প্রবন্ধ


আহলেহাদীছ একটি বৈশিষ্ট্যগত নাম

মূল (উর্দূ) : শায়খ যুবায়ের আলী যাঈ
অনুবাদ : আহমাদুল্লাহ

ভূমিকা : সাহায্যপ্রাপ্ত দল, নাজাতপ্রাপ্ত ফিরক্বা এবং হক্বের অনুসারীদের বৈশিষ্ট্যগত নাম ‘আহলেহাদীছ’। এরা ঐ সমস্ত মহান ব্যক্তি, যারা সর্বযুগে ছিলেন এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকবেন। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِى مَنْصُورِينَ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ حَتَّى تَقُوْمَ السَّاعَةُ  ‘আমার উম্মতের মধ্যে ক্বিয়ামত পর্যন্ত একটি দল (আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হ’তে) সর্বদা সাহায্যপ্রাপ্ত হ’তে থাকবে। পরিত্যাগকারীরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না’।[1]

ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেছেন, إن لم تكن هذه الطائفة المنصورة أصحاب الحديث، فلا أدري من هم  ‘সাহায্যপ্রাপ্ত এই দলটি যদি আছহাবুল হাদীছ (আহলেহাদীছ) না হয়, তবে আমি জানি না তারা কারা’?[2]

ইমাম হাকেম (রহঃ) বলেন, ‘ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) এই হাদীছের ব্যাখ্যায় অত্যন্ত চমৎকার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, সাহায্যপ্রাপ্ত দলটি হচ্ছে আছহাবে হাদীছের দল। আহলেহাদীছের চাইতে কারা এ হাদীছের আওতাভুক্ত হওয়ার অধিক হক্বদার হ’তে পারেন? যারা (আহলেহাদীছগণ) সৎ মানুষদের পথে চলেন, সালাফে ছালেহীনের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন এবং রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাতের দ্বারা বিরুদ্ধবাদীদের এবং বিদ‘আতীদের সামনে বুক ফুলিয়ে জবাব প্রদানের মাধ্যমে তাদের যবান বন্ধ করে দেন। যারা আরাম-আয়েশ ও বিলাসিতার জীবনকে ত্যাগ করে বিশুষ্ক মরুভূমি এবং তৃণ-লতা ও পত্রহীন এলাকায় (হাদীছ সংগ্রহের জন্য) সফর করাকে অগ্রাধিকার প্রদান করেন। তারা আহলে ইলম এবং আহলে আখবারের সংস্পর্শে আসার জন্য ভ্রমণের কঠিন পরিস্থিতিকেও শোভনীয় মনে করেন।[3]

ইমাম বুখারী (রহঃ)-এর উস্তাদ ইমাম আলী ইবনুল মাদিনী (রহঃ) বলেছেন,   هم أصحاب الحديث  ‘তারা হচ্ছে আছহাবুল হাদীছ’। অর্থাৎ ‘সাহায্যপ্রাপ্ত দল’ দ্বারা আহলেহাদীছগণ উদ্দেশ্য।[4]

হাদীছ জগতের সম্রাট ইমাম বুখারী (রহঃ) ‘ত্বায়েফাহ মানছূরাহ’ সম্পর্কে বলেন, هم أهل الحديث  ‘তারা হ’লেন আহলেহাদীছ’।[5]

ইমাম ইবনে হিববান উপরোক্ত হাদীছের উপর এই মর্মে অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন যে,ذِكْرُ إِثْبَاتِ النُّصْرَةِ لِأَصْحَابِ الْحَدِيثِ إِلَى قِيَامِ السَّاعَةِ  ‘ক্বিয়ামত অবধি আল্লাহ কর্তৃক আহলেহাদীছদের সাহায্যপ্রাপ্তি প্রমাণিত হওয়ার বিবরণ’।[6]

ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন মুফলিহ আল-মাক্বদেসী বলেন, أَهْلُ الْحَدِيثِ هُمْ الطَّائِفَةُ النَّاجِيَةُ الْقَائِمُونَ عَلَى الْحَقِّ  ‘আহলেহাদীছরাই মুক্তিপ্রাপ্ত দল। যারা হক্বের উপর প্রতিষ্ঠিত আছেন’।[7]

ইমাম হাফছ বিন গিয়াছ এবং ইমাম আবুবকর বিন আইয়াশ (রহঃ)-এর বক্তব্যকে সমর্থন ও সত্যায়ন করতঃ ইমাম হাকেম (রহঃ) বলেন, তারা দু’জন সত্যই বলেছেন যে, আহলেহাদীছগণ সৎ মানুষ। আর এমনটা কেনইবা হবেন না, তারা তো (কুরআন ও হাদীছের (মুকাবিলায়) দুনিয়াকে সম্পূর্ণরূপে তাদের পশ্চাতে নিক্ষেপ করেছেন।[8]

প্রখ্যাত ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,  أَوْلَى النَّاسِ بِىْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَكْثَرُهُمْ عَلَىَّ صَلاَةً  ‘ক্বিয়ামতের দিন ঐ সমস্ত ব্যক্তি আমার সর্বাধিক নিকটবর্তী হবে, যারা সবচেয়ে বেশী আমার উপরে দরূদ পাঠ করে’।[9] এজন্যই আহলেহাদীছ পরিবারের ছোট ছোট বালক-বালিকাদের অন্তরে হাদীছের প্রতি গভীর অনুরাগ ও আকর্ষণ বিরাজিত। আর আহলেহাদীছগণ ক্বিয়াসী দৃষ্টিভঙ্গি এবং ফিক্বহী মাসআলার খুঁটিনাটি বিষয়ের পরিবর্তে কেবলমাত্র নবী করীম (ছাঃ)-এর হাদীছ বর্ণনাকেই পরকালে সৌভাগ্যবান হওয়ার মাধ্যম মনে করেন। তাই ইমাম আবূ হাতেম ইবনে হিববান আল-বাসতী (রহঃ) উপরোক্ত হাদীছ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা উদ্ভাবন করেছেন। তিনি বলেছেন, ক্বিয়ামত দিবসে আহলেহাদীছগণের রাসূল (ছাঃ)-এর সর্বাধিক নিকটে থাকার দলীল উক্ত হাদীছে বিদ্যমান। কেননা এই উম্মতের মধ্যে আহলেহাদীছদের চাইতে কোন দল রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপর বেশী দরূদ পাঠ করে না।[10]

