প্রবন্ধ

যাকাত সম্পর্কিত বিবিধ মাসায়েল

মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম*

ভূমিকা :

আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে আশরাফুল মাখলূকাত তথা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসাবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। আর তাদের সার্বিক জীবন পরিচালনার জন্য ইসলামকে একমাত্র দ্বীন হিসাবে মনোনীত করেছেন। উদ্দেশ্য হ’ল- মানুষ ইসলামের যাবতীয় বিধান পালনের মাধ্যমে আল্লাহ্র নৈকট্য হাছিল করবে। আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর দন্ডায়মান; যার অন্যতম স্তম্ভ হ’ল যাকাত। শ্রেষ্ঠ ইবাদত ছালাতের পরেই যাকাতের স্থান। কুরআনুল কারীমের অধিকাংশ জায়গায় আল্লাহ তা‘আলা ছালাতের পরেই যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব যাকাতের বিধান ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে, যা আদায় করা সামর্থ্যবান সকলের উপর অপরিহার্য। নিম্নে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে যাকাতের বিভিন্ন দিক ও বিভাগ সম্পর্কে আলোচনা করা হ’ল।-

যাকাতের পরিচয়

আভিধানিক অর্থ : الطهارة والنماء والبركة والمدح  অর্থাৎ পবিত্রতা, ক্রমবৃদ্ধি, আধিক্য ও প্রশংসা। উল্লিখিত সব কয়টি অর্থই কুরআন ও হাদীছে উদ্ধৃত হয়েছে।

পারিভাষিক অর্থ : ইসলামী শরী‘আত কর্তৃক নির্ধারিত নিছাব পরিমাণ মালের নির্দিষ্ট অংশ নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করার নাম যাকাত।[1]

কুরআন ও হাদীছের অনেক স্থানে ‘যাকাত’-কে ‘ছাদাক্বাহ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। কুরআন মাজীদের ৮ টি মাক্কী ও ২২টি মাদানী সূরার ৩০টি আয়াতে ‘যাকাত’ শব্দটি উল্লিখিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৭টি আয়াতে ‘ছালাত’-এর সাথেই ‘যাকাত’ শব্দ এসেছে।

যাকাতের গুরুত্ব ও ফযীলত

(ক) যাকাত পূর্ণাঙ্গ ইসলাম মানার অন্যতম মাধ্যম : যাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম। একে বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলাম মানা সম্ভব নয়। আর পূর্ণ মুমিন হওয়ার জন্য ইসলামের যাবতীয় বিধান মানা অবশ্যক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

أَفَتُؤْمِنُوْنَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُوْنَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاءُ مَنْ يَفْعَلُ ذَلِكَ مِنْكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِيْ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّوْنَ إِلَى أَشَدِّ الْعَذَابِ وَمَا اللهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُوْنَ-

‘তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে ঈমান রাখ আর কিছু অংশ অস্বীকার কর? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা তা করে, দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ব্যতীত তাদের কি প্রতিদান হ’তে পারে? ক্বিয়ামত দিবসে তাদেরকে কঠিনতম আযাবে নিক্ষেপ করা হবে। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে উদাসীন নন’ (বাক্বারাহ ২/৮৫)

(খ) যাকাত ঈমানের সত্যায়নকারী : পৃথিবীতে মানুষের নিকটে সবচেয়ে প্রিয় বস্ত্ত হ’ল তার ধন-সম্পদ। আর সে কখনই তা দান করে না, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাঁর নিকটে অধিক প্রিয় না হয়।

(গ) যাকাত অন্তরে প্রশান্তি লাভের মাধ্যম : মানুষের সম্পদ যত বেশীই হোক না কেন, যদি তার কোন প্রতিবেশী অনাহারে দিনাতিপাত করে তাহ’লে সে কখনও তার অন্তরে প্রশান্তি লাভ করতে পারে না। বরং যখন তার সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ ঐ গরীব লোকটিকে দিয়ে সচ্ছল করে, তখন সে অন্তরে প্রশান্তি লাভ করে।

প্রত্যেক মানুষ যেহেতু তার সম্পদকেই অধিক ভালবাসে। এমনকি সম্পদের জন্য মানুষ নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না, সেহেতু সেই অধিক ভালবাসার বস্ত্তকে অন্যের জন্য পসন্দ করার মাধ্যমেই পূর্ণ ঈমানদার হওয়া সম্ভব। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,

لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيْهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ-  

‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হ’তে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পসন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পসন্দ করে।[2]

(ঙ) যাকাত জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

إِنَّ فِيْ الْجَنَّةِ لَغُرْفَةً، قَدْ يُرَى ظَاهِرُهَا مِنْ بَاطِنِهَا، وَبَاطِنُهَا مِنْ ظَاهِرِهَا، أَعَدَّهَا اللهُ لِمَنْ أَطْعَمَ الطَّعَامَ، وَأَلاَنَ الْكَلاَمَ، وَتَابَعَ الصِّيَامَ، وَصَلَّى بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ-

