প্রশ্নোত্তর

দারুল ইফতা
হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

প্রশ্ন (১/২৪১) : মানত করার হুকুম কি? জনৈকা মহিলা সন্তান সুস্থ হলে জানের ছাদাক্বা দিবেন বলে মানত করেছিলেন। তার সন্তান সুস্থ হয়েছে। এক্ষণে তিনি কিভাবে উক্ত মানত পূরণ করবেন?

-মুহাম্মাদ ছিদ্দীক, মতিঝিল, ঢাকা।

উত্তর : মানত সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেন, তোমরা মানত করো না। মানত আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ভাগ্যকে পরিবর্তন করতে পারেনা। এটি কৃপণের সম্পদ থেকে কিছু অংশ বের করে আনে মাত্র’ (বুখারী হা/৬৬০৮, মুসলিম হা/১৮৩৯; মিশকাত হা/৩৪২৬)। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ্র নাফরমানীতে কোন মানত নেই। যদি কেউ কোন অন্যায় কাজের মানত করে, তবে তা পূরণ করতে হবে না এবং যদি কেউ এমন মানত করে যা তার সাধ্যের অতীত, তাহ’লে তা পূরণ করা আবশ্যক নয়’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৩৪২৭)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, যদি কেউ মানত করে যে, আমি সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব, বসবো না, ছায়ায় যাবো না ও ছিয়াম রাখবো। সে যেন বসে ও ছায়ায় যায় এবং ছিয়াম পূর্ণ করে’ (বুখারী, মুসলিম হা/৩৪৩০)। আর মানত ভঙ্গের কাফফারা হ’ল শপথভঙ্গের কাফফারার ন্যায় (মুত্তাফাক্ব আলাইহ; মিশকাত হা/৩৪২৯)। আর তা হ’ল- দশজন অভাবগ্রস্তকে মধ্যম মানের খাদ্য অথবা বস্ত্র দান করা অথবা একজন (মুমিন) ক্রীতদাস মুক্ত করা অথবা তিনদিন (একটানা) ছিয়াম রাখা (মায়েদাহ ৮৯)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, যদি কেউ আল্লাহ্র আনুগত্যপূর্ণ কাজের মানত করে, তবে সে যেন তা পূর্ণ করে (বুখারী, মিশকাত হা/৩৪২৭)। অনুরূপ মানত পূর্ণ করার আগেই মৃত্যু হয়ে গেলে তার ওয়ারিছগণ তা পূরণ করবে (যদি তিনি সম্পদ রেখে যান)’ (বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৩৪৩৩-৩৪)

আলোচ্য প্রশ্নে মনে রাখতে হবে যে, সন্তান আল্লাহ্র রহমতে সুস্থ হয়েছে, মানতের কারণে নয়। কিন্তু তিনি নেকীর কাজে মানত করছেন, তাই তাকে অবশ্যই তা পূর্ণ করতে হবে। তিনি তার নিয়ত অনুযায়ী ছাদাক্বা দিবেন। যেটা তার সাধ্যে কুলায়। তিনি কোন অভাবগ্রস্ত ঈমানদার নারী বা পুরুষকে অন্ন, বস্ত্র বা অর্থ দান করতে পারেন। কোন হালাল পশু যবহ করে অভাবগ্রস্তদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে পারেন। তবে ছাদাক্বায়ে জারিয়াহ্র নিয়ত করলে অবশ্যই এমন কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দিবেন, যারা স্রেফ আল্লাহ্র ওয়াস্তে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের প্রচার ও প্রসারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। নইলে ধর্মের নামে কোন শিরক ও বিদ‘আতী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানে দান করলে স্থায়ী পাপের কাজে সহযোগিতা করা হবে। আল্লাহ বলেন, তোমরা নেকী ও আল্লাহভীরুতার কাজে

পরস্পরকে সাহায্য করে এবং পাপ ও শত্রুতার কাজে সাহায্য করো না (মায়েদাহ ২)

প্রশ্ন (২/২৪২) : চাচা ও ভাতিজীর মাঝে বিবাহ জায়েয কি?

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

উত্তর : আপন ভাতিজীকে বিবাহ করা হারাম। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে আপন ভাইয়ের মেয়ে (আপন ভাতিজী)-কে বিবাহ করা হারাম করেছেন (নিসা ২৩)। তবে চাচাতো, মামাতো, খালাতো, ফুফাতো ভাইয়ের মেয়েকে বিবাহ করা জায়েয। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর স্বীয় কন্যা ফাতেমা (রাঃ)-কে আপন চাচাতো ভাই আলী (রাঃ)-এর সাথে বিবাহ দিয়েছিলেন।

প্রশ্ন (৩/২৪৩) :  মাগরিবের ছালাতের ন্যায় তিন রাক‘আত বিশিষ্ট বিতর ছালাতের ৩য় রাক‘আতে দাঁড়ানোর সময় রাফ‘ঊল ইয়াদায়েন করতে হবে কি?

-জালাল, সিঙ্গাপুর।

উত্তর : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা মাগরিবের ছালাতের ন্যায় (মাঝখানে বৈঠক করে) বিতর আদায় করো না’ (দারাকুৎনী হা/১৬৩৪-৩৫, সনদ ছহীহ)। চার খলীফাসহ অধিকাংশ ছাহাবী, তাবেঈ ও মুজতাহিদ ইমামগণ এক রাক‘আত বিতরে অভ্যস্ত ছিলেন (মির‘আত ৪/২৫৯)। তিন রাক‘আত বিতর একটানা এক সালামে পড়াই উত্তম (হাকেম ১/৩০৪)। সেখানে যেহেতু মাঝখানে কোন বৈঠক নেই, সেহেতু তৃতীয় রাক‘আতে দাঁড়ানোর সময় রাফ‘উল ইয়াদায়েন করতে হবে না (বিঃদ্রঃ ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ‘বিতর’ অনুচ্ছেদ)

প্রশ্ন (৪/২৪৪) : স্ত্রীকে চাকুরী করার অনুমতি দেওয়া যাবে কি? তার অর্জিত অর্থ স্বামী গ্রহণ করতে পারবে কি?

-নাঈম হোসাইন

ফকিরপাড়া, পবা, রাজশাহী।

উত্তর : শর্তসাপেক্ষে স্ত্রীদেরকে চাকুরীর অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। যেমন, (১)  জীবিকার জন্য কাজ করতে বাধ্য হলে (২) কাজটি পুরুষদের সাথে মিলিতভাবে না হলে (৩) বাড়ির মধ্যেই করা যায় এরূপ কোন কাজ না পাওয়া গেলে (৪) সার্বক্ষণিক পর্দার মধ্যে থাকা সম্ভব হলে (৫) কাজটা ইসলাম বিরোধী না হলে (৬) কাজটি মহিলাদের কাজের উপযোগী হলে (৭) স্বামী, সন্তান এবং গৃহের ব্যাপারে অবহেলা সৃষ্টি না হলে (৮) কর্মক্ষেত্র যদি সফরের পর্যায়ে পড়ে, তাহলে মাহরাম সাথে থাকলে। উপরোক্ত শর্তাবলী পুরণ করা সাপেক্ষে মহিলাদেরকে চাকুরীর অনুমতি দেওয়া যাবে এবং প্রয়োজনে তার অর্জিত অর্থ গ্রহণ করা যাবে।   

প্রশ্ন (৫/২৪৫) : আমি একজন সরকারী কর্মচারী। প্রতিমাসে প্রভিডেন্ট ফান্ডের যে অর্থ আমার বেতন থেকে কর্তন করা হয় তার বিপরীতে প্রদত্ত সূদ গ্রহণ না করে মূল টাকা নিলে কোন পাপ হবে কি?

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

মিরপুর-১০, ঢাকা।

উত্তর : সূদ গ্রহণ না করে মূল টাকা গ্রহণ করায় কোন বাধা নেই। বরং সমুদয় অর্থ উত্তোলন করে সূদের অংশটুকু নেকীর আশা ব্যতীত দান করে দেওয়া যেতে পারে।

প্রশ্ন (৬/২৪৬) : সূরাতুল মুল্ক পাঠের কোন বিশেষ ফযীলত আছে কি?