এত ফযীলত ও মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্তেবও কতিপয় ব্যক্তি আহলেহাদীছদের বিরোধিতা করা, তাদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ, উপহাস-পরিহাস এবং তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করাকে নিজেদের পৈত্রিক অধিকার মনে করে। সম্ভবত এই সকল আহলেহাদীছ বিরোধীদের উদ্দেশ্য করেই ইমাম আহমাদ বিন সিনান আল-ওয়াসিত্বী (রহঃ) মন্তব্য করেছেন, لَيْسَ فِى الدُّنْيَا مُبْتَدِعٌ إِلاَّ وَ هُوَ يَبْغَضُ أَهْلَ الْحَدِيْثِ-  ‘দুনিয়াতে এমন কোন বিদ‘আতী নেই, যে আহলেহাদীছদের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ করে না’।[11]

ইমাম হাকেম (রহঃ) বলেন, ‘আমি সর্বত্র যত বিদ‘আতী এবং নাস্তিকমনা মানুষ পেয়েছি, তারা সকলেই ‘ত্বায়েফাহ মানছূরাহ’ তথা আহলেহাদীছদেরকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখত এবং আহলেহাদীছদেরকে নিকৃষ্টভাবে সম্বোধন করত (যেমন হাশাবিয়া)।[12]

অথচ আমরা তাদেরকে বুঝাতে চাই যে, أهل الحديث همُو أهل النبي وإن لم يصحبوا نفسه أنفاسه صحبوا  ‘আহলেহাদীছগণই মূলত আহলে নবী বা নবী (ছাঃ)-এর পরিবার। যদিও তারা সরাসরি রাসূল (ছাঃ)-এর সাহচর্য লাভ করেননি। তথাপি তারা রাসূল (ছাঃ)-এর সুগন্ধীযুক্ত শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে নির্গত অমর বাণী দ্বারা উপকৃত হয়েই আসছেন’।

আলোচ্য গ্রন্থটি শায়খ হাফেয যুবায়ের আলী যাঈ রচিত একটি চমৎকার গ্রন্থ। এতে বৈশিষ্ট্যগত নাম ‘আহলেহাদীছ’-এর বিরুদ্ধে উত্থাপিত যাবতীয় প্রশ্ন, আপত্তি ও সমালোচনার জবাব প্রদান করা হয়েছে। দলীল-প্রমাণাদি উপস্থাপনের দৃষ্টিকোণ হ’তে এটি একটি  সারগর্ভ ও অনন্য পুস্তক।*

আহলেহাদীছ একটি বৈশিষ্ট্যগত নাম এবং এর পরিচিতি :

মুসলমানদের অনেক গুণবাচক নাম রয়েছে। যেমন মুমিন, ইবাদুল্লাহ (আল্লাহ্র বান্দা), হিযবুল্লাহ (আল্লাহ্র দল)। তদ্রূপ ছাহাবা, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন, মুহাজির, আনছার ইত্যাদি নামসমূহ। ঠিক তেমনিভাবে ঐসকল গুণবাচক নাম সমূহের মধ্যে ‘আহলেহাদীছ’ ও ‘আহলে সুন্নাত’ উপাধিদ্বয় ‘খায়রুল কুরূন’ বা সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ হ’তে সাব্যস্ত রয়েছে। মুসলমানদের মাঝে উভয় গুণবাচক উপাধির ব্যবহার নির্দ্বিধায় প্রচলিত আছে। বরং এর বৈধতার পক্ষে মুসলিম উম্মাহ্র ইজমা রয়েছে।

‘আহলেহাদীছ’ এবং ‘আহলে সুন্নাত’ দু’টি সমার্থবোধক গুণবাচক নাম। যার দ্বারা ছহীহ আক্বীদা সম্পন্ন মুসলমানদের অর্থাৎ সাহায্য ও নাজাতপ্রাপ্ত দলের পরিচয় পাওয়া যায়।

‘আহলেহাদীছ’ এই গুণবাচক নাম এবং প্রিয় উপাধি দ্বারা দুই শ্রেণীর ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন মুসলমান উদ্দেশ্য।

ক. সম্মানিত মুহাদ্দিছগণ।

খ. তাদের অনুসারী আম জনতা, যারা হাদীছের উপরে আমল করে থাকে।

প্রথম প্রকার সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, ইমাম ইবনে তায়মিয়া (রহঃ) মুহাদ্দিছগণকে ‘আহলেহাদীছ’ বলে অভিহিত করেছেন।[13]

ইমাম ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আল-ক্বাত্তান একজন রাবী প্রসঙ্গে বলেছেন, তিনি আহলেহাদীছ ছিলেন না।[14]

প্রমাণিত হ’ল যে, শুধুমাত্র হাদীছ বর্ণনাকারীদেরকেই আহলেহাদীছ বলা হ’ত না। বরং ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন হাদীছ বর্ণনাকারী তথা মুহাদ্দিছগণকেও আহলেহাদীছ বলা হ’ত।

এক জায়গায় হাফেয ইবনে হিববান আহলেহাদীছদের ৩টি আলামত বর্ণনা করেছেন :

ক. তারা হাদীছের উপর আমল করেন।

খ. তারা সুন্নাত তথা হাদীছের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত থাকেন।

গ. তারা সুন্নাত বিরোধীদের মূলোৎপাটন করেন।[15]