‘জান্নাতের মধ্যে এমন সব (মসৃণ) ঘর রয়েছে যার বাইরের জিনিস সমূহ ভিতর হ’তে এবং ভিতরের জিনিস সমূহ বাহির হ’তে দেখা যায়। সে সকল ঘরসমূহ আল্লাহ তা‘আলা সেই ব্যক্তির জন্য প্রস্ত্তত করে রেখেছেন যে ব্যক্তি (মানুষের সাথে) নম্রতার সাথে কথা বলে, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করে (যাকাত আদায় করে), পর পর ছিয়াম পালন করে এবং রাতে ছালাত আদায় করে অথচ মানুষ তখন ঘুমিয়ে থাকে’।[3]

(চ) যাকাত মুসলিম ঐক্যের সোপান : যাকাত আদায়ের মাধ্যমে মুসলিম ঐক্য সুদৃঢ় হয়। এমনকি এটি সমগ্র মুসলিম জাতিকে একটি পরিবারে রূপান্তরিত করে। ধনীরা যখন গরীবদেরকে যাকাত আদায়ের মাধ্যমে সহযোগিতা করে তখন গরীবরাও তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ধনীদের উপর সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে। ফলে তারা পরস্পরে ভাই ভাই হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَأَحْسِنْ كَمَا أَحْسَنَ اللهُ إِلَيْكَ ‘তুমি অনুগ্রহ কর যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন’ (ক্বাছাছ ৭৭)

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ، لاَ يَظْلِمُهُ وَلاَ يُسْلِمُهُ، وَمَنْ كَانَ فِيْ حَاجَةِ أَخِيْهِ كَانَ اللهُ فِيْ حَاجَتِهِ، وَمَنْ فَرَّجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً فَرَّجَ اللهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرُبَاتِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ-

‘এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সে তার উপর যুলুম করবে না এবং তাকে শত্রুর হাতে সোপর্দ করবে না। যে কেউ তার ভাইয়ের অভাব পূরণ করবে, আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের দিন তার বিপদসমূহ দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ ঢেকে রাখবে, আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন’।[4] অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

تَرَى الْمُؤْمِنِيْنَ فِيْ تَرَاحُمِهِمْ وَتَوَادِّهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ كَمَثَلِ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى عُضْوًا تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ جَسَدِهِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى-

‘পারস্পরিক দয়া, ভালবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শনে তুমি মুমিনদের একটি দেহের মত দেখবে। যখন শরীরের একটি অঙ্গ রোগাক্রান্ত হয়, তখন শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রাত জাগে এবং জ্বরে আক্রান্ত হয়’।[5]

(ছ) যাকাত দারিদ্র্য বিমোচনের প্রধান মাধ্যম : প্রাচীনকাল হতে মানুষ দু’টি শ্রেণীতে বিভক্ত। ধনী ও দরিদ্র। ধনিক শ্রেণীর সম্পদের আধিক্য সীমা ছাড়িয়ে গেছে, আর দরিদ্র শ্রেণী ক্ষীণ হ’তে হ’তে মাটির সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। তেলহীন প্রদীপের ন্যায় নিভু নিভু জীবন প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে মাত্র। এর কারণ হ’ল, প্রাচীন ধর্মগ্রন্থসমূহ দরিদ্রের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ প্রদর্শনে উৎসাহ দিলেও তা বাধ্যতামূলক করেনি এবং দানের পরিমাণও নির্ধারণ করেনি। পক্ষান্তরে ইসলাম ‘যাকাত’ নামে এমন এক বিধান দিয়েছে, যার মাধ্যমে ধনীদের সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ দরিদ্রের মাঝে বণ্টন বাধ্যতামূলক করে দারিদ্র্য বিমোচনে চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করেছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

أَنَّ اللهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً فِيْ أَمْوَالِهِمْ، تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ وَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ-

‘আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর তাদের সম্পদের মধ্য থেকে ছাদাক্বা (যাকাত) ফরয করেছেন। যেটা ধনীদের নিকট থেকে গৃহীত হবে আর দরিদ্রের মাঝে বণ্টন হবে’।[6]

অতএব ধনীদের সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ গরীবদের মাঝে বণ্টনের মাধ্যমেই কেবল দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব। সূদ ভিত্তিক অর্থনীতি কখনোই দারিদ্র্য দূর করতে পারে না। বর্তমান সঊদী আরবের দিকে লক্ষ্য করলেই তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। যেখানে যাকাত ব্যবস্থা চালু থাকার কারণে যাকাত গ্রহণ করার মত দরিদ্র মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে সেই যাকাতের অর্থ অন্য রাষ্ট্রে প্রেরণ করতে হয়। পক্ষান্তরে ক্ষুদ্র ঋণের দোহাই দিয়ে যে দেশে যত সূদ ভিত্তিক অর্থনীতি চলছে সে দেশে তত দরিদ্রের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