মীযান, সঊদী আরব।

উত্তর : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সূরা মুল্ককে কবরের আযাব প্রতিরোধকারী বলে অভিহিত করেছেন (হাকেম হা/৩৮৩৯, ছহীহুল জামে হা/৩৬৪৩; ছহীহাহ হা/১১৪০)। তিনি বলেন, উক্ত সূরা তার তেলাওয়াতকারীর জন্য কিয়ামতের দিন শাফা‘আত করবে এবং তাকে ক্ষমা করা হবে (ইবনু মাজাহ হা/৩৭৮৬; মিশকাত হা/২১৫৩)। অন্য হাদীছে এসেছে, তিনি সূরা সাজদাহ ও মুল্ক না পড়ে ঘুমাতেন না (তিরমিযী হা/২৮৯২, মিশকাত হা/২১৫৫)। তবে রাসূল (ছাঃ) বলেন, তোমাদের কারু আমল তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না বা জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারবে না, এমনকি আমাকেও না, আল্লাহ্র রহমত ব্যতীত। অতএব তোমরা (আমলে) মধ্যপন্থা অবলম্বন কর এবং আল্লাহ্র নৈকট্য তালাশ কর’ (মুসলিম, মিশকাত হা/২৩৭২)। 

প্রশ্ন (৭/২৪৭) : সূরা বাক্বারাহর শেষ আয়াত পাঠের পর জোরে আমীন বলার কোন দলীল আছে কি? ছালাতের মধ্যে ইমাম-মুক্তাদী উভয়কেই কি আয়াতের জবাব দিতে হবে?

-জাহাঙ্গীর আলম

বালানগর, বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর : এ ব্যাপারে কোন ছহীহ দলীল পাওয়া যায় না। একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, যা যঈফ (মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা হা/৮০৬২, ইবনু জারীর হা/৬৫৪১, ইবনু কাছীর ১/৭৩৮)। যে সকল আয়াতের জবাব দানের বিষয়টি ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত, সেসব আয়াতের জবাব ইমাম-মুক্তাদী উভয়েরই দেওয়া উচিত। মিশকাত-এর ভাষ্যকার ওবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী (রহঃ) বলেন, ছালাতের মধ্যে হৌক বা বাইরে হৌক, পাঠকারীর জন্য উপরোক্ত আয়াত সমূহের জওয়াব দেওয়া মুস্তাহাব। যা বর্ণিত হাদীছ সমূহে উল্লেখিত হয়েছে। কিন্তু শ্রোতা বা মুক্তাদীর জন্য উপরোক্ত আয়াত সমূহের জওয়াব দেওয়ার প্রমাণে স্পষ্ট কোন মরফূ হাদীছ আমি অবগত নই। তবে আয়াত গুলিতে প্রশ্ন রয়েছে। সেকারণ জওয়াবের মুখাপেক্ষী। কাজেই পাঠকারী ও শ্রোতা উভয়ের জন্য উত্তর দেওয়া বাঞ্ছনীয় (মির‘আত ৩/১৭৫; দ্রঃ ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ১৫০-১৫১ পৃঃ)

প্রশ্ন (৮/২৪৮) : রুকুর পূর্বে বেশ কিছুক্ষণ ‘সাকতা’ করে সূরা ফাতিহা পাঠ করা যাবে কি? যদি না যায় তবে তা কখন পড়তে হবে?

যাকারিয়া, মেহেরপুর।

উত্তর : এ স্থানে সাকতা করার বিধান সম্বলিত হাদীছটি যঈফ (দ্রঃ ইরওয়াউল গালীল হা/৫০৫ যঈফ আবুদাঊদ হা/৭৭৭-৭৮০)। সুতরাং তা আমলযোগ্য নয়। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ বলেন, والجمهور لا يستحبون ان يسكت الامام ليقرأ الماموم- ‘জমহূর বিদ্বানগণ এটা মুস্তাহাব মনে করেন না যে, ইমাম চুপ থাকুন, যাতে মুক্তাদী ক্বিরাআত পড়তে পারে’ (ইবনু তায়মিয়া, মাজমু‘আ ফাতাওয়া ২২/৩৩৯)। শায়খ নাছিরুদ্দীন আলবানী বলেন, ‘উপরোক্ত কথার মধ্যে সূরা ফাতিহা পাঠের পরে ইমামের চুপ থাকার এবং সেই সময় মুক্তাদীর সূরা ফাতিহা পাঠের কোন দলীল নেই। যেমন পরবর্তীকালে কেউ কেউ বলে থাকেন’ (আলবানী, মিশকাত হা/৮১৮-এর টীকা-৪)

এক্ষণে সূরা ফাতিহা কখন পাঠ করতে হবে সে বিষয়ে ছহীহ হাদীছের ফায়ছালাই চূড়ান্ত। যেমন (১) ওবাদাহ বিন ছামেত (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, একদিন ফজরের ছালাত শেষে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, সম্ভবতঃ তোমরা তোমাদের ইমামের পিছনে কিছু পাঠ করে থাক? আমরা বললাম, হ্যাঁ। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন لاَ تَفْعَلُوا إِلاَّ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ فَإِنَّهُ لاَ صَلاَةَ إِلاَّ بِهَا ‘তোমরা এরূপ করো না কেবলমাত্র সূরা ফাতিহা ব্যতীত। কেননা এটি পাঠ না করলে ছালাত সিদ্ধ হয় না’ (আবুদাঊদ, তিরমিযী, সনদ হাসান, মিশকাত হা/৮৫৪ ‘ছালাতে ক্বিরাআত’ অনুচ্ছেদ)। (২) জেহরী ছালাতে মুক্তাদী কখন কিভাবে সূরা ফাতিহা পাঠ করবে, এরূপ এক প্রশ্নের জবাবে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, اقْرَأْ بِهَا فِى نَفْسِكَ ‘তুমি এটা মনে মনে পড়’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৮২৩ ‘ছালাত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১২)। রাবী ও ছাহাবীর এধরনের স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়ার পরে অন্য কারু বক্তব্য তালাশ করা মুমিনের কর্তব্য নয় (বিস্তারিত দ্রঃ আত-তাহরীক ৭ম বর্ষ জুলাই ২০০৪, প্রশ্ন নং ৪০/৪০০)।

প্রশ্ন (৯/২৪৯) : দাঁড়িয়ে পেশাব করায় শরী‘আতে কোন বাধা আছে কি?

-আযীযুল ইসলাম

মালে, মালদ্বীপ।

উত্তর : বসে পেশাব করাই শরী‘আতের বিধান। একান্ত অসুবিধায় দাঁড়িয়ে পেশাব করা যায়। তবে যেন পেশাবের ছিটা দেহে না লাগে (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩৩৮) এবং নির্লজ্জতা প্রকাশ না পায় (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫)। হুযায়ফা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একদা একটি গোত্রের ডাষ্টবিনে দাঁড়িয়ে পেশাব করেছিলেন বলা হয়েছে যে, সেটি ছিল ওযর বশতঃ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩৬৪ ‘পবিত্রতা’ অধ্যায়)

প্রশ্ন (১০/২৫০) : ছালাতরত অবস্থায় ইমামের ওযূ নষ্ট হয়ে গেলে ইমামসহ মুক্তাদীদের করণীয় কি? বিশেষতঃ শেষ তাশাহহুদে হলে করণীয় কি?

