নবীনদের পাতা

জান্নাতের নে‘মত ও তা লাভের উপায়

নাজমুস সা‘আদত*

ভূমিকা : ইহকালীন জীবনের সৎ আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তোষ লাভ করা এবং পরকালীন জীবনে জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করা হচ্ছে মুসলমানদের প্রধান লক্ষ্য। আর জান্নাত লাভ করতে হ’লে রাসূল (ছাঃ)-এর পদ্ধতি অনুযায়ী শিরক ও বিদ‘আত মুক্ত আমল করা যরূরী। আলোচ্য নিবন্ধে আমরা জান্নাতের নে‘মত সমূহ উল্লেখ পূর্বক তা লাভের উপায় আলোচনা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

জান্নাতের নে‘মতসমূহ : জান্নাতবাসীদের জন্য আল্লাহ অফুরন্ত নে‘মত প্রস্ত্তত করে রেখেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَإِذَا رَأَيْتَ ثَمَّ رَأَيْتَ نَعِيْمًا وَمُلْكًا كَبِيْرًا  ‘আর যখন তুমি সেখানে দেখবে তখন দেখতে পাবে ভোগবিলাসের উপকরণ ও বিশাল রাজ্য’ (দাহর ২০)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,فَأَمَّا مَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِيْنُهُ، فَهُوَ فِيْ عِيْشَةٍ رَاضِيَةٍ، وَأَمَّا مَنْ خَفَّتْ مَوَازِيْنُهُ، فَأُمُّهُ هَاوِيَةٌ- ‘তখন যার (নেকীর) পাল্লা ভারী হবে, সে লাভ করবে সন্তোষজনক জীবন। কিন্তু যার পাল্লা হাল্কা হবে তার অবস্থান হবে হাবিয়া (জাহান্নাম)’ (ক্বারি‘আহ ৬-৯)

সৎ কর্মশীল বান্দার জন্য আল্লাহ তা‘আলার দয়া ও রহমত সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেন, قَالَ اللهُ أَعْدَدْتُ لِعِبَادِى الصَّالِحِيْنَ مَا لاَ عَيْنَ رَأَتْ، وَلاَ أُذُنَ سَمِعَتْ، وَلاَ خَطَرَ عَلَى قَلْبِ بَشَرٍ، فَاقْرَءُوْا إِنْ شِئْتُمْ: فَلاَ تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِىَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ- ‘আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেছেন, আমি আমার পুণ্যবান বান্দাদের জন্য এমন সব জিনিস প্রস্ত্তত করেছি, যা কখনও কোন চুক্ষ দেখেনি, কোন কান কখনও শুনেনি এবং মানুষের অন্তঃকরণ যা কখনও কল্পনাও করেনি। তিনি বলেন, (এর সত্যতা প্রমাণে) তোমরা ইচ্ছা করলে এই আয়াতটি তেলাওয়াত করতে পার। অর্থাৎ কেউই জানে না তাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর কি লুক্কায়িত রাখা হয়েছে, তাদের কৃতকর্মের পুরস্কার স্বরূপ’।[1]

জান্নাতের ফল-ফলাদির বিবরণ : জান্নাতে আল্লাহ তা‘আলা বিভিন্ন প্রকার সুস্বাদু ফল-মূল তৈরী করে রেখেছেন জান্নাতবাসীদের জন্য। আল্লাহ বলেন, وَلَكُمْ فِيْهَا مَا تَشْتَهِيْ أَنْفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيْهَا مَا تَدَّعُوْنَ، نُزُلاً مِّنْ غَفُوْرٍ رَحِيْمٍ- ‘সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে যা কিছু তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে যা তোমরা চাইবে। এটা ক্ষমাশীল ও দয়াবান আল্লাহর তরফ হ’তে মেহমানদারী’ (হা-মীম সাজদাহ ৩১-৩২)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, فِيْ سِدْرٍ مَخْضُوْدٍ، وَطَلْحٍ مَنْضُوْدٍ، وَظِلٍّ مَمْدُوْدٍ، وَمَاءٍ مَسْكُوْبٍ، وَفَاكِهَةٍ كَثِيْرَةٍ، لاَ مَقْطُوْعَةٍ وَلاَ مَمْنُوْعَةٍ، وَفُرُشٍ مَرْفُوْعَةٍ- ‘তাদের জন্য রয়েছে কাটাহীন কুলবৃক্ষ সমূহ, থরে থরে সাজানো কলা, সম্প্রসারিত ছায়া, সর্বদা প্রবাহমান পানি, আর প্রচুর পরিমাণ ফল-মূল। যা কোন দিন শেষ হবে না ও যা নিষিদ্ধও হবে না। আর সমুচ্চ শয্যাসমূহ’ (ওয়াকি‘আহ ২৮-৩৪)