(জ) যাকাত মানুষকে অর্থনৈতিক পাপ থেকে রক্ষা করে : চুরি, ডাকাতিসহ অর্থ সম্পর্কিত অন্যান্য পাপ সমূহ থেকে মানুষকে রক্ষা করার অন্যতম মাধ্যম হ’ল যাকাত। কেননা অর্থ সংকটের কারণেই মানুষ বাধ্য হয়ে চুরি-ডাকাতির মত জঘন্যতম অপরাধ করতে বাধ্য হয়। ধনীরা তাদের সম্পদ থেকে যাকাতের নির্দিষ্ট অংশ দ্বারা যখন গরীবরেদকে সহযোগিত করবে ও তাদের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে, তখন তারা অবশ্যই উল্লিখিত অপরাধ থেকে বিরত থাকবে।

(ঝ) যাকাত আদায় করলে সম্পদ বৃদ্ধি পায় : আল্লাহ তা‘আলা বলেন, يَمْحَقُ اللهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ وَاللهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ كَفَّارٍ أَثِيْمٍ ‘আল্লাহ সূদকে ধ্বংস করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন। আল্লাহ কোন অকৃতজ্ঞ পাপীকে ভালবাসেন না’ (বাক্বারাহ ২/২৭৬)। অতএব যাকাত আদায় করলে এবং দান করলে সম্পদ কমে যায় না। বরং তা বৃদ্ধি পায়। যে কোন মাধ্যমে আল্লাহ তার রিযিক বৃদ্ধি করে দেন।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ وَمَا زَادَ اللهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ إِلاَّ عِزًّا وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلاَّ رَفَعَهُ اللهُ-

‘দান সম্পদ কমায় না; ক্ষমা দ্বারা আল্লাহ কোন বান্দার সম্মান বৃদ্ধি ছাড়া হ্রাস করেন না এবং যে কেহ আল্লাহর ওয়াস্তে বিনয় প্রকাশ করে, আল্লাহ তাকে উন্নত করেন’।[7]

(ঞ) যাকাত কল্যাণ নাযিলের মাধ্যম : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,وَلَمْ يَمْنَعُوْا زَكَاةَ أَمْوَالِهِمْ إِلاَّ مُنِعُوْا الْقَطْرَ مِنَ السَّمَاءِ ‘তারা তাদের সম্পদের যাকাত আদায়কে বাধা দেয় না। বরং আকাশ হ’তে (রহমতের) বৃষ্টি বর্ষণকে বাধা দেয়’।[8]

ইসলামী শরী‘আতে যাকাতের হুকুম ও তার অবস্থান

প্রত্যেক মুসলিম স্বাধীন ব্যক্তির উপর যাকাত ফরয যা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে তৃতীয় স্তম্ভ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَأَقِيْمُوْا الصَّلَاةَ وَآتُوْا الزَّكَاةَ وَارْكَعُوْا مَعَ الرَّاكِعِيْنَ ‘তোমরা ছালাত ক্বায়েম কর ও যাকাত দাও এবং যারা রুকূ করে তাদের সাথে রুকূ কর’ (বাক্বারহ ২/৪৩)। তিনি অন্যত্র বলেন, خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيْهِمْ بِهَا ‘তাদের সম্পদ হ’তে ছাদাক্বা গ্রহণ করবে। এর দ্বারা তুমি উহাদেরকে পবিত্র করবে এবং পরিশোধিত করবে’ (তওবা ৯/১০৩)। হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

بُنِىَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ، وَإِيْتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالْحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ-

‘ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি। ১- আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ) আল্লাহ্র রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা। ২- ছালাত ক্বায়েম করা। ৩- যাকাত আদায় করা। ৪- হজ্জ সম্পাদন করা এবং ৫- রামাযানের ছিয়াম পালন করা।[9]

অন্য হাদীছে এসেছে,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رضى الله عنهما أَنَّ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم بَعَثَ مُعَاذًا رضى الله عنه إِلَى الْيَمَنِ فَقَالَ ادْعُهُمْ إِلَى شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ، وَأَنِّيْ رَسُوْلُ اللهِ، فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوْا لِذَلِكَ فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللهَ قَدِ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فِيْ كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ، فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوْا لِذَلِكَ فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً فِيْ أَمْوَالِهِمْ، تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ وَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ-

ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী (ছাঃ) মু‘আয (রাঃ)-কে ইয়ামান দেশে (শাসক হিসাবে) প্রেরণ করেন। অতঃপর বলেন, ‘সেখানকার অধিবাসীদেরকে এ সাক্ষ্য দানের প্রতি আহবান জানাবে যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহ্র রাসূল। যদি তারা তা মেনে নেয় তবে তাদেরকে অবগত কর যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর প্রতি দিনে ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ফরয করেছেন। যদি সেটাও তারা মেনে নেয় তবে তাদেরকে অবগত কর যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর তাদের সম্পদে ছাদাক্বা (যাকাত) ফরয করেছেন। যেটা তাদের ধনীদের নিকট থেকে গৃহীত হবে আর দরিদ্রের মাঝে বণ্টন হবে’।[10]

যাকাত ফরয হওয়ার সময়

যাকাত মক্কায় ফরয হয়। কিন্তু নিছাব নির্ধারণ, কোন কোন সম্পদে যাকাত ফরয এবং তা ব্যয়ের খাত সমূহের বর্ণনা মদীনায় দ্বিতীয় হিজরীতে অবতীর্ণ হয়েছে।[11]