-রকীবুল ইসলাম

ওয়ার্টসিলা বাংলাদেশ লিমিটেড, খুলনা।

উত্তর : উক্ত অবস্থায় ইমাম ছালাত ছেড়ে দিবেন এবং মুছল্লীদের মধ্যে কাউকে ইমামতির জন্য এগিয়ে দিবেন। অতঃপর তার নেতৃত্বে বাকী মুছল্লীরা ছালাত শেষ করবে। ওমর (রাঃ) ছালাতরত অবস্থায় আঘাতপ্রাপ্ত হলে এমনটিই করেছিলেন (বুখারী হা/৩৭০০)। আর শেষ তাশাহহুদে এরূপ ঘটলে নিকটস্থ একজন মুক্তাদীকে সালাম ফিরানোর জন্য বলে দিয়ে তিনি বের হয়ে যাবেন (উছায়মীন, লিকাউল বাবিল মাফতূহ ৪/৩৫)।  

প্রশ্ন (১১/২৫১) : সন্তান মাতার কবরের পাশে গিয়ে ৪১ দিন সূরা ইয়াসীন পাঠ করলে কবরের আযাব মাফ করে দেওয়া হয়। উক্ত বক্তব্যের সত্যতা আছে কি?

-সিরাজুল ইসলাম

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

উত্তর : উক্ত বক্তব্য ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। এছাড়া মুমূর্ষ ব্যক্তির শিয়রে বসে সূরা ইয়াসীন পাঠ করা সম্পর্কিত হাদীছটিও ‘যঈফ’ (আবুদাঊদ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১৬২২)

প্রশ্ন (১২/২৫২) : ছূফীবাদ সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন। এদের আক্বীদা পোষণকারী ইমামদের পিছনে ছালাত আদায় করা যাবে কি?

-সায়ফুদ্দীন খালেদ, পটুয়াখালী।

উত্তর : হিন্দু, পারসিক ও গ্রীক দর্শনের কু-প্রভাবে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে হিজরী তৃতীয় শতাব্দীতে মা‘রেফাতের নামে ছূফীবাদের সূচনা হয়। ছূফী আরবী ‘ছুফ’ শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ পশম। ছূফীরা তাদের বৈরাগ্যের নিদর্শনস্বরূপ পশমের কাপড় পরতো বলেই সম্ভবতঃ এই নামে পরিচিত হয়েছেন। সর্বপ্রথম ইরাকের বছরা নগরীতে যুহ্দ বা দুনিয়া ত্যাগের প্রেরণা থেকে এটা শুরু হয়। প্রবল আল্লাহভীতি ও দুনিয়াত্যাগের বাড়াবাড়ি, সার্বক্ষণিক যিকর, আযাবের আয়াত পাঠে বা শুনে অজ্ঞান হওয়া বা মৃত্যু বরণ করা ইত্যাদির মাধ্যমে ছূফীবাদের যাত্রা শুরু হয়। ছূফীবাদের পরিভাষায় এই অবস্থাকে ‘হাল’ বলে। রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরামের যুগে ছূফী শব্দের সাথে কেউ পরিচিত ছিলেন না। বরং রাসূল (ছাঃ) ছাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈনে এযামের তিনটি স্বর্ণযুগের পরে (তৃতীয় শতাব্দী হিজরীতে) এই প্রথা চালু হয়। যখন অতি পরহেযগারীর নামে এগুলি প্রকাশ পেতে শুরু করে , তখন ছাহাবী ও তাবেঈগণ এসবের তীব্র প্রতিবাদ করেন (ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১১/৬)। পরবর্তীতে এই ছূফীবাদী ধ্যান-ধারণা বিজাতীয় নানা মরমীবাদী দর্শনের সংস্পর্শে এসে বিবিধ শিরকী আক্বীদা ও বিদআতী রীতি-নীতির নোংরা গরলে নিমজ্জিত হয় এবং ইসলামের মৌলিক আক্বীদা-আমল থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। তাদের আক্বীদাকে তিনটি মাযহাবে ভাগ করা যায়।

- প্রাচ্য দর্শনভিত্তিক মাযহাব, যা দক্ষিণ এশীয় হিন্দু ও বৌদ্ধদের নিকট থেকে এসেছে। এই মাযহাবের অনুসারী ছূফীরা মা‘রেফাত হাছিল করার জন্য দেহকে চরমভাবে কষ্ট দিয়ে স্বীয় ক্বলবকে তাদের ধারণা মতে জ্যোতির্ময় করার চেষ্টা করে থাকে। প্রায় সকল ছূফীই এরূপ প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকেন।

২- খ্রিষ্টানদের নিকট থেকে আগত মাযহাব, যা ‘হুলূল’ ও ‘ইত্তেহাদ’ দ’ুভাগে বিভক্ত। হুলূল অর্থ ‘মানুষের দেহে আল্লাহর অনুপ্রবেশ’। হিন্দু মতে ‘নররূপী নারায়ণ’। ইরানের আবু ইয়াযীদ বিস্তামী (মৃঃ ২৬১ হিঃ) ওরফে বায়েযীদ বুস্তামী ছিলেন এই মতের হোতা। এই মাযহাবের অন্যতম নেতা হুসাইন বিন মনছূর হাল্লাজ (মৃঃ ৩০৯ হিঃ) নিজেকে সরাসরি আল্লাহ (আনাল হক্ব) বলে দাবী করায় মুরতাদ হওয়ার কারণে তাকে শূলে বিদ্ধ করে হত্যা করা হয়।

৩- ইত্তেহাদ বা ওয়াহদাতুল উজূদ বলতে অদ্বৈতবাদী দর্শন বুঝায়, যা ‘হুলূল’-এর পরবর্তী পরিণতি হিসাবে রূপ লাভ করে। এর অর্থ হ‘ল আল্লাহর অস্তিত্বের মধ্যে বিলীন হয়ে যাওয়া। অস্তিত্ব জগতে যা কিছু আমরা দেখছি, সবকিছু একক এলাহী সত্তার বহিঃপ্রকাশ।  এই আক্বীদার অনুসারী ছূফীরা স্রষ্টা ও সৃষ্টিতে কোন পার্থক্য করে না। এদের মতে মূসা (আঃ) -এর সময়ে যারা বাছুর পূজা করেছিল, তারা মূলতঃ আল্লাহকে পূজা করেছিল। কারণ তাদের দৃষ্টিতে সবই আল্লাহ। আল্লাহ আরশে নন, বরং সর্বত্র ও সবকিছূতে বিরাজমান। অতএব, মানষের মধ্যে মুমিন ও মুশরিক বলে কোন পার্থক্য নেই। যে ব্যক্তি মুর্তিপুজা করে বা পাথর, গাছ, মানুষ, তারকা ইত্যাদি পুজা করে, সে মূলতঃ আল্লাহকেই পুজা করে। সবকিছুর মধ্যে মুমিন আল্লাহর নূর বা জ্যোতির প্রকাশ রয়েছে। তাদের ধারণায় খৃষ্টানরা কাফের এজন্য যে, তারা কেবল ঈসা (আঃ)-কেই প্রভূ বলেছে। যদি তারা সকল সৃষ্টিকে আল্লাহ বলত, তাহ’লে তারা কাফের হ’ত না। বলা বাহুল্য এটাই হ‘ল  হিন্দুদের ‘সর্বেশ্বরবাদ’। তৃতীয় শতাব্দী হিজরী থেকে চালু এই সব কুফরী আক্বীদার ছূফী সম্রাট হ’লেন সিরিয়ার মুহিউদ্দিন ইবনু আরাবী (মৃঃ ৬৩৮ হিঃ)। বর্তমানে এই আক্বীদাই মা‘রেফাতপন্থী ছূফীদের মধ্যে ব্যপকভাবে প্রচলিত। এদের দর্শন হ‘ল এই যে, প্রেমিক ও প্রেমাষ্পদের মধ্যকার সম্পর্ক এমন হ’তে হবে যেন উভয়ের অস্তিত্বের মধ্যে কোন ফারাক না থাকে’। বলা বাহুল্য ‘ফানাফিল্লাহ’-র উক্ত আক্বীদা সম্পূর্ণরূপে কুফরী আক্বীদা। এই আক্বীদাই বর্তমানে চালু আছে।  