আহলেহাদীছদের প্রসিদ্ধ দুশমন এবং যাকে তাকে কাফের আখ্যা দানকারী খারেজী জামা‘আত ‘জামাআতুল মুসলিমীন রেজিস্টার্ড’-এর প্রতিষ্ঠাতা মাসঊদ আহমাদ বিএসসি পরিষ্কারভাবে লিখেছেন, আমরাও মুহাদ্দিছগণকে আহলেহাদীছ বলে থাকি।[16]

বর্তমানে জীবিত দেওবন্দী আলেমদের ‘ইমাম’ খ্যাত সরফরায খান ছফদর গাখড়ুভী লিখেছেন, আহলেহাদীছ বলতে ঐ সমস্ত ব্যক্তি উদ্দেশ্য, যারা হাদীছ সংরক্ষণ ও অনুধাবনে এবং হাদীছ অনুসরণে প্রবল অনুরাগী।[17]

অতঃপর সরফরায খান দীর্ঘ আলোচনা করতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘এতে প্রতীয়মান হয় যে, যিনি হাদীছের ইলম হাছিল করেছেন, তা সংগ্রহের জন্য চেষ্টা করেছেন এবং হাদীছ তাহকীক করেছেন, তাকেই আহলেহাদীছ বলা হয়। চাই সে ব্যক্তি হানাফী, মালেকী, শাফেঈ কিংবা হাম্বলী হৌক। এমনকি সে যদি শী‘আও হয়ে থাকে, তথাপি সে আহলেহাদীছ।[18]

এই উক্তিতে খান ছাহেব মুহাদ্দিছগণকে ‘আহলেহাদীছ’ নামে অভিহিত করেছেন। কিন্তু তিনি শী‘আ এবং অন্যদেরকেও আহলেহাদীছ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, যা দলীলের ভিত্তিতে একেবারেই বাতিল এবং ভিত্তিহীন। এই বিষয়ে সামনে আলোচনা আসছে ইনশাআল্লাহ।

যুগ বিবেচনায় মুহাদ্দিছগণের কয়েকটি জামা‘আত বা দল রয়েছে। যথা :

১. ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) :

হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মাক্কীর খলীফা ও জামে‘আ নিযামিয়া, হায়দারাবাদের প্রতিষ্ঠাতা আনওয়ারুল্লাহ ফারূকী ফযীলত জঙ্গ লিখেছেন, ‘প্রত্যেক ছাহাবী (রাঃ) আহলেহাদীছ ছিলেন। কেননা হাদীছ শাস্ত্রের সূচনা তাঁদের আমল থেকেই শুরু হয়েছে। কারণ তাঁরা রাসূল (ছাঃ)-এর কাছ থেকে হাদীছ গ্রহণ করে সরাসরি উম্মতের কাছে পেঁŠছে দিয়েছেন। সুতরাং তাদের আহলেহাদীছ হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।[19]

এখানে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ উল্লেখ্য যে, হাক্বীক্বাতুল ফিক্বহ গ্রন্থটি ক্বারী আব্দুল ক্বাইয়ূম যহীর আমাকে উপহার দিয়েছেন। আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

দেওবন্দীদের প্রসিদ্ধ আলেম এবং বহু গ্রন্থ প্রণেতা মুহাম্মাদ ইদরীস কান্দলভী লাহোরী লিখেছেন, ‘সকল ছাহাবীই তো আহলেহাদীছ ছিলেন। কিন্তু আহলে রায়গণই ফৎওয়া প্রদান করতেন। পরবর্তীতে আহলে রায় উপাধিটি ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এবং তার শিষ্যদেরকে প্রদান করা হয়েছে। ঐ যুগের সকল আহলেহাদীছ ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-কে আহলে রায়দের ইমাম উপাধিতে ভূষিত করেছেন।[20]

এই উক্তি দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর সময়েও আহলেহাদীছগণ বিদ্যমান ছিলেন।

২. ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন তাবেঈন, তাবে তাবেঈন এবং পরবর্তীগণ :

শী‘আ এবং বিদ‘আতীদেরকে কয়েকটি কারণে আহলেহাদীছ বলা ভুল ও বাতিল। যেমন :

প্রথমত : ছহীহ হাদীছে এসেছে যে, ‘ত্বায়েফাহ মানছূরাহ’ সর্বদা বিজয়ী থাকবে...। উক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় ইমাম বুখারী, ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল সহ অন্যান্য মুহাদ্দিছ ইমামগণ বলেছেন, ত্বায়েফাহ মানছূরাহ হচ্ছে ‘আহলেহাদীছ’।[21]

সুতরাং এমন কথা বলা কেবল বাতিলই নয়, বরং চরম ভ্রষ্টতা যে, শী‘আ এবং বিদ‘আতীরাও সাহায্যপ্রাপ্ত দলের অন্তর্ভুক্ত।

দ্বিতীয়ত : ইমাম আহমাদ বিন সিনান আল-ওয়াসিতী (রহঃ) বলেছেনে, ليس في الدنيا مبتدع إلا وهو يبغض أصحاب الحديث  ‘দুনিয়াতে এমন কোন বিদ‘আতী নেই যে আহলেহাদীছের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ করে না’।[22]

এই মূল্যবান উক্তি দ্বারা স্পষ্টত বুঝা গেল যে, আহলেহাদীছ এবং আহলে বিদ‘আত ভিন্ন ভিন্ন দল।

তৃতীয়ত : ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেছেন, إِذَا رَأَيْتُ رَجُلاً مِّنْ أَصْحَابِ الْحَدِيْثِ فَكَأَنِّيْ رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ  حَيًّا-  ‘আমি যখন কোন ‘আহলেহাদীছ’ ব্যক্তিকে দেখি তখন যেন রাসূল (ছাঃ)-কেই জীবন্ত দেখি’।[23] অর্থাৎ আহলেহাদীছগণের মাধ্যমেই নবী করীম (ছাঃ)-এর দাওয়াত জীবিত রয়েছে।

এক্ষণে ‘আহলেহাদীছ’ দ্বারা যদি শী‘আ ও বিদ‘আতীকেও বুঝানো হয়, তবে কি ইমাম শাফেঈ (রহঃ) শী‘আ, মু‘তাযিলা, জাহমিয়া, মুরজিয়া এবং হরেক রকমের বিদ‘আতীদেরকে দেখে আনন্দিত হ’তেন?

