে না মর্মে যে হাদীছ রয়েছে (আবুদাউদ হা/৬৮২; তিরমিযী হা/২৩১; মিশকাত হা/১১০৫) তা তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন সামনের কাতার অপূর্ণ থাকবে । অতএব এরূপ অবস্থায় মুছল্লী কাতারে একাকীই দাঁড়াবে এবং তার ছালাত হয়ে যাবে। কিন্তু সামনের কাতারে জায়গা থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ একাকী পেছনের কাতারে ছালাত আদায় করে, তাহ’লে তার ছালাত হবে না (ইরওয়া হা/৫৪১-এর আলোচনা দ্রঃ, ২/৩২৯)

প্রশ্ন (১১/২৫১) : ফরয ছালাতের পর নিয়মিত ১টি হাদীছ শুনাতে গেলে মাসবূক ব্যক্তিদের ছালাতে বিঘ্ন ঘটে। অন্যদিকে দেরী করলে মুছল্লীরা চলে যায়। এক্ষণে মাসবূক ছালাতরত অবস্থায় মুছল্লীদের উদ্দেশ্যে কথা বলার ব্যাপারে শরী‘আতের বিধান কি?

-আব্দুল আলীম, মান্দা, নওগাঁ।

উত্তর : মাসবূকের ছালাত শেষ হওয়ার পর হাদীছ শুনানোই উত্তম। কোন কারণে বিশেষভাবে ব্যস্ত না হ’লে ঈমানদার শ্রোতা কখনোই হাদীছ না শুনে উঠে যাবে না।

প্রশ্ন (১২/২৫২) : সূরা আর রহমানে দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচল বলতে কি বুঝানো হয়েছে?

-আলমগীর হোসাইন, ফকিরাপুল, ঢাকা।

উত্তর : এর দ্বারা গ্রীষ্মকাল ও শীতকালে পৃথক দু’টি করে উদয়াচল ও অস্তাচল বুঝানো হয়েছে। অন্য আয়াতে ‘বহু পূর্বের ও পশ্চিমের রব’ (মা‘আরেজ ৭০/৪০) বলা হয়েছে। এর দ্বারা সূর্যের সদা পরিবর্তনশীল উদয়াচল ও অস্তাচলের কথা বলা হয়েছে। কেননা সূর্য নিজের কক্ষপথে সদা সন্তরণশীল (ইয়াসীন ৩৬/৩৮)। যা আল্লাহর হুকুমে বান্দার কল্যাণে সর্বদা নিয়োজিত। এর মধ্যে সৌর বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ উৎস বর্ণিত হয়েছে।

প্রশ্ন (১৩/২৫৩) : জনৈক ব্যক্তি কারু নিকট থেকে অর্থ ঋণ গ্রহণ করলে ফেরত দেওয়ার সময় কিছু বেশী প্রদান করেন। এরূপ দেওয়া বা নেওয়া শরী‘আতসম্মত হবে কি?

-তৌফীকুল ইসলাম, চট্টগ্রাম।

উত্তর : ঋণ গ্রহণকারী ঋণ পরিশোধের সময় কোন পূর্বশর্ত ছাড়াই স্বেচ্ছায় যদি কিছু বেশী প্রদান করে, তবে তা দেওয়া এবং গ্রহণ করা জায়েয। জাবের (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে আগমন করলাম। এমতাবস্থায় তিনি মসজিদে ছিলেন....। তিনি আমাকে আমার পাওনা পরিশোধ করলেন এবং কিছু বেশী দিলেন (বুখারী হা/২৩০৫, মুসলিম হা/১৬০১)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, জনৈক ব্যক্তি উট ঋণ নিয়ে পরবর্তীতে পরিশোধের সময় তার চেয়ে দামী উট ব্যতীত তার নিকটে ছিল না। অতঃপর সে রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, সেটা দ্বারাই ঋণ পরিশোধ কর। তোমাদের মধ্যে উত্তম ঐ ব্যক্তি যে উত্তমভাবে ঋণ পরিশোধ করে (বুখারী হা/২৩৯০; মুসলিম হা/১৬০১; মিশকাত হা/২৯০৬)। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, ঋণ গ্রহীতা স্বেচ্ছায় কিছু বেশী দিলে দিতে পারে এবং গ্রহীতাও তা নিতে পারে। তবে এক্ষেত্রে গ্রহীতা যদি বেশী পাওয়ার সুপ্ত কামনাও রাখে, তাহলে তা সূদে পরিণত হবে (বায়হাক্বী, ইরওয়াউল গালীল হা/১৩৯৬, সনদ মওকূফ ছহীহ)

প্রশ্ন (১৪/২৫৪) : রোগমুক্তি বা পরীক্ষায় ভালো করার আশায় কুরআন তেলাওয়াত, দান-ছাদাক্বা, ছিয়াম ইত্যাদি পালন করা যাবে কি?

