নবীনদের পাতা

সুধারণা ও কুধারণা

ইহ্সান ইলাহী যহীর*

উপক্রমণিকা : অন্যান্য মহৎ গুণের পাশাপাশি একজন মুসলিমকে যে বিষয়ে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে তা হ’ল মানুষের প্রতি সুধারণা পোষণ করা। সুধারণা সমাজে কল্যাণ বয়ে আনে, ভ্রাতৃত্ববোধ অটুট রাখে। সুচিন্তা-সুধারণা আমাদেরকে বিবেকবান উন্নত মানুষে পরিণত করে। প্রত্যেক বিবেকবান মানুষেরই সুধারণামূলক মনোভাব থাকা আবশ্যক। কেননা অপরের উপর ভাল ধারণা পোষণ করা নেকীতে পরিণত হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,  حُسْنُ الظَّنِّ مِنْ حُسْنِ الْعِبَادَةِ ‘সুন্দর ধারণা সুন্দর ইবাদতের অংশ’।[1]

পক্ষান্তরে কুধারণা মোটেও কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। মন্দ ধারণা পোষণকারী ব্যক্তি হিংসা-বিদ্বেষ, দ্বন্দ-কলহে ইন্ধন যোগায়। নানান অন্যায়-অসার কথাবার্তার বিস্তার ঘটায়। মন্দ ধারণার বশবর্তী হয়ে মানব মনে অসন্তোষের দানা বাঁধতে শুরু করে। মন্দ ধারণার মধ্য দিয়ে মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধে চিড় ধরে। ফলে একতার বন্ধন ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে যায়। এজন্যই অপর মুসলিম ভাই সম্পর্কে সদা-সর্বদা সুধারণা পোষণ করা আবশ্যক। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلاَ يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللهَ إِنَّ اللهَ تَوَّابٌ رَحِيمٌ-   

‘হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক ধারণা থেকে বেঁচে থাক, কারণ কোন কোন ধারণা পাপ এবং তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান কর না এবং একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা কর না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করতে ভালবাসে? বস্ত্ততঃ তোমরা একে ঘৃণাই কর। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ তওবা কবুলকারী, কৃপাণিধান’ (হুজুরাত ৪৩/১২)। মন্দ ধারণা ও অতিরিক্ত ধারণা থেকেই হিংসা-বিদ্বেষের সৃষ্টি। আর হিংসা-বিদ্বেষ থেকে অন্যায়ের জন্ম। অনেক ক্ষেত্রে আমরা সুধারণার পরিবর্তে কুধারণাকে প্রাধান্য দিতে পসন্দ করি। অপর মুসলিম ভাইয়ের মানহানি করি, তার মানমর্যাদা নিয়ে টানাহেঁচড়া করি। অথচ এগুলো অমানবোচিত কাজ। হাদীছে সংশয়-সন্দেহ থেকে দূরে থেকে পরস্পরের প্রতি সুধারণা পোষণ করতে বলা হয়েছে। মিথ্যা ও অনুমান ভিত্তিক বাগাড়ম্বর, বাকপটুতা তো দূরের কথা, অন্তরে মন্দ ধারণার বশবর্তী হ’তেও নিষেধ করা হয়েছে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,إِيَّاكُمْ وَ الظَّنَّ، فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الْحَدِيثِ، لاَ تَجَسَّسُوا، وَلاَ تَحَسَّسُوا، وَلاَ تَبَاغَضُوا، وَكُونُوا عِبَادَ اللهِ إِخْوَانًا ‘তোমরা ধারণা থেকে বেঁচে থাক। কারণ, ধারণা ভিত্তিক কথাই হ’ল সবচেয়ে বড় মিথ্যাকথা। তোমরা একে অপরের দোষ অনুসন্ধান কর না। পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ কর না এবং পরস্পর দুশমনি কর না, বরং  তোমরা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও হে আল্লাহর বান্দারা’।[2]

ধারণার প্রকারভেদ :  আল্লামা যামাখশারী (রহঃ) ধারণাকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। যেমন- ১. সুধারণা ২. কুধারণা ও ৩. বৈধ ধারণা।

 ১. সুধারণা পোষণ করা ওয়াজিব : তা হ’ল আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করা। জাবের (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে তাঁর মৃত্যুর তিনদিন পূর্বে বলতে শুনেছি, لاَ يَمُوتَنَّ أَحَدُكُمْ إِلاَّ وَهُوَ يُحْسِنُ الظَّنَّ بِاللهِ عَزَّ وَجَلَّ  ‘তোমাদের কেউ যেন আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ ব্যতীত মৃত্যুবরণ না করে’।[3] অনুরূপভাবে মুমিনদের প্রতি অপরাপর মুমিনদের সুধারণা পোষণ করাও ওয়াজিব ।