চতুর্থত : আহমাদ বিন আলী লাহোরী দেওবন্দী স্বীয় ‘মালফূযাত’-এ লিখেছেন, ‘আমি ক্বাদেরী (আব্দুল কাদের জিলানী-এর তরীকা) এবং হানাফী। আহলেহাদীছগণ কাদেরীও নয়, আবার হানাফীও নয়। কিন্তু তারা আমার মসজিদে চল্লিশ বছর যাবৎ ছালাত আদায় করে আসছে। আমি তাদেরকে হকের উপর প্রতিষ্ঠিত মনে করি।[24]

উক্ত উক্তি থেকে পাঁচটি বিষয় সাব্যস্ত হয়েছে :

১. আহলেহাদীছগণ হকের উপরে প্রতিষ্ঠিত আছেন।

২.‘আহলেহাদীছ’ ছহীহ আক্বীদা সম্পন্ন মুসলমানদের উপাধি। এজন্য শী‘আ ও অন্যান্য দল সমূহ ‘আহলেহাদীছ’ নয়। তারা তো আহলে বিদ‘আত-এর অন্তর্ভুক্ত।

৩. শুধু মুহাদ্দিছগণকেই ‘আহলেহাদীছ’ বলা হয় না। বরং মুহাদ্দিছগণের অনুসারী সাধারণ জনগণকেও ‘আহলেহাদীছ’ বলা হয়। নতুবা মুহাদ্দিছগণের কোন জামা‘আতটি লাহোরী ছাহেবের মসজিদে চল্লিশ বছর যাবৎ ছালাত আদায় করেছেন?

৪. মানুষ যদি হানাফী বা কাদেরী নাও হয়, তথাপি সে আহলে হক তথা হক্বপন্থী হ’তে পারেন।

৫. জনাব সরফরায খান কর্তৃক শী‘আদেরকে আহলেহাদীছ গণ্য করা বাতিল।

এমনিতরো আরো অসংখ্য উদ্ধৃতি রয়েছে যদ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে, মুহাদ্দিছ হৌক কিংবা হাদীছের অনুসারী সাধারণ জনতা হৌক, ‘আহলেহাদীছ’ দ্বারা ‘আহলে সুন্নাত’ তথা ছহীহ আক্বীদাসম্পন্ন মানুষ উদ্দেশ্য। আর বিদ‘আতীরা আদৌ ‘আহলেহাদীছ’ উপাধিতে শামিল নয়। বরং তারা তো ‘আহলেহাদীছের’ প্রতি কেবল বিদ্বেষই পোষণ করে থাকে।

দ্বিতীয় বিষয়টি অর্থাৎ মুহাদ্দিছগণের অনুসারী এবং হাদীছের উপরে আমলকারী সাধারণ জনতার ব্যাপারে বক্তব্য হ’ল, কতিপয় লোক এ অপপ্রচার চালিয়ে থাকেন যে, ‘আহলেহাদীছ’ দ্বারা কেবল সম্মানিত মুহাদ্দিছগণ উদ্দেশ্য, এর দ্বারা সাধারণ জনতা উদ্দেশ্য নয়। সেকারণে এই লোকদের অপপ্রচারের জবাবে বিশটি উদ্ধৃতি পেশ করা হ’ল :

১. অসংখ্য হক্বপন্থী আলেম যেমন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল, ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী, ইমাম বুখারী প্রমুখ ‘আহলেহাদীছ’-কে সাহায্যপ্রাপ্ত দল হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন।

এর আলোকে বক্তব্য হ’ল কেবল মুহাদ্দিছগণই ‘সাহায্যপ্রাপ্ত দল, তাদের সাধারণ অনুসারীগণ নন। অথবা শুধু মুহাদ্দিছগণ জান্নাতে প্রবেশ করবেন এবং তাদের অনুসারীগণ জান্নাতের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবেন’ এমন ধারণা শুধু বাতিলই নয়, বরং ইসলামের সাথে ঠাট্টা-মশকরা করার শামিল।

২. হাফিয ইবনে হিববান ‘আহলেহাদীছদে’র সম্পর্কে বলেছেন যে, ‘তারা হাদীছের উপরে আমল করেন, হাদীছ সংরক্ষণ করেন এবং হাদীছ বিরোধীদের মূলোৎপাটন করেন’।[25] আর এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, আহলেহাদীছ সাধারণ জনগণও হাদীছের উপরেই আমল করে থাকেন।

৩. ইমাম আবুদাঊদ (রহঃ)-এর ছেলে ইমাম আবু বকর বলেছেন, ‘তুমি ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা নিজ দ্বীন নিয়ে খেল-তামাশা করে’। (যদি তুমি দ্বীনকে তাচ্ছিল্যকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও) তাহ’লে তুমি আহলেহাদীছদেরকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও সমালোচনার তীরে বিদ্ধ করবে।[26]

এ উক্তি দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, যারা আহলেহাদীছদের সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করেন, তারা দ্বীনকে নিয়ে তামাশা করেন। অর্থাৎ তারা বিদ‘আতী। আর এও দিবালোকের ন্যায় পরিস্ফূট যে, বিদ‘আতীরা শুধু মুহাদ্দিছগণের সাথেই শত্রুতা পোষণ করে না; বরং তারা হাদীছের অনুসারী আম জনতার প্রতিও চরম-বিদ্বেষ পোষণ করে থাকে।