-হুমায়ূন, শিবগঞ্জ, সিলেট।

উত্তর : এতে শরী‘আতে কোন বাধা নেই। এগুলোর সাথে সাথে আল্লাহর কাছে তাওফীক কামনা করে দো‘আ করবে।  নেক আমল মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে (তিরমিযী হা/২১; মিশকাত হা/২২৩৩; ছহীহাহ হা/১৫৪)। ছাদাক্বাকে চিকিৎসার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা যায় (ছহীহুল জামে‘ হা/৩৩৫৮) তবে এ ক্ষেত্রে মানত করা ঠিক নয়। কারণ মানত কৃপণতা থেকে বের করা ছাড়া তাকদীরের কোন কিছু প্রতিহত করতে পারে না (বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত হা/৩৪২৬; আবুদাউদ হা/৩২৮৭)। তবে কেউ মানত মানলে যদি তা আল্লাহর নাফারমানীর ক্ষেত্রে না হয় তাহলে পূর্ণ করা ওয়াজিব। পূর্ণ না করলে তাকে কসম ভঙ্গের কাফফারা দিতে হবে (তিরমিযী হা/১৫২৪, ১৫২৫; নাসাঈ হা/৩৮৩৪; আবুদাউদ হা/৩২৯০;মিশকাত হা/৩৪২৮, ৩৪৩৫)

প্রশ্ন (১৫/২৫৫) : বাসায় স্ত্রীর কাজকর্মে সহায়তার জন্য কাজের মেয়ে রাখার ব্যাপারে শরী‘আতের বিধান কি? সঊদী আরবে সরকারীভাবে খাদেমা নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এভাবে মাহরাম বিহীন সেখানে অবস্থান করা শরী‘আতসম্মত হবে কি?

মীযানুর রহমান

বড়পেটা, আসাম, ভারত।

উত্তর : বাসার কাজের জন্য কাজের মেয়ে রাখতে শরী‘আতে বাধা নেই। তবে শর্ত হচ্ছে বালেগা হ’লে বাড়ীর পুরুষ সদস্যদের তার সামনে পূর্ণরূপে পর্দা করতে হবে এবং মনিবের সাথে তার স্ত্রী কিংবা মা-বোন কাউকে থাকতে হবে। কারণ পর-পুরুষের সাথে গায়ের মাহরাম নারীর একাকী হওয়া নিষিদ্ধ’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৫১৩; তিরমিযী হা/২১৬৫)। সঊদীআরবে বা অন্যান্য দেশে সরকারীভাবে  যেসব গৃহকর্মী পাঠানো হচ্ছে তা চরম অন্যায়। কারণ প্রথমতঃ মাহরাম ছাড়া এরূপ বিদেশ ভ্রমণ নারীদের জন্য হারাম’ (বুখারী হা/১৮৬২ ;মুসলিম হা/১৩৩৮, মিশকাত হা/২৫১৩)। দ্বিতীয়তঃ স্বামী-সন্তানের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে বিদেশে অবস্থান করা নারী জাতির প্রকৃতি ও দায়িত্বের বিরোধী। কারণ নিজ গৃহে অবস্থান করা ও ঘর-সংসার করাই তার প্রধানতম কর্তব্য (আহযাব ৩৩/৩৩)। তৃতীয়তঃ বিদেশে নারীর ইযযতের কোন নিশ্চয়তা নেই। অতএব প্রত্যেক নারীর জন্য এ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

প্রশ্ন (১৬/২৫৬) : নবী-রাসূল, ছাহাবায়ে কেরাম বা অন্য কোন মানুষের নামের পূর্বে হযরত, জনাব ইত্যাদি শব্দটি ব্যবহার করায় শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

-মবীনুল ইসলাম

উপশহর, রাজশাহী।

উত্তর : حضرة ‘হযরত’ আরবী শব্দ, পুংলিঙ্গ। অর্থ নৈকট্য, নেতা, জনাব, সম্মানসূচক উপাধি। جناب ‘জনাব’ আরবী শব্দ, উভয় লিঙ্গ। অর্থ সম্মানিত ব্যক্তি, আশ্রয়স্থল ইত্যাদি (ফীরোযুল লুগাত (উর্দূ)। সম্মানিত ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য তাঁদের নামের শুরুতে ‘হযরত’, ‘জনাব’ ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়। যেমন, হযরতুল উস্তায/আদ-দাকতূর, হযরতুল মুহতারাম ইত্যাদি’ (মু‘জামুল লুগাতিল আরাবিইয়াহ আল-মু‘আছারাহ ১/৪০১, ৫১৪)। আরবী ভাষায় ‘হযরত’ শব্দের ব্যবহার বহূ পূর্ব থেকেই চালু আছে। যেমন ইমাম যাহাবী, হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) প্রমুখ বিদ্বানগণ সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্বোধনের ক্ষেত্রে এ শব্দ ব্যবহার করেছেন (সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ১০/৫৫২, আল-বিদায়াহ ১৩/২৬১)

বস্ত্ততঃ প্রত্যেক দেশের প্রচলিত সর্বোচ্চ সম্মানসূচক শব্দ রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরামের নামের পূর্বে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন আরব দেশে উপনাম দিয়ে ডাকাকে সম্মানসূচক মনে করা হ’ত। যেমন, আবুল ক্বাসেম, আবু হুরায়রা, আবু হাফছ ইত্যাদি। বর্তমানে সেখানে শায়খ, সাইয়েদ, বহুবচনে সাদাত, সাইয়েদাত ইত্যাদি বলা হয়। এছাড়া ইংরেজীতে ইয়োর অনার, হিজ ম্যাজেস্টী, ইয়োর এক্সেলেন্সী এবং জাপানে ‘সান’, ‘সামা’, ‘চ্যান’ ইত্যাদি। একইভাবে উপমহাদেশে জনাব, হযরত, হুযুর, মাওলানা ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা হয়।

আল্লাহ পরস্পরকে মন্দ লকবে ডাকতে নিষেধ করেছেন (হুজুরাত ৪৯/১১)। অতএব প্রচলিত উত্তম লকব সমূহে আহবান করায় কোন দোষ নেই।