২. কুধারণা করা হারাম : আল্লাহ তা’আলার প্রতি এবং মুসলিমদের বাহ্যিক কাজকর্মের উপর কুধারণা বা মন্দ ধারণা পোষণ করা হরাম। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা ধারণা করা থেকে বেঁচে থাক’।[4]

৩. বৈধ ধারণা : যে ব্যক্তি মন্দ কর্ম সম্পাদনে অত্যধিক পটু, তার মন্দ কাজ-কর্ম প্রকাশ্যে ধরা পড়ে ও মানুষের নিকট মন্দ বলেই সে পরিচিত; এরূপ মানুষ সম্পর্কে খারাপ ধারণা করা হারাম নয়, বরং বৈধ।[5] ছালাতে কারো যদি এই সন্দেহ হয় যে, সে কি তিন রাক‘আত পড়ল, নাকি চার রাক‘আত? তবে সন্দেহ অবসানের লক্ষ্যে কম সংখ্যক রাক‘আতের উপর অনুমান করে, বাকী ছালাত পূর্ণ করে ছালাত শেষে সাহু সিজদা দিবে। এই প্রকারের ধারণা ইসলামে বৈধ।[6]

সুধারণা তৈরীকরণের কতিপয় উপায় : মানব মনে অপর ভাই সম্পর্কে সুধারণা সৃষ্টির কতিপয় উপায় নিম্নে তুলে ধরা হ’ল, যেগুলো পারস্পরিক ভাল ধারণা সৃষ্টিতে সহায়ক হবে ইনশাআল্লাহ।

১. দো‘আ করা : দো‘আ হ’ল সকল কল্যাণের মূল উৎস। রাসূল (ছাঃ) আল্লাহর কাছে ‘ক্বালবে সালীম’ তথা সুস্থ আত্মার জন্য শাদ্দাদ বিন আওস (রাঃ)-কে দো‘আ শিখিয়েছিলেন। শাদ্দাদ বিন আওস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) আমাকে বললেন, ‘হে শাদ্দাদ বিন আওস! তুমি যখন মানুষকে সোনা-রূপা জমা করতে দেখবে তখন এই কথাগুলো বেশী বেশী বল,

 اَللَّهُمَّ إنِّيْ أسْألُكَ الثَّبَاتَ فِيْ الأمْرِ، والعَزِيْمَةَ عَلَى الرُّشْدِ، وأسْألُكَ مُوْجِبَاتِ رَحْمَتِكَ، وَعَزَائِمَ مَغْفِرَتِِكَ، وَأَسْألُكَ شُكْرَ نِعْمَتِِكَ، وَحُسْنَ عِبَادَتِكَ، وَأَسْأَلُكَ قَلْباً سَلِيْماً، وَلِسَاناً صَادِقاً، وَأَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِمَا تَعْلَمُ، وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا تَعْلَمُ، وَأسْتَغْفِرُكَ لِمَا تَعْلَمُ؛ إِنَّكَ أَنْتَ عَلاَّمُ الْغُيُوْبِ.

‘হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট কাজের দৃঢ়তা, সৎ পথের উপর অবিচলতা প্রার্থনা করছি; আপনার রহমতের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি সম্বলিত ভাল কাজ ও অনুপম ক্ষমা প্রার্থনা করছি। নে‘মতের শুকরিয়া, উত্তম ইবাদত ও ‘ক্বালবে সালীম’ তথা সুস্থ আত্মা, সত্যবাদী জিহবার জন্য দো‘আ করছি, আপনার পরিজ্ঞাত সকল কল্যাণ প্রার্থনা করছি ও অকল্যাণ থেকে আশ্রয় চাচ্ছি এবং যা আপনি জানেন তা থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, নিশ্চয়ই আপনি অদৃশ্য সমূহের মহাজ্ঞানী’।[7]