যাকাত ত্যাগকারীর হুকুম

কেউ যদি যাকাত ওয়াজিব হওয়াকে অস্বীকার করে তাহ’লে সে মুরতাদ হয়ে যাবে। সে তওবা করে ফিরে না আসলে তার রক্ত মুসলমানদের জন্য হালাল হয়ে যাবে। কেননা কুরআন ও সন্নাহ দ্বারা যাকাত ওয়াজিব সাব্যস্ত হয়েছে। পক্ষান্তরে কেউ যদি যাকাত ওয়াজিব হওয়াকে স্বীকার করে কিন্তু অজ্ঞতাবশত অথবা কৃপণতার কারণে যাকাত আদায় না করে তাহ’লে সে কাবীরা গুনাহগার হবে। তবে ইসলাম থেকে বের হবে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যাকাত ত্যাগকারী সম্পর্কে বলেন, فَيُرَى سَبِيْلُهُ إِمَّا إِلَى الْجَنَّةِ وَإِمَّا إِلَى النَّارِ ‘অতঃপর তাকে তার পথ দেখানো হবে জান্নাতের দিকে, না হয় জাহান্নামের দিকে’।[12] অতএব কৃপণতাবশত যাকাত ত্যাগকারী কাফের হ’লে তার জান্নাতের কোন পথ থাকবে না। তবে তার থেকে জোরপূর্বক যাকাত আদায় করতে হবে। এক্ষেত্রে যাকাত আদায় করতে অস্বীকার করলে সে মুরতাদ হয়ে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَإِنْ تَابُوْا وَأَقَامُوْا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوْا سَبِيْلَهُمْ إِنَّ اللهَ غَفُوْرٌ رَحِيْمٌ- ‘কিন্তু যদি তারা তওবা করে, ছালাত কায়েম করে ও যাকাত আদায় করে তবে তাদের পথ ছেড়ে দিবে; নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (তওবা ৯/৫)

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوْا أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ، وَيُقِيْمُوْا الصَّلاَةَ، وَيُؤْتُوْا الزَّكَاةَ، فَإِذَا فَعَلُوْا ذَلِكَ عَصَمُوْا مِنِّيْ دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلاَّ بِحَقِّ الإِسْلاَمِ، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللهِ-

‘আমি লোকদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য আদিষ্ট হয়েছি, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই ও মুহাম্মাদ (ছাঃ) আল্লাহ্র রাসূল, আর ছালাত ক্বায়েম করে ও যাকাত আদায় করে। তারা যদি এগুলো করে, তবে আমার পক্ষ হ’তে তাদের জান ও মালের নিরাপত্তা লাভ করল; অবশ্য ইসলামের বিধান অনুযায়ী যদি কোন কারণ থাকে, তাহলে স্বতন্ত্র কথা। আর তাদের হিসাবের ভার আল্লাহ্র উপর ন্যাস্ত’।[13]

আবু বকর (রাঃ) যাকাত আদায়ে অস্বীকারকারীদের সম্পর্কে বলেছিলেন, وَاللهِ لَوْ مَنَعُوْنِيْ عَنَاقًا كَانُوْا يُؤَدُّوْنَهَا إِلَى رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم لَقَاتَلْتُهُمْ عَلَى مَنْعِهَا ‘আল্লাহর কসম! যদি তারা একটি মেষ শাবক যাকাত দিতেও অস্বীকৃতি জানায় যা আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে তারা দিত, তাহ’লে যাকাত না দেওয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে আমি অবশ্যই যুদ্ধ করব’।[14]

যাকাত ত্যাগকারীর পরিণতি

আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে আশরাফুল মাখলূকাত তথা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসাবে সৃষ্টি করে করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন এবং ভাল ও মন্দ উভয় পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। ভাল পথের অনুসারীদের জন্য জান্নাতের অফুরন্ত নে‘মত ও মন্দ পথের অনুসারীদের জন্য জাহান্নামের কঠিন আযাব নির্ধারণ করেছেন।

(ক) যাকাত ত্যাগকারীর পরকালীন শাস্তি : যাকাত পরিত্যাগকারীর পরিণাম উল্লেখ করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَالَّذِيْنَ يَكْنِزُوْنَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُوْنَهَا فِيْ سَبِيْلِ اللهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيْمٍ، يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِيْ نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوْبُهُمْ وَظُهُوْرُهُمْ هَذَا مَا كَنَزْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ فَذُوْقُوْا مَا كُنْتُمْ تَكْنِزُوْنَ-

‘যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহ্র পথে ব্যয় না করে তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও। যেদিন জাহান্নামের অগ্নিতে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেওয়া হবে। আর বলা হবে, এটাই তা, যা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জীভূত করতে। সুতরাং তোমরা যা পুঞ্জীভূত করেছিলে তা আস্বাদন কর’ (তওবা ৯/৩৪-৩৫)

