নবীনদের পাতা

যুবসমাজের নৈতিক অধঃপতন  : কারণ ও প্রতিকার

আব্দুল হালীম বিন ইলিয়াস

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

প্রতিকার :

যুবসমাজই আগামী দিনে দেশ ও জাতির কর্ণধার। তাদের নৈতিক ও চারিত্রিক অবক্ষয় হ’লে দেশ ও জাতি নিমজ্জিত হবে অধঃপতনের অতল তলে। তাই তাদের অধঃপতন প্রতিরোধ ও প্রতিহত করতে প্রয়োজন যুগোপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এক্ষেত্রে কতিপয় প্রস্তাবনা পেশ করা হ’ল-

১. যুবকদের মধ্যে আল্লাহভীতি সৃষ্টি করা :

মানুষের মধ্যে সৎ কাজের উদ্দীপক ও প্রেরণাদায়ক এবং অসৎ কাজ থেকে বাঁচার মত একটি শক্তিশালী অনুভূতির নাম হচ্ছে তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি। বর্তমানে ঘুণে ধরা যুবসমাজকে পাপাচার, মন্দকাজ ও নৈতিক অধঃপতন থেকে উত্তরণের সর্বোত্তম পথ হচ্ছে তাদের মধ্যে তাক্বওয়া বা আল্লাহভীরুতা সৃষ্টি করা। যখন সে জানবে এবং বুঝবে যে, আমার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য ছোট-বড় যাবতীয় কথাবার্তা ও কর্মকান্ড আল্লাহপাক দেখছেন এবং ফিরিশতাগণ তা লিপিবদ্ধ করছেন। এর জন্য একদিন অবশ্যই আমাকে আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। যখন সে বুঝবে যে, কবরের আযাব, হাশরের ময়দান এবং জাহান্নামের শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ, তখনই সে তার যাবতীয় উদ্যম, জোশ, বল-শক্তি, উদ্দীপনা ও চিন্তা-চেতনাকে সুসংহত রাখবে এবং অসৎ পথে ব্যবহার থেকে দূরে থাকবে। যা দুনিয়াবী কোন আইনের পক্ষে সম্ভব নয়। যদি তারা ভুল করে কোন অন্যায় পথে পা বাড়ায় তাহ’লে তাক্বওয়ার বলেই তওবা করে নিজের পাপ কাজ অকপটে স্বীকার করে দুনিয়াবী যেকোন শাস্তিকে হাসিমুখে বরণ করে নেবে। এর বাস্তব প্রমাণ আমরা দেখতে পাই ছাহাবীদের জীবনে। যুবক মা‘ইয বিন মালিক (রাঃ) যেনা করার পর পরকালীন শাস্তির ভয়ে তওবা করে এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট নিজের অপরাধ স্বীকার করে। অতঃপর তাকে রজম করা হয়। একইভাবে আযদ বংশের গামেদী গোত্রীয় এক যুবতী মহিলা তাক্বওয়ার বলে বলীয়ান হয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট এসে নিজের যেনার অপরাধ স্বীকার করে। অতঃপর তাকেও রজম করা হয়।[1] কোন সে আদর্শ ও শক্তি! যা ছাহাবীদেরকে নিজের অপরাধ স্বীকার করে দুনিয়াবী সর্বোচ্চ শাস্তি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছিল? এর জবাবে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, ইসলামী আদর্শ ও তাক্বওয়া। তাই যুবসমাজের মাঝে তাক্বওয়ার করতে পারলে ইনশাআল্লাহ তারা তাদের নীতি-নৈতিকতা ধূলায় ধূসরিত হতে দিবে না। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا اتَّقُوْا اللهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلاَ تَمُوْتُنَّ إِلاَّ وَأَنْتُم مُّسْلِمُوْنَ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং প্রকৃত মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না’ (আলে ইমরান ৩/১০২)

২. শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো :

মহান আল্লাহ বলেন, اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِيْ خَلَقَ ‘পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন’ (‘আলাক ১)। এর মাধ্যমে শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উল্লেখ্য যে, নৈতিক ও বৈষয়িক জ্ঞানের সমন্বয়ে প্রণীত শিক্ষা ব্যবস্থাই হ’ল পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা ব্যবস্থা। মানবীয় জ্ঞানের সাথে যদি অহি-র জ্ঞানের আলো না থাকে, তাহ’লে যে কোন সময় মানুষ পথভ্রষ্ট হবে এবং বস্ত্তগত উন্নতি তার জন্য ধ্বংসের কারণ হবে। বিগত যুগে কওমে নূহ, আদ, ছামূদ, শো‘আয়েব এবং ফেরাঊন ও তার কওমের পরিণতি, আধুনিক যুগে ১ম ও ২য় বিশ্বযুদ্ধের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং সাম্প্রতিককালের বসনিয়া, সোমালিয়া, কসোভো এবং সর্বশেষ ইরাক ও আফগানিস্তান ট্রাজেডী এসবের বাস্তব প্রমাণ বহন করে।[2]

যুবসমাজের নৈতিক অধঃপতন প্রতিরোধে তাওহীদ ও রিসালাতের ভিত্তিতে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সর্বস্তরে ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। দেশে প্রচলিত মাদরাসা শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার দ্বিমুখী ধারাকে সমন্বিত করে একক ও পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সেই সাথে নিম্নোক্ত কাজগুলো করা দরকার।

ক. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দলাদলি মুক্ত রাখা :

বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নোংরা রাজনীতি ও দলাদলির নামে মারামারি, কাটাকাটি ও বিভিন্ন অশ্লীল কর্মকান্ড ঘটে থাকে। এজন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহকে সর্বপ্রকারের দলাদলি মুক্ত রাখতে হবে। এছাড়া মুসলমানদের ঈমান, আক্বীদা, আমল-আখলাক বিনষ্টকারী যাবতীয় প্রকার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহকে মুক্ত রাখতে হবে। সেখানে বয়স, যোগ্যতা ও মেধাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে।

খ. সহ-শিক্ষা ব্যবস্থা বাতিল করা :

আল্লাহ তা‘আলা নারী-পুরুষকে পরস্পরের প্রতি আকর্ষণীয় করে সৃষ্টি করেছেন। তাই ছেলে-মেয়ে ও যুবক-যুবতীদের একই প্রতিষ্ঠানে পাশাপাশি বসে লেখাপড়া করার কারণে তারা অবাধ মেলামেশার সুযোগ পাচ্ছে। এতে তাদের চরিত্র নষ্ট হচ্ছে। তাই যুবসমাজকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষায় সহ-শিক্ষা ব্যবস্থা বাতিল করে ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য পৃথক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ অসম্ভব হ’লে একই প্রতিষ্ঠানে পৃথক শিফটিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

৩. পৃথক কর্মক্ষেত্রের ব্যবস্থা :

বর্তমানে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষ একই সাথে কাজ করে। এই ধারা বাতিল করে নারী-পুরুষের জন্য পৃথক কর্মক্ষেত্র ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে সকলে মানসিক চাপমুক্ত পরিবেশে জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে।

৪. বেকারত্ব দূর করা :

কথায় বলে ‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা’। যুবসমাজ বেকার থাকলে তারা বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়বে। তাই তাদেরকে বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ, যোগ্য ও কর্মঠ করে গড়ে তুলতে হবে এবং তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

৫. বিচার বিভাগকে স্বাধীন করা :

যুবসমাজকে নৈতিক অধঃপতন থেকে ফিরিয়ে আনতে হ’লে বিচার বিভাগকে সরকারের যাবতীয় হস্তক্ষেপ, প্রভাব ও চাপ থেকে মুক্ত এবং স্বাধীন রাখতে হবে। সাথে সাথে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ইসলামী আইন মুতাবিক নির্ভয়ে, নিঃশঙ্কচিত্তে বিচারের রায় প্রদান ও তা কার্যকর করতে হবে। তাহ’লে দুষ্ট চরিত্রের যুবক-যুবতীরা শাস্তির ভয়ে পাপের পথ থেকে ফিরে আসবে ইনশাআল্লাহ। মহানবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর যুগে মাখযূম গোত্রের এক মহিলা চুরি করলে তার গোত্রের লোকজন তার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট সুপারিশ করার জন্য উসামা বিন যায়েদ (রাঃ)-এর কাছে আসে। উসামা (রাঃ) এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে আলোচনা করলে তিনি রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বলেন,