তবে যদি কেউ এর দ্বারা মন্দ অর্থ গ্রহণ করেন, সেজন্য তিনি দায়ী হবেন। যেমন, মদীনায় মুসলমানরা রাসূল (ছাঃ)-কে ‘রা‘এনা’ বলতেন (বাক্বারাহ ২/১০৪)। কিন্তু ইহূদীরা সেটা বলত গালি অর্থে। মুসলমানরা ‘রব’ বলতে আল্লাহকে বুঝেন, কিন্তু ফেরাঊন ‘রব’ বলতে নিজেকে বুঝিয়েছিল (নাযে‘আত ২৪)। কুরআনে আল্লাহকে ‘মাওলানা’ (আমাদের প্রভু) বলা হয়েছে (বাক্বারাহ ২/২৮৬, তওবা ৯/৫১)। কিন্তু বান্দার ক্ষেত্রেও ‘মাওলা’ বন্ধু বা গোলাম বা অভিভাবক অর্থে ব্যবহৃত হয়। ‘মৌলবী’ অর্থ দুনিয়াত্যাগী, বড় আলেম ইত্যাদি’ (আল-মু‘জামুল ওয়াসীত্ব)

উপমহাদেশে সম্মানসূচক সম্বোধন হিসাবে ‘মাওলানা’ (আমাদের অভিভাবক) বলা হয়ে থাকে (ফীরোযুল লুগাত)। ‘শরীফ’ অর্থ সর্বোচ্চ সম্মানিত। সে অর্থে কুরআন শরীফ, কা‘বা শরীফ ইত্যাদি বলা হয়ে থাকে। এক্ষণে যদি কেউ শিরকের আড্ডাখানা কোন কবরকে ‘শরীফ’ বলেন, তার জন্য তিনি দায়ী হবেন। কিন্তু সেজন্য কুরআন শরীফ বলা যাবে না, এমনটি নয়। একইভাবে জনাব, হুযুর, মাওলানা, হযরত ইত্যাদি শব্দ সম্মানসূচক অর্থে ব্যবহার করায় কোন দোষ নেই।

প্রশ্ন (১৭/২৫৭) : অন্যের গাছের নীচে পড়ে থাকা ফল অনুমতি না নিয়ে কুড়িয়ে খাওয়া যাবে কি?

-গোলাম রববানী,

ভোলাহাট, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।

উত্তরঃ অনুমতি নিয়ে খাওয়া যাবে। অনুমতি দেওয়ার মতো কাউকে না পেলে, ক্ষুধা নিবৃত্ত হওয়া পর্যন্ত উক্ত ফল খাওয়া যাবে। কিন্তু বহন করে নিয়ে যাওয়া যাবে না। সামুরা বিন জুনদুব (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, তোমাদের কেউ যখন কোন ছাগপালের নিকট আসবে (তখন দুধ পানের উদ্দেশ্যে) তার মনিবের অনুমতি নিবে। যদি সেখানে কেউ না থাকে, তাহ’লে তিনবার আওয়ায দিবে। অতঃপর উত্তর পেলে তার নিকট থেকে অনুমতি নিবে। আর যদি কেউ  উত্তর না দেয়, তাহলে দুধ দোহন করবে ও পান করবে। কিন্তু বহন করে নিয়ে যাবে না’ (আবুদাঊদ হা/২৬১৯; মিশকাত হা/২৯৫৩)। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, ক্ষুধার্ত ব্যক্তি ক্ষুধা নিবারণের জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু খেতে পারবে। 

প্রশ্ন (১৮/২৫৮) : গোসলখানা ও টয়লেট একত্রে থাকলে সেখানে ওযূ করায় শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

-আশরাফুল ইসলাম

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাযীপুর।

উত্তর : গোসলখানা ও টয়লেট একত্রে থাকলেও যদি ওযূ করার স্থানে অপবিত্র বস্ত্ত ছড়িয়ে না থাকে, তাহ’লে সেখানে ওযূ করায় শরী‘আতে কোন বাধা নেই (ফাতওয়া লাজনা-দায়েমাহ ৫/৮৫; মাজমূ‘ ফাতাওয়া উছায়মীন ১২/৩৬৯)

প্রশ্ন (১৯/২৫৯) : জনৈক ইমাম ছালাতের সময় কারো টাখনুর নীচে কাপড় দেখলে পুনরায় ওযূ করে আসতে বলেন। এটা কি ছহীহ হাদীছ সম্মত?

-আব্দুল কাদের, পীরগাছা, রংপুর।

উত্তর : এ মর্মে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ। বর্ণনাটি হ’ল- আত্বা ইবনু ইয়াসির (রাঃ) জনৈক ছাহাবী হ’তে বর্ণনা করেন যে, একদা এক ব্যক্তি টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে ছালাত আদায় করছিল। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে বললেন, যাও ওযূ কর। তাই সে গেল এবং ওযূ করে আসল। তখন অপর এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আপনি তাকে কেন ওযূ করতে বললেন? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘যে ব্যক্তি টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে ছালাত আদায় করে, আল্লাহ তার ছালাত কবুল করেন না (আবুদাঊদ হা/৪০৮৬, আহমাদ হা/২৩২৬৫, মিশকাত হা/৭৬১, সনদ যঈফ)। হাদীছটি যঈফ হওয়ার কারণে ইমাম ছাহেবের এরূপ নির্দেশ দেওয়া থেকে বিরত থাকা কর্তব্য। বরং তিনি ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী এ সম্পর্কে সতর্ক করবেন যে, ছালাত ও ছলাতের বাইরে কোন অবস্থাতেই টাখনুর নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরা যাবে না। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘টাখনুর নীচে কাপড়ের যতটুকু যাবে, ততটুকু জাহান্নামে পুড়বে’ (বুখারী, মিশকাত হা/৪৩১৪)

প্রশ্ন (২০/২৬০) : যেখানে রাসূল (ছাঃ) অমুসলিম দেশে কুরআন নিয়ে গমন করতে নিষেধ করেছেন সেখানে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ইতালিয়ানদেরকে কুরআনের অনূদিত কপি উপহার দেওয়া যাবে কি?