আমীন উকাড়বী দেওবন্দী ‘গায়ের মুক্বাল্লিদের পরিচয়’ শিরোনামে লিখেছেন যে, ‘কিন্তু যে ব্যক্তি ইমামও নয়, মুক্তাদীও নয় তথা বেনামাযী। কখনো সে ইমামকে গালি দেয় আবার কখনো মুক্তাদির সাথে ঝগড়া বাধায়- তবে বুঝতে হবে সে একজন গায়ের মুক্বাল্লিদ’।[27]

আবার অন্য স্থানে উকাড়বী লিখেছেন, ‘এজন্যই যে যত বড় গায়ের মুক্বাল্লিদ হবে, সে তত বড় বেআদব ও অভদ্র হবে’।[28]

উকাড়বী আরো লিখেছেন, প্রতিটি গায়ের মুক্বাল্লিদ ব্যক্তিই ‘নিজের রায় নিয়ে গর্ববোধকারী’-এর প্রতিকৃতি। আর রাসূল (ছাঃ)-এর ভাষ্যানুসারে এমন লোকদের জন্য (গায়ের মুকাল্লিদদের) তওবা করার পথ রুদ্ধ।[29]

এই বক্তব্য এবং অনুরূপ অন্যান্য বক্তব্যের কারণে তাকলীদপন্থীদের আহলেহাদীছদের বিরুদ্ধে ‘গায়ের মুকাল্লিদ’ শব্দ ব্যবহার করা একেবারেই ভ্রান্ত, বাতিল ও পরিত্যাজ্য।

৪. ইমাম আহমাদ বিন সিনান আল-ওয়াসিত্বী (রহঃ) বলেছেন, দুনিয়াতে এমন কোন বিদ‘আতী নেই যে আহলেহাদীছদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে না’।[30]

আর এটা সুস্পষ্ট যে, প্রত্যেক আহলেহাদীছ তথা মুহাদ্দিছ, আলেম ও হাদীছের অনুসারী সাধারণ মানুষদের প্রতি সকল বিদ‘আতীই বিদ্বেষ পোষণ করে থাকে এবং হরেক রকমের উদ্ভট নামে যেমন ‘গায়ের মুকাল্লিদ’ বলার দ্বারা আহলেহাদীছদের সাথে মশকরা করে থাকে।

৫. হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) স্বীয় প্রসিদ্ধ ‘ক্বাছীদায়ে নূনিয়াহ’তে লিখেছেন, ‘ওহে আহলেহাদীছদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী এবং গালি প্রদানকারী! তুমি শয়তানের সাথে বন্ধুত্ব ও সখ্যতা গড়ার সুসংবাদ গ্রহণ করো’।[31]

এটা আপামর জনসাধারণেরও জানা আছে যে, প্রত্যেক কট্টর বিদ‘আতী জামা‘আত হিসাবে প্রত্যেক আহলেহাদীছের সাথে শত্রুতা রাখে এবং আহলেহাদীছ আলেম হৌক কিংবা সাধারণ জনতা হৌক তাদেরকে মন্দ নামে ডাকে।

৬. হাফেয ইবনে কাছীর (রহঃ) আহলেহাদীছদের একটি ফযীলত উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘কতিপয় সালাফে ছালেহীন এই আয়াতটি (বাণী ইসরাঈল ১৭/৭১) সম্পর্কে বলেছেন,هَذَا أَكْبَرُ شَرَفٍ لِأَصْحَابِ الْحَدِيْثِ لِأَنَّ إِمَامَهُمْ النَّبِىُّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ  ‘এটি আহলেহাদীছের জন্য সবচেয়ে বড় ফযীলত। কেননা তাদের ইমাম হচ্ছেন স্বয়ং রাসূল (ছাঃ)।[32]

যেমনিভাবে মুহাম্মাদ (ছাঃ) মুহাদ্দিছগণের ইমামে আযম (মহান ইমাম), তদ্রূপ তিনি সাধারণ আহলেহাদীছগণেরও ইমামে আযম। এটা কোন লুকোচুরি কথা নয়; বরং আহলেহাদীছদের খ্যাতিমান বাগ্মী ও সাধারণ বক্তাদের আলোচনা থেকেও এটা সুস্পষ্ট।

৭. হাদীছের ভিত্তি (قوام السنة ) খ্যাত ইমাম ইসমাঈল বিন মুহাম্মাদ আল-ফযল আল-ইস্পাহানী (রহঃ) আহলেহাদীছের প্রসঙ্গে বলেছেন, এরাই ক্বিয়ামত পর্যন্ত হক্বের উপরে বিজয়ী থাকবে।[33]

এতে প্রমাণিত হয় যে, ‘আহলেহাদীছ’ বলতে মুহাদ্দিছ এবং হাদীছের অনুসারী সাধারণ জনতা উভয়কেই বুঝানো হয়। আর এ দলটি ক্বিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক যুগেই বিদ্যমান থাকবে। এজন্য মাসঊদ আহমাদ ছাহেবের নিম্নোক্ত বক্তব্যটি অগ্রহণযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘মুহাদ্দিছগণ তো মারা গেছেন। বর্তমানে তো ঐ সকল লোক জীবিত রয়েছেন, যারা তাঁদের গ্রন্থ সমূহ থেকে নকল করে থাকে’।[34]

৮. আবূ ইসমাঈল আব্দুর রহমান বিন ইসমাঈল আছ-ছাবূনী বলেছেন, ‘আহলেহাদীছগণ এই আক্বীদা পোষণ করেন এবং একথার সাক্ষ্য দেন যে, আল্লাহ তা‘আলা সাত আসমানের উপরে স্বীয় আরশের উপরে সমাসীন আছেন’।[35]