২. মুসলিম ভাইয়ের প্রতি সর্বাবস্থায় ভাল ধারণা করা : আমাদের প্রত্যেকেই যদি কোন কথা বা কাজ ঘটার সাথে সাথেই অপর মুসলিম ভাই সম্পর্কে উত্তম ধারণা  করি, তবে যে কোন পরিস্থিতিতে আমাদের অন্তরাত্মা সুধারণা পোষণ করতে বাধ্য থাকবে। এমনই একটি ঘটনার বৃত্তান্ত আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন। আয়েশা (রাঃ)-এর উপর যখন অপবাদ আরোপ করা হ’ল, তখন মুমিনদের উচিৎ ছিল মুনাফিকদের খপ্পরে না পড়ে উক্ত অপবাদ শ্রবণের প্রথম ধাপেই তাঁদের উপর সুধারণা পোষণ করা। আল্লাহ বলেন, لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكٌ مُبِينٌ ‘যখন তোমরা একথা শুনলে তখন মুমিন পুরুষ ও মুমিনা নারীগণ নিজেদের বিষয়ে কেন ভাল ধারণা করনি এবং বলনি এটা সুস্পষ্ট অপবাদ?’ (নূর ২৪/১২)।

৩. কথা শ্রবণের সাথে সাথে সেটাকে উত্তমভাবে গ্রহণ করা : সালাফে ছালেহীনের কর্মপদ্ধতি ছিল যে, তারা কোন কথা শুনামাত্রই সেটাকে খারাপ অর্থে না নিয়ে উত্তমভাবে গ্রহণ করতেন। ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) বলেন, وَلَا تَظُنَّنَّ بِكَلِمَةٍ خَرَجَتْ مِنِ امْرِئٍ مُسْلِمٍ شَرًّا وَأَنْتَ تَجِدُ لَهُ فِي الْخَيْرِ مَحْمَلًا ‘তোমার ভাইয়ের ভিতর থেকে যে কথা বের হয়েছে, তাকে তুমি খারাপ অর্থে নিবে না। বরং কোন কথা শুনামাত্রই উত্তমভাবে নিবে’।[8]

ইমাম শাফেঈ (রহঃ) অসুস্থ হ’লে তার কতিপয় ভাই তাকে দেখতে এসে তাকে বলেন, ‘আল্লাহ আপনার দুর্বলতাকে শক্তিশালী করুন। ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেন, আল্লাহ যদি আমার দূর্বলতাকে শক্তিশালী স্থায়িত্ব দেন, তবে তো আমার মৃত্যু হবে! তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ, আমি কল্যাণ ছাড়া কিছুই কামনা করিনি। তখন ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেন, আপনি যদি আমাকে গালিগালাজও করতেন, তবুও আমি তা ভাল অর্থেই নিতাম।[9]

৪. অপরের ওযর-আপত্তি গ্রহণ করা : অপর মুসলিম ভাইয়ের যে কোন কথায় বা কাজে তার ওযর-আপত্তি তালাশ করতে হবে। সালাফে ছালেহীনের উত্তম ধারণার কথা স্মরণ করতে হবে। তাঁরা মানুষকে ক্ষমা করার নিমিত্তে তার ওযর-আপত্তি সমূহ তালাশ করতেন। তাঁদের কথাই ছিল : فَاطْلُبُوْا لَهُ سَبْعِيْنَ عُذْرًا   ‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের সত্তরটি ওযর অনুসন্ধান কর’।[10]

মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রহঃ) বলেন, إِذَا بَلَغَكَ عَنْ أَخِيكَ الشَّيْءُ تُنْكِرُهُ فَالْتَمِسْ لَهُ عُذْرًا وَاحِدًا إِلَى سَبْعِينَ عُذْرًا، فَإِنْ أَصَبْتَهُ وَإِلَّا قُلْ: لَعَلَّ لَهُ عُذْرًا لاَ أَعْرِفُهُ ‘তুমি যদি তোমার মুসলিম ভাইয়ের মন্দ কিছু আঁচ করতে পার, তবে তাঁর ওযর গ্রহণ কর। যদি কোনই ওযর না পাও তবে বল, হয়তবা তার এমন ওযর আছে যা আমি জানি না।[11] আমরা যদি অপরের ওযরখাহী গ্রহণ করতে পারি তবে মন্দ ধারণা থেকে মুক্ত হয়ে আমাদের অন্তরে প্রশান্তি নেমে আসবে।