-সাইফুল ইসলাম

বলোনিয়া, ইতালী।

উত্তর : কুরআনের অনূদিত কপি ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে অমুসলিমদের উপহার দেওয়া যাবে। অমুসলিমদের জন্য কুরআন শ্রবণ, কুরআনের তাফসীর বা অনুবাদ সহ কুরআন স্পর্শ করে পড়ায় কোন বাধা নেই (মাজমূ‘ ফাতাওয়া বিন বায ২৪/৩৪০)। রাসূল (ছাঃ) কুরআনের আয়াত সম্বলিত পত্র অমুসলিম শাসকদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে পাঠিয়েছেন’ (বুখারী হা/০৭, ১৯; মুসলিম হা/১৭৭৩; মিশকাত হা/৩৯২৬)। তবে আরবী মূল মুছহাফ তাদেরকে দেওয়া যাবেনা। কেননা তা স্পর্শ করা মুশরিকদের জন্য জায়েয নয় (ওয়াক্বি‘আহ ৫৬/৭৯; ত্বাবারাণী, ছহীহুল জামে‘ হা/৭৭৮০)

প্রশ্ন (২১/২৬১) : ত্বক ফর্সা করার জন্য ছেলেরা বিভিন্ন ধরনের স্নো, ক্রীম ইত্যাদি প্রসাধনী ব্যবহার করতে পারবে কি?

-আব্দুল্লাহ

ধূনট, বগুড়া।

উত্তর :  মানুষের ত্বক আল্লাহর সৃষ্টি এবং প্রকৃতিগত বিষয়, যা ফর্সা বা কালো করার ক্ষমতা মানুষের নেই। এ বিষয়ে যেসব প্রচারণা চালানো হয় সেগুলো পুঁজিবাদী ব্যবসায়ীদের অপপ্রচার মাত্র। এগুলো করতে গিয়ে অনেকে ত্বকের নানা রোগের শিকার হয়। এমনকি এর ফলে ত্বকের ক্যানসারও হ’তে পারে। তবে দেহকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর। তিনি সৌন্দর্যকে পসন্দ করেন’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৫১০৮ ‘ক্রোধ ও গর্ব’ অনুচ্ছেদ)

প্রশ্ন (২২/২৬২) : জনৈক আলেম বলেন, ছালাতের সালাম ফিরানোর পর আল্লাহু আকবার বলা যাবে না। বরং আসতাগফিরুল্লাহ বলতে হবে। একথা ঠিক কি?

-রায়হান

খয়রাবাদ, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।

উত্তর : উক্ত কথা সঠিক নয়। বরং সালাম ফিরানোর পরে একবার সরবে ‘আল্লাহু আকবার’ এবং তিনবার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলাই ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত (বুখারী ফাৎহসহ হা/৮৪১-৪২; মুসলিম হা/৫৮৩; মিশকাত হা/৯৫৯)

প্রশ্ন (২৩/২৬৩) : কোন মুসলিম ব্যক্তির মাঝে কুফরী, মুনাফেকী ও শিরকী কার্যক্রম দেখতে পেলে তাকে কাফের, মুনাফিক বা মুশরিক নামে ডাকা যাবে কি?

-তালীম হোসাইন প্রধান

পাটগ্রাম, লালমণিরহাট।

উত্তর : কোন মুসলিমের মধ্যে এরূপ দেখতে পেলে তাকে মুশরিক বা কাফের বলে ডাকা যাবে না। আল্লাহ বলেন,  তোমরা কাউকে মন্দ লকবে ডেকো না’... (হুজুরাত ৪৯/১১)। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ক্বাতাদাহ বলেন, এর অর্থ হ’ল, কাউকে হে মুনাফিক, হে ফাসেক ইত্যাদি বলে ডাকা যাবে না’ (বায়হাক্বী শু‘আব হা/৬৭৪৮, কুরতুবী, তাফসীর হুজুরাত ১১ আয়াত)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, যাকে কাফের বলা হবে সে সত্যিকারে কাফের না হ’লে যে কাফের বলল তার দিকেই সেটা ফিরে আসবে (মুসলিম হা/৬০; বুখারী হা/৬১০৩)। তিনি বলেন, কোন ব্যক্তি কর্তৃক তার (মুসলিম) ভাইকে কাফের বলাটা তাকে হত্যা করার মত অপরাধ (বুখারী হা/৬০৪৭; মিশকাত হা/৩৪১০)। তবে কাউকে এরূপ কাজ করতে দেখলে, তোমার এ কাজটি কুফরী পর্যায়ভুক্ত বা তোমার মধ্যে মুনাফিকের এই আলামতটা দেখা যাচ্ছে এরূপ বলা যেতে পারে।

প্রশ্ন (২৪/২৬৪) : হিসাব বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশুনা শেষে সূদী কারবারের কারণে ব্যাংকে চাকুরী করতে পারছে না। এক্ষণে হিসাব বিভাগের সাথে জড়িত শরী‘আত অনুমোদিত কোন কোন ক্ষেত্রে চাকুরী করা যেতে পারে?

-ওমর বিন হুসাইন

বগুড়া সেনানিবাস, বগুড়া।

উত্তর: ইসলামী নীতির বিরোধী নয় এরূপ দেশী-বিদেশী যেকোন প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করতে পারেন। ব্যাংক, বীমা এবং যেসব এনজিও সমাজ সেবার আড়ালে ক্ষুদ্র ঋণের নামে সূদী কারবার, ধর্মান্তরকরণ, নারীর পর্দাহীনতা, একসন্তান নীতি প্রভৃতি ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ডে ভুমিকা রাখছে, সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে থাকা আবশ্যক। কেননা গুনাহের কাজে সহায়তা করা নিষিদ্ধ (মায়েদাহ ৫/২)

প্রশ্ন (২৫/২৬৫) : রাসূল (ছাঃ)-এর শরীর থেকে নির্গত ঘাম সংরক্ষণ করে জনৈক ছাহাবী তার কবরে নাজাতের জন্য কাফনের কাপড়ে লাগিয়ে দিতে বলেছিলেন মর্মে বক্তব্যটির কোন সত্যতা আছে কি?