সর্বোপরি ইসলামী আক্বীদার সাথে মা‘রেফাতের নামে প্রচলিত ছূফীবাদী আক্বীদার কোন সম্পর্ক নেই। ইসলাম ও ছূফীদর্শন সরাসরি সংঘর্ষশীল। ছূফীবাদের ভিত্তি হ‘ল  আউলিয়াদের কাশ্ফ, স্বপ্ন, মুরশিদের ধ্যান ও ফয়েয ইত্যাদির উপরে। পক্ষান্তরে ইসলামের ভিত্তি হ‘ল  আল্লাহর প্রেরিত ‘অহি’ পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের উপরে। ছূফীদের আবিস্কৃত তরীকা সমূহ তাদের কপোলকল্পিত। এর সাথে কুরআন, হাদীছ, ইজমায়ে ছাহাবা, ক্বিয়াসে ছহীহ কোন কিছুরই দূরতম সম্পর্ক নেই। ছূফীদের ইমারত খৃষ্টানদের বৈরাগ্যবাদ-এর উপরে দন্ডায়মান। ইসলাম যাকে প্রথমেই দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে (হাদীদ ২৭)(দ্রঃ দরসে কুরআন, মা‘রেফতে দ্বীন, ২য় বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা, জানুয়ারী ১৯৯৯)

ছূফীদের মধ্যে যারা হুলূল ও ইত্তেহাদ তথা অদ্বৈতবাদী ও সর্বেশ্বরবাদী আক্বীদা পোষণ করে এবং সেমতে আমল করে, যা কুফরীর পর্যায়ভুক্ত সেসব ইমামের পিছনে জেনেশুনে ছালাত আদায় করা সিদ্ধ হবে না।

প্রশ্ন (১৩/২৫৩) : আমি ওয়ারিছ সূত্রে কোন সম্পদ পাইনি। পিতা-মাতার মৃত্যুর পর ১টি বাড়ী ও সামান্য জমি ক্রয় করেছি। আমার তিনটি মেয়ে রয়েছে। কোন পুত্র সন্তান নেই। এক্ষণে আমার মৃত্যুর পর আমার ভাই বা তার ছেলেরা এতে কোন অংশ পাবে কি?

-আব্দুল হাকীম

গোমস্তাপুর, চাপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : মৃতব্যক্তির সন্তান থাকলে পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে তার স্ত্রী পাবে আটভাগের একভাগ এবং একাধিক মেয়ে থাকলে তারা পাবে দুই-তৃতীয়াংশ। আর এক মেয়ে থাকলে সে অর্ধেক সম্পত্তি পাবে। অবশিষ্ট সম্পদ ভাইয়েরা পাবে এবং ভাইয়েরা মারা গেলে তাদের ছেলেরা পাবে (নিসা ১১)

প্রশ্ন (১৪/২৫৪) : যৌতুক না দেওয়ায় মেয়ের বিবাহ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এক্ষণে নিরুপায় অবস্থায় যৌতুক প্রদান জায়েয হবে কি?

-ইসমাঈল হোসেন

ধুকুরিয়া সদর, সিরাজগঞ্জ।

উত্তর : আল্লাহ বলেন, তোমরা স্ত্রীদেরকে খুশীমনে (অফেরতযোগ্য) মোহরানা প্রদান কর’ (নিসা ৪)। এটি ফরয (নিসা ২৪-২৫)। এর সরাসরি বিপরীত হ’ল স্ত্রীর নিকট হ’তে যৌতুক নেওয়া। যা আল্লাহ্র হুকুমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। প্রকৃত মুসলমান ছেলেদের এ বিষয়ে সাবধান হওয়া উচিত। এ ধরনের পাপের সাথে কোন অবস্থায় জড়িত হওয়া যাবে না। বরং এর গন্ডী থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ হ’ল, আল্লাহকে ভয় করা। তিনি অবশ্যই একটি পথ বের করে দিবেন (তালাক ১)। আল্লাহ বলেন, যারা আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তাদেরকে একটি পথ বের করে দেন। এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ্র উপর ভরসা করে আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট হন’ (তালাক ২-৩)

প্রশ্ন (১৫/২৫৫) : পিতা-মাতার কথা মনে আসলে তাদের জন্য আমি দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করি। এরূপ আমল শরী‘আতসম্মত কি?

-আনছার আলী

মঙ্গলপুর, বিরামপুর, দিনাজপুর।

উত্তর : এটি শরী‘আতসম্মত নয়। বরং তাদের জন্য দো‘আ ও ছাদাক্বা করতে হবে (মুসলিম, মিশকাত হা/২০৩)

প্রশ্ন (১৬/২৫৬) : কোন্ স্থানে (যেমন মসজিদ, মাদ্রাসা, সংগঠন) দান করলে সর্বাধিক নেকী অর্জিত হয়? অন্যদেরকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে প্রকাশ্যে দান করলে গোপন দানের নেকী অর্জিত হবে কি? মৃত পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজনের নামে দান করলে মৃতব্যক্তিসহ দানকারীর কোন নেকী হবে কি?

-অধ্যাপক মহসিন আলী

পুঠিয়া, রাজশাহী।

উত্তর : সাধারণ ছাদাক্বার চেয়ে ছাদাক্বায়ে জারিয়াহ অধিক গুরুত্ব বহন করে। কেননা মৃতব্যক্তি যে তিনটি মাধ্যমে নেকী পেতে থাকে, তার মধ্যে ছাদাক্বায়ে জারিয়া অন্যতম। প্রশ্নে উল্লেখিত তিনটি ক্ষেত্রের প্রত্যেকটিই ছাদাক্বায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত (মুসলিম; মিশকাত হা/২০৩)। অতএব যখন যে ক্ষেত্রে অধিক প্রয়োজন দেখা দেয় তখন সে ক্ষেত্রে দান করাটাই বেশী নেকীর কাজ। গোপনে দান করা বেশী উত্তম (বাক্বারাহ ২/২৭১; বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৭০১)। তবে অন্যকে উৎসাহিত করার জন্য এখলাছের সাথে প্রকাশ্যে দান করলে এবং এ কারণে উৎসাহিত হয়ে অন্যরা দান করলে উৎসাহদানকারী ব্যক্তি অন্যদের দানের সমপরিমাণ ছওয়াব পাবেন ইনশাআল্লাহ (আবুদাঊদ হা/৫১২৯; তিরমিযী হা/২৬৭১; মুসলিম, মিশকাত হা/২০৯-১০)। মৃত পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের জন্য দান করা যায়। এতে মৃত ব্যক্তি এবং দাতা উভয়েই নেকী পাবেন (বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত হা/১৯৫০)

প্রশ্ন (১৭/২৫৭) :কুরবানীর উদ্দেশ্যে ছাগল ক্রয়ের পর কারণবশতঃ তা বিক্রয় করে উক্ত অর্থ অন্য কাজে লাগানো যাবে কি?

-আবুল কালাম

মাকলাহাট, নিয়ামতপুর, নওগাঁ।

উত্তর : কুরবানীর নিয়তে ক্রয়কৃত পশুর চেয়ে আরো ভালো পশু কুরবানী করার উদ্দেশ্যে অথবা দারিদ্রে্যর কারণে পরিবারের খাবার জুটছে না কিংবা অন্য কোন বাধ্যগত কারণে বিক্রি করা যাবে। তবে পরবর্তীতে সামর্থ্যবান হলে কুরবানী করবে (উছায়মীন, আহকামুল উযহিয়া ওয়ায যাকাত)

প্রশ্ন (১৮/২৫৮) :সমাজের দু’টি গোত্র অহংকারবশতঃ সমাজ ত্যাগ করে আমার গৃহের সম্মুখেই একটি জামে মসজিদ নির্মাণ করেছে। এমতাবস্থায় আমি সেখানে ছালাত আদায় না করে সামান্য দূরে অন্য একটি মসজিদে ছালাত আদায় করি। এরূপ করা কি শরী‘আতসম্মত?

-রফীকুল ইসলাম

মাকলাহাট, নিয়ামতপুর, নওগাঁ।

উত্তর : অহংকারবশত মসজিদ নির্মিত হয়ে থাকলে সে মসজিদ তাক্বওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ কারণে সেখানে ছালাত আদায় করা যাবে না এবং ঐ মসজিদ যিরার মসজিদ হিসাবে গণ্য হবে (তওবা ১০৭-১০৮)

প্রশ্ন (১৯/২৫৯) :নাভির নীচের লোম না কাটলে ৪০ দিনের ইবাদত কবুল হয় না মর্মে প্রচলিত কথাটি কি সঠিক?