৫. মানুষের অন্তঃস্থ নিয়তে হস্তক্ষেপ না করা :  অন্যের মনের কথায় কোনরূপ হস্তক্ষেপ না করলেই আমাদের মনে সুধারণা তৈরী হবে। মানুষের উচিৎ হ’ল মনের সকল বিষয়কে একমাত্র গায়েবজান্তা আল্লাহর দিকে ন্যস্ত করা। আল্লাহ আমাদেরকে মানুষের অন্তর চিড়ে তার স্বরূপ উদঘাটনের নির্দেশ দেননি। উসামাহ বিন যায়েদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে হুরাক্বাহ নামক স্থানে জুহাইনা গোত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য পাঠালেন। সেখানে আমরা প্রভাতে তাদের উপর হামলা করলাম। আমি ও একজন আনছার মিলে তাদের একজনকে আক্রমণ করলাম। আমরা তাকে কাবু করে ফেললে সে ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ বলল। ফলে আনছার ছাহাবী তাকে ছেড়ে দিল। কিন্তু আমি আমার বল্লম দ্বারা আঘাত করে তাকে হত্যা করলাম। যখন আমরা ফিরে আসলাম, তখন এ সংবাদ রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে পৌঁছল। তখন তিনি বললেন,يَا أُسَامَةُ أَقَتَلْتَهُ بَعْدَ مَا قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ إِنَّمَا كَانَ مُتَعَوِّذاً مِنَ الْقَتْلِ فَكَرَّرَهَا عَلَىَّ حَتَّى تَمَنَّيْتُ أَنِّى لَمْ أَكُنْ أَسْلَمْتُ إِلاَّ يَوْمَئِذٍ ‘হে উসামা! ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ বলার পরও তুমি তাকে হত্যা করলে? আমি বললাম, সে হত্যা থেকে আত্মরক্ষার জন্য কালিমা পড়েছে। রাসূল (ছাঃ) কথাটার পুনরাবৃত্তি করতে থাকেন। আর আমি আফসোসের সাথে কামনা করলাম, হায়! আমি যদি এ দিনের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ না করতাম।[12]

৬. মন্দ ধারণার কুফল সম্পর্কে সর্বদা সজাগ থাকা : অধিকাংশ মানুষের স্বভাব হ’ল অপর ভাই সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করা। আর এই মন্দ বা ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে মানুষ একে অপরের প্রতি মিথ্যারোপ করে এবং নিজেকে পরিশুদ্ধ মনে করে। অথচ মহান আল্লাহ বলেন,فَلاَ تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَى ‘তোমরা আত্মপ্রশংসা কর না, তিনিই সর্বাধিক অবগত কে বেশী পরহেযগার’ (নাজম ৫৩/৩২)।

ইহুদীদের আত্মপ্রশংসার নিন্দা করে আল্লাহ আয়াত নাযিল করেছেন। আল্লাহ বলেন,أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يُزَكُّونَ أَنْفُسَهُمْ بَلِ اللهُ يُزَكِّي مَنْ يَشَاءُ وَلاَ يُظْلَمُونَ فَتِيلًا انْظُرْ كَيْفَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللهِ الْكَذِبَ وَكَفَى بِهِ إِثْمًا مُبِينًا ‘তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য করনি, যারা স্বীয় আত্মার পবিত্রতা প্রকাশ করে? বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পবিত্র করেন এবং তারা সূতা পরিমাণও অত্যাচারিত হবে না’(নিসা ৪/৪৯)। মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন,

وَقَالَتِ الْيَهُوْدُ وَالنَّصَارَى نَحْنُ أَبْنَاءُ اللهِ وَأَحِبَّاؤُهُ قُلْ فَلِمَ يُعَذِّبُكُمْ بِذُنُوبِكُمْ بَلْ أَنْتُمْ بَشَرٌ مِمَّنْ خَلَقَ يَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَنْ يَشَاءُ وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَإِلَيْهِ الْمَصِيْرُ-

‘ইহুদী ও নাছারাগণ বলে, আমরা আল্লাহর সন্তান ও প্রিয়ভাজন। তুমি বল, তবে তোমাদের পাপকর্মের দরুণ কেন তোমাদেরকে শাস্তি দেয়া হয়? বরং তাঁর সৃষ্টি মানুষের মত তোমরাও মানুষ। তিনি যাকে ইচছা ক্ষমা করবেন, যাকে ইচ্ছা শাস্তি দিবেন’ (মায়েদাহ ৫/১৯)। তাই মন্দ ধারণাযুক্ত বাকচতুরতা থেকে বিরত থেকে তার কুফল থেকে সর্বদা সজাগ থাকতে হবে।