-হাসনা হেনা

পাঁচদোনা, নরসিংদী।

উত্তর : কথাটি ভিত্তিহীন। রাসূল (ছাঃ)-এর শরীরের ঘামের মাধ্যমে নাজাত নয় বরং নাজাতের জন্য প্রয়োজন তাঁর আনুগত্য এবং সেমতে তাঁর আদেশ ও নিষেধ সমূহ মেনে চলা। রাসূল (ছাঃ)-এর শরীর থেকে যে ঘাম নির্গত হ’ত তা ছিল সবচেয়ে সুগন্ধিময়’ (মুসলিম হা/২৩৩১)। সেকারণ রাসূল (ছাঃ)-এর খালা উম্মে সুলায়েম (রাঃ) একবার তাঁর ঘাম সুগন্ধি এবং বরকত হিসাবে নিয়েছিলেন (মুসলিম হা/২৩৩১, মিশকাত হা/৫৭৮৮)। এছাড়া অন্য কোন ছাহাবী এরূপ করেছিলেন বলে জানা যায় না।

প্রশ্ন (২৬/২৬৬) : মামা বা চাচা মারা গেলে অথবা মামী বা চাচীকে তালাক দিলে ঐ মামী বা চাচীকে তার ভাগ্নে বা ভাতিজা বিবাহ করতে পারবে কি?

-রেযওয়ান

জামগড়া, বাইপাইল, ঢাকা।

উত্তর : পারবে। কেননা মামী বা চাচী ভাগ্নে বা ভাতিজার জন্য মুহাররামাতের অন্তর্ভুক্ত নয়। অর্থাৎ যে ১৪ জন মহিলাকে বিবাহ করা হারাম, তাদের অন্তর্ভুক্ত নয় (নিসা ৪/২৩)। 

প্রশ্ন (২৭/২৬৭) : যেসব বিবাহে যৌতুক আদান-প্রদান হয়, সেসব বিবাহ অনুষ্ঠানে যাওয়া যাবে কি?

-তারেক আযীয

রহনপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : এধরনের দাওয়াতে অংশ গ্রহণ না করাই উত্তম। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে বলেন, ‘ঐসব লোকদের পরিত্যাগ কর যারা তাদের ধর্মকে খেল-তামাশারূপে গ্রহণ করেছে এবং পার্থিব জীবন যাদেরকে ধোঁকায় ফেলেছে (আন‘আম ৬/৭০)। তবে এতে যেন পারস্পরিক সম্পর্ক বিনষ্ট না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ দাওয়াতের ব্যাপারটি মুসলমানদের পারস্পরিক হক-এর অন্তর্ভুক্ত (নাসাঈ হা/১৯৩৮; মিশকাত হা/৪৬৩০)। তাছাড়া এর ফলে উপদেশ প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে যেসব বিবাহ অনুষ্ঠানে গান-বাজনা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলা-মেশা ইত্যাদি প্রকাশ্য শরী‘আত বিরোধী কর্মকান্ড হয়, যার কারণে দাওয়াতপ্রাপ্তদের গুনাহ হয়, সেসব অনুষ্ঠান পরিত্যাগ করতে হবে (আবুদাঊদ হা/৪৯২৪)। যদিও তাতে সম্পর্ক বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে (মুসলিম হা/১৮৪০; মিশকাত হা/৩৬৯৬)

প্রশ্ন (২৮/২৬৮) : ইসলামী বা সাধারণ ব্যাংক, বিকাশ, এ.টি.এম কার্ড এর মাধ্যমে টাকা-পয়সা লেনদেন করায় সার্ভিস চার্জ দিতে হয়। এক্ষণে এতে কোন বাধা আছে কি?

-মুস্তানতাছির বিল্লাহ

হোসেনীগঞ্জ, রাজশাহী।

উত্তর : এখানে আদান-প্রদানের সার্ভিস চার্জ হিসাবে অতিরিক্ত কিছু অর্থ দিতে হয়। অতএব লেনদেনের উদ্দেশ্যে এসব মাধ্যম ব্যবহারে কোন বাধা নেই।

প্রশ্ন (২৯/২৬৯) : কা‘বাগৃহের কসম খাওয়া যাবে কি?

-ইবরাহীম

কাচারী রোড, দিনাজপুর।

উত্তর : কা‘বাগৃহের কসম খাওয়া নিষিদ্ধ। ইবনু ওমর (রাঃ) জনৈক ব্যক্তিকে কা‘বার কসম খেতে শুনে বললেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে কসম করল সে শিরক করল (আবুদাঊদ হা/৩২৫১ সনদ ছহীহ)। বরং কা‘বার রবের তথা আল্লাহর কসম করতে হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, তোমাদের কেউ যখন কসম করার ইচ্ছা করে সে যেন বলে, কা‘বার রবের কসম (নাসাঈ হা/৩৭৭৩)তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের পিতাদের নামে কসম খেতে নিষেধ করেছেন। অতএব যে কসম খেতে চায়, সে যেন আল্লাহর নামে কসম খায় অথবা চুপ থাকে’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৪০)

প্রশ্ন (৩০/২৭০) : মূসা (আঃ)-এর লাঠি কি তার নিজস্ব ব্যবহৃত লাঠি ছিল? না আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছিল?