-মঈনুদ্দীন, গোদাগাড়ী, রাজশাহী।

উত্তর : ইবাদত কবুল হয় না মর্মে কথাটি ভিত্তিহীন। তবে চল্লিশ দিনের মধ্যে ছাফ করা রাসূল (ছাঃ) নির্দেশিত সুন্নাত (মুসলিম, মিশকাত হ/৪৪২২)। নির্ধারিত সময়সীমা হওয়ায় এটা ইচ্ছাকৃতভাবে পরিত্যাগ করা জায়েয নয় (নায়লুল আওত্বার ১/১৪৩)

প্রশ্ন (২০/২৬০) :জনৈক ব্যক্তি সমাজে অনেক শিরক ও বিদ‘আতের প্রচলন ঘটিয়েছে এবং মানুষ তা আমল করে চলেছে। পরবর্তীতে ঐ ব্যক্তি বিশুদ্ধ দ্বীনের পথে ফিরে এসেছে। এক্ষণে ঐ ব্যক্তি কি সমাজের লোকদের পাপের অংশ পেতে থাকবে? এক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তির পরিত্রাণের উপায় কি?

-আব্দুল্লাহ, হারাগাছ, রংপুর।

উত্তর : শিরক ও বিদ‘আত আল্লাহর সাথে সংশ্লিষ্ট পাপ। শর্তানুযায়ী তওবা করলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে ক্ষমা করে দিবেন (যুমার ৫৩)। তওবা না করে মৃত্যুবরণ করলে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে (মুহাম্মাদ ৩২)। তার তওবা স্পষ্ট করে দিতে হবে এবং সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রচার করতে হবে। এভাবে তওবা করার করলে সে আর অন্যের পাপের অংশীদার হবে না।

প্রশ্ন (২১/২৬১) :কোন কোন সাবান কোম্পানী শূকরের চর্বিকে কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহার করে। জেনেশুনে উক্ত সাবান ব্যবহার করা জায়েয হবে কি?

-আল-মামূন ছানী

গাংনী, মেহেরপুর।

উত্তর : শূকরের চর্বি হারাম। তাই তা সাবানে ব্যবহার করা হারাম। ছাহাবীগণ শূকরের চর্বি দুনিয়াবী প্রয়োজনে ব্যবহারের অনুমতি চাইলে রাসূল (ছাঃ) তা ব্যবহার করা হারাম ঘোষণা করে বলেন, قَاتَلَ اللهُ الْيَهُودَ ، إِنَّ اللهَ لَمَّا حَرَّمَ شُحُومَهَا جَمَلُوهُ ثُمَّ بَاعُوهُ فَأَكَلُوا ثَمَنَهُ ‘আল্লাহ ইহুদীদের ধ্বংস করুন! যখন আল্লাহ তাদের উপর শূকরের চর্বি খাওয়া হারাম করলেন, তখন তারা তা আগুনে জ্বালিয়ে তরল করল। অতঃপর তা বিক্রি করে তার মূল্য ভক্ষণ করতে থাকল’ (বুখারী হা/২২৩৬, মুসলিম হা/১৫৮১, মিশকাত হা/২৭৬৬)।    

প্রশ্ন (২২/২৬২) :ফজরের সামান্য পূর্বে স্বপ্নদোষ হওয়ার পর কোন কারণে গোসল করা সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রে ওযূ করে ছালাত আদায় করা যাবে কি? না গোসলের পর ক্বাযা হিসাবে ছালাত আদায় করবে? গোসলের ফলে স্বাস্থ্যগত ক্ষতির আশংকা থাকলে সে অবস্থায় করণীয় কি?

-শফিউল্লাহ, উপশহর, রাজশাহী।

উত্তর : গোসল করে ছালাত আদায় করতে হবে (মায়েদাহ ৬)। স্বাস্থ্যগত ক্ষতির আশংকা থাকলে তায়াম্মুম দ্বারা পবিত্র হ’তে হবে (আবূদাঊদ হা/৩৩৪ সনদ ছহীহ)

প্রশ্ন (২৩/২৬৩) :কোন ব্যক্তি কিছু দান করতে চেয়ে দান না করেই মারা গেলে তা পূরণ করা ওয়ারিছদের উপর আবশ্যক কি?

-মা‘ছূম, রাজশাহী।

উত্তর : ওয়ারিছদের উক্ত ইচ্ছা পূরণ করা উচিৎ, তবে আবশ্যক নয় (নাসাঈ হা/৩৬৪৯)। কেননা তা অছিয়তের অন্তর্ভুক্ত নয়। তার ছেড়ে যাওয়া সম্পদ থেকে তা দান করে বাকী সম্পদ বন্টন করতে পারে অথবা ওয়ারিছগণ নিজেদের পক্ষ থেকেও উক্ত ইচ্ছা পূরণ করতে পারেন।

প্রশ্ন (২৪/২৬৪) :কুরআন ও ছহীহ হাদীছের অনুসারী না হ’লে সে কি স্থায়ী না অস্থায়ী জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হবে?

-ফারূকুদ্দীন, সিডনী, অস্ট্রেলিয়া।

উত্তর : ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের বিধানকে অগ্রাহ্য করলে অবশ্যই সে জাহান্নামী হবে। অনেক বিদ‘আতী আমল ও আক্বীদা আছে যেগুলো বড় শিরক এবং বড় কুফরীর পর্যায়ে পড়ে, ফলে কারো নিকট হক পৌঁছার পরেও সে ধরনের আক্বীদায় বিশ্বাসী হলে তার আমল বরবাদ হবে (মুহাম্মাদ ৩২)। এই ধরনের লোকেরা চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে (বাক্বারাহ ১৫৯-৬৩)। যেমন আল্লাহ্ নিরাকার, সর্বত্র বিরাজমান, রাসূল (ছাঃ) নূরের নবী, মাটি থেকে সৃষ্টি নন, সৃষ্টি স্রষ্টার অংশ, অলীরা গায়েব জানেন এরূপ বিশ্বাস রাখা ইত্যাদি। তবে আক্বীদা বিশুদ্ধ থাকলে কবীরা গোনাহগার মুমিন অস্থায়ী জাহান্নামী হবে এবং রাসূল (ছাঃ)-এর শাফা‘আত ক্রমে একসময় আল্লাহ্র রহমতে জান্নাতে প্রবেশ করবে (আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৫৫৯৮; বুখারী, মিশকাত হা/৫৫৮৪)

প্রশ্ন (২৫/২৬৫) :যেহেতু জিন ও ইনসান উভয়কেই সৃষ্টি করা হয়েছে কেবলমাত্র ইবাদতের জন্য। এক্ষণে উভয় জাতিই কি শয়তানের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়?

-দিদার বখ্শ, রাজশাহী।

উত্তর : জিনরাও শয়তান দ্বারা পথভ্রষ্ট হয়। কারণ তাদের মধ্যেও মুমিন ও ফাসেক রয়েছে (জিন ১৪-১৫)। আর ইবলীস আল্লাহর সব বান্দাকেই পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করে (নিসা ১১৮)

প্রশ্ন (২৬/২৬৬) :থার্টিফার্স্ট নাইট, ভালোবাসা দিবস, নববর্ষ ইত্যাদি পালন সম্পর্কে শরী‘আতের বিধান জানিয়ে বাধিত করবেন।

-মতীউর রহমান, মান্দা, নওগাঁ।

উত্তর : থার্টিফার্স্ট নাইট, ভালোবাসা দিবস, নববর্ষ ইত্যাদি পালন করা নিষিদ্ধ। কারণ প্রথমতঃ সব ধরনের দিবস পালন বিজাতীয় অপসংস্কৃতির অনুকরণ মাত্র। যা নিষিদ্ধ (আবূদাঊদ হা/৪০৩১, তিরমিযী হা/২৬৯৫; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২১৯৪)। দ্বিতীয়তঃ এসব কিছুর আয়োজনের দ্বারা বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সময়ের অপচয় হয়। আল্লাহ বলেন, অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই (বনী ইসরাঈল ২৭)। তৃতীয়তঃ এসব অনুষ্ঠান সমাজে অশ্লীলতা ও বেলাল্লাপনা প্রসারের অন্যতম মাধ্যম। আর আল্লাহ প্রকাশ্য ও গোপন সকল প্রকার অশ্লীলতার নিকটবর্তী হতে নিষেধ করেছেন (আন‘আম ১৫১)

প্রশ্ন (২৭/২৬৭) :সপ্তাহে দু’দিন হাটে বেচাকেনার ব্যস্ততার কারণে পার্শ্ববর্তী মসজিদে জামা‘আতের সাথে ছালাত আদায় করা সম্ভব হয় না। এক্ষণে ব্যস্ততার কারণে একাকী ছালাত আদায় করলে তা কবুল হবে কি?