জান্নাতের নারী সম্পর্কে বিবরণ : আল্লাহ তা‘আলা বলেন, مُتَّكِئِيْنَ عَلَى سُرُرٍ مَصْفُوْفَةٍ وَزَوَّجْنَاهُمْ بِحُوْرٍ عِيْنٍ  ‘তারা সামনাসামনিভাবে সাজানো সারি সারি আসনের উপর ঠেস দিয়ে বসে থাকবে এবং আমি তাদের সাথে সুনয়না হূরদেরকে বিবাহ দিব’ (তূর ২০)

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فِيْهِنَّ خَيْرَاتٌ حِسَانٌ ‘সেই উদ্যান সমূহের মাঝে রয়েছে সচ্চরিত্রবান ও সুদর্শনগণ’ (আর-রহমান ৭০)

রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, غَدْوَةٌ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ أَوْ رَوْحَةٌ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيْهَا، وَلَقَابُ قَوْسِ أَحَدِكُمْ أَوْ مَوْضِعُ قَدَمٍ مِنَ الْجَنَّةِ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيْهَا، وَلَوْ أَنَّ امْرَأَةً مِنْ نِسَاءِ أَهْلِ الْجَنَّةِ اطَّلَعَتْ إِلَى الأَرْضِ، لأَضَاءَتْ مَا بَيْنَهُمَا، وَلَمَلأَتْ مَا بَيْنَهُمَا رِيْحًا، وَلَنَصِيْفُهَا  يَعْنِى الْخِمَارَ، خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيْهَا- ‘আল্লাহর পথে এক সকাল বা এক সন্ধ্যা ব্যয় করা দুনিয়া ও তার সমস্ত সম্পদ হ’তে উত্তম। তোমাদের কারো ধনুক পরিমাণ বা পা রাখার জায়গা পরিমাণ জান্নাতের জায়গা দুনিয়া ও তার মাঝের সবকিছুর চেয়ে উত্তম। যদি জান্নাতবাসিনী কোন নারী (হূর) পৃথিবীর পানে উঁকি দেয় তবে সমগ্র জগতটা (তার রূপের ছটায়) আলোকিত হয়ে যাবে এবং আসমান ও যমীনের মধ্যবর্তী স্থান সমূহ সুগন্ধিতে পূর্ণ হয়ে যাবে। তাদের মাথার উড়নাও গোটা দুনিয়া এবং তার মধ্যকার সবকিছু হ’তে উত্তম’।[2]

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, جَنَّاتِ عَدْنٍ مُفَتَّحَةً لَهُمُ الْأَبْوَابُ، مُتَّكِئِيْنَ فِيْهَا يَدْعُوْنَ فِيْهَا بِفَاكِهَةٍ كَثِيْرَةٍ وَشَرَابٍ، وَعِنْدَهُمْ قَاصِرَاتُ الطَّرْفِ أَتْرَابٌ،  ‘চিরস্থায়ী জান্নাত, যার দ্বার তাদের জন্য উন্মুক্ত। সেখানে তারা আসীন হবে হেলান দিয়ে, সেখানে তারা বহুবিধ ফলমূল ও পানীয় চাইবে।  আর তাদের পার্শ্বে থাকবে আয়তনয়না সমবয়স্কাগণ’(ছোয়াদ ৫০-৫২)

জান্নাতের নদ-নদীর বিবরণ : জান্নাতে বিভিন্ন জিনিসের নদ-নদী থাকবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لِلَّذِيْنَ اتَّقَوْا عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِيْنَ فِيْهَا وَأَزْوَاجٌ مُطَهَّرَةٌ وَرِضْوَانٌ مِنَ اللهِ- ‘যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের প্রতিপালকের নিকট তাদের জন্য এমন উদ্যান সমূহ রয়েছে যার নীচ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহমান। আর সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে। সেখানে তাদের  জন্য আরও আছে সতী-সাধ্বী স্ত্রীগণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি’ (আলে ইমরান ৩/১৫)