-সুফিয়া খাতুন

পাঁচদোনা মোড়, নরসিংদী।

উত্তর : মূসা (আঃ)-এর লাঠি তাঁর নিজস্ব ব্যবহৃত লাঠি ছিল। মহান রাববুল আলামীন উক্ত লাঠির মাধ্যমেই তাঁর ‘মু‘জিযা’ প্রকাশ করান (শাওকানী, ফাৎহুল ক্বাদীর ৩/৩৬১)। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘হে মূসা! তোমার ডান হাতে ওটা কি?’ ‘মূসা বললেন, এটা আমার লাঠি। এর উপরে আমি ভর দেই এবং এর দ্বারা আমার ছাগপালের জন্য গাছের পাতা ঝেড়ে নামাই। তাছাড়া এর দ্বারা আমার অন্যান্য কাজও চলে’। ‘আল্লাহ বললেন, তুমি ওটা ফেলে দাও’। ‘অতঃপর তিনি ওটা (মাটিতে) ফেলে দিতেই তা সাপ হয়ে ছুটাছুটি করতে লাগল’। ‘আল্লাহ বললেন, তুমি ওটাকে ধর, ভয় করো না, আমি এখুনি ওকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেব’ (ত্বোয়াহা ২০/১৭-২১)

প্রশ্ন (৩১/২৭১) : অসুস্থ বা মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার সন্তানেরা ক্বাযা ছিয়াম আদায় করতে পারবে কি?

-নাসরীন সুলতানা

কসবা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

উত্তর : এ বিষয়ে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি মারা গেল এমতাবস্থায় যে, তার উপর রামাযান মাসের ছিয়ামের ক্বাযা রয়েছে, তার পক্ষ থেকে প্রতি ছিয়ামের বদলে প্রতিদিন একজন করে মিসকীন খাওয়াবে’ (তিরমিযী হা/৭১৮; মিশকাত হা/২০৩৪; মারফূ হিসাবে সনদ যঈফ। তবে মওকূফ হিসাবে ছহীহ)

জনৈক ব্যক্তি মারা গেল। যার উপরে রামাযানের অথবা মানতের ছিয়ামের ক্বাযা ছিল। এক্ষণে তার পক্ষে উক্ত ছিয়াম আদায় করতে হবে কি-না এরূপ এক প্রশ্নের উত্তরে ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, কেউ কারু পক্ষে ছিয়াম পালন করবে না এবং কেউ কারু পক্ষে ছালাত আদায় করবে না। বরং তোমরা তার পরিত্যক্ত মাল থেকে তার পক্ষে ছিয়ামের বদলে ছাদাক্বা দাও প্রতিদিনের জন্য একজন করে মিসকীন। যার পরিমাণ হ’ল এক মুদ করে গম (বায়হাক্বী ৪/২৫৪, সনদ ছহীহ)। এক মুদ হ’ল সিকি ছা‘ (ইরওয়া হা/১৩৯, ১/১৭০২)। ইবনু আববাস (রাঃ) বর্ণিত অপর বর্ণনায় এসেছে, উত্তরাধিকারীরা ছাদাক্বা দিতে পারেন কিংবা ছিয়ামও আদায় করতে পারেন (বায়হাক্বী ৪/২৫৪)

প্রশ্ন (৩২/২৭২) : স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী নাকফুল, কানের দুল, রঙিন শাড়ী ইত্যাদি খুলে ফেলে। এগুলি করা শরী‘আত সম্মত কি?

-মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহ

কামারখন্দ, সিরাজগঞ্জ।

উত্তর : এগুলি কুসংস্কার মাত্র। ইদ্দত কালে তথা চার মাস দশ দিন স্ত্রী স্বামীর বাড়ীতে অবস্থান করবে। একান্ত যরূরী প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হবে না। রঙ্গিন বা অধিক সৌন্দর্য প্রকাশক কোন পোষাক পরিধান করবে না। অলঙ্কার ব্যবহার করবে না। বিশেষ কারণ ব্যতীত সুগন্ধি, সুরমা, মেহেদীও ব্যবহার করবে না (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৩৩১; আবুদাঊদ, নাসাঈ, মিশকাত হা/৩৩৩২-৩৪)। মৃত্যুর সাথে সাথে স্ত্রীর নাকফুল, কানের দুল, পরিহিত শাড়ী খুলে রাখার রেওয়াজ বাড়াবাড়ি বৈ কিছুই নয়। অন্যদিকে সদ্য বিধবা স্ত্রীকে নতুন শাড়ী উপহার দেওয়াও কুসংস্কার মাত্র।

প্রশ্ন (৩৩/২৭৩) : কোন মহিলা বা পুরুষ লোক মৃত্যুবরণ করার পর কোন কোন পুরুষ বা কোন কোন নারী তাকে দেখতে পারবে?

-আব্দুল্লাহ আল-মামূন

চন্ডিপুর, যশোর।

উত্তর : জীবিত অবস্থায় যাদের দেখা জায়েয মৃত্যুর পরেও তাদের দেখা জাযেয। মূলত মানুষ মারা গেলে একজন মুসলমানের জন্য যরূরী হ’ল তার জানাযায় অংশগ্রহণ করা, তাকে দেখা নয় (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৬৪৩০)। প্রচলিত আছে যে, স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামী-স্ত্রীর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। যার কোন ভিত্তি নেই। এগুলি কুসংস্কার মাত্র।

প্রশ্ন (৩৪/২৭৪) : কবরের শাস্তি কমানোর জন্য কবরের উপর খেজুরের ডাল পুতে দেওয়া যাবে কি?