-শফীকুল ইসলাম

ইটাগাছা, সাতক্ষীরা।

উত্তর : শরী‘আতের বিধান হ’ল, সব কিছু ত্যাগ করে ছালাত আদায় করতে হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর কসম করে বলছি, আমার মন চায় আযান হওয়ার পরেও যারা জামা‘আতে আসে না, ইমামতির দায়িত্ব কাউকে দিয়ে আমি নিজে গিয়ে তাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দিয়ে আসি’ (বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত হা/১০৫৩)। তবে গ্রহণযোগ্য শারঈ কারণে জামা‘আতে অংশগ্রহণ করতে না পরলে দোকানেই একাকী বা জামা‘আতের সাথে ছালাত আদায় করা যেতে পারে।  

প্রশ্ন (২৮/২৬৮) :নাপাক অবস্থায় কম্পিউটারের পর্দায় কুরআন দেখে পাঠ করা যাবে কি?

-মুস্তাফীযুর রহমান

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

উত্তর : নাপাক অবস্থায় মূল আরবী কুরআন স্পর্শ ব্যতীত পাঠ করা জায়েয। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার যিকির-আযকার করতেন (মুসলিম, মিশকাত হা/৪৫৬)। অতএব কম্পিউটার বা মোবাইলের পর্দায় কুরআন দেখে পাঠ করতে বাধা নেই। তবে নাপাকী থেকে গোসল  সেরে কুরআন পাঠ করাই সর্বোত্তম।

প্রশ্ন (২৯/২৬৯) :ইসলামিক টিভিতে শরী‘আত পরিপন্থী বহু বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। এগুলির জন্য কর্তৃপক্ষ কিরূপ শাস্তির সম্মুখীন হবে? তারা যেসব উপকারী ও মানুষের জন্য কল্যাণকর বিষয়াদী প্রচার করছে এগুলি কি উক্ত শাস্তির জন্য কাফফারা স্বরূপ হবে?

-অধ্যাপক শফিউদ্দীন আহমাদ, নরসিংদী।

উত্তর : টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে ইসলামী দাওয়াত পরিচালনা করা দাওয়াতের বহু মাধ্যমের অন্যতম মাধ্যম মাত্র। কিন্তু তা যদি হারাম পন্থায় উপার্জিত পয়সা দ্বারা হয়, তাহ’লে আল্লাহ তা কবূল করবেন না। অনৈসলামিক ও অশালীন বিজ্ঞাপন হতে উপার্জিত পয়সা দিয়ে ইসলামী কার্যক্রম পরিচালনা করলে তা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না। কারণ আল্লাহ্ পবিত্র। তিনি পবিত্র বস্ত্ত ব্যতীত কবূল করেন না (মুসলিম, মিশকাত হা/২৭৬০)। টিভি কতৃপক্ষ এজন্য দুঃখ প্রকাশ করলেও তা আল্লাহ্র নিকটে কবুল হবে না। সৎপন্থায় দ্বীন প্রচার সম্ভব না হ’লে, সে পথ পরিত্যাগ করাই কর্তব্য। অব্যাহতভাবে ছোট গোনাহ করলে তা বড় গোনাহে পরিণত হয় এবং তা ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায় (আহমাদ হা/৩৮১৮; ছহীহুল জামে‘ হা/২৬৮৭)। আর যেখানে বড় গুনাহ্ অব্যাহত ভাবে চলছে সেখানে কাফফারা হওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না।

প্রশ্ন (৩০/২৭০) :হস্তমৈথুন করা কিরূপ পাপের অন্তর্ভুক্ত। জনৈক আলেম বলেন, ইমাম ইবনু হাযম সহ অনেক ওলামা একে মুবাহ বলেছেন। এ ব্যাপারে সঠিক মতামত জানিয়ে বাধিত করবেন।

-সাইফুয যামান

রাণীনগর, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর।

উত্তর : হস্তমৈথুন বা যেকোন উপায়ে বীর্য স্খলন করা নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন, যারা নিজ স্ত্রী ও দাসী ব্যতীত অন্যকে কামনা করে, তারা সীমালংঘনকারী (মুমিনূন ২৩/৬-৭; মা‘আরিজ ৭০/৩০-৩১)। এটি হারাম এবং আত্মঘাতী পাপ। যা মানুষের জীবন-যৌবন ধ্বংস করে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়ো না এবং অন্যের ক্ষতি করো না’ (ইবনু মাজাহ হা/২৩৪০; ছহীহাহ হা/২৫০)। ক্বিয়ামতের দিন মানুষের মুখ বন্ধ হবে এবং হাত-পা, চোখ-কান ও দেহচর্ম সাক্ষ্য দিবে’ (ইয়াসীন ৩৬/৬৫, হা-মীম সাজদাহ্ ২০)। অতএব এই পাপীদের এখুনি তওবা করতে হবে। এদের বাঁচার পথ হ’ল বিয়ে করা অথবা নিয়মিত নফল ছিয়াম রাখা (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩০৮০)। সেই সাথে সর্বদা সৎ চিন্তা করা ও সৎ সঙ্গ গ্রহণ করা। ইবনু হযম (রহঃ) একে শর্তসাপেক্ষে মুবাহ বললেও তিনি একে ‘মকরূহ এবং উন্নত চরিত্রের বিরোধী’ বলেছেন। মুবাহ বললেও তা গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা কুরআনে এদের ‘সীমালংঘনকারী’ বলে অভিহিত করা হয়েছে (মুমিনূন ৭)

প্রশ্ন (৩১/২৭১) :রাসূল (ছাঃ)-কে অবমাননাকারীদের সম্পর্কে ইসলামের বিধান কি?

-সাজেদুল ইসলাম, ঢাকা।

উত্তর : সে ধর্মত্যাগী কাফের হিসাবে গণ্য হবে (তাওবাহ ৬৫-৬৬)। ছাহাবীগণসহ সর্বযুগের ওলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত যে ঐ ব্যক্তি কাফের, মুরতাদ এবং তাকে হত্যা করা ওয়াজিব (ইবনু তায়মিয়াহ, আছ-ছারেমুল মাসলূল ২/১৩-১৬)।  তবে তা প্রমাণ সাপেক্ষে আদালতের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব সরকারের (কুরতুবী)। এ দায়িত্ব পালন না করলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। ঐব্যক্তি তওবা করলে তার তওবা কবুল হবে। কিন্তু মৃত্যুদন্ড বহাল থাকবে। এটাই হ’ল বিদ্বানগণের সর্বাগ্রগণ্য মত (উছায়মীন, লিকাউল বাবিল মাফতূহ ৬/৫৩)। রাসূল (ছাঃ)-কে গালিদাতা জনৈক ইহুদীকে জনৈক মুসলিম শ্বাসরোধ করে হত্যা করলে রাসূল (ছাঃ) তার রক্তমূল্য বাতিল করে দেন (আবূদাঊদ হা/৪৩৬১, ৪৩৬৩, নাসাঈ হা/৪০৭৬)

প্রশ্ন (৩২/২৭২) :সন্তান কতদিন পর্যন্ত মায়ের দুধ খেতে পারে? সন্তানকে দুধ না খাওয়ালে পাপী হতে হবে কি? মি‘রাজের রাত্রে রাসূল মহিলাদের বুকে সাপ কামড়াতে দেখলেন পরে জানলেন তারা দুনিয়াতে সন্তানদের বুকের দুধ খাওয়াতো না। এর সত্যতা আছে কি?