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, إِنَّ فِى الْجَنَّةِ بَحْرَ الْمَاءِ وَبَحْرَ الْعَسَلِ وَبَحْرَ اللَّبَنِ وَبَحْرَ الْخَمْرِ ثُمَّ تُشَقَّقُ الأَنْهَارُ بَعْدُ ‘জান্নাতে বয়েছে পানির সমুদ্র, মধুর সমুদ্র, দুধের সমুদ্র এবং শরাবের সমুদ্র। অতঃপর তা হ’তে আরও বহু নদী প্রবাহিত হবে’।[3]

জান্নাতে প্রত্যাশার অতিরিক্ত লাভ : জান্নাতবাসীরা তাদের চাহিদার অতিরিক্ত বস্ত্ত আল্লাহর নিকট থেকে লাভ করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لَهُمْ مَا يَشَاءُوْنَ فِيْهَا وَلَدَيْنَا مَزِيْدٌ   ‘এখানে তারা যা  আকাঙ্খা করবে তা পাবে এবং আমার নিকট রয়েছে আরও অধিক’ (ক্বাফ ৩৫)

জান্নাতের গৃহের বর্ণনা : আল্লাহ জান্নাতবাসীদের জন্য উত্তম গৃহ রেখেছেন। আল্লাহ বলেন, وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ ‘আর স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে’ (তওবা ৭২; ছফ্ফ ১২)

রাসূল (ছাঃ) বলেন, لَبِنَةٌ مِنْ فِضَّةٍ وَلَبِنَةٌ مِنْ ذَهَبٍ وَمِلاَطُهَا الْمِسْكُ الأَذْفَرُ وَحَصْبَاؤُهَا اللُّؤْلُؤُ وَالْيَاقُوتُ وَتُرْبَتُهَا الزَّعْفَرَانُ ‘একটি ইট স্বর্ণের এবং একটি ইট রৌপ্যের এভাবে গাঁথুনি দেয়া হয়েছে। আর মিশক হচ্ছে তার সিমেন্ট এবং মণি-মুক্তা ও ইয়াকূত পাথর হচ্ছে তার সুরকি। মেঝে বানানো হয়েছে জাফরান দিয়ে’।[4]

জান্নাত লাভের উপায়

আল্লাহ প্রদত্ত ইসলামের মৌলিক ফরয সমূহ প্রতিপালনের পাশাপাশি আরো কতিপয় আমল রয়েছে, যা জান্নাত লাভের পথকে সুগম করে। তন্মধ্যে কতিপয় এখানে উল্লেখ করা হ’ল।-

১. ন্যায়বিচার, আল্লাহর ইবাদতে যৌবন কাটানো, মসজিদের সাথে অন্তর সম্পৃক্ত রাখা, আল্লাহর জন্য পারস্পরিক ভালবাসা, নির্জনে অশ্রুসিক্ত হয়ে ইবাদত করা, আল্লাহর ভয়ে যেনার আহবান প্রত্যাখ্যান করা এবং গোপনে দান করা : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللهُ فِى ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلاَّ ظِلُّهُ إِمَامٌ عَادِلٌ وَشَابٌّ نَشَأَ بِعِبَادَةِ اللهِ وَرَجُلٌ كَانَ قَلْبُهُ مُعَلَّقًا بِالْمَسْجِدِ إِذَا خَرَجَ مِنْهُ حَتَّى يَعُودَ إِلَيْهِ وَرَجُلاَنِ تَحَابَّا فِى اللهِ فَاجْتَمَعَا عَلَى ذَلِكَ وَتَفَرَّقَا وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ حَسَبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ إِنِّى أَخَافُ اللهَ وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا حَتَّى لاَ تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ-

‘সাত শ্রেণীর লোককে আল্লাহ তাঁর ছায়া দিবেন যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না। (১) ন্যায়পরায়ণ শাসক (২) সেই যুবক যে আল্লাহর ইবাদতে বড় হয়েছে (৩) সেই লোক যার অন্তর সর্বদা মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত থাকে, সেখান থেকে বের হয়ে আসার পর তথায় ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত। (৪) এমন দুই ব্যক্তি যারা আল্লাহর ওয়াস্তে পরস্পরকে ভালবাসে। আল্লাহর ওয়াস্তে উভয়ে মিলিত হয় এবং তাঁর জন্যই পৃথক হয়ে যায়। (৫) এমন ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার দুই চক্ষু অশ্রু বিসর্জন দিতে থাকে। (৬) এমন ব্যক্তি যাকে কোন সম্ভ্রান্ত সুন্দরী নারী আহবান করে আর সে বলে আমি আল্লাহকে ভয় করি এবং (৭) যে ব্যক্তি গোপনে দান করে। এমনকি তার বাম হাত জানতে পারে না তার ডান হাত কি দান করে’।[5]