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

مَنْ آتَاهُ اللهُ مَالاً، فَلَمْ يُؤَدِّ زَكَاتَهُ مُثِّلَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ شُجَاعًا أَقْرَعَ، لَهُ زَبِيْبَتَانِ، يُطَوَّقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، ثُمَّ يَأْخُذُ بِلِهْزِمَتَيْهِ يَعْنِى شِدْقَيْهِ ثُمَّ يَقُوْلُ أَنَا مَالُكَ، أَنَا كَنْزُكَ-

‘যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু সে এর যাকাত আদায় করেনি, ক্বিয়ামতের দিন তার সম্পদকে টেকো (বিষের তীব্রতার কারণে) মাথা বিশিষ্ট বিষধর সাপের আকৃতি দান করে তার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। সাপটি তার মুখের দু’পার্শ্বে কামড়ে ধরে বলবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার জমাকৃত মাল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তেলাওয়াত করেন, وَلاَ يَحْسَبَنَّ الَّذِيْنَ يَبْخَلُوْنَ بِمَا آتَاهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَهُمْ سَيُطَوَّقُوْنَ مَا بَخِلُوْا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلِلَّهِ مِيْرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاللهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ خَبِيْرٌ ‘আল্লাহ যাদেরকে সম্পদশালী করেছেন অথচ তারা সে সম্পদ নিয়ে কার্পণ্য করেছে, তাদের ধারণা করা উচিত নয় যে, সেই সম্পদ তাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে, বরং তা তাদের জন্য অকল্যাণকর হবে। অচিরেই ক্বিয়ামত দিবসে, যা নিয়ে কার্পণ্য করেছে তা দিয়ে তাদের গলদেশ শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হবে’ (আলে-ইমরান ৩/১৮০)[15]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরো বলেন, প্রত্যেক স্বর্ণ ও রৌপ্যের মালিক যে উহার হক (যাকাত) আদায় করে না, ‘নিশ্চয়ই ক্বিয়ামতের দিন তার জন্য আগুনের বহু পাত তৈরী করা হবে এবং সে সমুদয়কে জাহান্নামের আগুনে গরম করা হবে এবং তার পাঁজর, কপাল ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে। যখনই তা ঠান্ডা হয়ে যাবে তখন পুনরায় তাকে গরম করা হবে (তার সাথে এরূপ করা হবে) সে দিনের পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাযার বছরের সমান। (তার এ শাস্তি চলতে থাকবে) যতদিন না বান্দাদের বিচার নিষ্পত্তি হয়। অতঃপর সে তার পথ ধরবে, হয় জান্নাতের দিকে, না হয় জাহান্নামের দিকে।

জিজ্ঞেস করা হ’ল হে রাসূল (ছাঃ)! উট সম্পর্কে কি হবে? রাসূল (ছাঃ) বললেন, যে উটের মালিক তার হক আদায় করবে না আর তার হকসমূহের মধ্যে পানি পানের তারিখে তার দুধ দোহন করা (এবং অন্যদের দান করাও) এক হক। ‘ক্বিয়ামতের দিন নিশ্চয়ই তাকে এক ধুধু ময়দানে উপুড় করে ফেলা হবে, আর তার সে সকল উট যার একটি বাচ্চাও সে সেই দিন হারাবে না; বরং সকলকে পূর্ণভাবে পাবে, তাকে তার ক্ষুর দ্বারা মাড়াতে থাকবে এবং মুখ দ্বারা কামড়াতে থাকবে। এভাবে যখনই তাদের শেষ দল অতিক্রম করবে পুনরায় প্রথম দল এসে পৌঁছবে। এরূপ করা হবে সেই দিন, যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাযার বছরের সমান। (তার এ শাস্তি চলতে থাকবে) যতদিন না বান্দাদের বিচার নিষ্পত্তি হয়। অতঃপর সে তার পথ ধরবে, হয় জান্নাতের দিকে, না হয় জাহান্নামের দিকে।

অতঃপর জিজ্ঞেস করা হ’ল হে আল্লাহ্র রাসূল! গরু ছাগল সম্পর্কে কি হবে? তিনি বললেন, প্রত্যেক গরু ও ছাগলের মালিক যে তার হক আদায় করবে না, ‘ক্বিয়ামতের দিন নিশ্চয়ই তাকে এক ধুধু মাঠে উপুড় করে ফেলা হবে, আর তার সে সকল গরু-ছাগল তাকে শিং মারতে থাকবে এবং ক্ষুরের দ্বারা মাড়াতে থাকবে, অথচ সে দিন তার কোন একটি গরু ছাগলই শিং বাঁকা, শিং হীন বা শিং ভাঙ্গা হবে না এবং একটি মাত্র গরু-ছাগলকেও সে হারাবে না। যখনই তার প্রথম দল অতিক্রম কারবে, তখনই শেষ দল উপস্থিত হবে। এরূপ করা হবে সেই দিন, যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাযার বছরের সমান। (তার এ শাস্তি চলতে থাকবে) যতদিন না বান্দাদের বিচার নিষ্পত্তি হয়। অতঃপর সে তার পথ ধরবে, হয় জান্নাতের দিকে, না হয় জাহান্নামের দিকে।