فَإِنَّمَا أَهْلَكَ النَّاسَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوْا إِذَا سَرَقَ فِيْهِمُ الشَّرِيْفُ تَرَكُوْهُ، وَإِذَا سَرَقَ فِيْهِمِ الضَّعِيْفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ، وَالَّذِىْ نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا-

‘তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা এ কারণে ধ্বংস হয়েছে যে, যখন তাদের মধ্যে উচ্চ শ্রেণীর কেউ চুরি করত, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত এবং যখন দুর্বল কেউ চুরি করত তখন তার উপর নির্ধারিত শাস্তি প্রয়োগ করত। যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতেমাও চুরি করত, তবে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম’।[3]

৬. পরকালীন চেতনা ও নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টি :

যুবকদের মধ্যে পরকালীন জীবনের স্থায়ীত্ব ও জবাবদিহিতা সম্পর্কে চেতনা জাগ্রত করতে হবে। কেননা পার্থিব জগতের ক্ষণস্থায়ী জীবনের পর রয়েছে চিরস্থায়ী ও অনন্ত জীবন। সে জীবনের তুলনায় এ জীবন অত্যন্ত তুচ্ছ ও নগণ্য। মহান আল্লাহ বলেন,وَمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَلَعِبٌ وَإِنَّ الدَّارَ الْآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ لَوْ كَانُوْا يَعْلَمُوْنَ ‘এই পার্থিব জীবন ক্রীড়া কৌতুক বৈ কিছুই নয়। পরকালের জীবনই প্রকৃত জীবন। যদি তারা জানত’ (আনকাবূত ২৯/৬৪)। তিনি আরো বলেন, كَأَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَهَا لَمْ يَلْبَثُوْا إِلَّا عَشِيَّةً أَوْ ضُحَاهَا ‘যেদিন তারা একে (ক্বিয়ামতকে) দেখবে, সেদিন (তাদের) মনে হবে যেন তারা দুনিয়াতে এক সন্ধ্যা অথবা এক সকাল অবস্থান করেছে’ (নাযি‘আত ৭৯/৪৬)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, وَاللهِ مَا الدُّنْيَا فِى الآخِرَةِ إِلاَّ مِثْلُ مَا يَجْعَلُ أَحَدُكُمْ إِصْبَعَهُ فِى الْيَمِّ فَلْيَنْظُرْ بِمَ يَرْجِعُ  ‘আল্লাহর কসম! আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার উদাহরণ হ’ল, তোমাদের কেউ মহাসাগরের মধ্যে নিজের একটি অঙ্গুলি ডুবিয়ে দিয়ে লক্ষ্য করে দেখুক তা কি (পরিমাণ পানি) নিয়ে আসল’।[4]

জাবির (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একটি মৃত কানকাটা বকরীর বাচ্চার নিকট দিয়ে অতিক্রমকালে বললেন, তোমাদের মধ্যে কে আছে যে, একে এক দিরহামের বিনিময়ে ক্রয় করতে পসন্দ করবে? ছাহাবীগণ বললেন, আমরা তো একে কোন কিছুর বিনিময়েই ক্রয় করতে পসন্দ করব না। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! এটা তোমাদের কাছে যতটুকু নিকৃষ্ট আল্লাহর কাছে দুনিয়া এর চেয়েও নিকৃষ্ট’।[5]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এভাবে মানুষকে পরকালীন চেতনায় উজ্জীবিত করে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নৈতিক  মূল্যবোধ সৃষ্টি করেন। আমাদেরও তাঁরই দেখানো পথে যুবকদেরকে নৈতিক অধঃপতন থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে।

৭. নেশাকর দ্রব্য নিষিদ্ধকরণ :