২. তাহিয়্যাতুল ওযূ ছালাত আদায় করা : তাহিয়্যাতুল ওযূ ছালাত আদায় করলে জান্নাত পাওয়া যাবে। যেমন হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ رضى الله عنه أَنَّ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ لِبِلاَلٍ عِنْدَ صَلاَةِ الْفَجْرِ يَا بِلاَلُ حَدِّثْنِى بِأَرْجَى عَمَلٍ عَمِلْتَهُ فِى الإِسْلاَمِ، فَإِنِّى سَمِعْتُ دَفَّ نَعْلَيْكَ بَيْنَ يَدَىَّ فِى الْجَنَّةِ. قَالَ مَا عَمِلْتُ عَمَلاً أَرْجَى عِنْدِى أَنِّى لَمْ أَتَطَهَّرْ طُهُورًا فِى سَاعَةِ لَيْلٍ أَوْ نَهَارٍ إِلاَّ صَلَّيْتُ بِذَلِكَ الطُّهُورِ مَا كُتِبَ لِى أَنْ أُصَلِّىَ-

আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, ‘একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ফজরের সময় বেলালকে বললেন, বেলাল বলতো দেখি মুসলমান হয়ে তুমি এমন কোন কাজ করেছো যার ছওয়াবের আশা তুমি অধিক করতে পার? কেননা আমি তোমার জুতার শব্দ জান্নাতে আমার সম্মুখে শুনতে পেয়েছি। তখন বেলাল বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)! আমি এছাড়া এমন কোন কাজ করিনি যা আমার নিকট অধিক ছওয়াবের কারণ হ’তে পারে যে, আমি রাতে বা দিনে যেকোন সময়ই ওযূ করেছি তখন সেই ওযূ দ্বারা ছালাত আদায় করেছি যা আল্লাহর পক্ষ হ’তে আমাকে তাওফীক্ব দেওয়া হয়েছে’।[6]

৩. সময়মত ছালাত আদায় করা : ওয়াক্ত অনুযায়ী নিয়মিত ছালাত আদায় করা জান্নাত লাভের মাধ্যম। যা আল্লাহর নিকট পসন্দনীয় আমল। যেমন হাদীছে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাস‘ঊদ (রাঃ) বলেন, سَأَلْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم أَىُّ الأَعْمَالِ أَحَبُّ إِلَى اللهِ قَالَ الصَّلاَةُ عَلَى وَقْتِهَا- ‘আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম কোন কাজ আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়? তিনি উত্তরে বললেন, সঠিক সময়ে ছালাত আদায় করা’।[7]

৪. তাসবীহ পাঠ করা : জান্নাত পাওয়ার বড় মাধ্যম বেশী বেশী তাসবীহ পাঠ করা। তাসবীহ পাঠ করা আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় ইবাদত। এ সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেন, لأَنْ أَقُوْلَ سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ  وَاللهُ أَكْبَرُ أَحَبُّ إِلَىَّ مِمَّا طَلَعَتْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ ‘আমার নিকট সমস্ত পৃথিবী অপেক্ষাও প্রিয়তর হচ্ছে সুবহানাল্লাহ, আলহাম দু লিল্লা-হ, লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ও আল্লাহু আকবার বলা’।[8] অন্য হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ رضى الله عنه أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَنْ قَالَ سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ فِى يَوْمٍ مِائَةَ مَرَّةٍ حُطَّتْ خَطَايَاهُ، وَإِنْ كَانَتْ مِثْلَ زَبَدِ الْبَحْرِ-

আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দৈনিক একশত বার বলবে, ‘সুবহা-নাল্লা-হি ওয়াবিহামদিহী’ (অর্থাৎ আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করি তাঁর প্রশংসার সাথে) তার গোনাহসমূহ মাফ করা হবে, যদিও তা সমুদ্র ফেনার ন্যায় অধিক হয়’।[9]