সুধারণার প্রশিক্ষণ দিলেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) : সামাজিক জীবনে আমাদের পারস্পরিক আন্তরিকতা বজায় রাখতে হবে। অযথা সন্দেহ পোষণ থেকে বিরত থাকতে হবে। অনুমান নির্ভর ও গুজবের উপর ভর করে সমাজে অঘটনের অনেক নযীর আছে। কথার সত্যতা যাচাই না করেই অন্যের বিরুদ্ধে বিষোদগার রচনার অপতৎপরতাও সমাজে কম নয়। মুসলমান হিসাবে আমাদের উচিত নিজেদেরকে মন্দ ধারণা থেকে পরহেয করে ঘটনার সত্যতা যাচাই করা। ফলে পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটবে, অটুট থাকবে ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধ। অপর ভাই সম্পর্কে ভাল ধারণা তৈরী করার মানসে নবী করীম (ছাঃ) জনৈক ছাহাবীকে হাতে-কলমে শিক্ষা দিলেন। একদা এক ব্যক্তি তাঁর নিকটে অভিযোগ করল যে, আমার স্ত্রী কাল সন্তান প্রসব করেছে। তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তোমার কোন উট আছে কি? সে বলল, জী আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কি রং সেগুলোর? সে বলল, সেগুলো লাল রংয়ের। তিনি বললেন, সেগুলোর মধ্যে কোন কাল বাচ্চা আছে কি? সে বলল, অবশ্যই আছে। তিনি বললেন, কালগুলো কোথা থেকে আসল? সে বলল, সম্ভবত পূর্ব বংশের কোন রগের ছোঁয়া লেগেছে। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, لَعَلَّ ابْنَكَ هَذَا نَزَعَهُ عِرْقٌ ‘সম্ভবত তোমার সন্তানও পূর্ববর্তী কোন বংশের ছোঁয়া পেয়েছে’।[13]

এ ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মন্দ ধারণা পরিবর্তনে রাসূল (ছাঃ) ছিলেন উত্তম প্রশিক্ষক। ঐ ব্যক্তির ধারণা ছিল যে, তার স্ত্রী ব্যভিচারের শিকার হয়েছে এবং এ সন্তান তার ঔরসজাত সন্তান নয়। কিন্তু রাসূল (ছাঃ) বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে উন্নত মননের অধিকারী বানাতে সহায়তা করলেন।

ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ)-এর যুগে আব্দুল্লাহ নামের এক ব্যক্তি ছিল, যাকে হিমার তথা গাধা উপাধিতে ডাকা হ’ত। সে আল্লাহর রাসূলকেও হাসাতে পারত। মদ্যপানের অভিযোগে রাসূল (ছাঃ) তাকে চাবুক মারার নির্দেশ দেন। একই অপরাধে অন্য একদিন আবারো তাকে উপস্থিত করা হ’ল। আবারো তাকে চাবুক মারার নির্দেশ প্রদান করা হ’ল। তখন জনৈক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ তার উপর লা‘নত বর্ষণ কর। একই অপরাধে শাস্তির জন্য কতবার তাকে আনা হ’ল। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন,لاَ تَلْعَنُوهُ ، فَوَاللهِ مَا عَلِمْتُ أَنَّهُ يُحِبُّ اللهَ وَرَسُولَهُ  ‘তোমরা তাকে লা’নত দিও না। আল্লাহর কসম! আমি জানি যে সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভলবাসে’।[14]

রাসূল (ছাঃ) আরো বলেন, إِنَّ حُسْنَ الظَّنِّ مِنْ حُسْنِ الْعِبَادَةِ ‘নিশ্চয়ই সুন্দর ধারণা সুন্দর ইবাদতের অংশ’।[15]

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,إِذَا قَالَ الرَّجُلُ هَلَكَ النَّاسُ فَهُوَ أَهْلَكُهُمْ ‘তুমি যখন কাউকে বলতে শোন যে, সে বলল, লোকেরা ধ্বংস হয়ে গেল, তবে জেনে রেখ সেই সর্বাধিক ধ্বংসপ্রাপ্ত’।[16]

নেতিবাচক ধারণা ধ্বংসমুখী করে : মানুষের প্রতি নেতিবাচক ধারণা মানুষকে যেভাবে বিপথে পরিচালিত করে, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ পেশ করেছেন। আল্লাহ বলেন,

بَلْ ظَنَنْتُمْ أَنْ لَنْ يَنْقَلِبَ الرَّسُولُ وَالْمُؤْمِنُونَ إِلَى أَهْلِيهِمْ أَبَدًا وَزُيِّنَ ذَلِكَ فِي قُلُوبِكُمْ وَظَنَنْتُمْ ظَنَّ السَّوْءِ وَكُنْتُمْ قَوْمًا بُوْرًا-