বিভিন্ন রকমের নেশাকর দ্রব্য যুবকদেরকে নৈতিক অধঃপতনের দিকে ধাবিত করছে। তাই নেশাকর দ্রব্যাদি নিষিদ্ধ করতে হবে। এগুলো ব্যবহারকারীদের জন্য শাস্তির বিধান সরকারীভাবে কার্যকর করতে হবে। সরকারীভাবে এগুলোর উৎপাদন, বিপণন, বাজারজাতকরণ ইত্যাদি বন্ধ করতে হবে। যুবকদের মাঝে নেশাকর দ্রব্যের অপকারিতা তুলে ধরতে হবে যাতে এর প্রতি তাদের ঘৃণা জন্মে এবং তা থেকে ফিরে আসে। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,كُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ  ‘প্রত্যেক নেশাকর বস্ত্ত হারাম’।[6] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মদের সাথে সম্পৃক্ত দশ ব্যক্তিকে লা‘নত করেছেন।[7] তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহ ঐ ব্যক্তির জন্য ওয়াদাবদ্ধ, যে নেশাকর বস্ত্ত পান করে তাকে ‘ত্বীনাতুল খাবাল’ পান করাবেন। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, সেটি কি বস্ত্ত হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! তিনি বললেন, জাহান্নামীদের দেহের ঘাম অথবা দেহ নিঃসৃত রক্তপুঁজ’।[8]

আবুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, আমার বন্ধু মুহাম্মাদ (ছাঃ) আমাকে অছিয়ত করেছেন যে, ولاَ تَشْرِبِ الْخَمْرَ فَإِنَّهَا مِفْتَاحُ كُلِّ شَرٍّ  ‘তুমি মদ পান কর না। কেননা তা সকল অনিষ্টের মূল’।[9]

৮. সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দান :

সাধারণত পিতা-মাতার স্বভাব-চরিত্রের উপর সন্তানের স্বভাব-চরিত্র গড়ে উঠে। এজন্য পিতা-মাতাকে উত্তম চরিত্রের অধিকারী হ’তে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, ‘প্রত্যেক সন্তান ফিৎরাতের (ইসলামী স্বভাব) উপর জন্ম গ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদী, খ্রিস্টান ও অগ্নিপূজক করে গড়ে তোলে’।[10] তিনি আরো বলেন, ‘পরিবারকে সংশোধন করার জন্য চাবুক এমন স্থানে রাখ যেন পরিবার তা দেখতে পায়। কারণ এটাই তাদের জন্য শিষ্টাচার’।[11] তাই পিতা-মাতার কর্তব্য সন্তানকে শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া। তাহ’লে তারা উত্তম চরিত্রের অধিকারী হবে ইনশাআল্লাহ।

৯. উত্তম উপদেশ প্রদান :

পিতা-মাতার দায়িত্ব হ’ল তারা ছেলে-মেয়েদেরকে উত্তম উপদেশ প্রদান করবেন। সন্তানদের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে তারা ইসলামী আদর্শে গড়ে উঠে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করতে সচেষ্ট হয়। মহান আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا قُوْا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيْكُمْ نَاراً وَقُوْدُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেকে এবং তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে বাঁচাও, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর’ (তাহরীম ৬৬/৬)

সন্তানদেরকে উত্তম পথে আনার ব্যাপারে লুকমান হাকীম কর্তৃক তাঁর পুত্রের প্রতি প্রদত্ত নয়টি উপদেশ পিতা-মাতার জন্য বিশেষভাবে লক্ষণীয় (লুকমান ৩১/১৩-১৯)

১০. সুস্থ সংস্কৃতি ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা :

যুবসমাজকে নৈতিক দিক দিয়ে উন্নত করতে হ’লে সুস্থ, সুন্দর চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। উপযুক্ত শরীরচর্চা, মুক্ত বায়ু সেবন, হৃদয়ের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের জন্য কুরআন তেলাওয়াত, ইসলামী জাগরণী, কবিতা ইত্যাদি বিষয়ের উপরে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা। সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে অন্যায়ের প্রতি ঘৃণা, মানুষের প্রতি ভালবাসা, পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির প্রতি তাদের কর্তব্য ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা। রেডিও-টিভিসহ সকল প্রচার মাধ্যমে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রচারের ব্যবস্থা করা। যাবতীয় অশ্লীল বই, পত্র, সাময়িকী বন্ধ করা। সকল প্রকার বিজাতীয় সংস্কৃতি বন্ধ করে সুস্থ সংস্কৃতি চালু করা।

১১. উত্তম বন্ধু নির্বাচন :