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مَنْ قَالَ حِينَ يُصْبِحُ وَحِينَ يُمْسِى سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ مِائَةَ مَرَّةٍ. لَمْ يَأْتِ أَحَدٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِأَفْضَلَ مِمَّا جَاءَ بِهِ إِلاَّ أَحَدٌ قَالَ مِثْلَ مَا قَالَ أَوْ زَادَ عَلَيْهِ-

আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় একশত বার বলবে, ‘সুবহা-নাল্লা-হি ওয়াবিহামদিহী’ ক্বিয়ামতের দিন ইহা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বাক্য নিয়ে কেউ উপস্থিত হ’তে পারবে না, কেবল সেই ব্যক্তি ব্যতীত, যে ইহার অনুরূপ বা ইহা অপেক্ষা অধিকবার বলবে’।[10]

৫. আল্লাহর নাম মুখস্থ করা : আল্লাহর অনেক গুণবাচক নাম রয়েছে। ঈমানের সাথে ঐ নামগুলি মুখস্থ করলে জান্নাত লাভ করা যাবে। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوْهُ بِهَا ‘আল্লাহর কতক উত্তম নাম রয়েছে। তোমরা সে নামের মাধ্যমে আল্লাহকে ডাক’ (আ‘রাফ ১৮০)

রাসূল (ছাঃ) বলেন, لِلَّهِ تِسْعَةٌ وَتِسْعُوْنَ اسْمًا، مِائَةٌ إِلاَّ وَاحِدًا، لاَ يَحْفَظُهَا أَحَدٌ إِلاَّ دَخَلَ الْجَنَّةَ،  ‘আল্লাহর নিরানববইটি এক কম একশতটি নাম রয়েছে। যে তা মুখস্থ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’।[11]

৬. আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করা : মানুষের জীবনের সকল প্রয়োজন আল্লাহর কাছে চাইতে হবে এবং তাঁর নিকটে কল্যাণ প্রার্থনা করতে হবে, গোনাহ থেকে ক্ষমা চাইতে হবে। এক কথায় সর্বদা তাঁর কাছে প্রার্থনা করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ادْعُوْنِيْ أَسْتَجِبْ لَكُمْ ‘তোমরা আমাকে ডাক আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব’ (মুমিন ৬০)

অন্য এক আয়াতে তিনি বলেন, ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ডাক বিনয়ের সাথে ও গোপনে’ (আ‘রাফ ৫৫)

অন্যত্র তিনি আরো বলেন, وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِيْ عَنِّيْ فَإِنِّيْ قَرِيْبٌ أُجِيْبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ ‘আর যখন আমার বান্দারা তোমাকে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে, তুমি বল আমি নিকটেই রয়েছি। আমি আহবানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে’ (বাক্বারাহ ১৮৬)

এ সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেন, لِيَسْأَلْ أَحَدُكُمْ رَبَّهُ حَاجَتَهُ كُلَّهَا حَتَّى يَسْأَلَ شِسْعَ نَعْلِهِ إِذَا انْقَطَعَ ‘তোমাদের প্রত্যেকেই যেন স্বীয় প্রতিপালকের নিকট যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিস প্রার্থনা করে। এমনকি যখন তার জুতার ফিতা ছিড়ে যায়, তাও যেন আল্লাহর নিকট চায়’।[12]

৭. ছিয়াম পালন করা : ছিয়াম পালন করলে জান্নাতে যাওয়া যাবে। মহান আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ ‘তোমাদের জন্য ছিয়াম ফরয করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি ফরয করা হয়েছিল। যাতে তোমরা মুত্তাক্বী হ’তে পার’ (বাক্বারাহ ১৮৩)

রাসূল (ছাঃ) বলেন, مَنْ صَامَ يَوْمًا فِىْ سَبِيْلِ اللهِ بَعَّدَ اللهُ وَجْهَهُ عَنِ النَّارِ سَبْعِيْنَ خَرِيْفًا ‘যে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য একদিন  ছিয়াম পালন করবে, আল্লাহ জাহান্নামকে তার নিকট হ’তে একশত বছরের পথ দূরে করে দিবেন’।[13]

অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, فِى الْجَنَّةِ ثَمَانِيَةُ أَبْوَابٍ، فِيْهَا بَابٌ يُسَمَّى الرَّيَّانَ لاَ يَدْخُلُهُ إِلاَّ الصَّائِمُوْنَ-  ‘জান্নাতের আটটি দরজা রয়েছে। তার মধ্যে একটি দরজার নাম রাইয়ান। ছিয়াম পালনকারী ব্যতীত ঐ দরজা দিয়ে অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না’।[14]