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।

উত্তর : সন্তানকে দুধ পান করানোর সময়কাল হ’ল দু’বছর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘মায়েরা তাদের সন্তানকে পূর্ণ দু’বছর দুধ পান করাবে’ (বাক্বারাহ ২৩৩, লোকমান ১৪ ও আহক্বাফ ১৫)। তবে দু’বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও দুধ পান করালে কোন দোষ নেই। মূলতঃ আয়াত সমূহে দু’বছর দুধ পান করানোর সময়সীমা নির্ধারণের উদ্দেশ্য হ’ল, দু’বছর পর যদি কোন বাচ্চা অন্য কোন মহিলার দুধ পান করে, তাহ’লে ঐ বাচ্চা তার দুধ সন্তান হিসাবে গণ্য হবে না। বরং তা সাধারণ খাদ্য হিসাবে গণ্য হবে’ ­(তাফসীর ইবনে কাছীর; ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ৩৪/৬৩)

দুধ পান সহ সন্তানের সার্বিক প্রতিপালন পিতা-মাতার দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালন না করলে তাদেরকে আল্লাহ্র নিকট জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, মহিলা ও তার স্বামী তার সন্তানের দায়িত্বশীল। অতএব তাদেরকে স্বীয় দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে হবে (বুখারী হা/২৪০৯, মুসলিম হা/৪৮২৮)। তবে  মি‘রাজের রাত্রে রাসূল (ছাঃ) মহিলাদের বুকে সাপে কামড়াতে দেখলেন এবং পরে জানলেন যে, তারা দুনিয়াতে সন্তানদের বুকের দুধ খাওয়াতো না’ এ কথা ভিত্তিহীন।

প্রশ্ন (৩৩/২৭৩) :সফর অবস্থায় তাহাজ্জুদের ছালাত আদায়ের পদ্ধতি কি?    

-আব্দুল্লাহিল কাফী

বড়বনগ্রাম, রাজশাহী।

উত্তর : সফরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সুন্নাত সমূহ পড়তেন না (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/১৩৩৮)। অবশ্য বিতর, তাহাজ্জুদ ও ফজরের দু’রাক‘আত সুন্নাত ছাড়তেন না (ইবনুল ক্বাইয়িম, যাদুল মা‘আদ ৩/৪৫৭ পৃঃ)। তবে ঘুম না ভাঙ্গার আশংকা থাকলে আগ রাতে বিতর ছালাতের পর দু’রাক‘আত নফল ছালাত আদায় করলে সেটাই তাহাজ্জুদ হিসাবে গণ্য হবে (দারেমী, মিশকাত হা/১২৮৬, ইবনে খুযায়মা হা/১১০৬; ছহীহাহ হা/১৯৯৩)। ছয়ভাবে তাহাজ্জুদ পড়ার পদ্ধতি দেখুন- ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) পৃঃ ১৭৮-১৭৯।                          

প্রশ্ন (৩৪/২৭৪) : মুছাফাহা কিভাবে করতে হয়? এর কোন দো‘আ আছে কি?

-আব্দুল মজীদ শেখ

কুকুরিয়া, টাঙ্গাইল।

উত্তর : মুছাফাহা অর্থ পরস্পরের হাতের তালু মিলানো (إلصاق صفح الكف بالكف)। মুছাফাহার সময় একে অপরের ডান হাতের তালু মিলিয়ে করমর্দন করতে হয়। এটা রাসূল (ছাঃ) ও ছাহাবীগণের যুগ হ’তে চলে আসা একটি সামাজিক আদর্শগত সুন্নাত (বুখারী হা/৬২৬৩, মিশকাত হা/৪৬৭৭)। মুছাফাহা করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, যখন কোন মুমিন অপর মুমিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং তাকে সালাম করে ও তার একহাত ধরে মুছাফাহা করে, তখন উভয়ের গোনাহ ঝরে পড়ে, যেমন গাছের পাতা ঝরে পড়ে (ত্বাবারাণী, ছহীহাহ হা/৫২৬)। তিনি বলেন, যখন দু’জন মুসলিম পরস্পরে মিলিত হয়ে মুছাফাহা করে তখন তারা পৃথক হওয়ার পূর্বেই তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হয় (আবুদাউদ হা/৫২১৪, মিশকাত হা/৪৬৭৯)। দুইজনের চার হাত মিলানো ও বুকে হাত লাগানোর প্রচলিত প্রথা সুন্নাত বিরোধী আমল। সাক্ষাতকালে মাথা ঝুঁকানো, বুকে জড়িয়ে ধরা, কোলাকুলি করা, হাতে বা কপালে চুমু খাওয়া নয়, কেবল সালাম ও মুছাফাহা করবে। মুছাফাহার জন্য পৃথক কোন দো‘আ ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়নি (দ্রঃ ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) পৃঃ ২৭৬)

প্রশ্ন (৩৫/২৭৫) : ছালাত আদায়কালে মহিলাদের চুল বেঁধে খোপা করে রাখা যাবে, না ছেড়ে দিতে হবে? কেউ কেউ বলেন ছেড়ে রাখা আবশ্যক। সঠিক সমাধান জানিয়ে বাধিত করবেন।

-মেরিনা, বিরামপুর, দিনাজপুর।

উত্তর : অন্য সময়ের ন্যায় ছালাত আদায়কালেও মেয়েরা পর্দা রক্ষার সুবিধার্থে তাদের চুল পিছনে বেণী বা খোঁপাবদ্ধ রাখতে পারে। এটা মেয়েদের পর্দা রক্ষা এবং ছালাতে খুশূ-খুযূ বজায় রাখার সহায়ক। তবে তাদের খোঁপা উটের কুঁজোর মত (كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ) করে মাথার উপরে বাঁধা যাবে না। যেমনভাবে প্রাচীন যুগে মিসরীয় নারীরা বাঁধত। পর পুরুষকে আকৃষ্টকারী এইসব মহিলারা জাহান্নামী (মুসলিম, মিশকাত হা/৩৫২৪ ‘ক্বিছাছ’ অধ্যায়; মিরক্বাত ৭/৯৬)

এক্ষণে ছালাতের সময় মুছল্লী তার ৭টি অঙ্গের (কপাল, দু’হাত, দু’হাঁটু ও দু’পায়ের আঙ্গুলের মাথা) উপরে সিজদা করবে  মর্মে ইবনু আববাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীছের শেষাংশে যে বলা হয়েছে وَلاَ نَكْفِتَ الثِّيَابَ وَالشَّعَرَ ‘এবং আমরা যেন সিজদাকালে আমাদের কাপড় ও চুল গুটিয়ে না নেই’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা৮৮৭; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৮২৭ ‘সিজদা ও তার মাহাত্ম্য’ অনুচ্ছেদ; নায়লুল আওত্বার ৩/২২ পৃঃ), উক্ত বিষয়টি পুরুষের জন্য খাছ, মহিলাদের জন্য নয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর এই নিষেধাজ্ঞা না জানার কারণে অনেক পুরুষ মুছল্লী ছালাতের সময়ে তাদের মাথার চুল বেঁধে নিতেন। একদা ইবনু আববাস (রাঃ) জনৈক বদরী ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনুল হারিছ (রাঃ) এর চুল খুলে দেন (ইবনু মাজাহ, আবুদাঊদ, তিরমিযী, নায়লুল আওত্বার ৩/২৩৫; ছহীহ ইবনু মাজাহ হা/৮৬১ ছহীহ আবুদাঊদ হা/৬৪৬)। ইমাম শাওকানী উপরোক্ত হাদীছ দু’টির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন,والحديثان يدلان علي كراهية صلاة الرجل وهو معقوص الشعر ‘হাদীছ দু’টি পুরুষের জন্য চুল বাঁধা অবস্থায় ছালাত আদায় করা মাকরূহ সাব্যস্ত করে। হাফেয ইরাকী বলেন, এটি পুরুষের জন্য খাছ, মেয়েদের জন্য নয়। কেননা তাদের চুলও সতরের অন্তর্ভুক্ত, যা ছালাত অবস্থায় ঢেকে রাখা ওয়াজিব। এছাড়াও খোঁপা বা বেণী খোলার মধ্যে তার জন্য বাড়তি কষ্ট ও ঝামেলা রয়েছে। অথচ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মেয়েদেরকে ফরয গোসলের মত গুরুত্বপূর্ণ সময়েও খোঁপা বা বেণী না খোলার অনুমতি দিয়েছেন (নায়লুল আওত্বার ৩/২৩৬-২৩৭ ‘পুরুষের জন্য চুল বাঁধা অবস্থায় ছালাত আদায়’ অনুচ্ছেদ)। শায়খ আলবানী বলেন, ويبدو أن هذا الحكم خاص بالرجال دون النساء ‘এটা স্পষ্ট যে, সিজদাকালে চুল খুলে দেওয়ার নির্দেশ শুধুমাত্র পুরুষের জন্য খাছ, মহিলাদের জন্য নয়’ (ছিফাতু ছালাতিন নবী পৃঃ ১২৫)