কথায় বলে, সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎসঙ্গে সর্বনাশ। যুবসমাজকে নৈতিক বলে বলীয়ান ও উন্নত করতে হ’লে সৎসঙ্গ গ্রহণ ও অসৎসঙ্গ ত্যাগ করতে হবে। সৎ ও চরিত্রবান বন্ধুদের সাথে থাকলে তারাও তাদের গুণে গুণান্বিত হবে এবং কল্যাণের পথে পরিচালিত হবে। বন্ধু নির্বাচন সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘সৎসঙ্গ ও অসৎসঙ্গের দৃষ্টান্ত হচ্ছে কস্ত্তরি বিক্রেতা ও কামারের হাপরে ফুঁক দানকারীর ন্যায়। কস্ত্তরি বিক্রেতা হয়তো এমনিতেই তোমাকে কিছু দিয়ে দিবে অথবা তুমি তার কাছ থেকে কিনে নিবে কিংবা তুমি তার কাছ থেকে সুঘ্রাণ অবশ্যই পাবে। আর কামারের হাপরের ফুলকি তোমার পোশাক-পরিচ্ছদ পুড়িয়ে দিবে অথবা তুমি তার নিকট থেকে দুর্গন্ধ অবশ্যই পাবে’।[12]

১২. ছালাতে অভ্যস্ত করানো :

মহান আল্লাহ বলেন,إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاء وَالْمُنكَرِ  ‘নিশ্চয়ই ছালাত মুমিনকে নির্লজ্জ ও অপসন্দনীয় কাজ হ’তে বিরত রাখে’ (আনকাবূত ২৯/৪৫)। পবিত্র কুরআনের সর্বাধিক আলোচিত বিষয় হ’ল ছালাত। ছালাতের বিধ্বস্তি জাতির বিধ্বস্তি হিসাবে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে’ (মারিয়াম ১৯/৫৯)। জাহান্নামী ব্যক্তির লক্ষণ হ’ল ছালাত ত্যাগ করা ও প্রবৃত্তির পূজারী হওয়া। তাই যুবসমাজকে ছালাতের প্রতি মনোযোগী করতে হবে এবং নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত মসজিদে আদায়ে অভ্যস্ত করতে হবে। তারা যদি ছালাতে অভ্যস্ত হয় তবে তারা অন্যায় পথ থেকে ন্যায়ের পথে ফিরে আসবে। নিম্নোক্ত হাদীছ তার বাস্তব প্রমাণ। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি এসে বলল যে, অমুক ব্যক্তি রাতে (তাহাজ্জুদের) ছালাত পড়ে। অতঃপর সকালে চুরি করে। জবাবে  রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে বলেন, ‘তার রাত্রি জাগরণ সত্বর তাকে ঐ কাজ থেকে বিরত রাখবে, যা তুমি বলছ’।[13]

১৩. উপযুক্ত বয়সে বিবাহ দান :

উপযুক্ত বয়সে ছেলে-মেয়েকে বিবাহ দেওয়া পিতা-মাতা ও অভিভাবকদের দায়িত্ব। এতে তাদের মন-মস্তিষ্ক বাজে চিন্তা থেকে মুক্ত থাকে এবং চরিত্র উন্নত হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা তা চক্ষুকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাযত করে। আর যে সামর্থ্য রাখে না সে যেন ছিয়াম রাখে। কেননা তা তার প্রবৃত্তিকে দমন করার জন্য উপযুক্ত মাধ্যম’।[14]

১৪. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আদর্শে চরিত্র গঠন :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছিলেন উত্তম চরিত্রের মূর্ত প্রতীক। মহান আল্লাহ বলেন, وَإِنَّكَ لَعَلى خُلُقٍ عَظِيْمٍ ‘তুমি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী’ (কলম ৬৮/৪)। তাই যুবসমাজ সহ পৃথিবীর সকল মানুষকে অবশ্যই মহানবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আদর্শে জীবন গঠন করতে হবে। তবেই সে নৈতিক অধঃপতনের পথ থেকে মুক্তি পাবে এবং উভয় জীবনে সফলতা লাভ করবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর চরিত্রকে নমুনা হিসাবে উল্লেখ করে মহান আল্লাহ বলেন, لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِيْ رَسُوْلِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ  ‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস রাখে তাদের জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মধ্যে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ’ (আহযাব ৩৩/২১)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে ঈমানে পরিপূর্ণ মুসলমান হচ্ছে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি’।[15]