৮. আল্লাহর পথে দান করা : দান-ছাদাক্বা আল্লাহর সন্তোষ লাভের মাধ্যম। এর দ্বারা জান্নাত পাওয়া যায়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ وَمَا زَادَ اللهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ إِلاَّ عِزًّا وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلاَّ رَفَعَهُ اللهُ ‘দান মানুষের সম্পদকে হরাস করে না। বরং বান্দাকে ক্ষমা করে এবং তার মান-মর্যাদা বৃদ্ধি করে। আর যে আল্লাহর ওয়াস্তে বিনয় প্রকাশ করে আল্লাহ তার মর্যাদাকে উন্নত করেন’।[15] অন্যত্র তিনি বলেন,

إِنَّ الصَّدَقَةَ لَتُطْفِئُ عَنْ أَهْلِهَا حَرَّ الْقُبُوْرِ، وَإِنَّمَا يَسْتَظِلُّ الْمُؤْمِنُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِيْ ظِلِّ صَدَقَتِهِ-

‘নিশ্চয়ই দান কবরের শাস্তিকে মিটিয়ে দেয় এবং ক্বিয়ামতের দিন মুমিন তার দানের ছায়াতলে ছায়া গ্রহণ করবে’।[16] তিনি আরো বলেন, صَدَقَةُ السِّرِّ تُطْفِيُ غَضَبَ الرَّبِّ- ‘গোপন দান প্রতিপালকের ক্রোধকে মিটিয়ে দেয়’।[17] এ হাদীছ দ্বারা বুঝা যায় যে, গোপন দান এমন এক ইবাদত যা প্রতিপালকের রাগকে মুছে দেয়। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন এবং তার প্রতি রহমত বর্ষণ করেন।

৯. কুরআন তেলাওয়াত করা : কুরআন তেলাওয়াত করলে বহু নেকী রয়েছে। যা জান্নাত লাভের উপায় বটে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, الْمَاهِرُ بِالْقُرْآنِ مَعَ السَّفَرَةِ الْكِرَامِ الْبَرَرَةِ وَالَّذِى يَقْرَأُ الْقُرْآنَ وَيَتَتَعْتَعُ فِيهِ وَهُوَ عَلَيْهِ شَاقٌّ لَهُ أَجْرَانِ ‘কুরআন পাঠে দক্ষ ব্যক্তি সম্মানিত লেখক ফিরিশতাদের সাথে থাকবেন। আর যে কুরআন পড়ে কিন্তু আটকায় এবং কুরআন পড়া তার পক্ষে খুব কষ্টদায়ক হয় তার জন্য দুইগুণ নেকী রয়েছে’।[18] তিনি আরো বলেন, إِنَّ اللهَ يَرْفَعُ بِهَذَا الْكِتَابِ أَقْوَامًا وَيَضَعُ بِهِ آخَرِيْنَ- ‘এই কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহ কোন কোন জাতিকে উন্নত করেন এবং অন্যদের অবনত করেন’।[19]

শেষ কথা : উপরোক্ত আমল সমূহ সহ পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা নির্দেশিত নেক আমল সমূহ একনিষ্ঠভাবে সম্পন্ন করতে পারলে জান্নাত লাভ করা সহজ হবে। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!


[1]. বুখারী হা/৩২৪৪; মুসলিম হা/১৮৯; মিশকাত হা/৫৬১২

[2]. বুখারী হা/৬৫৬৮

[3]. তিরমিযী, দারেমী, মিশকাত হা/৫৬৫০, সনদ ছহীহ

[4]. তিরমিযী হা/২৫২৬, সনদ ছহীহ

[5]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৭০১

[6]. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৩২২

[7]. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫৬৮

[8]. মুসলিম, মিশকাত হা/২২৯৫

[9]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২২৯৬

[10]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২২৯৭

[11]. বুখারী হা/৬৪১০; মুসলিম হা/২৬৭৩

[12]. তিরমিযী, মিশকাত হা/২২৫১, সনদ হাসান

[13]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২০৫৩

[14]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৯৫৭

[15]. মুসলিম, মিশকাত হা/১৮৮৯

[16]. সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৮১৬/৩৪৮৪

[17]. সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৮৪০

[18]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২১১২

[19]. মুসলিম, মিশকাত হা/২১১৫; বাংলা মিশকাত হা/২০১৩