জমহূর বিদ্বানগণ বলেন, ‘পুরুষের জন্য মাথার চুল বাঁধা কেবল ছালাতের সময় নয় বরং সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ। ইমাম নববী বলেন, এভাবেই ছাহাবায়ে কেরাম ও অন্যান্য বিদ্বানগণ থেকে বর্ণিত হয়েছে এবং এটাই সঠিক’ (মির‘আত ৩/২০৭ হা/৮৯৪-এর ব্যাখ্যা)

প্রশ্ন (৩৬/২৭৬) :সূরা বনী ইস্রাঈলের ৩১ নং আয়াতের ব্যাখ্যা জানিয়ে বাধিত করবেন।

-আব্দুছ ছামাদ, পঞ্চগড়।

উত্তর : অনুবাদ : আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমরা দরিদ্রতার ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করোনা। তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমরাই খাদ্য প্রদান করে থাকি। নিশ্চয়ই তাদের হত্যা করা মহাপাপ’ (ইসরা ৩১)। জাহেলী যুগে কিছু লোক সন্তানদেরকে বিশেষ করে কন্যা সন্তানদেরকে দারিদ্রে্যর ভয়ে জীবন্ত পুঁতে ফেলে হত্যা করত। আল্লাহ তা‘আলা তাদের এ নিকৃষ্টতম কাজ থেকে সতর্ক করে উক্ত আয়াত নাযিল করেন (ইবনু কাছীর)। বর্তমান যুগে যারা সংসারকে সচ্ছল করার ধারণায় জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করছে, তারা মূলতঃ সেযুগের সন্তান হত্যাকারীর ন্যায় মহাপাপী হবে। রূযীর মালিক আল্লাহ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা প্রেমময়ী ও অধিক সন্তানদায়িনী নারীকে বিবাহ কর। কারণ কিয়ামতের দিন আমি আমার উম্মতের সংখ্যাধিক্য নিয়ে গর্ব করব’ (আবুদাঊদ, নাসাঈ, মিশকাত হা/৩০৯১)। তবে স্ত্রী ও সন্তানের স্বাস্থ্যের দিকে লক্ষ্য রেখে স্ত্রীর সম্মতিক্রমে আযল বা সাময়িক জন্মনিয়ন্ত্রণ করা যায় (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩১৮৪)

প্রশ্ন (৩৭/২৭৭) : ক্বায়েদা বা কুরআন মাজীদ মাটিতে রেখে পড়া যাবে কি?

-কবীর,

গোদাগাড়ী, রাজশাহী।

উত্তর : কুরআন আল্লাহ তা‘আলার বাণী। একে সম্মান করা প্রত্যেক মুমিনের ঈমানী দায়িত্ব। মাটিতে রাখলে কুরআনকে অসম্মান করা হয়। তাকে অবশ্যই কোন উঁচু স্থানে রাখবে। এক দল ইয়াহুদী রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট এসে একজন ব্যভিচারীনী মহিলার শাস্তির দাবী করল। তখন তিনি তাওরাত নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন এবং সেটি নিচে না রেখে একটি বালিশের উপর রাখলেন (আবুদাউদ হা/৪৪৪৯)। আবরী ক্বায়েদাসহ যে সব বইয়ে কুরআনের কিছু আয়াত থাকে, সেগুলিকেও সম্মান করা উচিৎ।

প্রশ্ন (৩৮/২৭৮) :যাকাত-ওশর না দেওয়ার পরিণাম কি?

-মুশফিকা নাজনীন

             বিরামপুর, দিনাজপুর।

উত্তর : আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন, যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করেনা, (হে নবী) তুমি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও। যেদিন জাহান্নামের আগুনে ঐগুলোকে উত্তপ্ত করে তাদের ললাট, পার্শ্বদেশ এবং পৃষ্ঠদেশে দাগানো হবে, (আর বলা হবে) এটা হচ্ছে ওটাই যা তোমরা নিজেদের জন্য সঞ্চয় করে রেখেছিলে, সুতরাং এখন নিজেদের সঞ্চয়ের স্বাদ গ্রহণ কর (তওবা ৩৪, ৪০)। উল্লেখিত আয়াতে স্বর্ণ ও রৌপ্যের কথা বলা হ’লেও উদ্দেশ্য সকল জমাকৃত অপবিত্র সম্পদ, যাকে যাকাত দিয়ে পবিত্র করা হয়নি। কেননা কান্য বলা হয় প্রত্যেক সঞ্চিত সম্পদকে (কুরতুবী) 

রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, আল্লাহ যাকে সম্পদ দান করেছেন, অথচ সে তার যাকাত আদায় করেনি, ক্বিয়ামতের দিন তার সেই সম্পদকে টেকো মাথা বিষাক্ত সাপে রূপান্তরিত করা হবে। যার দু’চোখে দু’টি কালো বিন্দু থাকবে। ক্বিয়ামতের দিন ঐ সাপ তার গলা পেঁচিয়ে ধরবে এবং দু’চোয়াল কামড়ে ধরে বলতে থাকবে, আমি তোমার সঞ্চিত ধন। আমি তোমার সঞ্চিত ধন’ (বুখারী, মিশকাত হা/১৭৭৪ ‘যাকাত’ অধ্যায়)

প্রশ্ন (৩৯/২৭৯) :দাড়ি না রেখে ছালাত আদায় করলে উক্ত ছালাত কবুল হবে কি? এতে মুনাফিকের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে কি?

-আহমাদ সাবিবর

সারিয়াকান্দী, বগুড়া।

উত্তর : দাড়ি কাটা রাসূল (ছাঃ)-এর সুস্পষ্ট নির্দেশকে অমান্য করার শামিল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা মুশরিকদের বিরোধিতা কর। দাড়ি পূর্ণভাবে ছেড়ে দাও ও গোঁফ পূর্ণভাবে ছেটে ফেলো’ (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৪৪২১)। তবে ‘মুখে দাড়ি না রেখে ছালাত আদায় করলে উক্ত ছালাত কবুল হবেনা’ অথবা ‘মুনাফিকের অন্তর্ভুক্ত হবে’ মর্মে কোন দলীল পাওয়া যায়না। যদিও কাজটি কবীরা গোনাহের অন্তর্ভুক্ত।

প্রশ্ন (৪০/২৮০) : দুনিয়াতে পুরুষের জন্য সবচেয়ে বড় ফেতনা কি?

-সাইফুল ইসলাম

বসন্তপুর, বাগমারা, রাজশাহী।

উত্তর: দুনিয়াতে পুরুষের জন্য সবচেয়ে বড় ফেতনা হ’ল (দুষ্টু) নারী (বুখারী হা/৫০৯৬, মুসলিম হা/২৭৪১; মিশকাত হা/৩০৮৫)



***