মুহাদ্দিছীনে কেরাম হৌক কিংবা তাঁদের অনুসারী সাধারণ জনগণ হৌক সবার এটাই আক্বীদা যে, আল্লাহ তা‘আলা আরশের উপরে সমাসীন আছেন এবং তিনি স্বীয় সত্তায় সর্বত্র বিরাজমান নন। বরং তাঁর জ্ঞানের পরিধি এবং ক্ষমতার ব্যাপকতা সবকিছুকে বেষ্টন করে আছে।

৯. আবূ মানছূর আব্দুল ক্বাহের বিন ত্বাহের আল-বাগদাদী সিরিয়া ও অন্যান্য সীমান্ত অঞ্চলের অধিবাসীদের সম্পর্কে বলেছেন, كُلُّهُمْ عَلَى مَذْهَبِ أَهْلِ الْحَدِيْثِ مِنْ أَهْلِ السُّنَّةِ  ‘তারা সকলেই আহলে সুন্নাত। আর তারা আহলেহাদীছ মাযহাবের উপরে রয়েছে’।[36]

১০. শায়খুল ইসলাম হাফেয ইবনে তায়মিয়া (রহঃ)-হাদীছের উপর আমলকারী সাধারণ লোকদেরকেও ‘আহলেহাদীছ’ হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন।[37]

১১. ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেছেন, আমার নিকটে ঐ ব্যক্তিই আহলেহাদীছ, যিনি হাদীছের উপর আমল করেন।[38]

১২. সূরা বণী ইসরাইলের ৭১ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহঃ) মন্তব্য করেছেন, আহলেহাদীছদের জন্য এর চেয়ে অধিক ফযীলতপূর্ণ আর কোন বক্তব্য নেই। কেননা রাসূল (ছাঃ) ব্যতীত আহলেহাদীছদের আর কোন ইমামে আ‘যম বা বড় ইমাম নেই।[39]

১৩. রশীদ আহমাদ লুধিয়ানবী দেওবন্দী লিখেছেন, প্রায় দ্বিতীয় তৃতীয় হিজরী শতকে হক্বপন্থীদের মাঝে শাখা-প্রশাখাগত মাসআলা সমূহের সমাধানকল্পে সৃষ্ট মতভেদের প্রেক্ষিতে পাঁচটি মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ চার মাযহাব ও আহলেহাদীছ। তৎকালীন সময় হ’তে অদ্যাবধি উক্ত পাঁচটি তরীকার মধ্যেই হক্ব সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে মনে করা হয়।[40]

উক্ত বক্তব্য দ্বারা তিনটি বিষয় পরিষ্কারভাবে সাব্যস্ত হয়।

ক. ‘আহলেহাদীছ’ হক্বের উপর রয়েছে।

খ. ‘আহলেহাদীছ’ দ্বারা মুহাদ্দিছীনে কেরাম এবং তাদের অনুসারী আম জনতা উভয়েই উদ্দেশ্য।

গ. চার মাযহাব ব্যতিরেকে পঞ্চম দল হ’ল ‘আহলেহাদীছ’। এজন্য সরফরায খান ছফদরের মতানুসারে অন্যদেরকে ‘আহলেহাদীছ’ বলে স্বীকৃতি দেয়া ভুল হয়েছে ।

১৪. আহমাদ আলী লাহোরীর এই বক্তব্যটি পূর্বেই উল্লিখিত হয়ে গেছে যে, তিনি বলেছেন, আহলেহাদীছগণ কাদরিয়া তরীকার অনুসারীও নন, আবার হানাফীও নন। তবে তারা আমার মসজিদে চল্লিশ বছর যাবৎ ছলাত আদায় করে আসছে। আমি তাদেরকে হক্বের উপর প্রতিষ্ঠিত বলে মনে করি।[41]

আহমাদ আলী লাহোরীর বক্তব্য দ্বারা এটি একেবারেই পরিষ্কার যে, স্রেফ মুহাদ্দিছগণই আহলেহাদীছ নন। বরং তাদের অনুসারী সাধারণ লোকজনও আহলেহাদীছ।

১৫. দেওবন্দ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ক্বাসেম নানূতুবীর পসন্দনীয় গ্রন্থ ‘হক্কানী আক্বায়েদে ইসলাম’ গ্রন্থে আব্দুল হক হক্কানী দেহলভী বলেছেন, শাফেঈ, হাম্বলী, মালেকী, হানাফী মাযহাবের অনুসারীগণ আহলে সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। আর আহলেহাদীছগণও আহলে সুন্নাতের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত।[42]

এই বক্তব্যে যেমনভাবে হানাফী, শাফেঈ, হাম্বলী, মালেকী নামগুলি দ্বারা তাদের আম জনতাকেও বুঝানো হয়েছে। ঠিক তেমনিভাবে উক্ত বক্তব্যে ‘আহলেহাদীছ’ দ্বারা মুহাদ্দিছীনে কেরামের সাধারণ অনুসারীদেরকেও বুঝানো হয়েছে।

১৬. মুফতী কেফায়াতুল্লাহ দেহলভী (দেওবন্দী) একটি প্রশ্নের জবাবে লিখেছেন, ‘হ্যা, আহলেহাদীছগণ মুসলমান এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অন্তর্ভুক্ত। তাদের সাথে বিয়ে-শাদীর বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েয। শুধু তাক্বলীদ বর্জন করাতে ইসলামে কোন যায় আসে না। এমনকি তাক্বলীদ বর্জনকারী ব্যক্তি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত হ’তেও বের হয়ে যায় না।[43]

এই ফৎওয়া ও পূর্বোক্ত (১৩ নং) ফৎওয়া দ্বারা সুস্পষ্ট হ’ল যে, ‘আহলেহাদীছ’ আহলে সুন্নাতেরই অন্তর্ভুক্ত এবং হাদীছের উপরে আমলকারী সাধারণ লোকদেরকেও ‘আহলেহাদীছ’ উপাধিতে ভূষিত করা সম্পূর্ণ সঠিক।