‘বরং তোমরা ধারণা করেছিলে যে, রাসূল (ছাঃ) ও মুমিনগণ  তাদের পরিবার-পরিজনের কাছে কিছুতেই ফিরে আসবে না। আর এ ধারণা তোমাদের জন্য খুবই সুখবর ছিল। তোমরা মন্দ ধারণার বশবর্তী হয়েছিলে, আর তোমরা ছিলে ধবংসমুখী সম্প্রদায়’ (ফাতহ ৪৮/১২)। উল্লিখিত আয়াতটি হুদায়বিয়ার সন্ধির পরপরই নাযিল হয়। আরব বেদুইনদের কতিপয় লোক কুধারণা করেছিল যে, মক্কার কুরাইশ কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করে মুহাম্মাদ (ছাঃ) সদলবলে নিহত হবেন (নাউযুবিল্লাহ)। কিন্তু তারা যখন দেখল যে তাঁরা ফিরে এসেছেন, তখন রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার মিথ্যা অজুহাত পেশ করতে লাগল। তখন আল্লাহ তা‘আলা  উপরোক্ত আয়াত নাযিল করে  তাদের গোমর ফাঁস করে দেন।

মুমিনের ভিত্তি অপর মুমিনের উপর পূর্ণ সুধারণার উপরে গড়ে উঠবে। কথা বা কাজ উত্তম ও দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে গ্রহণ করবে। মন্দ ধারণার উপর ভিত্তি করে কত বন্ধুত্বে ফাটল ধরছে,আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে, ভাইয়ে ভাইয়ে খুনাখুনি  হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। এসবেরই মূল হ’ল নিছক ধারণা ও অনুমান। এই অন্যায় ধারণার কারণে পৃথিবীর অধিকাংশ লোকই বিভ্রান্ত। আল্লাহ বলেন, وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللهِ إِنْ يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ ‘তুমি যদি দুনিয়াবাসীর অধিকাংশ লোকের অনুসরণ কর, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করবে। তারা নিছক ধারণা ও অনুমানেরই অনুসরণ করে, আর তারা ধারণা ও অনুমান ছাড়া কিছুই করছে না’ (আন‘আম ৬/১১৬)। নেতিবাচক ধারণা ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাষ্ট্র সর্বত্রই শত্রুতা, হিংসা-বিদ্বেষ, ঝগড়া-কলহের সূত্রপাত ঘটায়। 

তবে কোন কোন ক্ষেত্রে সংবাদের সত্যতা যাচাই করতে আল্লাহ কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন। তথ্যের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত বিশ্বাস না থাকলে অথবা তথ্যদাতা অমুসলিম বা ফাসেক-ফাজের হলে তাদের সংবাদ যাচাই করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَنْ تُصِيبُوْا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوْا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِيْنَ-

‘হে মুমিনগণ! কোন ফাসিক যদি তোমাদের নিকট কোন বার্তা নিয়ে আসে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশতঃ কোন সম্প্রদায়কে তোমরা কষ্ট না দাও অতঃপর তোমাদের কৃতকর্মের জন্যে লজ্জিত হয়ে যাও’ (হুজুরাত ৪৯/৬)।