অতঃপর জিজ্ঞেস করা হ’ল হে আল্লাহ্র রাসূল! ঘোড়া সম্পর্কে কি হবে? তিনি বললেন, ঘোড়া তিন প্রকার। ঘোড়া কারো জন্য পাপের কারণ, কারো জন্য আবরণ স্বরূপ, আবার কারো জন্য ছওয়াবের বিষয়। (ক) যে ঘোড়া তার মালিকের পক্ষে পাপের কারণ, তা হ’ল সে ব্যক্তির ঘোড়া, যে তাকে পালন করেছে লোক দেখানো, গর্ব এবং মুসলমানদের প্রতি শত্রুতার উদ্দেশ্যে। এ ঘোড়া হ’ল তার পাপের কারণ। (খ) যে ঘোড়া তার মালিকের জন্য আবরণস্বরূপ, তা হ’ল সে ব্যক্তির ঘোড়া, যে তাকে পালন করেছে আল্লাহ্র রাস্তায়, অতঃপর ভুলে যায়নি তার সম্পর্কে ও তার পিঠ সম্পর্কে আল্লাহ্র হক। এই ঘোড়া তার ইয্যত-সম্মানের জন্য আবরণস্বরূপ। (গ) আর যে ঘোড়া তার মালিকের জন্য ছওয়াবের কারণ, তা হ’ল সে ব্যক্তির ঘোড়া, যে তাকে পালন করেছে কোন চারণভূমিতে বা ঘাসের বাগানে শুধু আল্লাহ্র রাস্তায় মুসলমানদের (দেশ রক্ষার) জন্য। তখন তার সে ঘোড়া চারণভূমি অথবা বাগানের যা কিছু খাবে, তার পরিমাণ তার জন্য নেকী লিখা হবে এবং লিখা হবে গোবর ও পেশাব পরিমাণ নেকী। আর যদি তা আপন রশি ছিড়ে একটি বা দু’টি মাঠও বিচরণ করে, তাহ’লে নিশ্চয়ই উহার পদচিহ্ন ও গোবরসমূহ পরিমাণ নেকী লিখা হবে। এছাড়া মালিক যদি উক্ত ঘোড়াকে কোন নদীর কিনারে নিয়ে যায়, আর তা নদী হ’তে পানি পান করে, অথচ মালিকের ইচ্ছা ছিল না পানি পান করাতে, তথাপি তার পানি পান পরিমাণ নেকী তার জন্য লিখা হবে।

অতঃপর জিজ্ঞেস করা হ’ল, হে আল্লাহ্র রাসূল! গাধা সম্পর্কে কি হবে? তিনি বললেন, গাধার বিষয়ে আমার প্রতি কিছু নাযিল হয়নি। এই স্বতন্ত্র ও ব্যাপকার্থক আয়াতটি ব্যতীত, ‘যে ব্যক্তি এক অণু পরিমাণ ভাল কাজ করবে, সে তার নেক ফল পাবে, আর যে এক অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে, সে তার মন্দ ফল ভোগ করবে (অর্থাৎ গাধার যাকাত দিলে তারও ছওয়াব পাওয়া যাবে)’ (যিলযাল ৭-৮)[16]

(খ) যাকাত ত্যাগকারীর দুনিয়াবী শাস্তি : আল্লাহ তা‘আলা পরকালে যেমন যাকাত ত্যাগকারীর জন্য কঠিন শাস্তি নির্ধারণ করেছেন। তেমনিভাবে দুনিয়াতেও তাদের উপর নেমে আসে শাস্তি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, وَلاَ مَنَعَ قَوْمٌ الزَّكَاةَ إِلاَّ حَبَسَ اللهُ عَنْهُمُ الْقَطْرَ ‘যে জাতি যাকাত দেয় না, আল্লাহ তাদের উপর  বৃষ্টিপাত বন্ধ করে দেন’।[17]

যাকাত ওয়াজিব হওয়ার শর্তসমূহ

যাকাত ওয়াজিব হওয়ার শর্ত পাঁচটি। যথা :

(১) الحرية তথা স্বাধীন হওয়া : যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য ব্যক্তিকে স্বাধীন হ’তে হবে। কোন দাসের উপর যাকাত ওয়াজিব নয়। কেননা দাস সম্পদের মালিক হ’তে পারে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنِ ابْتَاعَ عَبْدًا وَلَهُ مَالٌ فَمَالُهُ لِلَّذِى بَاعَهُ إِلاَّ أَنْ يَشْتَرِطَ الْمُبْتَاعُ- ‘যদি কেউ গোলাম (দাস) বিক্রয় করে এবং তার (দাসের) সম্পদ থাকে, তবে সে সম্পদ হবে বিক্রেতার। কিন্তু যদি ক্রেতা শর্ত করে তাহ’লে তা হবে তার (ক্রেতার)’।[18]

অতএব দাস যেহেতু সম্পদের মালিক নয় সেহেতু তার উপর যাকাত ওয়াজিব নয়। যেমনিভাবে ফকীরের উপর যাকাত ওয়াজিব নয়।