১৭. চতুর্থ হিজরী শতাব্দীর ইতিহাসবিদ বিশারী মাক্বদেসী (মৃঃ ৩৭৫ হিঃ) মানছূরার (সিন্ধুর) অধিবাসীদের সম্পর্কে বলেছেন, أَكْثَرُهُمْ أَصْحَابُ حَدِيْثٍ  ‘তাদের অধিকাংশই আহলেহাদীছ’।[44]

আর যুক্তির নিরীখে এটি প্রতীয়মান হয় যে, সে সময় সিন্ধু প্রদেশের সকল অধিবাসী মুহাদ্দিছ ছিলেন না। বরং তাদের মধ্যে মুহাদ্দিছগণের অনুসারী বহু সাধারণ লোক ছিলেন।

১৮. ইশারাতে ফরীদী অর্থাৎ ‘মাক্বাবীসুল মাজালিস’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, ‘আহলেহাদীছগণের ইমাম হযরত ক্বাযী মুহাম্মাদ বিন আলী শাওকানী ইয়ামানী (রহঃ) ‘সামা’ (সঙ্গীত)-এর উপর একটি প্রামাণ্য পুস্তিকা লিখেছেন। পুস্তিকাটির নাম ‘ইবত্বালু দা‘ওয়া ইজমা’ (ইজমা দাবীর অসারতা)। উক্ত বইয়ে তিনি রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ দ্বারা প্রমাণ করেছেন যে, ‘সামা’ জায়েয।[45]

উক্ত বক্তব্যে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে যে, ‘আহলেহাদীছ’ অর্থ হিন্দুস্তান সহ অন্যান্য দেশের সাধারণ আহলেহাদীছগণ। আর অবশিষ্ট বক্তব্য সম্পর্কে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিম্নে তুলে ধরা হ’ল :

প্রথমত : শাওকানী সমস্ত আহলেহাদীছের ‘ইমামে আযম’-নন। বরং আহলেহাদীছের ইমামে আযম হ’লেন বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)। শাওকানী তো পরবর্তীদের মধ্য হ’তে একজন আলেম ছিলেন।

দ্বিতীয়ত : যদি ‘সামা’ দ্বারা কাওয়ালী, গান-বাজনা এবং বাদ্যযন্ত্র সম্বলিত সংগীত উদ্দেশ্য হয়, তাহ’লে ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী তা হারাম। অনুরূপভাবে শিরকী-বিদ‘আতী কবিতা পাঠ করাও হারাম।

১৯. দেওবন্দী মুফতী মুহাম্মাদ আনওয়ার ছূফী আব্দুল হামীদ সোয়াতী কর্তৃক প্রণীত ‘নামাযে মাসনূন’ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, নিঃসন্দেহে হানাফী মাযহাব অনুসারীদের স্বীয় মাযহাবের সত্যতার এবং আত্মিক প্রশান্তির জন্য ‘নামাযে মাসনূন’-একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। ৮৩৭ পৃষ্ঠাব্যাপী উক্ত গ্রন্থে ছালাতের যরূরী বিষয়াবলী বিশদভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। আমার মতে এ গ্রন্থটি পাঠ করা শুধু হানাফী মাযহাবের প্রতিটি ইমাম ও খত্বীবের জন্যই উপকারী নয়। বরং সাধারণ হানাফীদের জন্যও উপকারী। এমনকি মধ্যপন্থী আহলেহাদীছ ব্যক্তিদের জন্যও উক্ত গ্রন্থখানি আলোকবর্তিকা স্বরূপ হবে ইনশাআল্লাহ।[46] উক্ত উক্তিতে মুহাম্মাদ আনওয়ারও হাদীছের অনুসারী সাধারণ ব্যক্তিদেরকে ‘আহলেহাদীছ’ উপাধিতে ভূষিত করেছেন।

২০. মুহাম্মাদ ওমর নামক এক কট্টর দেওবন্দী লিখেছেন, সাধারণ আহলেহাদীছগণের নিকটে আমাদের বিনীত নিবেদন এই যে, আপনাদেরকে এই সত্য থেকে বঞ্চিত রেখে আপনাদের চিন্তাগত শূন্যতা এনে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ আহলেহাদীছগণ এটা ভেবে থাকবেন যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অন্তর্ভুক্ত হানাফীগণ কেন আহলেহাদীছ আলেমদের কিতাবগুলোর উপরে আমল করেন না?[47]

এই শঠতাপূর্ণ উক্তিতেও সাধারণ আহলেহাদীছ জনগণকে ‘আহলেহাদীছ’ বলে মেনে নেওয়া হয়েছে।

উল্লিখিত ২০টি উদ্ধৃতি স্তূপ থেকে একটি মুষ্টি মাত্র। নইলে এগুলি ব্যতীত আরো বহু উদ্ধৃতি মওজুদ রয়েছে।

কতিপয় ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নিজেকে আহলেহাদীছ বলেন না। বরং তারা নিজেকে আহলেহাদীছ বলে পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করেন এবং বিভিন্ন নামে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। আবার কেউ কেউ গায়ের আহলেহাদীছদের বিরোধিতার কারণে ‘আহলেহাদীছ’ নাম বলতে ভয় পান। আবার কেউ নিজেকে ‘আহলে ছহীহ হাদীছ’ ইত্যাদি বলে বিশ্বাস করাতে চেষ্টা করে থাকেন। এ ধরনের কাজ-কারবার ও ছলচাতুরি ভ্রান্তি বৈ কিছুই নয়। হকপন্থীদের বৈশিষ্ট্যগত নাম সমূহের মধ্যে আহলে সুন্নাত, আহলেহাদীছ, সালাফী, আছারী ইত্যাদি অনেক সুন্দর সুন্দর উপাধি রয়েছে। তবে এসবের মধ্যে ‘আহলেহাদীছ’ নামটি সর্বশ্রেষ্ঠ। এ নামটির জায়েয হওয়ার ব্যাপারে সালাফে ছালেহীনের ইজমা রয়েছে। আল-হামদুলিল্লাহ।