-আব্দুল জাববার,

কলারোয়া, সাতক্ষীরা।

উত্তর : পোতা যাবে না। যারা এরূপ করে থাকেন তারা একটি হাদীছের অনুসরণে এরূপ করে থাকেন। যেমন নবী করীম (ছাঃ) একদিন দু‘টি কবরের শাস্তি জানতে পেরে একখানা খেজুরের ডাল দুই টুকরা করে দু’টি কবরে গেড়ে দেন। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এরূপ করলেন কেন? তিনি বললেন, হয়ত ডাল দু’টি শুকানো পর্যন্ত তাদের শাস্তি হালকা হয়ে থাকবে’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩৩৮)। কিন্তু তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ তাদের শাস্তি হালকা হয়েছিল রাসূল (ছাঃ)-এর বিশেষ সুপারিশের জন্য। কাঁচা ডালের জন্য নয়। যা ছহীহ মুসলিমে জাবের (রাঃ) বর্ণিত হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। কাজেই খেজুরের কাঁচা ডাল বা অন্য কোন কাঁচা ডাল গেড়ে কবরের শাস্তি হালকা হবে বলে ধারণা করা একেবারেই ভ্রান্ত। কেননা যদি বিষয়টি তাই-ই হ’ত তহ’লে তিনি ডালটি চিরে ফেলতেন না। কেননা তাতে তো ডালটি দ্রুত শুকিয়ে যাবার কথা। আসল কারণ ছিল ঐ কবর দু’টিকে ঐ ডাল দ্বারা চিহ্নিত করা যে, তিনি তাদের জন্য সুপারিশ করেছেন (আলবানী, মিশকাত ১/১১০ পৃঃ; দ্রঃ ছালাতুর রাসূল ২৪২ পৃঃ)। 

প্রশ্ন (৩৫/২৭৫) : স্বামী স্ত্রীকে মোহরানা পরিশোধ না করে থাকলে সন্তান কি পিতার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করে দিতে পারবে?

-তাসলিমা আক্তার জুলি

নাচোল, মুরাদপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : স্বামীর জন্য ফরয কর্তব্য হ’ল মোহর পরিশোধ করা (নিসা ৪, মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩১৪৩)। জীবিত অবস্থায় মোহর পরিশোধ না করলে মৃত্যুর পর তার পরিত্যক্ত সম্পদ হতে মোহর পরিশোধ করে তারপর বাকী অংশ ওয়ারিছদের মাঝে বণ্টন করতে হবে। আর সম্পদ না থাকলে সন্তান বা অন্য যে কেউ তা পরিশোধ করতে পারে (বুখারী, মিশকাত হা/২৯০৯; আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৩২০৮)

প্রশ্ন (৩৬/২৭৬) : ছালাত বিশুদ্ধভাবে আদায়ের জন্য পৃথক মসজিদ নির্মাণ করায় এলাকাবাসী উক্ত মসজিদকে যেরার মসজিদ বলে আখ্যায়িত করছে। এক্ষণে আমাদের করণীয় কি? কি কি কারণে কোন মসজিদকে যেরার মসজিদ হিসাবে গণ্য করা যায়?

-রবীউল ইসলাম

বেড়া, পাবনা।

উত্তর : কোন মসজিদে ছহীহ তরীকায় ছালাত আদায়ে বাধাপ্রাপ্ত হ’লে পৃথক মসজিদ নির্মাণ করা যাবে। তবে সাধ্যপক্ষে  একত্রে ছালাত আদায় করাই উত্তম হবে। কারণ ইমামের সুন্নাত বিরোধী আমলের জন্য তিনিই দায়ী হবেন, মুছল্লীরা নয়। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ইমামগণ তোমাদের ছালাত আদায় করান। যদি তারা সঠিকভাবে আদায় করান, তাহ’লে সকলের জন্য নেকী। পক্ষান্তরে যদি বেঠিকভাবে আদায় করান, তাহ’লে তোমাদের জন্য নেকী ও তাদের জন্য পাপ (বুখারী হা/৬৯৪, মিশকাত হা/১১৩৩)

একই সমাজে পরস্পরের মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে যদি নতুন মসজিদ তৈরি করা হয় এবং যার দ্বারা মুমিন সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি ও ক্ষতি করা উদ্দেশ্য হয়, তাহ’লে উক্ত মসজিদকে ‘মসজিদে যেরার’ বা ‘ক্ষতিকর মসজিদ’ বলা হয়। এরূপ মসজিদ তৈরির ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য থাকে না এবং তা তাক্বওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত হয় না (কুরতুবী, তাফসীর সূরা তওবা ১০৭ আয়াত; আলবানী, আছ-ছামরুল মুসতাত্বাব, পৃঃ ৩৯৮)

প্রশ্ন (৩৭/২৭৭) : জনৈক আলেম বলেন, জুম‘আর খুৎবা চলা অবস্থায় সুন্নাত ছালাত আদায় করা হারাম। এ বক্তব্য কি সঠিক?

-শামসুযযামান

রহনপুর, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।

উত্তর: বক্তব্যটি ভিত্তিহীন ও ছহীহ হাদীছের বিরোধী। রাসূল ( ছাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করবে সে যেন বসার পূর্বে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করে’ (বুখারী হা/৪৪৪; মুসলিম হা/৭১৪; মিশকাত হা/৭০৪)। একদা রাসূল (ছাঃ)-এর জুম‘আর খুৎবা দিচ্ছিলেন। এমন সময় সুলাইক গাতফানী নামক জনৈক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করে সুন্নাত না পড়েই বসে পড়েন। রাসূল (ছাঃ) তাকে বললেন, হে সুলাইক! দাড়াও এবং দু’রাক‘আত ছালাত পড়ে বস। অতঃপর তিনি বললেন, তোমাদের কেউ যখন ইমামের খুৎবারত অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করবে, তখন সে যেন সংক্ষিপ্তভাবে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় ব্যতীত না বসে। (মুসলিম হা/৮৭৫; মিশকাত হা/১৪১১)

প্রশ্ন (৩৮/২৭৮) : আমি দর্জির কাজ করি। মেয়েরা আমার নিকট থেকে টাইটফিট পোশাক তৈরী করে নেয়। এ জন্য কি আমি দায়ী হব?