উপসংহার :

কোন দেশের যুবসমাজ শিক্ষা-সংস্কৃতি ও নৈতিক বলে বলীয়ান হ’লে সে দেশের উন্নতি যেমন কেউ ঠেকাতে পারে না, অনুরূপভাবে কোন কারণে তাদের নৈতিক অধঃপতন ঘটলে সে দেশ ও জাতি অংকুরেই ধ্বংস হ’তে বাধ্য। আল্লাহ প্রদত্ত যৌবনের এই মহামূল্যবান সময়টাকে যুবসমাজ যদি অহি-র বিধান প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় ব্যয় না করে অন্যায় পথে ব্যয় করে এবং হেলায় নষ্ট করে, তবে তার হিসাব দিতে হবে ক্বিয়ামত দিবসে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

لاَ تَزُوْلُ قَدَمَا ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ عَنْ عُمْرِهِ فِيْمَا أَفْنَاهُ وَعَنْ شَبَابِهِ فِيْمَا أَبْلاَهُ وَمَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيْمَ أَنْفَقَهُ وَمَاذَا عَمِلَ فِيْمَا عَلِمَ.

‘ক্বিয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্নের জবাব না দিয়ে আদম সন্তান স্ব স্ব স্থান হ’তে এক কদমও নড়তে পরবে না। যথা- (১) সে তার জীবন কাল কিভাবে অতিবাহিত করেছে (২) তার যৌবনকাল কোথায় ব্যয় করেছে (৩) ধন-সম্পদ কিভাবে উপার্জন করেছে (৪) কোন পথে তা ব্যয় করেছে (৫) সে দ্বীনের কতটুকু জ্ঞানার্জন করেছে এবং অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী সে আমল করেছে কি-না’।[16] তাই আসুন, আমরা যুবসমাজকে নৈতিক অধঃপতনের কবল থেকে রক্ষা করে তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালনার সার্বিক চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন-আমীন!


* এম.ফিল গবেষক, আরবী বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

[1]. মুসলিম হা/১৬৯৫-৯৬; মিশকাত হা/৩৫৬২ ‘দন্ডবিধি’ অধ্যায়, বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৩৪০৬, ৭/৯০-৯১ পৃঃ

[2]. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, তাফসীরুল কুরআন, ৩০তম পারা, (রাজশাহী: হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২য় সংস্করণ ২০১৩), পৃঃ ৩৭৮  

[3]. বুখারী হা/৪৩০৪, ‘মাগাযী’ অধ্যায়, মুসলিম হা/১৬৮৮ ‘দন্ডবিধি’ অধ্যায়, ‘দন্ডের ব্যাপারে সুপারিশ নিষিদ্ধ’ অনুচ্ছেদ

[4]. মুসলিম, মিশকাত হা/৫১৫৬ রিক্বাক্ব অধ্যায়, বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৯২৯, ৯/১৯৯ পৃঃ

[5]. মুসলিম, মিশকাত হা/৫১৫৭, ‘রিক্বাক্ব’ অধ্যায়, বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৯৩০, ৯/১৯৯ পৃঃ

[6].  মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৩৯, ‘দন্ডবিধি সমূহ’ অধ্যায়

[7].  তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/২৭৭৬

[8]. মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৩৯

[9]. ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/৫৮০।

[10]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৯০, ‘ঈমান’ অধ্যায়

[11]. সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৪৪৬

[12]. মুক্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫০১০, ‘আদব’ অধ্যায়, ‘আল্লাহর জন্য ও আল্লাহর সাথে ভালবাসা’ অনুচ্ছেদ

[13]. আহমাদ হা/৯৭৭৭, বায়হাকী শু‘আব, মিশকাত হা/১২৩৭, ছালাত অধ্যায়-৪, ‘রাত্রি জাগরণে উৎসাহ দান’ অনুচ্ছেদ-৩৩

[14]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩০৮০ ‘বিবাহ’ অধ্যায়

[15]. তিরমিযী হা/১১৬২

[16]. তিরমিযী হা/২৪১৭; মিশকাত হা/৫১৯৭; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৯৭০ ৯/২১৩ পৃঃ

 

 

 

 

 

HTML Comment Box is loading comments...