সময়ের অনিবার্য দাবী হ’ল সকল ‘আহলেহাদীছ’ আলেম ও আহলেহাদীছ আম জনতা পরস্পর ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাক। সমস্ত মতানৈক্যকে বিদায় জানিয়ে কুরআন ও হাদীছের ঝান্ডাকে পৃথিবীর বুকে উড্ডীন করার জন্য মনেপ্রাণে সচেষ্ট হোক। ওমা আলায়না ইল্লাল বালাগ।

[চলবে]



* সৈয়দপুর, নীলফামারী।

[1]. ইবনে মাজাহ হা/৬; তিরমিযী হা/২১৯২, সনদ ছহীহ

[2]ইমাম হাকেম, মা‘রিফাতু উলূমিল হাদীছ হা/২, সনদ হাসান

[3]. ঐ, পৃঃ ১১২

[4].  তিরমিযী হা/২১৯২ প্রভৃতি।

[5].  খত্বীব বাগদাদী, মাসআলাতুল ইহতিজাজ বিশ-শাফেঈ, পৃঃ ৪৭, সনদ ছহীহ।

[6].  ছহীহ ইবনে হিববান, ১ম খন্ড, পৃঃ ২৬১, হা/৬১

[7].  আল-আদাবুশ শারঈয়্যাহ, ১/২১১

[8].  মা‘রিফাতু উলূমিল হাদীছ, পৃঃ ১১৩

[9].  তিরমিযী, হা/৪৮৪; সনদ হাসান।

[10].  ইবনে হিববান, হা/৯১১।

* হাফেয নাদীম যহীর, ১২ই শা‘বান, ১৪৩৩ হিজরী

[11].  মা‘রিফাতু উলূমিল হাদীছ, হা/৬, সনদ ছহীহ

[12].  ঐ, পৃঃ ১১৫।

[13].  মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ৪/৯৫

[14].  ইমাম বুখারী, আত-তারীখুল কাবীর ২/৪২৯; আল-জারহু ওয়াত-তা‘দীল, ৬/৩০৩।

[15].  ছহীহ ইবনে হিববান, আল-ইহসান, হা/৬১২৯; অন্য একটি কপির হাদীছ নং ৬১৬২।

[16].  আল-জামা‘আতুল ক্বাদীমাহ বেজওয়াবে আল-ফিরক্বাতুল জাদীদাহ, পৃঃ ৫।

[17].  ত্বায়েফাহ মানছূরাহ, পৃঃ ৩৮; আল-কালামুল মুফীদ, পৃঃ ১৩৯

[18]. ত্বায়েফাহ মানছূরাহ, পৃঃ ৩৯।

[19].  হাক্বীক্বাতুল ফিক্বহ, ২য় খন্ড (করাচী : ইদারাতুল কুরআন ওয়াল উলূম আল-ইসলামিয়া), পৃঃ ২২৮

[20].  ইজতিহাদ আওর তাক্বলীদ কী বে-মিছাল তাহক্বীক্ব (পশ্চিম পাকিস্তান : ইলমী মারকায আনারকলী লাহোর), পৃঃ ৪৮

[21].  দ্র: মাসআলাতুল ইহতিজাজ বিশ-শাফেঈ, পৃঃ ৪৭; তিরমিযী, হা/২২২৯; ইমাম হাকেম, মা‘রিফাতু উলূমিল হাদীছ, হা/২

[22].  মা‘রিফাতু উলূমিল হাদীছ, পৃঃ ৪

[23].  খত্বীব বাগদাদী, শারফু আছহাবিল হাদীছ, হা/৮৫।

[24].  মালফূযাতে ত্বাইয়েবাহ, পৃঃ ১১৫; অন্য একটি সংস্করণের পৃঃ নং ১২৬

[25].  ছহীহ ইবনে হিববান হা/৬১২৯; অন্য একটি সংস্করণের হাদীছ নং ৬১৬২

[26].  ইমাম আজুর্রী, আশ-শারী‘আহ, পৃঃ ৯৭৫

[27].  তাজাল্লিয়াতে ছফদর, ৩/৩৭৭।

[28].  ঐ, ৩/৫৯০।

[29].  ঐ, ৬/১৬৪

[30].  মা‘রিফাতু উলূমিল হাদীছ, পৃঃ ৪।

[31].  ক্বাছীদায়ে নূনিয়া, পৃঃ ১৯৯।

[32].  তাফসীর ইবনে কাছীর, ৪/১৬৪।

[33].  আল-হুজ্জাহ ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ, ১/২৪৬

[34]আল-জামা‘আতুল ক্বাদীমাহ, পৃঃ ২৯

[35].  আক্বীদাতুস সালাফ আছহাবুল হাদীছ, পৃঃ ১৪

[36].  উছূলুদ দ্বীন, পৃঃ ৩১৭

[37]মাজমূঊ ফাতাওয়া, ৪/৯৫

[38].  ইমাম খত্বীব বাগদাদী, আল-জামে‘ ১/৪৪।

[39].  তাদরীবুর রাবী, ২/১২৬, ২৭তম প্রকার

[40].  আহসানুল ফাতাওয়া, ১/৩১৬।

[41].  মালফূযাতে ত্বাইয়েবাহ, পৃঃ ১১৫; পুরানা সংস্করণের পৃঃ নং ১২৬

[42].  হক্কানী আক্বায়েদে ইসলাম, পৃঃ ৩।

[43].  কিফায়াতুল মুফতী, ১/৩২৫

[44].  আহসানুত তাক্বাসীম ফি মা‘রিফাতিল আক্বালীম, পৃঃ ৪৮১

[45].  ইশারাতে ফরীদী, পৃঃ ১৫৬।

[46]নামাযে মাসনূন, ভূমিকা দ্রঃ।

[47].  ছুপে রায, ৪/২।

 

 

HTML Comment Box is loading comments...