-উজ্জ্বল মিয়াঁ

নবাবগঞ্জ, দিনাজপুর।

*[আরবীতে ইসলামী নাম রাখুন (স.স.)]

উত্তর : নগ্নতা প্রকাশক ও যৌন উদ্দীপক যেকোন পোষাক পরিধান করা হারাম (মুসলিম হা/২১২৮; মিশকাত হা/৩৫২৪)। একইভাবে তা তৈরী করাও হারাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তোমরা সৎ ও তাক্বওয়ার কাজে পরস্পরকে সাহায্য কর আর গুনাহ ও সীমালংঘনের কাজে সহযোগিতা করো না (মায়েদাহ ৫/০২)। মেয়েদের টাইটফিট পোশাক তৈরী করে দেওয়া অন্যায় কাজে সহযোগিতার শামিল। অতএব এসব হ’তে বিরত থাকতে হবে।

প্রশ্ন (৩৯/২৭৯) : আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ গ্রন্থে তাবূক যুদ্ধের ময়দানে রাসূল (ছাঃ)-এর সে সারগর্ভ ভাষণ সংকলিত হয়েছে, তা ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত কি?

-রেযওয়ানুল ইসলাম

তাহেরপুর, রাজশাহী।

উত্তর : তাবূকের ময়দানে সমবেত সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য রাসূল (ছাঃ) যে সংক্ষিপ্ত ও সারগর্ভ ভাষণ প্রদান করেছিলেন তা বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে (ইবনুল ক্বাইয়িম, যাদুল মা‘আদ ৩/৪৭৩-৭৪; ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ৫/১৩-১৪; মুবারকপুরী, আর-রাহীক্ব ৪৩৫ পৃঃ)। কিন্তু এর সনদ ছহীহ নয়। ভাষণটি সম্পর্কে ইবনু কাছীর বলেন, হাদীছটি ‘গরীব’। এর মধ্যে অপ্রাসঙ্গিক (نكارة) কথা রয়েছে এবং এর সনদে দুর্বলতা রয়েছে’ (আল-বিদায়াহ ৫/১৪)। আলবানী বলেন, এর সনদ ‘যঈফ’ (সিলসিলা যঈফাহ হা/২০৫৯)। আরনাঊত্ব বলেন, এর সনদ ‘অতীব দুর্বল’ (যাদুল মা‘আদ ৩/৪৭৪- টীকা)

সনদের বিশুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বক্তব্যগুলি বিভিন্ন ‘ছহীহ’ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। আকরাম যিয়া উমারী বলেন, তাবূকের এই দীর্ঘ ভাষণটি বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত নয়। যদিও এর বক্তব্যগুলি বিভিন্ন হাদীছ থেকে গৃহীত। যার কিছু ‘ছহীহ’ কিছু ‘হাসান’ (সীরাহ ছহীহাহ ২/৫৩৪, বিস্তারিত দ্রঃ ‘সীরাতুর রাসূল (ছাঃ)’, ৫৪২-৫৪৫ পৃঃ)

প্রশ্ন (৪০/২৮০) : ‘মুরসাল’ হাদীছ শরী‘আতের দলীল হিসাবে গ্রহণযোগ্য কি?

-ওমর ফারূক

রিয়াদ, সঊদী আরব।

উত্তর : যে হাদীছ কোন তাবেঈ মধ্যবর্তী রাবীর নাম না করে সরাসরি রাসূল (ছাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তাকে ‘মুরসাল’ হাদীছ বলে। ‘মুরসাল’ হাদীছ যঈফ হাদীছের শ্রেণীভূক্ত। এ জন্য জমহূর মুহাদ্দেছীনের নিকটে মুরসাল হাদীছ সাধারণভাবে দলীল হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয় (তাদরীবুর রাবী ১/১৯৮)

তবে শর্তসাপেক্ষে ‘মুরসাল’ হাদীছ গ্রহণযোগ্য হতে পারে। যেমন ইমাম শাফেঈ সহ অপরাপর ইমামগণ উল্লেখ করেছেন- ১. রাবী উঁচু স্তরের তাবেঈ হওয়া। ২. রাবী যে রাবীর কাছ থেকে ‘ইরসাল’টি করেছেন তাঁকে ‘ছিক্বাহ’ বা বিশ্বস্ত বলে উল্লেখ করা। ৩. বিশ্বস্ত অন্য কোন রাবী’র বিরোধিতা না থাকা এবং ৪. নিম্নোক্ত চারটি শর্তের যে কোন একটি থাকা- যেমন  (ক) অন্য কোন মুসনাদ সূত্রে বর্ণিত হওয়া। (খ) অপর কোন মুরসাল সূত্রে বর্ণিত হওয়া। (গ) ছাহাবীর কওল দ্বারা সমর্থিত হওয়া। অথবা (ঘ) অধিকাংশ বিদ্বানের মতামতের অনুকূলে হওয়া। এ সকল শর্ত পাওয়া গেলেই কেবল মুরসাল হাদীছ দলীল হিসাবে বিবেচিত হতে পারে (আল-মাজমূ‘ শারহুল মুহাযযাব ৬/২০৬, তায়সীরু মুছত্বলাহিল হাদীছ পৃঃ ৬০)

 

 

HTML Comment Box is loading comments...