(২) الإسلام তথা মুসলিম হওয়া : যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য ব্যক্তিকে অবশ্যই মুসলিম হ’তে হবে। কোন কাফেরের উপর যাকাত ওয়াজিব নয়। কেননা যাকাত হ’ল পবিত্রকারী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيْهِمْ بِهَا ‘উহাদের সম্পদ হ’তে ছাদাক্বা গ্রহণ করবে। এর দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে এবং পরিশোধিত করবে’ (তওবা ৯/১০৩)। পক্ষান্তরে কাফেরগণ অপবিত্র। যদি তারা পৃথিবী পূর্ণ স্বর্ণ দান করে তবুও তারা পবিত্র হ’তে পারবে না।

এছাড়াও যাকাত হ’ল ইসলামের অন্যতম একটি ইবাদত। আর কাফেরদের কোন ইবাদত আল্লাহ্র নিকট গ্রহণীয় নয়। তিনি বলেন, وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوْا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَنْثُوْرًا- ‘আমি তাদের (কাফিরদের) কৃতকর্মের প্রতি লক্ষ্য করব, অতঃপর সেগুলিকে বিক্ষিপ্ত ধুলিকণায় পরিণত করব’ (ফুরক্বান ২৫/২৩)। তিনি অন্যত্র বলেন, وَمَا مَنَعَهُمْ أَنْ تُقْبَلَ مِنْهُمْ نَفَقَاتُهُمْ إِلَّا أَنَّهُمْ كَفَرُوْا بِاللهِ وَبِرَسُوْلِهِ وَلَا يَأْتُوْنَ الصَّلَاةَ إِلَّا وَهُمْ كُسَالَى وَلَا يُنْفِقُوْنَ إِلَّا وَهُمْ كَارِهُوْنَ- ‘তাদের (কাফিরদের) দান গ্রহণ করা নিষেধ করা হয়েছে এজন্য যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করে, ছালাতে শৈথিল্যের সাথে উপস্থিত হয় এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে দান করে’ (তওবা ৯/৫৪)

(৩) ملك نصاب তথা নিছাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া : ইসলামী শরী‘আত কর্তৃক নির্ধারিত নিছাব পরিমাণ সম্পদ হ’লেই কেবল যাকাত ওয়াজিব। তার চেয়ে কম হ’লে যাকাত ওয়াজিব নয়। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, لَيْسَ فِيْمَا أَقَلُّ مِنْ خَمْسَةِ أَوْسُقٍ صَدَقَةٌ، وَلاَ فِيْ أَقَلَّ مِنْ خَمْسَةٍ مِنَ الإِبِلِ الذَّوْدِ صَدَقَةٌ، وَلاَ فِيْ أَقَلَّ مِنْ خَمْسِ أَوَاقٍ مِنَ الْوَرِقِ صَدَقَةٌ- ‘পাঁচ ওয়াসাক-এর কম উৎপন্ন দ্রব্যের যাকাত নেই এবং পাঁচটির কম উটের যাকাত নেই। এমনিভাবে পাঁচ আওকিয়ার কম পরিমাণ রৌপ্যেরও যাকাত নেই’।[19]

‘ওয়াসাক’-এর পরিমাণ : ১ ওয়াসাক = ৬০ ছা‘। অতএব ৫ ওয়াসাক = ৩০০ ছা‘। ১ ছা‘ = ২ কেজি ৫০০ গ্রাম হ’লে ৩০০ ছা‘ = ৭৫০ কেজি হয়। অর্থাৎ ১৮ মন ৩০ কেজি। এই পরিমাণ শষ্য বৃষ্টির পানিতে উৎপাদিত হ’লে ১০ ভাগের ১ ভাগ যাকাত ফরয। আর নিজে পানি সেচ দিয়ে উৎপাদন করলে ২০ ভাগের ১ ভাগ যাকাত ফরয।

আওকিয়ার পরিমাণ : ১ আওকিয়া = ৪০ দিরহাম। অতএব ৫ আওকিয়া = ২০০ দিরহাম। রৌপ্যের ক্ষেত্রে যার পরিমাণ হয় ৫৯৫ গ্রাম রৌপ্য। আর স্বর্ণের ক্ষেত্রে পরিমাণ হবে, ২৪ ক্যারেট : ৮৫ গ্রাম। ২১ ক্যারেট : ৯৭ গ্রাম। ১৮ ক্যারেট : ১১৩ গ্রাম। উল্লিখিত পরিমাণ স্বর্ণ বা রৌপ্য কারো মালিকানায় থাকলে অথবা এ পরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্যের মূল্য পরিমাণ টাকা থাকলে তার উপর যাকাত ফরয।

অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, فِيْ كُلِّ أَرْبَعِيْنَ شَاةً شَاةٌ ‘প্রত্যেক চল্লিশটি ছাগলের যাকাত হ’ল, একটি ছাগল’।[20]