রাসূল (ছাঃ) ছাহাবায়ে কেরামকে সর্বদা ভাল ধারণা পোষণ করতে বলতেন এবং মন্দ ধারণা থেকে সর্বদা নিরুৎসাহিত করতেন। কুধারণাকে পরিহার করার গভীর অনুশীলন করাতেন। আলী (রাঃ)  থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যুবাইর ও মিক্বদাদ সহ আমাকে ‘রাওযাতু খাখ’ নামক স্থানে পাঠালেন। আর বললেন, সেখানে এক শিবিকারোহিনী রয়েছে, যার সাথে লিখিত একটি পত্র আছে। তোমরা তার কাছ থেকে সেটা নিয়ে নিবে। অতঃপর আমাদের ঘোড়াগুলো পরস্পর প্রতিযোগিতা করে ছুটল। আমরা মহিলার কাছে পৌঁছে বললাম, হে মহিলা পত্রটি বের কর! সে বলল, আমার কাছে কোন পত্র নেই। আমরা বললাম, অবশ্যই তুমি পত্র বের কর অন্যথায় তোমার কাপড় খুলে চেক করা হবে। অতঃপর সে তার চুলের খোপার ভিতর থেকে চিঠিটি বের করল। আমরা সেটি নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সমীপে উপস্থিত হ’লাম। তাতে লেখা ছিল, ‘হাত্বেব ইবনে আবু বালতা‘আর পক্ষ থেকে মক্কার মুশরিকদের প্রতি’। এতে তিনি তাদেরকে রাসূল (ছাঃ)-এর কিছু কর্মকৌশলের সংবাদ পাচার করেছিলেন। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘হে হাত্বেব! এটা কি’? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার বিষয়ে ক্ষিপ্রতা অবলম্বন করবেন না। আমি কুরাইশদের ঘনিষ্ঠ ছিলাম। (সুফিয়ান বলেন, তিনি কুরাইশদের মিত্র ছিলেন, কিন্তু তাদের বংশীয় ছিলেন না। হাত্বেব অন্য ছাহাবার সাথে হিজরত করে মক্কায় চলে এসেছেন বটে, কিন্তু তার পরিবার মক্কায় তার আত্মীয়দের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।) আমি আমার আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নের আশংকা করলাম। তাই আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রেখে তাদেরকে হাত করার জন্য এই পদ্ধতি অবলম্বন করেছি। কুফরী বশত কখনো আমি এ কাজ করিনি এবং আমি আমার ধর্ম থেকে মুরতাদ হয়ে যাইনি। আর ইসলাম গ্রহণের পর কুফরীর উপর আমি সন্তুষ্ট নই। তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, সে সত্য বলেছে। অন্যদিকে ওমর (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! এই মুনাফিকের ঘাড়ে তলোয়ার মারতে আমাকে সুযোগ করে দিন। রাসূল (ছাঃ) তখন বলেন,إِنَّهُ قَدْ شَهِدَ بَدْرًا، وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّ اللهَ أَنْ يَكُونَ قَدِ اطَّلَعَ عَلَى أَهْلِ بَدْرٍ فَقَالَ اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ، فَقَدْ غَفَرْتُ لَكُمْ ‘নিশ্চয়ই হাত্বেব বদরী ছাহাবী, তুমি কি জান না আল্লাহ বদরী ছাহাবীদের প্রতি উঁকি দিয়ে দেখে বলেন, তোমরা যাচ্ছেতাই কর; আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম’। অতঃপর আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُمْ مِنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ أَنْ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبِّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِي سَبِيلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي تُسِرُّونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَأَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخْفَيْتُمْ وَمَا أَعْلَنْتُمْ

‘হে মুমিনগণ! আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধু রূপে গ্রহণ কর না। তোমরা কি তাদের সাথে বন্ধুত্ব করছ? অথচ তোমাদের নিকট যে সত্য এসেছে তার সাথে তারা কুফরী করেছে। তারা রাসূল (ছাঃ) ও তোমাদেরকে এ কারণেই বহিষ্কার করেছে যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে বিশ্বাস কর। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্যে আমার পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হয়ে থাক তবে তোমরা তাদের সাথে গোপনে বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠা কর। তোমরা যা গোপন কর বা প্রকাশ কর সে বিষয়ে আমি সম্যক অবগত’ (মুমতাহিনা ৬০/১)। অপর বর্ণনা মতে, রাসূল (ছাঃ) আমাকে, যুবাইর, তালহা, মিক্বদাদ বিন আসওয়াদকে পাঠালেন।[17]

সুফিয়ান ইবনে হুসাইন বলেন, আমি ইয়াস ইবনু মু‘আবিয়ার নিকট কোন এক লোকের বদনাম করলাম। তিনি আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি কি রোম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছ? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, ভারতবর্ষ, তুর্কী, সিন্ধু প্রদেশের লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছ? আমি বললাম, জী না। তিনি বললেন, তোমার থেকে রোমান, সিন্ধু, তুর্কী, ভারতীয়রা নিরাপদে রইল, অথচ তোমার মুসলিম ভাই তোমার থেকে নিরাপদ নয়! তিনি বলেন, এরপর থেকে আর কখনো আমি এরূপ করিনি।[18]

আবু হাত্বেব ইবনে হিববান আল বাসাতী (রহঃ) বলেন, জ্ঞানীদের উপর আবশ্যক হ’ল অপর মানুষের মন্দচারী থেকে নিজেকে পূর্ণভাবে মুক্ত রাখা, নিজের দোষ-ত্রুটি সংশোধনার্থে সর্বদা নিমগ্ন থাকা। যে ব্যক্তি অপরেরটা  ত্যাগ করে নিজের ভুলত্রুটি সংশোধনে  সদা ব্যস্ত থাকে, তার দেহ-মন শান্তিতে থাকে। আর যে অন্য মানুষ সম্পর্কে মন্দ ধারণা করে, তার অন্তর মরে যায়, আত্মিক অশান্তি বেড়ে যায় এবং তার অন্যায় কর্মও বৃদ্ধি পায়।[19]