অতএব ইসলামী শরী‘আত কর্তৃক নির্ধারিত নিছাব পরিমাণের কম হ’লে যাকাত ওয়াজিব নয়।

(৪) الإستقرار তথা সম্পদের পূর্ণ মালিক হওয়া : যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য ব্যক্তিকে সম্পদের পূর্ণ মালিক হ’তে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً ‘তাদের সম্পদ হতে ছাদাকা গ্রহণ করবে’ (তওবা ৯/১০৩)। তিনি অন্যত্র বলেন, وَالَّذِيْنَ فِيْ أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ مَعْلُوْمٌ ‘এবং যাদের ধন-সম্পদে রয়ছে নির্ধারিত হক’ (মা‘আরিজ ৭০/২৪)। অতএব পূর্ণ মালিকানাধীন সম্পদের উপরই যাকাত ওয়াজিব।

(৫) مضى الحول তথা  পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হওয়া : নিছাব পরিমাণ সম্পদ মালিকের নিকট পূর্ণ এক বছর মওজুদ থাকতে হবে। এক বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই কিছু অংশ ব্যয় হয়ে গেলে তার উপর যাকাত ওয়াজিব নয়। আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, لاَ زَكَاةَ فِيْ مَالٍ حَتَّى يَحُوْلَ عَلَيْهِ الْحَوْلُ- ‘পূর্ণ এক বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত সম্পদের যাকাত নেই’।[21]

[চলবে]

 



[1]. ফিক্বহুল মুয়াস্সার ১২১ পৃঃ।

[2]. বুখারী হা/১৩, ‘ঈমান’ অধ্যায়; মুসলিম হা/৪৫; মিশকাত হা/৪৯৬১।

[3]. মুসনাদে আহমাদ হা/১৩৫১; মিশকাত হা/১২৩২; আলবানী, সনদ ছহীহ।

[4]. বুখারী হা/১৪৪২, বঙ্গানুবাদ বুখারী ২/৫৪১ পৃঃ; মুসলিম হা/২৫৮০; মিশকাত হা/৪৯৫৮।

[5]. বুখারী হা/৬০১১, বঙ্গানুবাদ বুখারী ৫/৪৪৭ পৃঃ; মুসলিম হা/২৫৮৬; মিশকাত হা/৪৯৫৩।

[6]. বুখারী হা/১৩৯৫, ‘যাকাত’ অধ্যায়, ‘যাকাত ওয়াজিব হওয়া’ অনুচ্ছেদ, বঙ্গানুবাদ বুখারী ২/৭৫ পৃঃ; মুসলিম হা/১৯।

[7]. মুসলিম হা/২৫৮৮; মিশকাত হা/১৮৮৯।

[8]. ইবনু মাজাহ হা/৪০১৯; আলবানী, সনদ হাসান।

[9]. বুখারী হা/৪, ‘ঈমান’ অধ্যায়, বঙ্গানুবাদ, বুখারী ১/১৪ পৃঃ; মুসলিম হা/১৬; মিশকাত হা/৩।

[10]. বুখারী হা/১৩৯৫, ‘যাকাত’ অধ্যায়, ‘যাকাত ওয়াজিব হওয়া’ অনুচ্ছেদ, বঙ্গানুবাদ বুখারী ২/৭৫ পৃঃ; মুসলিম হা/১৯।

[11]. মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন, শারহুল মুমতে আলা যাদিল মুসতাকনি ৬/১২ পৃঃ।

[12]. মুসলিম হা/৯৮৭; মিশকাত হা/১৭৭৩, ‘যাকাত’ অধ্যায়, বঙ্গানুবাদ (এমদাদিয়া) ৪/১২৩ পৃঃ।

[13]. বুখারী হা/২৫, ‘ঈমান’ অধ্যায়, বঙ্গানুবাদ বুখারী ১/২১ পৃঃ; মুসলিম হা/২২।

[14]. বুখারী হা/১৪০০, ‘যাকাত’ অধ্যায়, বঙ্গানুবাদ বুখারী ২/৭৮ পৃঃ; মিশকাত হা/১৭৯০।

[15]. বুখারী হা/১৪০৩, ‘যাকাত’ অধ্যায়, বঙ্গানুবাদ বুখারী ২/৭৯; মিশকাত হা/১৭৭৪।

[16]. মুসলিম হা/৯৮৭; মিশকাত হা/১৭৭৩, ‘যাকাত’ অধ্যায়, বঙ্গানুবাদ (এমদাদিয়া) ৪/১২৩ পৃঃ।

[17]. সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী হা/৬৬২৫; সিলসিলা ছহীহাহ হা/১০৭।

[18]. বুখারী হা/২৩৭৯, বঙ্গানুবাদ বুখারী ২/৫০৯ পৃঃ।

[19]. বুখারী হা/১৪৮৪, ‘যাকাত’ অধ্যায়, বঙ্গানুবাদ বুখারী ২/১২০ পৃঃ; মুসলিম হা/৯৭৯; মিশকাত হা/১৭৯৪।

[20]. আবুদাউদ হা/১৫৬৮; তিরমিযী হা/৬২১; ইবনু মাজাহ হা/১৮০৫; মিশকাত হা/১৭৯৯; আলবানী, সনদ ছহীহ।

[21]. আবূদাউদ হা/১৫৭৩; তিরমিযী হা/৬৩১; ইবনু মাজাহ হা/১৭৯২; আলবানী, সনদ ছহীহ।

 

**