রাসূল (ছাঃ) মানুষের দোষ ও ছিদ্রান্বেষণ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি মানুষকে স্ব-স্ব দোষত্রুটি সংশোধনে আত্মনিয়োগ করতে উৎসাহিত করেছেন। আল্লাহর কাছে যেসব কথাবার্তা-ধ্যানধারণার মূল্য নেই তা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন, يَا مَعْشَرَ مَنْ آمَنَ بِلِسَانِهِ وَلَمْ يَدْخُلِ الإِيمَانُ قَلْبَهُ لاَ تَغْتَابُوا الْمُسْلِمِينَ وَلاَ تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ فَإِنَّهُ مَنِ اتَّبَعَ عَوْرَاتِهِمْ يَتَّبِعِ اللهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ يَتَّبِعِ اللهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ فِى بَيْتِهِ ‘ওহে যারা মৌখিক স্বীকৃতির মাধ্যমে ঈমান এনেছ, অথচ এখনো অন্তঃকরণে ঈমান পৌঁছেনি! তোমরা মুসলিমদের নিন্দা কর না, তাদের ছিদ্রান্বেষণ কর না। কেননা যে ব্যক্তি অপরের দোষ খোঁজে আল্লাহ তার দোষ  অনুসন্ধান করেন। আর আল্লাহ যার দোষ তালাশ করেন, তাকে তার নিজস্ব বাসগৃহেই অপদস্থ করেন’।[20]

সমাপনী : পরিশেষে বলা যায় যে, সুধারণা পোষণ উন্নত চরিত্রের ভূষণ। অন্যের সম্পর্কে সুধারণার ফলে পারস্পরিক ভুল বুঝাবুঝির অবসান পুরোপুরিভাবে সম্ভব। ফলে সমাজের দ্বন্দ্ব কলহ নিঃশেষ হয়ে সমাজের মানুষের ভ্রতৃত্ববোধ অটুট হবে। দৃঢ় হবে সামাজিক মেলবন্ধনের সেতু। তাই অপর মুসলিম ভাই সম্পর্কে স্বচ্ছ, নিষ্কলুষ ধারণা রেখে আমরা সমাজে বসবাস করার আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাব। আল্লাহ আমাদের সবাইকে অপর মুসলিম সম্পর্কে সুধারণা পোষণের ‘ক্বালবে সালীম’ তথা সুস্থ অন্তঃকরণ দান করুন-আমীন!


* বি.এ (অনার্স) দ্বিতীয় বর্ষ, আরবী বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

[1]. আহমাদ হা/৮০৩৬; আবুদাঊদ হা/৪৯৯৩, সনদ হাসান।

[2]. বুখারী হা/৪৮৪৯, ৫১৪৩।

[3]. মুসলিম হা/২৮৭৭।

[4]. বুখারী হা/৬০৬৪।

[5]. ছান‘আনী, সুবুলুস সালাম ৪/১৮৯।

[6]. বুখারী হা/৩৮৬; মুসলিম হা/৮৮৯।

[7]. আহমাদ হা/১৭১১৪; ছহীহাহ/৩২২৮।

[8]. বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান হা/৭৯৯২; জামেউল আহাদীছ হা/৩১৬০৪।

[9]. বায়হাক্বী, মানাক্বিবুল ইমাম শাফেঈ ২/১১৬-১১৭; তাবাকাতুশ শাফেঈয়্যাহ আল-কুবরা পৃঃ ১৩৫/১৩৮।

[10]. আবুদাঊদ হা/৫১৬৪, সনদ ছহীহ; শু‘আবুল ঈমান হা/৮৩৪৪।

[11]. বায়হাক্বী হা/৭৯৯১; ১০৬৮৪।

[12]. বুখারী হা/২৪৬৯; মুসলিম হা/১৯০।

[13]. বুখারী হা/৬৮৪৭।

[14]. বুখারী হা/৬৭৮০।

[15]. আহমাদ হা/ ৮১৭৬; আবুদাউদ হা/ ৪৯৯৩, সনদ হাসান।

[16]. মুসলিম হা/৬৭৭৬; আদাবুল মুফরাদ হা/৭৫৯।

[17]. বুখারী হা/৩০০৭; মুসলিম হা/৬৪৮৫।

[18]. বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১৩/১২১।

[19]. রওয়াতুল উক্বালা পৃঃ ১৩১।

[20]. আবুদাঊদ হা/৪৮৮০, আলবানী একে ছহীহ বলেছেন।

             

HTML Comment Box is loading comments...